এক আলোকিত আত্মার নাম হজরত সাররি আস-সাকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তাসাউফ ও আধ্যাত্মিকতার জগতে যাঁর নাম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় উচ্চারিত হয়। হজরত মারুফ কারখি (রহ.)-এঁর প্রিয় শাগরিদ এবং হজরত জুনাইদ বাগদাদি (রহ.)-এঁর আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। তাঁর অন্তর ছিল আল্লাহপ্রেমে নিমগ্ন, জীবন ছিল বিনয় ও জিকিরে ভরপুর। যিনি দুনিয়াকে হাতের মুঠোয় রেখে হৃদয়কে আল্লাহর দরবারে সমর্পণ করেছিলেন।
প্রাথমিক পরিচিতি:
মহান ইমাম, আদর্শ ব্যক্তিত্ব, শায়খুল ইসলাম সবটাই তাঁর অভিধা। তাঁর নাম সাররি ইবনুল মুগাল্লিস আস-সাকতি, তাঁর উপনাম আবুল হাসান, তাকে বাগদাদের দিকে নিসবত করে আল-বাগদাদি বলা হয়। তাঁর পূর্ণ নাম হজরত আবুল হাসান সাররি ইবনুল মুগাল্লিস আস-সাকতি আল-বাগদাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তাঁর জন্ম হয়েছিল হিজরি প্রায় ১৬০ সালের দিকে।১
ইলম অর্জন:
তিনি ইলমে দ্বীন ও হাদিস শিক্ষা গ্রহণ করেছেন নিম্নোক্ত মহামানবদের কাছ থেকে। ফুদ্বাইল ইবনু ইয়াদ্ব, হুশাইম ইবনু বাশীর, আবু বকর ইবনু আ’ইয়াশ, আলী ইবনু গুরাব, ইয়াযিদ ইবনু হারুন এবং তাঁদের মতো আরও অনেকের কাছ থেকে, তবে তাঁর বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা অল্প ছিল। তিনি ইবাদতে গভীরভাবে নিমগ্ন ছিলেন এবং আধ্যাত্মিক সাধক হজরত মারুফ কারখি রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এঁর সোহবত লাভ করেছিলেন। তিনি তাঁর শ্রেষ্ঠ শিষ্যদের অন্যতম ছিলেন।২
তাঁর শিষ্য:
তাঁর কাছ থেকে ইলম ও হাদিস শিক্ষা গ্রহণ করেছেন— হজরত জুনাইদ ইবনু মুহাম্মদ (জুনাইদ বাগদাদি), আবুল হুসাইন আন-নুরী, আবুল আব্বাস ইবনু মাসরুক, ইবরাহিম ইবনু আব্দুল্লাহ আল-মুখাররিমী এবং আবদুল্লাহ ইবনু শাকির-সহ আরো অনেকে।৩
ইবাদত-বন্দেগি:
আবদুল্লাহ ইবনু শাকির (রহ.) হজরত সাররি আস-সাকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছ থেকে বর্ণনা করেন,“এক রাতে আমি আমার নফলের নামাজ আদায় করলাম, তারপর মিহরাবের ভিতরেই পা প্রসারিত করলাম। তখন একটি আওয়াজ এলো—‘হে সাররি, তুমি কি এভাবেই রাজাদের সান্নিধ্যে বসো?’ আমি সঙ্গে সঙ্গে পা গুটিয়ে নিলাম এবং বললাম,‘হে আমার প্রভু, আপনার মহিমার কসম, আমি আর কখনো পা প্রসারিত করব না।’
হজরত ফাররুখানী (রহ.) বলেন, আমি হজরত জুনাইদ বাগদাদি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি,“আমি আল্লাহর ইবাদতে হজরত সাররি আস-সাকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এঁর চেয়ে বেশি নিবেদিত কাউকে দেখিনি। তিনি আটানব্বই বছর জীবিত ছিলেন এবং এই দীর্ঘ জীবনে তাঁকে কখনো শোয়া অবস্থায় দেখা যায়নি। কেবল মৃত্যুর অসুস্থতার সময় ছাড়া।”
হজরত জুনাইদ বাগদাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি হজরত সাররি আস-সাকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি-কে বলতে শুনেছি,“কোনো কোনো দিন আমার ওজিফা (নফল আমল বা নির্দিষ্ট জিকিরের অংশ) মিস হয়ে যায়; কিন্তু আমি কখনো তা কাজা করতে পারি না, কারণ আমার সময়সমূহ ইতোমধ্যেই আল্লাহর স্মরণে সম্পূর্ণ নিমগ্ন থাকে।”৪
খোদাভীতি:
আবু বকর আল-হারবী (রহ.) বলেন, আমি হজরত সাররি আস-সাকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি-কে বলতে শুনেছি, “একবার আমি আল্লাহর প্রশংসা করেছিলাম (আলহামদুলিল্লাহ বলেছিলাম), আর সেই প্রশংসার জন্যই আমি গত ত্রিশ বছর ধরে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইছি।”তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, “হে শায়খ, কেন এমন?” তিনি বললেন, “আমার একটি দোকান ছিল, সেখানে কিছু পণ্য রাখা ছিল। একদিন বাজারে আগুন লাগল। তখন এক ব্যক্তি এসে আমাকে বলল, ‘খুশির খবর নিন, আপনার দোকানটি আগুন থেকে রক্ষা পেয়েছে।’আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’কিন্তু পরে চিন্তা করে দেখলাম, আমি তো শুধু নিজের দোকান বাঁচার কারণে আল্লাহর প্রশংসা করেছি, অন্যদের ক্ষতি নিয়ে মনোভাব প্রকাশ করিনি। এজন্যই আমি এটাকে একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছি।”
হজরত জুনাইদ বাগদাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি হজরত সাররি আস-সাকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি-কে বলতে শুনেছি, “আমি প্রতিদিন আমার নাকে তাকাই, এই আশঙ্কায় যে, আমার মুখ হয়তো কালো হয়ে গেছে (আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণে)। আর আমি চাই না যে, এমন স্থানে মৃত্যুবরণ করি, যেখানে মানুষ আমাকে চেনে, কারণ ভয় হয়— যদি মাটি আমাকে গ্রহণ না করে, তাহলে মানুষ তা দেখে ফেলবে এবং আমি লজ্জিত হব।”৫
জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলেন, ‘আমি এক গ্রীষ্মের দিনে সাররি আস-সাকতির কাছে প্রবেশ করলাম। তখন দেখলাম, যে মটকা থেকে তিনি পানি পান করতেন, সেটি সূর্যের আলোতে রাখা আছে। আমি বললাম, ‘হে আমার শায়খ, মটকাটি তো সূর্যের আলোতে।’ তিনি বললেন, ‘হে আবুল কাসিম, তুমি ঠিকই বলেছ। এটি ছায়াতেই ছিল, কিন্তু সূর্য আলো নিয়ে সেদিকে চলে এসেছে। আমার নফস আমাকে বলল যে, মটকাটি ছায়ায় সরিয়ে দিতে। কিন্তু আমি আল্লাহ তায়ালার সামনে লজ্জিত হলাম যে, এমন একটি পদক্ষেপ নেব, যার মধ্যে আমার নফসের জন্য সামান্যতম আরাম রয়েছে।”৬
দুনিয়াবিমুখতা ও আধ্যাত্মিক পদচারণা:
বলা হয়, একদিন হজরত সাররি আস-সাকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি দেখলেন, এক দাসী মেয়ের হাত থেকে একটি মাটির পাত্র পড়ে ভেঙে গেছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে নিজের দোকান থেকে আরেকটি পাত্র এনে তাকে দিয়ে দিলেন। এ দৃশ্য দেখে তাঁর আধ্যাত্মিক পীর হজরত মারুফ কারখী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁকে দোয়া করলেন— “আল্লাহ তায়ালা যেন তোমার অন্তরে দুনিয়াকে অপছন্দনীয় করে দেন।”
হজরত সাররি আস-সাকতি (রহ.) বলেন,“আজ আমি যে অবস্থায় আছি, তা হজরত মারুফ কারখী (রহ.)-এঁর সেই দোয়ারই বরকত।”
হজরত জুনাইদ বাগদাদী রহ. বলেন, “আমি সাররি আস-সাকতি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “আমি গত ত্রিশ বছর ধরে একটি সাধারণ খাবার তথা তিনটি গাজরকে খেজুরের সিরায় ডুবিয়ে খাওয়ার ইচ্ছা করছি। কিন্তু এখনো সে সুযোগ আমার হয়নি।”
তিনি আরও বলতেন,“আমি চাই এমন একটি খাদ্য খেতে, যার জন্য আল্লাহর কাছে কোনো জবাবদিহিতা থাকবে না এবং কোনো মানুষও যেন আমার প্রতি তাতে উপকার বা অনুগ্রহশীল না হয়। কিন্তু আমি আজ পর্যন্ত এমন খাবার পেতে সক্ষম হইনি।”৭
হজরত জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলছেন— তিনি হজরত সাররি আস-সাকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন,“আমি জান্নাতে যাওয়ার একটি সংক্ষিপ্ত ও সহজ পথ জানি।”আমি বললাম, “সেটা কী?” তিনি বললেন,“কারো নিকট কিছু চাইবে না, কারও কাছ থেকে কিছু নেবে না এবং তোমার কাছে এমন কিছু থাকবে না, যা তুমি কাউকে দিতে পারো।”৮
তাঁর জুহদের কারণ:
সাররি সাকতি মাঝে মাঝে মারুফ আল-কারখীর কাছে যেতেন। একদিন মারুফ একটি এতিম ছেলেকে নিয়ে তাঁর দোকানে আসলেন এবং বললেন, ‘এই এতিমকে কাপড় পরিয়ে দাও।’ সাররি বলেন, ‘আমি তাকে কাপড় পরিয়ে দিলাম (কিনে বা নিজের কাছে থাকা কাপড়)। এতে মারুফ খুব খুশি হলেন এবং আমাকে বললেন, ‘আর আল্লাহ আপনাকে আপনি যা কিছুর মধ্যে আছেন (অর্থাৎ, দুনিয়ার ব্যস্ততা), তা থেকে শান্তি দিন।” অতঃপর আমি দোকান থেকে উঠে দাঁড়ালাম। তখন দুনিয়ার চেয়ে আমার কাছে আর কোনো জিনিস বেশি অপছন্দ ছিল না। আমি আজ যে অবস্থায় আছি, তা মারুফ আল-কারখীর দোয়ার বরকতেই হয়েছে।৯
ইলমুত তাসাউফের বিকাশে তাঁর অবদান:
ইমাম আবু আবদুর রহমান আস-সুলামী (রহ.) বলেন, “হজরত সাররি আস-সাকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি-ই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি বাগদাদ নগরীতে তাওহিদের ভাষা প্রকাশ্যে প্রচার করেন এবং আল্লাহর সত্য জ্ঞানের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। তিনিই ছিলেন বাগদাদের সুফিদের মধ্যে ‘ইশারাত’ তথা আধ্যাত্মিক প্রতীক ও ইঙ্গিতভিত্তিক তাসাউফি ভাষার ইমাম।”১০
স্বপ্নে আল্লাহর সাথে কথোপকথন:
জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলেন, “আমি একবার সাররি আস-সাকতি (রহ.)-এঁর দরবারে ঘুমিয়ে ছিলাম। তিনি আমাকে জাগিয়ে বললেন, ‘হে জুনাইদ, আমি যেন স্বপ্নে আল্লাহ তায়ালার সামনে উপস্থিত হয়েছিলাম। আল্লাহ তায়ালা আমাকে বললেন, ‘হে সাররি, আমি যখন সৃষ্টিকে সৃষ্টি করলাম, তখন তারা সকলেই আমার ভালোবাসার দাবি করল। তারপর আমি দুনিয়া সৃষ্টি করলাম, তখন তাদের দশ ভাগের নয় ভাগই আমার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল, আর মাত্র একভাগ আমার সাথে রইল। এরপর আমি জান্নাত সৃষ্টি করলাম। তখন সেই এক-দশমাংশেরও দশ ভাগের নয় ভাগ জান্নাতের লোভে আমার কাছে থেকে দূরে সরে গেল; কেবল এক-দশমাংশের একভাগ আমার সাথে রইল। তারপর আমি তাদের ওপর এক কণা পরিমাণ বিপদ নাজিল করলাম, তাতেও সেই সামান্য দলটির নয়ভাগ আমাকে ছেড়ে পালিয়ে গেল। অবশেষে যারা রইল, তাদের আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমরা তো দুনিয়া চাওনি, জান্নাতও পাওনি, আবার জাহান্নাম থেকেও পালাতে চাওনি; তাহলে তোমরা আসলে কী চাও?’ তারা বলল, ‘আপনিই জানেন আমরা কী চাই।’ আমি বললাম, ‘আমি তোমাদের ওপর তোমাদের নিঃশ্বাসের সমান পরীক্ষা নাজিল করবো। এমন পরীক্ষা, যা বিশাল পর্বতও সহ্য করতে পারবে না। তোমরা কি ধৈর্য ধারণ করবে?’ তারা উত্তর দিল, ‘যদি আপনিই আমাদের পরীক্ষাকারী হন, তবে আপনার ইচ্ছামতো করুন।’ তখন আল্লাহ বললেন, ‘এরাই আমার প্রকৃত বান্দা।”১১
ব্যবসায়িক সততার গল্প:
আল্লান (রহ.) বলেন,“ একবার সাররি আস-সাকতি ৬০ দিনারের মূল্যে কাঠবাদাম কিনেছিলেন এবং তার হিসাবের খাতায় ৩ দিনার লাভ লিখেছিলেন। তখন কাঠবাদামের মূল্য ৯০ দিনার হয়ে যায়। একজন মধ্যস্থতাকারী এসে বলল, ‘আমি সেই কাঠবাদামটি চাই।’ সাররি বললেন, ‘নাও।’ মধ্যস্থতাকারী জিজ্ঞেস করল, ‘মূল্য কত?’ সাররি বললেন, ‘৬৩ দিনার।’মধ্যস্থতাকারী বলল, ‘কাঠবাদামের মূল্য এখন ৯০ দিনার।’ সাররি বললেন, ‘আমি আল্লাহর সঙ্গে একটি চুক্তি করেছি, যা আমি ভাঙব না; আমি এটি ৬৩ দিনারের বেশি বিক্রি করব না।’ মধ্যস্থতাকারী বললেন, ‘আমি আল্লাহর সঙ্গে চুক্তি করেছি, একজন মুসলিমকে ঠকাব না; তাই আমি শুধু ৯০ দিনার দিচ্ছি।’ ফলে মধ্যস্থতাকারী কিনলেন না এবং সাররিও বিক্রি করলেন না।”১২
মটকা ভাঙার স্বপ্ন:
জুনাইদ বাগদাদি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি সাররির কাছে প্রবেশ করলাম, তখন তিনি বসে কাঁদছিলেন এবং তাঁর সামনে একটি ভাঙা মটকা ছিল। আমি চুপ করে বসে থাকলাম যতক্ষণ না তিনি নীরব হলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী কারণে কাঁদছেন?’ তিনি বললেন, ‘আমি রোজা ছিলাম। আমার মেয়ে আমার জন্য মটকায় পানি এনে এক জায়গায় ঝুলিয়ে রেখে বলল, ‘এটি আপনার জন্য ঠান্ডা হবে, আপনি এটি দিয়ে ইফতার করবেন।
তখন আমার চোখে ঘুম চলে এলো। আমি স্বপ্নে দেখলাম যেন একটি দাসী এই দরজা দিয়ে আমার কাছে প্রবেশ করল, তার পরনে ছিল রূপার জামা, আর তার পায়ে ছিল এমন জুতো, যা আমি কোনোদিন দেখিনি। তার পায়ের সৌন্দর্য ঐ জুতোতে আরও বেড়ে গিয়েছিল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তুমি কার?’ সে বলল, ‘তার, যে সবুজ মটকায় পানি ঠান্ডা করে না।’ এরপর সে তার হাত দিয়ে মটকাটিতে আঘাত করল এবং তা ছুড়ে ফেলে দিল, যা এই (ভাঙা) অবস্থায় রয়েছে। তারপর আমি জেগে উঠলাম।’ জুনাইদ বাগদাদি বলেন, আমি দীর্ঘসময় তাঁর কাছে যাতায়াত করেছি। দেখতাম ভাঙা মটকাটি তাঁর সামনেই পড়ে আছে, তার ওপর ধূলো জমেছে, কিন্তু তিনি তা তুলতেন না।”১৩
তাঁর দোয়ার বরকত:
মুহাম্মদ বিন ইব্রাহিম বিন মুহাম্মদ বলেন, আমি আলী ইবনে আব্দুল হামিদ আল-গদ্বাইরি আল-হালাবিকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, “আমি হযরত সাররি আস-সাকত্বি এর কাছে গেলাম এবং তাঁর দরজায় করাঘাত করলাম। তিনি দরজার দুই পাশের খুঁটি ধরে দাঁড়ালেন। তখন আমি তাঁকে বলতে শুনলাম, ‘হে আল্লাহ, যে ব্যক্তি আমাকে আপনার কাছ থেকে বিমুখ করে (আপনার স্মরণে বাধা দিয়ে) ব্যস্ত রেখেছে, তাকে আপনি আপনার নিজের ইবাদত ও স্মরণে ব্যস্ত করে দিন।’ তাঁর এই দোয়ার বরকতে আমি হালাব (আলেপ্পো, সিরিয়া) থেকে চল্লিশ বার পায়ে হেঁটে হজ পালন করেছি। পায়ে হেঁটে গিয়েছি এবং পায়ে হেঁটে ফিরে এসেছি।”
কারামত:
মুজাফফর ইবন সাহেল আল-মুকরি বর্ণনা করেন, তিনি ʿআল্লান আল-খাইয়্যাতকে বলতে শুনেছিলেন, একদিন তাদের মধ্যে সাররি আস-সাকতির গুণাবলি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। তখন ʿআল্লান বললেন,“একবার আমি সাররি আস-সাকতির সঙ্গে বসে ছিলাম। তখন একটি মহিলা তার কাছে এসে বললেন, ‘হে আবুল হাসান, আমি আপনার প্রতিবেশী। আমার ছেলেকে পুলিশ আটক করেছে এবং আমি ভয় পাচ্ছি তারা তাকে কষ্ট দেবে। আপনি যদি চান তবে আমার সঙ্গে চলুন অথবা তার কাছে কাউকে পাঠিয়ে দিন।”
আল্লান বলেন, তিনি আশা করছিলেন যে, সাররি কাউকে পাঠাবেন। কিন্তু সাররি উঠে দাঁড়ালেন, তাকবির উচ্চারণ করলেন এবং দীর্ঘ সময় সালাত আদায় করতে লাগলেন। মহিলাটি দ্বিতীয় বার অনুরোধ জানালেন, “হে আবুল হাসান, আল্লাহর দোহাই, আমার ছেলের জন্য আমি ভয় পাচ্ছি, শাসক তাকে ক্ষতি করবে।”সালাত শেষ হতেই সাররি মহিলার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি তোমার প্রয়োজন পূরণে লেগে আছি।”আল্লান বলেন, আমি সেখান থেকে সরিনি। কিছু সময় পর আরেকটি মহিলা এসে প্রথম মহিলার কাছে বললেন, “দ্রুত যাও, তোমার ছেলেকে তারা ছেড়ে দিয়েছে।”১৫
কলব তিন প্রকার:
হজরত সাররি আস-সাকতি (রহ.) বলেন, “কলব তিন প্রকার।
১. একটি কলব পাথরের মতো দৃঢ়, যা কোনো শক্তিই সরাতে পারে না।
২. একটি কলব খেজুরের মতো, মূলটি স্থির কিন্তু বাতাসে হেলে যায়।
৩. একটি কলব পালকের মতো, যা হাওয়ার সঙ্গে উভয় দিকে সহজে ঝুঁকে যায়।”১৬
আর যার কলবে এই পাঁচটি বিষয় থাকে, তাঁর কলবে অন্য কোনো কিছু থাকেনা।
১. কেবল আল্লাহর ভয়।
২. কেবল আল্লাহর প্রতি আশা।
৩. কেবল আল্লাহর প্রেম।
৪. কেবল আল্লাহর প্রতি লজ্জা।
৫. কেবল আল্লাহর সাথে আত্মীয়তা ও আনন্দ।”১৭
মুরিদের দশটি মাকাম:
হজরত সাররি আস-সাকতি (রহ.) বলেছেন,“মুরিদের (আধ্যাত্মিক সাধক) জন্য দশটি পর্যায় রয়েছে।
১. নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা।
২. উম্মতের উপদেশের মাধ্যমে আল্লাহর সামনে শোভা অর্জন।
৩. কোরআনের সঙ্গে অন্তরঙ্গতা।
৪. আল্লাহর বিধানের প্রতি ধৈর্য।
৫. আল্লাহর কাজে প্রিয়দের উপেক্ষা বা ত্যাগ।
৬. আল্লাহর দৃষ্টিতে লজ্জা বা বিনয়।
৭. প্রিয় কাজের জন্য পরিশ্রম।
৮. সামান্যতেই সন্তুষ্টি।
৯. অল্পতেই তৃপ্তি।
১০. আত্মসংযম ও বিনয়।”১৮
আল্লাহভীরু ব্যক্তির দশটি মাকাম:
হজরত সাররি আস-সাকতি (রহ.) বলেছেন, আল্লাহভীরু ব্যক্তির জন্য দশটি স্তর রয়েছে।
১. অবিরাম দুঃখ।
২. প্রাধান্য বিস্তারকারী দুশ্চিন্তা।
৩. বিচলিতকারী ভয়।
৪. বেশি বেশি ক্রন্দন।
৫. দিন ও রাতে মিনতি।
৬. আরামের জায়গাগুলো থেকে পলায়ন।
৭. অধিক ব্যাকুলতা।
৮. অন্তরের অস্থিরতা।
৯. জীবনের আনন্দ নষ্ট হওয়া।
১০. তীব্র যন্ত্রণার (আবেগ) উপর নজর রাখা।১৯
আবদাল ব্যক্তিদের চারটি গুণ:
হজরত সাররি আস-সাকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আবদাল তথা আল্লাহর বিশেষ নেক বান্দাদের চারটি গুণ হলো
১. চূড়ান্ত পর্যায়ের পরহেজগারী।
২. নিয়তকে বিশুদ্ধ করা।
৩. সৃষ্টির প্রতি অন্তরকে পরিষ্কার রাখা।
৪. মানুষের জন্য সদা আন্তরিক উপদেশ দান করা।”২০
তরিকতের পরীক্ষা:
আবু হোসাইন মুহাম্মদ ইবনু আলী ইবনু হাবিশ বলেন, কাসেম ইবনু আব্দুল্লাহ আল-বাজ্জাজ থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, হজরত সাররি আস-সাকতি (রহ.) বলেছেন, “যদি কোনো ব্যক্তি এমন এক বাগানে প্রবেশ করে যেখানে আল্লাহ সৃষ্ট সকল প্রকারের গাছপালা আছে এবং তার ওপর আল্লাহর সৃষ্ট সকল প্রকারের পাখি আছে, আর সেই পাখিগুলোর প্রতিটি যদি নিজ নিজ ভাষায় তাকে সম্বোধন করে বলে, “আসসালামু আলাইকা ইয়া ওয়ালিয়্যাল্লাহ তথা হে আল্লাহর অলি, আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আর সে তাতে প্রশান্তি লাভ করে, তবে সে তাদের হাতে বন্দি হয়ে গেল।”২১
সত্যিকারের সাহসী ব্যক্তির পাঁচটি গুণাবলি:
আবু আব্দুল্লাহ আহমাদ ইবনু মুহাম্মদ ইবনু ইব্রাহীম আল-ইস্পাহানি বর্ণনা করেন, তিনি শুনেছেন হজরত সাররি আস-সাকতি (রহ.) বলেন, যদি পাঁচটি গুণ একজন মানুষের মধ্যে থাকে, সে সত্যিকারের বীর সাহসী।
১. আল্লাহর আদেশে স্থিরতা, যাতে কোনো উদাসীনতা থাকে না।
২. ত্যাগময় পরিশ্রম, যাতে ভুল থাকে না।
৩. সতর্কতা, যাতে অবহেলা থাকে না।
৪. আল্লাহর প্রতি গোপন ও প্রকাশ উভয় স্থানে পরিপূর্ণ নজরদারি, যাতে রিয়া থাকে না।
৫. মৃত্যুর প্রতি সদা প্রস্তুতি।”
জীবনের মৌলিক প্রয়োজন ও তাওয়াক্কুল:
হজরত সাররি আস-সাকতি (রহ.) বলেন, “পুরো দুনিয়া অপ্রয়োজনীয়, তবে পাঁচটি জিনিস ব্যতীত।
১. রুটি, যা ক্ষুধা মেটায়।
২. পানি, যা তৃষ্ণা মিটায়।
৩. পোশাক, যা শরীর আবৃত করে ও রক্ষা করে।
৪. ঘর, যা নিরাপত্তা দেয়।
৫. জ্ঞান, যা কাজে লাগে।
এছাড়া তাওয়াক্কুল হলো নিজের শক্তি ও ক্ষমতার উপর নির্ভরতা ছেড়ে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।”অর্থাৎ, জীবনের জন্য মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো এবং সৎ জ্ঞান ছাড়া সবকিছু অপ্রয়োজনীয়। জীবনকে সহজ ও সার্থক করার জন্য এই পাঁচটি মৌলিক দিক এবং তাওয়াক্কুলই যথেষ্ট।২৩
মানুষকে উন্নীত করার চারটি গুণ:
হজরত সাররি আস-সাকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “চারটি গুণ একজন মানুষকে অনেক উঁচুতে উন্নীত করে।
১. জ্ঞান, ২. শিষ্টাচার, ৩. শুদ্ধতা ও ইজ্জত, ৪. সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা।”২৪
সিদ্ধান্ত গ্রহণের তিনটি স্তর:
হজরত সাররি আস-সাকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের তিনটি স্তর। যথা—
১. এমন বিষয় যার সঠিক পথ তোমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে, সুতরাং তুমি তা অনুসরণ করো।
২. এমন বিষয় যার ভ্রান্ত পথ তোমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে, সুতরাং তুমি তা বর্জন করো।
৩. এমন বিষয় যা তোমার কাছে অস্পষ্ট রয়ে গেছে, সুতরাং তুমি তার কাছে থেমে যাও এবং তা আল্লাহ তায়ালার উপর সোপর্দ করো।
“তোমার পথপ্রদর্শক যেন শুধু আল্লাহ হন। তোমার প্রয়োজন ও অভাবও যেন তাঁর কাছেই নিবদ্ধ থাকে এবং তাঁর সাহায্য নিয়ে তুমি অন্য সবকিছুকে মোকাবেলা করো।”২৫
আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ ও বিচ্ছিন্নতার শিক্ষা:
হজরত সাররি আস-সাকতি বলেন,“যে ব্যক্তি আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, সে দুটি দোষের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন হয়।
১. ফরজ কর্তব্য অবহেলা করে, নফলকর্মে ব্যস্ত থাকা।
২. বাহ্যিক কাজ করা, কিন্তু অন্তরের সততা সঙ্গে না থাকা।
আর যে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত থাকে, সে চারটি গুণের মাধ্যমে যুক্ত হয়।
১. দরজা আঁকড়ে ধরে থাকা (আল্লাহর আনুগত্যে লেগে থাকা)।
২. সেবার জন্য প্রস্তুত থাকা।
৩. অপ্রিয় বিষয়গুলোর ওপর ধৈর্য ধারণ করা।
৪. কারামত-সমূহকে সংরক্ষণ করা (প্রকাশ না করা)।২৬
সাররি আস-সাকতি (রহ.)-এর নৈতিক শিক্ষা ও চরিত্রের দিকনির্দেশনা:
হজরত সাররি আস-সাকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “সৎ মানুষের তিনটি গুণ।
১. ফরজ পালন করা।
২. হারাম থেকে দূরে থাকা।
৩. অমনোযোগিতা ও উদাসীনতা ত্যাগ করা।
আর তিনটি কাজ যা একজন বান্দাকে আল্লাহর সন্তুষ্টিতে পৌঁছে দেয়:
১. অধিক ইস্তিগফার করা।
২. বিনয়ী হওয়া (অবনমিত হওয়া)।
৩. প্রচুর দান-সদকা করা।
তিনটি কাজ যা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ডেকে আনে:
১. অযথা খেলা-ধুলা।
২. মজা-মশকরা।
৩. গুজব ও পিছনে কথাবার্তা বলা।
আর এই তিন তিন করে নয়টির ওপর ভিত্তি করে একটিমাত্র দ্বীনের সর্বোচ্চ স্তম্ভ মূল হলো— আল্লাহর প্রতি সুন্দর ধারণা।”২৭
তাঁর বাণী ও নসিহত:
হজরত জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলেন,“আমি একদিন সাররি আস-সাকতি (রহ.)-এঁর কাছে গেলাম, তখন তিনি মৃত্যুর কাছাকাছি অবস্থায় ছিলেন। আমি তাঁকে বললাম, ‘হে শায়খ, আমাকে কিছু উপদেশ দিন।’তিনি বললেন,‘দুষ্কৃত লোকদের সাহচর্য গ্রহণ করো না, আর আল্লাহর স্মরণ থেকে তোমাকে যেন ভালো লোকদের সঙ্গও ব্যস্ত না করে ফেলে।”২৮
মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈল আল-আসলামি থেকে বর্ণিত, সাররি আস-সাকতি (রহ.) বলেছেন, সেই ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত, যার দিনগুলো ‘পরে করব’ করতে করতে শেষ হয়ে যায়, এবং সেই ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত, যার অবস্থান (মর্যাদা) পাওয়ার জন্য সৎকর্মশীলরা আকাঙ্ক্ষা করে।” (অর্থাৎ, মর্যাদার কারণে নিজেকে সংশোধন না করে গর্বিত হয়)। ২৯
হজরত সাররি আস-সাকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে জিজ্ঞেস করা হলো,‘আকল (বুদ্ধি) কাকে বলে?’ তিনি বললেন,“আকল হলো সেই জিনিস, যার দ্বারা আল্লাহর আদেশ-নিষেধের দলিল প্রতিষ্ঠিত হয়।”অর্থাৎ আকল হচ্ছে যা মানুষকে বুঝায় কোনটি আদেশ, কোনটি নিষেধ, কোনটি সঠিক ও কোনটি ভুল।
আলী ইবনু আবদুল হামিদ আল-গদাইরী বলেন, আমি সাররি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি,“যে নেয়ামতের কদর করে না, সে বুঝতেও পারে না— কখন সেই নেয়ামত তার হাত থেকে তুলে নেওয়া হলো।”
তিনি আরো বলেন,“যে ব্যক্তি বিপদ-আপদকে হালকা ভাবে এবং ধৈর্য ধরে; সে সেই বিপদের পূর্ণ সওয়াব লাভ করে।”
সাররি (রহ.) বলেন, “আদব হলো বুদ্ধির অনুবাদক।”অর্থাৎ, সত্যিকার আদবই বুদ্ধি বা মনের সঠিক ব্যবহারকে প্রকাশ করে।
“অনেকেই গুণের বর্ণনা করে, কিন্তু খুব কম মানুষই তাদের কর্ম সেই গুণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখে।”
“সর্বোত্তম শক্তি হলো নিজের উপর জয় লাভ করা। যে ব্যক্তি নিজের মনকে শৃঙ্খলিত করতে ব্যর্থ, সে অন্যের প্রতি আদব শিখাতে আরও অক্ষম। আর যে ব্যক্তি নিজের ওপরের কর্তার আদেশ মানে, নিম্নস্তরেও সে আজ্ঞাবহ হয়। অর্থাৎ, তার আদেশও অন্যরা যথাযথভাবে পালন কর।”
সাররি (রহ.) বলেন, “তোমার জিহ্বা হলো হৃদয়ের অনুবাদক এবং তোমার মুখ হলো হৃদয়ের আয়না। যা হৃদয়ে লুকানো আছে, তা মুখে প্রকাশ পায়।”
তিনি বলেন: “যদি তুমি নিজের মাল–সম্পদের ক্ষয় নিয়ে দুঃখিত হও, তবে নিজের সময়ের ক্ষয় নিয়ে আরও বেশি কাঁদো।”
সাররি (রহ.) বলেন, “সত্যের অভাব থেকে জটিলতা ও বিশৃঙ্খলা বেশি সৃষ্টি হয়।”
সাররি (রহ.) বলেন, “সুন্দর চরিত্র হলো— মানুষের ক্ষতি না করা এবং তাদের ক্ষতি নিন্দা বা প্রতিদান ছাড়াই ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করা।”
সাররি (রহ.) বলেন, “ধীরেধীরে বিপথগমন বা সাবধানতা হারানোর লক্ষণ হলো নিজের আত্মার দোষ-ত্রুটি অজানা থাকা।”
সাররি (রহ.) বলেন, “সবচেয়ে সাহসী বা দৃঢ় মানুষ হলো যে তার ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।”
সাররি (রহ.) বলেন, “যে ব্যক্তি অন্যকে দেখানোর জন্য যা নেই তা দ্বারা নিজেকে সজ্জিত করে, সে আল্লাহর নজর থেকে বঞ্চিত হয়।”
সাররি আস-সাকতি (রহ.) বলেন,“কোনো মানুষ ততক্ষণ পরিপূর্ণ হবে না যতক্ষণ সে তার ইমানকে তার কামনা থেকে উচ্চতর স্থানে রাখবে না, এবং কেউ ধ্বংস হবে না যতক্ষণ সে তার কামনার প্রতি অত্যধিক প্রভাবিত হয়ে তার দ্বীনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।”৩০
জুনাইদ বাগদাদি বলেন, যখন আমরা সাররি আস-সাকতির চারপাশে থাকতাম তিনি আমাদের বলতেন, “হে যুবক দল, আমি তোমাদের জন্য একটি শিক্ষা। আমল করো, কারণ আমল তো কেবল যৌবনেই সম্ভব।” “মানুষের যখন অর্ধেক মারাও যায়, বাকি অর্ধেক তখনও সতর্ক হয় না। আর আমি নিজেকে তাদের বাইরের কেউ মনে করি না।” “মুমিনদের হৃদয় পূর্ববর্তী ফয়সালার (আস-সাওয়াবিক্ব) সাথে যুক্ত, আর নেককারদের হৃদয় পরিণতির (আল-খাওয়াতীম) সাথে যুক্ত। শেষের দলটি বলে, আমাদের পরিণতি কী দিয়ে হবে? আর প্রথম দলটি বলে, আল্লাহ আমাদের জন্য কী ফয়সালা করেছেন?”
আলী ইবনে আবদুল হামিদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সাররি আস-সাকতিকে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি নিজের নফসের (প্রবৃত্তির) হিসাব নেয়, আল্লাহ তার হিসাব নেওয়া থেকে লজ্জাবোধ করেন।”
আমি তাঁকে আরও বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি জানে সে কী তালাশ করছে (অর্থাৎ, তার লক্ষ্য), তার কাছে তা পাওয়ার পথে যা কিছু বিলীন হয়, তা তুচ্ছ মনে হয়।”
আবু উবায়েদ ইবনে হারবাওয়াহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সাররি আস-সাকতিকে বলতে শুনেছি, “আল্লাহ দুনিয়াকে তাঁর অলিদের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছেন, তাঁর মনোনীত বান্দাদের থেকে তা রক্ষা করেছেন এবং তা তাঁর সৎকর্মশীলদের হৃদয় থেকে বের করে দিয়েছেন, কারণ তিনি এটি তাদের জন্য পছন্দ করেননি।”৩১
ওফাত:
হজরত সাররি আস-সাকতি রহমাতুল্লাহি আলাইহির ওফাত হয়েছিল হিজরি ২৫৩ সনে (রমজান মাসে)। অন্য বর্ণনা অনুযায়ী, কেউ বলেন ২৫১ হিজরিতে। আবার কেউ বলেন ২৫৭ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেছেন।৩২
আবু উবায়েদ ইবনে হারবাওয়াহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি সাররি আস-সাকতির জানাজায় উপস্থিত হয়ে ফিরে আসলাম। তখন এক ব্যক্তি অন্য একজনের মাধ্যমে আমাদের কাছে বর্ণনা করলেন যে, সে সাররি আস-সাকতির জানাজায় উপস্থিত ছিল। যখন রাতের কিছুটা অংশ অতিবাহিত হলো, তখন সে তাঁকে স্বপ্নে দেখল। সে তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আল্লাহ আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন?’ তিনি বললেন, ‘তিনি আমাকে এবং যারা আমার জানাজায় উপস্থিত ছিল ও নামাজ পড়েছে, তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।’ আমি বললাম, ‘আমিও তো আপনার জানাজায় উপস্থিত ছিলাম এবং নামাজ পড়েছি।’ বর্ণনাকারী বলেন, তখন তিনি একটি তালিকা বের করলেন এবং তাতে দেখলেন, কিন্তু আমার নাম খুঁজে পেলেন না। আমি বললাম, ‘অবশ্যই আমি উপস্থিত ছিলাম!’ বর্ণনাকারী বলেন, তখন তিনি তাকালেন এবং দেখলেন যে, আমার নামটি তালিকার শেষাংশে (হাশিয়াতে) লেখা রয়েছে।”৩৩