আহলে বায়তের উজ্জ্বল প্রদীপ, ইলম ও মারিফাতের এক অফুরন্ত ভান্ডার, যার সামনে যুগের জ্ঞানীরা মাথা নত করতেন। এমন এক মহাজ্ঞানী, যিনি কেবল তাসাউফ, ফিকহ ও হাদিসের ইমামই নন, বরং তাফসির, আকিদাহ, কেমিস্ট্রি, মেডিসিনসহ বিভিন্ন বিদ্যার প্রবর্তকদের শিক্ষকও। তাঁর কাছ থেকে ইলম আহরণ করেছেন স্বয়ং ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.)-সহ প্রমুখ ফকিহ ও মুহাদ্দিসগণ। এমনকি আধুনিক রসায়নের জনক জাবির ইবনে হাইয়ান পর্যন্ত। তিনি ইমাম জাফর সাদেক (রহ.)। তাঁর জীবন ছিল ইবাদত, জ্ঞান, দানশীলতা, বিনয় ও খোদাভীতির অনন্য সংমিশ্রণ। তিনি দুনিয়াবিমুখ ছিলেন, অথচ মানুষের কল্যাণে সর্বদা সচেষ্ট থাকতেন। দ্বীনি আলোচনায় যেমন গভীরতা ও দৃঢ়তা ছিল, তেমনি আধ্যাত্মিক আসরেও থাকত রহমত ও প্রশান্তি।
জন্ম ও বংশধারা:
তিনি হিজরি ৮০ সালে (৬৯৯ খিষ্টাব্দে) মদিনাতুল মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম এমন এক পরিবারে, যেখানে প্রিয়নবীর ﷺ তাকওয়া ও আধ্যাত্মিকতার নূর একত্রিত হয়েছিল। পিতা ছিলেন ইমাম মুহাম্মদ আল-বাকির (রহ.), যিনি ইলম, ফিকহ ও তাকওয়ার জন্য যুগের ইমাম হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। দাদা ইমাম আলী যাইনুল আবিদীন (রহ.), যিনি ইবাদত ও সেজদার কারণে ‘সাজ্জাদ’বা ‘যাইনুল আবিদীন’নামে সুপরিচিত। প্রপিতামহ ছিলেন সায়্যিদুশ শুহাদা ইমাম হোসাইন (রাদ্বিআল্লাহু আনহু), যিনি কারবালার ময়দানে শাহাদাত বরণ করেছিলেন। আর তাঁর প্রপিতামহ ছিলেন নবীজীর ﷺ চাচাতো ভাই ও জামাতা, খলিফায়ে রাশেদ ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব (রাদ্বিআল্লাহু আনহু)। এভাবে ইমাম জাফর সাদিক রহমাতুল্লাহি আলাইহি সরাসরি আহলে বাইতের পবিত্র বংশে জন্মগ্রহণ করেন।
মাতৃসূত্রেও তাঁর বংশ মর্যাদাপূর্ণ। তাঁর মা ছিলেন উম্মে ফারওয়া, কাসিম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবি বকরের কন্যা। তাঁর নানা, কাসিম ইবনে মুহাম্মদ, ছিলেন মদিনার প্রসিদ্ধ ফকিহ ও মদিনার সাত ফকিহের অন্যতম। এই কারণে তিনি মাতৃসূত্রে খলিফায়ে আউয়াল আবু বকর (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) এর বংশধর ছিলেন। এজন্যই তিনি বলতেন, “আবু বকর আমাকে দুই দিক থেকে জন্ম দিয়েছেন।” আর কেউ আবু বকরের বিরুদ্ধে কথা বললে তিনি বলতেন, “কোনো মানুষ কি তার দাদাকে গালি দিতে পারে? আবু বকর তো আমার দাদা।”১
জ্ঞান অর্জন:
ইমাম জাফর আস-সাদিক (রহ.) জ্ঞান, সাহিত্য, বংশ এবং মর্যাদার এক মহৎ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শহর মদিনায় বেড়ে ওঠেন। তখন মদিনা ছিল সাহাবায়ে কেরাম ও প্রবীণ তাবেয়িনদের সমাবেশস্থল। ইমাম জাফর সাদিক তাঁর পিতা ইমাম মুহাম্মদ আল-বাকির (রহ.) এবং দাদা ইমাম আলী ইবনুল হুসাইন জয়নুল আবেদীন (রহ.)-এর কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। ইমাম জয়নুল আবেদীন (রহ.) ৯৪ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন, তখন ইমাম জাফরের বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। এছাড়াও তিনি তাঁর নানা কাসিম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবি বকর (রহ.) থেকে জ্ঞান লাভ করেন, যিনি মদিনার অন্যতম প্রবীণ আলেম ও ফকিহ ছিলেন। ২
ইমাম যাহাবি (রহ.) সিয়ারু আলামিন-নুবালা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ইমাম জাফর অনেক আলেম ও মুহাদ্দিসের সান্নিধ্যে থেকেছেন এবং তাঁদের কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। ইমাম যাহাবি বলেন, “তিনি ৮০ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং কিছু সাহাবিকে দেখেছিলেন। আমার ধারণা তিনি আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) এবং সাহল ইবন সাদ (রা.)-কে দেখেছিলেন। তিনি তাঁর পিতা আবু জাফর আল-বাকির, উবাইদুল্লাহ ইবন আবি রাফে, উরওয়া ইবনে জুবাইর, আতা ইবনে আবি রাবাহ প্রমুখের কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। মুসলিমের সংকলনে তাঁর বর্ণিত হাদিস রয়েছে। তাঁর শায়েখদের মধ্যে আরও আছেন কাসিম ইবনে মুহাম্মদ, নাফি আল-উমরী, মুহাম্মদ ইবনে আল-মুনকাদির, জুহরি, মুসলিম ইবনে আবি মারয়াম প্রমুখ। তবে তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁর পিতা থেকেই বর্ণনা করেছেন। তিনি মদিনার অন্যতম শ্রদ্ধাভাজন আলেম ছিলেন।”৩
সব মিলিয়ে ইমাম জাফর আস-সাদিক (রহ.)-এঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে জ্ঞানচর্চার অনুকূল পরিবেশে। সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িদের সরাসরি প্রভাব, এবং তাঁর পিতা ও দাদার শিক্ষাই তাঁকে ইসলামি জ্ঞানের দিগন্তে অনন্য মর্যাদা দান করেছে।
উল্লেখযোগ্য শাগরেদবৃন্দ:
ইমাম জাফর সাদিক রহমাতুল্লাহি আলাইহির নিকট ইলম অর্জন করেছেন এবং তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন তার পুত্র মূসা আল-কাযিম, ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদ আল-আনসারী, ইয়াযিদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আল-হাদ , ইমাম আবু হানিফা, আবান ইবনে তাগ্লিব, ইবনে জুরাইজ, মু’আবিয়া ইবনে আম্মার আয-যাহনি, ইবনে ইসহাক এবং তার সমসাময়িক আরও অনেকে। এছাড়াও সুফিয়ান, শু’বা, মালিক, ইসমাঈল ইবনে জাফর, ওয়াহব ইবনে খালিদ, হাতিম ইবনে ইসমাইল, সুলাইমান ইবনে বিলাল, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা, হাসান ইবনে সালিহ, হাসান ইবনে আইয়াশ, যুহাইর ইবনে মুহাম্মাদ, জাফর ইবনে গিয়াস, জায়েদ ইবনে হাসান আল-আনমাতি, সাঈদ ইবনে সুফিয়ান আল-আসলামি, আবদুল্লাহ ইবনে মাইমুন, আবদুল আযিয ইবনে ইমরান আয-যুহরি, আবদুল আযিয আদ-দারাওয়ারদি, আবদুল ওয়াহাব আস-সাকাফি, উসমান ইবনে ফারকাদ, মুহাম্মাদ ইবনে সাবিত আল-বুনানি, মুহাম্মাদ ইবনে মাইমুন আয-যা’ফরানি, মুসলিম আয-যিঞ্জি, ইয়াহিয়া আল-কাত্তান, আবু আসিম আন-নাবিল এবং আরও অনেকে। ৪
জ্ঞানের দিগন্ত:
ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহ্-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি সবচেয়ে জ্ঞানী কাকে দেখেছেন? উত্তরে তিনি বলেছেন, আমি জাফর ইবনে মুহাম্মাদের চেয়ে জ্ঞানী কাউকে দেখিনি। যখন আল-মানসুর তাকে হীরা শহরে নিয়ে আসেন, তিনি আমাকে ডেকে বললেন, হে আবু হানিফা, মানুষ জাফর ইবনে মুহাম্মাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, তাই তার জন্য কিছু কঠিন প্রশ্ন তৈরি করো।
আমি তার জন্য চল্লিশটি প্রশ্ন তৈরি করলাম। তারপর আমি আবু জাফরের কাছে গেলাম, আর জাফর তার ডান দিকে বসেছিলেন। যখন আমি তাদের দেখলাম, তখন জাফরের প্রতি আমার এমন সম্মান জাগলো, যা আবু জাফরের প্রতি জাগেনি। আমি সালাম দিলাম। আমাকে বসার অনুমতি দেওয়া হলো। তারপর তিনি জাফরের দিকে তাকিয়ে বললেন, হে আবু আবদুল্লাহ, তুমি একে চেনো? তিনি বললেন, হ্যাঁ, ইনি আবু হানিফা। তারপর তিনি বললেন, হে আবু হানিফা, তোমার প্রশ্নগুলো নিয়ে আসো, আমরা আবু আবদুল্লাহকে জিজ্ঞেস করি।
আমি তাকে প্রশ্ন করা শুরু করলাম। প্রতিটি প্রশ্নের জবাবে তিনি বলতেন, তোমরা এ বিষয়ে এমন বলছো, মদিনার লোকেরা এমন বলছে, আর আমরা এমন বলছি। কখনো তিনি আমাদের সাথে একমত হতেন, কখনো মদিনার লোকদের সাথে একমত হতেন, আর কখনো আমাদের সবার সাথে ভিন্নমত পোষণ করতেন। আমি চল্লিশটি প্রশ্ন শেষ করলাম। তারপর আবু হানিফা (রহ.) বললেন, ‘আমরা কি বর্ণনা করিনি যে, মানুষের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী সে, যে তাদের মতপার্থক্য সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানে!’ ৫
মুয়াবিয়া ইবনে আম্মার বলেন, আমি জাফর ইবনে মুহাম্মাদকে কুরআন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এটি সৃষ্ট নয় এবং স্রষ্টাও নয়, তবে এটি আল্লাহর কালাম।
আইয়ুব বলেন, আমি জাফরকে বলতে শুনেছি, আল্লাহর কসম, আমরা এমন সবকিছু জানি না, যা মানুষ আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করে, আমাদের থেকে অন্যেরা বেশি জানে।
মুসলিমা ইবনে জাফর আল-আহমসি বলেন, আমি জাফর ইবনে মুহাম্মাদকে বললাম, কিছু লোক দাবি করে যে, অজ্ঞতাবশত তিন তালাক দিলে তা সুন্নাহতে ফিরিয়ে আনা হয় এবং তারা এটিকে এক তালাক গণ্য করে, তারা আপনাদের থেকে এটি বর্ণনা করে। তিনি বললেন, আল্লাহর আশ্রয় চাই, এটা আমাদের কথা নয়। যে তিন তালাক দিয়েছে, তা তার কথা মতোই হয়েছে।
ইমাম জাফর আস সাদিককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আল্লাহ সুদ কেন হারাম করেছেন? তিনি বললেন, “যাতে মানুষ একে অপরের প্রতি ভালো আচরণ করা থেকে বিরত না হয়।”
খলিল ইবনে আহমাদ বলেন, আমি সুফিয়ান আস-সাওরীকে বলতে শুনেছি, আমি মক্কায় গেলাম এবং আবু আবদুল্লাহ জাফর ইবনে মুহাম্মাদকে আবতাহে তার উট বসাতে দেখলাম। আমি জানতে চাইলাম, হে রসুলুল্লাহর পুত্র, কেন আরাফাতের অবস্থান হারাম থেকে দূরে করা হয়েছে? এবং কেন তা হারামের পবিত্র স্থানে নয়?
তিনি বললেন, ‘কাবা আল্লাহর ঘর, আর হারাম হলো এর পর্দা, আর আরাফাতের অবস্থান হলো এর দরজা। যখন আগন্তুকরা এর দিকে যায়, তখন তাদের দরজায় দাঁড় করানো হয়, যাতে তারা মিনতি করে। যখন তাদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়, তখন তাদের দ্বিতীয় দরজার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, যা মুজদালিফা। যখন আল্লাহ তাদের অতিরিক্ত মিনতি ও দীর্ঘ প্রচেষ্টা দেখেন, তখন তাদের প্রতি দয়া করেন। যখন তিনি তাদের প্রতি দয়া করেন, তখন তাদের কুরবানি করার নির্দেশ দেন। যখন তারা তাদের কুরবানি সম্পন্ন করে, তাদের ময়লা দূর করে এবং তাদের ও আল্লাহর মধ্যে পর্দা ছিল এমন পাপ থেকে পবিত্র হয়, তখন তাদের পবিত্র অবস্থায় আল্লাহর ঘর জিয়ারত করার নির্দেশ দেন।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে কেন আইয়ামে তাশরিক (কুরবানির পরের দিনগুলো) রোজা রাখা অপছন্দ করা হয়? তিনি বললেন, ‘কারণ তারা আল্লাহর মেহমান, আর মেহমানের জন্য তার মেজবানের কাছে রোজা রাখা উচিত নয়।’ পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, আমার জান আপনার জন্য কুরবান হোক, লোকেরা কেন কাবার পর্দায় ঝুলে থাকে, যখন এটি একটি কাপড় যা কোনো উপকার করে না? তিনি বললেন, ‘এটি এমন একজন ব্যক্তির মতো যার ও অন্য একজন ব্যক্তির মধ্যে কোনো অপরাধ হয়েছে। তাই সে তার কাছে ঝুলে থাকে এবং তার চারপাশে প্রদক্ষিণ করে, এই আশায় যে, সে তাকে সেই অপরাধ ক্ষমা করে দেবে। ৬
ইবাদত ও রিয়াজত:
ইমাম মালিক ইবনে আনাস রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন,“মানবচক্ষু যা কিছু দেখেছে, মানবকর্ণ যা কিছু শুনেছে, আর মানুষের অন্তরে যা কিছু ভেবেছে, তার কোনোটিই জাফর ইবনে মুহাম্মদ আস-সাদিক রহমাতুল্লাহি আলাইহির মর্যাদা, জ্ঞান, ইবাদত ও সংযমের চেয়ে উৎকৃষ্ট নয়।” ৭
হজরত সুফিয়ান সাওরী বলেন, আমি জাফর ইবন মুহাম্মদের কাছে প্রবেশ করলাম। তার গায়ে ছিল গাঢ় রঙের দামি রেশমি চাদর ও রেশমি পোশাক। আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, “হে সাওরী, কেন তুমি আমার দিকে তাকিয়ে আছো? সম্ভবত তুমি এ পোশাক দেখে বিস্মিত হচ্ছো।” আমি বললাম, “হে রসলুল্লাহ ﷺ-এঁর সন্তান, এটি তো আপনার পোশাক নয়, আর না-ই আপনার পূর্বপুরুষ আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এঁর পোশাক, যিনি আপনার নানাজান।”
তখন ইমাম জাফর সাদিক (রহ.) বললেন, “হে সাওরী, সেটি ছিল এক অভাব-অনটনের যুগ। তারা নিজেদের সময়ের অবস্থা অনুযায়ী ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন এমন যুগ এসেছে যেখানে সবকিছু সহজলভ্য হয়েছে।” এরপর তিনি তার বাইরের জামা উঁচু করলেন, ভেতরে ছিল সাদা উলের সরল পোশাক, যার হাতা ও নিচের অংশ ছোটো। তিনি বললেন, “হে সাওরী, এই পোশাকটি আল্লাহর জন্য, আর ওইটা তোমাদের জন্য। যা আল্লাহর জন্য, আমি তা গোপন রাখি; আর যা মানুষের জন্য, আমি তা প্রকাশ করি।” ৮
হাইয়াজ ইবনে বাস্তাম বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, “জাফর ইবনে মুহাম্মদ লোকদের এমনভাবে খাওয়াতেন যে, তার পরিবারের জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকত না।”৯
বাদশাহর সম্মুখেও অকুতোভয়:
আহমদ ইবনে আমর ইবনে মুকদাম রাযী বলেন, “একদিন এক মাছি এসে আব্বাসী খলিফা মানসুরের গায়ে বসলো। তিনি তা সরালেন, আবার এল, আবার সরালেন, এতে তিনি কষ্ট পেলেন। তখন ইমাম জাফর ইবনে মুহাম্মদ প্রবেশ করলেন। মানসুর তাঁকে বলল, ‘হে আবু আবদুল্লাহ, আল্লাহ মাছি কেন সৃষ্টি করেছেন?’ তিনি বললেন, ‘যাতে আল্লাহ এর মাধ্যমে জালিম শাসকদের অপমানিত করতে পারেন!”১০
ইমাম সুফিয়ান সাওরির প্রতি নসিহত:
ইমাম মালেক ইবনে আনাস (রহ.) বর্ণনা করেন, ইমাম জাফর সাদিক রহমাতুল্লাহি আলাইহি হজরত সুফিয়ান সাওরীকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন,“হে সাওরী, আল্লাহ যদি তোমাকে কোনো নেয়ামত দান করেন এবং তুমি চাও যে তা স্থায়ী হোক, তবে প্রচুর শোকর আদায় করো। কেননা আল্লাহ কুরআনে বলেছেন,
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দেবো।” (সুরা ইবরাহীম: ৭)। আর যদি রিজিক দেরিতে আসে, তবে বেশি বেশি ইস্তিগফার করো। কারণ আল্লাহ বলেছেন,
اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا، يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا، وَيُمْدِدْكُم بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ – তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান দান করবেন।” (সুরা নূহ: ১০-১২)। আর যদি শাসক বা অন্য কারো থেকে কোনো সমস্যা আসে, তবে বারবার বলো, ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।’ এটি হলো মুক্তির চাবি এবং জান্নাতের খাজানার ভান্ডার।”১১
ইমাম মুসা কাজেমের প্রতি নসিহত:
ইমাম জাফর সাদিক রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর পুত্র হজরত মুসা কাজেম রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে উপদেশ প্রদান করে বলেন, “বাছাধন, আমার উপদেশগুলো মেনে নাও। তুমি যদি তা আঁকড়ে ধরো তবে সুখী জীবনযাপন করবে এবং সম্মানজনক মৃত্যু বরণ করবে। আর তা হলো—
- যে আল্লাহর বণ্টনে সন্তুষ্ট, সে ধনী।
- যে অন্যের সম্পদের দিকে চায়, সে গরিব হয়ে মরে।
- যে আল্লাহর তাকদিরে অসন্তুষ্ট, সে আল্লাহর উপরই অভিযোগ আনে।
- যে নিজের ভুলকে ছোট মনে করে, সে অন্যের ভুলকে বড় করে দেখে।
- যে অন্যের গোপনীয়তা ভাঙে, তার নিজের ঘরের পর্দা ফাঁস হয়।
- যে অন্যায়ভাবে তলোয়ার তোলে, সে তাতে নিহত হয়।
- যে অন্যের জন্য গর্ত খোঁড়ে, সে তাতে পড়ে যায়।
- যে মূর্খদের সাথে মেশে, সে অপমানিত হয়।
- যে আলেমদের সাথে মেশে, সে সম্মানিত হয়।
- যে মন্দ স্থানে যায়, সে অভিযুক্ত হয়।
হে বৎস, সত্য বলো, তা তোমার পক্ষে হোক বা বিপক্ষে। গিবত ও নামিমা থেকে বাঁচো, কারণ এগুলো মানুষের অন্তরে বিদ্বেষ জন্মায়।”১২
হিলিয়াতুল আউলিয়াতে আরো রয়েছে—
হে আমার পুত্র, তুমি যেন পুরুষদের তুচ্ছ না করো, তাহলে তোমাকে তুচ্ছ করা হবে। আর তুমি এমন বিষয়ে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থেকো, যা তোমার জন্য অর্থহীন, তাহলে তুমি এর কারণে অপমানিত হবে। হে আমার পুত্র, সত্য বলো, তা তোমার পক্ষে হোক বা বিপক্ষে, তাহলে তুমি তোমার সমবয়সীদের মধ্যে সম্মানিত হবে।
হে আমার পুত্র, আল্লাহর কিতাবের পাঠক হও, সালামের প্রচারক হও, ভালো কাজের আদেশকারী হও, মন্দ কাজ থেকে নিষেধকারী হও, যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তার সাথে সম্পর্ক স্থাপনকারী হও, যে তোমার প্রতি নীরব থাকে তার সাথে কথা শুরু করো এবং যে তোমার কাছে কিছু চায় তাকে তা দান করো। আর তুমি পরনিন্দা থেকে বিরত থেকো, কারণ তা মানুষের হৃদয়ে শত্রুতা সৃষ্টি করে। আর মানুষের ত্রুটি খুঁজতে যাওয়া থেকে বিরত থেকো, কারণ মানুষের ত্রুটি খুঁজতে যাওয়া লক্ষ্যের মতো।
হে আমার পুত্র, যদি তুমি উদারতা চাও, তবে তার উৎসের কাছে যাও, কারণ উদারতার উৎস রয়েছে, আর উৎসের রয়েছে মূল, আর মূলের রয়েছে শাখা, আর শাখার রয়েছে ফল। আর ফল মূল ছাড়া সুস্বাদু হয় না, আর কোনো মূল উত্তম উৎস ছাড়া স্থায়ী হয় না।
হে আমার পুত্র, যদি তুমি পরিদর্শন করো, তবে সৎ লোকদের পরিদর্শন করো, পাপীদের পরিদর্শন করো না, কারণ তারা এমন পাথরের মতো, যা থেকে পানি বের হয় না, এমন গাছের মতো যার পাতা সবুজ হয় না এবং এমন জমির মতো যা থেকে ঘাস বের হয় না।” আলী ইবনে মুসা বলেন, তিনি তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই উপদেশ ত্যাগ করেননি। ১৩
কারামত:
লাইস ইবনে সাদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হিজরি ১১৩ সনে হজ করেছিলাম। আমি মক্কায় এসে আসরের নামাজ আদায় করার পর আবু কুবাইস পাহাড়ে উঠলাম। সেখানে আমি এক ব্যক্তিকে বসে দোয়া করতে দেখলাম। তিনি বলছিলেন, ‘ইয়া রাব্বি, ইয়া রাব্বি।’ যতক্ষণ না তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল ততক্ষণ এভাবে বলতে থাকল। তারপর বললেন, ‘ইয়া রাব্বাহ।’ যতক্ষণ না তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল ততক্ষণ এভাবে বলতে থাকল। তারপর বললেন, ‘ইয়া রাব্বি।’ যতক্ষণ না তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল ততক্ষণ এভাবে বলতে থাকল।
তারপর বললেন, ‘ইয়া আল্লাহ, ইয়া আল্লাহ।’ যতক্ষণ না তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল ততক্ষণ এভাবে বলতে থাকল। তারপর বললেন, ‘ইয়া হাইয়ু, ইয়া হাইয়ু।’ যতক্ষণ না তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল ততক্ষণ এভাবে বলতে থাকল। তারপর বললেন, ‘ইয়া রাহিম।’ যতক্ষণ না তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল ততক্ষণ এভাবে বলতে থাকল। তারপর বললেন, ‘ইয়া আরহামার রাহিমিন।’ যতক্ষণ না তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল ততক্ষণ এভাবে বলতে থাকল।
তারপর বললেন, ‘হে আল্লাহ, আমি এই আঙুর খেতে চাই, আমাকে তা খাওয়ান। হে আল্লাহ, আমার দুটি চাদর পুরনো হয়ে গেছে।’ লাইস বলেন, আল্লাহর কসম, তার কথা শেষ হতে না হতেই আমি দেখলাম এক ঝুড়ি আঙুরে পরিপূর্ণ, অথচ সেসময় জমিনে কোনো আঙুর ছিল না, এবং দুটি নতুন চাদরও রাখা ছিল। তিনি খেতে চাইলে আমি বললাম, আমি আপনার অংশীদার হতে চাই। তিনি আমাকে বললেন, সামনে এসে খাও, কিন্তু এর থেকে কিছু নিও না। আমি সামনে গেলাম এবং এমন কিছু খেলাম যা আমি আগে কখনো খাইনি। আঙুরগুলো ছিল বীজ ছাড়া। আমি তৃপ্তি সহকারে খেলাম, কিন্তু ঝুড়িটি আগের মতোই পরিপূর্ণ ছিল।
তারপর তিনি আমাকে বললেন, তোমার পছন্দের চাদরটি নাও। আমি তাকে বললাম, আমার চাদরের প্রয়োজন নেই। তিনি আমাকে বললেন, আমার কাছ থেকে আড়ালে যাও যাতে আমি চাদর দুটি পরতে পারি। আমি তার কাছ থেকে আড়ালে গেলাম। তিনি একটি পরলেন এবং অন্যটি দিয়ে লুঙ্গি বানালেন। তারপর তার পুরোনো চাদর দুটি কাঁধে রাখলেন। তিনি নিচে নামলেন এবং আমি তার অনুসরণ করলাম।
যখন তিনি মাসআয় পৌঁছলেন, তখন এক ব্যক্তি তার সাথে দেখা করে বললেন, ‘হে আল্লাহর রসুলের পুত্র, আমাকে পোশাক দান করুন, আল্লাহ আপনাকে পোশাক দান করুন।’ তখন তিনি তার পুরোনো দুটি চাদর তাকে দিয়ে দিলেন। আমি সেই লোকটির কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? সে বলল, জাফর ইবনে মুহাম্মদ। লাইস বলেন, আমি তার কাছ থেকে আরও কিছু শোনার জন্য তাকে খুঁজতে লাগলাম, কিন্তু তাকে আর পেলাম না। ১৪
আল-ফদল ইবনে আর-রাবী তাঁর পিতার কাছে বর্ণনা করেন: একবার বাদশাহ মানসুর আমাকে ডেকে বললেন, “জাফর ইবনে মুহাম্মাদ আমার শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে। আল্লাহ আমাকে হত্যা করুন, যদি আমি তাকে হত্যা না করি।”আমি জাফর সাদিক রহমাতুল্লাহি আলাইহির কাছে গেলাম এবং বললাম, “আপনি আমিরুল মুমিনিনের ডাকে সাড়া দিন।”জাফর তখন পবিত্রতা অর্জন করলেন, নতুন পোশাক পরিধান করলেন এবং আমি তাঁকে নিয়ে গেলাম।
খলিফা মানসুরের অনুমতি চাওয়া হলে তিনি বললেন, “তাকে প্রবেশ করাও। আল্লাহ আমাকে হত্যা করুন, যদি আমি তাকে হত্যা না করি।”যখন মানসুর ইমাম জাফর সাদিককে দেখলেন, তিনি তার আসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং স্বাগত জানালেন। তিনি বললেন,“ কপটতা ও বিশ্বাসঘাতকতা থেকে মুক্ত পবিত্র ও খাঁটি আমার ভাই ও চাচাতো ভাইকে স্বাগতম।” তারপর তিনি জাফর সাদিককে নিজের সিংহাসনে বসালেন এবং তাঁর অবস্থার খোঁজ নিলেন।
জাফর সাদিক বললেন,“মক্কা ও মদিনার লোকদের ভাতা বিলম্বিত হয়েছে, আপনার কাছে অনুরোধ, তাদের জন্য এটি প্রদানের নির্দেশ দিন।”খলিফা মানসুর বললেন, “আমি তা করব। এরপর তিনি একজন দাসীকে বললেন, “আমার জন্য সুগন্ধি নিয়ে আসো।”দাসী কাচের পাত্রে সুগন্ধি নিয়ে এল। মানসুর নিজের হাতে ইমাম জাফর সাদিকের হাতে তা দিলেন, এবং জাফর সাদিক চলে গেলেন।
আল-ফদল বলেন, আমি তাঁর অনুসরণ করলাম এবং জিজ্ঞাসা করলাম, “হে রসুলুল্লাহর পুত্র, আমি আপনাকে নিয়ে এসেছি। আমার কোনো সন্দেহ ছিল না যে তিনি আপনাকে হত্যা করবেন। কিন্তু আমি যা দেখেছি, তা অনন্য। আপনি প্রবেশের সময় যা বলেছিলেন, তা কী ছিল?”
জাফর সাদিক রহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন,“আমি প্রার্থনা করেছিলাম— হে আল্লাহ, আমাকে তোমার সেই চোখ দ্বারা রক্ষা করো যা কখনো ঘুমায় না। তোমার সেই অটল স্তম্ভ দ্বারা আশ্রয় দাও যা কখনো ভাঙে না। তোমার ক্ষমতার দ্বারা আমাকে রক্ষা করো; আমাকে ধ্বংস করো না। তুমি আমার একমাত্র আশা। হে আমার রব, তুমি আমাকে কত নেয়ামত দিচ্ছ, যার জন্য আমার কৃতজ্ঞতা কম এবং তুমি কত বিপদের সময় আমাকে বাঁচিয়েছ, যার জন্য আমার ধৈর্য কম।
তাই, হে সেই সত্তা, যে নেয়ামতের জন্য আমার কৃতজ্ঞতা কম হলেও আমাকে বঞ্চিত করেননি, এবং হে সেই সত্তা, যে বিপদের সময় আমার ধৈর্য কম হলেও আমাকে লাঞ্ছিত করেননি। হে সেই সত্তা, যিনি আমাকে আমার পাপের কারণে অপদস্থ করেননি; যাঁর নেয়ামতের সীমা নেই এবং ভালো কাজ কখনো শেষ হয় না। তুমি আমাকে আমার দ্বীনের ওপর দুনিয়ার সাহায্য দাও এবং আখিরাতের ওপর তাকওয়া দ্বারা সহায়তা করো। আমাকে যে অনুপস্থিতি থেকে রক্ষা করা দরকার, তা হতে রক্ষা করো এবং আমি যে বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করি, তা আমার নিজের হাতে ছেড়ে দিও না।
হে সেই সত্তা, যাকে পাপ ক্ষতি করতে পারে না এবং যাঁর ক্ষমা কমে না, আমাকে এমন ক্ষমা দাও। হে ওয়াহহাব, আমি দ্রুত স্বস্তি, সুন্দর ধৈর্য, সব বিপদ থেকে মুক্তির জন্য তোমার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রার্থনা করি।”১৫
কতিপয় বাণী:
১. হিশাম ইবনে ইবাদ বলেন, আমি জাফর ইবনে মুহাম্মাদকে বলতে শুনেছি, “ফকিহরা রসুলদের আমানতদার। যখন তোমরা ফকিহদেরকে শাসকদের দিকে ঝুঁকতে দেখবে, তখন তাদের সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করো।
২. তাকওয়া থেকে উত্তম কোনো পাথেয় নেই, নীরবতা থেকে সুন্দর কিছু নেই, অজ্ঞতা থেকে ক্ষতিকর কোনো শত্রু নেই, এবং মিথ্যা থেকে খারাপ কোনো রোগ নেই।
৩. ইয়াহিয়া ইবনে আল-ফুরাত বলেন, জাফর আস-সাদিক বলেছেন, “তিনটি জিনিস ছাড়া ভালো কাজ পূর্ণ হয় না: তা দ্রুত করা, তাকে ছোটো মনে করা এবং গোপন রাখা।”
৪. আনবাসা আল-খাসআমি বলেন, আমি জাফর ইবনে মুহাম্মাদকে বলতে শুনেছি, “তোমরা দ্বীনের বিষয়ে বিবাদ থেকে দূরে থাকো, কারণ তা অন্তরকে ব্যস্ত করে তোলে এবং মুনাফেকি সৃষ্টি করে।”
৫. যখন তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কিছু জানতে পারো যা তোমার খারাপ লাগে, তখন দুঃখ করো না। কারণ যদি সে যেমন বলছে তেমনই হয়, তবে এটি একটি শাস্তি যা দ্রুত দেওয়া হয়েছে। আর যদি সে যেমন বলছে তেমন না হয়, তবে এটি এমন একটি সওয়াব যা তুমি পাওনি। ১৬
৬. নামাজ প্রত্যেক মুত্তাকির জন্য নৈকট্য লাভের মাধ্যম, হজ দুর্বলদের জিহাদ, দেহের জাকাত হলো রোজা, আর আমল ছাড়া দোয়াকারী হলো ধনুক ছাড়া তীর নিক্ষেপকারীর মতো।
৭. সদকার মাধ্যমে জীবিকা প্রার্থনা করো, এবং জাকাতের মাধ্যমে তোমাদের সম্পদ সুরক্ষিত করো।
৮. যে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে, সে কখনো অভাবী হয় না। পরিকল্পনা জীবিকার অর্ধেক, মানুষের সাথে ভালোবাসা স্থাপন বুদ্ধিমত্তার অর্ধেক, আর কম সন্তান থাকা একটি স্বাচ্ছন্দ্য।
৯. যে তার বাবা-মাকে দুঃখ দেয়, সে তাদের অবাধ্যতা করে। যে বিপদে পড়ে নিজের উরুতে হাত দিয়ে আঘাত করে, তার নেকি নষ্ট হয়ে যায়। সৎকাজ কেবল সম্ভ্রান্ত ও ধর্মপরায়ণ ব্যক্তির কাছেই করা উচিত।
১০. আল্লাহ তায়ালা বিপদের পরিমাণ অনুযায়ী ধৈর্য অবতীর্ণ করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জীবিকা অবতীর্ণ করেন। যে তার জীবিকা পরিমিতভাবে ব্যবহার করে, আল্লাহ তাকে জীবিকা দেন, আর যে তার জীবিকা অপচয় করে, আল্লাহ তাকে বঞ্চিত করেন।” ১৭
১১. সুফিয়ান সাওরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জাফর ইবনে মুহাম্মদের কাছ থেকে শুনেছি, তিনি বলছিলেন, ইজ্জত ও নিরাপত্তা দুর্লভ হয়ে গেছে, এমনকি এর সন্ধানও কঠিন হয়ে পড়েছে। যদি তা কোথাও থাকে, তবে সম্ভবত তা নির্জনতায় আছে। যদি তা নির্জনতায় খোঁজা হয় এবং পাওয়া না যায়, তবে সম্ভবত তা একাকিত্বে আছে, যা নির্জনতার মতো নয়। যদি তা একাকিত্বে খোঁজা হয় এবং পাওয়া না যায়, তবে সম্ভবত তা নীরবতায় আছে, যা একাকিত্বের মতো নয়। যদি তা নীরবতায় খোঁজা হয় এবং পাওয়া না যায়, তবে সম্ভবত তা পূর্বসূরিদের সৎ কথার মধ্যে আছে। আর সে ব্যক্তিই সৌভাগ্যবান, যে নিজের মধ্যে এমন নির্জনতা খুঁজে পায় যা দিয়ে সে ব্যস্ত থাকতে পারে। ১৮
১২.“যে ব্যক্তি মানুষের অবহেলায় রাগান্বিত হয় না, সে আসলে নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে না।”
১৩. হারমাযী বর্ণনা করেন, একজন গ্রামীণ মানুষ নিয়মিত ইমাম জাফর ইবন মুহাম্মদের কাছে আসত। একদা কিছুদিন সে অনুপস্থিত হলো। ইমাম খোঁজ নিলেন। কেউ বলল, “সে তো একজন নবতী (নিম্নবংশীয়)। সে যেন তাকে হেয় করতে চাইছিল। তখন ইমাম জাফর সাদিক বললেন, “মানুষের আসল হলো তার বুদ্ধি। তার মর্যাদা হলো তার দ্বীন। তার সম্মান হলো তার তাকওয়া। আর সবাই আদম (আ.)-এঁর সন্তান, তাই সবাই সমান।”১৯
ইন্তেকাল:
আল-মাদাইনি, শাবাব আল-উসফুরি এবং আরও অনেকে বলেন: ইমাম জা’ফর আস-সাদিক রহমাতুল্লাহি আলাইহি ১৪৮ হিজরিতে মদিনায় ইন্তেকাল করেন। তার জন্ম ৮০ হিজরিতে হয়েছিল, বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। ২০
অর্থাৎ, তিনি ইন্তিকাল করেন ১৪৮ হিজরি শাওয়াল মাসে, মদিনায়। তাঁকে জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে দাফন করা হয়, যেখানে শায়িত ছিলেন তাঁর পিতা ইমাম মুহাম্মদ আল-বাকির, তাঁর দাদা ইমাম আলী জয়নুল-আবিদীন এবং তাঁর দাদার চাচা ইমাম হাসান ইবনে আলী রাদিআল্লাহু আনহুম।
উত্তরসূরী:
ইমাম জাফর আস-সাদিক রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন আহলে বাইতের অন্যতম মহিমান্বিত ইমাম। আল্লাহ তাঁকে বহু সন্তান দান করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিলেন ইসমাইল ইবনু জাফর, যিনি অল্প বয়সেই পিতার জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর অপর সন্তান মুহাম্মদ, আলী ও ফাতিমা (রহ.)। সন্তানদের মধ্যে জাফর ও ইসমাইল বিশেষভাবে খ্যাত। জাফরের বংশে মুহাম্মদ ও আহমদের জন্ম হয়েছিল, যদিও আহমদ অল্প বয়সেই মৃত্যুবরণ করেন এবং তাঁর কোনো উত্তরসূরী ছিল না। মুহাম্মদ ইবনু জাফরের বংশে আবার জাফর, ইসমাঈল, আহমদ ও হাসানের জন্ম হয়। এর মধ্যে হাসানের সন্তান জাফর ছিলেন, যিনি হিজরি ২৯৩ সনে মিসরে ইন্তেকাল করেন। তিনি তাঁর পুত্র মুহাম্মদকে রেখে যান, যার ঘরে পাঁচ পুত্র জন্ম নেয় এবং এভাবেই বংশ বিস্তার লাভ করে।
অন্যদিকে ইসমাইল ইবনু মুহাম্মদের সন্তানদের মধ্যে আহমদ, ইয়াহইয়া, মুহাম্মদ ও আলী ছিলেন। তবে আলী শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেন। আহমদের ঘরে বহু সন্তান হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে ইসমাইল ইবনু আহমদ অন্যতম, যিনি হিজরি ৩২৫ সনে মিশরে ইন্তেকাল করেন। এভাবে মুহাম্মদ ইবনু ইসমাইল ইবনু জাফরের বংশধরগণ এক বৃহৎ পরিবারে পরিণত হয়। তাঁদের কেউ বসবাস করতেন মিশরে, কেউ দমেশকে, আবার কেউ কুফায়।
এই বংশের বহু তথ্য সংগ্রহ করেছেন বিখ্যাত আলেম আবুল হুসাইন মুহাম্মদ ইবনু আলী ইবনু হুসাইন ইবনু আহমদ ইবনু ইসমাঈল ইবনু মুহাম্মদ ইবনু ইসমাঈল ইবনু জাফর আস-সাদিক রহ., যিনি ‘আখী মুহসিন’নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি দমেশকের বাব তুমা এলাকায় বসবাস করতেন এবং চারশ হিজরির পূর্বেই ইন্তেকাল করেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন যে ফাতিমি বংশের দাবিদার উবাইদুল্লাহ আল-মাহদি প্রকৃতপক্ষে আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত নন, বরং তিনি একজন দাবিদার ও মিথ্যাবাদী। তাঁর রচিত গ্রন্থে এ বিষয়টি প্রমাণসহ উপস্থাপিত হয়েছে।
অতএব, ইমাম জাফর আস-সাদিক রহমাতুল্লাহি আলাইহির বংশধারা ইতিহাসে বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ আকারে ছড়িয়ে আছে। তবে তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বমহান উত্তরসূরী হলেন তাঁর পুত্র ইমাম মূসা আল কাযিম রহমাতুল্লাহি আলাইহি, যিনি ইমামদের মধ্যে বিশেষ স্থান অধিকার করেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে গেছেন। ২১