এমন সুফি আছেন, যাঁদের জীবন সাধারণ বোধের সীমা অতিক্রম করে। হজরত বাহলুল রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন তেমনই এক আল্লাহওয়ালা—দুনিয়ার চোখে যিনি ‘পাগল’, কিন্তু আখিরাতের মানদণ্ডে ছিলেন এক প্রাজ্ঞ আরিফ। আব্বাসীয় যুগের রাজকীয় জৌলুসের মাঝেও তিনি বেছে নিয়েছিলেন জুহদ, ফকিরি ও আত্মগোপনের পথ।
দুনিয়ার মোহ ও ক্ষমতার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ‘মাজনুন’-এর বেশ ধারণ করেন, যাতে নির্ভয়ে সত্য বলতে পারেন। তাঁর সরল কথার আড়ালে লুকিয়ে ছিল গভীর হিকমত ও আখিরাতমুখী উপদেশ।
প্রাথমিক পরিচিতি:
তাঁর নাম বাহলুল ইবনে আমর, আবু ওয়াহিব আল-সাইরাফি আল-মাজনুন। বাহলুল দানা নামেও খ্যাত। তিনি কুফার অধিবাসী ছিলেন। তিনি আয়মান বিন নাবিল, আমর বিন দিনার এবং আসিম বিন আবি আল-নাজুদ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি ছিলেন ‘মজ্জুব অলিদের’ একজন। তাঁর কথা ছিল অত্যন্ত চমৎকার, সরস এবং উপদেশমূলক। খলিফা হারুনুর রশিদ তাঁর কথা শোনার জন্য তাঁকে দরবারে ডেকে পাঠাতেন।১
তারিখে গুজিদা’ গ্রন্থে হামদুল্লাহ আল-মুস্তাওফি লিখেছেন, তিনি ছিলেন আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের নিকটাত্মীয়দের অন্তর্ভুক্ত এবং মহান ইমাম জাফর আস-সাদিক (রহ.)-এঁর শিষ্য। তিনি তাঁর যুগের অন্যতম পরহেজগার ও মুত্তাকি ব্যক্তি।”২
জুহদের গল্প:
হজরত সাররি আস-সাকতি (রহ.) বলেন, একদিন আমি কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি বাহলুল (রহ.) একটি কবরের ভেতর পা ঝুলিয়ে বসে মাটি নিয়ে খেলছেন।
আমি বললাম, ‘তুমি এখানে কেন?’
তিনি বললেন,‘হ্যাঁ, আমি এমন লোকদের কাছে আছি যারা আমাকে কষ্ট দেয় না; আর আমি তাদের থেকে দূরে থাকলেও তারা আমার গিবত করে না।’
আমি বললাম, ‘হে বাহলুল, এখন তো রুটির দাম অনেক বেড়ে গেছে।’
তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম, তাতে আমার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এক দানা শস্যের মূল্য যতটুকুই হোক না কেন। আমাদের দায়িত্ব হলো— তিনি যেমন আদেশ করেছেন, তেমনভাবে তাঁর ইবাদত করা; আর তাঁর দায়িত্ব হলো তিনি যেমন ওয়াদা করেছেন, তেমনভাবে আমাদের রিজিক দান করা।’
এরপর তিনি আমার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে গেলেন এবং বলতে লাগলেন—
يا من تمتع بالدنيا وزينتها … ولا تنام عن اللذات عيناه
افنيت عمرك فيما لست تدركه … تقول لله مإذا حين تلقاه
হে সেই ব্যক্তি,
যে দুনিয়া ও তার সাজসজ্জায় মগ্ন,
যার চোখ কখনো ভোগবিলাস থেকে নিদ্রা যায় না,
তুমি তোমার জীবন শেষ করে ফেলেছ এমন কিছুর পেছনে—
যা তুমি কখনোই অর্জন করতে পারবে না;
আল্লাহর সামনে দাঁড়ালে তখন কী জবাব দেবে—
সে কথা কি কখনো ভেবে দেখেছ?
অপর বর্ণনায় এসেছে, সাররি আস-সাকত্বি (রহ.) বর্ণনা করেন, “একদিন আমি কবরস্থানের দিকে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, বাহলুল একটি কবরের ভেতর পা ঝুলিয়ে বসে মাটি ছুঁড়ে খেলছেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে বাহলুল, তুমি এখানে কী করছ?” তিনি বললেন, “আমি এমন লোকদের কাছে আছি যারা আমাকে কষ্ট দেয় না; আর আমি তাদের থেকে দূরে থাকলেও তারা আমার গিবত করে না।”
আমি বললাম,“তুমি কি ক্ষুধার্ত নও?’
তিনি মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকালেন এবং বলতে লাগলেন—
نجوع فان الجوع من علم التقي … وان طويل الجوع يوما سيشبع
“ক্ষুধার্ত হই, কারণ ক্ষুধার মধ্যে তাকওয়ার জ্ঞান নিহিত। দীর্ঘ ক্ষুধার্ত থাকলেও একদিন তৃপ্তি পাব।”
আমি বললাম, “হে বাহলুল, এখন রুটির দাম অনেক বেড়ে গেছে।”
তিনি বললেন,“আল্লাহর কসম, তাতে আমার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই; এক দানা শস্যেরও মূল্য যতটুকু হোক না কেন। আমাদের দায়িত্ব হলো তিনি যেমন আল্লাহ আদেশ করেছেন, তেমনভাবে তাঁর ইবাদত করা; আর তাঁর দায়িত্ব হলো তিনি যেমন তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তেমনভাবে আমাদের রিজিক দান করা।”
এরপর তিনি আমার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে গেলেন এবং বলতে লাগলেন—
أف للدنيا فليست لي بدار … انما الراحة في دار القرار
أبت الساعات الا سرعة … في بلي جسمي بليل ونهار
হায় আপসোস, এই দুনিয়ার জন্য! আমার জন্য এখানে কোনো স্থায়ী বাস নেই; প্রকৃত শান্তি শুধু কবরস্থানে।
সময় কখনো থেমে থাকে না, দ্রুত অতিক্রম করে;
রাত-দিন আমার শরীরকে পরীক্ষা করছে, আমার ধৈর্যকে যাচাই করছে।৩
খলিফা হারুনুর রশিদ ও বাহলুল:
ফদ্বল ইবনে আল-রাবি বর্ণনা করেন, “আমি খলিফা হারুনুর রশিদের সাথে হজ করতে যাচ্ছিলাম। আমরা যখন কুফা অতিক্রম করছিলাম, তখন দেখলাম বাহলুল মাজনুন আপন মনে প্রলাপ বকছেন। আমি তাঁকে ধমক দিয়ে বললাম, ‘চুপ করো, আমিরুল মুমিনীন আসছেন।’
তিনি চুপ হয়ে গেলেন। যখন খলিফার হাওদা (উটের পিঠের আসন) তাঁর বরাবর পৌঁছাল, তখন বাহলুল বলে উঠলেন, “হে আমিরুল মুমিনীন, আয়মান ইবনে নাবিল আমাকে হাদিস শুনিয়েছেন, তিনি কুদামাহ ইবনে আব্দুল্লাহ আল-আমেরি থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, আমি রসুলুল্লাহ ﷺ-কে মিনায় একটি উটের পিঠে সওয়ার অবস্থায় দেখেছি যার নিচের আসনটি ছিল অতি জরাজীর্ণ; সেখানে কোনো লাঠিপেটা, মানুষের ভিড় সরানো বা ‘সরে দাঁড়াও, সরে দাঁড়াও’ (ইলেক, ইলেক!) বলে কোনো চিৎকার ছিল না।”
আমি (ফদ্বল) বললাম, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, ও তো বাহলুল পাগল।’
খলিফা বললেন, ‘আমি তাকে চিনি।’ তারপর বাহলুলকে বললেন, ‘বলে যাও হে বাহলুল।
তখন বাহলুল এই কবিতাটি পাঠ করলেন—
هب انك قد ملكت الارض طرا … ودان لك البلاد فكان مإذا؟
اليس غدا مصيرك ترب … ويحثو الترب هذا ثم هذا؟
ধরে নিন, আপনি পুরো পৃথিবীর অধিপতি হয়ে গেছেন…
সব দেশ ও জনপদ আপনার অনুগত হয়েছে, কিন্তু তারপর কী?
আগামীকাল কি আপনার ঠিকানা হবে না সেই কবরের মাটি?…
যেখানে এই মানুষটি আর ওই মানুষটি মিলে আপনার ওপর কেবল মাটিই ছুড়ে দেবে!
খলিফা বললেন, ‘চমৎকার বলেছ হে বাহলুল, আরও কিছু বলো।’
বাহলুল বললেন, ‘হ্যাঁ, হে আমিরুল মুমিনীন, যাকে আল্লাহ সৌন্দর্য এবং সম্পদ দান করেছেন, অতঃপর সে তার সৌন্দর্যের ব্যাপারে পবিত্রতা রক্ষা করেছে এবং সম্পদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করেছে (সঠিক পথে ব্যয় করেছে), তার নাম পুণ্যবানদের দপ্তরে লিখে রাখা হয়।’
খলিফা মনে করলেন বাহলুল হয়তো কোনো পার্থিব সাহায্য চাইছেন, তাই তিনি বললেন, ‘আমরা আপনার ঋণ পরিশোধ করার আদেশ দিয়েছি।’
বাহলুল বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, এমনটা করবেন না! অন্যের ঋণ দিয়ে নিজের ঋণ শোধ করবেন না (অর্থাৎ জনগণের বায়তুল মালের টাকা দিয়ে আমার ব্যক্তিগত ঋণ শোধ করবেন না)। বরং হকের পাওনা হকের মালিককে ফিরিয়ে দিন এবং নিজের আমল দিয়ে নিজের হিসাব চুকিয়ে নিন।’
খলিফা বললেন, ‘আমরা আপনার জন্য একটি স্থায়ী ভাতার ব্যবস্থা করার আদেশ দিচ্ছি।’
বাহলুল বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, এমনটা করবেন না। আল্লাহ কি আপনাকে দেবেন আর আমাকে ভুলে যাবেন? যিনি আপনাকে রিজিক দিচ্ছেন, তিনি আমাকেও দিচ্ছেন। আপনার ওই ভাতার আমার কোনো প্রয়োজন নেই।’৪
খাবার নিয়ে একটি মজার গল্প:
আল-আসমায়ি বলেন, আমি বাহলুলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, তাঁর সাথে ছিল ‘খুবাইস’ (এক প্রকার সুস্বাদু হালুয়া বা মিষ্টি)। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার কাছে ওটা কী?’
তিনি বললেন, ‘খুবাইস।’
আমি বললাম, ‘আমাকে কিছুটা খেতে দিন।’
তিনি উত্তর দিলেন, ‘এটি আমার নয়।’
আমি বললাম, ‘তবে এটি কার?’
তিনি বললেন, ‘এটি হারুনুর রশিদের কন্যা হামদুনার; তিনি এটি পাঠিয়েছেন যেন আমি তাঁর পক্ষ থেকে এটি খেয়ে ফেলি।’
(অর্থাৎ, বাহলুল বুঝাতে চেয়েছেন তিনি হামদুনার পক্ষ থেকে এটি খাওয়ার দায়িত্ব পেয়েছেন, তাই অন্যকে দেওয়ার অধিকার তাঁর নেই; যা তাঁর সততা ও পাগলামির ছলে বুদ্ধিমত্তারই বহিঃপ্রকাশ)।৫
পাথরের আঘাতের বদলে মমতাবোধের গল্প:
হাসান বিন সাহল বলেন, ‘আমি দেখলাম একদল শিশু বাহলুলকে লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়ে মারছে। পাথরের আঘাতে তাঁর শরীর থেকে রক্ত ঝরতে শুরু করল। তখন তিনি এই কবিতাটি আবৃত্তি করছিলেন—
حسبي الله توكلت عليه….. من نواصي الخلق طراً بيديه
ليس للهارب في مهربه…. أبداً من راحة إلا إليه
رب رام لي بأحجار الأذى…. لم أجد بدأ من العطف عليه
‘‘আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, আমি কেবল তাঁর ওপরই ভরসা করি;
সৃষ্টিজগতের সকলের ভাগ্যললাট তো তাঁরই কুদরতি হাতে।
পলায়নপর কোনো ব্যক্তির পলায়নস্থলেও কখনো শান্তি নেই;
আল্লাহর আশ্রয় ছাড়া অন্য কোথাও কোনো স্বস্তি নেই।
কত জন আমাকে কষ্টের পাথর ছুঁড়ে মারছে;
অথচ আমি তাদের প্রতি মমতা না দেখিয়ে পারছি না।’
আমি (হাসান বিন সাহল) অবাক হয়ে বললাম, ‘তারা আপনাকে পাথর মারছে, আর আপনি তাদের প্রতি মমতা দেখাচ্ছেন?’ বাহলুল উত্তর দিলেন, ‘চুপ করো, হয়তো আল্লাহ আমার দুঃখ-বেদনা এবং এই শিশুদের (খেলার ছলে পাওয়া) চরম আনন্দটুকু দেখবেন; ফলে (দয়াময় আল্লাহ) আমাদের একজনের ওসিলায় অন্যজনকে ক্ষমা করে দেবেন।’৬
প্রজ্ঞায় পূর্ণ কিছু ঘটনা:
১. ফদ্বল ইবনে সুলাইমান বর্ণনা করেন, বাহলুল প্রায়ই সুলাইমান ইবনে আলীর কাছে আসতেন। সুলাইমান কিছুক্ষণ তাঁর কথা শুনে হাসাহাসি করতেন, তারপর বাহলুল চলে যেতেন। একদিন তিনি এলেন এবং সুলাইমান কিছুক্ষণ হাসাহাসি করার পর জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কাছে খাওয়ার মতো কিছু আছে?’
দেখলেনি, কিছু নেই। অতঃপর সুলাইমান তাঁর গোলামকে বললেন, ‘বাহলুলকে কিছু রুটি আর জয়তুন দাও।’ বাহলুল তা খেলেন এবং যাওয়ার সময় সুলাইমানকে বললেন, ‘হে বন্ধু, ঈদের দিন যদি আপনার বাড়িতে আসি, তখন কি গোশত পাওয়া যাবে?’ এ কথা শুনে সুলাইমান লজ্জিত হলেন (অর্থাৎ বাহলুল বুঝিয়ে দিলেন যে সাধারণ দিনে আপনি আমাকে সামান্য খাবার দিচ্ছেন)।
২. বাহলুল কুফার এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির কাছে গিয়ে বললেন, ‘আমার আজ মধু এবং গোবর খাওয়ার খুব ইচ্ছা করছে।’ সেই ব্যক্তি তাঁর সামনে মধু ও গোবর উভয়ই পেশ করলেন। বাহলুল কেবল মধু খেতে শুরু করলেন এবং পেট ভরে খেলেন।
লোকটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি যে বললেন গোবর খাবেন, তা খাচ্ছেন না কেন?’ বাহলুল উত্তর দিলেন, ‘ভাই, আজকে শুধুই মধু খেতে বেশি সুস্বাদু লাগছে!’ (এটি বাহলুলের উপস্থিত বুদ্ধির একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত)।
৩. একদিন শিশুরা বাহলুলকে বিরক্ত করছিল, তিনি তাদের হাত থেকে বাঁচতে দৌড়ে একটি খোলা দরজা দিয়ে এক বাড়িতে ঢুকে পড়লেন। বাড়ির মালিক সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যাঁর মাথায় দুটি ঝুটি (বেণী) ছিল। মালিক চিৎকার করে বললেন, ‘তুমি আমার বাড়িতে কেন ঢুকেছ?’ বাহলুল (তাঁকে দেখে ও তাঁর মাথার ঝুটি দেখে আল-কুরআনের ভাষায়) উত্তর দিলেন, ‘হে জুলকারনাইন, নিশ্চয় ইয়াজুজ ও মাজুজ পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে (অর্থাৎ শিশুরা আমাকে তাড়া করছে)!’ (সুরা আল-কাহাফ: ৯৪)।৭
ওফাত:
তিনি ১৯০ হিজরির কাছাকাছি সময়ে বাগদাদে ইন্তেকাল করেন।৮