খারকানের ছোট্ট গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ল — সুলতান মাহমুদ গজনবি আসছেন! গজনি থেকে এত দূর, শায়খ আবুল হাসান আল-খারকানির দেখা পেতে। গ্রামবাসীরা অবাক। তাদের সেই সাধারণ শায়খ, যিনি নিজেই কাঠ কুড়ান, নিজেই রান্না করেন, তাঁর জন্য সুলতান এত দূর থেকে আসছেন?
গ্রামের বাইরে বিশাল তাঁবু পড়ল। সুলতানের সৈন্যদল, ঘোড়া, হাতি — সব মিলিয়ে যেন এক শহর নেমে এল খারকানে।
সুলতান একজন দূত পাঠালেন শায়খের কাছে। দূত এসে বলল, “সুলতান দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আপনার কাছে এসেছেন। তিনি চান আপনি তাঁর তাঁবুতে এসে দেখা করুন।”
শায়খ হাসলেন। “বলো, আমি যেতে পারছি না।”
দূত একটু থমকে গেল। তারপর বলল, “সুলতান বলেছেন, যদি আপনি না আসেন, তাহলে আপনাকে কুরআনের আয়াত মনে করিয়ে দিতে — ‘আল্লাহর আনুগত্য করো, রসুলের আনুগত্য করো এবং উলিল আমরের আনুগত্য করো।'”
শায়খ গম্ভীর হলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “বেটা, গিয়ে সুলতানকে বলো — আমি ‘আল্লাহর আনুগত্য করো’ এই অংশেই এতটা ডুবে আছি যে, ‘রসুলের আনুগত্য করো’ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছি না। এজন্য আমি লজ্জিত। এমতাবস্থায় উলিল আমরের কথা ভাবার সময় আমার কোথায়?”
দূত ফিরে গিয়ে সুলতানকে কথাগুলো বলল। সুলতান মাথা নিচু করলেন। তাঁর চোখে পানি এসে গেল। “চলো,” তিনি বললেন, “আমরাই যাই। তিনি আমার ভাবনার চেয়ে অনেক বড়।”
তারপর সুলতান একটা কাজ করলেন যা তাঁর সভাসদরা কখনো কল্পনা করতে পারেনি। তিনি তাঁর রাজকীয় পোশাক খুলে দাস আইয়াজকে পরিয়ে দিলেন। নিজে সাধারণ ভৃত্যের পোশাক পরলেন।
“আইয়াজ, তুমি আগে যাও। সুলতানের বেশে।”
শায়খের ঘরে ঢুকল আইয়াজ। চকচকে পোশাক, মাথায় মুকুট। সালাম দিল।
শায়খ সালামের উত্তর দিলেন, কিন্তু উঠে দাঁড়ালেন না। তাকালেনও না আইয়াজের দিকে। বরং তাঁর চোখ ছিল দরজার দিকে। যখন সুলতান সাধারণ পোশাকে ঢুকলেন, শায়খের মুখে হাসি ফুটল। তিনি উঠে গিয়ে সুলতানের হাত ধরলেন, নিজের পাশে বসালেন।
সুলতান অবাক! তিনি কীভাবে বুঝলেন?
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর সুলতান বললেন, “হুজুর, শায়খ আবু ইয়াজিদ বোস্তামীর কোনো কথা শোনাবেন?”
শায়খ চারপাশে তাকালেন। সুলতানের কয়েকজন দাসী দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি বললেন, “আগে এদের বাইরে পাঠাও। পরনারী এখানে থাকতে পারে না।”
দাসীরা বের হলো। তারপর শায়খ বললেন, “আবু ইয়াজিদ বলেছিলেন — যে আমাকে দেখেছে, সে দুর্ভাগ্যের তালিকা থেকে মুক্তি পেয়েছে।”
সুলতান ভুরু কুঁচকালেন। “কিন্তু হুজুর, এ কথা তো মনে হয় আবু ইয়াজিদ নিজেকে নবীজির চেয়েও বড় দাবি করছেন! আবু লাহাব, আবু জেহেল — তারা তো নবীজিকে দেখেছিল, কিন্তু মুক্তি পায়নি!”
শায়খের মুখ গম্ভীর হলো। “বেয়াদবি করো না, সুলতান। চোখ দিয়ে তাকানো আর হৃদয় দিয়ে দেখা এক জিনিস নয়। কাফেররা নবীজিকে দেখেনি, শুধু তাকিয়ে ছিল। কুরআন বলছে — ‘তুমি দেখবে তারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে, অথচ তারা দেখছে না।’ দেখার মানে হলো বিশ্বাস করা, ভালোবাসা, অনুসরণ করা। যে এভাবে দেখে, সে-ই মুক্তি পায়।”
সুলতান মাথা নিচু করলেন। বুঝলেন তাঁর ভুল।
“হুজুর, আমাকে উপদেশ দিন।”
শায়খ বললেন, “চারটা জিনিস মনে রেখো — তাকওয়া, জামায়াতের নামাজ, দানশীলতা, আর সৃষ্টির প্রতি দয়া।”
“আমার জন্য দোয়া করুন।”
“আমি তো রোজ সব মুমিনদের জন্য দোয়া করি।”
“না, আমার জন্য বিশেষ দোয়া চাই।”
শায়খ হাসলেন। “আল্লাহ মাহমুদের পরিণাম মাহমুদ করুন।”
সুলতান তখন নিজের থলে থেকে এক তোড়া স্বর্ণমুদ্রা বের করলেন। “হুজুর, এটা কবুল করুন।”
শায়খ উঠে গেলেন। ফিরে এলেন একটা যবের রুটি নিয়ে। “আগে এটা খাও।”
সুলতান এক টুকরো মুখে দিলেন। চিবালেন। কিন্তু গিলতে গেলে গলায় আটকে গেল। যতই চেষ্টা করলেন, গিলতে পারলেন না।
শায়খ বললেন, “দেখলে? যেমন তুমি এই ফকিরের শুকনো রুটি গিলতে পারছ না, তেমনি আমিও তোমার স্বর্ণমুদ্রা গিলতে পারি না। আমি দুনিয়াকে তিন তালাক দিয়েছি, সুলতান। তিন তালাকপ্রাপ্তা আর ফিরে আসে না।”
সুলতান লজ্জিত হলেন। “তাহলে আমি কিছু নিতে পারি না?”
শায়খ নিজের গায়ের জামাটা খুলে দিলেন। “এটা নাও।”
সুলতান উঠে যাওয়ার সময় শায়খও উঠে দাঁড়ালেন। সুলতান অবাক। “আসার সময় তো দাঁড়ালেন না!”
শায়খ বললেন, “তখন তুমি এসেছিলে সুলতান হয়ে, অহংকার নিয়ে। এখন ফিরছো বিনয় নিয়ে। তোমার রাজত্বের জন্য আমি দাঁড়াই না, তোমার বিনয়ের জন্য দাঁড়াই।”
কিছুদিন পর, সুলতান সোমনাথে যুদ্ধে গেলেন। কাফের বাহিনী অসংখ্য। মুসলমানরা হারতে বসেছে।
সুলতান নির্জনে গেলেন। শায়খের জামাটা হাতে নিয়ে কাঁদলেন। “ইয়া আল্লাহ, এই জামার মালিকের সম্মানে আমাদের জেতাও।”
হঠাৎ আকাশ কালো হলো। ঘূর্ণিঝড় এলো খোরাসানের দিক থেকে। কাফেররা একে অপরকে চিনতে পারল না। নিজেদের মধ্যেই লড়াই শুরু হলো। মুসলমানরা জিতল।
সেই রাতে সুলতান স্বপ্ন দেখলেন। শায়খ বলছেন, “মাহমুদ, তুমি আমার ছেঁড়া জামার দোহাই দিলে কেন? যদি তুমি ওই মুহূর্তে সব কাফেরের হেদায়েতের জন্য দোয়া করতে, তাহলে আল্লাহ তাদের সবাইকে মুসলমান বানিয়ে দিতেন!”
সুলতান ঘুম থেকে উঠে কাঁদতে লাগলেন। বুঝলেন — ক্ষমতা দিয়ে নয়, দোয়া দিয়েই আসল জয় হয়।