খ্যাতির ডাক

বুখারার রাজদরবার থেকে বের হয়ে ইবনে সিনা গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে পূর্ব থেকে পশ্চিম। দর্শনে তাঁর পাণ্ডিত্য স্বীকৃত সর্বত্র। কিন্তু আজ এক পথিক তাঁকে এমন এক মানুষের কথা বলেছেন, যাঁর সামনে নাকি জ্ঞানীরা নীরব হয়ে যান।

“শায়খ আবু হাসান আল-খারকানি,” ইবনে সিনা মনে মনে নামটি উচ্চারণ করলেন। “দেখা যাক, কী আছে এই সাধক-পুরুষের মধ্যে।”

পরদিন ভোরেই তিনি রওনা হলেন খারকানের উদ্দেশ্যে।

দরজায় প্রথম ধাক্কা

খারকান ছিল সাধারণ একটি গ্রাম। ধুলোমাখা পথ, মাটির ঘর। ইবনে সিনা শায়খের বাড়ির সন্ধান পেয়ে দরজায় করাঘাত করলেন।

দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন একজন বয়স্কা মহিলা। শায়খের স্ত্রী। তাঁর মুখে কোনো সৌজন্যের ছাপ নেই।

‘কী চাই?’ রূঢ় স্বরে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।

ইবনে সিনা ভদ্রভাবে বললেন, ‘আমি শায়খ আবু হাসানকে খুঁজছি।’

মহিলা কটমট করে তাকালেন। ‘সেই যিন্দিক? মিথ্যাবাদকে দিয়ে তোমার কী কাজ? কেন তার জন্য এত কষ্ট করছ?’

ইবনে সিনা হতবাক! একজন স্ত্রী তাঁর স্বামীকে এভাবে ডাকছেন? এ কেমন ঘর?

তবু তিনি ধৈর্য ধরে বললেন, ‘তাঁর সান্নিধ্য আমার জন্য জরুরি।’

মহিলা অবজ্ঞার সুরে বললেন, ‘সে তো কাঠ কুড়াতে গেছে বনে। যেতে চাও যাও।’

দরজা ধপ করে বন্ধ হয়ে গেল।

বনের পথে

ইবনে সিনা বিভ্রান্ত মনে বনের দিকে এগোতে লাগলেন। একজন মহান সাধক, যাঁর কথা দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ শুনতে আসে, তিনি নিজে কাঠ কুড়াতে যান? আর তাঁর স্ত্রী তাঁকে এমন ভাষায় ডাকেন?

‘হয়তো লোকে ভুল বলেছে, এ বুঝি সাধারণ কোনো মানুষই হবে।’ ইবনে সিনা ভাবলেন।

বনের গভীরে ঢুকতেই তিনি এমন এক দৃশ্য দেখলেন যা তাঁর সব যুক্তি, সব বিজ্ঞান, সব দর্শনকে থামিয়ে দিল।

একজন বৃদ্ধ মানুষ — সাদাসিধে পোশাক, শান্ত মুখশ্রী — একটি বিশাল সিংহের পিঠে কাঠের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছেন। সিংহটি একটি গৃহপালিত গাধার মতো দাঁড়িয়ে আছে!

ইবনে সিনার পা যেন মাটিতে গেঁথে গেল। চোখ বিস্ফারিত। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না।

বোঝার খেলা

শায়খ আবু হাসান সিংহকে চালিয়ে ইবনে সিনার কাছে এলেন। তাঁর মুখে মৃদু হাসি।

শায়খ তাঁর উপনাম ধরে ডাকলেন, “আবু আলী, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।”

ইবনে সিনা কোনোমতে বলতে চাইলেন, হুজুর, এ তো… এ তো সম্ভব নয়! সিংহ… কাঠ বহন করছে?

শায়খ বলতে চাইলেন, প্রত্যেক সৃষ্টিই তার স্রষ্টার আদেশে চলে। তুমি যখন স্রষ্টার কাছে পৌঁছে যাও, সৃষ্টি তোমার সেবক হয়ে যায়।

তারপর একটু থেমে, গভীর দৃষ্টিতে ইবনে সিনার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমরা ওই নেকড়ের বোঝা সবর ও ধৈর্যের সাথে বহন করেছি বলেই আজ এই সিংহ আমাদের বোঝা বহন করছে।”

শিক্ষা

ইবনে সিনা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। নেকড়ে — শায়খের স্ত্রীর কটু কথা, রূঢ় ব্যবহার। আর শায়খ তা নীরবে সহ্য করেছেন, ধৈর্য ধরেছেন, প্রতিবাদ করেননি।

ইবনে সিনা কাঁপা গলায় বললেন, “হুজুর, আমি জ্ঞানের অহংকারে এসেছিলাম আপনাকে পরীক্ষা করতে। কিন্তু আজ বুঝলাম, আমার জ্ঞান শুধু বইয়ের পাতায়। আপনার জ্ঞান জীবনে, আচরণে, সহনশীলতায়।”

শায়খ হাসলেন। “বেটা, বই জ্ঞান দেয়, কিন্তু জীবন প্রজ্ঞা দেয়। তুমি জ্ঞানী, এটা সত্য। কিন্তু প্রজ্ঞা পেতে হলে তোমাকে অহংকার ত্যাগ করতে হবে, নফসের সিংহকে বশ করতে হবে।”

“দেখো, এই হিংস্র জন্তু আজ আমার সেবক। কারণ আমি আমার ভেতরের হিংস্রতাকে, ক্রোধকে, অহংকারকে ধৈর্য দিয়ে বশ করেছি। তুমি যদি তোমার স্ত্রীর কটু কথায় রাগ করো, তাহলে তুমি তোমার সিংহকে মুক্ত করে দিলে। কিন্তু যদি ধৈর্য ধরো, তাহলে সিংহ তোমার বাহন হয়ে যাবে।”