একদিন হজরত সাররি আস-সাকতি কবরস্থানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর চোখ আটকে গেল এক অদ্ভুত দৃশ্যে। বাহলুল—সেই বিখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক—একটি কবরের ভেতর পা ঝুলিয়ে বসে আছেন। তাঁর হাতে মাটি, আর তিনি সেই মাটি নিয়ে খেলছেন যেন কোনো নিরীহ শিশু।

সাররি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “হে বাহলুল, তুমি এখানে কেন?”

বাহলুল মুখ তুলে তাকালেন। তাঁর চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি বললেন, “আমি এমন লোকদের কাছে আছি যারা আমাকে কষ্ট দেয় না। আর আমি তাদের থেকে দূরে থাকলেও তারা আমার গিবত করে না, পেছনে আমার নিন্দা করে না।”

সাররি বুঝলেন, বাহলুল মৃতদের কথা বলছেন। যারা চলে গেছেন, তারা আর কাউকে কষ্ট দেয় না, কারও নিন্দাও করে না।

সাররি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি ক্ষুধার্ত নও?”

বাহলুল মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকালেন। তারপর আস্তে আস্তে কবিতার মতো করে বলতে লাগলেন, “হ্যাঁ, ক্ষুধার্ত হই। কিন্তু ক্ষুধার মধ্যেই তো তাকওয়ার জ্ঞান নিহিত। দীর্ঘ ক্ষুধার্ত থাকলেও একদিন না একদিন তো তৃপ্তি পাব।”

সাররি একটু হেসে বললেন, “হে বাহলুল, তুমি কি জানো না, এখন রুটির দাম কত বেড়ে গেছে? মানুষ খেতে পারছে না!”

বাহলুল এবার একটু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “আল্লাহর কসম, তাতে আমার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই! এক দানা শস্যের মূল্য যতটুকুই হোক না কেন, তা আমার চিন্তার বিষয় নয়। আমাদের দায়িত্ব হলো—তিনি যেমন আদেশ করেছেন, তেমনভাবে তাঁর ইবাদত করা। আর তাঁর দায়িত্ব হলো—তিনি যেমন ওয়াদা করেছেন, তেমনভাবে আমাদের রিজিক দান করা।”

এই কথা বলে বাহলুল উঠে দাঁড়ালেন। সাররির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। আর হাঁটতে হাঁটতে উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন:

“হে সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়া আর তার চাকচিক্যে মগ্ন! যার চোখ কখনো ভোগবিলাস ছেড়ে ঘুমায় না! তুমি তোমার পুরো জীবন শেষ করে ফেলেছ এমন কিছুর পেছনে, যা তুমি কখনোই ধরতে পারবে না। যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে, তখন কী জবাব দেবে? সে কথা কি কখনো ভেবে দেখেছ?”

তারপর আবার কবিতার মতো সুরে বলতে লাগলেন, “আহ, এই দুনিয়া! এখানে আমার কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। প্রকৃত শান্তি তো শুধু ওই কবরস্থানেই। সময় কখনো থেমে থাকে না, দ্রুত বয়ে চলে। রাত-দিন আমার শরীরকে ক্ষয় করছে, আমার ধৈর্যকে পরীক্ষা করছে।”

সাররি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। বাহলুলের কথাগুলো তাঁর হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করল। এই মানুষটি পাগল হয়ে থাকতে পারেন দুনিয়ার চোখে, কিন্তু তাঁর কথায় কী গভীর জ্ঞান! কী নির্ভেজাল আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা!

বাহলুল দূরে চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর বাণী রয়ে গেল সাররির মনে। দুনিয়ার মোহ, রিজিকের চিন্তা, মানুষের কথায় ভীত হওয়া—এসব থেকে মুক্ত হয়ে শুধু আল্লাহর উপর নির্ভর করার এক অনন্য শিক্ষা।

সেদিন সাররি বুঝলেন, প্রকৃত প্রজ্ঞা কখনো কখনো পাগলের বেশে আসে। আর যে আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখে, দুনিয়ার কোনো বিপদই তাকে টলাতে পারে না।