সুফি ইতিহাসে রাবেয়া আল-আদাউইয়া বা রাবেয়া বসরি (রহ.)-এঁর এক উজ্জ্বল সেতারা। ৯৫ হিজরিতে বসরা শহরে জন্মগ্রহণ করা এই মহান নারী সুফি ছিলেন নিঃস্বার্থ ভক্তি, ত্যাগ ও আধ্যাত্মিক প্রেমের প্রতীক। তিনি শুধু তার সময়ের জন্য নয়, বরং পরবর্তীকালের মুসলিমদের জন্যও আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণার অমলিন উৎস।
রাবেয়া বসরি (রহ.) ধন-সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদার দিকে কখনো নজর না দিয়ে শুধু আল্লাহর প্রেমে বিভোর ছিলেন। তাঁর জীবন অব্যাহত জিকির, ধ্যান ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পূর্ণ। তিনি প্রাকৃতিকভাবে মানুষের হৃদয়ে ঈমান ও ভক্তি জাগ্রত করতেন এবং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার মাধ্যমে সমাজে আলোর প্রদীপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
তিনি ছিলেন মহান জাহিদা (দুনিয়ার মোহ থেকে বিমুখ), অবিরাম ইবাদতকারী ও খাশিয়াহ (আল্লাহভীরু)। পুরো নাম রাবেয়া আল-আদাউইয়া আল-বসরিয়া। উপাধি ‘উম্মু আমর’। তাঁর পিতা ছিলেন ইসমাইল, যাঁর আনুগত্য ছিল আতকীয় গোত্রের প্রতি। ১
জন্ম:
তিনি ৯৫ হিজরিতে বসরায় জন্মগ্রহণ করেন । তখন বসরা ছিল বিদ্যা ও ধর্মচর্চার অনন্য কেন্দ্র, যেখানে শিক্ষাবিদ, ফকিহ ও জাহিদের উপস্থিতি চোখে পড়ত নিয়মিত। গরিবদের কুঁড়েঘরের মাঝে এক কুঁড়েঘরে জন্ম নেন তিনি। তার নাম “রাবেয়া” রাখার কারণ হলো তার আগে তিনজন বোন জন্মগ্রহণ করেছিল। ২
প্রাথমিক জীবন ও জ্ঞানার্জন:
তিনি ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত বুদ্ধিমতি ছিলেন এবং কমবয়সেই কুরআন শরিফ মুখস্থ করেছিলেন। তার তারুণ্যের প্রারম্ভেই তার পিতা মারা যান। সেই সময় বসরায় মারাত্মক খরা দেখা দেয়, যার কারণে রাবেয়া ও তার ভাইবোনরা জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্যত্রে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হন। এক সময় তিনি দাসত্বের শিকারও হন; একজন ব্যবসায়ী তাকে নিয়ে গিয়ে দাস বাজারে বিক্রি করেন। কিন্তু তার আত্মা আল্লাহর প্রতি গভীর আকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ ছিল। ছোটবেলা থেকেই আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এবং কুরআন ও রসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনুসরণে প্রাপ্ত শিক্ষা তাকে সব অমর্যাদাকর পরিস্থিতিতেও আল্লাহর প্রতি আকৃষ্ট রাখে। ফলে পরবর্তীতে তিনি আত্মপর্যালোচনার মুহূর্তে পৌঁছান এবং জীবনের গভীর আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন করেন।
দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া সত্ত্বেও তার পিতা ছিলেন আধ্যাত্মিক, খোদাভক্ত এবং আল্লাহর মহিমার প্রতি প্রেমময়। ছোটবেলার এই অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা তার জীবনে স্থায়ী ছাপ ফেলে এবং তাকে পরবর্তী সময়ে তাসাওফের পথে পরিচালিত করে। এই প্রাথমিক জীবনই রাবেয়াকে আল্লাহর প্রতি নিবেদিত একজন মহীয়ান নারী হিসেবে গড়ে তোলে।৩
ইবাদত-রিয়াজত:
ইবনু আবি দুনিয়া বলেন, আমাদের মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন বর্ণনা করেছেন, তিনি উবাইস ইবন মাইমুন আল-আত্তার থেকে, আর তিনি বর্ণনা করেছেন আব্দাহ বিনতে আবি শুয়াল থেকে, যিনি রাবেয়ার খেদমত করতেন। তিনি বলেন,“রাবেয়া সারারাত নামাজ পড়তেন। যখন ফজর হতো, তখন সামান্য বিশ্রাম নিতেন সূর্য ওঠা পর্যন্ত। আমি তাঁকে বলতে শুনতাম, ‘হে নফস, কত ঘুমাবে? আর কতবার উঠবে? অচিরেই এমন এক ঘুম আসবে, যেখান থেকে কেয়ামতের দিন ছাড়া আর কখনো জাগবে না”৪
আবদুল্লাহ ইবনে ঈসা বলেন, “আমি রাবেয়া আল-আদাউইয়ার ঘরে প্রবেশ করলাম। দেখলাম তার চেহারায় নূর জ্বলজ্বল করছে। তিনি খুব বেশি কাঁদতেন। এক ব্যক্তি তার সামনে কুরআনের একটি আয়াত তেলাওয়াত করল, যেখানে জাহান্নামের কথা উল্লেখ ছিল। তিনি চিৎকার করে উঠলেন এবং জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলেন।” আরেকবার তার কাছে গেলাম, তখন তিনি একটি পুরনো চাটাইয়ের টুকরোর ওপর বসে ছিলেন। সেখানে একজন কিছু কথা বলছিল। আমি তার চোখের পানি চাটাইয়ের উপর পড়ার শব্দ শুনতে পেলাম, যেন ফোঁটা ফোঁটা করে পানি পড়ছে। তারপর তিনি কাঁপতে লাগলেন এবং চিৎকার করে উঠলেন। আমরা উঠে চলে এলাম।
মুহাম্মদ ইবনে আমর বলেন, “আমি রাবেয়ার ঘরে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি ৮০ বছর বয়সের একজন বৃদ্ধা ছিলেন, যেন একটি শুকনো চামড়ার থলে। মনে হচ্ছিল তিনি এখনই পড়ে যাবেন। আমি তার ঘরে চাটাইয়ের কিছু টুকরো, একটি পারস্যের তৈরি বাঁশের ঝুড়ি (যার উচ্চতা মাটি থেকে প্রায় দুই হাত), চামড়ার পর্দা (এটি চাটাই হিসেবে ব্যবহার করা যেত), একটি কলস, একটি পেয়ালা এবং একটি কম্বল দেখলাম, যা তার বিছানা ও জায়নামাজ উভয় হিসেবে ব্যবহার করা যেত। তাঁর একটি বাঁশের ঝুড়ি ছিল, সেখানে তার কাফনের কাপড় রাখা ছিল। যখনই তার কাছে মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হতো, তিনি কাঁপতে শুরু করতেন এবং তার শরীরে কম্পন দেখা দিত। যখন তিনি কোনো দলের পাশ দিয়ে যেতেন, তখন সবাই তার ইবাদত দেখে চিনতে পারত।”
সাজফ ইবনে মানজুর বলেন, “আমি রাবেয়ার ঘরে প্রবেশ করলাম, যখন তিনি সিজদায় ছিলেন। যখন তিনি আমার উপস্থিতি টের পেলেন, মাথা তুললেন। দেখলাম তার সিজদার স্থানটি চোখের পানিতে ভেজা, যেন একটি জলাশয়। আমি তাকে সালাম দিলাম, তিনি আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘হে আমার পুত্র, তোমার কি কোনো প্রয়োজন আছে?’ আমি বললাম, ‘আপনাকে সালাম জানাতে এসেছি।’তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, ‘আল্লাহ তোমার ওপর পর্দা দিন, আল্লাহ তোমার ওপর পর্দা দিন।’এরপর তিনি কিছু দোয়া করলেন, তারপর নামাজের জন্য দাঁড়ালেন।
আবু জাফর আল-মাদানি, একজন কুরাইশ শায়খ থেকে বর্ণনা করেন, রাবেয়াকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আপনি কি এমন কোনো আমল করেছেন, যা আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়?” তিনি বললেন, “যদি হয়ে থাকে, তবে তা আমার ভয় যে আমার আমল কবুল না হয়ে ফেরত দেওয়া হবে।”৫
দুনিয়াবিমুখতা:
খালিদ ইবন খুদাশ বলেন, আমি শুনেছি, রাবেয়া যখন সালিহ আল-মরি-কে কিসসা বর্ণনা করতে শুনলেন, তিনি দুনিয়ার কথা উল্লেখ করছিলেন। তখন রাবেয়া তাকে ডেকে বললেন,“হে সালিহ, যে যাকে ভালোবাসে, সে তো তার কথাই বেশি বলে।”
বশর ইবন সালিহ আল-আতকি বর্ণনা করেছেন, কিছু লোক রাবেয়ার কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন, তাঁদের সঙ্গে ছিলেন সুফিয়ান আস-সাওরি। তাঁরা তাঁর কাছে কিছুক্ষণ বসলেন এবং কথাবার্তার মাঝে দুনিয়ার কিছু প্রসঙ্গও তুললেন। যখন তাঁরা চলে গেলেন, রাবেয়া তাঁর দাসিকে বললেন,“যদি ওই শাইখ (সুফিয়ান) ও তাঁর সঙ্গীরা আবার আসে, তবে তাদের প্রবেশ করতে দিও না। আমি দেখেছি, এরা দুনিয়াকে ভালোবাসে।”
হাম্মাদ বলেন, আমি ও সালাম ইবনু আবি মুতী রাবেয়ার ঘরে প্রবেশ করলাম। সালাম দুনিয়াবি কথা বলতে শুরু করলেন। তখন রাবেয়া বললেন,“কিছু তো সেই বস্তু যা সত্যিই বস্তু। আর যা বস্তুই নয়, তা কি করে উল্লেখযোগ্য হবে?”৬
মাসমা ইবনে আসিম এবং রিয়াহ আল-কাইসি বলেন, আমরা রাবেয়ার কাছে উপস্থিত ছিলাম। এক ব্যক্তি তাকে চল্লিশ দিনার এনে দিল এবং বলল, “আপনার প্রয়োজনে এটি ব্যবহার করুন।” তিনি কেঁদে ফেললেন, তারপর আকাশের দিকে মাথা তুলে বললেন, “তিনি (আল্লাহ) জানেন যে, তার কাছে দুনিয়া চাইতে আমি লজ্জাবোধ করি, অথচ তিনিই এর মালিক। তাহলে যারা এর মালিক নয়, তাদের কাছ থেকে তা কীভাবে নেব?”
আজহার ইবনে মারওয়ান বলেন, রিয়াহ আল-কাইসি, সালেহ ইবনে আবদুল জলিল এবং কুল্লাব রাবেয়ার কাছে এলেন। তারা দুনিয়া নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন এবং এর নিন্দা করতে শুরু করলেন। তখন রাবেয়া বললেন, “আমি দেখতে পাচ্ছি দুনিয়া তার সব দিক দিয়ে তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেছে।”তারা বললেন, “আপনি কীভাবে এমনটা ভাবলেন?” তিনি বললেন, “তোমরা তোমাদের অন্তরের সবচেয়ে কাছের জিনিস নিয়ে কথা বলছ।”৭
সুফিয়ান সাওরির সাথে ঘটনা:
একদিন সুফিয়ান আস-সাওরি (রহ.) তাঁর কাছে বসে বললেন, আহ, দুঃখ!
রাবেয়া বসরি (রহ.) বললেন, মিথ্যা বলো না। বরং বলো, আহ, অল্পই আমাদের দুঃখ! যদি সত্যিই দুঃখ থাকত তবে শ্বাস নেওয়াও তোমার পক্ষে সম্ভব হতো না।
আরেকদিন সুফিয়ান সাওরি (রহ.) তাঁকে জীর্ণ কাপড়ে দেখে বললেন,“হে উম্মু আমর, তোমার অবস্থা বেশ দুর্বল দেখছি। চাইলে পাশের ধনবান প্রতিবেশীর কাছে সাহায্য চাইতে পারো।”
রাবেয়া (রহ.) উত্তর দিলেন,“সুফিয়ান, তুমি আমার কোন খারাপ অবস্থা দেখছ? আমি কি ইসলাম থেকে বঞ্চিত হয়েছি? ইসলাম তো এমন সম্মান যার কোনো অপমান নেই, এমন সম্পদ যার সাথে দারিদ্র্য নেই, আর এমন সঙ্গ যার নিঃসঙ্গতা নেই। আমি তো লজ্জা পাই পৃথিবীর মালিকের কাছ থেকে কিছু চাইতে, তাহলে আমি কীভাবে তার কাছ থেকে চাইব, যার কাছে দুনিয়া নেই?”
সুফিয়ান বললেন,“এরকম কথা আমি আগে কখনো শুনিনি।”
তিনি সুফিয়ানকে আরও বলেছিলেন,“তুমি তো কেবলই কিছু দিনের সমষ্টি। প্রতিদিন চলে যাওয়ার সাথে সাথে তোমার কিছু অংশও চলে যাচ্ছে। শিগগিরই সবটাই চলে যাবে। তুমি জেনে শুনে বসে আছো, কাজ করছো না!”৮
জাফর ইবনে সুলায়মান বলেন, সুফিয়ান আল-সাওরি আমার হাত ধরে বললেন, “চলো আমাদের সেই শিক্ষিকার কাছে নিয়ে চলো, যাকে ছেড়ে এলে আমি শান্তি পাই না।”যখন আমরা তার কাছে পৌঁছলাম, সুফিয়ান তার হাত তুলে বললেন, “হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে নিরাপত্তা চাই।” রাবেয়া কেঁদে ফেললেন। সুফিয়ান তাকে বললেন, “আপনি কাঁদছেন কেন?” তিনি বললেন: “তুমি আমাকে কাঁদিয়েছ।” তিনি বললেন, “কীভাবে?” তিনি বললেন, “তুমি কি জানো না যে, দুনিয়া থেকে নিরাপত্তা হলো তা ত্যাগ করা? তাহলে কীভাবে তুমি এতে জড়িয়ে থেকে নিরাপত্তা চাও?”
জাফর ইবনে সুলায়মান বলেন, আমি শুনেছি, রাবেয়া সুফিয়ানকে বলছিল, “তুমি তো কিছু নির্দিষ্ট দিনের সমষ্টি। যখন একটি দিন চলে যায়, তোমার কিছু অংশ চলে যায়। আর শীঘ্রই যখন কিছু অংশ চলে যাবে, তখন পুরোটা চলে যাবে। তুমি এটা জানো, সুতরাং কাজ করো।”৯
বিবাহের প্রস্তাব:
আবু সুলাইমান আল-হাশিমী বসরার একজন ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর দৈনিক আয় ছিল আশি হাজার দিরহাম। তিনি বিবাহের জন্য বসরার আলেমদের কাছে মত নিলেন। সবাই একমত হলেন যে, রাবেয়া বসরি (রহ.)-কে বিবাহ করা উচিত।
অতঃপর তিনি রাবেয়াকে লিখলেন,“আমার প্রতিদিনের আয় আশি হাজার দিরহাম। অচিরেই তা এক লাখে পৌঁছাবে, ইনশাআল্লাহ। আমি তোমাকে বিবাহ করতে চাই, এবং তোমার জন্য মোহর হিসেবে এক লাখ দিচ্ছি, এর চেয়ে বেশি দিতেও প্রস্তুত আছি।”
রাবেয়া বসরি (রহ.) জবাবে লিখলেন,“দুনিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া হৃদয় ও শরীরের প্রশান্তি আনে। আর দুনিয়ার প্রতি আসক্তি দুঃখ-কষ্টের কারণ হয়। আমার চিঠি হাতে পাওয়ার সাথে সাথে নিজের আখিরাতের যাত্রার প্রস্তুতি নাও। নিজের জন্য নিজেই অসিয়ত তৈরি করো। সারাজীবন রোজা রাখো, আর মৃত্যু হবে তোমার ইফতার। আল্লাহর কসম, আল্লাহ যদি আমাকে তোমার চেয়ে বহু গুণ বেশি দিতেন, তবুও আমি তোমার কারণে আল্লাহ থেকে এক মুহূর্তও গাফেল হতে চাইতাম না।”১০
আল্লাহর নৈকট্য অর্জন:
আবু বকর আর-রাজী বলেন, আমি আবু সালামা আল-বালাদীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, মাইমুন ইবনে আল-আসবাগ আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি সিয়ার থেকে, তিনি জাফর থেকে, তিনি বলেন, মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসি রাবেয়ার ঘরে প্রবেশ করলেন। দেখলেন তিনি মাতালের মতো দুলছেন। জিজ্ঞেস করলেন, “এমন দুলছ কেন?”
তিনি বললেন,“গত রাতে আমি আমার প্রভুর ভালোবাসার নেশায় মত্ত হয়েছি, আজ সকালেও তার নেশায় মত্ত আছি।”
জাফর ইবনে সুলায়মান বর্ণনা করেন, সুফিয়ান সাওরি (রহ.) তাঁকে (রাবেয়াকে) জিজ্ঞেস করলেন, “আল্লাহর সবচেয়ে নিকটে যাওয়ার উপায় কী?”
এতে তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন,“আমার মতো দুর্বল কাউকে এ প্রশ্ন করা হয়? বান্দা আল্লাহর নিকটে পৌঁছায় তখনই, যখন সে বুঝতে পারে যে, দুনিয়া ও আখিরাত— কোনোটির প্রতিই তার ভালোবাসা নেই, ভালোবাসা কেবল আল্লাহর সাথেই।”১১
কারামত:
শাইবান ইবনু ফারুক বলেন, আমাদের রিয়াহ আল-কাইসি বর্ণনা করেছেন, আমি এবং রাবেয়া শামীতের কাছে আসা-যাওয়া করতাম। একবার রাবেয়া বললেন,“এসো হে যুবক!” তারপর আমার হাত ধরলেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। হঠাৎ সবুজ এক কলসি দেখা গেল, সেটি সাদা মধুতে ভরপুর ছিল। তিনি বললেন,“খাও, এই মধু আল্লাহ দিয়েছেন; এটি মৌমাছির পেট থেকে আসেনি।”আমি ভয় পেয়ে গেলাম, আমরা উঠে চলে এলাম এবং সেটি রেখে দিলাম।১২
আবুল কাসিম আল-কুশাইরি তাঁর রিসালা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, রাবেয়া বসরি (রহ.) প্রায়ই মোনাজাতে বলতেন,“হে আল্লাহ, যে হৃদয় তোমাকে ভালোবাসে, তুমি কি তাকে আগুনে পোড়াবে?”
তখন অদৃশ্য থেকে আওয়াজ শোনা গেল,“আমরা তো এমন কাজ করব না। আমাদের সম্পর্কে এ ধরনের মন্দ ধারণা করো না।”
কেউ একজন বলেছিলেন, আমি রাবেয়া আল-আদাবিয়ার জন্য দোয়া করতাম। একদিন স্বপ্নে তাঁকে দেখলাম। তিনি বললেন,“তোমার উপহার আমাদের কাছে নুরে ভরা থালায় আসে, যা আবার নুরের রুমাল দিয়ে আবৃত থাকে।”১৩
কাব্যগাঁথা:
শাইখ শিহাবুদ্দীন সুহরাওয়ার্দী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর আওয়ারিফুল মাআরিফ গ্রন্থে তাঁর একটি কবিতা উল্লেখ করেছেন—
إني جعلتك في الفؤاد محدثي – وأبحت جسمي من أراد جلوسي
فالجسم مني للجليس مؤانس – وحبيب قلبي في الفؤاد أنيسي
“তোমায় রেখেছি অন্তরে, আলাপের অমল সঙ্গী,
আর দেহটাকে বানিয়েছি, যারই আসুক, বসে থাকুক বন্ধু অঙ্গী।
জগৎ যে আমার শরীরের সঙ্গী হয় প্রতিক্ষণে,
কিন্তু অন্তরের প্রিয়তম সঙ্গী শুধু তুমি— অচল, অনন্তে।”১৪
বাণী-অমলিন:
১.“তোমরা তোমাদের ভালো কাজ এমনভাবে গোপন করো যেমনভাবে খারাপ কাজ গোপন করো।”
২.“আমার আমল যদি প্রকাশ পায় তবে আমি তাকে কোনো গুরুত্বই দিই না।”
৩. তিনি তাঁর পিতাকে বলেছিলেন,“আব্বা, আমি তোমাকে হালাল নয় এমন কিছু খাওয়ানোর ব্যাপারে কখনো হালাল করে দিচ্ছি না।”পিতা বললেন, “যদি হালাল না পাই?” তিনি জবাব দিলেন,“দুনিয়াতে ক্ষুধা সহ্য করা আখিরাতে আগুন সহ্য করার চেয়ে সহজ।”
৪. প্রতি রাতে তিনি ছাদের উপর দাঁড়িয়ে বলতেন,“হে আল্লাহ, সকল শব্দ স্তব্ধ হয়েছে, সব নড়াচড়া থেমে গেছে, প্রত্যেকে তার প্রিয়জনের সাথে নির্জনে আছে। আমিও তোমার সাথে নির্জনে আছি। হে প্রিয়তম, আমার এ একান্ত নির্জনতা যেন আমার জন্য মুক্তির মাধ্যম হয়।”
৫. এক নারী তাঁকে বলল,“আমি আপনাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি।”তিনি বললেন,“যার জন্য তুমি আমাকে ভালোবাস, তাকে মেনে চলো।”এক পুরুষও তাঁকে বলল,“আমি আপনাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি।”তিনি বললেন,“যার জন্য ভালোবাস, তার অবাধ্য হয়ো না।”
৬. তিনি প্রার্থনা করতেন,“হে আল্লাহ, যে আমাকে কষ্ট দিয়েছে, আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম। তাই তুমি আমাকে তাদের কাছ থেকে ক্ষমা করিয়ে নাও যাদের আমি কষ্ট দিয়েছি।”১৫
৭. শাইবান আল-আবলী বলেন, আমি রাবেয়াকে বলতে শুনেছি,“প্রতিটি জিনিসের একটি ফল আছে, আর আল্লাহর মারেফাতের ফল হলো তাঁর দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ।”
৮. অন্য সূত্রে বর্ণিত আছে, রাবেয়া (রহ.) বলতেন,“আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এই কারণে যে, আমি (যখন বলি) ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’, তখনও আমার ইস্তিগফারে যথেষ্ট আন্তরিকতা থাকে না।” ১৬
মৃত্যু ও মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা:
রাবেয়া আল-বসরিয়া (রহ.)-এঁর মৃত্যু সাল নিয়ে মতানৈক্য আছে। কেউ বলেছেন ১৩৫ হিজরিতে, আবার কেউ বলেছেন ১৮৫ হিজরিতে। তাঁর কবর বাইতুল মুকাদ্দাসের পূর্ব দিকে, জাবাল আত-তূর নামক পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত, যা আজও জিয়ারতের স্থান।
মৃত্যুর সময় তিনি আব্দাকে বললেন,“আমার মৃত্যুর খবর কাউকে দিও না। আমাকে এই উলের জুব্বা দিয়েই কাফন দেবে। এটি সেই জুব্বা, যাতে আমি রাতের গভীরে ইবাদত করতাম।”
আব্দা বলেন,“আমরা তাঁকে সেই জুব্বায় কাফন দিয়েছিলাম। পরে স্বপ্নে তাঁকে দেখলাম, তিনি সবুজ রেশমি পোশাকে আছেন, মাথায় সবুজ ওড়না। জিজ্ঞেস করলাম, ও যে উলের কাফন দিলাম, সেটি কোথায়? তিনি বললেন, আল্লাহ তা আমার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়েছেন এবং জান্নাতি পোশাক দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন। আল্লাহ সেই কাফন সংরক্ষণ করেছেন, যাতে কিয়ামতে এর সওয়াব আমাকে পূর্ণভাবে দেওয়া হয়।
আমি তাঁকে বললাম: এ জন্যই আপনি দুনিয়াতে এত আমল করতেন?
তিনি উত্তর দিলেন: ‘এ সবকিছু আল্লাহর অলিদের প্রতি প্রদত্ত সম্মানের তুলনায় কিছুই নয়।”
আব্দা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন,“হজরত উবাইদা বিনতে আবি কিলাব কেমন আছেন?”
তিনি বললেন,“আহ, তিনি আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে আছেন। কারণ তিনি দুনিয়ার অবস্থার তোয়াক্কা করতেন না, যেভাবেই সকাল বা সন্ধ্যা হোক।”
আবার জিজ্ঞেস করলেন,“আবু মালিক (দোইঘাম) কেমন আছেন?”
তিনি বললেন,“তিনি যখন ইচ্ছা আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করেন।”
আবার জিজ্ঞেস করলেন,“বিশর ইবনে মানসুর কেমন আছেন?”
তিনি বললেন,“বাহ, তিনি তো আল্লাহর পক্ষ থেকে আশার চেয়েও বেশি কিছু পেয়েছেন।”
শেষে আব্দা তাঁকে বললেন,“আমাকে এমন কোনো উপদেশ দিন, যা আল্লাহর নৈকট্য এনে দেবে।”
রাবেয়া (রহ.) উত্তর দিলেন,“আল্লাহর প্রচুর স্মরণ করো। অচিরেই কবরের মধ্যে তা তোমার জন্য আনন্দ ও স্বস্তি হয়ে উঠবে।”১৭