১. “সৃষ্টিজগত তোমার এবং তোমার নিজের (আসল সত্তার) মাঝে পর্দা স্বরূপ; আর তোমার নফস বা অহমিকা তোমার এবং তোমার রবের মাঝে পর্দা স্বরূপ।”[১]
২. পরকালের ভয় এবং দুনিয়ার অস্থিরতা সম্পর্কে সতর্ক করে গাউসুল আজম হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) বলেন, দুনিয়া হলো ব্যস্ততা আর আখেরাত হলো ভয়াবহতা। বান্দা এই ব্যস্ততার মাঝেই থাকে যতক্ষণ না সে তার স্থায়ী গন্তব্যে অর্থাৎ জান্নাত বা জাহান্নামে পৌঁছায়।
৩. পরোপকার ও সৃষ্টির সেবাকে তিনি ইবাদতের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করতেন। তিনি বলেছেন, আমি সমস্ত নেক আমল তল্লাশি করেছি, কিন্তু ‘ক্ষুধার্তকে অন্নদান’ করার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কোনো আমল খুঁজে পাইনি। আমার ইচ্ছা হয়, গোটা দুনিয়া যদি আমার হাতের মুঠোয় থাকত, তবে আমি তা ক্ষুধার্তদের খাইয়ে দিতাম।[40]
৪. দুনিয়া ও আখেরাতের স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, দুনিয়া হলো ব্যস্ততা আর আখিরাত হলো বিভীষিকা। বান্দা এই দুইয়ের মাঝখানে অবস্থান করে; জান্নাত অথবা জাহান্নামে না পৌঁছানো পর্যন্ত তার চূড়ান্ত স্থিরতা বা শান্তি আসে না।
৫. মানুষের আধ্যাত্মিক উত্তরণের ক্রমধারা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আধ্যাত্মিক পথে মুমিনের অন্তরে প্রথমে ‘প্রজ্ঞার নক্ষত্র’ উদিত হয়, তারপর ‘ইলমের চাঁদ’ এবং সবশেষে ‘মারেফাতের সূর্য’ উদিত হয়। প্রজ্ঞার নক্ষত্র দিয়ে সে দুনিয়ার অসারতা দেখে। ইলমের চাঁদ দিয়ে সে পরকালের স্বরূপ দেখে। মারেফাতের সূর্য দিয়ে সে খোদ মালিক বা রবের দিদার লাভ করে।[41]
৬. মুমিনের নিত্যদিনের পথচলায় তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনের উপায় হিসেবে তিনি বলেন, প্রত্যেক মুমিনের জন্য তার জীবনের সর্বাবস্থায় তিনটি জিনিস অপরিহার্য: আল্লাহর আদেশ পালন করা, নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বেঁচে থাকা এবং তাকদির বা ভাগ্যের ওপর সন্তুষ্ট থাকা।
৭. আল্লাহর সাথে সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে তিনি বলেন, যে ব্যক্তি তার মওলা বা রবের সাথে সত্যতা ও একনিষ্ঠতার সাথে আচরণ করে, সে সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে বিমুখ হয়ে যায়।
৮. ইবাদতের ক্ষেত্রে আন্তরিকতা ও রিয়া (লোকদেখানো ভাব) সম্পর্কে তিনি সতর্ক করেন। প্রবৃত্তি থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কোনোকিছু গ্রহণ করা হলো অবাধ্যতা ও হঠকারিতা। প্রবৃত্তিহীন অবস্থায় (আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য) গ্রহণ করা হলো ঐকমত্য ও সঠিকতা। আর কোনো কিছু ত্যাগ করা যদি লোকদেখানো হয়, তবে তা রিয়াকারি ও মুনাফিকি।
৯. তিনি সুন্নাতের অনুসরণের ওপর জোর দিয়ে বলতেন, প্রত্যেক মুমিনের উচিত হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসটিকে নিজের অন্তরের আয়না এবং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে নেওয়া। নবীজী ﷺ আমাকে বললেন, “হে যুবক, তুমি আল্লাহর হুকুমের হেফাজত করো, আল্লাহ তোমার হেফাজত করবেন। আল্লাহকে স্মরণ করো, তাঁকে তোমার সামনেই পাবে। যখন কিছু চাইবে, আল্লাহর কাছেই চাও। যখন সাহায্য চাইবে, আল্লাহর কাছেই চাও। যা কিছু ঘটার তা কলম লিখে ফেলেছে (তাকদির নির্ধারিত)। যদি সমস্ত সৃষ্টিজগত তোমার কোনো উপকার করতে চায়— যা আল্লাহ লিখে রাখেননি, তবে তারা তা পারবে না। আর যদি তারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে চায়— যা আল্লাহ লিখে রাখেননি, তবে তারা সেটিরও ক্ষমতা রাখবে না। যদি পারো তবে দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে আল্লাহর শোকর আদায় করো। আর যদি তা না পারো, তবে জেনে রেখো, যা তোমার অপছন্দ তার ওপর সবর বা ধৈর্য ধরার মধ্যে অনেক কল্যাণ রয়েছে। জেনে রেখো, ধৈর্যের সাথেই বিজয় আসে, বিপদের সাথেই মুক্তি আসে এবং কষ্টের সাথেই স্বস্তি আসে।”
১০. অভাবের সময় মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়ার নেপথ্যে যে দুর্বলতা কাজ করে তা নিয়ে তিনি বলেন, মানুষ কেবল আল্লাহর প্রতি অজ্ঞতা, ঈমানের দুর্বলতা এবং ধৈর্যের অভাবেই অন্যের কাছে হাত পাতে। আর যে ব্যক্তি অন্যের কাছে হাত পাতা থেকে বিরত থাকে, সে কেবল আল্লাহর ওপর গভীর জ্ঞান, সুদৃঢ় ঈমান এবং প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর মারেফত বৃদ্ধির কারণেই তা করতে পারে।
১১. সমাজ ও স্রষ্টার মাঝে ভারসাম্য রক্ষার অনন্য সূত্র হিসেবে তিনি বলেন, আল্লাহর সাথে এমনভাবে থাকো যেন তোমার সাথে কোনো সৃষ্টি নেই; আর সৃষ্টির সাথে এমনভাবে থাকো যেন তোমার মাঝে কোনো নফস বা অহমিকা নেই। যখন তুমি সৃষ্টির মায়া ত্যাগ করে আল্লাহর সাথে থাকবে, তখন তুমি সবকিছু পাবে। আর যখন নিজের নফস ত্যাগ করে মানুষের সাথে থাকবে, তখন তুমি ইনসাফ ও তাকওয়া অবলম্বন করতে পারবে এবং ক্লান্তি থেকে রক্ষা পাবে।
১২. নিজের মাকাম বা আধ্যাত্মিক উচ্চতা সম্পর্কে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বলতেন, আমার মাঝে এবং তোমাদের ও সমস্ত সৃষ্টির মাঝে আসমান-জমিন ব্যবধান রয়েছে। সুতরাং আমাকে কারো সাথে তুলনা করো না এবং কাউকে আমার সাথে তুলনা করো না। কারণ বাদশাহর সাথে কামারের তুলনা হয় না। (এগুলো ‘ফুতুহুল গায়ব’ থেকে নেওয়া)
১৩. আল্লাহর নৈকট্য লাভের সংক্ষিপ্ততম পথ দেখিয়ে তিনি বলেন, মাত্র দুটি কদম বা পদক্ষেপ; তাতেই তুমি আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাবে। একটি হলো ‘নফস’ (প্রবৃত্তি) ত্যাগ করা, অন্যটি হলো ‘খলক’ তথা সৃষ্টির মায়া ত্যাগ করা। (অন্য বর্ণনায় এসেছে, দুনিয়া ও আখেরাত ত্যাগ করা)।[2]