কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন আল্লাহপ্রেমে রঙিন এক শাশ্বত দৃষ্টান্ত। দুনিয়ার রাজত্ব, বিলাস আর ঐশ্বর্য তাঁদের চোখে কিছুই নয়; তাঁদের কাছে আসল রাজত্ব হলো আল্লাহর নৈকট্য। হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁদের অন্যতম। রাজসিংহাসন ত্যাগ করে তিনি গ্রহণ করেছিলেন জুহদ (দুনিয়া-বিমুখতা) ও আল্লাহর দাসত্বের জীবন। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়— আসল সমৃদ্ধি দুনিয়ার প্রাচুর্যে নয়, বরং আখিরাতের মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টিতে।
প্রাথমিক পরিচিতি:
নাম ইবরাহিম ইবনে আদহাম ইবনে মানসুর ইবনে ইয়াজিদ ইবনে জাবির, লকব— ইমামুল আরিফ, সাইয়্যেদুয্ যুহহাদ, কুনিয়াত— আবু ইসহাক আল ইজলী। তাঁকে আত-তামেমী, আল-খোরাসানী, আল-বলখীও বলা হয়। যদিও তিনি পরবর্তীতে শামে তথা সিরিয়ায় বসতি স্থাপন করেছেন। জন্মগ্রহণ করেন ১০০ হিজরির আশপাশে। ফদ্বল ইবনে মুসা বলেন, “যখন ইবরাহিম ইবনে আদহামের পিতা ও মাতা হজ করতে এসেছিলেন, তখন তাঁর জন্ম হয়েছিল মক্কায়।” ১
পূর্বসূরী:
তিনি তাঁর পিতা মুহাম্মদ ইবনে জিয়াদ আল-জুমাহী (যিনি হজরত আবু হুরায়রা রা. এর সাহচর্যে ছিলেন), আবু ইসহাক আস-সবীয়ী, মানসুর ইবনে মু‘তামির, মালিক ইবনে দিনার, আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে আলী, সুলাইমান আল-আ‘মাশ, ইবনে ইজলান, ও মুকাতিল ইবনে হাইয়ান থেকে হাদিস বর্ণনা করেন এবং ইলম অর্জন করেন।২
উত্তরসূরী:
তাঁর নিকট তাঁর বন্ধু সুফিয়ান আস-সাওরী, শাকিক আল-বালখী, বাকিয়্যাহ ইবনে আল-ওয়ালিদ, দামরাহ ইবনে রাবী‘আহ, মুহাম্মাদ ইবনে হিময়ার, খালাফ ইবনে তামিম, মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ আল-ফিরইয়াবী, তাঁর খাদিম ইবরাহিম ইবনে বাশশার আল-খুরাসানী, সাহল ইবনে হাশিম, উতবাহ ইবনে আস-সাকান। এছাড়া তাঁর থেকে আল-আউযাঈ ও আবু ইসহাক আল-ফাযারী হাদিস বর্ণনা করেছেন।৩
বাদশাহি ছেড়ে জুহদ অর্জনের গল্প:
ইউনুস আল-বালখী বলেন,“ইবরাহিম ইবনে আদহাম ছিলেন অভিজাতদের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর পিতা ছিলেন বিপুল সম্পদের মালিক; তাঁর বহু খেদমতগার, বাহন, যুদ্ধের ঘোড়া এবং শিকারি বাজপাখি ছিল। একদিন ইবরাহিম শিকারে বের হলেন, ঘোড়ার পিঠে চড়ে দৌড়াচ্ছিলেন। হঠাৎ উপর থেকে একটি আওয়াজ শোনা গেল,‘হে ইবরাহিম, এ কি খেল-তামাশা? اَفَحَسِبۡتُمۡ اَنَّمَا خَلَقۡنٰكُمۡ عَبَثًا- তোমরা কি ভেবেছিলে, আমি তোমাদেরকে উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেছি?’ (সুরা আল-মু’মিনুন: 115)। আল্লাহকে ভয় করো, রসদ সংগ্রহ করো সেই দিনের জন্য, যেদিন চরম অভাব হবে।’ এ কথা শুনে তিনি সাথে সাথে ঘোড়া থেকে নেমে গেলেন এবং দুনিয়াদারি ছেড়ে দিলেন।”
আর রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহতে রয়েছে, তিনি ছিলেন বলখ অঞ্চলের রাজপরিবারের সন্তান। একদিন তিনি খরগোশ বা শিয়াল তাড়াচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ একটি আওয়াজ এলো,“এর জন্যই কি তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে? এ কাজের জন্যই কি তোমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?” তিনি সাথে সাথে ঘোড়া থেকে নেমে পড়লেন। পথে তাঁর বাবার এক রাখালের সাথে দেখা হলো। তিনি তার কাছ থেকে জোড়া চাদর (আবায়া) নিলেন এবং নিজের ঘোড়া ও সমস্ত কিছু তাকে দিয়ে দিলেন। তারপর মরুভূমিতে প্রবেশ করলেন। তিনি সুফিয়ান আস-সাওরী ও ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.) এঁর সোহবত লাভ করেন। পরে শামে প্রবেশ করেন। তিনি ফসল কাটার মজুরি ও বাগান পাহারা দেওয়ার বিনিময়ে আহার করতেন।
মরুভূমিতে তিনি এক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ পান, যিনি তাকে আল্লাহর ‘ইসমে আজম’শিক্ষা দেন। তিনি তা দ্বারা দোয়া করলে হজরত খিজির আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাৎ হয়। তখন খিজির (আ.) তাঁকে বললেন,“তোমাকে আসলে শিক্ষা দিয়েছেন আমার ভাই দাউদ (আ.)।” এ ঘটনা আলী ইবনে মুহাম্মাদ আল-মিসরী আল-ওয়াআয বর্ণনা করেছেন।৪
দৈনন্দিন জীবনাচার:
আলী ইবনে বাক্কার বলেন,“ইবরাহিম ছিলেন বানু ‘ইজল গোত্রের, বংশমর্যাদায় সম্মানিত। তিনি যখন ফসল কাটতেন, তখন কবিতার সুরে বলতেন, আল্লাহকে সঙ্গী করো, মানুষকে দূরে সরিয়ে দাও।”
তিনি পশমি জামা পরতেন, কিন্তু ভেতরে কোনো কামিস থাকত না। গ্রীষ্মকালে মাত্র চার দিরহামে দুই টুকরো কাপড় তথা একটি লুঙ্গি ও একটি চাদর পরতেন। তিনি বসবাস ও সফর উভয় অবস্থায় রোজা রাখতেন, রাত জাগতেন, চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। তাঁর সঙ্গীরা যখন মজুরি আনত, তিনি তা হাতে স্পর্শ করতেন না, বলতেন— “তোমরা এ দ্বারা নিজেদের খাওয়া-দাওয়ার চাহিদা পূরণ করো।”৫
ইবাদত ও জুহদ:
আবু সুলাইমান আদ-দারানী বলেন, ইবরাহিম ইবনে আদহাম এক অজু দিয়ে পনেরো ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেছিলেন। মাখলাদ ইবনুল হুসাইন থেকে বর্ণিত, রাতের বেলা ঘুম থেকে উঠলেই আমি ইবরাহিম ইবনে আদহামকে আল্লাহর জিকির করতে দেখতাম। এতে আমার কষ্ট হতো, কিন্তু আমি এই আয়াত দিয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দিতাম, ‘এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে তা দান করেন।’ (সুরা আল-মায়িদাহ: ৫৪)৬
ইবরাহিম ইবনে আদহাম বলেছেন,“হারাম থেকে বিরত থাকার নিমিত্তে জুহদ (দুনিয়া ত্যাগ) ফরজ, আর নিরাপত্তামূলক জুহদ হলো সন্দেহজনক জিনিস থেকে বিরত থাকা। আর অতিরিক্ত ফজিলতের জুহদ হলো হালাল থেকেও বিরত থাকা।”
ইয়াহইয়া ইবনে উসমান আল-বাগদাদী বলেন, বাকিয়া বর্ণনা করেছেন, ইবরাহিম ইবনে আদহাম একদিন আমাকে তাঁর খাবারে দাওয়াত দিলেন। আমি তাঁর কাছে গেলাম। তিনি বসে বাম পা শরীরের নিচে ভাঁজ করে রাখলেন, ডান পা সোজা করে তার ওপর কনুই রেখে বসলেন। তারপর বললেন,“এটাই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এঁর বসার ভঙ্গি। তিনি বান্দার মত বসতেন। তোমরা ‘বিসমিল্লাহ’ পড়ে খাও।”আমরা খাওয়া শেষে তাঁর সঙ্গীকে বললাম, “তাঁর সঙ্গে চলাফেরা করতে গিয়ে সবচেয়ে কঠিন কোন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছো?” তিনি বললেন, “একবার আমরা রোজায় ছিলাম, কিন্তু ইফতারের জন্য কিছুই ছিল না। সকালে আমি বললাম, ‘হে আবু ইসহাক, তুমি কি চাও আমরা রাস্তান শহরে যাই এবং শ্রমিক হিসেবে কাজ করি?’ তিনি রাজি হলেন। এক লোক আমাকে এক দিনারের বিনিময়ে ভাড়া করল। আমি বললাম, ‘আমার সাথিও?’ সে বলল, ‘তার প্রয়োজন নেই, আমি দুর্বল কাউকে চাই।’ আমি জোর দিয়ে বললাম, অবশেষে সে তাঁকেও দুই-তৃতীয়াংশের বিনিময়ে ভাড়া করল। তারপর আমি আমার মজুরি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনলাম, আর বাকিটা দান করলাম। আমি তাঁকে খাবার দিলাম, তখন কেঁদে ফেললেন এবং বললেন,‘আমরা তো আমাদের মজুরি পুরোপুরি পেয়ে গেলাম। কিন্তু জানি না আমরা আমাদের মালিকের (যে আমাকে নিয়োগ দিয়েছিল) পাওনা ঠিকভাবে আদায় করেছি কি না!’ আমি রেগে গেলাম। তিনি বললেন,‘তুমি কি আমাকে নিশ্চয়তা দিতে পারো যে, আমরা তার কাজের হক পুরোপুরি আদায় করেছি?’ তখন আমি খাবারটি নিলাম এবং সবটুকু সদকা করে দিলাম।
দ্বামরাহ বলেন, আমি ইবনে আদহামকে বলতে শুনেছি—“আমি ভয় করি সুস্বাদু খাবার না খাওয়ার কারণে হয়তো আমি কোনো সওয়াব পাব না, কারণ আমার তাতে কোনো আকর্ষণ নেই।”তিনি যখন কোনো উত্তম খাবারে বসতেন, তখন তা সঙ্গীদের খেতে দিতেন, আর নিজে কেবল রুটি ও যয়তুন নিয়ে সন্তুষ্ট হতেন।
মুহাম্মদ ইবনে মাইমূন আল-মাক্কী বলেন, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা বর্ণনা করেছেন, কেউ ইবরাহিম ইবনে আদহামকে বলল, “আপনি বিয়ে করেন না কেন?” তিনি বললেন, “যদি আমার পক্ষে নিজের সাথে তালাক দেওয়া সম্ভব হতো, তবে আমি তা-ই করতাম।”৭
দুনিয়ার ধন-দৌলতের প্রতি অনীহা:
আলী ইবনু বাক্কার বলেন, আমরা মিসিয়াসাহ নামক স্থানে ইবরাহিম ইবনে আদহামের কাছে বসা ছিলাম। তখন খোরাসান থেকে একজন লোক আসলেন এবং বললেন, ‘আপনাদের মধ্যে ইবরাহিম ইবনে আদহাম কে?’ উপস্থিত লোকেরা বললেন ‘ইনি।’ লোকটি বলল, ‘আপনার ভাইয়েরা আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন।’ যখন তিনি তার ভাইদের নাম শুনলেন, তখন তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং লোকটির হাত ধরে তাকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। তিনি বললেন, ‘তুমি কী নিয়ে এসেছো?’ লোকটি বলল, ‘আমি আপনার গোলাম, আমার সাথে একটি ঘোড়া, একটি খচ্চর এবং আপনার ভাইদের পাঠানো দশ হাজার দিরহাম আছে।’ ইবরাহিম ইবনে আদহাম বললেন, ‘যদি তুমি সত্য বলে থাকো, তাহলে তুমি মুক্ত, আর তোমার সাথে যা কিছু আছে, তা তোমারই। তুমি যাও, আর কাউকে কিছু বলবে না।’ লোকটি চলে গেল।
ইয়াহিয়া ইবনুল কুদাইর ইবনু আসওয়াদ আল-কিলাবী, যিনি আসকালানের অধিবাসী ছিলেন তিনি বলেন, ইবরাহিম ইবনে আদহাম আমার বাগানে এক বছর মজুর হিসেবে কাজ করতেন। আমি তাকে সেই সব কাজেই লাগাতাম, যা একজন মজুরকে লাগানো হয়। একবার আমার কিছু ভাই বাগানে আমার সাথে দেখা করতে আসলেন। আমি ইবরাহিমকে বললাম, ‘আমাদের জন্য কিছু মিষ্টি আনার দাও।’ তিনি কিছু আনার আনলেন, যা আমাদের মনঃপূত হলো না। আমি তাকে বললাম, ‘তুমি এই বাগানে এক বছর ধরে আছো, অথচ তুমি ভালো ও মিষ্টি আনারের জায়গা চেনো না?’ তিনি বললেন, ‘বাগানের কোন জায়গায় ভালো আনার হয়?’ আমি তাকে জায়গাটি বলে দিলাম। তখন আমি তার বিষয়টি বুঝতে পারলাম না।
ইতোমধ্যে এক ব্যক্তি একটি উন্নত উটের পিঠে চড়ে আসলেন এবং ইবরাহিম ইবনে আদহাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তাকে আমার কাছে তার অবস্থানের কথা জানানো হলো। লোকটি উট থেকে নেমে আসলেন এবং আমি দেখলাম, সে ইবরাহিমের দুই হাতে চুমু খেলো ও তাকে অনেক সম্মান করল। ইবরাহিম তাকে বললেন, ‘তুমি কী নিয়ে এসেছো?’ লোকটি বলল, ‘আপনার কিছু অনুগত লোক মারা গেছেন, আর আমি আপনার জন্য তাদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ত্রিশ হাজার দিরহাম নিয়ে এসেছি।’
ইবরাহিম বললেন, ‘তোমরা আমার অনুগতদের কী করবে?’ লোকটি বলল, ‘আমি বলখ থেকে এত কষ্ট করে এসেছি, এটি আপনি আমার কাছ থেকে গ্রহণ করুন।’ ইবরাহিম লোকটিকে বললেন, ‘তোমার আচল বিছাও এবং তোমার সাথে যা আছে, তা ঢেলে দাও।’ লোকটি তাই করলো। ইবরাহিম বললেন, ‘এটি তিন ভাগে ভাগ করো।’ সে ভাগ করলো। ইবরাহিম বললেন, ‘এক তৃতীয়াংশ তোমার, কারণ তুমি বলখ থেকে এখানে আসতে অনেক কষ্ট করেছো। এক তৃতীয়াংশ বলখের দরিদ্রদের মধ্যে ভাগ করে দাও। আর এক তৃতীয়াংশ, হে ইয়াহিয়া, তুমি আসকালানের দরিদ্রদের মধ্যে ভাগ করে দাও।”৮
তাঁর দৃষ্টিতে আল্লাহর অলী হওয়ার ৬টি ধাপ:
ইবরাহিম ইবনে আদহাম তাওয়াফরত অবস্থায় এক ব্যক্তিকে বলেছিলেন, জেনে রাখো, তুমি সৎকর্মশীলদের স্তরে পৌঁছাতে পারবে না, যতক্ষণ না তুমি ছয়টি ধাপ অতিক্রম করবে।
১. তুমি নেয়ামতের দরজা বন্ধ করবে এবং কষ্টের দরজা খুলবে।
২. তুমি সম্মানের দরজা বন্ধ করবে এবং অপমানের দরজা খুলবে।
৩. তুমি আরামের দরজা বন্ধ করবে এবং কঠিন পরিশ্রমের দরজা খুলবে।
৪. তুমি ঘুমের দরজা বন্ধ করবে এবং রাত জাগরণের দরজা খুলবে।
৫. তুমি ধনী হওয়ার দরজা বন্ধ করবে এবং দারিদ্র্যের দরজা খুলবে।
৬. তুমি আশার দরজা বন্ধ করবে এবং মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়ার দরজা খুলবে।৯
আধ্যাত্মিক দীক্ষা:
আসলাম ইবনু ইয়াজিদ আল-জুহানী বলেন, আমি হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহমাতুল্লাহি আলাইহির সাথে আলেকজান্দ্রিয়ায় দেখা করলে তিনি আমাকে বললেন—
- হে যুবক, তুমি কে?
- আমি বললাম, আমি খোরাসানের একজন যুবক।
- দুনিয়া থেকে বেরিয়ে আসতে তোমাকে কীসে উৎসাহিত করেছে?
- দুনিয়ার প্রতি বৈরাগ্য (জুহদ) এবং আল্লাহ তায়ালার প্রতিদান লাভের আশা।
- নিশ্চয়ই বান্দার জন্য আল্লাহর প্রতিদানের আশা পূর্ণ হয় না, যতক্ষণ না সে তার নফসকে ধৈর্যের উপর চালিত করে।
তখন তাঁর সাথে থাকা এক ব্যক্তি বললেন, ‘ধৈর্য আবার কী?’
তিনি বললেন, ধৈর্যের সর্বনিম্ন স্তর হলো বান্দা নিজের নফসকে এমন সব কষ্ট সহ্য করার জন্য অভ্যস্ত করে তোলে, যা নফস অপছন্দ করে।’
আমি বললাম, ‘তারপর কী?’
তিনি বললেন, ‘যখন সে কষ্টগুলো সহ্য করতে পারে, তখন আল্লাহ তার অন্তরে একটি নুর দান করেন।’
আমি বললাম, ‘সেই নুর কী?’
তিনি বললেন, ‘সেটি হলো তার অন্তরের একটি বাতি, যার দ্বারা সে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে, এবং নাসেখ (রহিতকারী) ও মানসুখ (রহিত হওয়া বিধান)-এর মধ্যে পার্থক্য করতে পারে।’
আমি বললাম, ‘এগুলো তো রাব্বুল আলামিনের অলী-আউলিয়াদের গুণ!’
তিনি বললেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। ঈসা ইবনু মারইয়াম (আলাইহিস সালাম) সত্যই বলেছেন, ‘তোমরা প্রজ্ঞাকে তার অযোগ্যদের কাছে স্থাপন করো না, তাহলে তাকে নষ্ট করবে; আর তার যোগ্যদের থেকেও তাকে ফিরিয়ে রেখো না, তাহলে তাদের প্রতি অবিচার করবে।’
তখন আমি তাঁর দিকে বিনয়ের সাথে ঝুঁকে গেলাম এবং তাঁর কাছে উপদেশ চাইলাম, আর তাঁর সঙ্গীরাও আমার সাথে উপদেশ চাইলেন।
তখন তিনি বললেন, ‘হে যুবক, যখন তুমি নেককারদের সঙ্গ দেবে বা পূণ্যবানদের সাথে কথা বলবে, তখন তাদের রাগিয়ে দেবে না। কারণ, আল্লাহ তাদের রাগে রাগান্বিত হন এবং তাদের সন্তুষ্টিতে সন্তুষ্ট হন। আর এর কারণ হলো, প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরাই জ্ঞানী এবং যখন লোকেরা অসন্তুষ্ট হয়, তখন তাঁরাই আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন। তাঁরাই নবী ও সিদ্দীকদের পরে আগামীকালের আল্লাহর সভাসদ হবেন।’ ‘হে যুবক, আমার কথা সংরক্ষণ করো, বুদ্ধি খাটাও, ধৈর্য ধরো এবং তাড়াহুড়ো করো না। কারণ, স্থিরতার সাথে রয়েছে সহনশীলতা ও লজ্জা, আর মূর্খতার সাথে রয়েছে হালকা-পাতলা হওয়া ও অকল্যাণ।’
বর্ণনাকারী বলেন, আমি তখন আমার চোখের দিকে চেয়ে বললাম, ‘আল্লাহর কসম, আমার পিতা-মাতাকে ত্যাগ করা এবং আমার ধন-সম্পদ থেকে বেরিয়ে আসা আমাকে বাধ্য করেনি, শুধু আল্লাহর জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার ভালোবাসা ছাড়া, আর এর সাথে রয়েছে দুনিয়ার প্রতি বৈরাগ্য ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের আকাঙ্ক্ষা।’
তখন তিনি বললেন, ‘কৃপণতা থেকে দূরে থাকো।’
আমি বললাম, ‘কৃপণতা কী?’
তিনি বললেন, ‘দুনিয়াদারদের কাছে কৃপণতা হলো এই যে, লোকটি তার সম্পদের বিষয়ে কৃপণ হয়। আর আখেরাতপন্থীদের কাছে কৃপণতা হলো, যে আল্লাহ তায়ালার কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিতে কৃপণতা করে। সাবধান, বান্দা যখন আল্লাহর জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়, তখন আল্লাহ তার অন্তরে হিদায়ত ও তাকওয়া দান করেন, আর তাকে প্রশান্তি, মর্যাদা ও পূর্ণ জ্ঞান দান করেন। এর সাথে সাথে তার জন্য আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, আর সে তার অন্তর দিয়ে দেখে যে সেগুলোর দরজা কীভাবে খোলে, যদিও সে দুনিয়ার পথে পড়ে থাকে।’
তখন তাঁর সাথিদের মধ্য থেকে একজন তাঁকে বললেন, ‘তাঁকে আঘাত করে কষ্ট দিন! আমরা দেখছি যে, তিনি আল্লাহর অলী হওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছেন।’
বর্ণনাকারী বলেন, ‘তখন শায়খ তাঁর বন্ধুদের ‘আল্লাহর অলী হওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছেন’ কথা শুনে আশ্চর্য হলেন।
তারপর তিনি আমাকে বললেন, ‘হে যুবক, তুমি অবশ্যই নেককারদের সঙ্গী হবে, তাই তুমি তাদের জন্য এমন মাটি হয়ে যাও, যার উপর তারা পা রাখে। যদি তারা তোমাকে প্রহার করে, গালি দেয়, তাড়িয়ে দেয় এবং তোমার প্রতি খারাপ কথা বলে, আর যখন তারা তোমার সাথে এমনটি করে, তখন তুমি তোমার নিজের বিষয়ে চিন্তা করো যে, কোথা থেকে তোমার ভুল হয়েছে? তুমি যখন এটি করবে, তখন আল্লাহ তাঁর সাহায্য দ্বারা তোমাকে সমর্থন করবেন এবং তাদের অন্তর তোমার দিকে ফিরিয়ে দেবেন।
জেনে রাখো, বান্দাকে যখন নেককাররা ঘৃণা করে এবং পুণ্যবানরা তার সঙ্গ ত্যাগ করে, আর জাহেদগণ তাকে অপছন্দ করে, তখন এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি তিরস্কার হয়, যাতে সে আল্লাহর দিকে ফেরে। যদি আল্লাহ তায়ালা তাকে ফিরিয়ে আনেন, তবে তিনি তাদের অন্তর তার দিকে ফিরিয়ে দেন। আর যদি সে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়, তবে তিনি তার হৃদয়ে পথভ্রষ্টতা দেন, এর সাথে জীবিকা থেকে বঞ্চিত হওয়া, পরিবার থেকে রুক্ষতা, ফেরেশতাদের ঘৃণা এবং রসুলদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া থাকে; এরপর তিনি কোন উপত্যকায় তাকে ধ্বংস করবেন সে বিষয়ে কোনো পরোয়া করেন না।’
আমি বললাম, ‘আমি কুফা ও মক্কার মধ্যবর্তী রাস্তায় হাঁটার সময় এক ব্যক্তির সঙ্গী হয়েছিলাম। আমি দেখতাম যে, যখন সন্ধ্যা হতো, তখন তিনি দুই রাকআত নামাজ আদায় করতেন, যা তিনি দ্রুত করতেন। এরপর তিনি নিজের সাথে চুপে চুপে কথা বলতেন। তখন তাঁর ডান পাশে এক থালা সারীদ (গোশত ও রুটির মিশ্রিত খাবার) এবং এক জগ পানি আসত। তিনি খেতেন এবং আমাকেও খাওয়াতেন।’
বর্ণনাকারী বলেন, তখন শায়খ কাঁদলেন, আর তাঁর আশেপাশে যারা ছিলেন তাঁরাও কাঁদলেন। তারপর তিনি বললেন, ‘হে আমার পুত্র, ইনি আমার ভাই দাঊদ। তাঁর বাসস্থান বলখের পিছনে একটি গ্রামে, যার নাম আল-বারিদাহ আত-ত্বাইয়্যিবাহ। আর এর কারণ হলো, দাঊদের সেখানে অবস্থানের জন্য ভূমিখণ্ডগুলো গর্ব করত। হে যুবক, তিনি তোমাকে কী বলেছেন এবং কী শিখিয়েছেন?’
আমি বললাম, ‘তিনি আমাকে ইসমুল্লাহ আল-আযম (ইসমে আজম) শিখিয়েছেন।’
শায়খ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তা কী?’
আমি বললাম, “এটা আমার জন্য এত বড় যে, মুখে উচ্চারণ করা কঠিন। আমি একবার তা দিয়ে প্রার্থনা করেছিলাম, তখন এক ব্যক্তি আমার কোমর ধরে বললেন, ‘চাও, তোমাকে দেওয়া হবে।’ তিনি আমাকে ভয় দেখালেন।”
তিনি বললেন, ‘ভয় নেই তোমার, আমি তোমার ভাই খিজির। আমার ভাই দাঊদ তোমাকে এটি শিখিয়েছেন, তাই সাবধান, সৎ কাজ ছাড়া আর কোথাও যেন তা দিয়ে দোয়া না করো।’
তারপর তিনি বললেন, ‘হে যুবক, যারা দুনিয়ার প্রতি বৈরাগ্য অবলম্বন করেছে, তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টিকে পোশাক হিসেবে তাঁর ভালোবাসাকে চাদর হিসেবে এবং তাঁর জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়াকে ভেতরের জামা হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাই আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর এমনভাবে অনুগ্রহ করেছেন, যা অন্যদের উপর করেননি।’
তারপর তিনি আমার কাছ থেকে চলে গেলেন। শায়খ আমার কথা শুনে আশ্চর্য হলেন।
তারপর তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমার মতো ব্যক্তিকে এবং তোমার অনুসরণকারী সৎপথপ্রাপ্তদের দ্বারা উচ্চতায় পৌঁছাবেন।’
তারপর বললেন, ‘হে যুবক, আমরা তোমার উপকার করেছি, তোমার জন্য পথ সহজ করেছি এবং তোমাকে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছি।’
তারপর তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বললেন, ‘অধিক ভোজনের সাথে রাত জাগার আশা করো না, অধিক ঘুমের সাথে দুঃখ-দুর্দশা দূর হওয়ার আশা করো না, দুনিয়ার প্রতি আসক্তির সাথে আল্লাহর ভয়ের আশা করো না, সৃষ্টির প্রতি আসক্তির সাথে আল্লাহর প্রতি ঘনিষ্ঠতার আশা করো না, তাকওয়া (আল্লাহভীতি) ত্যাগ করে প্রজ্ঞা লাভের আশা করো না, অত্যাচারীদের সাথে মিলেমিশে কাজ করে তোমার কাজের সঠিকতার আশা করো না, ধন-সম্পদ ও সম্মানের ভালোবাসার সাথে আল্লাহর ভালোবাসার আশা করো না, ইয়াতিম, বিধবা ও দরিদ্রের প্রতি কঠোরতা বজায় রেখে হৃদয়ের কোমলতার আশা করো না, অতিরিক্ত কথা বলার সাথে হৃদয়ের সূক্ষ্মতার আশা করো না, সৃষ্টির প্রতি দয়া না করে আল্লাহর রহমতের আশা করো না, আলেমদের মজলিস ত্যাগ করে সঠিক পথের আশা করো না, প্রশংসার প্রতি ভালোবাসার সাথে আল্লাহর জন্য ভালোবাসার আশা করো না, দুনিয়ার প্রতি লোভের সাথে পরহেজগারিতার আশা করো না, এবং পরহেজগারিতার অভাবের সাথে সন্তুষ্টি ও অল্পে তুষ্টির আশা করো না।’
তারপর তাঁদের কেউ কেউ বললেন, ‘হে আমাদের ইলাহ, তাঁকে আমাদের থেকে আড়াল করে দাও, আর আমাদের তাঁর থেকে আড়াল করে দাও।’
ইব্রাহীম ইবনু আদহাম বলেন, ‘আমি জানি না তাঁরা কোথায় গেলেন।’১০
স্বপ্নে আল্লাহর দিদার লাভ:
ইবরাহিম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ আল-বালখী, ইবরাহিম ইবনে আদহাম থেকে বর্ণনা করেন, ‘একদিন আমি শান্তি অনুভব করলাম এবং আল্লাহর আমার প্রতি সুন্দর আচরণের জন্য আমার অন্তর প্রশান্ত হলো। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ, আপনি যদি আপনার মুহিব্বীনদের (প্রেমিকদের) কাউকে এমন কিছু দিয়ে থাকেন যা দিয়ে তাদের অন্তর আপনার সাথে সাক্ষাতের আগে স্থির হয়, তবে আমাকেও তা দান করুন, কারণ অস্থিরতা আমার ক্ষতি করেছে।’ আমি তখন স্বপ্নে আল্লাহ তায়ালাকে দেখলাম। তিনি আমাকে তার সামনে দাঁড় করিয়ে বললেন, ‘হে ইবরাহিম, আমার কাছে চাইতে তোমার লজ্জা হলো না? তুমি আমার সাক্ষাতের আগে এমন কিছু চাও যা দিয়ে তোমার অন্তর স্থির হবে? প্রেমিকের অন্তর কি তার প্রিয়জন ছাড়া অন্য কিছুতে স্থির হয়? অথবা প্রেম কি তার আকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও কাছে স্বস্তি পায়?’ আমি বললাম, ‘হে রব, আপনার প্রেমে আমি দিশেহারা হয়ে গেছি, তাই কী বলব বুঝতে পারিনি।’১১
কারামত:
বাকিয়ার সনদে এসেছে, আমরা ইবরাহিমের সঙ্গে সমুদ্রযাত্রায় ছিলাম। হঠাৎ ঝড় উঠল, জাহাজ কেঁপে উঠল, সবাই কাঁদতে লাগল। তখন আমরা বললাম, ‘হে আবু ইসহাক, এখন কী করবেন?’ তিনি দোয়া করলেন,“ওহে সকল প্রাণীর পূর্বের অমর সত্তা! ওহে সকল জীবনের পূর্বের অমর সত্তা! ওহে সেই সকলের মৃত্যুর পরেরও সত্তা! ইয়া হায়্যু, ইয়া কাইয়্যুম, ইয়া রহিম, ওহে সুন্দরের স্রষ্টা! তুমি আমাদের তোমার কুদরত দেখিয়েছো, এবার আমাদের তোমার ক্ষমা দেখাও।”সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্র শান্ত হয়ে গেল।
ইসাম ইবনে রাওয়াদ বর্ণনা করেন, আমি ঈসা ইবনে খাযিম নৈশাপুরীকে বলতে শুনেছি, আমরা মক্কায় হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহমাতুল্লাহি আলাইহি-র সাথে ছিলাম। তিনি আবু কুবায়িস পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “যদি কোনো মুমিন পূর্ণ ঈমানের সাথে এই পাহাড়কে নাড়াতে বলে, তবে তা নড়ে উঠবে।”তখন পাহাড় কেঁপে উঠল। তিনি বললেন, “স্থির হও, আমি তো তোমাকে উদ্দেশ্য করিনি।”১২
ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহমাতুল্লাহি আলাইহির খাদেম ইবরাহিম ইবনে বাশশার আস-সুফি খোরাসানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন— এক রাতে আমরা হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর সঙ্গে কাটালাম। আমাদের কাছে ইফতার করার মতো কিছুই ছিল না এবং কোনো উপায়ও ছিল না। আমি তখন দুঃখিত ও ব্যথিত অবস্থায় ছিলাম। তিনি আমাকে দেখে বললেন, “হে ইবরাহিম ইবনে বাশশার, আল্লাহ তায়ালা দরিদ্র ও নিঃস্ব মানুষদের কত বড় অনুগ্রহ এবং স্বস্তি দিয়েছেন এই জীবনে এবং পরকালেও। কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তাদের জাকাত, হজ, সদকা বা আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য জিজ্ঞেস করবেন না। বরং হিসাব হবে সেই ধনীদের জন্য যারা দুনিয়ায় সমৃদ্ধ কিন্তু পরকালে দরিদ্র, যারা দুনিয়ায় শক্তিশালী কিন্তু কিয়ামতে দীনহীন। তুমি দুঃখ করো না, শোকও করো না। আল্লাহর রিজিক নিশ্চয়ই তোমার কাছে পৌঁছে যাবে। আর আমরা যারা রাজা ও ধনী, যারা দুনিয়ার স্বস্তি তাড়াহুড়ো করে গ্রহণ করেছি, যখন আমরা আল্লাহর আজ্ঞা মেনে চলি, তখন কোনো পরিস্থিতি আমাদের উদাসীন করে না।”
তারপর তিনি নামাজের জন্য উঠলেন। আমি আমার নামাজের জন্য উঠে দাঁড়ালাম। এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে একজন ব্যক্তি এল, আটটি রুটি ও প্রচুর খেজুর নিয়ে। তিনি এগুলো আমাদের সামনে রাখলেন এবং বললেন, “খাও, আল্লাহ তোমাদেরকে রহম করুন।” তিনি নিজেও খেয়েছেন এবং বললেন, “খাও, হে দুঃখিত!” এক ভিক্ষুক এসে বলল, “আমাকে কিছু খাবার দিন।” তিনি তাকে তিনটি রুটি ও কিছু খেজুর দিলেন। আমাকে তিনটি রুটি দেওয়া হলো এবং আমরা দুজন দুটি রুটি খাই। হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহমাতুল্লাহি আলাইহি এই অভিজ্ঞতা থেকে বললেন, “সহানুভূতি ও পরস্পরের সাহায্য হলো ঈমানদারের চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ।”১৩
মুসা ইবনু ত্বারিফ বলেন, ইবরাহিম ইবনে আদহাম একবার সমুদ্রপথে যাচ্ছিলেন। তাদের উপর এক শক্তিশালী বাতাস আঘাত করল এবং তারা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেল। ইবরাহিম তার মাথাটি একটি চাদর দিয়ে পেঁচিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। লোকেরা তাকে বলল, ‘আমরা যে চরম সংকটে আছি, তা কি আপনি দেখছেন না?’ তিনি বললেন, ‘এটি কোনো চরম সংকট নয়।’ তারা বলল, ‘তাহলে চরম সংকট কী?’ তিনি বললেন, ‘মানুষের কাছে মুখাপেক্ষী হওয়া।’ এরপর তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি আমাদের আপনার ক্ষমতা দেখিয়েছেন, এবার আপনার ক্ষমা দেখান।’ তখন সমুদ্র এমন শান্ত হয়ে গেল যেন তা এক গ্লাস তেল।
খালফ ইবনু তামিম বলেন, আমি আবু রাজা আল-হারাভীর মসজিদে ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে আসলেন, নেমে তাকে সালাম দিলেন এবং বিদায় নিলেন। আবু রাজা আমাকে তার সম্পর্কে জানালেন যে, তিনি ইবরাহিম ইবনু আদহামের সাথে সমুদ্রে একটি জিহাদের সফরে একই জাহাজে ছিলেন। তাদের উপর বাতাস আঘাত করেছিল এবং তারা ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তখন তারা সমুদ্রের মধ্যে এক আহ্বানকারীকে সর্বোচ্চ স্বরে বলতে শুনলো, ‘তোমরা ভয় পাচ্ছো, অথচ তোমাদের মধ্যে ইবরাহিম আছেন!’১৪
আবদুল্লাহ ইবনে আল-ফারজ আল-কান্তারি আল-আবেদ বলেন, আমি হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহমাতুল্লাহি আলাইহি-কে শাম অঞ্চলের একটি বাগানে দেখেছি। তিনি শুয়ে ছিলেন, ঘুমাচ্ছিলেন। তার মুখের সামনে একটি সাপ ছিল, যার মুখে তেজস্ক্রিয় একটি শক্তি ছিল, কিন্তু তা তাকে স্পর্শ করতে পারছিল না। সাপটি বারবার আক্রমণ করার চেষ্টা করলেও কোনো ক্ষতি করতে পারেনি, যতক্ষণ না হজরত ইব্রাহীম জেগে উঠলেন।
উসমান ইবনু উমারা, ইবরাহিমম ইবনু আদহাম (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন, ইবরাহিম ইবনু আদহাম (রহ.) বললেন, আমি সমরকন্দের অধিবাসী মুসলিম আল-আওয়ার নামক এক ইবাদতকারী ব্যক্তির সঙ্গী হয়েছিলাম। আমরা যখন সমরকন্দের কাছাকাছি পৌঁছালাম, তখন তিনি বললেন, ‘হে আমার ইলাহ, আপনি অলসদের রিজিক দেবেন না এবং জালিমদের প্রতি দয়া দেখাবেন না।’ তখন আকাশ থেকে একটি আওয়াজ এলো, যা আমি শুনতে পেলাম। ‘এই ধরনের কথা তার পক্ষেই শোভা পায়, যে মনে করে আল্লাহর কোনো শরিক আছে, অথচ তুমি তো একজন সৃষ্টি।’ এরপর আমি দেখলাম, আকাশ থেকে একটি লাল চাকতি নেমে এলো এবং তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিল। আমার অন্তরে এক তীব্র ভয় সৃষ্টি হলো। হঠাৎ আমার ডান পাশে সাদা পোশাক পরিহিত একজন বৃদ্ধকে দেখলাম, তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর বান্দা, তুমি এই ধরনের লোকের সঙ্গী হয়ো না।’ এরপর তিনি আমার কাছ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন এবং আমি তাঁকে আর দেখতে পেলাম না।’
সালিহ ইবনু সুলাইমান বলেছেন, ইবরাহিম ইবনে আদহামের এক দিনারের প্রয়োজন হলো। তিনি তখন সমুদ্রের তীরে ছিলেন। আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। তখন মাছেরা ঢেউ দিয়ে তীরে আসতে লাগল এবং প্রত্যেকটি মাছের মুখে একটি করে দিনার ছিল। তিনি মাছগুলো থেকে শুধু একটি দিনার নিলেন।১৫
বাণী ও নসিহত:
মুসাইয়্যাব ইবনে ওয়াদিহ বলেন, আমাদের কাছে আবু ‘উতবাহ আল-খওয়াস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি ইবরাহিম ইবনে আদহামকে বলতে শুনেছি—“যে ব্যক্তি তাওবা করতে চায়, সে যেন অন্যায়-অত্যাচার (মানুষের হক নষ্ট করা) থেকে বেরিয়ে আসে, মানুষের সাথে অতিরিক্ত মেলামেশা ত্যাগ করে। অন্যথায় সে তাওবার কাঙ্ক্ষিত ফল পাবে না।”
আবদুর রহমান ইবনে মাহদী, তালূত থেকে বর্ণনা করেন, আমি হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহমাতুল্লাহি আলাইহি-কে বলতে শুনেছি,“যে বান্দা খ্যাতিকে ভালোবাসে, সে কখনও আল্লাহর সাথে সত্যবাদী হতে পারে না।”
হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “যে রাজা ন্যায়পরায়ণ নয় সে ডাকাতের সমান। যে আলেম খোদাভীরু নয় সে নেকড়ে-শেয়ালের সমান। আর যে আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে নিজেকে হীন করে, সে কুকুরের সমান।”
ইব্রাহিম ইবনে আদহাম রহমাতুল্লাহি আলাইহি আরও বলেছেন,“আহ, কী চমৎকার হতো, যদি এ দীনের প্রকৃত রক্ষক পুরুষ থাকত! যে জ্ঞান আল্লাহর জন্য অর্জন করে, তার কাছে অখ্যাতি প্রিয় হয়ে ওঠে খ্যাতির চেয়ে। আল্লাহর কসম, জীবন এমন কোনো ভরসার জিনিস নয় যে তার বিশ্রামের আশায় থাকা যায়। আর মৃত্যু এমন কোনো নিশ্চয়তাপূর্ণ বিষয় নয় যে তা থেকে নিরাপদ থাকা যায়। তাহলে কেন এই অবহেলা, আলস্য, ভরসার ভান আর দেরি? আমরা আমাদের আমল থেকে শুধু নামকাওয়াস্তে কিছু নিচ্ছি, তাওবা চাওয়ায় দেরি করছি, আর স্থায়ী জীবনের পরিবর্তে ক্ষণস্থায়ী জীবনের সাথে মগ্ন হয়ে আছি।”১৬
আমি আহমাদ ইবনু আলী ইবনুল হাসান আল-মুকরীকে বলতে শুনেছি, তিনি মুহাম্মাদ ইবনু গালিব আত-তামতামকে বলতে শুনেছেন, ইবরাহিম ইবনু আদহাম সুফিয়ান সাওরীর কাছে লিখেছিলেন, “যে ব্যক্তি জানে যে সে কী চাচ্ছে, তার জন্য যা কিছু উৎসর্গ করতে হয়, তা সহজ হয়ে যায়। যে ব্যক্তি তার দৃষ্টিকে স্বাধীন করে দেয়, তার আফসোস দীর্ঘ হয়। যে ব্যক্তি তার আশাকে দীর্ঘ করে, তার আমল খারাপ হয়ে যায়। যে ব্যক্তি তার জিহ্বাকে স্বাধীন করে দেয়, সে নিজেকে হত্যা করে।”১৭
ইবরাহিম ইবনে আদহাম (রহ.) বলেছেন, “বাতিলের প্রতি অধিক দৃষ্টিপাত অন্তর থেকে সত্যের জ্ঞান দূর করে দেয়।”
তিনি আরও বলেছেন, “ভিক্ষুকরা কতই না উত্তম, তারা আমাদের পরকালের পাথেয় বহন করে নিয়ে যায়। তাদের কেউ তোমাদের একজনের দরজায় এসে বলে, ‘আপনারা কি (আল্লাহর পথে) কিছু পাঠাবেন?”
ইবরাহিম ইবনে আদহাম (রহ.) বলেছেন, “আমি এক ইবাদতকারী ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করলাম, যার সম্পর্কে বলা হতো যে, তিনি রাতে ঘুমান না। আমি তাকে বললাম, ‘আপনি কেন ঘুমান না?’ তিনি বললেন, ‘কুরআনের আশ্চর্যজনক বিষয়গুলো আমাকে ঘুমোতে দেয় না।”১৮
ইন্তেকাল:
তিনি ১২৬ হিজরিতে জাজিরাতে ইন্তেকাল করেন। তাঁকে লেবাননের সুর নামক শহরে দাফন করা হয়। সেখানে তাঁর মাজার শরিফ রয়েছে।১৯