হজরত আবু ইয়াজিদ বায়েজিদ বোস্তামি রহমাতুল্লাহি আলাইহি সুফিবাদের প্রাচীন ও শুদ্ধতম ধারার এক মহান সাধক, যাঁর জীবন, চিন্তা ও উক্তি পরবর্তী শতাব্দীর অসংখ্য আরিফ, অলি ও আলেমদের জন্য দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। তিনি এমন এক মহান সাধক, যিনি আত্মার গভীর সাধনা ও প্রেমের উন্মোচনে মানবচেতনার সীমা অতিক্রম করে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন। তাঁর বাণী ও আচরণে প্রকাশ পেয়েছে আল্লাহপ্রেমের শুদ্ধ রূপ, আত্মসমর্পণের নিখুঁত চিত্র এবং আধ্যাত্মিক জগতের সূক্ষ্মতম বাস্তবতা।
প্রাথমিক পরিচিতি:
আল্লাহর অলিদের মাঝে তিনি ‘সুলতানুল আরিফীন’। তাঁর নাম আবু ইয়াজিদ তাইফুর ইবনে ঈসা ইবনে শারওসান আল-বিস্তামী। তাঁর দুই ভাই— আদম ও আলী—এরাও জাহিদ (পরহেজগার) হিসেবে খ্যাত ছিলেন। তাঁদের দাদা শারওসান ছিলেন এক মাজুসী (অগ্নিপূজক), পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ১
জন্ম ও জন্মস্থান:
বর্তমান ইরানের রাজধানী তেহরানের পার্শ্ববর্তী কুমিস প্রদেশের অন্তর্গত খোরাসানের এক প্রসিদ্ধ শহর বোস্তাম বা বিস্তাম। এই শহরে মোবদান নামক এলাকায় ১২৮ হিজরি, ৭৪৫ খ্রিষ্টাব্দে কোনো এক শুভক্ষণে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান বোস্তাম বা বিস্তামের দিকে সম্পর্ক করে তাঁকে বোস্তামি বা বিস্তামি বলা হয়। অন্য এক বর্ণনা মতে তাঁর জন্ম সন ১৮৮ হিজরী। তবে প্রথম বর্ণনাটিই বেশী গ্রহণযোগ্য।২
হজরত বায়েজিদ বোস্তামি (রহ.) এর সম্মানিত পিতা হজরত ঈসা বোস্তামি (রহ.) তাবে তাবেয়িন ছিলেন। তিনি অত্যন্ত সৎ, আল্লাহ ওয়ালা, দ্বীনদার ও খোদাভীরু মুসলমান ছিলেন। কথা-বার্তা, চলা-ফেরা এবং জীবনের প্রতিটি কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করতেন। তাকওয়া ছিল তাঁর জীবনের প্রধান পাথেয়। বিশেষ করে খানা-পিনা, পোশাকাদি এবং রুজি-রুজগার ইত্যাদিতে এত বেশি সাবধানতা অবলম্বন করতেন যে, সন্দেহযুক্ত বস্তু থেকেও তিনি বিরত থাকতেন।
তাঁর মা সতীসাধ্বী, লজ্জাবতী এবং অতি পর্দাশীল চরিত্রবান মহিলা ছিলেন। বিনয়, ধৈর্য্যশীলতা, উচ্চ বংশীয় মর্যাদা, ধর্মীয় জ্ঞানে পরিপূর্ণতাসহ যাবতীয় উত্তম গুণাবলি তাঁর জীবনে পরিলক্ষিত হয়। ইবাদত-রিয়াজত এবং তাকওয়া পরহেজগারিতে যুগের অদ্বিতীয়া ছিলেন। ধর্ম পরায়ণা মহিলা হিসাবে বোস্তামে তাঁর খ্যাতি ছিল। হজরত বায়েজিদ বোস্তামি (রহ.) স্বীয় মাতা সম্পর্কে বলেন, ‘আমার বুজুর্গ মা ‘মুসতাজাবাতুত দাওয়াত’ (যার দোয়া আল্লাহর নিকট সঙ্গে সঙ্গে কবুল) ছিলেন। সবসময় আল্লাহর কাছে এই বলে ফরিয়াদ করতেন, হে আল্লাহ, আমাকে তোমার সন্তুষ্টি এবং তোমার রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এঁর আনুগত্যের তৌফিক দান করুন। যাবতীয় হারাম থেকে বেঁচে হালালভাবে জীবন-যাপন করার সুযোগ দিন। আল্লাহ তায়লা তাঁর দোয়া কবুল করে তাঁকে এমন বুজুর্গি দান করলেন যে, যখন খাওয়ার জন্য তাঁর সামনে খাবার দেওয়া হত, তখন খাবার হালাল হলে তাঁর হাত সেদিকে প্রসারিত হত, আর খাবার হারাম এমনকি সন্দেহ যুক্ত হলেও তাঁর হাত সেদিকে প্রসারিত হত না। ৩
খোদাপ্রীতি:
হজরত বায়েজিদ বোস্তামি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “হে আল্লাহ, এখন আমি আপনার প্রতি আনন্দিত হলেও আপনাকে ভয় করি; তাহলে যখন আপনার কাছ থেকে নিরাপদ হব, তখন আনন্দ কত অপরিসীম হবে! আশ্চর্যের বিষয় আমার আপনার প্রতি পর্যাপ্ত ভালোবাসা নেই, কারণ আমি তো এক নগন্য দাস, দরিদ্র ও অসহায়। বরং বিস্ময়ের বিষয় হলো আপনার আমার প্রতি অসিম ভালোবাসা, অথচ আপনি মহান, ক্ষমতাবান সম্রাট!”
তিনি আরো বলেন, “যতদিন বান্দা মনে করে যে, মানুষের মধ্যে তার চেয়েও খারাপ কেউ আছে, ততদিন সে অহংকারী। প্রেমিকের (আল্লাহর প্রেমিক) কাছে জান্নাতের কোনো মূল্য নেই, কারণ সে তার প্রেমাস্পদের (আল্লাহ) ভালোবাসায় মগ্ন থাকে।”৪
আল্লাহর নৈকট্য হাসিল:
একবার বায়েজিদ বোস্তামি রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে কিছু মানুষ বলতে শুনলেন, তিনি বলেছেন, “হে আল্লাহ, আমাকে আপনার নৈকট্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবেন না।” তিনি বলেছেন যে, যে আরেফ তথা আল্লাহর মারেফতপ্রাপ্ত ব্যক্তি, সে আমাদের বর্ণনার চেয়েও ঊর্ধ্বে, আর যে আলেম, সে আমাদের বর্ণনার চেয়েও নিম্নমানের।
একবার তাঁকে বলা হলো, “আমাদের ‘ইসমে আ’জম’—আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নাম শিখিয়ে দিন। তিনি উত্তর দিলেন, “ইসমে আজমের কোনো সীমানা বা সংজ্ঞা নেই। বরং এটি হলো তোমার হৃদয়ের শূন্যতা—অন্য সব কিছুর থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র তাঁর একত্ববোধে মগ্ন থাকা। যখন তুমি এই অবস্থায় পৌঁছাবে, তখন তুমি চাইলে তাঁর নামসমূহের যেকোনো নাম ধরে তাঁকে সমর্পণ করতে পারো।”৫
তিনি আরো বলেছেন, “আমার সূচনালগ্নে আমি চারটি বিষয়ে ভুল করেছিলাম: আমি ভেবেছিলাম যে, আমি তাঁকে স্মরণ করি, আমি তাঁকে চিনি, আমি তাঁকে ভালোবাসি, এবং আমি তাঁকে খুঁজি। কিন্তু যখন আমি (চূড়ান্ত পর্যায়ে) পৌঁছলাম, তখন আমি দেখলাম যে, তাঁর স্মরণ আমার স্মরণকে ছাড়িয়ে গেছে, তাঁর জ্ঞান আমার জ্ঞানকে ছাড়িয়ে গেছে, তাঁর ভালোবাসা আমার ভালোবাসার চেয়েও প্রাচীন এবং আমি খোঁজার আগেই তিনি প্রথমে আমাকে তালাশ করেছেন।”
হজরত বায়েজিদ বোস্তামি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “ত্রিশ বছর আমি আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম, আর তাঁর থেকে আমার বিচ্ছিন্নতা ছিল তাঁর প্রতি আমার স্মরণ। অতঃপর যখন আমি তাঁর কাছ থেকে নিজেকে সংকুচিত করলাম (বা নীরব হলাম), তখন আমি তাঁকে সর্বাবস্থায় খুঁজে পেলাম।” তখন এক ব্যক্তি তাঁকে বলল, “আপনার কী হলো যে, আপনি সফর করেন না?” তিনি বললেন, “কারণ আমার সঙ্গী (আল্লাহ) সফর করেন না, আর আমি তাঁর সাথে মুকিম (স্থায়ীভাবে অবস্থানকারী)।”
প্রশ্নকারী তখন একটি উদাহরণ দিয়ে তাঁকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “স্থির (দাঁড়িয়ে থাকা) পানি দ্বারা অজু করা মাকরুহ (অপছন্দনীয়)। সমুদ্রের পানি দ্বারা অজু করতে তারা কোনো আপত্তি দেখেননি। তা নিজে পবিত্র, তার পানি পবিত্র এবং তার মৃত প্রাণী হালাল।
এরপর বললেন, “আপনি দেখেন, নদীগুলো প্রবাহিত হয়, তাদের শব্দ ও কলকল ধ্বনি থাকে। কিন্তু যখন তারা সমুদ্রের কাছে আসে এবং তার সাথে মিশে যায়, তখন তাদের কলকল ধ্বনি ও তীব্রতা শান্ত হয়ে যায়। সমুদ্রের পানি সেগুলোকে অনুভব করে না, তাতে কোনো বৃদ্ধিও দেখা যায় না; আর যদি আপনি সমুদ্র থেকে বের হন, তাতেও কোনো ঘাটতি স্পষ্ট হয় না।”৬
আবু মুসা আদ-দাইবালী বলেছেন, আমি আবু ইয়াজিদকে বলতে শুনেছি, “সাধারণ মানুষ সবাই হিসাব থেকে পালাতে চায় এবং তা এড়িয়ে চলতে চায়, কিন্তু আমি আল্লাহ তায়ালার কাছে আমার হিসাব নিতে প্রার্থনা করি।” তাঁকে জিজ্ঞস করা হলো, কেন? তিনি বললেন, “হয়তো এর মাঝে তিনি আমাকে বলবেন, “হে আমার বান্দা, তখন আমি বলব, “লাব্বাইক (আমি উপস্থিত)।” তাঁর আমাকে ‘আমার বান্দা’ বলা, আমার কাছে দুনিয়া ও তাতে যা কিছু আছে তার চেয়েও বেশি প্রিয়। এরপর তিনি আমার সাথে যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন।”
আলী ইবনুল মুসান্না বলেছেন, আমি আমার চাচাকে বলতে শুনেছি, তিনি তাঁর পিতাকে বলতে শুনেছেন, তিনি আবু ইয়াজিদকে বলতে শুনেছেন, “আমি স্বপ্নে রাব্বুল ইজ্জত তাবারাকা ওয়া তায়ালা-কে দেখলাম, তখন আমি বললাম, ‘হে প্রভু, আপনার কাছে যাওয়ার পথ কী?’ তিনি বললেন, “তোমার আত্মাকে ত্যাগ করো, এরপর চলে এসো।”
আবু মুসা আদ-দাইবালী বলেছেন, আমি আবু ইয়াজিদকে বলতে শুনেছি, “আমার হৃদয় আসমানের দিকে আরোহণ করল, তা চক্কর দিল এবং ঘুরে ফিরে এলো। আমি বললাম, ‘কী নিয়ে এসেছো?’ তিনি বললেন, ‘আল-মুহাব্বাহ ওয়ার-রিদা’ (ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি)।৭
ইবাদত-রিয়াজত
আব্বাস ইবনে হামজা বলেন, “আমি আবু ইয়াজিদ আল-বিসত্বামীর পিছনে জোহরের নামাজ পড়লাম। যখন তিনি তাকবির দেওয়ার জন্য হাত উঠাতে চাইলেন, তখন আল্লাহর নামের মর্যাদার কারণে তিনি তা পারলেন না এবং তাঁর শরীরের হাড়গুলো এমনভাবে কাঁপতে লাগল যে, আমি তাঁর হাড়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। এটি আমাকে হতবাক করে দিয়েছিল।”৮
হাসান ইবনু আলী ইবনু হায়ওয়াইহ আল-দামাগানী বলেছেন, আমি আল-হাসান ইবনু উলুয়্যাহকে বলতে শুনেছি, আবু ইয়াজিদ বলেছেন, ‘আমি এক রাতে আমার মেহরাবে (নামাজ পড়ার স্থানে) বসে পা ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। তখন একজন গোপন আহ্বানকারী আমাকে ডেকে বলল, ‘যে ব্যক্তি রাজাদের (আল্লাহর) সাথে বসে, তার উচিত তাদের সাথে উত্তম আদব রক্ষা করে বসা।’৯
আবু ইয়াজিদ বায়েজিদ বোস্তামি বলেছেন, “আমি ত্রিশ বছর ধরে এমন ছিলাম যে, যখনই আল্লাহর নাম স্মরণ করার ইচ্ছা করতাম, তখনই তাঁর প্রতি সম্মানার্থে আমি কুলি করতাম এবং জিহ্বা পরিষ্কার করতাম।”
তিনি আরো বলেছেন, “আমি তৌহিদের (একত্ববাদের) ময়দানে ভ্রমণ করতে করতে ‘দারে তাফরিদ’ (একাকিত্বের বা নিঃসঙ্গতার রাজ্যে) প্রবেশ করি। এরপর ‘দারে তাফরিদে ভ্রমণ করতে করতে আমি ‘দাইমুমিয়্যাহ’ (চিরস্থায়িত্বের বা অনন্তকালের রাজ্যে) পৌঁছাই। সেখানে আমি তাঁর (আল্লাহর) পেয়ালা থেকে এমন একটি পানীয় পান করি, যার পর তাঁর স্মরণের পিপাসা আমার আর কখনও হবে না।”
ইউসুফ (বর্ণনাকারী) বলেন, “আমি এই কথাগুলো যুন-নূন আল-মিসরির কাছ থেকে ভিন্ন শব্দে শুনেছিলাম, যেখানে কিছু অতিরিক্ত কথা ছিল। যুন-নূন আল-মিসরি সেই অতিরিক্ত অংশটি কেবল তাঁর উৎসাহের সময় এবং যখন তাঁর হাল (আধ্যাত্মিক অবস্থা) প্রবল থাকত, তখনই প্রকাশ করতেন। তিনি এই কথাগুলো বলার পর বলতেন, ‘আপনার জন্যই সমস্ত জালাল (মহিমা) ও জামাল (সৌন্দর্য), আর আপনার জন্যই সমস্ত কামাল (পূর্ণতা)। আপনি পবিত্র! আপনি পবিত্র! স্তুতির জিহ্বা এবং তাসবিহের মুখসমূহ আপনাকে পবিত্র ঘোষণা করেছে। আপনি আপনি (অর্থাৎ, আপনি অদ্বিতীয়)! আজালি (অনাদি) আজালি! আমার প্রতি তাঁর ভালোবাসা আজালি!”
তিনি আরো বলেন, “আমি ত্রিশ বছর মুজাহাদা (আত্মসংযম ও কঠোর সাধনা) করেছি, কিন্তু ইলম (জ্ঞান) ও তার অনুসরণ অপেক্ষা কঠিন কিছু পাইনি। আলেমগণের মতপার্থক্য না থাকলে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। আর আলেমগণের এই মতপার্থক্য ‘তাজরীদুত-তৌহিদ’ (একত্ববাদের নির্ভেজালীকরণ) ব্যতীত অন্য সকল বিষয়ে রহমত।” ১০
আবু ইয়াজিদকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কীসের মাধ্যমে আপনি এই মারিফাত (আল্লাহর জ্ঞান) লাভ করেছেন?
তিনি বললেন, “ক্ষুধার্ত পেট এবং পোষাকবিহীন দেহ দ্বারা।” অর্থাৎ, কঠোর সাধনা ও দুনিয়াবিমুখতার মাধ্যমে।
আবু ইয়াজিদকে বলা হলো, ‘আল্লাহর পথে আপনি সবচেয়ে কঠিন কীসের সম্মুখীন হয়েছেন?’ তিনি বললেন, “তা বর্ণনা করা সম্ভব নয়।” তখন তাঁকে বলা হলো, ‘আপনার নফসের (আত্মার) দিক থেকে আপনি সবচেয়ে সহজ কীসের সম্মুখীন হয়েছেন?’ তিনি বললেন, “হ্যাঁ, এটি বলা যায়। আমি তাকে কিছু ইবাদতের দিকে আহ্বান করেছিলাম, কিন্তু সে স্বেচ্ছায় সাড়া দেয়নি। ফলে আমি তাকে এক বছর ধরে পানি পান করা থেকে বিরত রেখেছিলাম।”১১
জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:
বায়েজিদ বোস্তামি বলেছেন, “আমি দুনিয়াকে তিন তালাক দিয়েছি— চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় তালাক, যাতে আর কোনো প্রত্যাবর্তন নেই। আর আমি একাকী আমার রবের দিকে ধাবিত হয়েছি, তখন আমি আর্তনাদ করে তাঁকে আহ্বান করলাম, ‘হে আমার ইলাহ, আমি এমনভাবে তোমাকে ডাকছি যার কাছে তুমি ছাড়া আর কেউ বাকি নেই।’ অতঃপর যখন তিনি আমার হৃদয়ের প্রার্থনার সত্যতা এবং আমার আত্মার নিরাশা বুঝতে পারলেন, তখন সেই প্রার্থনার প্রথম উত্তর যা আমার উপর আপতিত হলো তা হলো— তিনি আমাকে সম্পূর্ণভাবে আমার সত্তা ভুলিয়ে দিলেন এবং সৃষ্টিসমূহকে আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া সত্ত্বেও আমার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন।”১২
আবু মুসা আদ-দাইবালী, আবু ইয়াজিদের কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, “আমি দুনিয়ার দিকে তাকালাম। দেখলাম যে, দুনিয়ার মানুষ বিয়ে, আর পানাহারের স্বাদ উপভোগ করছে; অথচ আখিরাতের মানুষ জান্নাতের সামগ্রী দ্বারা স্বাদ গ্রহণ করবে। সুতরাং, আমি দুনিয়াতে আমার স্বাদ নির্ধারণ করলাম আল্লাহর জিকিরে, আর আখিরাতে আল্লাহর দিকে দৃষ্টিতে।”১৩
আরেফের আলামত:
ইবরাহিম আল-হারাভী (রহ.) বলেছেন, আমি আবু ইয়াজিদ আল-বিসত্বামিকে বলতে শুনেছি, তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, আরেফের (মারেফাতপ্রাপ্তের) চিহ্ন কী? তিনি বললেন, “সে যেন তাঁর (আল্লাহর) স্মরণ থেকে কখনো শান্ত না হয়, তাঁর হকের (কর্তব্য) ক্ষেত্রে কখনো ক্লান্ত না হয় এবং তিনি ব্যতীত অন্য কারো দ্বারা যেন সে স্বস্তি অনুভব না করে।” তিনি আরও বললেন, “নিশ্চয় আল্লাহ বান্দাদের আদেশ ও নিষেধ করেছেন, অতঃপর তারা আনুগত্য করেছে। অতঃপর তিনি তাদের কিছু পোশাক দিলেন। তখন তারা সেই পোশাকে ব্যস্ত হয়ে তাঁকে ভুলে গেল। আর আমি আল্লাহর কাছে শুধু আল্লাহকেই চাই।”
তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, “কীসের মাধ্যমে তারা (আল্লাহর পরিচয়প্রাপ্ত বান্দা) মারিফাত লাভ করেছে? তিনি বললেন, “তাদের যা আছে তা নষ্ট করে দিয়ে, আর তাঁর (আল্লাহর) যা আছে তার উপর দাঁড়িয়ে।”
তিনি আরো বলেন, “আল্লাহ তাঁর অলিদের হৃদয়ে দৃষ্টি দেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন, যারা বিশুদ্ধভাবে মারিফাত (আল্লাহর গভীর জ্ঞান) বহনের উপযুক্ত ছিলেন না, তাই তিনি তাদের ইবাদতে ব্যস্ত রাখলেন।”১৪
তিনি আরও বলেছেন, “আবেদ (ইবাদতকারী) তাঁর ইবাদত করে ‘হাল’ (আধ্যাত্মিক অবস্থা) দ্বারা, আর আরেফ আল-ওয়াসিল (আল্লাহর কাছে পৌঁছানো আরেফ) তাঁর ইবাদত করে ফিল-হাল (বর্তমান অবস্থাতেই বা সরাসরি অবস্থায়)।” অর্থাৎ, আবেদের ইবাদত হয় বাহ্যিক অবস্থা দ্বারা, আর আরেফের ইবাদত হয় অন্তরের গভীর উপলব্ধি দ্বারা। তিনি আরো বলেছেন, “আরেফের উপর ন্যূনতম যা আবশ্যক, তা হলো সে যা কিছুর মালিক হয়েছে, তা (আল্লাহর জন্য) দান করে দেবে।”১৫
আল্লাহ থেকে আড়াল হয়ে পড়া তিন ব্যক্তি:
হজরত বায়েজিদ বোস্তামি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, “তিন ব্যক্তি আল্লাহ থেকে সবচেয়ে বেশি আড়ালপ্রাপ্ত হলো তাদের তিনটি জিনিসের কারণে। প্রথমত, জুহহাদ (পরহেজগার) তাদের জুহদ (পরহেজগারী বা দুনিয়াত্যাগ)-এর কারণে। দ্বিতীয়ত, আবেদ (ইবাদতকারী) তাদের ইবাদতের কারণে। তৃতীয়ত, আলেম (জ্ঞানী), তাদের জ্ঞানের কারণে।” এরপর তিনি বললেন, “আহা, বেচারা জুহহাদ, সে তার জুহদ পরিধান করেছে এবং পরহেজগারদের ময়দানে ছুটেছে। যদি বেচারা জানত যে, আল্লাহ সমগ্র দুনিয়াকে ‘ক্বালীল’ (সামান্য) বলে আখ্যায়িত করেছেন, তাহলে সে এই সামান্য বস্তুর কতটুকু মালিক হতে পেরেছে? আর সে এই মালিকানার কতটুকুর প্রতি জুহদ দেখিয়েছে? এরপর বললেন, প্রকৃত জুহহাদ সে, যার প্রতি একবার দৃষ্টি দেওয়া হয় এবং সে তার কাছেই থেকে যায়। এরপর তার দৃষ্টি আর অন্য কোনো দিকে বা তার নিজের দিকেও ফেরে না।” আর আবেদ (ইবাদতকারী) সে সেই ব্যক্তি, যে তার ইবাদতের চেয়েও ইবাদতে আল্লাহর অনুগ্রহকে বেশি দেখে, যাতে তার ইবাদত এই অনুগ্রহের মাধ্যমে পরিচিত হয়। আর আলেম, যদি সে জানত যে, আল্লাহ জ্ঞানস্বরূপ যা কিছু প্রকাশ করেছেন, তা ‘লাওহে মাহফুজের (সংরক্ষিত ফলক) মাত্র এক সারি; তবে এই আলেমের জ্ঞান সেই এক সারির কতটুকু? আর সে যা জানে, তার কতটুকু আমল করেছে?”১৬
আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়:
আবু মুসা আদ-দাইবালী বলেছেন, আমি শুনেছি, এক ব্যক্তিকে আবু ইয়াজিদকে জিজ্ঞেস করছে— ‘আমাকে এমন একটি কাজের পথ দেখান যার মাধ্যমে আমি আমার রব্বুল ইজজতের নিকটবর্তী হতে পারি।’ তিনি বললেন, “আল্লাহর অলিদের ভালোবাসো, যেন তাঁরা তোমাকে ভালোবাসেন। কারণ, আল্লাহ তায়ালা তাঁর অলিদের হৃদয়ের দিকে দৃষ্টি দেন। হয়তো তিনি তাঁর অলির হৃদয়ে তোমার নামের দিকে দৃষ্টি দেবেন এবং তোমাকে ক্ষমা করে দেবেন।”১৭
অলির মানদণ্ড:
হজরত বায়েজিদ বোস্তামি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “আল্লাহর বহু সৃষ্টি আছে, যারা পানির উপর দিয়ে হাঁটে, আল্লাহর কাছে তাদের কোনো মূল্য নেই। আর তোমরা যদি এমন কাউকে দেখো যাকে কারামত দেওয়া হয়েছে, এমনকি সে উড়তেও পারে, তবুও তোমরা তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা দেখো যে, সে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ, শরিয়তের সীমা এবং বিধিনিষেধ পালনে কেমন।”
একবার তাঁকে কেউ বলল, “লোকেরা বলে আপনি নাকি আকাশে উড়ে যান?”
তিনি উত্তর দিলেন, “এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? একটি পাখিও তো মৃত পশুর মাংস খেয়ে আকাশে উড়ে বেড়ায়!”১৮
একই বর্ণনা কিছুটা ভিন্নভাবে এসেছে আরেক জায়গায়। এক ব্যক্তি আবু ইয়াজিদের কাছে এসে বলল, “আমি শুনেছি যে, আপনি বাতাসে চলাচল করেন।”
তিনি বললেন, “এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? একটি পাখি, যা মৃত প্রাণী খায়, সেও তো বাতাসে চলাচল করে, আর মুমিন তো পাখির চেয়ে শ্রেষ্ঠ।”১৯
কারামাত:
হজরত মুসা বলেন, আমি আমার পিতাকে বলতে শুনেছি, একবার আমি আবু ইয়াজিদের পিছনে বসেছিলাম, এমন সময় তিনি একটি চিৎকার করলেন। আমি দেখলাম যে, তাঁর সেই চিৎকার তাঁর এবং আল্লাহর মধ্যের সমস্ত পর্দা ছিন্ন করে দিয়েছে। আমি বললাম, “হে আবু ইয়াযিদ, আমি এক আশ্চর্য জিনিস দেখলাম!” তিনি বললেন, ““আহা, বেচারা, আশ্চর্য কী দেখলে?” আমি বললাম, “আমি দেখলাম আপনার চিৎকার পর্দা ছিন্ন করে আল্লাহ তায়ালা পর্যন্ত পৌঁছে গেল।” তিনি বললেন, “আহা, বেচারা, উত্তম চিৎকার হলো সেটাই, যা প্রকাশ হওয়ার পর তাকে ছিন্ন করার মতো কোনো পর্দাই অবশিষ্ট থাকে না।”২০
মানসুর ইবনু আব্দুল্লাহ বলেছেন, আমি আবু ইমরান মুসা ইবনু ঈসা-কে বলতে শুনেছি, তিনি তাঁর পিতাকে বলতে শুনেছেন, “একবার আবু ইয়াজিদ আজান দিলেন, এরপর ইকামত দিতে চাইলেন। তখন তিনি কাতারগুলোর দিকে তাকালেন এবং এক ব্যক্তিকে দেখলেন যার উপর সফরের চিহ্ন ছিল। তিনি তার দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তাকে কিছু বললেন। লোকটি তখন উঠে মসজিদ থেকে বেরিয়ে গেল। উপস্থিত লোকদের মধ্যে কেউ কেউ লোকটিকে জিজ্ঞেস করলে, লোকটি বলল, ‘আমি সফরে ছিলাম, কিন্তু পানি পাইনি, তাই তাড়াতাড়ি তায়াম্মুম করেছিলাম। আমি ভুলে মসজিদে প্রবেশ করেছিলাম। আবু ইয়াযিদ আমাকে বললেন, ‘হাজারে (নিজ এলাকায়) তায়াম্মুম জায়েজ নয়।’ তাই আমার মনে পড়ল এবং আমি বেরিয়ে গেলাম।” ২১
বাণী ও নসিহত:
হজরত বায়েজিদ বোস্তামি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “আমি এমন কিছু পাইনি যা আমার জন্য জ্ঞানের মতো কঠিন এবং তাকে অনুসরণ করার মতো কঠিন। যদি আলেমদের মধ্যে মতভেদ না থাকত, তবে আমি বিভ্রান্ত হয়ে যেতাম।”
তিনি আরো বলেন, “তারা তাদের মাওলা (প্রভু)-কে শুধু গাফলতিতেই (বিস্মৃতিতে) স্মরণ করে, আর তাঁর খেদমত করে আলস্যের সাথে।”২২
“নিশ্চয়ই আল্লাহর কিছু খাস বান্দা রয়েছেন, যাদের যদি তিনি জান্নাতেও তাঁর দিদার থেকে আড়াল করেন, তবে তারা জান্নাত থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এমনভাবে ফরিয়াদ করবে, যেমনভাবে জাহান্নামের অধিবাসীরা জাহান্নাম থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ফরিয়াদ করে।”২৩
আবু মুসা আদ-দাইবালী (রহ.) বলেছেন, আমি আবু ইয়াজিদকে বললাম, আমি কার সঙ্গী হবো?
তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি অসুস্থ হলে তোমাকে দেখতে আসে, পাপ করলে তোমার জন্য তাওবা করে এবং তোমার সম্পর্কে আল্লাহ যা জানেন, সেও তা জানে।”২৪
আবু উসমান সাঈদ ইবনু ইসমাঈল থেকে বর্ণিত, আবু ইয়াজিদ বলেছেন, “যে ব্যক্তি মানুষের সাথে কথা বলার জন্য কালাম (আল্লাহর বাণী বা আধ্যাত্মিক কথা) শোনে, আল্লাহ তাকে এমন জ্ঞান দান করেন, যা দিয়ে সে মানুষের সাথে কথা বলে। আর যে ব্যক্তি তা নিজের কর্মে আল্লাহর সাথে লেনদেন করার জন্য শোনে, আল্লাহ তাকে এমন জ্ঞান দান করেন, যা দিয়ে সে তাঁর রবের সাথে মুনাজাত করে।”
তাঁর কিছু শিষ্য থেকে বর্ণিত আছে, আবু ইয়াজিদ বললেন, “যদি কোনো মানুষ তোমার সঙ্গী হয় এবং তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, তবে তুমি তোমার উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে তার সাথে মিশে যাও, তাহলেই তোমার জীবন সুন্দর হবে। আর যখন আল্লাহ তোমাকে নেয়ামত দান করেন, তখন সর্বপ্রথম আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো, কারণ তিনিই তোমার প্রতি অন্যদের হৃদয়কে আকৃষ্ট করেছেন। আর যখন তুমি বিপদে পড়ো, তখন দ্রুত মুক্তি কামনা করো, কারণ তিনিই (আল্লাহ) সেই বিপদ দূর করতে সক্ষম, অন্য কোনো সৃষ্টি নয়।”২৫
বায়েজিদ বোস্তামির ভাতিজা ঈসা ইবনু আদম বলেছেন, “আবু ইয়াজিদ নিজেকেই উপদেশ দিতেন। বলতেন, “নারী যখন ঋতুবতী হয়, তখন সে তিনদিন বা সর্বোচ্চ দশ দিনে পবিত্র হয়। আর হে নফস (আত্মা), তুমি বিশ-ত্রিশ বছর ধরে অপবিত্রতার উপর বসে আছো! কবে তুমি পবিত্র হবে? একজন পবিত্র সত্তার সামনে তোমার দাঁড়ানো উচিত, সুতরাং তোমার পবিত্র হওয়া আবশ্যক।”২৬
ওফাত:
হজরত বায়েজিদ বোস্তামি রহমাতুল্লাহি আলাইহি ৭৩ বছর বয়সে ২৬১ হিজরি সনে বিসতাম শহরে ওফাত বরণ করেন।২৭