ইসলামের প্রারম্ভিক যুগে যেসব তাবেয়ি ও মুহাদ্দিসগণ তাঁদের গভীর জ্ঞান, কঠোর ইবাদত এবং মহান চরিত্রের মাধ্যমে উম্মতের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন, তাঁদের অন্যতম হলেন হজরত সাফওয়ান ইবনে সুলাইম রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি ছিলেন মদিনাতুল মুনাওয়ারার এক বিশিষ্ট মুহাদ্দিস, ফকিহ, বিশিষ্ট সুফি ও আবিদ জুহ্‌দপন্থী আলেম।

প্রাথমিক পরিচিতি:

তাঁর নাম সাফওয়ান ইবনে সুলাইম, উপনাম আবু আব্দুল্লাহ। কেউ কেউ বলেছেন আবুল হারেস আল-কুরাশী, আয-যুহরী, আল-মাদানী। লকব আল-ইমাম, আস-সিকাহ, আল-হাফিজ, আল-ফকিহ। তিনি হুমাইদ ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ-এঁর মুক্ত করা দাস (মাওলা) ছিলেন।১

জ্ঞান অর্জন:

তিনি বহু মহান সাহাবি ও তাবেয়ি থেকে ইলম অর্জন ও হাদিস রেওয়ায়েত করেছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন হজরত আনাস ইবনু মালিক (রা:), ছালাবাহ ইবনু আবি মালিক আল-কুরাযী (রা:), হজরত জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা:), হামযা ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা:), এবং তাঁর মাওলা হুমায়দ ইবনু আবদুর রহমান ইবনু আওফ। এছাড়া তিনি বর্ণনা করেছেন যাকওয়ান আবু সালিহ আস-সাম্মান, সালিম ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু উমর, সাঈদ ইবনু সালামাহ (আলে ইবনুল আযরাক পরিবারভুক্ত), সাঈদ ইবনু আল-মুসাইয়্যিব, সালমান আল-আগার, সুলায়মান ইবনু আতাআ, সুলায়মান ইবনু ইয়াসার, তাওস ইবনু কৈসান এবং হজরত আবদুল্লাহ ইবনু জাফর ইবনু আবি তালিব (রা:) থেকে।

তিনি আরও হাদিস রিওয়ায়াত করেছেন আবদুল্লাহ ইবনু দীনার, আবদুল্লাহ ইবনু সালমান আল-আগার, হজরত আবদুল্লাহ ইবনু উমর ইবনুল খাত্তাব (রা:), আবদুল্লাহ ইবনু ইয়াযীদ (যিনি আল-আসওয়াদ ইবনু সুফইয়ানের মাওলা), আবদুর রহমান ইবনু সা‘দ আল-আ‘রাজ, আবদুর রহমান ইবনু আবি সাঈদ আল-খুদরী (রা:), আবদুর রহমান ইবনু গুনম আল-আশআরী, আবদুর রহমান ইবনু হুরমুয আল-আ‘রাজ, উবায়দুল্লাহ ইবনু তালহা ইবনু উবায়দিল্লাহ ইবনু কুরাইজ, উরওয়াহ ইবনু যুবাইর এবং আতা ইবনু ইয়াসার থেকে।

এছাড়া তিনি ইকরিমা (ইবনু আব্বাস (রা:)-এর মাওলা), আলী ইবনুল হাসান ইবনু আবিল হাসান আল-বাররাদ, উমর ইবনু ছাবিত, আল-কাসিম ইবনু মুহাম্মদ ইবনু আবি বকর আস-সিদ্দীক, কুরাইব (ইবনু আব্বাস (রা:)-এর মাওলা), মুহাম্মদ ইবনুল হাসান ইবনু আবিল হাসান আল-বাররাদ, নাফ‘ইবনু যুবাইর ইবনু মুতইম, নাফি‘(ইবনু উমর (রা:)-এর মাওলা), আবু উমামাহ সহল ইবনু হুনায়ফ (রা:), আবু বুসরা আল-গিফারী (রা:), আবু সাঈদ (আমির ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু কুরাইজের মাওলা), আবু সালামাহ ইবনু আবদুর রহমান ইবনু আওফ, উনাইসাহ (রা:) এবং উম্মে সা‘দ বিনতে আমর আল-জুমাহিয়্যাহ (রা:) থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন।২

ছাত্রবৃন্দ:

তাঁর কাছ থেকে ইলম অর্জন ও হাদিস রিওয়ায়াত করেছেন বহু বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ও তাবেয়ি। তাঁদের মধ্যে ছিলেন— ইবরাহিম ইবনু সা‘দ (তিনি তাঁর থেকে একটিমাত্র হাদিস বর্ণনা করেছেন), ইবরাহিম ইবনু তহমান, উসামা ইবনু যায়েদ ইবনু আসলম, উসামা ইবনু যায়েদ আল-লাইসী, ইসহাক ইবনু ইবরাহিম ইবনু সাঈদ আল-মাদানী, উমাইয়্যাহ ইবনু সাঈদ আল-উমাবী, আবু দমরা আনাস ইবনু ঈয়াদ আল-লাইসী, বকর ইবনু আমর আল-মু‘আফিরী আল-মিসরী, আবু সাখর হুমায়দ ইবনু জিয়াদ, জুহাইর ইবনু মুহাম্মদ আত-তামীমী, জিয়াদ ইবনু সাঈদ আল-খোরাসানী, যায়েদ ইবনু আসলাম (যিনি তাঁর সমসাময়িক ছিলেন), সুফিয়ান আস-সাওরী, সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা, সুলায়মান ইবনু আবদুল আজিজ আল-আইলী (রুযাইক ইবনু হাকিমের ভাইপো), আবু আইয়্যুব আবদুল্লাহ ইবনু আলী আল-ইফরিকী, আবু আলকামা আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু আবি ফারওয়া আল-ফারওয়ী, আবদুর রহমান ইবনু ইসহাক আল-মাদানী, আবদুর রহমান ইবনু সাঈদ ইবনু আম্মার আল-মুআজ্জিন, আবদুল আজিজ ইবনু মুহাম্মদ আদ-দারাওয়ার্দী, আবদুল আজিজ ইবনু মুত্তালিব, আবদুল মালিক ইবনু জুরাইজ, উবায়দুল্লাহ ইবনু আবি জাফর, ঈসা ইবনু মূসা ইবনু মুহাম্মদ ইবনু ইইয়াস ইবনু আল-বুকাইর, লায়স ইবনু সাঈদ, মালিক ইবনু আনাস, মুহাম্মদ ইবনু দাব, মুহাম্মদ ইবনু আজলান, মুহাম্মদ ইবনু আমর ইবনু আলকামা ইবনু ওয়াক্কাস আল-লাইসী, আবু গাসসান মুহাম্মদ ইবনু মুতাররিফ, মুহাম্মদ ইবনু আল-মুনকাদির (যিনি তাঁর সমসাময়িক ছিলেন), তাঁর পুত্র আল-মুনকাদির ইবনু মুহাম্মদ ইবনু আল-মুনকাদির, মূসা ইবনু আকাবা এবং ইয়াযীদ ইবনু আবি হাবীব।৩

ইবাদত-বন্দেগি:

ইয়াকুব ইবনু শায়বা (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, আমি আলী ইবনু আবদুল্লাহকে বলতে শুনেছি, সাফওয়ান ইবনু সুলাইম (রহিমাহুল্লাহ) শীতল রাতে ছাদের ওপর নামাজ পড়তেন, যেন ঘুম তাঁকে আচ্ছন্ন না করে।

ইসহাক ইবনু মুহাম্মদ (রহিমাহুল্লাহ) মালিক ইবনু আনাস (রহিমাহুল্লাহ)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, সাফওয়ান ইবনু সুলাইম (রহিমাহুল্লাহ) শীতকালে ছাদের ওপর এবং গ্রীষ্মকালে ঘরের ভেতরে নামাজ আদায় করতেন। তিনি গরম ও ঠান্ডার কষ্টের মধ্যেও জেগে থাকতেন যতক্ষণ না সকাল হতো। তারপর বলতেন,‘এটাই সাফওয়ানের প্রচেষ্টা, আর তুমি (হে আল্লাহ) সবকিছু ভালো জানো।’ তিনি রাত্রে এত বেশি নামাজে দাঁড়িয়ে থাকতেন যে তাঁর পা ফুলে যেত এবং তাতে সবুজ শিরা ফুটে উঠত। কখনো কখনো দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তিনি এত ক্লান্ত হয়ে যেতেন যে তাঁর পা যেন ভেঙে পড়ত।”

মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজিদ আল-আদামী বর্ণনা করেছেন, আনাস ইবনে ইয়াদ্ব (রহ.) বলেন, “আমি সাফওয়ান ইবনে সুলাইম (রহ.)-কে দেখেছি। যদি তাকে বলা হতো ‘আগামীকাল কিয়ামত’, তবুও তিনি তাঁর বর্তমান ইবাদতের চেয়ে সামান্যও বাড়িয়ে কিছু করতেন না।” অর্থাৎ, তাঁর ইবাদত ও খোদাভীতি এমনই পূর্ণতা লাভ করেছিল যে, কিয়ামতের আগমনও তাঁকে বাড়তি কোনো প্রস্তুতির প্রয়োজন অনুভব করাতে পারত না।

ইয়াকুব ইবনে মুহাম্মদ আয-যুহরী বর্ণনা করেছেন, আব্দুল আজীয ইবনে আবি হাজিম (রহ.) বলেন, “সাফওয়ান ইবনে সুলাইম (রহ.) আমার সঙ্গী হয়ে মক্কা শরিফ পর্যন্ত সফর করেছিলেন। পুরো সফরকালে তিনি কখনও তাঁর শরীরকে কাফেলার আসনে (পালঙ্কে) শোয়াননি, যতক্ষণ না আমরা ফিরে এসেছি।” অর্থাৎ তিনি সর্বদা জিকির, কুরআন তেলাওয়াত ও ইবাদতে মশগুল থাকতেন, বিশ্রামের সময়ও নষ্ট করতেন না।

ইবনে উয়াইনা (রহ.) বলেন, “সাফওয়ান ইবনে সুলাইম (রহ.) হজে গিয়েছিলেন। আমি তাঁকে খুঁজতে মিনায় গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তিনি কোথায়?’ কেউ বলল, ‘তুমি যখন মসজিদুল খাইফে প্রবেশ করবে, তখন মিনারের সামনে সামান্য এগিয়ে একজন বুড়ো ব্যক্তিকে দেখতে পাবে। তাঁকে দেখলে বুঝবে যে, তিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তিনিই সাফওয়ান ইবনে সুলাইম (রহ.)।’ আমি যেমনটি শুনেছিলাম তেমনই গেলাম এবং সত্যিই সেখানে এক নূরানী চেহারার বুড়ো মানুষ দেখলাম। তাঁকে দেখেই মনে হলো তিনি আল্লাহভীরু একজন ব্যক্তি। আমি তাঁর কাছে গিয়ে বসলাম ও বললাম, ‘আপনি কি সাফওয়ান ইবনে সুলাইম?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’

তিনি আরও বলেন, “সাফওয়ান ইবনে সুলাইম (রহ.) হজে গিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে তখন মাত্র সাত দিনার ছিল। তিনি ঐ অর্থে একটি উট কুরবানির জন্য ক্রয় করেছিলেন। কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ‘এত অল্প সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আপনি কেন সবটুকু ব্যয় করলেন?’ তিনি বললেন, ‘আমি তো আল্লাহর এ বাণী শুনেছি, وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُمْ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ لَكُمْ فِيهَا خَيْرٌ -“আর আমি কুরবানির উটগুলোকে তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছি, তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে।” (সুরা আল-হাজ্জ, আয়াত:৩৬)”৪

আবু গাসসান আন-নাহদী (রহ.) বলেন, আমি সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা (রহ.)-কে এ কথা বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,“সাফওয়ান ইবনে সুলাইম (রহ.) আল্লাহর নামে শপথ করেছিলেন যে, তিনি তাঁর পার্শ্বদেশ (শরীর) মাটিতে রাখবেন না (অর্থাৎ কখনও শোবেন না) যতক্ষণ না তিনি আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করেন।”তিনি এই অবস্থায় ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত করেছিলেন। যখন তাঁর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো এবং মৃত্যুযন্ত্রণার তীব্রতা বেড়ে গেল, তখনও তিনি বসা অবস্থায় ছিলেন। তাঁর কন্যা বলল, হে আমার আব্বা, আপনি যদি একটু শুয়ে পড়তেন!” তখন তিনি বললেন,“হে আমার প্রিয় কন্যা, যদি আমি এখন শুয়ে পড়ি, তবে আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার ও শপথ পূর্ণ করা হবে না।”এরপর তিনি বসা অবস্থায়ই ইন্তেকাল করেন।

সাহল ইবনে আসিম (রহ.), মুহাম্মদ ইবনে মনসুর (রহ.)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, সাফওয়ান ইবনে সুলাইম (রহ.) একদিন বলেছিলেন, “আমি আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার করেছি যে, আমি আমার শরীর কোনো বিছানায় রাখব না (অর্থাৎ শোব না) যতক্ষণ না আমার রবের সাক্ষাৎ লাভ করি।”তিনি এই অঙ্গীকারের পর চল্লিশ বছর জীবিত ছিলেন এবং ঐ পুরো সময় তিনি কখনও পার্শ্বদেশ মাটিতে রাখেননি। যখন তাঁর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো, কেউ তাঁকে বলল,“আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন, আপনি কি একটু হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিতে পারেন না?” তখন তিনি বললেন,“যদি আমি এখন শুয়ে পড়ি, তবে আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার পূর্ণ হবে না।”তিনি তখন সামান্য হেলান দিয়ে বসলেন এবং ঐ অবস্থায়ই তাঁর রুহ আল্লাহর কাছে চলে গেল।

মদীনাবাসীরা বলতেন, “তাঁর কপাল সেজদার কারণে এমনভাবে শক্ত ও দাগযুক্ত হয়ে গিয়েছিল যে, মৃত্যুর পরও তাঁর কপালে সেজদার চিহ্ন অটুট ছিল।”৫

মৃত্যুকে স্মরণ:

মুহাম্মদ ইবনে ইয়ালা আস-সাকাফী বর্ণনা করেন, মুনকাদির ইবনে মুহাম্মদ বলেন, “একদিন আমরা সাফওয়ান ইবনে সুলাইম (রহ.)-এর সঙ্গে একটি জানাজায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেখানে আমার পিতা ও আবু হাজিম (রহ.) এবং আরও কিছু ইবাদতগোজার ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। যখন জানাজার নামাজ শেষ হলো, তখন সাফওয়ান (রহ.) বললেন, ‘এই ব্যক্তি এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছেন যে, তাঁর সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে গেছে। এখন তাঁর প্রয়োজন তাঁর পরে থাকা মানুষদের দোয়া।’ এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন এবং আল্লাহর কসম, উপস্থিত সবাই কান্নায় ভেসে গেল।”

ইয়াকুব ইবনে মুহাম্মদ আয-যুহরী বর্ণনা করেছেন, আবু জুহরা মাওলা বানী উমাইয়া বলেন, “আমি সাফওয়ান ইবনে সুলাইম (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, ‘মৃত্যু মুমিনের জন্য দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি ও প্রশান্তি। যদিও মৃত্যুর সময় কিছু যন্ত্রণা থাকে, তবুও তা চির শান্তির সূচনা।’ এরপর তিনি নিজেই চোখের পানি ঝরাতে লাগলেন।”

কুদামা ইবনে মুহাম্মদ আল-খুশরামী, মুহাম্মদ ইবনে সালেহ আত-তাম্মার (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন, “সাফওয়ান ইবনে সুলাইম (রহ.) প্রায়ই জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে যেতেন। একদিন তিনি আমার পাশ দিয়ে গেলেন, আমি ভাবলাম তাঁকে অনুসরণ করে দেখি তিনি কী করেন। তিনি মাথা ঢেকে একটি কবরের পাশে বসলেন এবং ক্রমাগত কাঁদতে লাগলেন যতক্ষণ না আমি তাঁর প্রতি দয়া অনুভব করলাম। আমি ধারণা করলাম এটি সম্ভবত তাঁর কোনো আত্মীয়ের কবর। কিছুদিন পর আবার তাঁকে যেতে দেখলাম, আবার অনুসরণ করলাম। এবারও তিনি অন্য এক কবরের পাশে বসলেন এবং একইভাবে কাঁদতে লাগলেন। আমি এ কথা মুহাম্মদ ইবনে মুনকাদির (রহ.)-এঁর কাছে বললাম— ‘আমি ভেবেছিলাম এটি তাঁর আত্মীয়ের কবর।’ তখন মুহাম্মদ (রহ.) বললেন, ‘সবাই তাঁরই আত্মীয় ও ভাই। তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যার হৃদয়ে যখনই কঠোরতা আসে, তখনই তিনি মৃতদের স্মরণ করে নিজের অন্তরকে নরম করেন।”

তিনি বলেন, “এরপর মুহাম্মদ ইবনে মুনকাদির (রহ.) একদিন বাকী কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি বললেন, ‘সাফওয়ানের উপদেশ কি তোমার কোনো উপকারে এল না?’ তখন আমি বুঝলাম, তিনি নিজেও সাফওয়ানের ঐ উপদেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।”৬

জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:

কাসীর ইবনে ইয়াহইয়া, তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, সুলাইমান ইবনে আব্দুল মালিক মদিনায় এসেছিলেন, আর উমার ইবনে আব্দুল আযীয তখন সেখানকার শাসক। তিনি লোকদের নিয়ে জুহরের নামাজ আদায় করলেন, তারপর মাকসুরাহর (শাসকের বসার স্থান) দরজা খুলে মেহরাবের উপর হেলান দিলেন এবং জনগণের দিকে মুখ করলেন। তিনি সাফওয়ান ইবনে সুলাইমকে দেখে উমারকে বললেন, ‘এই লোকটি কে? আমি এর চেয়ে সুন্দর পোশাক পরিহিত আর কাউকে দেখিনি।’ উমার বললেন, ‘সাফওয়ান।’ তিনি বললেন, ‘হে যুবক, একটি থলে আনো যাতে পাঁচশ দিনার আছে।’ সে তা নিয়ে এলো।

তিনি তাঁর খাদেমকে বললেন, ‘এই টাকাগুলো ওই দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির কাছে নিয়ে যাও।’ সে গিয়ে সাফওয়ানের পাশে বসল। তখন তিনি নামায পড়ছিলেন। নামাজ শেষে তাঁকে সালাম দেওয়া হলো। সাফওয়ান তার দিকে ফিরলেন এবং বললেন, ‘তোমার কী দরকার?’ সে বলল, ‘আমীরুল মুমিনীন বলছেন এই অর্থ আপনার জীবন নির্বাহ ও পরিবারের জন্য ব্যবহার করতে।’ সাফওয়ান বললেন, ‘তুমি যার কাছে প্রেরিত হয়েছো, আমি সে নই।’ সে বলল, ‘আপনি কি সফওয়ান ইবনে সুলাইম নন?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ সে বলল, ‘তাহলে আমি আপনার কাছেই প্রেরিত হয়েছি।’ তিনি বললেন, ‘যাও, নিশ্চিত হয়ে এসো।’ যুবকটি ফিরে গেল, আর সফওয়ান তাঁর জুতো নিয়ে বেরিয়ে গেলেন এবং সুলাইমান মদিনা ছেড়ে না যাওয়া পর্যন্ত তাঁকে আর দেখা যায়নি।৭

দানশীলতা:

আবু মারওয়ান, যিনি বনু তামিমের মাওলা ছিলেন। তিনি বলেন, আমি ঈদের নামাজ শেষে সাফওয়ান ইবনে সুলাইমের (রহ.) সঙ্গে তাঁর বাসায় ফিরে এলাম। তিনি শুকনো রুটি (খাবার) আনলেন। এমন সময় এক ভিক্ষুক দরজার সামনে এসে সাহায্য চাইলো। সফওয়ান (রহ.) ঘরের একটি ছোট জানালা দিয়ে কিছু নিলেন এবং ভিক্ষুককে দিলেন। আমি কৌতূহলবশত সেই ভিক্ষুকের পিছু নিলাম, দেখতে চাইলাম, তিনি কী পেয়েছেন। তখন সে আনন্দে বলছিল,‘আল্লাহ তাঁকে এমন উত্তম প্রতিদান দিন যা তিনি তাঁর কোনো সৃষ্টিকে কখনো দেননি!’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তিনি তোমাকে কী দিয়েছেন?’ সে বলল, ‘আমাকে এক দিনার দিয়েছেন।’

সুফিয়ান (রহ.) বলেন, এক ব্যক্তি শাম (সিরিয়া) থেকে এসে বলল, ‘আমাকে সাফওয়ান ইবনে সুলাইমের কাছে নিয়ে চলো, কারণ আমি স্বপ্নে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করতে দেখেছি।’আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কীসের কারণে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করতে দেখেছ?’ সে বলল, ‘তিনি একজন মানুষকে একটি জামা পরিয়ে দিয়েছিলেন, সেই জামার বরকতে।

একজন সাফওয়ানের সঙ্গী বলেন, আমি সাফওয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওই জামার ঘটনা কী ছিল?’ তিনি বললেন,‘এক শীতের রাতে আমি মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলাম, দেখি একজন মানুষ সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় কাঁপছে। আমি আমার জামা খুলে তাঁকে পরিয়ে দিলাম।’৮

আব্দুর রহমান বিন হাসান বিন আসলাম থেকে বর্ণিত, সাফওয়ান বিন সুলাইম রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এঁর মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং একজন মিসকিনকে (গরিবকে) বলতে দেখলেন, ‘যে আমাকে একটি জামা পরাবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে একটি জামা পরাবেন।’ তখন সফওয়ান তাঁর নিজের জামা খুলে মিসকিনকে দিয়ে দিলেন। অতঃপর একজন নেককার লোক যিনি ভালো মানুষ ছিলেন, তিনি তিন রাত (স্বপ্নে) এমন এমন দেখলেন। তখন লোকটি মদিনাতে এসে আলী বিন হুসাইন (ইমাম যাইনুল আবিদীন)-এঁর কাছে গেলেন এবং তাঁকে বললেন, ‘সাফওয়ানের কাছে লোক পাঠান।’ তিনি সাফওয়ানের কাছে লোক পাঠালেন। যখন সাফওয়ান আসলেন, তখন লোকটি তাঁকে তাঁর দেখা স্বপ্নের কথা জানালেন। তখন আলী বিন হুসাইন সাফওয়ানকে বললেন, ‘আমি আপনাকে কসম দিচ্ছি, আপনি আমাকে বলুন সেই রাতে কী ঘটেছিল।’ তখন সফওয়ান কেঁদে ফেললেন এবং জামা দেওয়ার ঘটনাটি তাঁকে জানালেন।৯

বিনয়:

সুফিয়ান (রহ.) বলেন, আমি মিনায় এক মদিনাবাসীকে জিজ্ঞেস বললাম, আমাকে সাফওয়ান ইবনু সুলাইমের কাছে পৌঁছে দাও।

সে বলল, তুমি মাগরিব নামাজ শেষে মসজিদের মিনারের সামনে তাকাও, সেখানে তাকে বসা পাবে।

আমি বললাম, তাকে চিনব কীভাবে?

সে বলল, যখন দেখবে, চিনে ফেলবে। তাঁর বিনয় ও খুশুর জন্য।

আমি গেলাম, তাকিয়ে দেখি এক বৃদ্ধ বসে আছেন।

আমি তাঁর পাশে বসে বললাম, হে শায়খ, আপনি কি মদিনার লোক?

তিনি বললেন, হ্যাঁ।

আমি ভাবলাম, আজ রাতে তাঁর নাম জানতে চাইব না, তিনি-ই সেই সাফওয়ান।১০

কারামত:

ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, হজরত সাফওয়ান ইবনে সুলাইম রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন বিশ্বস্তদের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর কথা দ্বারা শিফা (রোগমুক্তি) লাভ করা হয় এবং তাঁর স্মরণে আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়।”১১

গুরুত্বপূর্ণ বাণী:

আবদুল্লাহ ইবনু আবি জা‘ফার (রহ.) থেকে বর্ণিত, সফওয়ান (রহ.) বলতেন, “কোনো রাজা পৃথিবী থেকে উঠতে পারে না (অর্থাৎ দুনিয়ার শাসন ত্যাগ করতে পারে না) যতক্ষণ না সে বলে, لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللّٰهِ -‘আল্লাহ ব্যতীত কোনো শক্তি ও ক্ষমতা নেই।”

আবু মুসলিম আল-খাওলানী (রহ.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে সাফওয়ান (রহ.) বলতেন,“আগে মানুষ ছিল কোমল বৃক্ষের পাতার মতো; কাঁটা ছিল না। কিন্তু তোমরা আজ কেবল কাঁটা হয়েছ, পাতাবিহীন বৃক্ষের মতো।”১২

ওফাত:

ওয়াকীদী, ইবনে সাআদ, খলিফা, ইবনে নুমাইর ও অন্যরা বলেন, সাফওয়ান ইবনে সুলাইম (রহ.) এর মৃত্যু ১৩২ হিজরিতে ঘটেছে। আবু হাসান জিয়াদি বলেন, তিনি ৭২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।১৩