বাগদাদ শহরে তখন শায়খ আব্দুল কাদের জিলানীর নাম ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। মানুষ তাঁকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। কিন্তু শহরের একশজন বড় বড় আলেম কিছুটা সন্ধিহান ছিল। তাঁরা ভাবলেন, শায়খকে একটু পরীক্ষা করা দরকার।

একদিন তাঁরা সবাই একসাথে বসলেন। পরিকল্পনা করলেন— প্রত্যেকে আলাদা আলাদা বিষয় থেকে এমন কঠিন প্রশ্ন তৈরি করবেন, যার উত্তর দেওয়া খুবই কঠিন। যাতে শায়খকে সবার সামনে নিরুত্তর করা যায়। প্রত্যেকে নিজের নিজের বিষয় থেকে জটিল প্রশ্ন তৈরি করলেন। কেউ কারো প্রশ্নের সাথে মিল রাখলেন না।

নির্ধারিত দিন এলো। শায়খের ওয়াজের মজলিস। সেদিন মানুষের ভিড় একটু বেশি। খবর ছড়িয়ে গিয়েছিল যে বড় বড় আলেমরা আসবেন।

একশজন আলেম এসে মজলিসে বসলেন। তাঁদের চেহারায় আত্মবিশ্বাসের ভাব। কোলে বই, হাতে কাগজপত্র। শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী মিম্বরে বসে ছিলেন। তিনি যখন সেই একশজন আলেমকে দেখলেন, তখন মাথা কিছুটা নিচু করলেন।

মজলিসে নিস্তব্ধতা নেমে এলো।

হঠাৎ একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। শায়খের বুক থেকে একটা উজ্জ্বল নুর ঝলকানি বের হলো। সেই আলো একশজন আলেমের বুকের ওপর দিয়ে চলে গেল। যার ওপর দিয়েই সেই নু যাচ্ছিল, সে-ই অস্থির হয়ে পড়ছিল।

তারপর একসাথে সবাই চিৎকার করে উঠলেন। নিজেদের কাপড় ছিঁড়ে ফেললেন। মাথার টুপি ফেলে দিলেন। দৌড়ে গেলেন মিম্বরের কাছে, শায়খের পায়ের কাছে মাথা নত করলেন।

পুরো মজলিসে এমন হইচই শুরু হলো যে মনে হলো বাগদাদ শহরটাই বুঝি কেঁপে উঠছে।

শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী তখন উঠে দাঁড়ালেন। একে একে সবাইকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

তারপর একেকজনের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, “তোমার প্রশ্ন ছিল এই এবং তার উত্তর হলো এই।”

এভাবে তিনি প্রত্যেকের প্রশ্ন এবং তার উত্তর বলে দিলেন। যে প্রশ্ন তাঁরা মুখে বলেননি, শুধু মনে মনে নিয়ে এসেছিলেন, সেই গোপন প্রশ্নগুলোও শায়খ বলে দিলেন। আর দিলেন এমন সব উত্তর, যা তাঁরা আগে কখনো শুনেননি।

মজলিস শেষ হলে আমি সেই আলেমদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনাদের কী হয়েছিল?”

তাঁরা বললেন, “আমরা যখন বসলাম, তখন আমাদের অর্জিত সমস্ত জ্ঞান আমরা ভুলে গেলাম; মনে হচ্ছিল আমরা জীবনে কখনো কিছুই পড়িনি। কিন্তু শায়খ যখন আমাদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন, তখন আমাদের ছিনিয়ে নেওয়া জ্ঞান পুনরায় ফিরে এলো। শুধু তাই নয়, তিনি আমাদের সেই প্রশ্নগুলো বলে দিলেন যা আমরা মনে মনে নিয়ে এসেছিলাম এবং এমন সব উত্তর দিলেন, যা আমাদের জানা ছিল না।”

সেদিন বাগদাদের একশজন বড় আলেম— যাঁরা শায়খকে নিরুত্তর করতে এসেছিলেন, তাঁরাই হয়ে গেলেন শায়খের ভক্ত, তাঁর মুরিদ।

সেদিনের সেই নুর ঝলকানির কথা বাগদাদের মানুষ অনেকদিন মনে রেখেছিল।