যুবক আব্দুল কাদের জিলানী যখন প্রথমবার বাগদাদের পথ ছেড়ে পবিত্র হজের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, তখন তাঁর হাতে ছিল না কোনো পাথেয়, পকেটে ছিল না কোনো সম্বল। শুধু ছিল আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস আর অন্তরে এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা।

পথিমধ্যে তাঁর সাথে দেখা হলো শায়খ আদী বিন মুসাফিরের। দুজন রিক্তহস্ত পথিক, একই গন্তব্য। তাঁরা একসাথে চলতে লাগলেন মরুর বুক চিরে, প্রখর রোদের তাপে পুড়তে পুড়তে।

এমন সময় পথের এক মোড়ে হঠাৎ এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী তাঁদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখে ছিল এক অলৌকিক দীপ্তি। তিনি সোজা আব্দুল কাদেরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “হে যুবক, আল্লাহ তায়ালা তোমার অন্তরে বিশেষ নুর অবতীর্ণ করেছেন। তোমাকে দান করা হয়েছে বিশেষ অনুগ্রহ। আজ আমি তোমাদের সাথে ইফতার করব।”

দুই পথিক বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। মরুভূমির মাঝে, রিক্তহস্ত অবস্থায়, এই নারী কীভাবে ইফতারের কথা বলছেন?

সন্ধ্যা নামল। এশার সময় হলো। হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে আব্দুল কাদের দেখলেন অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য। আকাশ থেকে নেমে আসছে একটি খাবারের থালা। তাতে ছয়টি রুটি, তাজা ফলমূল।

সেই পুণ্যবতী নারী হাসিমুখে বললেন, “আল্লাহ প্রতিদিন আমার জন্য দুটি করে রুটি নাজিল করেন। আজ তিনি আপনাদের সম্মানে ছয়টি পাঠিয়েছেন।”

তিনজন মিলে খেলেন সেই খাবার। পান করলেন এমন পানি, যার স্বাদ যেন জান্নাতের ঝর্ণার। সেই রাতে মরুভূমির বুকে আল্লাহর কুদরতের এক অনন্য স্বাক্ষর দেখলেন আব্দুল কাদের।

অবশেষে তাঁরা মক্কায় পৌঁছলেন। পবিত্র কাবা শরিফ। তওয়াফ শুরু করলেন আব্দুল কাদের। এমন সময় তাঁর ওপর অবতীর্ণ হলো এক বিশেষ নুর। শায়খ আদী অচেতন হয়ে পড়লেন সেই দীপ্তির তীব্রতায়।

সেই একই নারী আবার এসে শায়খ আদীকে সাহস দিলেন। তারপর আব্দুল কাদেরের দিকে ইশারা করে বললেন, “দেখো, এই যুবকের ওপর কী অবতীর্ণ হচ্ছে!”

আর ঠিক সেই মুহূর্তে আব্দুল কাদের শুনতে পেলেন গায়েবি আওয়াজ—

“হে আব্দুল কাদের, বাহ্যিক রিক্ততা ত্যাগ করো। একনিষ্ঠ তাওহিদে নিমগ্ন হও। অচিরেই তোমাকে দেখাব আমার কুদরতের বিস্ময়কর নিদর্শন। অস্তিত্বের মাঝে আমি ছাড়া অন্য কারো কর্তৃত্ব দেখো না। তবেই আমার দর্শন তোমার জন্য স্থায়ী হবে।”

আওয়াজ থামল। তারপর আবার ধ্বনিত হলো—

“এখন তুমি মানুষের কল্যাণে বসে যাও। তাদের নসিহত করো। কারণ আমার কিছু খাস বান্দাকে তোমার মাধ্যমে আমি আমার সান্নিধ্যে পৌঁছে দেব।”

বিদায়ের সময় সেই মহীয়সী নারী শেষবারের মতো বললেন, “হে যুবক, আজ তোমার ওপর নুরের একটি তাঁবু টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফেরেশতারা তোমাকে ঘিরে রেখেছে।”

এই বলে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আর কখনো তাঁকে দেখা যায়নি।

সেদিন থেকে শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী হয়ে উঠলেন মানুষের পথপ্রদর্শক, আলোর দিশারি। যে নুরের তাঁবু সেদিন তাঁর ওপর টানানো হয়েছিল, তা ছড়িয়ে পড়ল যুগ যুগ ধরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।