ইতিহাসের কালপরিক্রমায় কিছু জীবন মহাকাব্যের মতো স্নিগ্ধ আলো ছড়ায়, যা শুধু তথ্য নয়, অনুভব দিয়েও স্পর্শ করা যায়। ওয়াইস ইবনে আমির ইবনে জাজ আল-কারনি (রা.) ছিলেন তেমনই এক মহাকাব্যিক চরিত্র, যাঁর জীবন ছিলো নবীপ্রেম, মাতৃভক্তি, আর দুনিয়াবিমুখতার এক জীবন্ত উদাহরণ। তিনি সশরীরে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এঁর সংস্পর্শ পাননি; কিন্তু তাঁর আধ্যাত্মিক উচ্চতা ও আত্মনিবেদন এমনই ছিল যে, তাঁকে ‘খায়রুত তাবেযয়িন’ (তাবেয়িনদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। তাঁর জীবন যেন নিভৃতে জ্বলা এক প্রদীপ, যার আলো দূর থেকে দিকনির্দেশনা দেয়। তাঁর জীবনগাঁথা শাশ্বত মানবতার এক অনন্য দলিল, যা আজও কোটি হৃদয়ে ইমান ও আধ্যাত্মিকতার দীপশিখা জ্বেলে চলেছে।

 

তাঁর নাম ও পরিচয়:

তিনি তাঁর যুগের তাবেয়িনদের সর্দার। পুরো নাম আবু আমর ওয়াইস ইবনে আমির ইবনে জাজ ইবনে মালিক আল-কারনি আল-মুরাদি আল-ইয়ামানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি। করন ছিল ইয়েমানের মুরাদ গোত্রের একটি সম্মানিত শাখা। এই পবিত্র বংশেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন।১

হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রাদিআল্লাহু আনহু)-এর জন্মসন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য খুব একটা পাওয়া যায় না। তবে, অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে তিনি ইসলামের প্রথম যুগের প্রথম দিকে, সম্ভবত ৬ষ্ঠ শতাব্দীর শেষার্ধে (আনুমানিক ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) ইয়েমেনের ‘কারন’ গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন।

 

তাঁর হাদিস চর্চা:

হজরত ওয়াইস আল-কারনি রাদ্বিআল্লাহু আনহু এক সময় হজরত ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহুর নিকট আগমন করেন এবং তাঁর কাছ থেকে ও হজরত আলী রাদ্বিআল্লাহু আনহু থেকেও সামান্য কিছু হাদিস বর্ণনা করেছেন।

আর তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন— হজরত উসাইর ইবনে আমর, আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলা, আবু আব্দুর রব আদ-দিমাশকী, এবং আরও কিছু বরণীয় তাবেয়ি।

এগুলো ছিল সংক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ও কাহিনি; তিনি কোনো সনদবদ্ধ দীর্ঘ হাদিস (মুসনাদ) বর্ণনা করেননি। তাই তাঁকে দুর্বল রাবি হিসেবে মূল্যায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। বরং তিনি ছিলেন আল্লাহর নিকটবর্তী মুত্তাকি অলি এবং মুখলিস বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।২

 

হজরত ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহুর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ:

আফফান (রহ.) বলেন, আমাদের কাছে হাদিস বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ ইবনু সালামা; তিনি আল-জুরাইরি থেকে, তিনি আবু নَদ্বরাহ থেকে এবং তিনি উসাইর ইবনু জাবির থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যখন ইয়েমেনের লোকেরা মদিনায় আগমন করত, তখন হজরত ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু প্রতিটি কাফেলাকে জিজ্ঞেস করতেন,“তোমাদের মধ্যে কি করন গোত্রের কেউ আছে?”

একদিন এমন হলো যে, হজরত ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহুর উটের লাগাম অথবা হজরত ওয়াইস আল-কারনি রাদ্বিআল্লাহু আনহুর উটের লাগাম দুটোর মধ্যে একটির লাগাম অপরজনের হাতে এসে পড়ল; অথবা এদের কেউ একজন লাগাম অপরজনকে এগিয়ে দিলেন। তখনই হজরত ওমর তাঁকে চিনে ফেললেন। সাথে সাথে ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন—

“আপনার নাম কী?”

তিনি বললেন, “আমি ওয়াইস।”

“আপনার কি মা বেঁচে আছেন?”

তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আছেন।”

“আপনার শরীরে কি সাদা দাগ ছিল?”

তিনি উত্তর দিলেন,“হ্যাঁ, ছিল। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি এবং আল্লাহ তা দূর করে দিয়েছেন। শুধু নাভির কাছে দিরহামের মতো একটি দাগ রেখেছেন, যাতে আমি তা দেখে আমার রবকে স্মরণ করতে পারি।”

এ কথা শুনে ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু বললেন,“আমার জন্য (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করুন।”

হজরত ওয়াইস আল-কারনি রাদ্বিআল্লাহু আনহু বিনীতভাবে বললেন,“আপনি-ই বরং আমার জন্য ক্ষমা চাইবেন, কারণ আপনি তো রসুলুল্লাহ ﷺ-এঁর সাহাবি!”

তখন হজরত ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু বললেন,“নিশ্চয়ই আমি রসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি ‘তাবেয়িদের মধ্যে সর্বোত্তম একজন ব্যক্তি, যার নাম ওয়াইস। তাঁর মা রয়েছে। তাঁর শরীরে সাদা দাগ ছিল; তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, আল্লাহ তা দূর করে দিলেন। শুধু নাভির কাছে এক দিরহামের মতো একটি দাগ রেখে দিলেন। তাঁর কাছে যে ক্ষমা প্রার্থনা চাইবে, সে-ই তাঁর জন্য ইস্তিগফার করবে।”

এরপর তিনি (ওয়াইস কারনি) মানুষের ভিড়ের মধ্যে চলে গেলেন এবং আমরা আর বুঝতে পারলাম না, তিনি কোথায় গেলেন।

উসাইর ইবনে জাবির বলেন, পরে তিনি কুফায় উপস্থিত হলেন। আমরা এক বৃত্তে বসে আল্লাহর স্মরণ করতাম, আর তিনি এসে আমাদের সঙ্গে বসতেন। কিন্তু যখন তিনি কথা বলতেন, তখন আমাদের হৃদয়ে এমনভাবে প্রভাব ফেলত যে, অন্য কারও কথা ততটা প্রভাব ফেলতে পারত না।৩

 

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে জুব্বা মুবারক হাদিয়া:

যখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এঁর ওফাতের সময় ঘনিয়ে এলো, সাহাবায়ে কেরাম (রাদিআল্লাহু আনহুম) অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে জানতে চাইলেন, “হে আল্লাহর রসুল, আপনার চীরকা (মোটা পশমের পোশাক) কাকে দেব?” উত্তরে নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, “ওয়াইস আল-কারনিকে।”

পরবর্তীতে ওমর (রাদিআল্লাহু আনহু) তাঁর সাথে সাক্ষাৎকালে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এঁর নির্দেশিত তাঁর পবিত্র জুব্বা হজরত ওয়াইস আল-কারনি রাদিআল্লাহু আনহুর হাতে তুলে দেন। হজরত ওয়াইস আল-কারনি এই চীরকা গ্রহণ করে আনন্দে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সেজদা করেন এবং আল্লাহর কাছে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।৪

জীবন পরিক্রমা:

ওয়াইস ইবনে আমির ছিলেন ‘করন’ গোত্রের একজন লোক এবং তিনি কুফার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ছিলেন তাবেয়িদের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর শরীরে শ্বেত রোগ হয়েছিল। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন যেন তা দূর করে দেন। আল্লাহ তায়ালা তা দূর করে দিলেন।তখন তিনি বললেন, “হে আল্লাহ, আমার শরীরের কিছু অংশ রেখে দিন, যার মাধ্যমে আমি আপনার প্রদত্ত নেয়ামত স্মরণ করতে পারি।” ফলে আল্লাহ তাঁর শরীরে ততটুকু রেখে দিলেন, যার দ্বারা তিনি তাঁর উপর আল্লাহর নেয়ামত স্মরণ করতেন।

ওয়াইস (রহ.) কিছু সাথি নিয়ে মসজিদে অবস্থান করতেন। তাঁর একজন চাচাতো ভাই ছিল, যে শাসকের সাথে ঘনিষ্ঠ ছিল এবং ওয়াইস (রহ.)-এঁর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করত। যদি সে ওয়াইসকে ধনী লোকদের সাথে দেখত, তবে বলত, “সে শুধু তাদের থেকে খেয়ে বেড়ায়।” আর যদি সে তাঁকে গরিব লোকদের সাথে দেখত, তবে বলত, “সে শুধু তাদের ধোঁকা দিচ্ছে।” কিন্তু ওয়াইস (রহ.) তাঁর চাচাতো ভাই সম্পর্কে কেবল ভালো কথাই বলতেন। তবে যখন সে তাঁর পাশ দিয়ে যেত, তখন তিনি তার কাছ থেকে আড়াল হতেন এই ভয়ে যে, তাঁর কারণে সে যেন কোনো পাপে লিপ্ত না হয়।

ওমর (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) যখন কুফা থেকে তাঁর কাছে আগত প্রতিনিধি দলের কাছে খোঁজ নিতেন, তখন জিজ্ঞাসা করতেন, ‘তোমরা কি ওয়াইস ইবনে আমির আল-কারনিকে চেনো?’ তারা বলত, ‘না।’

এরপর কুফার একটি প্রতিনিধি দল এল, যাদের মধ্যে তাঁর সেই বিদ্বেষী চাচাতো ভাইটিও ছিল। ওমর (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কি ওয়াইসকে চেনো?’ তাঁর চাচাতো ভাই বলল, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, সে আমার চাচাতো ভাই। সে একজন নিকৃষ্ট ও নষ্ট প্রকৃতির লোক, তাকে আপনার চেনার মতো অবস্থানে সে পৌঁছায়নি।’

ওমর (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) বললেন, ‘তোমার ধ্বংস হোক, তোমার ধ্বংস হোক! যখন তুমি কুফায় পৌঁছবে, তখন তাকে আমার পক্ষ থেকে সালাম বলবে এবং আমার নির্দেশ পৌঁছে দেবে যেন সে আমার কাছে আসে।’

সে কুফায় পৌঁছল এবং সফরের পোশাক না খুলেই মসজিদে গেল। সেখানে সে ওয়াইসকে দেখতে পেল এবং তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন, হে আমার চাচাতো ভাই।”

ওয়াইস (রহ.) বললেন, “আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন, হে আমার চাচাতো ভাই।”

সে বলল, “আর আপনিও। আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, হে উয়াইস! আমিরুল মুমিনীন আপনাকে সালাম দিয়েছেন।”

ওয়াইস (রহ.) বললেন, “কে আমাকে আমিরুল মুমিনীনের কাছে স্মরণ করিয়েছে?”

সে বলল, “তিনিই আপনাকে স্মরণ করেছেন এবং আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমি আপনাকে তাঁর আহ্বান পৌঁছে দিই।”

ওয়াইস (রহ.) বললেন, “আমিরুল মুমিনীনের কথা আমার জন্য শোনা ও মানা ওয়াজিব।”

অতঃপর তিনি ওমর (রাদ্বিআল্লাহু আনহু)-এর কাছে এলেন। ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু বললেন, ‘আপনিই কি ওয়াইস ইবনে আমির?’

তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’

ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু বললেন, ‘আপনিই কি সেই ব্যক্তি, যার শ্বেত রোগ হয়েছিল এবং আপনি আল্লাহর কাছে তা দূর করার জন্য দোয়া করেছিলেন, ফলে তিনি তা দূর করে দিয়েছেন?’ আর আপনি বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আমার শরীরে এই রোগের কিছু অংশ রেখে দিন, যার দ্বারা আমি আপনার নেয়ামত স্মরণ করতে পারি।’ ফলে আল্লাহ আপনার শরীরে ততটুকু রেখে দিলেন যার দ্বারা আপনি তাঁর নেয়ামত স্মরণ করতে পারেন?’

ওয়াইস (রহ.) বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, আপনি কীভাবে জানলেন? আল্লাহর কসম, কোনো মানুষই এ বিষয়ে জানে না।’

ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু বললেন, ‘আমাদের রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খবর দিয়েছেন যে, তাবেয়িদের মধ্যে করন গোত্রের একজন লোক আসবে, যাকে ওয়াইস ইবনে আমির বলা হবে। তাঁর শ্বেত রোগ হবে, তিনি আল্লাহর কাছে তা দূর করার জন্য দোয়া করবেন, ফলে তিনি তা দূর করে দেবেন।’

ওয়াইস (রহ.) বললেন, ‘আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, হে আমিরুল মুমিনীন।’

ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু বললেন, ‘আর আপনিও। আল্লাহ আপনাকেও ক্ষমা করুন, হে ওয়াইস ইবনে আমির।’

এরপর যখন লোকেরা শুনল যে ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এঁর পক্ষ থেকে এ কথা বলছেন, তখন সবাই বলতে লাগল, ‘আমার জন্য ইস্তিগফার করুন, হে ওয়াইস!’ যখন তাঁদের সংখ্যা বাড়তে লাগল, তখন তিনি নিঃশব্দে সরে পড়লেন এবং চলে গেলেন। আর এই মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁকে আর দেখা যায়নি।৫

রসুল ﷺ ও সাহাবায়ে কিরামগণের নিকট তাঁর মর্যাদা:

আবু হুরায়রা রাদ্বিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, একবার রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের এক মজলিসে উপবিষ্ট ছিলেন। তখন তিনি বললেন, “আগামীকাল তোমাদের সাথে জান্নাতবাসীদের মধ্যেকার একজন লোক সালাত আদায় করবে।”

আমি সেই ব্যক্তি হওয়ার লোভ অনুভব করলাম। তাই পরদিন ভোরে গেলাম এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে নামাজ আদায় করলাম। লোকেরা চলে যাওয়া পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করলাম, তখন শুধু আমি এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাকি ছিলেন।

আমরা তাঁর কাছে অবস্থান করছিলাম, তখন এক কালো লোক এগিয়ে এলো। তিনি একটি ছেঁড়া কাপড় পরেছিলেন এবং একটি তালিযুক্ত বস্ত্র গায়ে জড়িয়েছিলেন। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে হাত রাখলেন এবং বললেন, ‘হে আল্লাহর নবী, আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।’

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য শাহাদাতের (শহীদ হওয়ার) দোয়া করলেন। আমরা তার কাছ থেকে তীব্র কস্তুরীর সুগন্ধি অনুভব করছিলাম।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আল্লাহর রসুল, ইনি কি সেই ব্যক্তি?’

তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, সে অমুক গোত্রের একজন দাস।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আল্লাহর নবী, আপনি কি তাকে কিনে মুক্ত করে দেবেন না?’

তিনি বললেন, ‘তা কীভাবে সম্ভব? যদি আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতের বাদশাহদের একজন বানাতে চান! হে আবু হুরায়রা, জান্নাতবাসীদের মধ্যে বাদশাহ এবং নেতা আছে। আর এই কালো লোকটি জান্নাতের বাদশাহ ও নেতাদের একজন হয়েছে।’

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘হে আবু হুরায়রা, আল্লাহ তায়ালা তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাদের ভালোবাসেন, তারা হলেন আল-আসফিয়া (বিশুদ্ধচিত্ত), আল-আখফিয়া (লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা), আল-আবরিয়া (সরলমনা ও নির্দোষ), যাদের মাথাগুলো উস্কোখুস্কো, চেহারা ধূলিধূসরিত, পেট খালি; তবে হালাল উপার্জন ব্যতীত নয়। যারা আমিরদের কাছে প্রবেশের অনুমতি চাইলে তাদের অনুমতি দেওয়া হয় না, যারা সচ্ছল নারীদের বিবাহ প্রস্তাব দেন, তাদের সঙ্গে বিবাহ হয় না, তারা অনুপস্থিত থাকলে কেউ খোঁজে না, উপস্থিত থাকলেও আমন্ত্রণ জানানো হয় না, তাদের আগমনে কেউ আনন্দিত হয় না, তারা অসুস্থ হলে কেউ দেখতে যায় না, মৃত্যুবরণ করলে জানাজায় অংশগ্রহণ হয় না।’

সাহাবিরা বললেন, ‘হে আল্লাহর রসুল, তাদের মধ্যকার একজন লোকের সঙ্গে আমরা কীভাবে সাক্ষাৎ করব?’

তিনি বললেন, ‘তাদের মাঝে একজন হলেন ওয়াইস আল-কারনি রাদ্বিআল্লাহু আনহু।’

সাহাবিরা জানতে চাইলেন, ‘ওয়াইস আল-কারনির বৈশিষ্ট কেমন?’

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তিনি মিশ্র রঙের, কাঁধের মধ্যবর্তী দূরত্ব প্রশস্ত, গড়ন মাঝারি, শ্যামলা ও গভীর কালচে ত্বকের। দাঁড়ি বুকের দিকে ঝুলে থাকে, থুতনি সিজদার স্থানের দিকে ঝুঁকে থাকে এবং তিনি ডান হাতকে বাম হাতের উপর রাখেন। তিনি কুরআন তেলাওয়াত করেন এবং নিজের জন্য কাঁদেন। তিনি সহজ-সরল, কোনো মর্যাদা বা মানুষের প্রশংসার প্রতি গুরুত্ব দেন না। পশমের লুঙ্গি ও পশমের চাদর পরেন। পৃথিবীর মানুষের কাছে অজানা কিন্তু আসমানের অধিবাসীদের কাছে সুপরিচিত। যদি তিনি আল্লাহর নামে কসম খান, আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই তা পূর্ণ করেন। তাঁর বাম কাঁধের নিচে একটি সাদা দাগ আছে। কিয়ামতের দিন বান্দাদের বলা হবে, ‘জান্নাতে প্রবেশ করো’, আর ওয়াইসকে বলা হবে, ‘দাঁড়াও এবং সুপারিশ করো’। তখন আল্লাহ তাঁকে রাবীয়াহ এবং মুদার গোত্রের সমান সংখ্যক লোকের জন্য সুপারিশ করার অনুমতি দেবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘হে ওমর এবং হে আলী, যখন তোমরা তাঁর সাক্ষাৎ পাবে, তখন তাঁকে অনুরোধ করবে যেন তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আল্লাহ তায়ালা তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন।’

আবু হুরায়রা রাদ্বিআল্লাহু আনহু বলেন, ওমর ও আলী দশ বছর ধরে তাঁর সন্ধান করলেন, কিন্তু তাঁকে খুঁজে পেলেন না। যে বছর ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু মারা যাবেন, সেই বছরের শেষের দিকে আলী রাদ্বিআল্লাহু আনহু আবু কুবাইস পাহাড়ে দাঁড়িয়ে ডাক দিলেন, ‘হে ইয়ামানবাসীদের হাজীগণ, তোমাদের মধ্যে কি মুদার গোত্রের ওয়াইস আছে?’

একজন লম্বা দাড়িওয়ালা বয়স্ক লোক বললেন, ‘ওয়াইস সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। তবে আমার এক ভাতিজা আছে, নাম ওয়াইস। সে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে অখ্যাত, সম্পদহীন এবং তুচ্ছ। সে উট চরায়।’

ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার এই ভাতিজা কোথায়?’

লোকটি বলল, ‘আরাফাতের আরাক এলাকায়।’

ওমর ও আলী রাদ্বিআল্লাহু আনহু দ্রুত তাদের গাধায় চড়ে আরাফাতের দিকে গেলেন। সেখানে তারা দেখলেন ওয়াইস আল-কারনি রাদ্বিআল্লাহু আনহু একটি গাছের কাছে সালাত আদায় করছেন, চারপাশে উট চরছে। তাঁরা এগিয়ে গেলেন এবং বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।’

ওয়াইস আল-কারনি রাদ্বিআল্লাহু আনহু দ্রুত সালাত শেষ করে বললেন, ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।’

তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, আপনার নাম কী?

তিনি বললেন, ‘আবদুল্লাহ (আল্লাহর বান্দা)।’

তাঁরা বললেন, ‘নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণনা অনুযায়ী, আমাদের দেখান আপনার বাম কাঁধের নিচে সাদা দাগ।’

ওয়াইস আল-কারনি রাদ্বিআল্লাহু আনহু কাঁধ উন্মুক্ত করলেন। দাগটি দেখা গেল। ওমর ও আলী (রা.) এগিয়ে গিয়ে তাঁকে চুমু দিলেন। তাঁরা বললেন, ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি ওয়াইস আল-কারনি। আমাদের জন্য দোয়া করুন।’

তিনি বললেন, ‘আমি দোয়াতে কেবল নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করি না, বরং জলে ও স্থলে থাকা সকল মুমিন ও মুসলিম পুরুষ ও মহিলাকে অন্তর্ভুক্ত করি।’

আলী রাদ্বিআল্লাহু আনহু বললেন, ‘ইনি হলেন ওমর, আমিরুল মুমিনীন, আর আমি আলী ইবনে আবি তালিব।’

ওয়াইস আল-কারনি রাদ্বিআল্লাহু আনহু বললেন, ‘আসসালামু আলাইকা ইয়া আমিরুল মুমিনীন ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, আর আপনি হে আলী ইবনে আবি তালিব, আল্লাহ আপনাদের দুজনকে উত্তম প্রতিদান দিন।’

ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু বললেন, মক্কায় গিয়ে আপনার জন্য কিছু খরচাপানি এবং কাপড় আনার ব্যবস্থা করতে চাই। ওয়াইস আল-কারনি রাদ্বিআল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমাদের মধ্যে আর কোনো সাক্ষাতের প্রয়োজন নেই। আমার পশমের লুঙ্গি ও চাদর যথেষ্ট। চার দিরহাম উপার্জন করেছি, খেয়ে শেষ করব। আমাদের সামনে কঠিন পথ রয়েছে; হালকা ও ক্ষীণ দেহবিশিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া কেউ তা অতিক্রম করতে পারবে না।’

ওমর রাদ্বিআল্লাহু আনহু তাঁর কথা শুনে বললেন, ‘হায় আফসোস, যদি উমরের মা তাকে জন্ম না দিত! কে এই দায়িত্ব গ্রহণ করবে?’

এরপর ওয়াইস আল-কারনি রাদ্বিআল্লাহু আনহু তাঁর উট হাঁকিয়ে চলে গেলেন, যে লোকের উট তাকে ফেরত দিলেন এবং ইবাদতে মনোনিবেশ করলেন। অবশেষে আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হলেন।৬

জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:

হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রহ.) ছিলেন একজন প্রকৃত জহিদ; যিনি দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও চাকচিক্য থেকে সম্পূর্ণরূপে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। বর্ণিত আছে যে, তাঁর কাছে মাত্র একটি চাদর ছিল, যা তিনি পরিধান করতেন। সেই চাদর এতটাই ছোট ছিল যে, তিনি যখন বসতেন, তখন তাঁর শরীর মাটির সাথে লেগে যেত।

তিনি প্রায়ই এই দোয়াটি পাঠ করতেন,“হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে ওজর পেশ করছি— একটি ক্ষুধার্ত পেটের পক্ষ থেকে, এক অনাবৃত দেহের পক্ষ থেকে। আমার কাছে যা আছে, তা কেবল আমার পিঠে থাকা কাপড় আর আমার পেটে থাকা সামান্য আহার।”৭

আলকামা বিন মারসাদ বলেন, আটজন ব্যক্তির ওপর দুনিয়াবিমুখতা বা জুহদ পূর্ণতা পেয়েছিল, যাদের অন্যতম ওয়াইস আল-কারনি। তাঁর পরিবারের লোকরা তাঁকে পাগল মনে করত। তারা ঘরের দরজার পাশেই তাঁর জন্য ছোট একটি ঘর বানিয়ে দিয়েছিল। সেখানে তিনি বছরের পর বছর কাটিয়ে দিতেন, কেউ তাঁর চেহারা দেখত না। তাঁর খাবার ছিল কুড়িয়ে পাওয়া খুরমার আঁটি। সন্ধ্যা হলে তিনি সেগুলো বিক্রি করে ইফতারের খাবার কিনতেন। আর যদি কোনো ভালো খুরমা পেতেন, তবে তা দিয়েই ইফতার করতেন।৮

আশ-শা’বী থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, মুরাদ গোত্রের একজন লোক ওয়াইস আল-কারনির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। লোকটি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কেমন আছেন?’

তিনি বললেন, ‘আমি আল্লাহর প্রশংসা করার মাধ্যমে সকাল করেছি।’

লোকটি বললেন, ‘সময় আপনার উপর কেমন প্রভাব ফেলছে?’

তিনি বললেন, ‘সময় সেই ব্যক্তির উপর কেমন প্রভাব ফেলবে, যে সকালে উঠলে ধারণা করে যে, সন্ধ্যায় আর বাঁচবে না, আর সন্ধ্যায় পৌঁছালে ধারণা করে যে, সকালে আর উঠবে না। সে হয় জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত, নয়তো জাহান্নামের দুঃসংবাদ প্রাপ্ত।’ হে মুদার গোত্রের ভাই, মৃত্যু এবং তার স্মরণ কোনো মুমিনের জন্য আনন্দ (প্রফুল্লতা) অবশিষ্ট রাখেনি। আর আল্লাহর অধিকার সম্পর্কে তার জ্ঞান, তার সম্পদে কোনো রৌপ্য বা স্বর্ণ (অব্যবহৃত) অবস্থায় ছেড়ে রাখেনি (অর্থাৎ সব বিলিয়ে দিয়েছে)। আর সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় তার জন্য কোনো বন্ধু অবশিষ্ট রাখেনি।’৯

ইবাদত ও দানশীলতা:

তিনি ছিলেন একজন মুখলিস ইবাদতগুজার। মুগীরা বলেন, ‘ওয়াইস আল-কারনি মাঝেমধ্যে নিজের পরিধেয় বস্ত্র দান করে দিতেন এবং নিজে বিবস্ত্র অবস্থায় ঘরে বসে থাকতেন। এমনকি জুমার নামাজে যাওয়ার মতো কাপড়ও তাঁর কাছে থাকত না।

আসবাহ বিন যায়েদ বলেন, তিনি নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এঁর যুগে হওয়া সত্ত্বেও একমাত্র মায়ের সেবার কারণেই হিজরত করে নবীজির সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেননি।

তিনি আরও বলেন, ওয়াইস যখন সন্ধ্যায় উপনীত হতেন, বলতেন ‘আজকের রাতটি সিজদার রাত।’

এরপর তিনি ভোর পর্যন্ত সিজদায় কাটিয়ে দিতেন। তিনি ঘরে অতিরিক্ত যা খাবার বা কাপড় থাকত, তা দান করে দিতেন এবং বলতেন, ‘হে আল্লাহ, কেউ যদি আজ ক্ষুধার্ত হয়ে মারা যায় তবে তার জন্য আমাকে পাকড়াও করবেন না, আর কেউ যদি বস্ত্রহীন অবস্থায় মারা যায় তবে তার জন্যও আমাকে পাকড়াও করবেন না।’

নাযর বিন ইসমাইল বলেন, ‘ওয়াইস আল-কারনি ডাস্টবিন থেকে রুটির টুকরো কুড়িয়ে পরিষ্কার করে খেতেন এবং তার কিছু অংশ সদকা করতেন। তিনি বলতেন, ‘হে আল্লাহ, ক্ষুধার্তদের কষ্ট থেকে আমি আপনার কাছে দায়মুক্তি চাই।’১০

অভাব ও লোকলজ্জা:

ওসাইর বিন জাবির থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘ওয়াইস আল-কারনি যখন কথা বলতেন, তাঁর কথা আমাদের হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে যেত যা অন্য কারও কথায় হতো না। তিনি আরও বলেন, কুফায় একজন বক্তা ছিলেন যিনি আমাদের হাদিস শোনাতেন। আলোচনা শেষ হলে তিনি বলতেন, ‘আপনারা এখন চলে যান।’ সবাই চলে গেলেও অল্প কয়েকজন রয়ে যেত, যাদের মধ্যে একজন ব্যক্তি এমনভাবে কথা বলতেন, যা আমি অন্য কারও মুখে শুনিনি। আমি তাঁকে ভালোবেসে ফেললাম। একদিন তাঁকে দেখতে না পেয়ে খোঁজ নিয়ে তাঁর কুটিরে গেলাম। তিনি বেরিয়ে এলে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, কীসে আপনাকে আমাদের মজলিস থেকে বিরত রাখল?’ তিনি বললেন, ‘নগ্নতা (অর্থাৎ, পরার মতো পর্যাপ্ত কাপড় ছিল না)।’ তাঁর সাথিরাও তাঁকে নিয়ে উপহাস করত এবং কষ্ট দিত।

আমি বললাম, ‘এই চাদরটি নিন এবং পরিধান করুন।’

তিনি বললেন, ‘না, এটা করবেন না। কারণ ,তারা যদি এটা আমার গায়ে দেখে, তবে আমাকে আরও বেশি কষ্ট দেবে।’ আমি অনেক অনুরোধ করার পর তিনি সেটি পরলেন। যখন তিনি বাইরে বের হলেন, দুষ্ট লোকগুলো বলতে লাগল, ‘দেখো তো, কার কাছ থেকে সে এই চাদরটি হাতিয়ে নিয়েছে?’ তিনি ফিরে এসে চাদরটি রেখে দিলেন এবং আমাকে বললেন, ‘দেখলেন তো (আমি কেন নিতে চাইনি)?’

এরপর আমি সেই মজলিসে গিয়ে লোকগুলোকে খুব কড়া ভাষায় শাসন করলাম। আমি বললাম, ‘তোমরা এই লোকটির কাছে কী চাও? তোমরা তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছ। মানুষের কখনো পোশাক থাকে, কখনো থাকে না (এটা নিয়ে উপহাসের কী আছে?)।’ সব মিলিয়ে আমি তাদের খুব শক্তভাবে তিরস্কার করলাম।১১

ওয়াইস আল-কারনির সঙ্গে হারম ইবনে হাইয়্যান আল-আবদীর সাক্ষাত:

হারম ইবনে হাইয়্যান আল-আবদী (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, ‘একবার আমি ওয়াইস আল-কারনিকে খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে বের হলাম। আমি তাঁর সম্পর্কে সকলের কাছে জিজ্ঞেস করতে লাগলাম। অবশেষে তাঁকে ফুরাত নদীর তীরে পেলাম। তিনি তখন অজু করছিলেন এবং তাঁর কাপড় পরিষ্কার করছিলেন। আমি আগে তাঁর বর্ণনা শুনেছি, তাই দেখেই তাঁকে চিনতে পারলাম। তিনি ছিলেন শ্যামলা বর্ণের, মাথা কামানো, ঘন দাড়িবিশিষ্ট এবং অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত চেহারার অধিকারী। আমি তাঁকে সালাম দিলাম এবং হাত বাড়িয়ে মুসাফাহা করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ওয়াইস আল-কারনি তা অস্বীকার করলেন। তাঁর এই আচরণে আমার চোখ ভিজে গেল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,‘আসসালামু আলাইকুম ইয়া ওয়াইস, হে আমার ভাই, আপনি কেমন আছেন?’

তিনি বললেন, ‘ওয়া আনতা ফাহাইয়্যাকাল্লাহু ইয়া হারম ইবনে হাইয়্যান। কে আপনাকে আমার পথ দেখাল?’

আমি উত্তর দিলাম, ‘আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা।’

তিনি বললেন, ‘সুবহানা রাব্বিনা, নিশ্চয়ই আমাদের প্রতিপালকের ওয়াদা অবশ্যই পূর্ণ হবে।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আল্লাহ আপনাকে রহম করুন। আপনি আমার এবং আমার পিতার নাম কীভাবে জানলেন? আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে আগে কখনও দেখিনি, আর আপনিও আমাকে দেখেননি।”

তিনি বললেন, ‘আমার রুহ আপনার রুহকে চিনতে পেরেছে, যখন আমার আত্মা কথা বলেছে। মুমিনরা আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লাহর রুহের মাধ্যমে একে অপরকে চিনতে পারে; যদিও দূরত্ব ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি তাদের আলাদা করে রাখে।’

আমি বললাম, ‘আপনি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করুন।’

তিনি বললেন, ‘আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সরাসরি দেখিনি। যাঁরা তাঁকে দেখেছেন তাদের থেকে হাদিস আমার কাছে এসেছে, যেমনভাবে তোমাদের কাছে পৌঁছে। আমি বিচারক বা মুফতি হওয়ার দরজা খুলতে চাই না। আমার নিজস্ব ইবাদত ও অন্তর্জগত নিয়েই ব্যস্ততা আছে।’

আমি অনুরোধ করলাম, ‘তাহলে আল্লাহর কিতাব থেকে কিছু আয়াত তেলাওয়াত করুন। আমার জন্য দোয়া করুন এবং একটি উপদেশ দিন।’

তিনি আমার হাত ধরে বললেন, ‘সবচেয়ে সত্য কথা হলো আমার রবের কথা; সবচেয়ে সত্য হাদিস হলো আমার রবের হাদিস; আর সবচেয়ে উত্তম কালাম হলো আল্লাহর কালাম।’

তারপর তিনি তেলাওয়াত শুরু করলেন— أَعُوذُ بِاللَّهِ السَّمِيعِ الْعَلِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ। এরপর পড়লেন, إِنَّ يَوْمَ الْفَصْلِ مِيقَاتُهُمْ أَجْمَعِينَ –“নিশ্চয়ই ফয়সালার দিন তাদের সকলের জন্য নির্ধারিত সময়।” (সুরা দুখান: ৪০)

এরপর তিনি কান্নাভেজা কণ্ঠে পড়লেন, يَوْمَ لَا يُغْنِي مَوْلًى عَنْ مَوْلًى شَيْئًا وَلَا هُمْ يُنْصَرُونَ

إِلَّا مَنْ رَحِمَ اللَّهُ إِنَّهُ هُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ – الدخان: ٤١-٤٢ – “সেদিন কোনো বন্ধু কোনো বন্ধুর উপকারে আসবে না, এবং তারা কোনো সাহায্যও পাবে না। সেখানে শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতি দয়াপ্রাপ্ত ব্যক্তি বাঁচবে। নিশ্চয়ই তিনি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।” (সুরা দুখান:৪১-৪২)

এরপর ওয়াইস আল‑কারনি (রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, ‘হে হারম ইবনে হাইয়্যান, তোমার পিতা মারা গেছেন আর শীঘ্রই তুমিও মারা যাবে। হে আবু হাইয়্যান, যারা মারা গেছেন, তাদের ঠিকানা হয় জান্নাত, নয়তো জাহান্নাম। আদম ও হাওয়া ওফাত লাভ করেছেন, আল্লাহর খলিল ইব্রাহীম ওফাত লাভ করেছেন, আল্লাহর কালিমুল্লাহ মুসা ওফাত লাভ করেছেন, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম; তিনিও ওফাত লাভ করেছেন, আবু বকর (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) ওফাত লাভ করেছেন, আমার ভাই, বন্ধু ও প্রিয়তম ওমরও ওফাত লাভ করেছেন…’

আমি বললাম, ‘ওমর (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) তো এখনো জীবিত!’

তিনি বললেন, ‘আমার রব আমাকে তাঁর ইন্তেকালের খবর দিয়েছেন। আমি জানি আমি কী বলছি। আর আগামীকাল আমি-তুমিও মৃতদের অন্তর্ভুক্ত হব।’

এরপর তিনি দোয়া করলেন এবং বললেন, ‘হে ইবনে হাইয়্যান, আল্লাহর কিতাব আঁকড়ে ধরো, নেককারদের মৃত্যু স্মরণ রাখো, নিজের মৃত্যুকে সবসময় হৃদয়ে জাগ্রত রাখো, তোমার সম্প্রদায়কে সতর্ক করো, জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না; নচেৎ দীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।’শেষে তিনি প্রার্থনা করলেন, ‘হে আল্লাহ, এ লোকটি আপনার সন্তুষ্টির জন্য আমাকে ভালোবাসে। আপনি তাকে জান্নাতুস সালামে আমার সঙ্গী করুন।’তারপর বললেন, ‘আমি আপনাকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করছি হে হারম ইবনে হাইয়্যান। আজকের পর আমাকে আর খুঁজবেন না। আমি আপনাকে স্মরণ করব এবং দোয়া করব।’তিনি কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলেন আর আমি তাকিয়ে রইলাম। পরে বহু খুঁজেছি, কিন্তু আর কখনো তাঁকে পাইনি।১২

বাণী ও নসিহত:

হারম ইবনে হাইয়্যান যখন তাঁর কাছে উপদেশ চাইলেন, ওয়াইস (রহ.) বললেন তিনটি উপদেশ দিলেন।

১. যখন ঘুমানোর জন্য বালিশে মাথা রাখবেন, তখন মৃত্যুকে বালিশ বানিয়ে ঘুমান (অর্থাৎ মৃত্যুকে খুব কাছে ভাবুন) এবং মৃত্যুকে সর্বদা চোখের সামনে রাখুন।

২. যখন ঘুম থেকে উঠবেন, তখন আল্লাহর কাছে নিজের অন্তর ও নিয়ত সংশোধনের দোয়া করবেন। কারণ এই দুটির চেয়ে কঠিন কোনো কিছুর চিকিৎসা আপনি আর পাবেন না। দেখা যায় অন্তর এখন আপনার সাথে আছে, কিন্তু পরক্ষণেই তা বিমুখ হয়ে গেছে; আবার বিমুখ ছিল, তো এইমাত্র অনুগত হয়েছে।

৩. পাপ কত ছোট তা দেখবেন না; বরং দেখুন কার নাফরমানি করছেন তিনি কত মহান।১৩

 

ওফাত:

তাঁর ওফাত কবে, কখন সংঘটিত হয়েছে সে সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে সালামাহ বর্ণনা করেছেন, ‘আমরা ওমর ইবনে আল-খাত্তাবের (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) যুগে আযারবাইজান অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলাম এবং আমাদের সাথে ওয়াইস আল-কারনি ছিলেন। যখন আমরা ফিরে আসছিলাম, তখন তিনি, অর্থাৎ ওয়াইস অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমরা তাঁকে বহন করলাম, কিন্তু তিনি স্থির থাকতে পারলেন না এবং ইন্তেকাল করলেন।

আমরা যেখানে অবতরণ করলাম সেখানে দেখলাম একটি খননকৃত কবর, পানির পাত্র, কাফন ও সুগন্ধি প্রস্তুত করা আছে। আমরা তাঁকে গোসল করালাম, কাফন পরালাম, তাঁর জানাযার নামাজ আদায় করলাম এবং দাফন করলাম। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বলল, ‘যদি আমরা ফিরে গিয়ে তাঁর কবরটি চিহ্নিত করে আসতাম।’ আমরা ফিরে গেলাম, কিন্তু সেখানে কোনো কবর বা কোনো চিহ্ন ছিল না।’১৪

ঐতিহাসিক হিশাম আল-কালবীর মতে, তিনি হজরত আলী (রা.)-এঁর পক্ষে সিফফিনের যুদ্ধে লড়াই করতে করতে শহীদ হন।১৫

আব্দুর রহমান বিন আবি লায়লা বলেন, সিফফিনের যুদ্ধের দিন এক ঘোষক ঘোষণা দিচ্ছিল, ‘লোকদের মধ্যে কি ওয়াইস আল-কারনি আছেন?’ অবশেষে তাঁকে হজরত আলী (রাদ্বিআল্লাহু আনহু)-এঁর পক্ষে লড়ে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের লাশের মধ্যে পাওয়া গেল।

এই দুই ধরনের অভিমত বিশ্লেষণ করে ইমাম জামালুদ্দিন আবুল ফারাজ ইবনে জাওযী, সিফফিনের যুদ্ধে শহীদ হওয়ার বর্ণনাকে অধিক বিশুদ্ধ বলেছেন।১৬