বাগদাদের চিকিৎসাকেন্দ্রে সেদিন অদ্ভুত এক নীরবতা ছিল। ঘরের কোণে শুয়ে আছেন শিবলি রহমাতুল্লাহি আলাইহি— সেই মানুষ, যাঁর একটি কথায় একসময় পুরো মজলিস কেঁপে উঠত, যাঁর চোখের দৃষ্টিতে মানুষ আল্লাহর কথা মনে করত। আজ তিনি অসুস্থ, শরীর দুর্বল।

খবর পেয়ে রাষ্ট্রীয় মন্ত্রী আলী ইবনে ঈসা দেখতে এলেন। সঙ্গে তাঁর কয়েকজন সহচর। ক্ষমতাবান মানুষ, রাজদরবারের চেনা মুখ। ঘরে ঢুকে শিবলির বিছানার পাশে বসলেন।

শিবলি চোখ খুললেন। মন্ত্রীর দিকে তাকালেন— সেই চোখে তখনও সেই দীপ্তি। ঠোঁটে একটু হাসি ফুটে উঠল, তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার রব কী করেন?’

মন্ত্রী একটু অবাক হলেন। প্রশ্নটা যেন প্রত্যাশিত ছিল না। তবু সামলে নিয়ে জবাব দিলেন, ‘তিনি আসমানে ফায়সালা করেন এবং বাস্তবায়ন করেন।’

শিবলি মাথা নাড়লেন। ধীরে ধীরে বললেন, ‘আমি তোমার সেই রব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছি— যাঁকে তুমি উপাসনা করো। সেই রব সম্পর্কে নয়, যাঁকে তুমি উপাসনা করো না।’

কথাটা বাতাসে ভাসতে লাগল। মন্ত্রী চুপ। এই প্রশ্নের জবাব তাঁর কাছে নেই— অন্তত এই মুহূর্তে নেই। তিনি পাশের সহচরের দিকে তাকালেন এবং ইশারায় বললেন, ‘এর জবাব তুমি দাও।’

সহচর একটু এগিয়ে এলেন। ভাবলেন, এই সুযোগে শিবলিকে একটু পরীক্ষা করে নেওয়া যাক। বললেন, ‘হে আবু বকর, আপনাকে সুস্বাস্থ্যের সময় বলতে শুনেছি— প্রত্যেক সিদ্দিক যিনি কোনো কারামত দেখাতে পারেন না, তিনি মিথ্যাবাদী। আপনি তো সিদ্দিক। তাহলে আপনার কারামত কী?’

ঘরে একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল। সবাই অপেক্ষা করছে। শিবলি ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। চোখ দুটো অর্ধনিমীলিত। তারপর বললেন, ‘আমার কারামত হলো এই— আমার সচেতন অবস্থার ভাবনা আর মত্ত আত্মহারার অবস্থার ভাবনা— উভয়ই আল্লাহর ইচ্ছার সাথে এমনভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে যে, কখনোই তা আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে বিচ্যুত হয় না।’

সহচর চুপ হয়ে গেলেন। মন্ত্রীও নিশ্চুপ।

কারামত মানে কি শুধু আগুনে না পোড়া, পানির উপর হাঁটা? নাকি কারামত হলো এই— যে মানুষ হুঁশে থাকুক বা বেহুঁশ, ঘুমে থাকুক বা জাগরণে, সুখে থাকুক বা বেদনায়— তার হৃদয় একটিবারের জন্যও আল্লাহর দরজা থেকে সরে না যায়?

সেদিন চিকিৎসাকেন্দ্রের সেই ছোট্ট ঘরে, একজন অসুস্থ বৃদ্ধ সুফির কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসা কয়েকটি কথা— ক্ষমতাবান মানুষদের বহুক্ষণ নিশ্চুপ করে রেখেছিল।