কল্পনা করুন ১৩শ শতাব্দীর কোনিয়া শহর। একজন আধ্যাত্মিক সাধক তাঁর প্রিয় বন্ধু শামস তাবরিজির অন্তর্ধানে শোকে মুহ্যমান। সেই শোক, সেই আকুতি, সেই ঐশী প্রেম তাঁর হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়ে পরিণত হয় কবিতায় – এমন কবিতা যা ৮০০ বছর পর আজও মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। সেই কবি জালালউদ্দিন রুমি। তাঁর কবিতা শুধু সাহিত্য নয়, এটি আত্মার ভাষা, প্রেমের গান, আল্লাহর প্রতি আকুতির প্রকাশ।
সুফি কবিতা বিশ্ব সাহিত্যের এক অনন্য অধ্যায়। এখানে দর্শন আর প্রেম একসাথে মিশে গেছে। এখানে মদ, মদিরা, সাকি, মাইখানা – এসব শব্দ ব্যবহার করা হয় কিন্তু কথা বলা হয় আল্লাহর প্রেমের। একটি সাধারণ গোলাপ হয়ে ওঠে ঐশী সৌন্দর্যের প্রতীক। একজন প্রেমিকার কথা বলা হয় কিন্তু বোঝানো হয় আল্লাহকে।[১]
হাজার বছরের এই কাব্য ঐতিহ্যে রুমি, হাফিজ, আত্তার শুধু তিনটি নাম। আছেন সানাই, সাদি, জামি, ইরাকি, আনসারি – এবং আরও অসংখ্য কবি যারা ফারসি ভাষাকে আধ্যাত্মিকতার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম বানিয়েছেন। প্রতিটি কবির নিজস্ব কণ্ঠস্বর, নিজস্ব শৈলী, কিন্তু সবার হৃদয়ে একই তৃষ্ণা – আল্লাহর মিলন।
পারস্য সুফি কবিতার উত্থান: ৯ম-১১শ শতাব্দী
পারস্য সাহিত্যে সুফি কবিতার যাত্রা শুরু হয় ৯ম শতাব্দীতে, যখন ইসলামি বিজয়ের পর ফারসি ভাষা আবার তার সাহিত্যিক গুরুত্ব ফিরে পায়। প্রাথমিক সুফি কবিরা আরবি এবং ফারসি উভয় ভাষায় লিখতেন, কিন্তু ধীরে ধীরে ফারসি হয়ে ওঠে সুফি ভাবপ্রকাশের প্রধান মাধ্যম।
আবুল হাসান খারাকানি (৯৬৩-১০৩৩): প্রথম ফারসি সুফি কবি
খারাকানি প্রথম সুফিদের একজন যিনি ফারসি ভাষায় আধ্যাত্মিক শিক্ষা প্রকাশ করেন। তাঁর কবিতা সরল কিন্তু গভীর:
“আমার কাছে দুটি জিনিস আছে যা আমাকে যথেষ্ট:
আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এবং মানুষের সেবা।”[২]
আব্দুল্লাহ আনসারি (১০০৬-১০৮৮): প্রেমের কবি
হেরাতের বিখ্যাত সুফি আনসারি ফারসি গদ্যকাব্যের (মুনাজাত) জনক। তাঁর “মুনাজাত নামা” (প্রার্থনার বই) ফারসি সাহিত্যের একটি মাস্টারপিস। তাঁর মুনাজাতগুলো সরাসরি আল্লাহর সাথে কথোপকথন – অসাধারণ আন্তরিক ও ভাবপূর্ণ।
“হে আল্লাহ! অন্যরা তোমার রহমত চায়,
আমি শুধু তোমাকে চাই।
অন্যরা জান্নাত চায়,
আমার জন্য তুমিই আমার জান্নাত।”[৩]
হাকিম সানাই (১০৮০-১১৩১): মসনবির পথপ্রদর্শক
সানাই ছিলেন প্রথম বড় মাপের সুফি কবি যিনি মসনবি (দীর্ঘ আখ্যানমূলক কবিতা) ফর্মে আধ্যাত্মিক শিক্ষা প্রকাশ করেন। তাঁর বিখ্যাত কাজ “হাদিকাতুল হাকিকাত” (সত্যের বাগান) পরবর্তী সুফি কবিদের জন্য একটি মডেল হয়ে ওঠে।
সানাই রাজদরবারের কবি ছিলেন কিন্তু একটি ঘটনা তাঁর জীবন বদলে দেয়। একদিন তিনি একজন মাতাল দরবেশকে গান গাইতে শোনেন: “সুলতান এবং কবি উভয়ই মরে যাবে, কিন্তু তাদের নাম থাকবে কাগজে।” এই কথা সানাইকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং তিনি পার্থিব জীবন ত্যাগ করে সুফি হয়ে যান।[৪]
তাঁর কবিতায় জ্ঞান, যুক্তি এবং ভালোবাসার সমন্বয়:
“জ্ঞান ছাড়া ভালোবাসা অন্ধ,
ভালোবাসা ছাড়া জ্ঞান শুষ্ক।
দুটি একসাথে থাকলেই পথ পাওয়া যায়।”[৫]
ফরিদউদ্দিন আত্তার (১১৪৫-১২২১): পাখিদের ভাষা
আত্তার নিশাপুরের একজন ওষুধ বিক্রেতা ছিলেন (আত্তার শব্দের অর্থ সুগন্ধি বা ওষুধ বিক্রেতা)। কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় তিনি একজন মহান সুফি কবি। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ “মানতিক উত-তায়ের” (পাখিদের সম্মেলন) – একটি রূপক মহাকাব্য যা আধ্যাত্মিক যাত্রার বর্ণনা দেয়।
মানতিক উত-তায়ের: আধ্যাত্মিক যাত্রার রূপক
এই কাব্যে, বিশ্বের সব পাখি তাদের রাজা সিমুর্গকে খুঁজতে বের হয়। পথে তাদের সাতটি উপত্যকা অতিক্রম করতে হয়:
- তালাব (অনুসন্ধান) এর উপত্যকা: যেখানে আধ্যাত্মিক যাত্রা শুরু হয়
- ইশক (প্রেম) এর উপত্যকা: যেখানে পার্থিব ভালোবাসা ঐশী প্রেমে রূপান্তরিত হয়
- মারিফাত (জ্ঞান) এর উপত্যকা: যেখানে সত্য উপলব্ধি হয়
- ইস্তেগনা (অনাসক্তি) এর উপত্যকা: যেখানে পার্থিব মোহ ত্যাগ হয়
- তাওহিদ (একত্ব) এর উপত্যকা: যেখানে দ্বৈততা মিটে যায়
- হায়রাত (বিস্ময়) এর উপত্যকা: যেখানে মানুষ আল্লাহর মহিমায় হতবাক
- ফকর ও ফানা (দারিদ্র্য ও বিলোপ) এর উপত্যকা: যেখানে আত্মা সম্পূর্ণ বিলীন হয়[৬]
হাজার পাখি শুরু করে, কিন্তু শেষে পৌঁছায় মাত্র ত্রিশটি (ফারসিতে “সি মুর্গ”)। যখন তারা সিমুর্গের সামনে পৌঁছায়, তারা দেখে একটি আয়নায় তাদের নিজের প্রতিফলন। তারা বুঝতে পারে – তারা নিজেরাই সিমুর্গ! যাকে তারা খুঁজছিল, সে তাদের মধ্যেই ছিল। এটি তাওহিদের (আল্লাহর একত্ব) একটি সুন্দর রূপক।
আত্তারের অন্যান্য রচনা
আত্তার আরও অনেক মহৎ কাজ রেখে গেছেন:
- “তাজকিরাতুল আওলিয়া” (সাধকদের স্মৃতিকথা): সুফি সাধকদের জীবনী ও শিক্ষা
- “এলাহি নামা” (ঐশী বই): একজন রাজা ও তার ছয় ছেলের গল্পের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক শিক্ষা
- “মুসিবত নামা” (দুর্ভোগের বই): আত্মার বিভিন্ন পরীক্ষা নিয়ে
আত্তার রুমির উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন। রুমি নিজেই বলেছেন: “আত্তার ছিলেন আত্মা, সানাই তার দুই চোখ – আমি আত্তার ও সানাইয়ের পথ অনুসরণ করে এসেছি।”[৭]
জালালউদ্দিন রুমি (১২০৭-১২৭৩): প্রেমের সাগর
রুমি সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে পঠিত কবি – আজও, তাঁর মৃত্যুর ৮০০ বছর পর। তাঁর কবিতা অসংখ্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং লাখো মানুষকে স্পর্শ করেছে। কী আছে তাঁর কবিতায় যা এতটা সার্বজনীন?
শামস তাবরিজি: রুমির জীবনে রূপান্তর
রুমি বালখ (বর্তমান আফগানিস্তান) এ জন্মগ্রহণ করেন এবং পরে কোনিয়া (বর্তমান তুর্কি) তে বসতি স্থাপন করেন। তিনি একজন সম্মানিত আলেম ও শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু ১২৪৪ সালে তাঁর জীবনে আসে শামস তাবরিজি – একজন রহস্যময় দরবেশ।
শামস রুমিকে প্রশ্ন করেন: “বায়েজিদ বোস্তামি বড় নাকি মুহাম্মদ (সা.)?” রুমি বলেন, “অবশ্যই মুহাম্মদ (সা.)।” শামস জিজ্ঞেস করেন, “তাহলে বায়েজিদ কেন বলেছিলেন ‘আমি কত মহান!’ এবং মুহাম্মদ (সা.) বলেছিলেন ‘আমি তোমার যথাযথ প্রশংসা করতে পারিনি’?”
এই প্রশ্ন রুমির জগৎ বদলে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন যে বইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন হৃদয়ের জ্ঞান। শামস হয়ে ওঠে রুমির আধ্যাত্মিক সঙ্গী এবং শিক্ষক।[৮]
কিন্তু রুমির শিষ্যরা শামসকে হিংসা করে। শামস দুবার অদৃশ্য হয়ে যায় এবং দ্বিতীয়বার আর ফিরে আসে না। এই বিরহ, এই শোক, এই তীব্র প্রেম রুপান্তরিত হয় কবিতায়। রুমি বলেন:
“শামস তাবরিজির সূর্য যখন উঠল,
আমার হৃদয়ের সব অন্ধকার দূর হয়ে গেল।”[৯]
রুমির প্রধান কাজ
১. মসনবি-ই মানাভি: ছয় খণ্ডে প্রায় ২৬,০০০ শ্লোকের এই মহাকাব্য “ফারসি ভাষার কুরআন” নামে পরিচিত। এতে আছে শত শত গল্প, উপমা, রূপক যা আধ্যাত্মিক শিক্ষা প্রদান করে। প্রতিটি গল্প বাহ্যিক অর্থের পাশাপাশি গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ বহন করে।
উদাহরণস্বরূপ, বিখ্যাত “হাতি ও অন্ধরা” গল্পে চার অন্ধ লোক একটি হাতি স্পর্শ করে। একজন শুঁড় ছুঁয়ে বলে এটি পাইপের মতো, একজন পা ছুঁয়ে বলে এটি স্তম্ভের মতো, একজন কান ছুঁয়ে বলে এটি পাখার মতো। প্রত্যেকে আংশিক সত্য জানে, কিন্তু পুরো সত্য জানে না। এটি মানুষের আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানের রূপক।[১০]
২. দিওয়ান-ই শামস তাবরিজি: প্রায় ৪০,০০০ শ্লোকের গজল (প্রেমের কবিতা) সংকলন, সবগুলো শামস তাবরিজির নামে উৎসর্গ করা। এগুলো ঐশী প্রেমের সবচেয়ে তীব্র প্রকাশ:
“প্রেমে পড়ে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি,
এখন আমি জানি না আমি কে।
কখনো মনে হয় আমি সে,
কখনো মনে হয় সে আমি।”[১১]
৩. ফিহি মা ফিহি: গদ্যে লেখা রুমির বক্তৃতা ও কথোপকথনের সংকলন, যা তাঁর দার্শনিক চিন্তাভাবনা প্রকাশ করে।
রুমির কবিতার বৈশিষ্ট্য
রুমির কবিতা সহজ ভাষায় গভীর সত্য প্রকাশ করে। তিনি দৈনন্দিন জীবনের ছবি ব্যবহার করেন – রান্নাঘর, বাজার, মাঠ, নদী। কিন্তু প্রতিটি ছবির পেছনে আধ্যাত্মিক অর্থ লুকিয়ে।
তাঁর বিখ্যাত শুরু:
“শোনো নে-এর অভিযোগ,
বিচ্ছেদের গল্প বলছে:
‘যেদিন থেকে আমাকে বাঁশবন থেকে কেটে নেওয়া হয়েছে,
আমার কান্না পুরুষ ও নারীকে কাঁদিয়েছে।
আমি এমন একটি হৃদয় খুঁজি যা বিচ্ছেদে ছিঁড়ে গেছে,
যাতে আমি তাকে আমার আকাঙ্ক্ষার যন্ত্রণা বলতে পারি।'”[১২]
এখানে নে (বাঁশি) মানুষের প্রতীক যে আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ফিরে যেতে চায়।
সাদি শিরাজি (১২১০-১২৯২): নৈতিক জ্ঞানের কবি
সাদি শিরাজে জন্মগ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ জীবন কাটান ভ্রমণে। তিনি উত্তর আফ্রিকা, আরব, ভারত, মধ্য এশিয়া ঘুরেছেন। এই বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত।
সাদির প্রধান রচনা
১. গুলিস্তান (গোলাপ বাগান): গদ্য ও কবিতার মিশ্রণে লেখা এই বই আটটি অধ্যায়ে বিভক্ত – রাজাদের চরিত্র, দরবেশদের আচরণ, তৃপ্তির মূল্য, নীরবতার সুবিধা, প্রেম ও যৌবন, দুর্বলতা ও বৃদ্ধত্ব, শিক্ষার প্রভাব এবং সুহবতের নিয়ম।
গুলিস্তানের প্রথম পাতায় আছে বিশ্ববিখ্যাত শ্লোক যা জাতিসংঘের প্রবেশপথে খোদাই করা:
“মানুষেরা একই দেহের অঙ্গ,
একই মৌলিক উপাদানে সৃষ্ট।
যখন কালের আঘাতে একটি অঙ্গ ব্যথিত হয়,
অন্য অঙ্গগুলো শান্তিতে থাকতে পারে না।”[১৩]
২. বুস্তান (সুগন্ধ বাগান): মসনবি ফর্মে লেখা এই কাব্য দশটি অধ্যায়ে বিভক্ত – ন্যায়বিচার, দানশীলতা, প্রেম, নম্রতা, সন্তুষ্টি, তওবা, কৃতজ্ঞতা, ইত্যাদি।
সাদির কবিতা সহজ, সরল এবং ব্যবহারিক। তিনি জটিল দার্শনিক ধারণা সহজ গল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতা:
“যে জ্ঞানী নিজেকে জানে,
সে সবকিছু জানে।
যে নিজেকে জানে না,
সে কিছুই জানে না।”[১৪]
শামসউদ্দিন মুহাম্মদ হাফিজ (১৩২৫-১৩৯০): গজলের সম্রাট
হাফিজ শিরাজের সবচেয়ে প্রিয় কবি এবং ফারসি গজলের নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। “হাফিজ” (কুরআনের হাফেজ) তাঁর উপাধি কারণ তিনি সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করেছিলেন। তাঁর প্রকৃত নাম শামসউদ্দিন মুহাম্মদ।
হাফিজের জীবন ও কবিতা
হাফিজ শিরাজে জন্মগ্রহণ করেন, সেখানেই জীবন কাটান এবং সেখানেই সমাহিত। তাঁর সমাধি আজও শিরাজের প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। তাঁর “দিওয়ান” (কবিতা সংকলন) এ প্রায় ৫০০ গজল আছে।
হাফিজের কবিতা রহস্যময়। একই কবিতা বাহ্যিকভাবে পার্থিব প্রেমের কথা বলে কিন্তু গভীরে ঐশী প্রেমের কথা বলে। তিনি মদ, মদিরা, সাকি, মাইখানার প্রতীক ব্যবহার করেন:
- মদ: ঐশী প্রেম বা জ্ঞান
- সাকি: আধ্যাত্মিক গুরু বা আল্লাহ
- মাইখানা: সুফি খানকাহ বা হৃদয়
- নেশা: আধ্যাত্মিক উচ্ছ্বাস[১৫]
তাঁর একটি বিখ্যাত গজল:
“ওহে সাকি! মদের পেয়ালা ঘুরিয়ে দাও,
প্রেম প্রথমে সহজ দেখালেও পরে কঠিন সমস্যা আসে।
মাইখানায় যে সুগন্ধ বাতাসে ভাসছে,
সেই খোশবু আল্লাহর প্রেমিকদের পাগল করে দেয়।”[১৬]
হাফিজের প্রভাব
হাফিজের প্রভাব শুধু ইরানে নয়, বরং সারা বিশ্বে। গোয়েটে, এমারসন, এবং অন্যান্য পশ্চিমা কবিরা হাফিজ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। ইরানে এখনও “ফাল-ই হাফিজ” প্রচলিত – যেখানে মানুষ হাফিজের দিওয়ান থেকে একটি এলোমেলো পৃষ্ঠা খুলে সেটিকে তাদের ভাগ্যের ইঙ্গিত মনে করে।
হাফিজ বলেছেন:
“আমার মৃত্যুর পর আমার কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়
তোমার পায়ের ছন্দে আমার কবরের ধুলো নাচবে।”[১৭]
আবদুর রহমান জামি (১৪১৪-১৪৯২): শেষ মহান ক্লাসিক কবি
জামি খোরাসান (বর্তমান আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্তে) এর জাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শেষ মহান ক্লাসিক পারস্য কবি হিসেবে বিবেচিত। তিনি নকশবন্দিয়া তরিকার একজন প্রখ্যাত সুফি ছিলেন।
জামির রচনাবলী
জামি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন – কবি, পণ্ডিত, ধর্মতত্ত্ববিদ, সুফি। তাঁর প্রধান কাজ:
- হাফত আওরাং (সাত সিংহাসন): সাতটি মসনবির সংকলন
- ইউসুফ ও জুলায়খা: কুরআনের নবী ইউসুফ (আ.) এর গল্পের কাব্যিক সংস্করণ
- লায়লা ও মজনু: বিখ্যাত আরব প্রেমকাহিনীর পারস্য রূপান্তর
- সালামান ও আবসাল: প্লেটোনিক দর্শনের কাব্যিক ব্যাখ্যা
জামির কবিতা পরিশীলিত এবং দার্শনিক। তিনি ইবনে আরাবির ওয়াহদাত আল-উজুদ (সত্তার একত্ব) দর্শন তাঁর কবিতায় প্রকাশ করেছেন। তাঁর একটি বিখ্যাত শ্লোক:
“এক সমুদ্র থেকে উঠছে বহু ঢেউ,
দেখতে আলাদা, কিন্তু আসলে এক।
এই বৈচিত্র্য শুধু আমাদের চোখের ধোঁকা,
সত্য শুধু এক – আল্লাহ।”[১৮]
পারস্য কবিতার বিশেষ ফর্মসমূহ
পারস্য সুফি কবিতার কয়েকটি বিশেষ ফর্ম রয়েছে যা এর সমৃদ্ধি প্রকাশ করে:
গজল (غزل)
গজল একটি গীতিকবিতা যা সাধারণত ৫-১৫ শ্লোক (বায়েত) এর হয়। প্রতিটি শ্লোকের দ্বিতীয় লাইনে একই অন্ত্যমিল থাকে। শেষ শ্লোকে কবি সাধারণত নিজের নাম (তাখাল্লুস) উল্লেখ করেন। গজল প্রেম, বিরহ, ঐশী প্রেম, মদ এবং প্রকৃতির বর্ণনা দেয়। হাফিজ এবং সাদি গজলের মাস্টার।[১৯]
মসনবি (مثنوی)
মসনবি একটি দীর্ঘ আখ্যানমূলক কবিতা যেখানে প্রতিটি শ্লোকের দুই লাইনে নিজস্ব অন্ত্যমিল থাকে (AA BB CC…)। এটি গল্প বলার জন্য আদর্শ। রুমির মসনবি এই ফর্মের সর্বোচ্চ উদাহরণ।
রুবাই (رباعی)
রুবাই চার লাইনের একটি কবিতা যেখানে অন্ত্যমিল সাধারণত AABA প্যাটার্নে থাকে। এটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর চিন্তা প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়। উমর খৈয়ামের রুবাইয়াত বিশ্ববিখ্যাত।
কাসিদা (قصیده)
কাসিদা একটি দীর্ঘ গীতিকবিতা (২০-১০০+ শ্লোক) যেখানে সব শ্লোকে একই অন্ত্যমিল থাকে। এটি প্রশংসা, শোক বা নৈতিক উপদেশের জন্য ব্যবহৃত হয়। সানাই এবং খাকানি কাসিদার মাস্টার।
সুফি কবিতার প্রধান থিমসমূহ
১. ঐশী প্রেম (ইশক-ই ইলাহি)
সুফি কবিতার কেন্দ্রীয় থিম হলো আল্লাহর প্রতি প্রেম। এই প্রেম সাধারণ মানবিক প্রেম থেকে আলাদা – এটি তীব্র, সর্বগ্রাসী এবং আত্মত্যাগী। রুমি বলেছেন:
“প্রেম এমন এক আগুন যা জ্বলে উঠলে
সব কিছু পুড়িয়ে ছাই করে দেয় – শুধু প্রেমিক রয়ে যায়।”[২০]
২. বিরহ (ফিরাক)
আল্লাহ থেকে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা সুফি কবিতার একটি শক্তিশালী থিম। মানুষ আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে এবং তাঁর কাছে ফিরে যেতে চায়। এই বিচ্ছেদ একটি গভীর ব্যথা তৈরি করে।
৩. ফানা (আত্মবিলোপ)
সুফি কবিতায় চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ফানা – নিজেকে হারিয়ে আল্লাহর মধ্যে বিলীন হওয়া। হাফিজ বলেছেন:
“হাফিজ যখন নিজেকে ভুলে গেল,
তখন সে সবকিছু পেল।”[২১]
৪. প্রকৃতির প্রতীক
সুফি কবিরা প্রকৃতি থেকে অসংখ্য প্রতীক ব্যবহার করেন:
- গোলাপ: আল্লাহর সৌন্দর্য বা নবী (সা.)
- বুলবুলি: আশেক (প্রেমিক), যে গোলাপকে ভালোবাসে
- বাগান: জান্নাত বা আধ্যাত্মিক জগৎ
- প্রজাপতি: আত্মা যা আলোর (আল্লাহ) দিকে উড়ে যায়
৫. মাতাল (মাস্ত) এর প্রতীক
সুফি কবিতায় মদ, মাতাল, সাকি – এসব প্রতীক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এগুলো আধ্যাত্মিক নেশা, ঐশী প্রেম এবং আত্মবিস্মৃতির প্রতীক। এটি প্রকৃত মদ্যপান নয়, বরং আল্লাহর প্রেমে মত্ত হওয়া।[২২]
আধুনিক যুগে পারস্য সুফি কবিতা
১৬শ-১৯শ শতাব্দী: ক্লাসিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা
জামির পরেও পারস্য সুফি কবিতা অব্যাহত থাকে, তবে নতুন উচ্চতায় পৌঁছায় না। কবিরা পূর্বসূরিদের শৈলী অনুকরণ করেন। তবে কিছু উল্লেখযোগ্য কবি:
- হিলালি বাদাখশি (১৪৬৯-১৫২৯): মুঘল ভারতে বসবাসকারী, জটিল ও সূক্ষ্ম শৈলীর জন্য পরিচিত
- ফয়েজ কাশানি (১৫৯৮-১৬৮১): সাফাভিড যুগের বিখ্যাত দার্শনিক কবি
- সাইব তাবরিজি (১৬০১-১৬৭৭): “ভারতীয় শৈলী” এর প্রতিষ্ঠাতা, জটিল রূপক ব্যবহারের জন্য পরিচিত
২০শ শতাব্দী: আধুনিকায়ন ও পুনর্জাগরণ
২০শ শতাব্দীতে পারস্য কবিতা আধুনিকীকরণের মধ্য দিয়ে যায়। নতুন কবিরা ক্লাসিক ফর্ম থেকে মুক্ত হয়ে নতুন শৈলী পরীক্ষা করেন। তবে সুফি থিম এখনও জীবন্ত:
মুহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮): পাকিস্তানের জাতীয় কবি, রুমির আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত। তাঁর “জাভেদ নামা” রুমির মসনবি এবং দান্তের ডিভাইন কমেডির অনুপ্রেরণায় লেখা।[২৩]
নিমা ইউশিজ (১৮৯৭-১৯৬০): আধুনিক ফারসি কবিতার জনক। তিনি ক্লাসিক ছন্দ ভেঙে মুক্ত ছন্দ চালু করেন। তবে তাঁর কবিতায় সুফি চিন্তার প্রভাব স্পষ্ট।
ফরুগ ফাররোখজাদ (১৯৩৫-১৯৬৭): ইরানের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধুনিক নারী কবি। তাঁর কবিতায় প্রেম, মৃত্যু এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের থিম।
সোহরাব সেপেহরি (১৯২৮-১৯৮০): চিত্রশিল্পী এবং কবি, তাঁর কবিতা প্রকৃতি, সরলতা এবং জেন বৌদ্ধধর্মের সাথে সুফিবাদের মিশ্রণ। তাঁর বিখ্যাত কবিতা “দ্য ওয়াটার’স ফুটস্টেপ” আধ্যাত্মিক যাত্রার বর্ণনা।[২৪]
পারস্য সুফি কবিতার বিশ্বব্যাপী প্রভাব
পশ্চিমে সুফি কবিতা
১৯শ শতাব্দীতে পশ্চিমা পণ্ডিতরা পারস্য কবিতা অনুবাদ শুরু করেন। জার্মান কবি গোয়েটে হাফিজ দ্বারা এতটাই অনুপ্রাণিত হন যে তিনি “ওয়েস্ট-ইস্টার্ন ডিওয়ান” রচনা করেন – হাফিজের উত্তর হিসেবে।
২০শ শতাব্দীতে রুমির অনুবাদ পশ্চিমে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়। কোলম্যান বার্কসের রুমি অনুবাদ আমেরিকায় মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে। রুমি এখন আমেরিকার অন্যতম পঠিত কবি।
ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব
পারস্য সুফি কবিতা দক্ষিণ এশিয়ায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। মুঘল আমলে ফারসি ছিল রাজভাষা এবং সাহিত্যিক ভাষা। আমির খসরু (১২৫৩-১৩২৫) পারস্য এবং হিন্দি ঐতিহ্য মিশিয়ে নতুন কাব্যশৈলী তৈরি করেন। তাঁর রচনা এখনও কাওয়ালিতে গাওয়া হয়।
ইকবাল রুমির আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার নিয়ে এসেছেন ২০শ শতাব্দীতে। তাঁর উর্দু এবং ফারসি কবিতা সুফি দর্শনকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করে।
সুফি কবিতার চিরন্তন আবেদন
পারস্য সুফি কবিতা হাজার বছর পুরনো, কিন্তু আজও প্রাসঙ্গিক। কেন? কারণ এর মূল থিমগুলো সার্বজনীন এবং কালজয়ী – প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, বিচ্ছেদ, মিলন, সৌন্দর্য, সত্য অনুসন্ধান। প্রতিটি মানুষ, যে ধর্ম বা সংস্কৃতিরই হোক না কেন, এই অনুভূতিগুলো বুঝতে পারে।
সুফি কবিতা আমাদের শেখায় যে আধ্যাত্মিকতা শুষ্ক তত্ত্ব নয়, বরং এটি জীবন্ত, স্পন্দনশীল, সুন্দর। এটি হৃদয়ের ভাষা, আত্মার গান। যখন রুমি বলেন “নাচো যখন তুমি টুকরো টুকরো ভাঙছো” বা হাফিজ বলেন “এই জগৎ প্রেমিকের বাগান,” তখন তারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জীবন একটি উদযাপন, একটি রহস্য, একটি সুন্দর যাত্রা।
আধুনিক বিশ্বে, যেখানে মানুষ উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং অর্থহীনতায় ভুগছে, সুফি কবিতা একটি প্রশান্তির উৎস। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা একা নই, আমাদের জীবনের একটি উদ্দেশ্য আছে এবং আমরা সবাই একই উৎস থেকে এসেছি।
রুমির কথায়:
“বাইরে কোথাও, শুদ্ধ এবং অশুদ্ধর ধারণার বাইরে,
একটি মাঠ আছে। আমি তোমার সাথে সেখানে দেখা করব।
যখন আত্মা সেই মাঠে শুয়ে থাকে,
জগৎ খুব পূর্ণ থাকে কথা বলার জন্য।”[২৫]
এই মাঠই সুফি কবিতার মাঠ – যেখানে সব ধর্ম, সব সংস্কৃতি, সব মানুষ মিলিত হতে পারে। এখানে শুধু প্রেম আছে, শুধু সত্য আছে, শুধু সৌন্দর্য আছে। এবং এই প্রেম, এই সত্য, এই সৌন্দর্যই হাজার বছর ধরে লাখো মানুষকে স্পর্শ করেছে এবং আগামী হাজার বছরও করবে।