আবু হাশিম আস-সুফি (রহ.) ছিলেন প্রাচীন ইসলামী যুগের একজন উজ্জ্বল সুফি চিন্তাবিদ এবং আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। তিনি কুফা নগরীর একজন বিশিষ্ট আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর ইবাদত, তাজকিয়া-ই-নফস (আত্মশুদ্ধি) এবং মানবসেবা দ্বারা পূর্ণ করেছিলেন। ইলমে তাসাওফের প্রথম দিকের ধারার একজন প্রকৃত প্রতিনিধি ছিলেন, যিনি নিজের চরিত্র ও আচরণের মাধ্যমে ‘সুফি’ শব্দের তাৎপর্য ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
প্রাথমিক পরিচয়:
আবু হাশিম আস-সুফি সত্যিকারের জাহিদ (দুনিয়া বিমুখ) ছিলেন, যিনি সর্বদা সত্যের প্রতি অনুরক্ত, মানুষের সমাবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সত্যের বাইরে যা কিছু আছে তার প্রতি নিরাসক্ত ছিলেন। তিনি আবু আবদুল্লাহ ইবনে আবি জাফর আল-বারাসির সমকালীন ছিলেন।১
সুফি ও খানকাহর ইতিহাস:
শায়খ আবদুর রহমান জামী রহমাতুল্লাহি আলাইহি স্পষ্টভাবে বলেছেন,“আবু হাশিম আল-কুফি-ই প্রথম ব্যক্তি, যিনি ‘সুফি’ নামে পরিচিত হন। তার পূর্বে কাউকেই এই নামে ডাকা হয়নি।”তিনি আরও বলেন, সুফিদের জন্য প্রথম খানকাহ নির্মিত হয়েছিল শাম (সিরিয়া) দেশের ‘রামলা’ নামক স্থানে। এর কারণ ছিল একজন খ্রিষ্টান রাজপুত্র শিকার করতে গিয়েছিলেন। পথে তিনি সুফিদের দু’জন ব্যক্তিকে দেখলেন, যারা একে অপরকে আলিঙ্গন করে বসলেন এবং নিজেদের কাছে থাকা সামান্য খাদ্যও একত্রে খেলেন, তারপর চলে গেলেন। রাজপুত্র তাদের আচরণ ও সৌজন্যে মুগ্ধ হলেন। তিনি তাদের একজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন—
‘ওই ব্যক্তি কে ছিল?’
সে বলল,‘আমি তাকে চিনি না।’
রাজপুত্র বলল,‘তোমার তার সঙ্গে সম্পর্ক কী?’
সে বলল,‘কোনো সম্পর্ক নেই।’
রাজপুত্র বলল,‘তাহলে সে কে ছিল?’
সে বলল,‘আমি জানি না।’
রাজপুত্র জিজ্ঞেস করল,‘তবে তোমাদের মধ্যে এই ভালোবাসা ও মমতার সম্পর্ক কেন?’
সে বলল,‘এই-ই আমাদের তরিকা (আধ্যাত্মিক পথ)।’
রাজপুত্র বলল,‘তোমাদের থাকার জন্য কোনো স্থান আছে কি?’
সে বলল,‘না।’
রাজপুত্র বলল,‘তাহলে আমি তোমাদের জন্য একটি আশ্রয়স্থল নির্মাণ করি।’
অতঃপর তিনি তাদের জন্য রামলায় ঐ খানকাহ নির্মাণ করে দিলেন।২
‘নাফহাতুল উনস’ গ্রন্থে শাইখ আবদুর রহমান আল-জামী (রহ.) বলেছেন, আবু হাশিমের পূর্বেও বহু বুজুর্গ ও পরহেজগার ব্যক্তি ছিলেন, যারা ত্যাগ, পরহেজগারি, আল্লাহর উপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) ও ভালোবাসার পথে উৎকৃষ্ট আচরণ করতেন। কিন্তু ‘সুফি’ বলে সর্বপ্রথম যাকে ডাকা হয়েছিল, তিনি ছিলেন আবু হাশিম। তাঁর আগে কাউকেই এই নামে ডাকা হয়নি। একইভাবে সুফিদের জন্য প্রথম যে খানকাহ (আধ্যাত্মিক জ্ঞান চর্চাকেন্দ্র) নির্মিত হয়েছিল, সেটি ছিল রামলা নগরীতে।৩
জুহদ ও তাসাউফ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি:
আবু হাশিম আয-যাহেদ বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা এই দুনিয়াকে একাকিত্ব ও ভীতি দ্বারা চিহ্নিত করেছেন; যাতে আল্লাহর অনুসন্ধানকারীদের স্বস্তি দুনিয়া ব্যতীত তাঁর সাথেই নিহিত থাকে এবং যাতে আনুগত্যশীল বান্দারা এটিকে উপেক্ষা করে তাঁর দিকে অগ্রসর হয়। অতএব, যারা আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, তারা এই দুনিয়ায় একাকিত্ব অনুভব করেন এবং আখেরাতের প্রতি আগ্রহী ও আকাঙ্ক্ষী হয়ে থাকেন। তিনি আরো বলেন, যদি দুনিয়া প্রাসাদ ও বাগান হতো আর আখিরাত হতো কুঁড়েঘর, তবুও আখিরাতকে দুনিয়ার উপর অগ্রাধিকার দেওয়ার যোগ্য হতো, কারণ তা (আখিরাত) চিরস্থায়ী এবং এটা (দুনিয়া) ক্ষণস্থায়ী।৪
আবু হাশিম আস-সুফির সোহবতে ইমাম সুফিয়ান সাওরীর আত্মশুদ্ধি অর্জন:
ইমাম সুফিয়ান সাওরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “আমি বুঝতাম না আমার চিন্তাগুলো কতটা আড়ষ্ট ও গোঁড়া; যতক্ষণ না আমি আবু হাশিমের সান্নিধ্যে বসেছি। তাঁর সংস্পর্শে এসে আমি শিখেছি কীভাবে অন্তরের ভণ্ডামি ও আত্মপ্রশংসা থেকে মুক্ত থাকতে হয়।”৫
বাণী-চিরন্তন:
১. সুঁই দিয়ে পাহাড় খুঁড়ে ফেলা সহজ, কিন্তু অন্তর থেকে অহংকার দূর করা তার চেয়ে কঠিন।৬
২. মানুষ যদি নিজেকে উত্তম আচরণের মাধ্যমে সংশোধন করতে পারে, তবে সে তার পরিবারকেও উত্তমভাবে শিষ্টাচার শেখাতে সক্ষম হয়।৭
ইন্তেকাল:
তিনি ১৫৫ হিজরিতে ইন্তিকাল করেন। তাঁর আদি নিবাস ছিল কুফা।৮