ইউসুফ ইবনুল হুসাইন একদিন শুনলেন এক আশ্চর্য কথা। কেউ একজন তাঁকে বললেন, “জুননুন মিসরি নামে মিশরের এক মহান আধ্যাত্মিক পুরুষ ইসমে আজম জানেন।” ইসমে আজম— আল্লাহর সেই মহান নাম, যা দিয়ে দোয়া করলে তা কবুল হয়! সাধারণত সাধকভেদে এই নাম আলাদা আলাদা হয়ে থাকে। এই কথা শুনে ইউসুফের মনে তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, যেভাবেই হোক এই জ্ঞান তাঁকে অর্জন করতে হবে।
ইউসুফ রওনা হলেন মিশরের উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌঁছে হজরত জুননুন মিসরির খিদমতে নিজেকে নিয়োজিত করলেন। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কেটে গেল। ইউসুফ শায়েখের সেবা করতে লাগলেন। এভাবে পূর্ণ এক বছর কেটে গেল।
এক বছর পর একদিন ইউসুফ সাহস করে বললেন, “হে শায়েখ, আমি দীর্ঘ এক বছর ধরে আপনার সেবা করেছি। এখন আমার মনে হয় আমার পাওয়ার অধিকার তৈরি হয়েছে। আপনি যে ইসমে আজম জানেন, আমি তা শিখতে চাই। আমি কি এখন তার উপযুক্ত নই?”
জুননুন মিসরি কোনো উত্তর দিলেন না। নীরবে বসে রইলেন। ইউসুফ ভাবলেন, ‘হয়তো তিনি আমাকে পরীক্ষা করছেন।’ এরপর আরও ছয় মাস কেটে গেল। শায়েখ এ বিষয়ে কোনো কথাই বললেন না।
অবশেষে একদিন জুননুন মিসরি তাঁর ঘর থেকে একটি থালা বের করলেন। থালার উপর শক্ত করে ঢাকনা বাঁধা, আর পুরোটা মোড়ানো একটি কাপড়ে। তিনি ইউসুফকে বললেন, “তুমি কি ফুস্তাত শহরের অমুক ব্যক্তিকে চেনো?”
“হ্যাঁ, চিনি।” ইউসুফ উত্তর দিলেন।
“তাহলে এই থালাটি তার কাছে পৌঁছে দাও।” শায়েখ বললেন।
ইউসুফ থালাটি হাতে নিয়ে রওনা হলেন। কিন্তু পথে চলতে চলতে তাঁর মনে কৌতূহল জাগতে শুরু করল। ‘জুননুন মিসরির মতো একজন মহান সাধক কোনো সাধারণ জিনিস পাঠাবেন না। নিশ্চয়ই এই থালায় কিছু বিশেষ আছে। হয়তো কোনো আধ্যাত্মিক নিদর্শন, হয়তো কোনো গোপন জ্ঞানের চিহ্ন!’
কৌতূহল ক্রমশ তীব্র হতে লাগল। ইউসুফ যখন নাইল নদীর সেতুতে পৌঁছলেন, তখন আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না। চারপাশে তাকিয়ে নিয়ে তিনি কাপড়ের বাঁধন খুললেন। তারপর আস্তে করে থালার ঢাকনাটা তুলে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল!
একটি ইঁদুর! একটি সাধারণ ইঁদুর লাফ দিয়ে থালা থেকে বের হয়ে গেল এবং দৌড়ে কোথায় পালিয়ে গেল!
ইউসুফের মুখ রাগে-লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। ‘এটা কী! জুননুন মিসরি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন! আমার মতো একজন একনিষ্ঠ সেবকের হাতে তিনি একটা ইঁদুর পাঠালেন!’
ক্ষুব্ধ হয়ে ইউসুফ ফিরে গেলেন শায়েখের কাছে। তাঁর মুখ দেখেই জুননুন মিসরি সব বুঝে ফেললেন। কিন্তু তাঁর মুখে কোনো বিস্ময় নেই, যেন তিনি আগে থেকেই সব জানতেন।
শান্ত স্বরে তিনি বললেন, “হে মূর্খ মানুষ, আমি তো শুধু তোমাকে পরীক্ষা করেছি। আমি তোমার কাছে একটি সাধারণ ইঁদুরের আমানত রেখেছিলাম, আর তুমি সেই ছোট্ট আমানতেই বিশ্বাসঘাতকতা করলে! তুমি কৌতূহল সামলাতে পারলে না, তুমি আমার বিশ্বাস রক্ষা করতে পারলে না। যদি তুমি একটি ইঁদুরের আমানতে খেয়ানত করতে পারো, তাহলে কি আমি তোমার হাতে ইসমে আজমের মতো মহান জ্ঞান অর্পণ করতে পারি? যাও, আমার সামনে থেকে চলে যাও। আমি আর তোমাকে দেখতে চাই না।”
সেদিন ইউসুফ বুঝলেন, আধ্যাত্মিক জ্ঞানের জন্য শুধু সময় দেওয়াই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্যতা, প্রয়োজন আমানতদারিতা। ছোট জিনিসে যে বিশ্বস্ত নয়, বড় জিনিসের দায়িত্ব তার কাছে কীভাবে দেওয়া যায়?