আবু হাসান বাগদাদী সেই রাতের কথা কখনো ভুলতে পারেননি। তিনি শায়খ আব্দুল কাদের জিলানীর মাদরাসায় বসে ছিলেন, খেদমতের সুযোগের অপেক্ষায়। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে শায়খ যখন বাইরে বের হলেন, আবু হাসান দ্রুত পানির পাত্র নিয়ে এগিয়ে গেলেন।

“লাগবে না।” শায়খ মৃদু স্বরে বললেন।

আবু হাসান কিছু না বুঝেই চুপ করে শায়খের পেছনে পেছনে চলতে লাগলেন। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে বাগদাদের প্রধান দরজার কাছে এসে পৌঁছালেন। রাতের সেই প্রহরে দরজা ছিল শক্ত তালাবদ্ধ।

কিন্তু যা ঘটল, তা দেখে আবু হাসানের চোখ ছানাবড়া! শায়খ কাছে যেতেই সেই ভারী লোহার তালা নিজে থেকে খুলে গেল। দরজা আপনা-আপনি সরে গেল, যেন কোনো অদৃশ্য হাত তা খুলে দিল।

আবু হাসান হতবাক। কিন্তু শায়খ কোনো বিস্ময় না দেখিয়ে সামনে এগিয়ে চললেন। তাঁরা হাঁটতে লাগলেন অন্ধকার পথ ধরে। কতক্ষণ হাঁটলেন, কত দূর গেলেন—বুঝতে পারলেন না আবু হাসান। মনে হচ্ছিল সময় যেন থেমে গেছে।

হঠাৎ তিনি চমকে উঠলেন। চারপাশের দৃশ্য পুরো পাল্টে গেছে! এ তো বাগদাদ নয়! সম্পূর্ণ অচেনা এক শহর! রাস্তাঘাট, দালানকোঠা—কিছুই চেনা মনে হলো না।

একটি খানকাহর মতো জায়গার সামনে শায়খ থামলেন। ভেতরে তাকিয়ে আবু হাসান দেখলেন সাতজন মানুষ নীরবে বসে আছেন। তাঁদের চেহারায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি।

হঠাৎ সেই শান্ত পরিবেশ ভেঙে উঠল এক যন্ত্রণাকাতর গোঙানি। কেউ যেন প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছেন। আবু হাসানের বুক কেঁপে উঠল। কিছুক্ষণ পর সেই গোঙানি থেমে গেল। চারদিকে নেমে এলো মৃত্যুর মতো নীরবতা।

তারপর ভেতর থেকে একজন মানুষ বের হলেন। তাঁর কাঁধে একজন মৃত। আবু হাসান ভালো করে দেখার আগেই সেই ব্যক্তি মৃতদেহ নিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন।

কিছুক্ষণ পরই একজন লম্বা গোঁফওয়ালা মানুষ ভেতরে ঢুকলেন। তাঁর পোশাক-আশাক দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তিনি বিদেশি। তিনি এসে শায়খের সামনে বসলেন।

শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, “বলো— লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।”

সেই মানুষটি কালিমা পড়লেন। ইসলাম গ্রহণ করলেন।

শায়খ নিজ হাতে তাঁর লম্বা চুল ও গোঁফ কেটে ছোটো করে দিলেন। মাথায় একটি টুপি পরিয়ে দিয়ে বললেন, “আজ থেকে তোমার নাম মুহাম্মদ।”

এরপর শায়খ উপস্থিত বাকি ছয়জনের দিকে ফিরে বললেন, “একে মৃত ব্যক্তির স্থলাভিষিক্ত আবদাল হিসেবে গ্রহণ করার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি।”

সেই ছয়জন একসাথে মাথা নুইয়ে বললেন, “শুনলাম এবং মানলাম।”

আবু হাসান সবকিছু দেখছিলেন স্তব্ধ বিস্ময়ে। এসব কী ঘটছে? কারা এই মানুষগুলো? কোন শহরে তিনি এসেছেন? কিন্তু কিছু জিজ্ঞাসা করার সাহস পেলেন না।

ফেরার পথেও নীরবেই চললেন। পরদিন সকালে যখন স্বাভাবিক পরিবেশে শায়খের সাথে দেখা, তখন আর থাকতে না পেরে কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, “হুজুর, গতরাতে আমরা কোথায় গিয়েছিলাম? সে-সব কী ছিল?”

শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী তাঁর চোখের দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “ওই শহরটির নাম নেহাওয়ান্দ। আর যে সাতজনকে দেখেছিলে, তাঁরা হলেন আবদাল— আল্লাহর বিশেষ বান্দা। এই পৃথিবী তাঁদের কারণেই টিকে আছে।”

আবু হাসানের শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।

শায়খ এগিয়ে বললেন, “যাঁর যন্ত্রণার আওয়াজ শুনেছিলে, তিনি ছিলেন সেই সাতজনের একজন— সপ্তম আবদাল। তিনি মারা যাচ্ছিলেন। আর যিনি তাঁকে কাঁধে করে নিয়ে গেলেন, তিনি হলেন হজরত খিজির (আ.)। তাঁর দাফন-কাফনের দায়িত্ব নিতে তিনি এসেছিলেন।”

“আর… আর সেই লোকটি?” আবু হাসান কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন।

“যাকে মুসলমান করলাম? সে ছিল কনস্টান্টিনোপলের এক খ্রিষ্টান পাদরি। আল্লাহ তাঁকে বেছে নিয়েছেন মৃত আবদালের জায়গায় নতুন আবদাল হওয়ার জন্য। রাতে তাঁকে সেখানে নিয়ে আসা হয়েছে। আর আমাকে ডাকা হয়েছে তাঁকে ইসলামে দীক্ষিত করার জন্য।”

আবু হাসান অবাক হয়ে শুনছিলেন। এক রাতে এত অবিশ্বাস্য ঘটনা!

শায়খ গম্ভীর স্বরে বললেন, “শোনো আবু হাসান, খুব সাবধান! আমি বেঁচে থাকতে এই কথা কাউকে বলবে না। এটা আল্লাহর গোপন রহস্য। আমরা যে জগতে বাস করি, তার পাশাপাশি আরেকটি অদৃশ্য জগৎ চলছে, যা সবাই দেখতে পায় না।”

আবু হাসান মাথা নিচু করলেন। সেই রহস্যময় রাতের স্মৃতি তাঁর মনে গেঁথে রইল। তিনি বুঝলেন, তিনি শুধু একজন মহান আলেমের খাদেম নন; তিনি এমন এক মহাপুরুষের সাথে আছেন যিনি দৃশ্য ও অদৃশ্যের সীমানা পার হতে পারেন।