ফদ্বল ইবনে আল-রাবি খলিফা হারুনুর রশিদের সাথে হজে যাচ্ছিলেন। বিশাল কাফেলা নিয়ে খলিফা যখন কুফা শহর অতিক্রম করছিলেন, তখন রাস্তার পাশে বাহলুল মাজনুনকে দেখা গেল। তিনি আপন মনে কী যেন বিড়বিড় করছিলেন।
ফদ্বল তাকে ধমক দিয়ে বললেন, “চুপ করো, আমিরুল মুমিনীন আসছেন।”
বাহলুল নীরব হয়ে গেলেন। কিন্তু খলিফার উটের হাওদা যখন ঠিক তার সামনে এলো, তখন তিনি স্পষ্ট স্বরে বলে উঠলেন, “হে আমিরুল মুমিনীন, আয়মান ইবনে নাবিল আমাকে একটি হাদিস শুনিয়েছিলেন। কুদামাহ ইবনে আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেছেন, তিনি রসুলুল্লাহ ﷺ-কে মিনায় একটি উটের পিঠে দেখেছিলেন। সেই উটের আসনটি ছিল অতি সাধারণ, জরাজীর্ণ। সেখানে কোনো লাঠিধারী প্রহরী ছিল না, মানুষ সরানোর জন্য ‘সরে দাঁড়াও, সরে দাঁড়াও’ বলে কোনো চিৎকারও ছিল না।”
ফদ্বল বিরক্ত হয়ে বললেন, “হে আমিরুল মুমিনীন, এ তো বাহলুল পাগল। এর কথায় কান দেবেন না।”
খলিফা শান্ত কণ্ঠে বললেন, “আমি তাকে চিনি।” তারপর বাহলুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বলে যাও, হে বাহলুল।”
বাহলুল তখন গম্ভীর স্বরে কবিতা আবৃত্তি করলেন, “মেনে নিন যে আপনি সমস্ত পৃথিবীর মালিক হয়ে গেছেন, সব দেশ ও জনপদ আপনার পদতলে নত হয়েছে— তারপর কী? আগামীকাল কি আপনার গন্তব্য সেই কবরের মাটি নয়? যেখানে এই মানুষ আর ওই মানুষ মিলে আপনার ওপর কেবল মাটিই ছুড়ে দেবে।”
খলিফা কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর বললেন, “সত্য বলেছ, হে বাহলুল, আরও কিছু বলো।”
বাহলুল বললেন, “হে আমিরুল মুমিনীন, যাকে আল্লাহ সৌন্দর্য এবং সম্পদ দান করেছেন, অতঃপর সে যদি তার সৌন্দর্যের ব্যাপারে পবিত্রতা রক্ষা করে এবং সম্পদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে সঠিক পথে ব্যয় করে, তবে তার নাম পুণ্যবানদের দপ্তরে লিখে রাখা হয়।”
খলিফা ভাবলেন বাহলুল হয়তো কোনো সাহায্য প্রার্থনা করছেন। তিনি বললেন, “আমরা আপনার ঋণ পরিশোধ করে দেওয়ার আদেশ দিচ্ছি।”
বাহলুল দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “হে আমিরুল মুমিনীন, এমনটা করবেন না। অন্যের ঋণ দিয়ে নিজের ঋণ পরিশোধ করবেন না। জনগণের বায়তুল মালের অর্থ দিয়ে আমার ব্যক্তিগত ঋণ মেটানো আপনার জন্য বৈধ নয়। বরং হকদারদের হক ফিরিয়ে দিন এবং নিজের আমল দিয়ে নিজের হিসাব চুকিয়ে নিন।”
খলিফা বললেন, “তাহলে আমরা আপনার জন্য একটি নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করছি।”
বাহলুল বললেন, “হে আমিরুল মুমিনীন, এমনটা করবেন না। আল্লাহ কি শুধু আপনাকে রিজিক দেবেন আর আমাকে বঞ্চিত রাখবেন? যিনি আপনাকে খাওয়াচ্ছেন, তিনি আমাকেও খাওয়াচ্ছেন। আপনার সেই ভাতার আমার কোনো প্রয়োজন নেই।”
এই বলে বাহলুল উঠে চলে গেলেন। খলিফা হারুনুর রশিদ নীরবে বসে রইলেন। কাফেলা আবার চলতে শুরু করল। কিন্তু বাহলুলের সেই কথাগুলো খলিফার মনে গেঁথে রইল— ক্ষমতা ও সম্পদের শেষ ঠিকানা কবরের মাটি, আর প্রকৃত সম্পদ হলো আল্লাহর উপর নির্ভরতা এবং তাঁর হুকুম পালন।