ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.) ছিলেন ইসলামের আলোচিত হাদিসজ্ঞ, ফকিহ ও আধ্যাত্মিক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। ছোটবেলা থেকেই তার হৃদয় আল্লাহর প্রেমে উজ্জ্বল ছিল। তার জীবন ছিল জ্ঞান, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির অনন্য মিশ্রণ। তিনি কেবল কোরআন ও হাদিস শিখেছেন এমন নয়, বরং তা তিনি নিজের চরিত্র ও জীবনের প্রতিটি কাজেই বাস্তবায়ন করেছেন। জুহদ ও ওয়ারাহ ছিল তার জীবনধারার মূলমন্ত্র।
প্রাথমিক পরিচিতি:
ইমাম ইবনে আবিদ দুনিয়া, মুহাম্মাদ ইবনে খালফ আল-তাইমি থেকে উল্লেখ করেছেন, তাঁর নসবনামা হচ্ছে, সুফিয়ান ইবনে সাঈদ ইবনে মাসরুক ইবনে হাবিব ইবনে রাফি ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মাওহিবা ইবনে উবাই ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মুনকিদ ইবনে নসর ইবনে আল-হারিস ইবনে সা‘লাবা ইবনে আমির ইবনে মালকান ইবনে সাওর ইবনে আবদে মানাত ইবনে আদ ইবনে তাবেখা ইবনে ইলিয়াস ইবনে মুদার ইবনে নিজার ইবনে মাদ ইবনে আদনান।
অন্যদিকে আল-হাইসাম ইবনে আদি ও ইবনে সাদ উভয়েও একইভাবে তাঁর বংশতালিকা বর্ণনা করেছেন এবং তাঁরা উল্লেখ করেছেন যে, তিনি তাবেখা গোত্রের সাওর বংশোদ্ভূত। ১
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন:
ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রহ.) ৯৭ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন। এটি সর্বসম্মত মত। শৈশবকালেই তিনি তাঁর পিতা সাঈদ ইবনে মাসরুক আল-সাওরির তত্ত্বাবধানে জ্ঞানার্জন শুরু করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বিশ্বস্ত হাদিস বর্ণনাকারী, যিনি ইমাম শাবি ও খাইসামা ইবনে আবদুর রহমানের ছাত্র ছিলেন। তিনি কুফার নির্ভরযোগ্য রাবিদের একজন এবং ছোট তাবেয়িদের অন্তর্ভুক্ত। ছয়টি প্রধান হাদিসগ্রন্থে তাঁর বর্ণনা রয়েছে। তাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন তাঁরই পুত্র ইমাম সুফিয়ান (রহ.), উমর, মুবারক, শুবা ইবনে আল-হাজ্জাজ, জাইদা, আবু আল-আহওয়াস, আবু আওয়ানা, উমর ইবনে উবাইদ আল-তানাফিসি এবং আরও অনেকে। তিনি ১২৬ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন।২
শিক্ষকবৃন্দ:
আবু আবদুল্লাহ সুফিয়ান সাওরী (রহ.)-এঁর শাইখদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০০ জন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন— ইবরাহিম ইবনে আবদুল আলা, ইবরাহিম ইবনে উকবা, ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আল-মুনতাশির, ইবরাহিম ইবনে মুহাজির, ইবরাহিম ইবনে মাইসারা, ইবরাহিম ইবনে মাজিদ আল-খাওজি, আজলাহ ইবনে আবদুল্লাহ, আদম ইবনে সুলাইমান, উসামা ইবনে যায়েদ, ইসরাঈল আবু মুসা, আসলাম আল-মিনক্বারি, ইসমাইল ইবনে ইবরাহিম আল-মাখজুমি, ইসমাইল আস-সুদ্দি, ইসমাইল ইবনে কাছির, আল-আসওয়াদ ইবনে কাইস, আশ‘আস ইবনে আবি আল-শাশা, আগার ইবনে আস-সাবাহ, আফলাত ইবনে খালিফা, ইয়াদ ইবনে লাকিত, আইয়ুব আল-সিখতিয়ানি, আইয়ুব ইবনে মুসা, আল-বাখতারি ইবনে আল-মুখতার, বুরদ ইবনে সিনান, বুরাইদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবি বুরদাহ, বাশির আবু ইসমাইল, বুকাইর ইবনে আতা, বাহজ ইবনে হাকিম, বিনান ইবনে বিশর, তাওবা আল-আনবারি, সাবিত ইবনে উবাইদ, আবু আল-মিকদাম সাবিত ইবনে হুরমুজ, সাওর ইবনে ইয়াজিদ, সুহাইর ইবনে আবি ফাহেতা, জাবির আল-জুফি, জামে ইবনে আবি রাশেদ, জামে ইবনে শাদ্দাদ, জাবলা বিন সুহাইম, জাফর ইবনে বুরকান, জা‘ফর আস-সাদিক, জাফর ইবনে মাইমুন, হাবিব ইবনে আবি সাবিত (তাঁর অন্যতম প্রধান শায়খ), হাবিব ইবনে শাহিদ, হাজ্জাজ ইবনে ফুরফিসা, আল-হাসান ইবনে উবাইদুল্লাহ, হুসাইন ইবনে আবদুর রহমান, হাকিম ইবনে জুবায়ের, হাকিম ইবনে দায়লাম, হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমান, হুমরান ইবনে আয়ান, হুমায়েদ ইবনে কাইস, হুমায়েদ তাওয়াল, হানযালা ইবনে আবি সুফিয়ান, খালেদ ইবনে সালামা আল ফাফা, খালেদ আল হায্যা, খুসাইফ ইবনে আব্দুর রহমান, আবু জাহাফ দাউদ ইবনে আবি আওফ, দাউদ ইবনে আবি হিনদ, রাশেদ ইবনে কাইসান, রাবাহ ইবনে আবি মারুফ, রাবি ইবনে আনাস, রাবি ইবনে সাবিহ, রাবেয়া আর রাঈ, রুকাইন ইবনে রাবি, জোবায়েদ আল ইয়ামি, জোবায়ের ইবনে আদি, সালামা ইবনে কুহাইল (তাঁর অন্যতম প্রধান শিক্ষক), সুলাইমান আল-আ‘মাশ, সুলাইমান আল-তাইমি, শুবা ইবনে আল-হাজ্জাজ (নাসাঈতে তাঁর বর্ণনা আছে), সালিহ ইবনে সালিহ ইবনে হাই, সাফওয়ান ইবনে সুলাইম, আবদুল্লাহ ইবনে আবি বকর ইবনে হাজম, আবদুল্লাহ ইবনে হাসান ইবনে হাসান, আবদুল্লাহ ইবনে দিনার, আবদুল্লাহ ইবনে আউন, আবদুল্লাহ ইবনে ইসা, আবদ আল-রহমান ইবনে আল-কাসিম, আবদ আল-করিম ইবনে মালিক, ইবনে জুরাইজ, উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর, উসমান ইবনে হাকিম, আতা ইবনে আল-সাইব, ইকরিমা ইবনে আম্মার, আলি ইবনে যায়েদ ইবনে জাদ‘আন, আমর ইবনে দিনার, আমর ইবনে মুররাহ (তাঁর প্রাচীন শিক্ষকদের অন্যতম), মা‘মার ইবনে রাশিদ, মুগিরা ইবনে মিকসাম, মানসুর ইবনে আল-মু‘তামির, মুসা ইবনে আবি আইশা, মুসা ইবনে উকবা, মাইসারা ইবনে হাবিব, আবু হামজা মাইমুন আল-আ‘ওয়ার, হিশাম ইবনে উরওয়া, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-আনসারি, ইয়াজিদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে জাবির, ইউনুস ইবনে উবাইদ, আবু ইসহাক আল-সাবি‘ঈ, আবু ইসহাক আল-শায়বানি, আবু বকর ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবি আল-জাহম, আবু জা‘ফর আল-ফাররা, আবু মালিক আল-আশজা‘ঈ, আবু হারুন আল-আবদি এবং আরও অনেকে।
এছাড়াও প্রবীণ তাবেয়িদের একজন সালামা ইবনে কুহাইল, হাবিব ইবনে আবি সাবিত, আমর ইবনে মুররাহ, আল-আমাশ প্রমুখ তাঁর বড় শিক্ষক ছিলেন। তিনি হামজা আল-যাইয়্যাতের কাছে চারবার কুরআন হেফজ করে তিলাওয়াত করেছিলেন। ৩
সুফিয়ান সাওরী (রহ.)-এঁর ছাত্র ও তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনাকারীগণ:
ইমাম সুফিয়ান আল-সাওরী (রহ.) ছিলেন এমন এক মহিমান্বিত মুহাদ্দিস ও ইমাম, যাঁর থেকে হাজারেরও বেশি আলেম হাদিস বর্ণনা করেছেন। যদিও ইমাম আবুল ফারাজ ইবনে জাওযী সূত্রে ২০,০০০-এর অধিক বর্ণনাকারীর কথা বলা হয়েছে, তবে তা অতিরঞ্জিত বলে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তবুও পরিচিত ও অপরিচিত বর্ণনাকারী মিলিয়ে সংখ্যা ১,৪০০-এরও বেশি হওয়া নিশ্চিত। এটি তাঁর ইলমি মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতারই প্রমাণ বহন করে।
তাঁর প্রবীণ শিক্ষাগুরু ও সমসাময়িকদের মধ্যেও অনেকে তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন— আল-আ‘মাশ, আবান ইবনে তাগলাব, ইবনে আজলান, খুসাইফ, ইবনে জুরাইজ, জাফর আস-সাদিক, জাফর ইবনে বুরকান, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আল-আওজাঈ, মুআবিয়া ইবনে সালিহ, ইবনে আবি যি‘ব, মিস‘আর, শু‘বা এবং মা‘মার। এঁরা সবাই তাঁর আগে ইন্তেকাল করলেও তাঁকে যথেষ্ট মর্যাদা দিয়ে তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন।
এছাড়াও বহু খ্যাতনামা মুহাদ্দিস ও ফকিহ তাঁর ছাত্র হিসেবে পরিচিত। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— ইবরাহিম ইবনে সা‘দ, আবু ইসহাক আল-ফাযারি, আহমাদ ইবনে ইউনুস আল ইয়ারবুয়ী, আহওয়াছ ইবনে জাওয়াব, আসবাত ইবনে মুহাম্মাদ, ইসহাক আল-আজরাক, ইবনুল উলাইয়া, উমাইয়া ইবনে খালিদ, বিশর ইবনে আস-সারি, বিশর ইবনে মনছুর, বকর ইবনে আশশারুদ, বুকাইর ইবনে শিহাব, সাবিত ইবনে মুহাম্মাদ আল আবেদ, সাআলাবা ইবনে সুহাইল, জারির ইবনে আবদুল হামিদ, জাফর ইবনে আওন, হারিস ইবনে মানসুর আল ওয়াসেতী, হাসান ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে উসমান, আবদুর রহমান ইবনে মাহদি, আবদুল্লাহ ইবনে আল-মুবারক, ইমাম মালিক ইবনে আনাস, আবদুর রাজ্জাক ইবনে হাম্মাম, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, ওয়াকি‘ ইবনে আল-জাররাহ, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা, ইয়াজিদ ইবনে হারুন, আবু দাউদ আত-তাইয়ালিসি, আবু নুআইম, ফুদ্বাইল ইবনে ইয়া‘দ প্রমুখ।
তাঁর কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন আরও বহু বিশিষ্ট মুহাদ্দিস, যেমন— আবু উসামা, হাফস ইবনে গিয়াস, খালিদ ইবনে আল-হারিস, রুহ ইবনে উবাদা, যুহাইর ইবনে মুআবিয়া, আলি ইবনে আল-জা‘দ (যিনি তাঁর নির্ভরযোগ্য শেষ ছাত্রদের একজন), ইসা ইবনে ইউনুস, মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ আল-ফিরিয়াবি, মুহাম্মাদ ইবনে কাছির আল-আবদি, মুহাম্মাদ ইবনে বিশর, মু‘আয ইবনে মু‘আয, মুহাম্মাদ ইবনে আল-হাসান আল-আসাদি, আবু হুযাইফা মুসা ইবনে মাসউদ, মু‘আম্মাল ইবনে ইসমাইল, হারুন ইবনে আল-মুগিরা, ইয়াহইয়া ইবনে আদম, ইউসুফ ইবনে আসবাত ইত্যাদি।
এই বিশাল তালিকার বাইরেও অসংখ্য মুহাদ্দিস ও ফকিহ সুফিয়ান (রহ.)-এঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন, যেমন— আবু আহমাদ আল-জুবাইরি, আবু বকর আল-হানাফি, আবু সুফিয়ান আল-মা‘মারি, আবু আমির আল-আক্বাদি, নায়িল ইবনে নাজিহ, মুস‘আব ইবনে মাহান, মাখলাদ ইবনে ইয়াজিদ, মুবারক ইবনে সা‘ঈদ (তাঁর ভাই) প্রমুখ।
সব মিলিয়ে ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.)-এঁর ইলমের প্রসার, তাঁর ছাত্রদের সংখ্যা এবং তাঁদের মধ্যে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ইমামদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে তিনি হাদিস ও ইলমে দ্বীনের এক অমূল্য বাতিঘর ছিলেন।৪
সুফিয়ান সাওরী (রহ.)-এর জুহদ ও পরহেজগারিতা :
জুহদের অর্থ হলো— হৃদয়কে দুনিয়া থেকে খালি রাখা এবং এর প্রতি লোভ না থাকা। শুধু হাত দিয়ে দুনিয়া ত্যাগ করা অথচ হৃদয় তা নিয়ে ব্যস্ত ও আসক্ত থাকা— এটা জুহদ নয়।
ওয়াকী’(রহ.) বলেন, আমি সুফিয়ান সাওরী (রহ.)-কে বলতে শুনেছি— “জুহদ মানে হলো মোটা খাবার খাওয়া বা খসখসে কাপড় পরা নয়; বরং জুহদ হলো— আশা-আকাঙ্ক্ষা সংক্ষিপ্ত রাখা এবং মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থাকা।”
ঈসা ইবনে ইউনুস (রহ.) বলেন, সুফিয়ান সাওরী গোপনে ইন্তিকাল করেছিলেন। তিনি তার জামাকে থলে বানিয়ে বই দিয়ে পূর্ণ করেছিলেন। (অর্থাৎ তার জীবনের শেষ মুহূর্তেও তিনি লেখালিখিতে নিমগ্ন ছিলেন)।
আবু কাতন (রহ.) বর্ণনা করেন শু’বা (রহ.) থেকে,“সুফিয়ান সাওরী মানুষদের মধ্যে নেতৃত্ব অর্জন করেছেন ওয়ারা’(পরহেজগারিতা) ও জ্ঞানের মাধ্যমে।”আবু সারি (রহ.) বলেন, ফুযাইল ইবনে ইয়ায (রহ.)-কে যখন তার পরহেজগারিতার উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি বললেন, “এই ব্যাপারে আমার ইমাম হচ্ছেন সুফিয়ান সাওরী।”
একবার হজরত সুফিয়ান সাওরীকে একটি কাপড় উপহার দেয়া হলো। তিনি তা ফিরিয়ে দিলেন। তখন যিনি উপহার দিয়েছিলেন তিনি বললেন, “আমি তো হাদিস শ্রোতা নই, তবুও ফিরিয়ে দিচ্ছেন কেন?” সুফিয়ান বললেন: “আমি জানি আপনি হাদিস শ্রোতা নন। কিন্তু আপনার ভাই আমার থেকে হাদিস শোনেন। আমি আশঙ্কা করি, আপনার ভাইয়ের প্রতি আমার হৃদয় অন্যদের তুলনায় নরম হয়ে যাবে।”
কুতাইবা ইবনে সাঈদ (রহ.) বলেন, “যদি সুফিয়ান না থাকতেন, তবে পরহেজগারিতা দুনিয়া থেকে হারিয়ে যেত।”
আবদুল আজিজ আল-কুরাশী (রহ.) বলেন, আমি সুফিয়ানকে বলতে শুনেছি— “তুমি জুহদ অবলম্বন করো, আল্লাহ তোমাকে দুনিয়ার ফাঁদগুলো দেখিয়ে দেবেন। তুমি পরহেজগারিতা অবলম্বন করো, আল্লাহ তোমার হিসাবকে সহজ করে দেবেন। যা সন্দেহজনক, তা ছেড়ে দাও, আর যা সন্দেহমুক্ত, তা গ্রহণ করো। সন্দেহকে নিশ্চিততার দ্বারা প্রতিস্থাপন করো, তাতে তোমার দ্বীন নিরাপদ থাকবে।”
আল-আমরী (রহ.) বলতেন,“হে কুরআন পাঠকগণ, তোমরা দুনিয়া ভোগ করো, কারণ সুফিয়ান সাওরী তো মারা গেছেন।”
হাফস ইবনে গিয়াস (রহ.) যখন সুফিয়ানের কথা উল্লেখ করতেন, তিনি বলতেন,“আমরা সুফিয়ান ও তার আসরে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দুনিয়ার কষ্ট ভুলে যেতাম।”
ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামান (রহ.) বলেন, সুফিয়ান সাওরী প্রায়ই এ কবিতাটি পাঠ করতেন— “তারা এমন এক জিনিস বিক্রি করেছে, যা চিরন্তন, সুন্দর ও নতুন; আর কিনেছে নষ্ট ও পুরনো জিনিস। কতই না মন্দ ব্যবসা করল তারা!” (অর্থাৎ তারা আখিরাত বিক্রি করেছে দুনিয়ার বিনিময়ে)।৫
শুআইব ইবনে হারব (রহ.) বলেন, হজরত সুফিয়ান সাওরী আমাকে বললেন—“হে আবু সালিহ, আমার কাছ থেকে তিনটি কথা শোনো। ১. যদি তোমার জুতার ফিতা প্রয়োজন হয়, তবুও কারও কাছে চেয়ো না। ২. যদি তোমার লবণের প্রয়োজন হয়, তবুও কারও কাছে চেয়ো না। আর জেনে রাখো, তুমি যে রুটি খাও, সেটি আসলে লবণ মিশিয়েই তৈরি। ৩. যদি তোমার পানির প্রয়োজন হয়, তাহলে নিজের হাত ব্যবহার করো। তোমার হাত-ই পাত্রের কাজ করবে।”৬
সুফিয়ান সাওরী (রহ.)-এঁর ইবাদত ও আল্লাহভীতি:
আলি ইবনে ফুজায়েল বলেছেন, “আমি সুফিয়ান সাওরী (রহ.)-কে দেখেছি মাথা না তুলেই কাবার চারপাশে সেজদায় তিনি সাতটি চক্কর ঘুরলেন।” অর্থাৎ, তিনি সেজদা অবস্থায় সাত চক্কর ঘুরেছেন।
ইবনে ওয়াহাব বলেন, “আমি সুফিয়ান সাওরী (রহ.)-কে মসজিদুল হারামে মাগরিবের পর নামাজ পড়তে দেখেছি। তিনি সেজদায় গেলেন এবং ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা তুললেন না, যতক্ষণ না ইশার নামাজের আজান হলো।”
এক ব্যক্তি সুফিয়ান সাওরীর (রহ.)-এঁর কাছে বললেন, “আমাকে উপদেশ দাও।” তিনি বললেন, “দুনিয়ার জন্য কাজ করো, যতদিন তুমি এখানে থাকছো এবং আখেরাতের জন্য কাজ করো, যতদূর তোমার অবস্থান সেখানে।”
আবদুল্লাহ ইবনে আবদান (আবু মুহাম্মাদ আল-বাগলানি) বলেন, “এক ব্যক্তি সুফিয়ান সাওরী (রহ.)-এঁর অনুসরণ করছিল। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে সুফিয়ান সাওরী (রহ.) সর্বদা একটি ইটের টুকরো থেকে একটি চিঠি বের করতেন এবং তাতে তাকাতেন। মানুষটি কৌতূহলী হয়ে চিঠি দেখার চেষ্টা করল এবং দেখল সেখানে লেখা আছে, ‘সুফিয়ান, তোমার অবস্থানকে আল্লাহর সামনে স্মরণ করো।”৭
সাইয়্যিদ ইবনে সাদাকা (আবু মুহল্লাল) বলেন, “সুফিয়ান সাওরী (রহ.) আমার হাত ধরে আমাকে পাহাড়ের দিকে নিয়ে গেলেন। আমরা মানুষের যাত্রাপথ থেকে দূরে এক শান্ত স্থান বেছে নিয়ে বসেছিলাম। তখন তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন,‘হে মুহল্লাল, যদি পারো, এই যুগে কারো সঙ্গে বেশি মিশো না। সবসময় তোমার লক্ষ্য হোক নিজের প্রয়োজন ও প্রস্তুতি ঠিক রাখা। দরবারি ও শাসকদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ থেকে দূরে থাকো। তোমার প্রয়োজনগুলো আল্লাহর কাছে তুলে ধরো। যেসব কাজ তোমার জন্য কঠিন বা জরুরি, তা নিয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও। মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ো না। তোমার প্রয়োজন সেই ব্যক্তির কাছে তুলে ধরো না, যিনি এগুলোকে গুরুত্ব দেন না। আল্লাহর কসম, আমি আজকের দিনে কুফা শহরে এমন কাউকে জানি না, যার কাছে আমি দশ দিরহাম ঋণ চাইলে সে আমাকে দেবে, আর তারপর সে এটা লিখে রাখবে না এবং সবার কাছে বলে বেড়াবে না যে, ‘সুফিয়ান আমার কাছে এসেছিল এবং কর্জ চেয়েছিল, আর আমি তাকে কর্জ দিয়েছি।”৮
মুযাহিম ইবনে জুফার বলেন, “সুফিয়ান সাওরী (রহ.) আমাদের সঙ্গে মাগরিবের নামাজ পড়লেন। তিনি কোরআন তিলাওয়াত করতে করতে ‘ইই্য়াকা না’বুদু ওয়া ইই্য়াকা নাস্তাঈন’(আমরা শুধুমাত্র আপনারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র আপনারই সাহায্য চাই) পর্যন্ত পৌঁছালেন। এখানে তিনি এমনভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে কাঁদলেন যে, তার তিলাওয়াত থেমে গেল। কিছুক্ষণ পর তিনি পুনরায় আলহামদুলিল্লাহ থেকে পড়া শুরু করলেন।”৯
আব্দুল রহমান ইবনে রাসতাহ বলেন, “আমি শুনেছি ইবনে মাহদি বলছেন, ‘সুফিয়ান সাওরী (রহ.) আমার এখানে রাত্রি কাটিয়েছেন এবং কাঁদছিলেন।”যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বললেন, “আমার পাপ আমার কাছে এতটা হালকা, যতটা না আমি পৃথিবী থেকে বিশ্বাস হারানোর ভয় পাচ্ছি।” এবং তিনি মাটির কিছু অংশ তুলেছিলেন এবং বললেন, “আমি ভয় পাই যে মৃত্যুর আগে আমার ইমান ছিনিয়ে নেয়া হবে।”১০
আব্দুর রহমান ইবনে মাহদি বলেন, “আমরা সুফিয়ান সাওরী (রহ.)-এঁর কাছে থাকলে মনে হতো যেন তিনি হিসাবের জন্য দাঁড়িয়েছেন। আমরা তাঁর সঙ্গে কথা বলার সাহস করতাম না। তাই আমরা হাদিস বর্ণনার কথা উল্লেখ করি, তখন সেই ভয় এবং ভক্তি বজায় থাকে। এরপর তিনি আমাদের হাদিস বলতেন।”১১
আবসার থেকে বর্ণিত, একবার সুফিয়ান সাওরী (রহ.) জোহরের আগে নামাজে দাঁড়ালেন। তিনি যখন এই আয়াতের কাছে পৌঁছালেন, فَإِذَا نُقِرَ فِي النَّاقُورِ، فَذَلِكَ يَوْمَئِذٍ يَوْمٌ عَسِيرٌ“যেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া হবে, সেদিন হবে এক কঠিন দিন।” (সুরা মুদ্দাচ্ছির, ৮-৯)। তিনি মসজিদ থেকে বের হয়ে চিৎকার করতে করতে দৌড়ালেন। মানুষ তাঁকে ধরতে পারল না, অবশেষে তাঁকে ‘হামরা’ নামক স্থানে গিয়ে ধরে ফিরিয়ে আনল।
ইউসুফ ইবনে আসবাত বলেন,“একবার আমরা এশার নামাজ শেষ করলাম। সুফিয়ান আমাকে বললেন, ‘আমাকে অজুর পানি দাও।’আমি দিলাম। তিনি তা ডান হাতে নিলেন এবং তাঁর বাম হাত গালে রেখে বসলেন।
আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন ঘুম ভেঙে গেল, দেখি ফজর হয়ে গেছে। আমি তাকালাম, তাঁর ডান হাতে তখনো সেই পানি রাখা আছে আর বাম হাত গালে। আমি বললাম, ‘হে আবু আব্দুল্লাহ, ফজর হয়ে গেছে।’তিনি বললেন, ‘যে মুহূর্ত থেকে তুমি আমাকে এই পানি দিয়েছিলে, তখন থেকে এখন পর্যন্ত আমি আখিরাতের চিন্তায় ডুবে ছিলাম।”
ইউসুফ ইবনে আসবাত আরও বলেন,“যখনই সুফিয়ান সাওরী গভীর চিন্তায় মগ্ন হতেন, তখন তাঁর নাক থেকে রক্ত বের হতো।”
আবু ইয়াযীদ মুহাম্মদ ইবনে হাসান বলেন, আমি আবদুর রহমান ইবনে মাহদীকে বলতে শুনেছি, “আমি মানুষের মধ্যে সুফিয়ানের মতো কোমল হৃদয়ের কাউকে পাইনি। আমি তাঁকে রাতের পর রাত লক্ষ্য করেছি। তিনি কেবল রাতের শুরুতে কিছুটা ঘুমাতেন। তারপর হঠাৎ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে জেগে উঠতেন আর বলতে থাকতেন, ‘আগুন, আগুন!’ তিনি বলতেন, ‘আগুনের কথা মনে করে আমি আর ঘুমাতে পারি না, না কোনো আকাঙ্ক্ষা পূরণে মন বসে।’
তারপর তিনি অজু করতেন এবং অজুর পর এই বলে দোয়া করতেন,‘হে আল্লাহ, আপনি আমার প্রয়োজন ভালোভাবেই জানেন, আমাকে কাউকে জিজ্ঞেস করতে হয় না। আমার একমাত্র চাওয়া হচ্ছে আমার গলাকে আগুন থেকে মুক্তি দিন। ইয়া ইলাহি, ভয়ের তীব্রতা আমাকে জাগ্রত রেখেছে, আর এটি আপনার এক মহান অনুগ্রহ। ইয়া ইলাহি, যদি আমার এক মুহূর্ত নিভৃতে থাকার সুযোগ থাকত, আমি কখনো মানুষের সাথে থাকতাম না।’তারপর তিনি নামাজে মনোযোগী হতেন। কিন্তু কান্নার কারণে তাঁর কিরাত শোনা যেত না। লজ্জা ও ভয়ের কারণে আমি তাঁর দিকে সরাসরি তাকাতে পারতাম না।”
ইসহাক ইবনে ইব্রাহীম আল-হানীনি বলেন,“আমরা একবার সুফিয়ান সাওরীর মজলিসে বসেছিলাম। তিনি এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি রাত কীভাবে কাটাও?’ সে উত্তর দিল। এভাবে সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন। তখন লোকেরা বলল, ‘হে আবু আব্দুল্লাহ, আপনি আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, আমরা বলেছি। এখন আপনিই বলুন— আপনি রাত কীভাবে কাটান?’ তিনি বললেন, ‘আমার দেহকে রাতের শুরুতে আমি একটু ঘুমাতে দেই, যতটুকু সে চায়। কিন্তু যখন জেগে উঠে তখন আর কখনো তাকে বিশ্রাম দিই না, আল্লাহর কসম।”১২
আকিদায়ে আহলে সুন্নাহ প্রসঙ্গে ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.)-এর অবস্থান:
শুআইব ইবনে হারব বলেছেন. “আমি সুফিয়ান আস-সাওরিকে বললাম, আমাকে এমন একটি হাদিস বর্ণনা করুন, যা আমার উপকারে আসবে। যখন আমি আল্লাহর সামনে দাঁড়াব এবং তিনি আমাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবেন, তখন আমি বলব, ‘হে প্রভু, সুফিয়ান আমাকে এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, ‘ফলে আমি মুক্তি পাব এবং আপনি ধরা পড়বেন।” তিনি হেসে বললেন, “লিখো, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।” এরপর তিনি বললেন, “কুরআন আল্লাহর বাণী, সৃষ্ট নয়। তা তাঁর থেকেই শুরু হয়েছে এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাবে। যে এর বাইরে কিছু বলে, সে কাফের।
ইমান হলো কথা, কাজ ও নিয়তের সমন্বয়, যা বাড়ে এবং কমে। (আর) শাইখান (আবু বকর ও ওমর রাদিআল্লাহু আনহুমা)-কে অগ্রাধিকার দেওয়া।” এরপর তিনি বললেন, “হে শুআইব, তুমি যা লিখেছ, তা তোমার কোনো উপকারে আসবে না, যতক্ষণ না তুমি মোজার উপর মাসাহ করাকে বৈধ মনে করবে।” (মোজার উপর মাসাহ করা হলো ফিকহি মাস’আলা, যা মুসাফির বা মুকিম উভয়ের জন্যই জায়েজ। তবে যেহেতু রাফেজিরা (শিয়া) এটিকে অস্বীকার করত, তাই আহলুস সুন্নাহ তাদের আকিদার কিতাবগুলোতে এটিকে আহলুস সুন্নাহর আকিদার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, রাফেজিদের বিরোধিতা করার জন্য।)
তিনি আরও বললেন, “এবং যতক্ষণ না তুমি ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’কে নীরবে পাঠ করাকে জোরে পাঠ করার চেয়ে উত্তম মনে করবে।’ (তিনি সালাতের মধ্যে পড়ার কথা বলতে চেয়েছেন। এটিও ফিকহি মাস’আলা, তবে রাফেজিদের বিরোধিতার কারণে এটিও আকিদার অংশ হিসেবে গণ্য হয়েছে।) এবং যতক্ষণ না তুমি তাকদিরের প্রতি ঈমান আনবে, যতক্ষণ না তুমি প্রত্যেক সৎ ও অসৎ লোকের পেছনে সালাত আদায় করাকে বৈধ মনে করবে, যতক্ষণ না তুমি কিয়ামত পর্যন্ত জিহাদকে চলমান বলে বিশ্বাস করবে, এবং যতক্ষণ না তুমি কোনো ন্যায়পরায়ণ বা অত্যাচারী শাসকের অধীনে ধৈর্য ধারণ করবে।”
আমি বললাম, “হে আবু আবদুল্লাহ, সব সালাত (তাদের পেছনে আদায় করব)? তিনি বললেন, না।”
তবে জুম’আ ও দুই ঈদের সালাত তুমি যার পেছনে পাও, তার পেছনে আদায় করবে। আর বাকি সালাতগুলোর ক্ষেত্রে তুমি স্বাধীন। তুমি শুধু সেই ব্যক্তির পেছনে সালাত আদায় করবে, যাকে তুমি নির্ভরযোগ্য মনে করো এবং জানো যে, সে আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।” এরপর তিনি বললেন, “যখন তুমি আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে এবং তিনি তোমাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবেন, তখন বলবে, ‘হে প্রভু, সুফিয়ান ইবনে সাঈদ আমাকে এই বিষয়ে বলেছেন।’ এরপর আমাকে আমার রবের কাছে ছেড়ে দিও।”১৩
বাহ্যিক চালচলন:
ইয়াহইয়া ইবনে আইয়ূব আল-মুকাবিরী বলেন, আমি আলী ইবনে সাবিতকে বলতে শুনেছি,“আমি মক্কার পথে সুফিয়ান সাওরীকে দেখেছিলাম। আমি তাঁর সবকিছু হিসাব করলাম, এমনকি জুতার দামও। মোট মূল্য হলো এক দিরহাম চার দানক।”
ইয়াহইয়া ইবনে আইয়ূব বলেন, আমি আলী ইবনে সাবিতকে বলতে শুনেছি,“যদি তুমি মক্কার পথে সুফিয়ানকে পাও এবং তোমার কাছে দুটি পয়সা থাকে যেগুলো তুমি দান করতে চাও, আর তুমি তাঁকে চেনো না, তোমার নিশ্চয় সেগুলো তাঁর হাতে দিতে মন চাইবে । আমি কখনো সুফিয়ানকে কোনো আসরের প্রথম সারিতে বসতে দেখিনি। বরং তিনি সর্বদা দেয়ালের পাশে বসতেন, দেয়ালে হেলান দিয়ে হাঁটু দুটো একত্র করতেন।”১৪
হাদিসের প্রতি তাঁর অনুরাগ:
আবদুর রহমান ইবনে মাহদী বলেন,“আমি সুফিয়ানকে বলতে শুনেছি, ‘রসুলুল্লাহ ﷺ থেকে যত হাদিস আমার কাছে পৌঁছেছে, আমি তা অবশ্যই অন্তত একবার হলেও আমল করেছি।”
হাতিম ইবনে ওয়ালিদ আল-কারমানী বলেন,“আমি ইয়াহইয়া ইবনে আবি বকরকে বলতে শুনেছি, সুফিয়ানকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘আপনি কবে পর্যন্ত হাদিস শিখবেন?’ তিনি বললেন, ‘আমি কোনো ভালো কাজে হাদিসের চেয়ে উত্তম কিছু পাইনি। তাই আমি এ কাজেই থাকব। নিশ্চয়ই হাদিস দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান।”১৫
খলিফা মাহদির কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তার দৃঢ় অবস্থান:
আতা ইবনে মুসলিম বর্ণনা করেছেন, যখন আল-মাহদি খলিফা হলেন, তিনি সুফিয়ান সাওরীর কাছে দূত প্রেরণ করলেন। সুফিয়ান যখন দূতের মাধ্যমে আল-মাহদির উপস্থিতিতে গেলেন, তখন আল-মাহদি তার আঙুলের আংটি খুলে সুফিয়ান সাওরীর দিকে ছুঁড়ে বললেন,“হে আবু আবদুল্লাহ, এই আমার আংটি। তুমি এই উম্মাহর মধ্যে কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ করো।”
হজরত সুফিয়ান সাওরী আংটিটি গ্রহণ করলেন এবং বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করলেন,“হে আমিরুল মুমিনীন, আমি কি কথা বলার অনুমতি পাবো?” উবাইদ বলেন আমি আতাকে বললাম, “হে আবু মুখাল্লাদ, তিনি কি তাকে ‘আমিরুল মুমিনীন বলে সম্বোধন করেছিলেন?” সুফিয়ান উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ।”তারপর সুফিয়ান নিশ্চিত হতে চাইলেন,“আমি কি কথা বলার ক্ষেত্রে নিরাপদ আছি?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ।”সুফিয়ান স্থিরভাবে বললেন,“তাহলে আপনি আমাকে ডাকবেন না, যতক্ষণ না আমি আপনার কাছে আসি। আর আপনি আমাকে কিছু দেবেন না, যতক্ষণ না আমি আপনার কাছে কিছু চাই।”
এতে খলিফা আল-মাহদি রাগান্বিত হলেন এবং সুফিয়ানকে শাস্তি দিতে চাইলেন। তখন তার লেখক (সচিব) বললেন,“হে আমিরুল মুমিনীন, আপনি কি তাকে নিরাপত্তা দেননি?” আল-মাহদি স্বীকার করলেন, “হ্যাঁ।”পরবর্তীতে হজরত সুফিয়ান সাওরী বেরিয়ে গেলেন। তার সঙ্গীরা তাঁকে ঘিরে ধরে জানতে চাইলেন,“হে আবু আবদুল্লাহ, আপনাকে কি বাধা দিল? তিনি তো আপনাকে এই উম্মাহর মধ্যে কিতাব ও সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।”হজরত সুফিয়ান সাওরী তাদের জ্ঞানকে তুচ্ছ জ্ঞান করলেন এবং বসরা অভিমুখে পালিয়ে গেলেন।”১৬
ইমাম ইবনে সাদ ‘আত-তাবাকাত গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, “সুফিয়ান সাওরীকে খোঁজা হচ্ছিল, তাই তিনি মক্কায় চলে গেলেন। খলিফা আল-মাহদি আমিরুল মুমিনিন মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহিম, যিনি মক্কার শাসক ছিলেন, তার কাছে সুফিয়ানকে ধরার জন্য চিঠি লিখলেন। মুহাম্মদ সুফিয়ানের কাছে দূত পাঠিয়ে তাকে বিষয়টি জানালেন এবং বললেন, ‘যদি আপনি তাদের কাছে যেতে চান, তাহলে নিজেকে প্রকাশ করুন, যাতে আমি আপনাকে তাদের কাছে পাঠাতে পারি। আর যদি আপনি যেতে না চান, তাহলে লুকিয়ে থাকুন।’
হজরত সুফিয়ান সাওরী আত্মগোপন করলেন। তার জন্য মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহিমকে চাপ দেওয়া হলো এবং একজন ঘোষণাকারীকে নির্দেশ দেওয়া হলো মক্কায় ঘোষণা দিতে ‘যে সুফিয়ানকে নিয়ে আসবে, তার জন্য এই পরিমাণ পুরস্কার রয়েছে।’ হজরত সুফিয়ান সাওরী মক্কায় লুকিয়ে রইলেন এবং শুধু আলেমদের সামনে এবং যাদের ভয় করতেন না, তাদের সামনেই নিজেকে প্রকাশ করতেন। তারা বলেন, ‘যখন সুফিয়ান মক্কায় নিজেকে ধরা পড়ার ঝুঁকিতে দেখলেন, তখন তিনি বসরা চলে গেলেন। তিনি ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তানের বাড়ির কাছে অবস্থান নিলেন। তিনি বাড়ির কিছু লোককে বললেন, ‘তোমাদের আশেপাশে কি কোনো মুহাদ্দিস আছেন?’
তারা বলল, ‘হ্যাঁ, ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদ।’ তিনি বললেন, ‘তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।’ তারা তাকে নিয়ে এলো। তিনি বললেন, ‘আমি এখানে ছয় বা সাত দিন ধরে আছি।’ ইয়াহিয়া তাকে তার পাশের বাড়িতে নিয়ে গেলেন, যার মাঝে শুধু একটি দরজা ছিল। তিনি বসরা থেকে মুহাদ্দিসদের নিয়ে আসতেন, যাতে তারা তাকে সালাম দিতে এবং তার কাছ থেকে হাদিস শুনতে পারেন। যারা তার কাছে এসেছিল, তাদের মধ্যে জারির ইবনে হাযিম, মুবারক ইবনে ফাযালা, হাম্মাদ ইবনে সালামাহ, মারহুম আল-আত্তার, হাম্মাদ ইবনে যায়দ এবং আরও অনেকে ছিলেন। আবদুর রহমান ইবনে মাহদিও এসেছিলেন এবং তার সঙ্গী হয়েছিলেন। ইয়াহিয়া এবং আবদুর রহমান সেই দিনগুলোতে তার কাছ থেকে হাদিস লিখতেন। তিনি আবু আওয়ানাকে তার কাছে আসার জন্য অনুরোধ করলেন, কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করলেন এবং বললেন, একজন লোক, যাকে আমি চিনি না, কেন তার কাছে যাব?।”
এর কারণ হলো, আবু আওয়ানা মক্কায় তাকে সালাম দিয়েছিলেন, কিন্তু সুফিয়ান সালামের উত্তর দেননি। (হয়তো তিনি সন্দেহ করেছিলেন বা তাকে চিনতেন না।) এ বিষয়ে তার সাথে কথা বলা হলে তিনি বললেন, আমি তাকে চিনি না। যখন সুফিয়ান বুঝতে পারলেন যে, ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদের কাছে তার অবস্থান প্রকাশ হয়ে গেছে, তখন তিনি তাকে বললেন, আমাকে এই স্থান থেকে সরিয়ে দাও। ইয়াহিয়া তাকে হাইসাম ইবনে মানসুর আল-আরাজি-এর বাড়িতে নিয়ে গেলেন, যিনি বনি সাদ ইবনে জয়েদ মানাত বনি তামিমের একজন ছিলেন। তিনি তাদের সাথে সেখানে ছিলেন। হাম্মাদ ইবনে জায়েদ তাকে শাসকদের থেকে দূরে থাকা নিয়ে কথা বললেন এবং বললেন, ‘এটি বিদআতিদের কাজ, আমরা তাদের থেকে কী ভয় করি?’ তখন সুফিয়ান এবং হাম্মাদ বাগদাদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।”১৭
শাসকদের সাথে সম্পর্ক:
আবদুস সামাদ (আল-মানসুরের চাচা) অসুস্থাবস্থায় সুফিয়ানের কাছে এলেন। সুফিয়ান মুখ ফিরিয়ে নিলেন, সালামও গ্রহণ করলেন না। তখন আবদুস সামাদ বললেন.“হে সৈয়দ, আমি মনে করি আবু আবদুল্লাহ ঘুমাচ্ছেন।”
সুফিয়ান বললেন, “মিথ্যা বলো না, আমি ঘুমাচ্ছি না।”
তিনি বললেন, “আপনার কোনো প্রয়োজন আছে?”
সুফিয়ান বললেন: “হ্যাঁ, তিনটি প্রয়োজন আছে—
১) তুমি আর কখনো আমার কাছে আসবে না।
২) আমার জানাজায় অংশগ্রহণ করবে না।
৩) আমার জন্য রহমত প্রার্থনা করবে না।”
এ কথা শুনে আবদুস সামাদ লজ্জিত হয়ে বেরিয়ে গেলেন।১৮
বচনামৃত:
১. যদি আমি জানতে পারতাম যে, কেউ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হাদিস অন্বেষণ করছে, তাহলে আমি তার বাড়িতে গিয়ে তাকে হাদিস শোনাতাম।
২. আমি যখন ইলম অন্বেষণ শুরু করি, তখন আমার সেই বিষয়ে কোনো সঠিক নিয়ত ছিল না। পরে আল্লাহ আমাকে সেই নিয়ত দান করেছেন।
৩. আমি আমার হৃদয়ে যা কিছু জমা রেখেছি, তা আমার সাথে কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করেনি।
৪. ইলম অর্জন করো। যখন তোমরা তা অর্জন করবে, তখন তা মনের মধ্যে গেঁথে নাও এবং হাসি-তামাশা দিয়ে তা মিশ্রিত করো না। কারণ এতে মানুষের মন তা প্রত্যাখ্যান করবে।”
৫. ইলম অন্বেষণ মানে শুধু ‘অমুকের সূত্রে অমুক’ নয়। বরং ইলম অন্বেষণ হলো আল্লাহর প্রতি ভয় রাখা।
৬. বলা হতো, দুনিয়ার প্রতি বেশি লোভি হয়ো না, তাহলে তুমি তোমার জ্ঞান সংরক্ষণ করতে পারবে না।
৭. আমি মনে করি, যদি কোনো ব্যক্তি মিথ্যা বলার ইচ্ছা করে, তবে তা তার চেহারায় প্রকাশ পায়।
৮. তোমরা সেই ব্যক্তির দাওয়াত ছাড়া অন্য কারও দাওয়াত গ্রহণ করো না, যার খাবার খেলে তোমাদের অন্তর পবিত্র হবে।
৯. যেসব মানুষ শাসকদের সাথে মেলামেশা করে, তাদের অধিকাংশই এমনটা করে থাকে পরিবার ও অভাবের কারণে।
১০. পরিবার-সংসার আছে এমন ব্যক্তির দ্বারা প্রতারিত হয়ো না, কারণ কমই এমন ব্যক্তি আছে যে (অর্থের বিষয়ে) ভুল করে না। অন্য একটি বর্ণনায় আছে, পরিবারের কর্তা সম্পর্কে খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ো না এবং তার দ্বারা প্রতারিত হয়ো না।
১১. অতীতে সম্পদকে খারাপ মনে করা হতো, কিন্তু আজকের দিনে তা মুমিনের ঢাল।
১২. এক ব্যক্তি তাকে বললেন, “হে আল্লাহর বান্দা, তুমি এই দিনারগুলো (স্বর্ণমুদ্রা) কেন সঞ্চয় করে রেখেছ?” তিনি বললেন, “চুপ করো, এই দিনারগুলো না থাকলে এই বাদশাহরা আমাদের রুমাল হিসেবে ব্যবহার করে তাদের হাত মুছতো।”
১৩. হালাল সম্পদ অপচয় সহ্য করে না।
১৪. আব্দুল্লাহ ইবনে দাউদ বলেন, আমি সুফিয়ানকে বলতে শুনেছি, “যদি কোনো ইবাদতকারীর প্রতি তার প্রতিবেশীরা সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে সে একজন মিথ্যুক।”
১৫. আতা আল-খাফাফ বলেন, আমি সুফিয়ান আস-সাওরীর সাথে যখনই দেখা করেছি, তখনই তাকে কাঁদতে দেখেছি। আমি তাকে বললাম, আপনার কী হয়েছে? তিনি বললেন, আমি ভয় পাই যে, আমি আল-কুরআনে দুর্ভাগাদের মধ্যে লিখিত আছি কি না!
১৬. আব্দুল আজিজ ইবনে আবু খালিদ (রহ.) বলেন, সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.) গাধিরিয় অঞ্চলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে এক ব্যক্তি কিছু কথা বলছিলেন, যার মাধ্যমে মানুষ হাসাচ্ছিলেন। তখন সুফিয়ান (রহ.) তাকে বললেন, ‘শাইখ, আপনি কি জানেন না যে, আল্লাহর এমন একটি দিন রয়েছে, যেদিন মিথ্যা ও ব্যর্থতায় লিপ্তরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে?’ এরপর থেকে সেই উপদেশ ও প্রভাব গাধিরিয় ঐ ব্যক্তির মধ্যে এমনভাবে প্রকাশিত হয়েছিল যে, তা তার মধ্যে আজীবন থেকে গিয়েছিল যতক্ষণ না তিনি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করেন।
১৭. সওয়াব ধৈর্যের পরিমাণ অনুযায়ী হয়।
১৮. এক ব্যক্তি সুফিয়ানকে বললেন, আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন, দুনিয়ার জন্য ততটুকু কাজ করো যতটুকু সময় তুমি তাতে থাকবে, আর আখিরাতের জন্য ততটুকু কাজ করো যতটুকু সময় তুমি তাতে থাকবে। আর এটাই আমার উপদেশ।
১৯. দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য একজন ভালো বন্ধুর চেয়ে উপকারী আর কিছু পাইনি।
২০. আল-ফিরিয়াবী বলেন, সুফিয়ান আস-সাওরী সালাত আদায় করতেন, তারপর তরুণদের দিকে ফিরে বলতেন, যদি তোমরা আজ সালাত আদায় না করো, তাহলে আর কবে করবে?।
২১. সুফিয়ানকে বলা হলো, যদি আপনি একটু দোয়া করতেন। তিনি বললেন, গুনাহ ত্যাগ করাই দোয়া।
২২. তিনি প্রায়শই চিন্তামগ্ন থাকতেন, আর যারা তাকে দেখত, তারা ভাবত তিনি পাগল। তার পকেটে একটি কাগজের টুকরা থাকত যা তিনি প্রায়ই দেখতেন। এটি একবার তার কাছ থেকে পড়ে গেল। লোকেরা এটি দেখল এবং তাতে লেখা ছিল, “সুফিয়ান, আল্লাহর সামনে তোমার দাঁড়ানোর কথা স্মরণ করো।”
২৩. আমি তার জন্য অবাক হই, যার মধ্যে কল্যাণ আছে অথচ সে খুশি হয় না। আমি তার জন্য অবাক হই, যার মধ্যে মন্দ আছে আর সে তাতেই থাকে, রাগান্বিত হয় না। এর চেয়েও বেশি অবাক হই তার জন্য, যে নিজেকে মানুষের চেয়ে বেশি ভালোবাসে এবং মানুষের উপর মিথ্যা ধারণা করে তাদের রাগান্বিত করে।১৯
২৪. আলী ইবনে উসাম ইবনে আলী বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, তিনি সুফিয়ান সাওরীকে বলতে শুনেছেন—“আমি আল্লাহকে এমন ভয় করেছি যে অবাক হই কীভাবে আমি এখনো মারা যাইনি! কিন্তু আমার তো একটি নির্দিষ্ট সময় আছে, যেটিতে আমি পৌঁছবই। আমি আল্লাহকে এত ভয় করেছি যে, মাঝে মাঝে কামনা করি— ইশ, যদি তিনি আমার ভয়ের কিছুটা হালকা করে দিতেন। আমি আশঙ্কা করি, এই ভয়ে আমার বুদ্ধি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”
২৫. আবদুর রহমান ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, সুফিয়ান সাওরী বলেছেন,“আমি রাতে কোনো আওয়াজ শুনলে হাত মাথার ওপর রাখি আর বলি, আমাদের ওপর শাস্তি এসে গেছে!”
২৬. সানী বলেন, আমর ইবনে আত্তাবী, সুফিয়ান সাওরী থেকে বর্ণনা করেছেন,“কোনো অবস্থাই আমার কাছে মৃত্যুযন্ত্রণার চেয়ে ভয়ঙ্কর নয়। আমি আশঙ্কা করি, মৃত্যু যখন আসবে তখন তা আমার জন্য কঠিন করে দেয়া হবে। আমি আল্লাহর কাছে সহজ করার দোয়া করি, কিন্তু যদি তা কবুল না হয়, তখন আমি পরীক্ষায় পড়ে যাব।”
২৭. সালেহ ইবনে খলিফা আল-কুফি বলেন, আমি সুফিয়ান সাওরীকে বলতে শুনেছি,“কিছু অধার্মিক ক্বারী কোরআনকে দুনিয়া অর্জনের সিঁড়ি বানিয়েছে। তারা বলে, ‘আমরা তো রাজা-আমিরদের কাছে যাই, বন্দিদের মুক্ত করি, বিপদগ্রস্তদের উপশম দেই।’অথচ এর পেছনে তাদের উদ্দেশ্য দুনিয়াবী স্বার্থ।”২০
২৮. ইয়াহইয়া আল-কাত্তান বলেন,“আমি সুফিয়ানকে বলতে শুনেছি, ‘সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি হলো সেই, যে আখিরাতের আমলের দ্বারা দুনিয়ার স্বার্থ হাসিল করে।”
২৯. “যখন দিনের আলো আছে, তখন আমল করতে হবে।”
৩০.“কোনো ব্যক্তি যদি অন্যের থালায় হাত দেয়, তবে সে তার কাছে লাঞ্ছিত হয়।”
৩১. তিনি প্রায়ই বলতেন: اللهم سلم سلم، اللهم سلمنا، وارزقنا العافية في الدنيا والآخرة
(হে আল্লাহ, নিরাপদ রাখুন, আমাদের নিরাপদ রাখুন এবং দুনিয়া-আখিরাতে আমাদের সুস্থতা দান করুন)।
৩২. ইয়াহইয়া ইবনে ইয়ামান বলেন, সুফিয়ান বলতেন,“আমার কাছে অন্য কারও চেয়ে বেশি অপছন্দের সঙ্গী হলো কুরআন পাঠক (যারা শুধুই প্রদর্শন করে), আর আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো যুবকের সঙ্গ।”
৩৩. ওয়াকী বর্ণনা করেন, সুফিয়ান বলতেন,“জুহদ মানে শক্ত খাবার খাওয়া বা রুক্ষ কাপড় পরা নয়, বরং জুহদ হলো স্বল্প আশা রাখা এবং মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা।”
৩৪. ধন-সম্পদ হলো এই উম্মাহর রোগ, আর আলেম হলো এই উম্মাহর চিকিৎসক। কিন্তু যদি চিকিৎসক নিজেই রোগে আক্রান্ত হয়, তবে মানুষ সুস্থ হবে কীভাবে?”
৩৫. সুফিয়ান বলতেন,“নিয়তের সাথে ইলম অর্জনের চেয়ে উত্তম কিছু আমরা জানি না।”
৩৬. খুরায়বী সুফিয়ান থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহর অসন্তুষ্টিকে তিন জায়গায় ভয় করো।
ক. আল্লাহ যা আদেশ করেছেন, তা পালনে অবহেলা করা।
খ. আল্লাহ যা তোমাকে দিয়েছেন, তাতে অসন্তুষ্ট হওয়া।
গ. দুনিয়া থেকে কিছু চাইলে তা না পেয়ে রাগান্বিত হওয়া।
৩৬. খালিদ ইবনে নিযার আল-আইলী বলেন, সুফিয়ান বলতেন,“জুহদ দুই প্রকার—
ফরজ জুহদ: অহংকার, গর্ব, রিয়া, লোক দেখানো ও আত্মপ্রশংসা ত্যাগ করা।
নফল জুহদ: আল্লাহ তোমাকে যে হালাল দিয়েছেন, তার কিছুটা ত্যাগ করা। তবে যদি ত্যাগ করো, তবে শুধু আল্লাহর জন্যই করবে।”২১
ইন্তেকাল:
হজরত সুফিয়ান সাওরী (রহ.) ১৬১ হিজরিতে (আল-মাহদীর খিলাফতে) বসরায় ইন্তেকাল করেন।২২
আবু নুয়াইম আল-ফাদল ইবনে দুকাইনের বর্ণনা,“সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.)-এর সামনে যখন মৃত্যুর কথা উঠত, তখন কয়েকদিন পর্যন্ত তাঁর থেকে উপকার পাওয়া যেত না (অর্থাৎ তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে যেতেন, কারো সাথে কথা বলতেন না, শিক্ষা-দীক্ষা বন্ধ থাকত)। আর যখন তাঁর কাছে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করা হত, তিনি বলতেন, ‘আমি জানি না, আমি জানি না।”
আবদুর রহমান ইবনে মাহদী (রহ.) বলেন,“যখন সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.) ইন্তিকাল করলেন, তখন শাসকগণের (ভয়ে) আমরা তাঁকে রাতে বের করেছিলাম এবং রাতেই বহন করেছিলাম। কিন্তু সেই জানাযায় মানুষের ভিড় দেখে আমাদের কাছে রাতকে দিন থেকে আলাদা মনে হয়নি (অর্থাৎ এত মানুষ এসেছিল যে, রাতটা দিনের মতোই উজ্জ্বল মনে হচ্ছিল)।”
আবদুর রহমান ইবনে মাহদী (রহ.) বলেন,“যখন আমি সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.)-কে গোসল দিই, তখন তাঁর শরীরে লেখা দেখতে পাই— فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ‘আল্লাহই তোমার জন্য তাদের মোকাবিলায় যথেষ্ট হবেন।”
আরিম বলেছেন, আমি আবু মনসুরের (অর্থাৎ বিশর ইবনে মনসুর আস-সুলাইমী) কাছে গিয়েছিলাম। সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.) বসরায় তাঁর ঘরেই ইন্তিকাল করেছিলেন। বিশর বললেন,“সুফিয়ান এই ঘরেই মৃত্যুবরণ করেছেন। এই ঘরে আমার ছেলের একটি বুলবুল পাখি ছিল। সুফিয়ান (রহ.) বললেন, ‘এই পাখিটিকে কেন বন্দি করে রাখা হয়েছে? এটাকে যদি ছেড়ে দেওয়া হতো!’ আমি বললাম, ‘এটা তো আমার ছেলের। তবে সে আপনাকে এটা উপহার হিসেবে দিচ্ছে।’
তিনি বললেন, ‘না, আমি এটাকে এক দিনার দিয়ে কিনে নেব।’
তখন আমি তা এক দিনারের বিনিময়ে তাঁকে দিলাম, আর তিনি সেটিকে মুক্ত করে দিলেন।
এরপর থেকে পাখিটি দিনে বাইরে যেত, চারণভূমিতে ঘুরে বেড়াত, আর বিকেলে ফিরে এসে ঘরের এক কোণে অবস্থান করত। কিন্তু যখন সুফিয়ান (রহ.) মৃত্যুবরণ করলেন, তখন সেই পাখিটি তাঁর জানাযার সঙ্গে গেল এবং তাঁর কবরের উপর ছটফট করতে লাগল। পরবর্তী দিনগুলোতেও মাঝে মাঝে সে কবরের কাছে চলে আসত। কখনো কখনো সেখানে রাত কাটাত, কখনো আবার ফিরে যেত ঘরে। শেষ পর্যন্ত একদিন তারা তাকে সুফিয়ানের কবরের পাশে মৃত অবস্থায় পেল, এরপর তাকে সুফিয়ানের কবরের পাশে কবর দেওয়া হলো।”
ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ (রহ.) বলেন,“আমি স্বপ্নে সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.)-কে দেখলাম। আমি তাঁর বুকে তাকালাম, দেখি তাঁর বুকে দুটি স্থানে লেখা আছে— فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ‘আল্লাহই তোমার জন্য তাদের মোকাবিলায় যথেষ্ট হবেন।’ (সূরা আল-বাকারা: ১৩৭)”
সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা বলেন, আমি স্বপ্নে সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.)-কে দেখলাম। আমি তাঁকে বললাম, আমাকে উপদেশ দিন।
তিনি বললেন: মানুষের সাথে মেলামেশা কম করো।
আমি বললাম, আরও কিছু বলুন।
তিনি বললেন, ‘তুমি অচিরেই (আখিরাতে) আসবে, তখন নিজেই জানতে পারবে।
উসমান ইবনে যায়দাহ বলেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে। সেখানে দেখি সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.) গাছ থেকে গাছে উড়ে বেড়াচ্ছেন এবং বলছেন— تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ অর্থাৎ— ‘এ পরকালীন গৃহ আমরা তাদের জন্য বানিয়ে রাখি, যারা দুনিয়ায় অহংকার করতে চায় না এবং ফ্যাসাদ সৃষ্টি করতে চায় না। আর পরিণাম তো মুত্তাকিদের জন্যই।’(সুরা কাসাস: ৮৩)”২৩
আবু আবজার থেকে বর্ণিত, যখন সুফিয়ান (রহ.)-এর মৃত্যু উপস্থিত হলো, তিনি আমাকে বললেন,
‘হে ইবনে আবজার, তুমি তো আমার অবস্থা দেখছো, এখন দেখো কারা আমাকে দেখতে আসছে।’
আমি কিছু লোককে নিয়ে এলাম, যাদের মধ্যে হাম্মাদ ইবনে সালামা ছিলেন। তিনি সুফিয়ানের মাথার কাছে সবচেয়ে নিকটবর্তী অবস্থান নিলেন। সুফিয়ান নিঃশ্বাস ফেললেন। তখন হাম্মাদ বললেন, ‘সুসংবাদ গ্রহণ করুন, আপনি তো সেই ভয় থেকে মুক্তি পেলেন যেটিতে আপনি সবসময় আশঙ্কা করতেন। এখন আপনি এক মহান রবের দিকে যাচ্ছেন।’সুফিয়ান বললেন, ‘হে আবু সালমা, আপনি কি মনে করেন আল্লাহ আমার মতো একজনকে ক্ষমা করবেন?’ হাম্মাদ বললেন, ‘হ্যাঁ, আল্লাহর কসম, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই!’ এ কথা শোনার সাথেসাথেই তাঁর দুশ্চিন্তা হালকা হয়ে গেল।”
আবদুর রহমান ইবনে মাহদী বলেন,“যে রাতে সুফিয়ান (রহ.) ইন্তেকাল করলেন, সেদিন তিনি নামাজের জন্য ষাটবার অজু করলেন। ভোরে তিনি আমাকে বললেন, ‘হে ইবনে মাহদী, আমার গাল মাটিতে রাখো। কারণ আমি এখন মরতে চলেছি। হে ইবনে মাহদী, মৃত্যু কত কঠিন! মৃত্যুযন্ত্রণা কত ভয়ঙ্কর!’ আমি বাইরে বের হলাম হাম্মাদ ইবনে যায়দ ও তাঁর সাথিদের খবর দিতে। দেখি তারা ইতোমধ্যেই আমাকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে এবং বলছে, ‘আল্লাহ তোমাকে সওয়াব দিন।’আমি বললাম, ‘তোমরা কিভাবে জানলে?’ তারা বলল, ‘আমাদের প্রত্যেককে গতরাতে স্বপ্নে জানানো হয়েছে— জেনে রাখো, সুফিয়ান আস-সাওরী ইন্তেকাল করেছেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।
আবদুর রহমান ইবনে মাহদী বলেন, “আমি স্বপ্নে সুফিয়ান সাওরীকে দেখলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আল্লাহ আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন?’ তিনি বললেন,‘আমাকে কবরস্থ করা মাত্রই আমি আল্লাহর সামনে হাজির হলাম। তিনি আমার সহজ হিসাব নিলেন, তারপর জান্নাতের দিকে নির্দেশ দিলেন। আমি জান্নাতের বাগান ও নদীর মধ্যে ঘুরছিলাম। কোথাও কোনো শব্দ বা নড়াচড়া শুনতে পাচ্ছিলাম না। হঠাৎ একজন ঘোষক বলল,“হে সুফিয়ান ইবনে সাঈদ, তুমি কি কোনোদিন নিজের প্রবৃত্তির চেয়ে আল্লাহকে প্রাধান্য দিয়েছিলে?” আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, আল্লাহর কসম।’ তখনই পুরো জান্নাত থেকে নানা প্রকার নেয়ামতের থালা আমাকে ঘিরে ধরল।”২৪