হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম। একাধারে মুহাদ্দিস, ফকিহ, মুজাহিদ ও জাহিদ। তবে তাবেয়িদের সেই স্বর্ণযুগে তিনি ছিলেন শীর্ষস্থানীয় আলিম, যাঁকে সমকালীন উলামায়ে কিরাম সম্মানিত করেছেন ‘ইমামুল হুদা’, ‘শাইখুল ইসলাম’, ‘আমীরুল মু’মিনীন ফিল হাদীস’ প্রভৃতি মর্যাদাপূর্ণ উপাধিতে। তিনি শুধু বিশ্বস্ত মুহাদ্দিস ও ফকিহ নন; বরং ছিলেন যুগের শ্রেষ্ঠ জাহিদ (দুনিয়াবিমুখ) ও আবিদ (অধ্যবসায়ী ইবাদতকারী)। জ্ঞানের তৃষ্ণায় তিনি ভ্রমণ করেছেন দিগ-দিগন্তে, দেশে-বিদেশে; আর আত্মশুদ্ধির পথে নিজেকে গড়ে তুলেছেন পরিপূর্ণ এক আল্লাহভীরু বান্দা হিসেবে। তাঁর রচনাসমূহও তাঁর অন্তরের সেই আধ্যাত্মিক গভীরতার সাক্ষ্য বহন করে। বিশেষত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাবুল-জুহদ ওয়া আর-রাক্বায়িক’ তাঁর জুহদ, তাকওয়া এবং আখিরাতমুখী চিন্তার এক উজ্জ্বল দলিল।
জন্ম ও পরিচয়:
তাঁর নাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক ইবনে ওয়াদ্বিহ, উপাধি ছিল— ইমাম, শায়খুল ইসলাম, আলিমু যামানিহি (তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ আলিম), আমিরুল আত্বকিয়ায়ি ফি ওয়াকতিহি (তাঁর যুগের পরহেযগারদের নেতা)। উপনাম আবু আবদুর রহমান আল-হানযালী, তিনি ছিলেন তাদের (হানযালা গোত্রের) মুক্তদাস (মাওলা)। তিনি ছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভূত, তারপর মারওয়াজী (মার্ভের অধিবাসী)। তিনি ছিলেন হাফিজ, গাজি (যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী) এবং অন্যতম মহান ব্যক্তিত্ব। আর তাঁর বাবা ছিলেন তুর্কি। তাঁর বাবা হামাদান-এর বনু হানযালা গোত্রের একজন বণিকের দাস ছিলেন। তাঁর মা ছিলেন খোয়ারিজমিয়া (খোরাসানের খোয়ারিজম অঞ্চলের)। তাঁর জন্ম হয় ১১৮ হিজরিতে (৭১৪-৭১৫ খ্রিষ্টাব্দ)।১
জ্ঞানার্জন:
বিশ বছর বয়সে তিনি জ্ঞান অন্বেষণ শুরু করেন। প্রথমে যে শায়খের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন, তিনি হলেন রাবি ইবনে আনাস আল-খোরাসানী। কৌশল করে তিনি তাঁর সাথে কারাগারে প্রবেশ করেন এবং তাঁর থেকে প্রায় চল্লিশটি হাদিস শোনেন। এরপর ১৪১ হিজরিতে তিনি ভ্রমণ শুরু করেন এবং তাবিয়ীনদের মধ্যে যারা জীবিত ছিলেন তাদের কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করেন। তিনি জ্ঞান অন্বেষণ, জিহাদ, ব্যবসা এবং আল্লাহর ওয়াস্তে ভাইদের জন্য খরচ করা ও তাদের নিজের সঙ্গে হজে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রচুর ভ্রমণ করেন, এমনকি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই কাজগুলো চালিয়ে যান।২
শায়খগণ:
তিনি যাদের থেকে ইলম অর্জন করেছেন এবং হাদিস শুনেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— সুলাইমান আত-তাইমী, আসিম আল-আহওয়াল, হুমাইদ আত-তাউইল, হিশাম ইবনে উরওয়া, আল-জুরাইরী, ইসমাঈল ইবনে আবী খালিদ, আল-আ’মাশ, বুরাইদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আবী বুরদাহ, খালিদ আল-হাযযা, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-আনসারী, আব্দুল্লাহ ইবনে আউন, মূসা ইবনে উকবা, আজলাহ আল-কিন্দি, হুসাইন আল-মুআল্লিম, হানযালা আস-সাদূসী, হাইওয়াহ ইবনে শুরাইহ আল-মিসরী, কাহমাস, আল-আওযাঈ, ইমাম আবু হানিফা, ইবনে জুরাইজ, মা’মার, আস-সাওরী, শু’বা, ইবনে আবি যি’ব, ইউনুস আল-আইলী, দুই হাম্মাদ (হাম্মাদ ইবনে যায়েদ ও হাম্মাদ ইবনে সালামা), মালিক, আল-লাইস, ইবনে লাহীআ, হুশাইম, ইসমাঈল ইবনে আইয়াশ, ইবনে উয়াইনাহ, বাকিয়্যাহ ইবনুল ওয়ালীদ, এবং আরো অসংখ্য শায়খ।৩
ছাত্রবৃন্দ:
ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ও ব্যক্তিত্বদের থেকে হাদিস ও জ্ঞান অর্জন করেছিলেন এবং বহু খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব তাঁর ছাত্র ছিলেন। তাঁর শায়খ এবং সমসাময়িকদের মধ্যে যারা তাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— সুফিয়ান আস-সাওরী, মা‘মার ইবনে রাশিদ, আবু ইসহাক আল-ফাযারী, জা’ফর ইবনে সুলাইমান আদ-দুবায়ী, বাকিয়্যাহ ইবনুল ওয়ালীদ, দাউদ ইবনে আব্দুর রহমান আল-আত্তার, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ, আবু আল-আহওয়াস, ফুদ্বাইল ইবনে ইয়াদ্ব, মু’তামির ইবনে সুলাইমান, আল-ওয়ালীদ ইবনে মুসলিম, এবং আবু বকর ইবনে আইয়াশ। অন্যদিকে, তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান অর্জনকারী পরবর্তী প্রজন্মের ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন অসংখ্য বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ। এই ছাত্রদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন: মুসলিম ইবনে ইবরাহীম, আবু উসামা, আবু সালামাহ আত-তাবুযাকী, নু’আইম ইবনে হাম্মাদ, আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী, আল-কাত্তান (ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তান), ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ, এবং ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন। এছাড়া ইবরাহীম ইবনে ইসহাক আত-ত্বালিকানী, আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ মার্দাওয়াইহ, ইসমাঈল ইবনে আবান আল-ওয়াররাক, বিশ্র ইবনে মুহাম্মাদ আস-সাখতিয়ানী, হিব্বান ইবনে মূসা, আল-হাকাম ইবনে মূসা, যাকারিয়্যা ইবনে আদী, সাঈদ ইবনে সুলাইমান, আব্দুল্লাহ ইবনে উসমান আবদান, আবু বকর ও উসমান ইবনা আবী শাইবাহ, আলী ইবনুল হাসান ইবনে শাকীক, আলী ইবনে হুজর, মুহাম্মদ ইবনে আস-সালত আল-আসদী, মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে সাহম আল-আন্তাকী, আবু কুরাইব, সুওয়াইদ ইবনে নাসর এবং সর্বশেষ হুসাইন ইবনে দাউদ আল-বালখী সহ আরও বহু মানুষ তাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করে তাঁর সুবিশাল জ্ঞানের উত্তরাধিকার বহন করেছেন।৪
স্মৃতির প্রখরতা:
মুহাম্মাদ ইবনুস নযর ইবনে মুসাওয়ির বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমার বাবা আমাকে বলেছেন, আমি ইবনুল মুবারাককে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি হাদিস মুখস্থ করেন? তখন তাঁর চেহারার রং বদলে গেল এবং তিনি বললেন, ‘আমি কখনো কোনো হাদিস মুখস্থ করিনি, আমি শুধু কিতাব নেই এবং তাতে দেখি, আর যা আমার পছন্দ হয়, তা আমার হৃদয়ে গেঁথে যায়।’
হাসান ইবনে ঈসা বলেন, আমাকে ইবনুল মুবারাকের বন্ধু সাখর বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমরা তখন মক্তবের ছাত্র ছিলাম। আমি এবং ইবনুল মুবারাক যাচ্ছিলাম, তখন এক ব্যক্তি বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। তিনি খুব দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন। যখন তিনি শেষ করলেন, ইবনুল মুবারাক আমাকে বললেন, ‘আমি এটা মুখস্থ করে ফেলেছি।’ সেখানে উপস্থিত এক ব্যক্তি তা শুনে বলল, ‘বলো দেখি।’ তখন তিনি তা হুবহু বলে গেলেন!
নু’আইম ইবনে হাম্মাদ বলেন, আমি ইবনুল মুবারাককে বলতে শুনেছি, আমার বাবা আমাকে বলেছিলেন, ‘যদি তোমার কিতাবগুলো খুঁজে পাই, তবে অবশ্যই আমি তা পুড়িয়ে দেব।’ আমি বললাম, ‘তাতে আমার কী আসে যায়, যখন সেগুলো আমার সিনায় আছে?’৫
জনসাধারণের নিকট তাঁর মর্যাদা:
আশ’আস ইবনে শু’বাহ আল-মিস্সিসী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, ‘খলিফা হারুনুর রশিদ রাক্কাহ শহরে এলেন। তখন লোকজন ইবনুল মুবারাকের পিছনে এমনভাবে ছুটে গেল যে, জুতো ছিঁড়ে গেল এবং ধূলো উড়তে লাগল। আমীরুল মুমিনীন-এর এক উপপত্নী কাঠের প্রাসাদ থেকে উঁকি মেরে দেখলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এটা কীসের ভিড়? লোকেরা বলল, খোরাসানের এক জ্ঞানী ব্যক্তি এসেছেন। তিনি তখন বললেন, আল্লাহর কসম, এটাই আসল রাজত্ব, হারুনের রাজত্ব নয়; যার জন্য লোক জমায়েত করতে সৈন্য এবং সাহায্যকারীর প্রয়োজন হয়।৬
দানশীলতা ও মেহমানদারি:
মুয়াজ ইবনে খালিদ বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি ইসমাঈল ইবনে আইয়াশের নিকট আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাকের পরিচয় জানতে চাইলাম। ইসমাঈল বললেন, পৃথিবীতে ইবনুল মুবারাকের মতো আর কেউ নেই, এবং আমি জানি না আল্লাহ কল্যাণের এমন কোনো বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করেছেন কিনা, যা আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাকের মধ্যে দেননি। আমার সাথিরা আমাকে জানিয়েছে যে, তারা মিশর থেকে মক্কা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গী হয়েছিল, আর তিনি তাদের ‘খাবীস’ (মিষ্টি জাতীয় খাবার) খাওয়াতেন, অথচ তিনি নিজে সারা বছর রোজা রাখতেন।
উমর ইবনে সাঈদ আত-ত্বাঈ বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমাদের কাছে উমর ইবনে হাফস আস-সুফি মানবিজ শহরে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, ইবনুল মুবারাক যখন বাগদাদ থেকে আল-মিস্সিসাহ্ অভিমুখে যাচ্ছিলেন, তখন সুফি দরবেশদের একটি দল তাঁর সঙ্গী হলো। তিনি তাদের বললেন, তোমাদের এমন আত্মা আছে যে তোমরা নিজেদের খরচ অন্যের দ্বারা করিয়ে নিতে লজ্জা বোধ করো। হে বালক, গামলাটি আনো। এরপর তিনি গামলার ওপর একটি রুমাল রাখলেন এবং বললেন, তোমাদের প্রত্যেকে রুমালের নিচে তার সঙ্গে যা আছে, তা রেখে দাও। লোকেরা দশ দিরহাম করে রাখল, কেউ কেউ বিশ দিরহামও রাখল। তিনি আল-মিস্সিসাহ্ পর্যন্ত তাদের সবার খরচ করলেন। এরপর বললেন, এটা (মিস্সিসাহ্) তো জিহাদে বের হওয়ার দেশ। তাই যা অবশিষ্ট আছে, তা আমরা ভাগ করে নেব। তখন তিনি একেকজনকে বিশ দিনার করে দিতে লাগলেন। একজন বলল, হে আবু আবদির রহমান, আমি তো বিশ দিরহাম দিয়েছিলাম। তিনি বললেন, আল্লাহ যে গাজি ব্যক্তিকে তার খরচে বরকত দিয়েছেন, তাতে তোমার আপত্তির কী আছে?
আহমাদ ইবনুল হাসান আল-মুকরী বর্ণনা করেছেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনে আহমাদ আদ-দাওরাকীকে বলতে শুনেছি, আমি মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনুল হাসান ইবনে শাকীককে বলতে শুনেছি, আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি, ইবনুল মুবারাক যখন হজের সময় হতো, তখন মার্ভের তাঁর ভাইয়েরা তাঁর কাছে এসে বলতেন, আমরা আপনার সঙ্গী হতে চাই। তিনি বলতেন, তোমরা তোমাদের খরচের অর্থ দাও। তিনি তাদের খরচের অর্থ নিয়ে একটি বাক্সে রেখে তালাবদ্ধ করতেন। এরপর তিনি তাদের জন্য ভাড়া করতেন এবং মার্ভ থেকে বাগদাদ পর্যন্ত তাদের নিয়ে যেতেন। তিনি সবসময় তাদের জন্য খরচ করতেন এবং সেরা খাবার ও সেরা মিষ্টান্ন খাওয়াতেন।
এরপর তাদের বাগদাদ থেকে সেরা সাজসজ্জা ও পূর্ণ ভদ্রতা সহকারে বের করতেন, যতক্ষণ না তারা রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এঁর শহরে পৌঁছতেন। সেখানে তিনি প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করতেন, তোমার পরিবারের সদস্যরা মদিনার বিশেষ জিনিসপত্র থেকে কী কিনতে বলেছে? সে বলত, এই এই জিনিস। এরপর তিনি তাদের মক্কায় নিয়ে যেতেন। তারা হজ শেষ করার পর তিনি তাদের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করতেন, তোমার পরিবারের সদস্যরা মক্কার জিনিসপত্র থেকে কী কিনতে বলেছে? সে বলত, এই এই জিনিস। তিনি তাদের জন্য সেই জিনিসগুলো কিনে দিতেন। এরপর মক্কা থেকে তাদের নিয়ে বের হতেন এবং মার্ভে না পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের জন্য খরচ করতেন।
মার্ভে পৌঁছার পর তাদের বাড়ি ও দরজা চুনকাম (সংস্কার) করে দিতেন। এরপর তিন দিন পর তিনি তাদের জন্য ওয়ালিমা (ভোজ) তৈরি করতেন এবং তাদের নতুন কাপড় দিতেন। তারা খাওয়া শেষ করে ও আনন্দিত হলে, তিনি বাক্সটি ডেকে আনতেন, তালা খুলে প্রত্যেককে তার নাম লেখা থলেটি দিয়ে দিতেন। আমার বাবা বলেন, তাঁর খাদেম আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি তাঁর জীবনের শেষ সফরে একটি দাওয়াত দিয়েছিলেন, তাতে লোকদের সামনে ২৫টি বড় থালা ফালুদা পরিবেশন করেছিলেন। আমাদের কাছে খবর পৌঁছেছে যে, তিনি ফুজাইল ইবনে ইয়াজ-কে বলেছিলেন, যদি আপনি এবং আপনার সাথিরা না থাকতেন, তবে আমি ব্যবসা করতাম না। আর তিনি প্রতি বছর দরিদ্রদের জন্য এক লাখ দিরহাম খরচ করতেন।
আলী ইবনে খাশরাম বলেন, আমাকে সালামাহ ইবনে সুলাইমান বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি ইবনুল মুবারাকের কাছে এসে তার ঋণ পরিশোধের জন্য অনুরোধ করল। তিনি তার এক প্রতিনিধির কাছে একটি চিঠি লিখলেন। যখন লোকটি চিঠি নিয়ে গেল, তখন প্রতিনিধি তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কত ঋণ পরিশোধের জন্য অনুরোধ করেছিলেন? লোকটি বলল, সাতশো দিরহাম। কিন্তু আব্দুল্লাহ চিঠিতে তাকে সাত হাজার দিরহাম দেওয়ার জন্য লিখেছিলেন। প্রতিনিধি তাঁকে চিঠিটি ফিরিয়ে দিল এবং বলল, ফসলের আয় তো শেষ হয়ে গেছে। তখন আব্দুল্লাহ তাকে লিখে পাঠালেন, যদি ফসলের আয় শেষ হয়ে যায়, তবে আমার জীবনও তো ফুরিয়ে যাচ্ছে। অতএব, আমার কলম যা লিখেছে, তা তাকে দিয়ে দাও।
মুহাম্মাদ ইবনুল মুনযির বলেন, আমাকে ইয়াকুব ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমাকে মুহাম্মাদ ইবনে ঈসা বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, ইবনুল মুবারাক ঘন ঘন ত্বারসুস (সীমান্ত অঞ্চল) যাতায়াত করতেন, এবং আল-রাক্কাহ শহরের একটি সরাইখানায় অবস্থান করতেন। এক যুবক তাঁর কাছে আসা-যাওয়া করত, তাঁর কাজকর্মে সহযোগিতা করত এবং তাঁর কাছ থেকে হাদিস শুনত। একবার আব্দুল্লাহ (ত্বারুসুস থেকে) এসে তাকে দেখলেন না। তিনি জিহাদের জন্য দ্রুত যাত্রা করলেন। ফিরে এসে তিনি যুবকটির খোঁজ করলেন।
লোকেরা বলল, দশ হাজার দিরহাম ঋণের কারণে সে জেলে বন্দি। তিনি ঋণদাতার সন্ধান করলেন, তাকে দশ হাজার দিরহাম ওজন করে দিলেন এবং তাকে শপথ করালেন যেন জীবদ্দশায় সে কাউকে এ-কথা না জানায়। এরপর যুবকটিকে মুক্তি দেওয়া হলো, আর ইবনুল মুবারাক তাঁর সফর শুরু করলেন। আল-রাক্কাহ থেকে দুই দিনের পথের দূরত্বে যুবকটি তাঁর কাছে এসে পৌঁছাল। তিনি তাকে বললেন, হে যুবক, তুমি কোথায় ছিলে? আমি তোমাকে দেখিনি। সে বলল, হে আবু আবদির রহমান, আমি ঋণের কারণে বন্দি ছিলাম। তিনি বললেন, কীভাবে মুক্তি পেলে? সে বলল, এক ব্যক্তি এসে আমার ঋণ পরিশোধ করে দিয়েছে, কিন্তু আমি জানি না সে কে। তিনি বললেন, তাহলে আল্লাহর প্রশংসা করো। আব্দুল্লাহর মৃত্যুর পরই কেবল লোকটি জানতে পারল যে, ইবনুল মুবারাকই তার ঋণ পরিশোধ করেছিলেন।৭
ইবাদত ও আল্লাহভীতি:
ক্বাতান ইবনে সাঈদ বলেন, ‘ইবনুল মুবারাক কখনও ইফতার করতেন না, এবং তাঁকে কখনও ঘুমাতে দেখা যায়নি।’ (অর্থাৎ, তিনি এত গোপনে রোজা রাখতেন এবং রাতে ইবাদত করতেন যে, কেউ তা জানতে পারত না)।
আলী ইবনে আল-হাসান ইবনে শাকীক বলেন, আমি ইবনুল মুবারককে বলতে শুনেছি, ‘একটি সন্দেহযুক্ত দিরহাম (মুদ্রা) ফিরিয়ে দেওয়া আমার কাছে এক লক্ষ, এক লক্ষ, এমনকি ছয় লক্ষ দিরহাম সাদাকা করার চেয়েও বেশি প্রিয়।’৮
মুহাম্মাদ ইবনুল ওয়াযীর (যিনি ইবনুল মুবারাকের ওয়াছি অর্থাৎ যার কাছে উপদেশ রাখতেন বা দায়িত্ব দিয়েছিলেন) বলেন, আমি আব্দুল্লাহর সাথে এক কাফেলায় ছিলাম। আমরা রাতে এক স্থানে পৌঁছলাম, যেখানে বিপদের ভয় ছিল। তিনি বললেন, ইবনুল মুবারাক নামলেন এবং তাঁর সওয়ারীতে চড়লেন। যখন আমরা সেই স্থানটি অতিক্রম করে একটি নদীর কাছে পৌঁছলাম, তখন তিনি তাঁর সওয়ারী থেকে নামলেন এবং আমি একা (অন্য দিকে) চলে গেলাম ও শুয়ে পড়লাম। তিনি তখন অজু করতে লাগলেন এবং ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করতে থাকলেন, আর আমি তাঁকে দেখছিলাম। যখন ফজর উদিত হলো, তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘ওঠো, অজু করো।’ আমি বললাম, ‘আমি অজু অবস্থাতেই আছি।’ তখন তিনি দুঃখিত হলেন, কারণ আমি যে তাঁর রাতের সালাত সম্পর্কে অবগত হয়েছি। এরপর তিনি আমার সাথে আর কথা বললেন না, যতক্ষণ না দুপুর হলো এবং আমি তাঁর সাথে গন্তব্যে পৌঁছলাম।
ক্বাসিম ইবনে মুহাম্মাদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ইবনুল মুবারাকের সাথে সফর করতাম, এবং প্রায়শই আমার মনে এই চিন্তা আসত যে, এই লোকটি আমাদের চেয়ে কোন গুণে শ্রেষ্ঠ হলো যে সে মানুষের মধ্যে এত খ্যাতি অর্জন করেছে? যদি সে সালাত আদায় করে, তবে আমরাও তো করি। যদি সে রোজা রাখে, তবে আমরাও তো রাখি। যদি সে জিহাদ করে, তবে আমরাও তো করি। আর যদি সে হজ করে, তবে আমরাও তো করি।
তিনি বলেন, একদিন আমরা শামের পথে সফর করছিলাম, রাতে এক বাড়িতে রাতের খাবার খাচ্ছিলাম, এমন সময় প্রদীপটি নিভে গেল। আমাদের মধ্যে একজন উঠে প্রদীপটি নিয়ে বাইরে গেল আলো আনার জন্য। সে অল্প কিছুক্ষণ থাকার পর প্রদীপটি নিয়ে ফিরে এল। আমি তখন ইবনুল মুবারাকের চেহারার দিকে তাকালাম এবং দেখলাম তাঁর দাড়ি অশ্রুতে ভিজে গেছে। তখন আমি মনে মনে বললাম, এই খাশিয়্যতের (আল্লাহর ভয়ের) কারণে এই লোকটি আমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছেন। হয়তো প্রদীপ নিভে যাওয়ায় অন্ধকার হওয়ার কারণে তিনি কিয়ামতের দিনের কথা স্মরণ করেছিলেন।
আল-মারওয়াযী বলেন, আমি আবু আব্দুল্লাহ আহমাদ ইবনে হাম্বলকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আল্লাহ ইবনুল মুবারাককে কেবল তাঁর গোপন ইবাদতের কারণেই উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন।৯
জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:
আলী ইবনুল ফুজাইল বর্ণনা করেছেন, আমি আমার বাবাকে (ফুদ্বাইল ইবনে ইয়াদ্বকে) ইবনুল মুবারাককে বলতে শুনেছি, আপনি আমাদেরকে দুনিয়াত্যাগ (জুহদ), পরিমিতিবোধ ও অল্পে সন্তুষ্ট থাকার আদেশ দেন, অথচ আমরা আপনাকে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে দেখি। এটা কেমন? ইবনুল মুবারাক বললেন, হে আবু আলী, আমি এটা করি যাতে আমার মুখ (মানুষের কাছে) সুরক্ষিত থাকে, আমার সম্মান অক্ষুণ্ণ থাকে এবং এর মাধ্যমে আমি আমার রবের আনুগত্যে সাহায্য নিতে পারি। ফুজাইল বললেন, হে ইবনুল মুবারাক, যদি আপনি এই অবস্থায় টিকে থাকতে পারেন, তবে তা কতই না সুন্দর!১০
হুসাইন ইবনে আল-হাসান আল-মারওয়াযী বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক বলেছেন, তোমার উচিত হলো নিজেকে অজ্ঞাত রাখার প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা, খ্যাতিকে অপছন্দ করা এবং নিজেকে প্রকাশ না করা যে তুমি বিনয় বা দুনিয়াত্যাগের পথে আছো। কেননা, তোমার নিজেকে দুনিয়াত্যাগী বলে দাবি করাই হলো দুনিয়াত্যাগ থেকে বের হয়ে যাওয়া, কারণ এতে তুমি তোমার দিকে প্রশংসা ও গুণগান টেনে আনছ।১১
বীরত্ব:
আবু হাতিম আর-রাযী বলেন, আমাদের কাছে আবদাহ ইবনে সুলাইমান আল-মারওয়াযী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমরা ইবনুল মুবারাকের সাথে রোমের ভূমিতে একটি সামরিক অভিযানে ছিলাম। আমরা শত্রুর সম্মুখীন হলাম। যখন দুই দল মুখোমুখি হলো, তখন শত্রুদের মধ্য থেকে একজন ব্যক্তি দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য আহ্বান জানাল। এক ব্যক্তি তার মোকাবিলায় বের হয়ে তাকে হত্যা করল। এরপর আরও একজন বের হলো এবং তাকেও হত্যা করল, তারপর আরও একজন বের হলো এবং তাকেও হত্যা করল।
এরপর সে আবার দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান জানালে একজন ব্যক্তি বের হয়ে কিছু সময় ঘোড়া দৌড়ানোর পর তাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করল। লোকেরা তার দিকে ভিড় করল। আমি দেখলাম, সে আর কেউ নয়, তিনি ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক। তিনি তাঁর মুখ আস্তিন দিয়ে ঢেকে রেখেছিলেন। আমি তাঁর আস্তিনের প্রান্ত ধরে টান দিলাম। দেখলাম, তিনি নিজেই। তিনি বললেন, ‘আর আপনিও, হে আবু আমর, তাদের মধ্যে যারা আমাদের নিন্দা করে!’ (অর্থাৎ তাঁর বীরত্ব প্রকাশ করে তাঁকে সমালোচিত করে)।১২
বিশেষ গুণাবলি:
হাসান ইবনে ঈসা ইবনে মাসারজিস (ইবনুল মুবারাকের মুক্ত করা গোলাম) বলেন, ফাদল ইবনে মুসা ও মাখলাদ ইবনুল হুসাইনের মতো একদল লোক একত্রিত হলেন এবং বললেন— এসো, আমরা কল্যাণের দরজা অনুযায়ী ইবনুল মুবারাকের গুণাবলি গণনা করি। তারা গণনা করে বললেন, ইলম, ফিকহ, আদব (সাহিত্য), নাহু (ব্যাকরণ), লুগাহ (ভাষা), জুহদ (দুনিয়াত্যাগ), ফাসাহাহ (বাগ্মিতা), শায়রি (কবিতা), কিয়ামুল লাইল (রাতে ইবাদত), ইবাদত, হজ, গাজি (জিহাদের ময়দানে বিজয়ী বীর), শুজাআহ (সাহসিকতা), ফুরুসিয়্যাহ (অশ্বচালনা), শক্তি, অপ্রয়োজনীয় কথা পরিহার, ইনসাফ (ন্যায়বিচার), এবং তাঁর সঙ্গীদের সাথে কম মতভেদ।১৩
ইবনে আসাকির আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, ‘আমি ইবনুল মুবারাকের মতো কাউকে দেখিনি।’ বর্ণনাকারী বলেন, তখন ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তান তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সুফিয়ান আস-সাওরী বা শু’বাহ-এর মতোও না?’ তিনি বললেন, ‘সুফিয়ান বা শু’বাহ-এর মতোও না! ইবনুল মুবারাক তাঁর জ্ঞানে ছিলেন ফকিহ , হাফিজ , জাহিদ (দুনিয়াত্যাগী), আবিদ (ইবাদতকারী), ধনী, হাজ্জাজ (বারবার হজ পালনকারী), গাজি (ধর্মযোদ্ধা), নাহ্উয়ী (ব্যাকরণবিদ) এবং শায়ের (কবি)। আমি তাঁর মতো কাউকে দেখিনি।’
আব্দুল আজিজ ইবনে আবী রিযমাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘কল্যাণের এমন কোনো গুণ ছিল না, যা আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাকের মধ্যে একত্রিত হয়নি; যেমন: লজ্জা, উদারতা, সচ্চরিত্রতা, উত্তম সাহচর্য, জুহদ (দুনিয়াত্যাগ), ওয়ারা (পরহেজগারিতা) ইত্যাদি।
আন-নাসায়ী বলেছেন, আমরা ইবনুল মুবারাকের যুগে ইবনুল মুবারাকের চেয়ে বেশি সম্মানিত (আজাল) বা তাঁর চেয়ে বেশি উচ্চ মর্যাদাশীল (আ’লা) কাউকে জানি না, এবং তাঁর চেয়ে বেশি প্রশংসনীয় গুণে সমৃদ্ধ আর কাউকে জানি না।
হাফেজ ইবনে হাজার আল-আসকালানী বলেছেন, ‘তিনি ছিলেন সিকাহ (বিশ্বস্ত), ছাবিত (দৃঢ়), ফকিহ (আইনজ্ঞ), আলিম (জ্ঞানী), জাওয়াদ (দানশীল) এবং মুজাহিদ (ধর্মযোদ্ধা)। তাঁর মধ্যে সমস্ত কল্যাণের গুণাবলি একত্রিত হয়েছিল।’
কারামাত:
আব্বাস ইবনে মুসআব বলেন, আমার কিছু সাথি আমাকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি আবু ওয়াহবকে বলতে শুনেছি, ইবনুল মুবারাক এক অন্ধ ব্যক্তির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকটি তাঁকে বলল, আমি আপনাকে অনুরোধ করছি যে, আপনি আমার জন্য দোয়া করুন যেন আল্লাহ আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে দেন। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, আর আমি দেখতে পেলাম যে আল্লাহ তার দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছেন।
হাতীম ইবনুল জাররাহ বলেন, আমি আলী ইবনুল হাসান ইবনে শাকীককে বলতে শুনেছি, তিনি ইবনুল মুবারাককে বলতে শুনেছেন, এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করল যে, সাত বছর ধরে তার হাঁটুর গাঁটে একটি ক্ষত (ফোড়া) হয়েছে, সে বিভিন্ন চিকিৎসা করেছে এবং ডাক্তারদের কাছেও গিয়েছে, কিন্তু কোনো উপকার হয়নি। তিনি তাকে বললেন, ‘যাও, পানির প্রয়োজন আছে এমন জায়গায় একটি কূপ খনন করো। আমি আশা করি সেখানে একটি ঝর্ণা প্রবাহিত হবে এবং তোমার রক্তক্ষরণ বন্ধ হবে।’ লোকটি তাই করল এবং সে সুস্থ হয়ে গেল।১৫
বাণী ও নসিহত:
হাবীব আল-জাল্লাব বলেন, আমি ইবনুল মুবারাককে জিজ্ঞেস করলাম, মানুষকে দেওয়া শ্রেষ্ঠ জিনিস কী? তিনি বললেন, ‘স্বাভাবিক জ্ঞান (সহজাত বুদ্ধি)।’ আমি বললাম, যদি তা না থাকে? তিনি বললেন, ‘উত্তম শিষ্টাচার (আদব)।’ আমি বললাম, যদি তাও না থাকে? তিনি বললেন, ‘একজন সহানুভূতিশীল ভাই, যার সাথে পরামর্শ করা যায়।’ আমি বললাম, যদি তাও না থাকে? তিনি বললেন, ‘দীর্ঘ নীরবতা (কম কথা বলা)।’ আমি বললাম, যদি তাও না থাকে? তিনি বললেন, ‘তাড়াতাড়ি মৃত্যু।’
আব্দান ইবনে উসমান, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তির ভালো গুণাবলি তার খারাপ গুণাবলিকে ছাড়িয়ে যায়, তবে তার খারাপ গুণাবলির কথা উল্লেখ করা হয় না। আর যদি তার খারাপ গুণাবলি তার ভালো গুণাবলিকে ছাড়িয়ে যায়, তবে তার ভালো গুণাবলির কথা উল্লেখ করা হয় না।’
নুআইম বলেন, আমি ইবনুল মুবারাককে বলতে শুনেছি, ‘আমি তাকে দেখে অবাক হই যে জ্ঞান অন্বেষণ করেনি, কীভাবে তার মন কোনো মহৎ কাজের দিকে ধাবিত হয়!’
মাহবুব ইবনুল হাসান বলেন, আমি ইবনুল মুবারাককে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞানে কার্পণ্য করে, সে তিনটির মধ্যে কোনো একটিতে আক্রান্ত হয়। ১. হয় এমন মৃত্যু, যা তার জ্ঞানকে নিয়ে যায়। ২. সে ভুলে যায়। ৩. অথবা সে শাসকের সাথে জড়িয়ে পড়ে এবং তার জ্ঞান নষ্ট হয়ে যায়।
আল-মুসায়্যাব ইবনে ওয়াযিহ বলেন, আমি ইবনুল মুবারাককে বলতে শুনেছি, তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর ওয়াস্তে হাদিস অন্বেষণ করে, তবে কি সে এর সনদ (বর্ণনাসূত্র) নিয়ে কঠোর হবে? তিনি বললেন, ‘যদি তা আল্লাহর জন্য হয়, তবে তার জন্য সনদ নিয়ে কঠোর হওয়া আরও বেশি আবশ্যক।’ তিনি আরও বলেন, ‘অন্তরে দুনিয়ার মোহ এবং গুনাহ তাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে, এমন অবস্থায় তার কাছে কল্যাণ কীভাবে পৌঁছবে?’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি একশটি জিনিস থেকে পরহেজ করে, কিন্তু একটি জিনিস থেকে পরহেজ না করে, তবে সে মুত্তাকিদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
আর যদি সে একশটি জিনিস ছাড়া শুধুমাত্র একটি জিনিস থেকে বিরত থাকে, তবে সে পরহেজগার হবে না। যার মধ্যে মূর্খতার একটি স্বভাব থাকে, সে মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত। তুমি কি শোনোনি যে আল্লাহ নূহ (আ.)-কে তাঁর ছেলের কারণে বলেন, ‘আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যেন তুমি জাহিলদের (মূর্খদের) অন্তর্ভুক্ত না হও?’ তিনি আরও বর্ণনা করেন, ইবনুল মুবারাককে জিজ্ঞেস করা হলো, মানুষ কারা? তিনি বললেন, ‘আলেমগণ।’ বলা হলো, তাহলে বাদশাহ কারা? তিনি বললেন, ‘যাহেদগণ (দুনিয়াত্যাগীগণ)।’ বলা হলো, তাহলে সাধারণ জনতা (আল-গাওগা) কারা? তিনি বললেন, ‘খুযাইমাহ এবং তার সঙ্গীরা (অর্থাৎ জালেম শাসকদের দল)। বলা হলো, তাহলে নীচ ও ইতর জনতা (আস-সাফিলাহ) কারা? তিনি বললেন, ‘যারা তাদের দ্বীন দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে।’
তাঁর থেকে আরও বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘তোমার বসার স্থান যেন মিসকিনদের সাথে হয়। আর তুমি যেন বিদআতিদের (ধর্মের মধ্যে নতুনত্ব সৃষ্টিকারীদের) সাথে বসা থেকে সাবধান থাকো।’ ইবনুল মুবারাক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যখন কোনো ব্যক্তি তার নফসের (নিজের) কদর বুঝতে পারে, তখন সে নিজের কাছে কুকুরের চেয়েও বেশি হীন হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘পরিবারের জন্য উপার্জনের সমতুল্য কোনো কাজ নেই, এমনকি আল্লাহর পথে জিহাদও নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘কত ছোট কাজ আছে, যা নিয়তের কারণে বড় হয়ে যায়, আর কত বড় কাজ আছে, যা নিয়তের কারণে ছোট হয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘জ্ঞানীরাও চারটি জিনিস থেকে নিরাপদ নন। ১. যে গুনাহ আগে হয়ে গেছে, তা নিয়ে আল্লাহ কী করবেন, তা জানা নেই। ২. যে জীবন বাকি আছে, তাতে কী বিপদ আছে, তা জানা নেই। ৩. বান্দাকে যে অনুগ্রহ দেওয়া হয়েছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা বা ধীরে ধীরে পাকড়াও করার সুযোগ কি না; ৪. যে ভ্রষ্টতা সজ্জিত করা হয়েছে, যা সে হিদায়াত মনে করে। ৫. এক মুহূর্তের জন্য হৃদয়ের বিচ্যুতি, কারণ ব্যক্তি অনুভব না করেই তার দ্বীন হারিয়ে ফেলতে পারে।’
আবু ওয়াহব আল-মারওয়াযী বলেন, আমি ইবনুল মুবারাককে ‘আল-কিবর’ (অহংকার) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ‘মানুষকে তুচ্ছ মনে করা।’ আমি তাঁকে ‘আল-উজব’ (আত্মমুগ্ধতা) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম? তিনি বললেন, ‘দেখা যে তোমার কাছে এমন কিছু আছে যা অন্য কারো কাছে নেই। আমি সালাত আদায়কারীদের মধ্যে আত্মমুগ্ধতার চেয়ে খারাপ কিছু দেখি না।’ ইবনুল মুবারাক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যে আলেমদের প্রতি তাচ্ছিল্য করে, তার আখিরাত নষ্ট হয়ে যায়; যে শাসকদের প্রতি তাচ্ছিল্য করে, তার দুনিয়া নষ্ট হয়ে যায়; আর যে কোনো ভাইদের প্রতি তাচ্ছিল্য করে, তার পৌরুষত্ব নষ্ট হয়ে যায়।’
আবু সালিহ আল-ফাররা বলেন, আমি ইবনুল মুবারাককে ‘জ্ঞান লেখা’ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ‘যদি লেখা না থাকত, তবে আমরা মুখস্থ রাখতে পারতাম না।’ আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, ‘কাপড়ের কালি হলো আলেমদের সুগন্ধি।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবেশীদের কোনো বিষয়ে একমত হওয়া আমার কাছে দুজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর সাক্ষ্যের চেয়েও বেশি প্রিয়।’১৬
হুসাইন ইবনে আল-হাসান আল-মারওয়াযী বলেন, আমি ইবনুল মুবারককে বলতে শুনেছি, ‘দুনিয়াদাররা দুনিয়ার সবচেয়ে উত্তম স্বাদ আস্বাদন করার আগেই দুনিয়া থেকে চলে যায়।’ তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আর এর সবচেয়ে উত্তম স্বাদ কী?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ আযযা ওয়া জাল-এর মারিফাত।১৭
রচিত গ্রন্থাবলি:
১. আত-তাফরির
২. আল-মুসনাদ
৩. কিতাবুল জিহাদ
৪. কিতাবুল বিররি ওয়াস-সিলাহ
৫. আস-সুনান
৬. কিতাবুত তারিখ
৭. আরবা’ঈন ফিল হাদিস
৮. রিক্বাউল ফাতাওয়া
৯. কিতাবুয জুহদ ওয়া ইয়ালীহি কিতাবুর রাক্বাইক্ব। ১৮
মৃত্যুকালীন ও মৃত্যু পরবর্তী ঘটনা:
আহমাদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল-ইজলী বলেন, আমার বাবা আমাকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, ইবনুল মুবারাকের যখন মৃত্যু আসন্ন হলো, তখন এক ব্যক্তি তাঁকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তালকীন দিতে লাগল এবং তা বারবার বলতে থাকল। ইবনুল মুবারাক তখন তাকে বললেন, ‘তুমি ঠিকভাবে পারছো না। আমি ভয় পাচ্ছি যে, আমার পরে তুমি অন্য কোনো মুসলিমকে কষ্ট দেবে। যখন তুমি আমাকে তালকিন দাও আর আমি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলি, এরপর যদি আমি আর কোনো কথা না বলি, তাহলে আমাকে ছেড়ে দাও। আর যদি আমি কোনো কথা বলি, তবে আবার তালকিন দাও, যাতে এটিই আমার শেষ কথা হয়।’
বলা হয়ে থাকে, খলিফা হারুনুর রশিদ এর কাছে যখন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক এর মৃত্যুর খবর পৌঁছল, তখন তিনি বললেন, ‘আজ আলেমদের নেতা মারা গেলেন।’
আব্দান ইবনে উসমান বলেন, ইবনুল মুবারাক বিহিত ও আনাত নামক স্থানের মধ্যবর্তী স্থানে রমজান মাসে, ১৮১ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন।
হাসান ইবনুর রবী বলেন, ইবনুল মুবারাক তাঁর মৃত্যুর আগে আমাকে বলেছিলেন, ‘আমার বয়স তেষট্টি ৬৩ বছর।’
মুহাম্মাদ ইবনুল ফুজাইল ইবনে ইয়াজ বলেন, আমি ইবনুল মুবারাককে স্বপ্নে দেখলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোন আমলটি সর্বোত্তম?’ তিনি বললেন, ‘সেই কাজটি যাতে আমি ছিলাম।’ আমি বললাম, ‘সীমান্ত প্রতিরক্ষা (রিবাত) ও জিহাদ?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ আমি বললাম, ‘আপনার রব আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন?’ তিনি বললেন, ‘তিনি আমাকে এমনভাবে ক্ষমা করেছেন, যার পর আর কোনো ক্ষমা নেই।’
আব্বাস ইবনে মুহাম্মাদ আন-নাসাফী বলেন, আমি আবু হাতিম আল-ফিরিবরীকে বলতে শুনেছি, আমি ইবনুল মুবারাককে জান্নাতের দরজায় দাঁড়ানো দেখলাম, তাঁর হাতে একটি চাবি। আমি বললাম, ‘আপনি এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছেন?’ তিনি বললেন, ‘এটা জান্নাতের চাবি। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এটা আমাকে দিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘তুমি রবের সাথে দেখা করা পর্যন্ত অপেক্ষা করো, তুমি আসমানে আমার আমানতদার হও, যেমন তুমি জমিনে আমার আমানতদার ছিলে।’
ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম আল-মিস্সিসী বলেন, আমি আল-হারিস ইবনে আতিয়্যাহকে স্বপ্নে দেখলাম। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ‘আমাকে ক্ষমা করা হয়েছে।’ আমি বললাম, ‘ইবনুল মুবারাক?’ তিনি বললেন, ‘বাহ! বাহ! তিনি তো ইল্লিয়্যীনে আছেন, তাঁদের অন্তর্ভুক্ত যিনি প্রতিদিন দুবার আল্লাহর কাছে প্রবেশ করেন।’
নাওফাল থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবনুল মুবারাককে স্বপ্নে দেখলাম। আমি বললাম, ‘আল্লাহ আপনার সাথে কী ব্যবহার করেছেন?’ তিনি বললেন, ‘হাদিসের সফরে বের হওয়ার কারণে তিনি আমাকে ক্ষমা করেছেন। তোমার জন্য কুরআন, তোমার জন্য কুরআন অপরিহার্য।’ আলী ইবনে আহমাদ আস-সাওয়াক বলেন, আমাদের কাছে যাকারিয়্যা ইবনে আদী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি ইবনুল মুবারাককে স্বপ্নে দেখলাম। আমি বললাম, ‘আল্লাহ আপনার সাথে কী ব্যবহার করেছেন?’ তিনি বললেন, ‘আমার সফরের কারণে তিনি আমাকে ক্ষমা করেছেন।’১৯