এক
পথের ধুলো মাখা পায়ে, ক্লান্ত শরীরে মুরিদ হাসান এগিয়ে চলেছিলেন। কতদিন হলো ঘর ছেড়েছেন, হিসাব নেই। খারকান থেকে লেবানন পাহাড় — পথটা যে এত দীর্ঘ হবে, তা তিনি জানতেন না। কিন্তু মনের ভেতর একটাই আকাঙ্ক্ষা জ্বলছিল — কুতুবের দেখা পেতে হবে।
শায়খ আবুল হাসান আল-খারকানি রহমতুল্লাহি আলাইহি যখন তাঁকে অনুমতি দিয়েছিলেন, তখন তিনি কিছু বলেননি। শুধু মৃদু হেসে মাথায় হাত রেখেছিলেন। সেই হাসির অর্থ তখন হাসান বুঝতে পারেননি।
দুই
লেবানন পাহাড়ের চূড়ায় উঠে হাসান থমকে দাঁড়ালেন। সামনে একদল মানুষ একটি জানাজা ঘিরে বসে আছেন। কিন্তু নামাজ শুরু হচ্ছে না কেন?
“ভাই, নামাজ শুরু করছেন না যে?” হাসান জিজ্ঞেস করলেন।
একজন বয়স্ক লোক মুখ তুলে বললেন, “আমরা কুতুবের জন্য অপেক্ষা করছি। তিনি আসবেন, অতঃপর ইমামতি করবেন।”
হাসানের হৃদয় ধক করে উঠল। “কুতুব? তিনি… তিনি এখানে আসেন?”
“প্রতিদিন পাঁচবার আসেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তিনিই পড়ান আমাদের।” আরেকজন বললেন।
হাসান নীরবে বসে পড়লেন। এত কষ্ট করে আসার পর অবশেষে তাঁর সাক্ষাৎ মিলবে!
তিন
হঠাৎ দূর থেকে একজন আসতে দেখা গেল। সাদাসিধে পোশাক, সাধারণ চেহারা। কিন্তু উপস্থিত সবাই এক নিমেষে দাঁড়িয়ে গেলেন। সম্মানে, ভক্তিতে তাঁদের মাথা নত হয়ে গেল।
লোকটি সালাম দিয়ে এগিয়ে এলেন এবং জানাজার নামাজ শুরু করলেন।
হাসান তাঁর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এ তো… এ তো তাঁর নিজের শায়খ! শায়খ আবুল হাসান আল-খারকানি!
কীভাবে সম্ভব? খারকান থেকে এখানে আসতে তাঁর লেগেছে সপ্তাহের পর সপ্তাহ, আর শায়খ…
মাথা ঘুরতে লাগল হাসানের। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো। তিনি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
চার
হাসান যখন চোখ খুলল, নামাজ শেষ, দাফনও সম্পন্ন। শায়খ চলে গেছেন।
“ভাই! ভাই!” হাসান চিৎকার করে উঠলেন। “ওই যে ইমাম ছিলেন, তিনি কে?”
উপস্থিত লোকেরা অবাক হয়ে তাকালেন। “আপনি চেনেন না? উনি আবুল হাসান আল-খারকানি।”
“তিনি… তিনি আবার আসবেন?” কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন হাসান।
“হ্যাঁ, জোহরের সময়। তিনি প্রতি নামাজে আসেন।”
হাসান হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। তাঁর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। তিনি কুতুবের খোঁজে এসেছিলেন, আর কুতুব তো তাঁর নিজের ঘরেই ছিলেন।
পাঁচ
জোহরের আজান হলো। শায়খ আবার এলেন। নামাজ পড়ালেন।
নামাজ শেষ হওয়ামাত্র হাসান ছুটে গিয়ে শায়খের জামার আঁচল ধরে ফেললেন। “হুজুর, আমাকে ক্ষমা করুন! আমি বুঝিনি… আমি জানতাম না…”
আবার অন্ধকার। আবার জ্ঞান হারানো।
ছয়
চোখ খুলে হাসান দেখলেন, তিনি রাই শহরের বাজারে দাঁড়িয়ে আছেন। ছুটে গেলেন শায়খের কাছে। শায়খ মৃদু হাসছেন।
“হুজুর, এটা… এটা কীভাবে…” হাসান বিস্ময়ে হতবাক।
শায়খ তাঁর মাথায় হাত রাখলেন। “বেটা, এই ঘটনা কাউকে বলবে না। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি, তিনি যেন দুনিয়া ও আখিরাতে আমার মর্যাদা গোপন রাখেন।”