মদিনার বিখ্যাত মুহাদ্দিস সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের মজলিস। প্রতিদিন ইলম পিপাসুরা ভিড় জমাত তাঁর কাছে। তাঁদের মধ্যে একজন নিয়মিত ছাত্র ছিলেন কাসির ইবনে মুত্তালিব। কিন্তু হঠাৎ করে বেশ কয়েকদিন তাঁকে দেখা গেল না।
একদিন কাসির যখন আবার মজলিসে হাজির হলেন, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কোথায় ছিলে?’ কাসির বিষণ্ণ কণ্ঠে বললেন, ‘আমার স্ত্রী মারা গিয়েছেন। তাই তাঁর জানাযা ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত ছিলাম।’ সাঈদ (রহ.) একটু আক্ষেপের সুরে বললেন, ‘আমাদের আগে জানাওনি কেন? জানালে আমরা জানাযায় শরিক হতাম।’
কাসির যখন উঠে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন, হঠাৎ সাঈদ (রহ.) প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি নতুন কোনো বিবাহের কথা ভেবেছ?’ কাসির অবাক হয়ে বললেন, ‘আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন! আমাকে কে মেয়ে বিয়ে দেবে? আমার কাছে তো মাত্র দুই বা তিন দিরহাম ছাড়া আর কিছুই নেই।’ সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব শান্ত স্বরে বললেন, ‘আমি তোমাকে মেয়ে বিয়ে দেব।’ কাসির যেন কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি সত্যিই তা করবেন?’ ‘হ্যাঁ’ দৃঢ়কণ্ঠে উত্তর এলো।
সেখানেই সাঈদ (রহ.) আল্লাহর প্রশংসা করলেন, নবীজি ﷺ-এর ওপর দরুদ পাঠ করলেন এবং মাত্র দুই বা তিন দিরহাম মহরের বিনিময়ে নিজের প্রিয় কন্যার সাথে কাসিরের বিবাহ সম্পন্ন করে দিলেন। কাসির খুশিতে আত্মহারা হয়ে বাড়ি ফিরলেন। কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তা এসে ভর করল— সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কোথা থেকে আনব? কার কাছ থেকে ধার নেব?
সন্ধ্যা নামল। কাসির রোজা রেখেছিলেন সেদিন। মাগরিবের নামাজ শেষে বাড়িতে এসে ইফতারের জন্য রুটি আর তেল সামনে নিয়ে বসেছেন, ঠিক তখনই দরজায় করাঘাত হলো। ‘কে?’ জিজ্ঞেস করলেন কাসির। ‘সাঈদ’, উত্তর এলো। কাসির; সাঈদ নামের সব পরিচিত মানুষের কথা ভাবলেন, কিন্তু সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব? না, এটা সম্ভব নয়! গত চল্লিশ বছর ধরে তাঁকে তো তাঁর ঘর আর মসজিদ ছাড়া কোথাও দেখা যায়নি।
দরজা খুলে দেখেন— সত্যিই সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব দাঁড়িয়ে আছেন! কাসির ভাবলেন, হয়তো তিনি মত পরিবর্তন করেছেন। ‘হে আবু মুহাম্মদ, আপনি কাউকে পাঠিয়ে দিলেই তো আমি আপনার কাছে হাজির হতাম’, বিব্রত কণ্ঠে বললেন কাসির। ‘না, আজ তোমার কাছে আসাটাই উত্তম’, জবাব দিলেন সাঈদ (রহ.)। ‘তুমি একজন একা মানুষ ছিলে, আজ বিয়ে করেছ। আমার এটা ভালো লাগছে না যে, তুমি আজ রাতটি একা কাটাও। এই যে তোমার স্ত্রী!’
কাসির তাকিয়ে দেখলেন, তাঁর পেছনে পূর্ণ উচ্চতার একজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন। সাঈদ (রহ.) তাঁর হাত ধরে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা টেনে চলে গেলেন। লজ্জায় মেয়েটি সেখানেই বসে পড়লেন।
কাসির দ্রুত ঘরের দরজা বন্ধ করলেন। তারপর তেলের বাতিটি রুটি ও তেলের পাত্র থেকে সরিয়ে ছায়ায় রাখলেন— যাতে নববধূ তাঁর দারিদ্র্যের দস্তরখান দেখতে না পায়। এরপর ছাদে উঠে প্রতিবেশীদের ডাকলেন। তারা এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে?’ ‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব আজ আমার সাথে তাঁর কন্যার বিবাহ দিয়েছেন এবং হঠাৎ করে তাঁকে আমার ঘরে দিয়ে গেছেন।’ প্রতিবেশীরা অবাক হয়ে বলল, ‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব তাঁর মেয়েকে তোমার সাথে বিয়ে দিয়েছেন?’ ‘হ্যাঁ, তিনি ঘরেই আছেন।’
খবর পেয়ে কাসিরের মা-ও ছুটে এলেন। তিনি ছেলেকে কড়া নির্দেশ দিলেন, ‘আমি একে সাজিয়ে গুছিয়ে দেওয়ার আগে যদি তুমি একে স্পর্শ করো, তবে তোমার সাথে দেখা করা আমার জন্য হারাম।’
তিনদিন পর কাসির তাঁর স্ত্রীর কাছে গেলেন। দেখলেন তিনি শুধু তৎকালীন সেরা সুন্দরীই নন; বরং আল্লাহর কিতাবের হাফেজ, রসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ এবং স্বামীর হক সম্পর্কে সবচেয়ে সচেতন নারী।
অথচ এই একই মেয়ের জন্য খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান তাঁর পুত্র যুবরাজ ওয়ালিদের জন্য বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সাঈদ (রহ.) সেই রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে খলিফা এক কনকনে শীতের দিনে তাঁকে একশ চাবুক মেরেছিলেন, মাথায় ঠান্ডা পানি ঢেলেছিলেন এবং পশমের মোটা জুব্বা পরিয়ে রেখেছিলেন।
কিন্তু সাঈদ (রহ.) তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থেকেছিলেন। কারণ তিনি চেয়েছিলেন— রাজপুত্রের নয়, একজন দরিদ্র; কিন্তু দ্বীনদার ছাত্রের ঘর আলো করুক তাঁর কন্যা। আর আল্লাহ সেই দুই দিরহামের বিয়েতে এত বরকত দিলেন যে, তা হয়ে গেল ইতিহাসের এক অনন্য গল্প— দ্বীনদারিত্বের, তাকওয়ার এবং আল্লাহর ওপর ভরসার।