হামদানের পথে কাফেলা এগিয়ে চলেছে। ধুলোমাখা রাস্তায় উটের পায়ের শব্দ, আর পথিকদের ক্লান্ত নিশ্বাস। হজরত আবু আবদুর রহমান আস-সুলামি (রহ.) সেই কাফেলার সাথেই ছিলেন— নিরহঙ্কার, সাদামাটা এক দরবেশ।
হঠাৎ খবর এলো, এলাকার আমির দেখা করতে চান।
সুলামি (রহ.) গেলেন। আমির নসর ইবনু সুবুকতাকিন; রণাঙ্গনের বীর, কিন্তু জ্ঞানের প্রতিও তাঁর গভীর টান। তিনি সুলামিকে দেখেই বললেন, “শায়খ, আপনার ‘হাকায়িকুত তাফসির’ আমাকে লিখে দিতেই হবে!”
কথাটি আদেশের সুরে বলা। সুলামি (রহ.) চুপ করে রইলেন।
সেদিনই আমির তাঁর ৮৫ জন লেখককে ডেকে কাজ ভাগ করে দিলেন। কলম চলতে লাগল দ্রুতগতিতে। আসরের আজানের আগেই পুরো কিতাব নকল হয়ে গেল— এক দিনে!
আমির খুশিতে আটখানা। তিনি সুলামির জন্য পাঠালেন একটি উৎকৃষ্ট ঘোড়া, একশো স্বর্ণমুদ্রা আর বহু মূল্যবান কাপড়।
কিন্তু সুলামি (রহ.) সেসব দেখে বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। তিনি দূতকে বললেন— “আমির আমার মন ভেঙে দিয়েছেন। হাজিদের কাফেলায় এভাবে হাদিয়া পাঠানো মানুষকে ভয় দেখানোর মতো। আর নবিজি (সা.) কোনো মুসলিমকে ভয় দেখাতে নিষেধ করেছেন।”
তারপর শান্তভাবে বললেন, “আমার একটাই চাওয়া— এই হাদিয়া থেকে আমাকে মুক্তি দিন। আমি এটি নেব না।”
দূত ফিরে গেল। আমির অবাক হলেন, কিন্তু মনে মনে শ্রদ্ধায় মাথা নত করলেন। দিনারগুলো তিনি কাফেলার নেতাদের মধ্যে বিলিয়ে দিলেন, আর সুলামির কাফেলার সুরক্ষায় প্রহরী পাঠালেন।
এতেই শেষ নয়। আমির এতটাই মুগ্ধ হলেন যে কিতাবটি দশ খণ্ডে আবার নকল করার আদেশ দিলেন— এবার আয়াতগুলো লেখা হবে সোনার কালি দিয়ে।
তারপর আমির বার্তা পাঠালেন, “শায়খ, আসুন। আমি নিজে কিতাব শুনতে চাই।”
সুলামি (রহ.) জবাব দিলেন— “আমি যাব না।”
আমিরের লোকেরা খানকায় এলো। সুলামি আত্মগোপন করলেন।
শেষমেশ আমির প্রথম খণ্ডটি পাঠিয়ে দিলেন খানকাহে। সুলামি (রহ.) বইটি হাতে নিলেন, এবং কেবল একটি কাজ করলেন— কলম তুলে লিখে দিলেন ইজাজত, অর্থাৎ এই কিতাব বর্ণনার অনুমতি।
ক্ষমতার দরজায় তিনি গেলেন না। কিন্তু ইলমের আলো পৌঁছে দিলেন— নিজের শর্তে, নিজের মর্যাদায়।