মদিনার রাজপথে প্রতিদিনই ইয়েমেন থেকে আসা কাফেলার ভিড় লেগে থাকত। কিন্তু আমিরুল মুমিনীন হজরত ওমর (রা.) প্রতিটি কাফেলার কাছে একই প্রশ্ন করতেন— “তোমাদের মধ্যে কি করন গোত্রের কেউ আছে?”
মানুষ অবাক হতো। খলিফা কাকে খুঁজছেন? কোন সেই মহান ব্যক্তি, যাঁর জন্য স্বয়ং ওমর (রা.) এতটা ব্যাকুল?
আসলে রসুলুল্লাহ ﷺ একবার বলেছিলেন, “তাবেয়িদের মধ্যে সর্বোত্তম একজন ব্যক্তি আসবেন, যার নাম ওয়াইস। তাঁর মা থাকবেন। তাঁর শরীরে সাদা দাগ ছিল, যা দোয়ার মাধ্যমে সেরে যাবে। শুধু নাভির কাছে এক দিরহাম পরিমাণ দাগ থেকে যাবে। তাঁর কাছে যে ক্ষমা চাইবে, তিনি তার জন্য দোয়া করবেন।”
সেই ভবিষ্যদ্বাণীর কথা মনে রেখে হজরত ওমর (রা.) অপেক্ষায় ছিলেন।
একদিন আল্লাহর ইচ্ছায় এমন এক মুহূর্ত এলো— হজরত ওমর (রা.)-এর উটের লাগাম এবং এক অচেনা মানুষের উটের লাগাম একজন আরেকজনের হাতে এসে পড়ল। সেই সাধারণ পোশাকের, নিরহংকার মানুষটির দিকে তাকিয়ে হজরত ওমর (রা.)-এর মনে হলো— এই বুঝি সেই মানুষ!
‘আপনার নাম কী?’ জিজ্ঞেস করলেন খলিফা।
‘আমি ওয়াইস,’ সরল উত্তর এলো।
‘আপনার কি মা বেঁচে আছেন?’
‘হ্যাঁ, আছেন।’
হৃদয় কাঁপল হজরত ওমর (রা.)-এর। তিনি আরও একটি প্রশ্ন করলেন— ‘আপনার শরীরে কি সাদা দাগ ছিল?’
ওয়াইস (রা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, ছিল। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি এবং আল্লাহ তা দূর করে দিয়েছেন। শুধু নাভির কাছে দিরহামের মতো একটি দাগ রেখেছেন, যাতে আমি তা দেখে আমার রবের দয়ার কথা স্মরণ করতে পারি।’
হজরত ওমর (রা.) বুঝে গেলেন—ইনিই সেই মহাপুরুষ, যাঁর কথা নবীজি ﷺ বলে গিয়েছিলেন। আমিরুল মুমিনীন নিজের জন্য দোয়া চাইলেন, ‘আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।’
কিন্তু হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রা.)-এর বিনয় দেখার মতো! তিনি বললেন, ‘আপনিই বরং আমার জন্য ক্ষমা চাইবেন, কারণ আপনি তো রসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবি!’
তখন হজরত ওমর (রা.) রসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিসটি শোনালেন। কিন্তু এরপরই যা ঘটল তা আরও বিস্ময়কর—হ জরত ওয়াইস (রা.) মানুষের ভিড়ে মিশে গেলেন। কেউ বুঝতেই পারল না তিনি কোথায় গেলেন। খ্যাতি, সম্মান, মানুষের প্রশংসা— এসব থেকে তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখলেন।
পরবর্তীতে হজরত ওয়াইস (রা.) কুফায় উপস্থিত হলেন। উসাইর ইবনে জাবির বলেন, আমরা এক বৃত্তে বসে আল্লাহর স্মরণ করতাম। তিনিও এসে আমাদের সঙ্গে বসতেন— সাধারণ একজন মানুষের মতো। কিন্তু যখন তিনি কথা বলতেন, তখন এমন এক আধ্যাত্মিক প্রভাব আমাদের হৃদয়ে পড়ত, যা অন্য কারও কথায় পড়ত না।
এভাবেই পর্দার আড়ালে থেকে হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রা.) আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নীরবে হেঁটে গেলেন— মায়ের সেবায়, আল্লাহর স্মরণে এবং মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালিয়ে।