তাসাউফের ইতিহাসে হজরত শাকিক আল-বালখী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এক আলোকিত নাম। খোরাসানের বালখ নগরীর এই মহাপুরুষ দুনিয়ার মোহমায়া ত্যাগ করে আল্লাহর প্রেমে আত্মসমর্পিত জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন মহান সুফি হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এঁর প্রিয় শাগরেদ ও আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি। তাঁর জীবন ও শিক্ষা তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর নির্ভরতা), জুহদ (দুনিয়াবিমুখতা) ও কানা‘আহ (সন্তুষ্টি)’র উজ্জ্বল উদাহরণ। শাকিক আল-বালখী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর গভীর প্রজ্ঞা, হৃদয়স্পর্শী উপদেশ ও আল্লাহভীতিপূর্ণ জীবনাচারে সুফি ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

প্রাথমিক পরিচিতি:

তাঁর নাম আবু আলী শাকিক ইবনে ইবরাহিম আল-আযদি আল-বালখী। ইমামুয যাহেদ, শায়খে খুরাসান তাঁর উপাধি। তিনি প্রখ্যাত সুফি হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহামের সাহচর্য লাভ করেছিলেন।১ তিনি মায়ের গর্ভে ছত্রিশ মাস ছিলেন বলে বর্ণনা আছে! তাঁর কুনিয়াত (উপনাম) ছিল আবু আলী।২

জ্ঞানার্জন:

তিনি ইবরাহিম ইবনে আদহাম, আবু হানিফা, ইসরাইল ইবনে ইউনুস ইবনে আবি ইসহাক (রহ.) এবং অন্যান্যদের কাছ থেকে ইলম অর্জন করেছেন এবং হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি খোরাসানের বিখ্যাত শায়খদের মধ্যে একজন এবং তাঁর মাধ্যমেই খোরাসানের মানুষেরা এই পথের (সুফিবাদ বা আধ্যাত্মিকতার) দিকে ঝুঁকতে শুরু করে।৩

শাগরেদবৃন্দ:

তাঁর কাছ থেকে হাতেম আল-আসসাম, তাঁর পুত্র মুহাম্মদ ইবনে শাকিক, মুহাম্মদ ইবনে আবান আল-বালখি এবং অন্যান্যরা হাদিস বর্ণনা করেন এবং ইলম অর্জন করেন।৪

দ্বীনে ফেরার গল্প:

আবু আবদুল্লাহ বলেন, আমি শাকিক ইবনে ইবরাহিমকে বলতে শুনেছি, “আমি তিন লক্ষ দিরহাম (সম্পত্তি) থেকে মুক্ত হয়েছি। আমি সুদের কারবার করতাম এবং বিশ বছর ধরে পশমের পোশাক পরেছি। কিন্তু আমি জানতাম না যে আমি (ইবাদতে) লোক দেখানো কাজ করছি, যতক্ষণ না আমি আব্দুল আযীয ইবনে আবী রাওয়াদের সাথে দেখা করলাম। তিনি আমাকে বললেন, ‘হে শাকিক, যব খাওয়া বা পশমী পোশাক পরা আসল বিষয় নয়; আসল বিষয় হলো আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান (মারিফাহ), এবং তুমি একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না।’ আমি বললাম, ‘তাহলে এর ব্যাখ্যা কী?’ তিনি বললেন, ‘তুমি যা করবে, তার সবকিছুই একান্তভাবে আল্লাহর জন্য খালেস হতে হবে।’ এরপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করলেন, ‘অতএব, যে তার রবের সাথে সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।’ (আল-কাহফ: ১১০)”৫

মক্কায় একবার ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহমাতুল্লাহি আলাইহি শাকিক আল-বালখী (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করলেন,‘ তোমার সেই ঘটনা কী, যা তোমাকে এই (আধ্যাত্মিক) অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে?’ শাকীক (রহ.) বললেন, ‘একদিন আমি মরুভূমিতে এমন একটি পাখি দেখলাম যার ডানা ভেঙে গেছে। আমি তাকিয়ে দেখি আরেকটি সুস্থ পাখি তার ঠোঁটে করে একটি ফড়িং এনে তাকে খাওয়াচ্ছে। তখন আমি ভাবলাম— আল্লাহ যখন ভাঙা ডানার পাখিকেও রিজিক দেন, তবে আমাকেও নিশ্চয় দেবেন। এরপর আমি উপার্জন ত্যাগ করে ইবাদতে মনোনিবেশ করলাম।’ এ কথা শুনে ইবরাহিম ইবনে আদহাম (রহ.) বললেন, ‘তুমি কেন সেই সুস্থ পাখির মতো হতে চাওনি, যে দুর্বল পাখিটিকে খাবার এনে দিল— যাতে তুমি তার চেয়ে উত্তম হতে পারতে ‘ তুমি কি নবী করিম ﷺ–এঁর এই হাদিস শুননি যে, اليَدُ العُلْيَا خَيْرٌ مِنَ اليَدِ السُّفْلَى অর্থাৎ: ‘উপরের হাত (যে দেয়) নিচের হাতের (যে নেয়) চেয়ে উত্তম।’ আর মুমিনের একটি আলামত হলো— সে সব ব্যাপারেই সর্বোচ্চ মর্যাদা ও উত্তম স্তর কামনা করে, যাতে সে সৎকর্মশীলদের মর্যাদায় পৌঁছাতে পারে।’ তখন শাকিক আল-বালখী (রহ.) ইবরাহিম ইবনে আদহাম (রহ.)-এঁর হাত ধরে চুমু খেয়ে বললেন, ‘আপনি-ই আমাদের প্রকৃত উস্তাদ, হে আবু ইসহাক!’৬

আল্লাহ পরিচয় লাভ ও জুহদ:

আলী ইবনে মুহাম্মদ ইবনে শাকীক বলেন, ‘আমার দাদার (শাকিক আল-বালখী) মালিকানায় তিনশ’টি গ্রাম ছিল। কিন্তু তিনি কাফনবিহীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন (অর্থাৎ, তিনি শহীদ হয়েছিলেন, আর শহীদদের কাফন পড়ানো হয়না)। তিনি আরও বলেন, ‘আজও তাঁর তলোয়ারকে মানুষ বরকতময় বলে মনে করে।’ একদিন তিনি বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে তুর্কিস্তানে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি মূর্তিপূজকদের মাঝে প্রবেশ করলেন এবং দেখলেন, তাদের এক শায়খ (নেতা) দাড়ি মুন্ডিয়েছে। তখন তিনি বললেন, ‘এটা তো বাতিল ব্যাপার! তোমাদেরও তো এক সৃষ্টিকর্তা আছেন, যিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।’ মূর্তিপূজক বলল, ‘তোমার কথা তোমার কাজের সাথে মেলে না।’ শাকিক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কীভাবে?’ সে বলল, ‘তুমি বলছ যে তোমার রব সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান, তবুও তুমি এত দূর এসেছো রিজিকের খোঁজে, যেখানে তোমার রিজিকদাতা তো তোমারই দেশে আছেন!’ এই কথাটিই তাঁর জাহিদ হওয়ার (দুনিয়া থেকে বিমুখ হওয়ার) কারণ হয়ে দাঁড়ায়।৭

শাকিক আল-বালখী বলেন, আমি বিশ বছর ধরে কুরআন নিয়ে কাজ করেছি, যতক্ষণ না আমি দুনিয়াকে আখেরাত থেকে আলাদা করতে পেরেছি। অতঃপর আমি তা দুটি অক্ষরে পেয়েছি। আর তা হলো আল্লাহর বাণী— ‘আর তোমাদের যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তা তো পার্থিব জীবনের ভোগ-সামগ্রী ও তার শোভা মাত্র, আর যা আল্লাহর কাছে আছে, তা উত্তম ও চিরস্থায়ী।’ (আল-ক্বাসাস: ২৬০)।

তিনি  আরো বলেন, ‘জাহিদ (প্রকৃত দুনিয়াবিমুখ) হলেন তিনি, যিনি তাঁর জুহদকে তাঁর কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেন। আর মুতাজাহিদ (কৃত্রিম দুনিয়াবিমুখ) হলেন তিনি, যিনি তাঁর জুহদকে তাঁর জিহ্বা দ্বারা প্রতিষ্ঠা করেন।’৮

বাদশাহর সাথে সাক্ষাতে অস্বীকৃতি:

হাকিম নিশাপুরী (রহ.) বলেন, শাকিক নিশাপুরে এসেছিলেন তিনশত জাহিদের (দুনিয়াবিমুখ অলী) দল নিয়ে। খলিফা আল-মামুন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলেন, কিন্তু তিনি সাক্ষাৎ করতে অস্বীকৃতি জানান।৯

জিহাদে অংশগ্রহণ:

মুহাম্মদ ইবনে ইমরান বলেন, আমি হাতিম আল-আসম থেকে শুনেছি, “আমরা একদিন তুর্কিদের বিরুদ্ধে জিহাদের ময়দানে হজরত শাকিক আল-বালখীর সাথে ছিলাম। আমি দেখলাম চারদিকে শুধু মাথা উড়ছে, তলোয়ার কেটে যাচ্ছে, বর্শা ভেঙে পড়ছে। তখন শাকিক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি এখন কেমন অনুভব করছ ‘ তোমার কি মনে হচ্ছে এটি তোমার বিয়ের রাতের মতো আনন্দময়?’

আমি বললাম, ‘না, আল্লাহর কসম, এমন নয়!’ তিনি বললেন, ‘কিন্তু আমি তো আমার আত্মাকে তেমনই আনন্দিত অনুভব করছি।’ এরপর তিনি দুই সেনাবাহিনীর মাঝখানে তাঁর ঢালের উপর শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন! এমন সময় এক তুর্কি এসে আমাকে ধরে ফেলল, আমাকে শুইয়ে দিলো জবেহ করার জন্য, এবং যখন সে ছুরি বের করতে গেল তখন একটি তির এসে তার গলায় লাগে এবং সে-ই নিহত হয়।১০

সালিক থেকে জাহিদ হওয়ার পদ্ধতি:

আহমদ ইবনে আব্দুল্লাহ আয জাহেদ বলেন, আমি শাকিক ইবনে ইবরাহিম আল-বালখিকে বলতে শুনেছি, ‘সাতটি দরজা রয়েছে, যা দিয়ে সালেকরা জুহহাদ এর পথ অতিক্রম করে।

১. আনন্দের সাথে ক্ষুধার উপর ধৈর্য ধারণ করা; দুর্বলতা নিয়ে নয়। সন্তুষ্টির সাথে, অস্থিরতা নিয়ে নয়।

২. আনন্দের সাথে বস্ত্রহীনতার উপর ধৈর্য ধারণ করা; দুঃখ নিয়ে নয়।

৩. দীর্ঘ সময় রোজা রাখার উপর ধৈর্য ধারণ করা, যেন সে (জান্নাতের) সুস্বাদু খাবার খাচ্ছে, জোর করে নয়, অনুগ্রহের সাথে।

৪. অসম্মান (লাঞ্ছনা) মেনে নেওয়ার উপর ধৈর্য ধারণ করা; নিজের মনের সন্তুষ্টির সাথে, বিতৃষ্ণা নিয়ে নয়।

৫. দুর্দশার উপর ধৈর্য ধারণ করা; সন্তুষ্টির সাথে, অসন্তুষ্টির সাথে নয়।

৬. খাদ্য ও পানীয় যা সে পেটে প্রবেশ করায়, তা কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে এসেছে, তা যেন শুদ্ধ হয়, এই বিষয়ে দীর্ঘ চিন্তা করা।

৭. পোশাক যা সে পরিধান করে, তা কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে এসেছে, তা যেন শুদ্ধ হয়, এই বিষয়ে দীর্ঘ চিন্তা করা।

যখন কেউ এই সাতটি দরজায় প্রবেশ করে, তখন সে জাহিদদের পথের একটি অংশ অতিক্রম করে ফেলে, আর এটাই হলো মহান অনুগ্রহ।১১

জাহিদদের মুকুট:

আহমদ ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, আমি শাকিক ইবনে ইবরাহিমকে বলতে শুনেছি, তিনটি বৈশিষ্ট্য হলো জাহিদের (দুনিয়াবিমুখ সুফি) মুকুট।

১. নফসের (প্রবৃত্তির) উপর ঝুঁকে থাকা, কিন্তু প্রবৃত্তির সাথে ঝুঁকে না পড়া।

২. জাহিদ তার অন্তর দ্বারা জুহদের প্রতি নিবেদিত হবে।

৩. যখনই সে একাকী হয়, তখনই সে স্মরণ করবে— কবরে তার প্রবেশ কেমন হবে, সেখান থেকে তার বের হওয়া কেমন হবে এবং সে ক্ষুধা, পিপাসা, বস্ত্রহীনতা, কিয়ামতের দীর্ঘকাল, হিসাব, সিরাত (পুলসিরাত), দীর্ঘ হিসাব এবং প্রকাশ্য অপমানের কথা স্মরণ করবে। যখন সে এগুলোর কথা স্মরণ করবে, তখন তা তাকে প্রতারণার ঘর (দুনিয়া) স্মরণ করা থেকে বিরত রাখবে। যদি সে এমন হয়, তবে সে জাহিদদের ভালোবাসে। আর যে তাদের ভালোবাসবে, সে তাদের সাথেই থাকবে।১২

শাকিক আল-বালখির মতে বান্দার জন্য অপরিহার্য তিনটি গুণ:

হাতিম আল-আসম বলেন, শাকিক আল-বালখি বলেছেন, তিনটি জিনিস আছে, যা পালন করা বান্দার জন্য অপরিহার্য। যে ব্যক্তি এগুলি আমল করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং সে দুনিয়াতে প্রশান্তি ও রহমত সহকারে জীবনযাপন করবে। আর যে ব্যক্তি এর মধ্যে থেকে একটি ছাড়বে, তার জন্য বাকি দুটি ছাড়া অপরিহার্য হয়ে পড়বে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি একটিকে গ্রহণ করবে, তার জন্য বাকিগুলি গ্রহণ করাও অপরিহার্য হবে; কারণ এগুলি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। আমি চাইলে এই তিনটিকে একটির মধ্যেও বলতে পারতাম, কিন্তু তিনটি হওয়ায় তা আরও সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার হয়েছে। যে ব্যক্তি এগুলি ছেড়ে দেবে ও নষ্ট করবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আর যে এদের একটিকে ছাড়বে, সে বাকি দুটিকেও ছেড়ে দেবে। সুতরাং তোমরা ফিকহ (গভীর জ্ঞান) অর্জন করো এবং দেখো। যখন তোমরা দেখবে, তখন মনোযোগ সহকারে দেখো।

১. তুমি তোমার অন্তর, জিহ্বা ও আমল দ্বারা মহান আল্লাহর একত্ববাদ (তাওহিদ) প্রতিষ্ঠা করবে। যখন তুমি তোমার অন্তর দ্বারা একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করবে যে, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং তিনি ছাড়া কোনো উপকারী বা ক্ষতিকর কেউ নেই, তখন অবশ্যই তোমাকে তা জিহ্বা দ্বারা উচ্চারণ করতে হবে, ফলে তা আসমানে উত্থিত হবে।

২. অবশ্যই তোমাকে তোমার সকল আমল একমাত্র আল্লাহর জন্য করতে হবে, অন্য কারও জন্য নয়। তুমি তোমার আমল অন্য কোনো স্বাধীন সত্ত্বার জন্য করতে পারবে না, শুধু তার প্রতি লোভ, লজ্জা বা ভয় ছাড়া। যখন তুমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করো বা তার প্রতি লোভ করো; অথচ তিনিই সবকিছুর মালিক ও রিজিকদাতা, তখন তুমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ইলাহ (উপাস্য) হিসেবে গ্রহণ করলে এবং তাকেই সম্মান ও মহত্ত্ব দান করলে। কারণ, তুমি তার কাছ থেকে লজ্জা পেলে, তাকে ভয় করলে এবং তার কাছে লোভ করলে। ফলে এটা তোমার অন্তর থেকে আল্লাহর তাওহিদ, তাঁর কর্তৃত্ব ও মহত্ত্বকে দূর করে দেয়। সুতরাং, এটা জানো। যখন তুমি এই কথা দ্বারা ইখলাস (খাঁটি নিয়ত) অর্জন করবে এবং এই অনুযায়ী আমল করবে যে, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তখন তিনি যেন তোমার কাছে দীনার ও দিরহাম, চাচা ও মামা, বাবা ও মা এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠে থাকা সকল মানুষের চেয়ে বেশি আস্থাশীল হন। কারণ তুমি যদি এর বিপরীত হও, তবে তোমার বিবেক, তোমার তাওহিদ এবং তাঁকে জানা ভেঙে পড়বে। এই দুটি গুণ তোমার জন্য অপরিহার্য এবং এরা একে অপরের অনুগামী।

৩. তুমি যখন এই অবস্থায় থাকবে এবং এই দুটি বিষয়কে প্রতিষ্ঠা করবে, তাওহিদ, ইখলাস এবং তাঁর উপর তাওয়াক্কুল; তখন তুমি তাঁর উপর সন্তুষ্ট থাকবে। কোনো কিছুতেই অসন্তুষ্ট হবে না যা তোমাকে দুঃখ দেয়। তা ভয়, ক্ষুধা, লোভ, স্বচ্ছলতা বা কঠোরতা যাই হোক না কেন। অসন্তুষ্টি থেকে সাবধান! তোমার অন্তর যেন তাঁর সাথে থাকে; এক মুহূর্তের জন্যও যেন সরে না যায়। কারণ তুমি যদি তোমার অন্তরে তাঁর প্রতি অসন্তুষ্টি প্রবেশ করাও, তবে তুমি তাঁকে অবজ্ঞা করলে, ফলে তোমার তাওহিদ ভেঙে পড়বে। সুতরাং, তোমার উচিত প্রথমটি অর্থাৎ তাওহিদ ও ইখলাসের উপর অটল থাকা। এটি জানো এবং এই তিনটি গুণ বোঝার চেষ্টা করো, তুমি এগুলির দ্বারা শক্তিশালী হবে। আর সাবধান, এগুলি যেন নষ্ট না করো, অন্যথায় তোমাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে এবং তুমি দুনিয়াতে চোখের শীতলতাও (শান্তি) দেখতে পাবে না।১৩

শয়তানের প্ররোচনা এবং তা মোকাবিলার কৌশল:

হাতিম আল-আসম বলেন, শাকিক বলেছেন, এমন কোনো দিন নেই যেদিন ইবলিস কোনো আদম সন্তানের খবর কমপক্ষে সাতবার জিজ্ঞেস করে না । যখন সে এমন কোনো বান্দার খবর শোনে যে তার পাপ থেকে মহান আল্লাহর কাছে তওবা করেছে, তখন সে এমন জোরে চিৎকার করে যে, তার পূর্ব ও পশ্চিমের সকল সন্তান (শয়তান) তার কাছে একত্রিত হয়। তারা তাকে জিজ্ঞেস করে, ‘হে আমাদের সর্দার, আপনার কী হয়েছে?’

সে বলে, ‘অমুক ব্যক্তি তওবা করেছে, তাকে বিপথগামী করার উপায় কী?’ সে তাদের জিজ্ঞেস করে, ‘তোমাদের মধ্যে কি তার কোনো আত্মীয়, বন্ধু বা প্রতিবেশী আছে?’ তাদের কেউ কেউ বলে, ‘হ্যাঁ, আর এই ব্যক্তিরা হলো মানুষের মধ্যে থাকা শয়তান (শয়াতীনুল ইনস)। তখন সে তাদের একজনকে বলে, ‘যাও, তার আত্মীয়দের কাছে যাও এবং তাকে বলো, তুমি যে পথে চলেছ, তা অতিরিক্ত কঠোর!’

ইবলিসের পাঁচটি দরজা বা কৌশল রয়েছে।

১. তার আত্মীয়রা তাকে বলবে, ‘তুমি অতিরিক্ত কঠোরতা অবলম্বন করেছ।’ যদি সে তার কথা গ্রহণ করে, তবে সে ফিরে আসবে এবং ধ্বংস হবে; অন্যথায় (যদি সে প্রত্যাখ্যান করে), তবে অন্যটি আসবে।

২. তার অন্য আত্মীয়রা তাকে বলবে, ‘তুমি যে পথ ধরেছো, তা পূর্ণতা পাবে না।’ যদি সে তার কথা গ্রহণ করে, তবে সে ফিরে আসবে এবং ধ্বংস হবে; অন্যথায় অন্যটি আসবে।

৩. তৃতীয়জন তাকে বলবে, ‘তুমি যেমন আছো তেমনই থাকো, যতক্ষণ না তোমার হাতে থাকা পার্থিব সম্পদ ফুরিয়ে যায়।’ যদি সে তার কথা গ্রহণ করে, তবে সে ফিরে আসবে এবং ধ্বংস হবে; অন্যথায় অন্যটি আসবে।

৪. চতুর্থজন তার কাছে এসে বলবে, ‘তুমি আমল করা ছেড়ে দিয়েছ, এখন তুমি কাজ করছো না। তুমি রাতদিন আরাম করছো, কোনো কাজ করছো না।’

৫. পঞ্চমজন তাকে এসে বলবে, ‘আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন। তুমি তওবা করেছ এবং আখেরাতের কাজে লেগেছো। তোমার মতো আর কে আছে, আর সত্য তো তোমার হাতেই!’ (অর্থাৎ এই বলে অন্তরে আত্মগর্ব বা উজব ঢুকিয়ে দেওয়া)।

এখন (শাকিক দেখান) কীভাবে তাদের উত্তর দিতে হবে।

১. যদি তারা বলে, তুমি কঠোরতা অবলম্বন করেছ, তবে তাকে উত্তর দাও, আমি আজ থেকে পূর্বে কঠোরতার মধ্যে ছিলাম, কিন্তু আজ আমি প্রশান্তিতে আছি, কারণ আমি আমার রবকে খুশি করতে চেয়েছি এবং মানুষদের অখুশি করতে চেয়েছি। যখনই আমি আমার রবকে খুশি করতে চেয়েছি, তখনই মানুষদেরকে অসন্তুষ্ট করেছি; আর যখনই আমি মানুষদের খুশি করেছি, তখনই আমার রবকে অসন্তুষ্ট করেছি। সুতরাং আজ আমি একমাত্র পরাক্রমশালী রবকে খুশি করার পথ বেছে নিয়েছি এবং মানুষদের ছেড়ে দিয়েছি। তাই আজ আমি স্বাধীন। আমার এই পথকে তুমি আমার জন্য সহজ করে দিয়েছ, কারণ আমি আমার একক রবের ইবাদত করছি, যাঁর কোনো শরিক নেই।

২. যদি তারা বলে, তুমি তা পূর্ণ করতে পারবে না, তবে বলো, পূর্ণতা তো মহান আল্লাহর হাতে, আমার কাজ হলো প্রবেশ করা।

৩. যদি তারা বলে, তুমি যেমন আছো তেমনই থাকো, যতক্ষণ না তোমার হাতে থাকা সম্পদ ফুরিয়ে যায়, তবে তাকে বলো, তুমি আমাকে কীসের ভয় দেখাচ্ছো? আমি তো নিশ্চিতভাবে জেনেছি যে, আমার কথা বা চাওয়া ছাড়া অন্য কোনো কিছু আমার জন্য নির্ধারিত থাকলে, আমি তাতে ক্ষমতা রাখি না। আর যা আমার জন্য নির্ধারিত, আমি যদি সপ্তম পৃথিবীতেও প্রবেশ করি, তবুও তা আমার কাছে চলে আসবে। এখন যখন আমি নিজেকে মুক্ত করে আমার রবের ইবাদতে মগ্ন হয়েছি, তখন তুমি আমাকে কীসের ভয় দেখাচ্ছো?

৪. যদি তারা বলে, তুমি তো কাজ করছো না, তুমি আমলহীন হয়ে গেছো, তবে বলো, আমি কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে আছি। আমার অন্তরের মধ্যে শত্রু (নফস বা শয়তান) স্পষ্ট হয়েছে, আর আমার রব আমার উপর ততক্ষণ সন্তুষ্ট হবেন না, যতক্ষণ না আমার অন্তরের এই শত্রু ভেঙে পড়ে এবং আমি অন্তরে যা কিছু নিক্ষেপ করে, তার বিরুদ্ধে বিজয়ী ও সাহায্যকারী হই। এর চেয়ে কঠিন কাজ আর কী হতে পারে?

৫. তুমি যখন এভাবে তাদের উত্তর দেবে এবং মহান আল্লাহর আনুগত্যে সুদৃঢ় থাকবে, তখন তারা তোমার কাছে আত্মগর্ব (উজব)’র দিক থেকে আসবে এবং তোমাকে বলবে, ‘তোমার মতো আর কে আছে? আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন এবং সুস্থ রাখুন।’ এই বলে তারা তোমার অন্তরে আত্মগর্ব ঢুকিয়ে দিতে চাইবে। তখন তাকে বলো, যখন তোমার কাছে স্পষ্ট হয়েছে যে, এই কাজই সত্য ও সঠিক, তখন মৃত্যু আসার আগ পর্যন্ত এই পথে চলতে তোমাকে কীসে বাধা দিচ্ছে?’

তুমি যখন এইভাবে তাদের উত্তর দেবে, তখন তারা তোমার কাছ থেকে সরে যাবে এবং তোমার উপর তাদের কোনো প্রভাব থাকবে না। তারা তখন ইবলিসের কাছে এসে খবর দেবে। তখন ইবলিস তাদের বলবে, ‘সে সঠিক পথ ও হিদায়াত লাভ করেছে। তার উপর তোমাদের আর কোনো প্রভাব নেই। কিন্তু সে শুধু এতেই সন্তুষ্ট থাকবে না, সে মানুষদে মহান আল্লাহর ইবাদতের দিকে ডাকবে। সুতরাং তোমরা মানুষদের তার কাছ থেকে দূরে রাখো এবং তাদের বলো, সে ভালো কিছু জানে না, তাই তোমরা তার কাছে যেও না।১৪

বান্দার কাজের পরিপূর্ণতা অর্জনের ছয়টি বৈশিষ্ট্য:

হাতিম আল-আসম বলেন, শাকিক ইবনে ইবরাহিম বলেছেন, বান্দার কাজের পরিপূর্ণতা ছয়টি বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে অর্জিত হয়।

১. স্থায়ী মিনতি এবং আল্লাহর শাস্তির ভীতি।

২. মুসলিমদের প্রতি সুধারণা।

৩. নিজের ত্রুটি নিয়ে ব্যস্ত থাকা; মানুষের ত্রুটি নিয়ে ব্যস্ত থাকার সময় না থাকা।

৪. নিজের ভাইয়ের ত্রুটি গোপন রাখা এবং মানুষের কাছে তা প্রকাশ না করা; এই আশায় যে, সে পাপ থেকে ফিরে আসবে এবং পূর্বে যা নষ্ট করেছে তা সংশোধন করবে।

৫. নিজের আমলের তুচ্ছতাকে বড় মনে করা; যাতে সে আমল বাড়ানোর প্রতি আরও বেশি আগ্রহী হয়।

৬. তার সাথি (ভাই) যেন তার কাছে সঠিক বলে বিবেচিত হয় (অর্থাৎ তার ভুল হলেও তাকে সরাসরি দোষারোপ না করা)।১৫

কারামাত:

ইমাম মুনাভী (রহ.) বলেছেন, একবার শাকিক আল-বালখী (রহ.) হজের উদ্দেশ্যে সফরকালে বিস্তাম নামক স্থানের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি সেখানে এক মসজিদে বসে আধ্যাত্মিক আলোচনা সভা করলেন। মসজিদের দরজার বাইরে কিছু শিশু খেলছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন ছোট্ট আবু ইয়াজিদ আল-বিস্তামী (বায়জিদ বোস্তামী রহ.)। সেই শিশু মাঝে মাঝে মসজিদের দরজার কাছে এসে শাকিকের বক্তব্য শুনে আবার ফিরে যেত। একসময় শাকিক আল-বালখী (রহ.)-এঁর দৃষ্টি তার উপর পড়ল। তিনি বললেন, “এই ছেলেটি ভবিষ্যতে পুরুষদের মধ্যে এক মহান পুরুষ হবে।” এবং সত্যিই তাই হয়েছিল। সেই শিশুটি পরবর্তীতে মহান আধ্যাত্মিক সাধক বায়জিদ বোস্তামী (রহ.) হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।১৬

বাণী ও নসিহত:

১.  হজরত শাকিক আল-বালখী বলেছেন, “যদি কোনো মানুষ দুইশ বছর বেঁচে থাকে, কিন্তু এই চারটি বিষয় না জানে, তবে সে মুক্তি পাবে না।

ক. আল্লাহকে চেনা।

খ. নিজেকে চেনা।

গ. আল্লাহর হুকুম ও নিষেধকে চেনা।

ঘ. আল্লাহর শত্রু ও নিজের নফসের শত্রুকে চেনা।

২. মুমিনের দৃষ্টান্ত হলো এমন এক ব্যক্তি, যে একটি খেজুর গাছ রোপণ করেছে, কিন্তু ভয় করে যে এটি কাঁটা ফল দেবে! আর মুনাফিকের দৃষ্টান্ত হলো এমন এক ব্যক্তি, যে কাঁটা রোপণ করেছে, কিন্তু আশা করে যে এটি মিষ্টি খেজুর ফল দেবে! কী দূরাশা!

৩. আমার কাছে অতিথির চেয়ে প্রিয় কিছু নেই; কারণ তার রিজিক আল্লাহর উপর, আর তার আতিথেয়তার সওয়াব আমার জন্য।

৪. তাওবার নিদর্শন হলো অতীতের পাপের জন্য কান্না, পুনরায় পাপে পতিত হওয়ার ভয়, খারাপ সঙ্গ ত্যাগ করা এবং ভালো লোকদের সাহচর্য অবলম্বন করা।

৫. যে ব্যক্তি বিপদে পড়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে অভিযোগ করে, সে কখনো ইবাদতের মিষ্টতা অনুভব করবে না।১৭

৬. হাতিম আল-আসম বলেন, আমি শাকিক ইবনে ইবরাহিমকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন—“বুদ্ধিমান ব্যক্তি তিনটি ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করে না। প্রথমত তিনি পূর্বে করা পাপের জন্য ভয় করে। দ্বিতীয়ত তিনি জানেন না পরের মুহূর্তে তার ওপর কী নেমে আসবে। তৃতীয়ত তিনি ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে ভয় পান, জানেন না কীভাবে তার সমাপ্তি হবে।”  সতর্ক থাক, যাতে তুমি দুনিয়ার কারণে ধ্বংস না হও এবং তুমি নিজের রিজিক নিয়ে চিন্তা করো না যে কেউ তা তোমার পরিবর্তে পাবে। মৃত্যুর সময় প্রস্তুত থাকো, মৃত্যুর পরে ফিরে আসার ব্যাপারে প্রশ্ন করো না। তাওয়াক্কুল মানে তোমার হৃদয় আল্লাহর প্রতিশ্রুতিতে নিশ্চিন্ত হওয়া। মানুষের তাকওয়া তিনটি বিষয়ে প্রকাশ পায়— গ্রহণে (নিজের জন্য নেওয়া), বিরতিতে (অনিচ্ছাকৃত বা নিষিদ্ধ জিনিস থেকে বিরত থাকা) এবং কথায় (বক্তব্যে সতর্ক থাকা)।

৭. মানুষের মাঝে অধঃপতন ছয়টি কারণে প্রবেশ করেছে।

ক. পরকালের কাজে নিয়্যতের দুর্বলতা।

খ. তাদের দেহ তাদের কামনার বন্দি হয়ে গেছে।

গ. দীর্ঘ আশা তাদের মেয়াদ (মৃত্যুর সময়) সম্পর্কে চিন্তা করার ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছে।

ঘ. তারা নিজেদের ইচ্ছা অনুসরণ করেছে এবং তাদের রসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সুন্নাহকে পিছনে ফেলে দিয়েছে।

ঙ. তারা মানুষের সন্তুষ্টিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উপর অগ্রাধিকার দিয়েছে।

চ. তারা পূর্বপুরুষদের ত্রুটি ও ভুলকে নিজের ধর্ম ও গুণের সমরূপ মনে করেছে।

৮. যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্পর্কে তার জ্ঞান যাচাই করতে চায়, সে যেন তাকিয়ে দেখে— আল্লাহ তাকে কীসের ওয়াদা দিয়েছেন এবং মানুষ তাকে কীসের ওয়াদা দিয়েছে; তার অন্তর কোনটির প্রতি বেশি আস্থাশীল?

৯. তুমি যা দাও এবং তোমাকে যা দেওয়া হয়, তার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করো। যদি যে তোমাকে দেয়, সে তোমার কাছে বেশি প্রিয় হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে তুমি দুনিয়াকে ভালোবাসো। আর যদি তুমি যাকে দাও, সে তোমার কাছে বেশি প্রিয় হয়, তাহলে তুমি আখেরাতকে ভালোবাসো।

১০. ধনী মানুষের প্রতি সাবধান হও। কারণ যদি তুমি তাদের সঙ্গে হৃদয় মিলাও এবং তাদের প্রতি লোভী হও, তবে তুমি তাদেরকে আল্লাহর স্থলে প্রভু মেনে নিয়েছ।

১১. যদি তুমি শান্তিতে থাকতে চাও, তবে যা পাও তা গ্রহণ কর, যা পাও তা পরিধান কর, এবং আল্লাহ যা তোমার জন্য নির্ধারণ করেছেন তাতে সন্তুষ্ট থাক।

১২. যে ব্যক্তি উচ্চতার (গর্ব, অহংকার) চারপাশে ঘোরে, সে কেবল আগুনের চারপাশে ঘোরে। যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির (শাহওয়াতের) আশেপাশে ঘোরাফেরা করে, সে যেন তার জান্নাতের স্তরগুলোকে দুনিয়াতে ভোগ করার জন্য ঘুরছে।১৮

১৩. হাতিম আল-আসম বলেন, শাকিক আল-বালখি আমাকে বলেছিলেন, তুমি মানুষের সাথে এমনভাবে মিশে থাকো, যেমনভাবে তুমি আগুনের সাথে থাকো। তার উপকার গ্রহণ করো, কিন্তু সাবধান, যেন সে তোমাকে পুড়িয়ে না দেয়।১৯

১৪. মুহাম্মদ ইবনে শাকিক ইবনে ইবরাহিম আল-বালখি এবং হাতিম আল-আসম দুজনই বলেছেন, শাকিকের দুটি উপদেশ ছিল। যদি কোনো আরব ব্যক্তি তাঁর কাছে আসত, তখন তিনি তাকে আরবিতে উপদেশ দিতেন— ‘তুমি তোমার অন্তর, জিহ্বা ও ঠোঁট দ্বারা আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করো।’ ‘তোমার হাতে যা আছে তার চেয়ে আল্লাহর প্রতি বেশি আস্থাশীল হও।’ ‘আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট থাকো।’ আর যদি কোনো অনারব ব্যক্তি তাঁর কাছে আসত, তখন তিনি তাকে বলতেন, আমার থেকে তিনটি বৈশিষ্ট্য অর্জন করো। প্রথমত, সত্যকে সংরক্ষণ করা। আর সত্য ঐক্যবদ্ধতা ছাড়া হয় না। যখন মানুষ একত্রিত হয়ে বলে যে ‘এটি সত্য’, তখন সে যেন সৃষ্টিকুল থেকে নিরাশ হয়ে সওয়াবের আশায় সেই সত্য কাজ করে। দ্বিতীয়ত, মিথ্যা শুধু ঐক্যবদ্ধতা ছাড়া মিথ্যা হয় না। যখন তারা একত্রিত হয়ে বলে যে ‘এটি মিথ্যা’, তখন সে যেন সৃষ্টিকুল থেকে নিরাশ হয়ে মহান আল্লাহর ভয়ে এই মিথ্যাকে পরিহার করে। তৃতীয়ত, যদি তুমি কোনো জিনিস সম্পর্কে না জানো যে, এটি সত্য না মিথ্যা, তবে তোমার উচিত থেমে যাওয়া, যতক্ষণ না তুমি জানতে পারো যে, এটি সত্য নাকি মিথ্যা। কারণ তোমার জন্য কোনো কিছুতে প্রবেশ করা হারাম, যদি না তোমার কাছে সেই বিষয়ে স্পষ্ট প্রমাণ ও জ্ঞান থাকে।

১৫. চারটি জিনিস বান্দার কাছ থেকে আখেরাতের বিষয়টিকে আড়াল করে রেখেছে।

ক. দারিদ্র্যের ভয় জাহান্নামের ভয়কে আড়াল করে দিয়েছে।

খ. মানুষ আমাকে কী বলবে— এই চিন্তাটি ‘আমি এটা করলে আমার রব আমাকে কী বলবেন’ এই চিন্তাটিকে আড়াল করে দিয়েছে।

গ. দুনিয়ার জীবনের ভালোবাসা আখেরাতের ভালোবাসাকে আড়াল করে দিয়েছে।

ঘ. দুনিয়ার জীবনের নিয়ামত, তার প্রতারণা, তার কামনা-বাসনা এবং তার বাহ্যিক সৌন্দর্য— যা তুমি দেখছ, তা আখেরাতের নিয়ামত এবং সেখানে তার জন্য যা প্রস্তুত করা হয়েছে তা থেকে আড়াল করে দিয়েছে

১৬. হাতিম আল-আসম বলেছেন, শাকিক বলেছেন, ‘যখন স্থল ও জলভাগে বিপর্যয় (ফাসাদ) দেখা দেবে, তখন এই চারটি বিষয়ের চেয়ে অদ্ভুত আর কিছু হবে না।

ক. নিজেকে বাঁচানোর জন্য বিবাহ (তাযয়িজ লীল-গালাবাহ্): অর্থাৎ হারাম থেকে বাঁচার জন্য বিবাহ করা।

খ. প্রয়োজনে ঘর তৈরি করা (আল-বাইতু লিল-‘ইদ্দাহ্): অর্থাৎ প্রয়োজনীয় আশ্রয় হিসেবে ঘর নির্মাণ।

গ. সুন্নাহ অনুযায়ী মেহমানদারি (আদ্ব-দ্বিয়াফাহ্ বিস্-সুন্নাহ্): মেহমানদারি করা, লোক দেখানোর জন্য নয়।

ঘ. লোভ ও লোক দেখানো ছাড়া জিহাদ (আল-জিহাদু বিলা ত্বামা’ই ওয়া লা রিয়া’ই): একনিষ্ঠভাবে জিহাদ করা।

বিবাহের ব্যাখ্যা: একজন ব্যক্তি হারামে লিপ্ত হওয়ার ভয়ে ভীত হয়ে বিবাহ করে।

প্রয়োজনে ঘর বানানোর ব্যাখ্যা: তুমি এমন একটি ঘর তৈরি করবে যা তোমাকে গরম ও ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা করবে। এবং তুমি ঘরের একটি পেরেকও এমনভাবে মারবে না যতক্ষণ না মারার আগে তুমি দেখবে যে, তা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ হবে। তেমনিভাবে সকল বিষয়ে, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ, তা তুমি গ্রহণ করো; অন্যথায় তা থেকে সাবধান থাকো।

সুন্নাহ অনুযায়ী মেহমানদারির ব্যাখ্যা: তুমি তোমার ঘরে এমন কোনো ব্যক্তিকে প্রবেশ করাবে না, যে হালাল জিনিস দেখেও লজ্জিত হয়। ফলে তোমার ঘরে ভাঙা রুটি থাকলেও তুমি লজ্জায় তাকে তা পরিবেশন করতে পারো না। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি হালাল নিয়ে লজ্জিত হয় না, তার ভরণপোষণ হালকা হয় এবং তার অহংকার কমে যায়। আর যে হালাল নিয়ে লজ্জিত হয়, সে অহংকারী।’ যে ব্যক্তি নিয়ামত থেকে বেরিয়ে এসে স্বল্পতার (কিল্লাহ্) মধ্যে পড়ে, আর যদি এই স্বল্পতা তার কাছে নিয়ামতের চেয়ে বড় না হয়, তবে সে দুটি দুঃখে (গম্ম) থাকে, দুনিয়ার দুঃখ ও আখেরাতের দুঃখ। তিনি আরো বলেন, আর যে ব্যক্তি নিয়ামত থেকে বেরিয়ে এসে স্বল্পতার মধ্যে পড়ে, আর যদি এই স্বল্পতা তার কাছে সেই নিয়ামতের চেয়েও বড় হয় যা থেকে সে বেরিয়ে এসেছে, তবে সে দুটি খুশিতে থাকে। দুনিয়ার খুশি ও আখেরাতের খুশি।

১৭. শাকিক আল-বালখি তাঁর মজলিসের লোকদের বলতেন, ‘তোমরা কি মনে করো, আল্লাহ যদি আজ তোমাদের মৃত্যু দেন, তবে তিনি তোমাদের কাছে আগামীকালের নামাজের দাবি করবেন?’ তারা বলল, ‘না। যে দিন আমরা বেঁচে থাকব না, সে দিনের নামাজের দাবি তিনি কীভাবে করবেন?’ শাকিক বললেন, ‘ঠিক যেমন তিনি তোমাদের কাছে আগামীকালের নামাজের দাবি করবেন না, তেমনি তোমরাও তাঁর কাছে আগামীকালের রিজিক চেয়ো না। কারণ হয়তো তোমরা আগামীকাল পর্যন্ত পৌঁছাবেই না!’

১৮. আমলে প্রবেশ করতে হয় ‘ইলম (জ্ঞান) দ্বারা, তাতে টিকে থাকতে হয় ‘সবর (ধৈর্য)’ দ্বারা, আর তা আল্লাহর কাছে সোপর্দ করতে হয় ‘ইখলাস (খাঁটি নিয়ত)’ দ্বারা। আর যে ব্যক্তি জ্ঞান ছাড়া তাতে প্রবেশ করে, সে মূর্খ।’২০

ইন্তেকাল:

হজরত শাকিক আল-বালখী রহমাতুল্লাহি আলাইহি কুলান যুদ্ধের ময়দানে, হিজরি ১৯৪ সনে (খ্রিষ্টাব্দ প্রায় ৮১০) শহিদ হন।২১

আবু সাঈদ আল-খাররাজ (রহ.) বলেছেন, আমি একবার স্বপ্নে শাকীক আল-বালখী (রহ.)-কে দেখলাম। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আল্লাহ তায়ালা আপনার সঙ্গে কী আচরণ করেছেন?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্ষমা করেছেন, তবে আমরা (আমাদের প্রজন্মের সুফিরা) তোমাদের স্তরে পৌঁছাতে পারিনি।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন এমন হলো?’ তিনি বললেন, ‘আমরা তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর ভরসা) করেছি যখন আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় জিনিস ছিল, আর তোমরা তাওয়াক্কুল করো যখন কিছুই হাতে থাকে না। তাই তোমাদের তাওয়াক্কুল আমাদের চেয়ে উচ্চতর।’ এরপর আমি স্বপ্নে শুনলাম, কেউ চিৎকার করে বলছে, ‘সে সত্য বলেছে, সে সত্য বলেছে!’ আমি সেই আওয়াজ শুনেই ঘুম থেকে জেগে উঠলাম, আর তখনও সেই আওয়াজ কানে বাজছিল।২২