ইমাম মালেক (রহ.) ছিলেন হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ফকিহ, মুহাদ্দিস এবং উম্মাহর জন্য প্রমাণযোগ্য শরিয়তের একজন বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব। তিনি মদিনা মুনাওয়ারার মাটিতে লালিত-পালিত এমন এক বিশিষ্ট আলেম, যিনি ইসলামি ফিকহের জগতে ‘ইমাম দারুল হিজরাহ’(হিজরতের নগর মদিনার ইমাম) উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। তিনি শুধু ফিকহের ইমামই নন, বরং এমন এক আলোকবর্তিকা, যিনি সহিহ হাদিস, সাহাবা ও তাবেয়িনদের আমল এবং মদিনার ধারাবাহিক ইসলামী ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে উম্মাহর সামনে সুসংবদ্ধরূপে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর রচিত আল-মুআত্তা ইসলামের প্রাথমিক যুগের অন্যতম নির্ভরযোগ্য কিতাব, যা হাদিস ও ফিকহের সমন্বয়ে অনন্য সংকলন হিসেবে ইতিহাসে খ্যাত। তাঁর ইলম, সতর্কতা, সংযম, তাকওয়া এবং আল্লাহভীতি তাঁকে এমন উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছে যে, তিনি যুগে যুগে মুসলমানদের জন্য অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় হয়ে আছেন।

প্রাক-পরিচয়:

তাঁর বংশধারা হলো ইমাম মালিক ইবনে আনাস ইবনে মালিক ইবনে আবু আমির ইবনে আমর ইবনে হারিস ইবনে গাইমান ইবনে খুছাইল ইবনে আমর ইবনে হারিস। ইয়েমেনি হিমিয়ারি বংশীয় আসবাহী, কুনিয়াত আবু আবদুল্লাহ। ছিলেন মাদিনার বাসিন্দা, শাইখুল ইসলাম, ইমামু দারিল হিজরাহ, হুজ্জাতুল উম্মাহ উপাধিতে ভূষিত। মাতা আলিয়া বিনতে শারিক আল-আযদিয়া। তাঁর চাচারা হলেন আবু সুহাইল নাফে এবং আওওয়াইস। ১

নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী হিজরি ৯৩ সালে জন্মগ্রহণ করেছেন, যে বছরে রসুলুল্লাহ ﷺ-এর খাদিম হজরত আনাস ইবনে মালিক (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) ইন্তিকাল করেন। মা’ন, আল-ওয়াকিদি এবং মুহাম্মাদ ইবনে আয-যাহহাক বলেছেন, মালেকের মাতা তাঁকে তিন বছর গর্ভে ধারণ করেছিলেন। আল-ওয়াকিদি থেকে বর্ণিত আছে তিনি তাকে দুই বছর গর্ভে ধারণ করেছিলেন। ২

জ্ঞানার্জন:

ইমাম মালিক রহমাতুল্লাহি আলাইহি কিশোর বয়স থেকেই (প্রায় ১৩ বছর বয়সে) জ্ঞান অনুসন্ধান শুরু করেন। মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি ফতোয়া দেওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠেন এবং শিক্ষাদান শুরু করেন। তিনি তখনও তরুণ ও লাজুক ছিলেন, কিন্তু তাঁর কাছে হাদিস শুনতে দূরদূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা আসতে শুরু করে। খলিফা আবু জাফর মানসুরের আমলের শেষভাগে এবং তার পরেও তাঁর কাছে মানুষের ভিড় জমতো নিয়মিত। হারুনুর রশীদের খিলাফতের সময় তিনি আরও ব্যাপকভাবে প্রসিদ্ধ হন। ৩

শিক্ষকবৃন্দ:

তিনি বহু তাবেয়ি ও বিশিষ্ট আলেম থেকে শিক্ষাগ্রহণ ও হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন— হজরত আমির ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর, নাঈম ইবনে আবদুল্লাহ আল-মুজাম্মির, জায়েদ ইবনে আসলাম, নাফি , হুমায়িদ আত-তাওয়ীল, সাঈদ আল-মাকবুরি, আবু হাজিম সালমা ইবনে দীনার, শারিক ইবনে আবদুল্লাহ, সালেহ ইবনে কাইসান, মুহাম্মদ ইবনে শিহাব আয-যুহরী, সফওয়ান ইবনে সুলায়ম, রাবিআ ইবনে আবদুর রহমান, আবু যিনাদ, ইবনে আল-মুনকাদির, আবদুল্লাহ ইবনে দীনার, আবু তাওয়ালা, আবদুর রব্বাহ, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ, উমর ইবনে আবু উমর , আল-আলা ইবনে আবদুর রহমান, হিশাম ইবনে উরওয়া, ইয়াজিদ ইবনে আল-হাদ, ইয়াজিদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে খুসাইফা, আবু যুবাইর আল-মাক্কী, ইবরাহিম ও মূসা ইবনে উকবা, আইয়ুব আস-সাখতিয়ানি, ইসমাঈল ইবনে আবু হাকীম, খুবায়ব ইবনে আবদুর রহমান, জাফর ইবনে মুহাম্মদ আস-সাদিক, হুমায়িদ ইবনে কাইস আল-মাক্কী, দাউদ ইবনে আল-হুসাইন, জিয়াদ ইবনে সাঈদ, জায়েদ ইবনে রাবাহ, সালিম আবু নাযর, সুহাইল ইবনে আবু সালেহ, সায়ফী (আবু আইয়ুবের মুক্তদাস), দামরাহ ইবনে সাঈদ, তালহা ইবনে আবদুল মালিক, আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর ইবনে হাজম, আবদুল্লাহ ইবনে ফজল হাশিমি, আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াজিদ (আল-আসওয়াদের মুক্তদাস), আবদুর রহমান ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবু সাসা, আবদুর রহমান ইবনে আল-কাসিম, উবায়দুল্লাহ ইবনে আবু আবদুল্লাহ আল-আঘর, আমর ইবনে মুসলিম ইবনে উকাইমাহ, আমর ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে উকাইমাহ, কাতন ইবনে ওয়াহ্ব, আবু আসওয়াদ , মুহাম্মদ ইবনে আমর ইবনে হালহালা, মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে হাব্বান, মাখরামা ইবনে বকীর এবং আরও অনেকে।৪

ছাত্রবৃন্দ:

ইমাম মালিক (রহ.) থেকে হাদিস ও ফিকহ শিখেছেন অসংখ্য মহামানব। যেমন— আয-যুহরী, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আনসারী, ইয়াজিদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আল-হাদ, আউযায়ী, সুফিয়ান আস-সাওরী, ওয়ারকা ইবনে আমর, শুবা ইবনে হাজ্জাজ, ইবনে জুরাইজ, ইবরাহিম ইবনে তাহমান, আল-লাইস ইবনে সাদ, ইবনে উয়াইনা, আবু ইসহাক আল-ফাযারী, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-কাত্তান, আবদুর রহমান ইবনে মাহদী, আল-হুসাইন ইবনে আল-ওয়ালিদ, রূহ ইবনে উবাদাহ, জায়েদ ইবনে আল-হাব্বাব, ইমাম শাফিঈ, ইবনে মুবারক, ইবনে ওয়াহ্ব, ইবনে আল-কাসিম, আল-কাসিম ইবনে ইয়াজিদ, মা‘ন ইবনে ঈসা, ইয়াহইয়া ইবনে আইয়ুব আল-মিসরী, আবু আলী আল-হানাফী, আবু নুয়াইম, আবু আসিম, আবু ওয়ালিদ আত-তুয়ালিসী, আহমদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ইউনুস, ইসহাক ইবনে ঈসা, বিশর ইবনে উমর, জুয়াইরিয়া ইবনে আসমা, খালিদ ইবনে মাখলাদ, সাঈদ ইবনে মনসুর, আবদুল্লাহ ইবনে রজাআ, আল-কাআনাবী, ইসমাঈল ইবনে আবু আওইস, ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া আন-নিসাপুরী, আবু মাসহার, আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ আত-তানিসী, আবদুল আজিজ আল-আউইসী, মক্কি ইবনে ইবরাহিম, ইয়াহইয়া ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে বকীর, ইয়াহইয়া ইবনে কুযা‘আ, কুতাইবা ইবনে সাঈদ, আবু মুসআব আয-যুহরী, ইসমাঈল ইবনে মূসা আল-ফাযারী, খলফ ইবনে হিশাম, আবদুল আ‘লা ইবনে হাম্মাদ, সুয়াইদ ইবনে সাঈদ, মুসআব ইবনে আবদুল্লাহ, হিশাম ইবনে আম্মার, উতবা ইবনে আবদুল্লাহ, আবু হুছাইফা আহমদ ইবনে ইসমাঈল এবং আরও অনেক।৫

দৈহিক গঠন, পোশাক-পরিচ্ছদ ও বৈশিষ্ট্য:

মুতাররিফ ইবন আবদুল্লাহ বলেন, “মালিক ইবন আনাস ছিলেন দীর্ঘকায়, মাথার চুল ও দাড়ির রং ছিল সাদা; তাঁর চেহারা ছিল অতিশয় ফর্সা, লালচে আভাযুক্ত। তিনি উৎকৃষ্ট আদনী কাপড় পরিধান করতেন। তিনি গোঁফ কামানোকে অপছন্দ করতেন এবং সমালোচনা করতেন; একে তিনি বিকৃত রূপ মনে করতেন।”৬

ঈসা ইবনে উমর আল-মাদানি বলেন, “আমি মালিকের চেহারার মতো সুন্দর ফর্সা ও লাল রঙ আর কখনো দেখিনি। তাঁর কাপড়ও অনন্য সাদা ছিল।” আবদুর রহমান ইবনে মাহদি বলেন, “ আমি মালিকের চেয়ে অধিক ভয় জাগানো, অধিক বুদ্ধিমান ও অধিক তাকওয়াবান কাউকে দেখিনি।”৭

মুহাম্মাদ ইবনে আয-যাহহাক আল-হিযামি বলেন, “মালেক পরিষ্কার এবং পাতলা কাপড় পরতেন, এবং বিভিন্ন ধরনের পোশাক পরিবর্তন করতেন।” আশহাব বলেন, “মালেক যখন পাগড়ি বাঁধতেন, তখন এর এক অংশ তার চিবুকের নিচে রাখতেন এবং অন্য অংশ তার কাঁধের পেছনে ঝুলিয়ে দিতেন।”৮

সমকালীনদের জবানে তাঁর মর্যাদা:

১. ইবনে মাহদি বলেন, তাঁদের যুগের ইমাম ছিলেন চারজন— সুফিয়ান আস-সাওরি, মালিক, আওযাঈ, হাম্মাদ ইবনে যায়েদ। তিনি আরো বলেন, আমি মালিকের মতো বুদ্ধিমান কাউকে দেখিনি।

২. ওয়াকিদী বলেন, মালিক তাঁর ঘরে বসতেন, চারপাশে গদি ও বালিশ রাখা থাকত, যাতে অতিথিরা বসতে পারেন। তাঁর মজলিস ছিল গাম্ভীর্য ও ধৈর্যের প্রতীক, সেখানে কোনো অযথা তর্ক-বিতর্ক বা কোলাহল ছিল না। বিদেশি লোকেরা হাদিস জানতে এলে তিনি অনুমতি দিলে পড়ে শোনাতো। তাঁর একজন লেখক ছিলেন হাবীব, যিনি তাঁর বইগুলো নকল করতেন এবং লোকদের সামনে পড়তেন। ভুল হলে মালিক সংশোধন করতেন, তবে তা খুবই কম ঘটত।

৩. বাকিআ বলেন, হে মালিক, তোমার মতো অতীতের সুন্নাহ সম্পর্কে অবগত আর কেউ পৃথিবীতে নেই। ৯

ফাতোয়া প্রদানে সতর্কতা:

আবু মুসআব বলেন, আমি মালিক ইবন আনাসকে বলতে শুনেছি, “আমি ফতোয়া দিতে শুরু করিনি যতক্ষণ না আমার যোগ্যতার ব্যাপারে সত্তরজন আলেম সাক্ষ্য দেন যে আমি এ দায়িত্বের উপযুক্ত।”

আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলতেন,“আমি কখনো ফতোয়া দিতে পছন্দ করিনি যতক্ষণ না আমার চেয়ে জ্ঞানী লোকদের জিজ্ঞাসা করেছি যে আমি কি এ দায়িত্বের উপযুক্ত? আমি রাবীআহ ও ইয়াহইয়া ইব্নে সাঈদকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। তারা আমাকে অনুমতি দিলে আমি ফতোয়া দেওয়া শুরু করি।” কেউ একজন তাঁকে বলল, “হে আবু আবদুল্লাহ, যদি তাঁরা আপনাকে নিষেধ করতেন?” তিনি বললেন, “তাহলে আমি থেমে যেতাম। কারণ কোনো মানুষ নিজের বিষয়ে এ ধারণা পোষণ করবে না যে, সে কোনো কিছুর যোগ্য, যতক্ষণ না তার চেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করে।”১০

ইমাম মালিক (রহ.) বলেন, “এক আলেমের রক্ষা হচ্ছে ‘আমি জানি না’বলার মধ্যে। যখন তিনি তা অবহেলা করেন, তখন তার ক্ষতি হয়।”এখানে ‘এক আলেমের রক্ষা’বলতে বোঝানো হয়েছে যে, একজন আলেম যদি বলেন ‘আমি জানি না’, এটি তাকে রক্ষা করে। এতে তিনি অজানা বিষয়ে অনুমান বা সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

হাইসম ইবনে জামীল বর্ণনা করেন, তিনি শুনেছেন, ইমাম মালিককে ৪৮টি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল; এর মধ্যে ৩২টির উত্তর তিনি দিয়েছিলেন ‘আমি জানি না’বলেই।

খালেদ ইবনে খোদাশ বলেন, তিনি ইমাম মালিকের কাছে ৪০টি প্রশ্ন নিয়ে গিয়েছিলেন; এর মধ্যে শুধু ৫টি বিষয়ে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন।

ইমাম মালিক নিজে বলেন যে, তিনি শুনেছেন আবদুল্লাহ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে হারমিজ বলেন, “একজন আলেমের উচিত তার সহপাঠীদের ‘আমি জানি না’শেখানো, যাতে এটি তাদের জন্য একটি মূলনীতি হয়ে যায়, যা তারা সবসময় মনে রাখতে পারে।”১১

ইবনে মাহদী বলেন: এক ব্যক্তি ইমাম মালিকের কাছে একটি মাসআলা জানতে চাইল। ইমাম মালিক বললেন: “আমি এটা জানি না।”লোকটি বলল, “আমি তো এতদূর পথ অতিক্রম করে শুধু এ প্রশ্নের জন্যই আপনার কাছে এসেছি।”তিনি বললেন, “তুমি যখন তোমার জায়গায় ফিরে যাবে তখন লোকদের জানিয়ে দিও যে মালিক বলেছে,‘আমি এটা জানি না।”১২

হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে আদব ও সতর্কতা:

ইবনে আবি উওয়াইস বলেন, ইমাম মালিক রহমাতুল্লাহি আলাইহি যখন কোনো হাদিস বর্ণনা করতে চাইতেন, তখন তিনি প্রথমে অজু করতেন, বিছানার উপরে বসতেন, দাড়ি আঁচড়াতেন, স্থিরভাবে গম্ভীর ভঙ্গিতে বসতেন, তারপর হাদিস বর্ণনা করতেন। কেউ তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন, “আমি চাই রসুলুল্লাহ ﷺ -এঁর হাদিসকে মহান মর্যাদা দিই। তাই আমি পবিত্র অবস্থায় স্থির হয়ে বসা ব্যতীত কখনো হাদিস বর্ণনা করি না। আর আমি পছন্দ করি না পথ চলতে চলতে বা দাঁড়িয়ে বা তাড়াহুড়োর মধ্যে হাদিস বর্ণনা করতে। কারণ আমি চাই লোকেরা রসুলুল্লাহ ﷺ -এঁর হাদিস পুরোপুরি বুঝুক।”

ইবরাহীম ইবন মুনযির বলেন: আমি মা‘ন ইবন ঈসাকে বলতে শুনেছি,“মালিক ইবন আনাস যখনই রসুলুল্লাহ ﷺ -এঁর কোনো হাদিস বর্ণনা করতে চাইতেন, তখন তিনি গোসল করতেন, সুগন্ধি মাখতেন এবং আতর ব্যবহার করতেন। কেউ তাঁর সামনে উচ্চস্বরে কথা বললে তিনি বলতেন, ‘তোমার কণ্ঠ নিচু করো। আল্লাহ বলেন,  يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ  (সুরা হুজরাত: ২)। অতএব, যে ব্যক্তি রসুলুল্লাহ ﷺ -এঁর হাদিসের সামনে উচ্চকণ্ঠে কথা বলে, সে যেন রসুলুল্লাহ ﷺ -এঁর সামনে আওয়াজ উঁচু করেছে।”১৩

তাঁর অনন্য সংকলন সহিহ হাদিস গ্রন্থ মুয়াত্তা:

ইবনে সাদ— মুহাম্মাদ ইবনে উমর আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, আমি ইমাম মালেককে বলতে শুনেছি, যখন খলিফা আল-মানসুর হজ করতে এলেন, তখন তিনি আমাকে ডাকলেন। আমি তার কাছে প্রবেশ করলাম, তার সাথে কথা বললাম এবং তিনি আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করলেন, যার আমি উত্তর দিলাম। তখন তিনি বললেন, “আমি আপনার এই বইগুলো অর্থাৎ ‘মুওয়াত্তা’ অনুলিপি করার আদেশ দিতে ইচ্ছে করেছি, তারপর আমি মুসলিমদের প্রতিটি শহরে এর একটি করে অনুলিপি পাঠাব এবং তাদের আদেশ দেব যেন তারা এর মধ্যে যা আছে তা মেনে চলে এবং অন্যান্য নতুন জ্ঞান ছেড়ে দেয়। কারণ আমি দেখেছি যে, জ্ঞানের মূল হলো মদিনার লোকদের বর্ণনা এবং তাদের জ্ঞান।”

আমি বললাম, “হে আমিরুল মুমিনিন, তা করবেন না। কারণ মানুষের কাছে বিভিন্ন মত পৌঁছেছে, তারা হাদিস শুনেছে, বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছে এবং প্রতিটি সম্প্রদায় তাদের কাছে যা পৌঁছেছে তা গ্রহণ করেছে এবং সে অনুযায়ী আমল করেছে, এবং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সাহাবিদের এবং অন্যদের মতভেদের উপর ভিত্তি করে ধর্ম পালন করেছে। তাদের বিশ্বাস থেকে তাদের ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই মানুষকে তাদের অবস্থায় থাকতে দিন এবং প্রতিটি অঞ্চলের লোকেরা যা নিজেদের জন্য বেছে নিয়েছে তা নিয়ে থাকুক।” তখন তিনি বললেন, “আমার জীবনের কসম, যদি আপনি রাজি থাকতেন, তাহলে আমি তা-ই করতাম।”১৪

ইমাম মালিক ও খলিফাদের সম্পর্ক:

খলিফা মাহদি মদিনায় এলে তিনি মালিককে দুই হাজার বা তিন হাজার দিনার পাঠালেন। এবং তাঁর মন্ত্রী রবী প্রস্তাব করলেন,“আমিরুল মুমিনীন চান আপনি বাগদাদে চলে যান।”ইমাম মালিক রহমাতুল্লাহি আলাইহি উত্তর দিলেন,“রসুল ﷺ বলেছেন, ‘মদিনা তাদের জন্য উত্তম, যদি তারা বুঝতে পারত।’ আর অর্থ এখনও আমার কাছে অক্ষত আছে।”১৫

সুলাইমান ইবনে আহমাদ (রহমাতুল্লাহি আলাইহি), ইমলার মাধ্যমে আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি আল-মিকদাম ইবনে দাউদ থেকে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল হাকাম থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “আমি ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)কে বলতে শুনেছি, খলিফা হারুনুর-রশিদ (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) আমার সঙ্গে তিনটি বিষয়ে পরামর্শ করেছিলেন।

১. মুওয়াত্তা কিতাবটিকে কাবা শরীফে ঝুলিয়ে রাখা এবং মানুষকে এটি মেনে চলতে বাধ্য করা। ২. নবি ﷺ-এঁর মিম্বার ভেঙে তা জহরত, সোনা ও রূপা দিয়ে তৈরি করা। ৩. নাফি ইবনে আবি নুআইমকে ইমাম করে রসুলুল্লাহ ﷺ-এঁর মসজিদে সালাত পড়ানো।

ইমাম মালিক (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) জবাব দিলেন, “হে আমিরুল মুমিনীন, মুওয়াত্তা কাবায় ঝুলিয়ে রাখার বিষয়ে রসুলুল্লাহ ﷺ-এঁর সাহাবারা শাখা-প্রশাখার বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন এবং বিভিন্ন অঞ্চলে তা ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রত্যেকের কাছে তার নিজের মতানুসারে এটি ঠিক। অতএব, এটি নিশ্চিত করা কঠিন। আর নবী ﷺ-এঁর মিম্বর ভেঙে তা জহরত, সোনা ও রূপা দিয়ে পুনঃনির্মাণ করার ব্যাপারে আমি মনে করি না যে, এটি মানুষের জন্য উপযুক্ত, কারণ এটি নবী ﷺ-এঁর স্মৃতিচিহ্ন থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করবে। আর নাফি ইবনে আবি নুআইমকে মানুষের জন্য রসুলুল্লাহ ﷺ-এঁর মসজিদে ইমামতি করার দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে বলতে গেলে তিনি কিরাতের একজন ইমাম। তবে হতে পারে মেহরাবে তার কোনো ভুল হয়, এবং তা তার উপর সংরক্ষিত হবে। খলিফা হারুনুর-রশিদ এ কথা শুনে বললেন, “আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করুন, হে আবু আবদুল্লাহ!”১৬

শাসকের রোষানলে:

ইবনে সাদ বলেন, আল-ওয়াকিদি আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, যখন ইমাম মালেককে ডাকা হলো, তার সাথে পরামর্শ করা হলো, তার কথা শোনা হলো, এবং তার কথা গ্রহণ করা হলো, তখন তিনি হিংসার শিকার হলেন। লোকেরা তার বিরুদ্ধে সব ধরনের ষড়যন্ত্র করতে লাগল। যখন জাফর ইবন সুলাইমান মদিনার গভর্নর হলেন, তখন তারা তার কাছে মালেকের বিরুদ্ধে চোগলখুরি করে বলল, “তিনি আপনার বাইয়াতের (আনুগত্যের শপথের) কোনো গুরুত্ব দেন না এবং তিনি সাবিত ইবনে আল-আহনাফ থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেন যে, মজবুর অবস্থায় তালাক জায়েজ নয়।”

আল-ওয়াকিদি বলেন, জাফর এতে রেগে গেলেন যে, ইমাম মালেককে ডেকে পাঠালেন এবং তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের প্রমাণ চাইলেন। এরপর তিনি তাকে বিবস্ত্র করে চাবুক মারার আদেশ দিলেন। তার হাত এমনভাবে টানা হলো যে, তা তার কাঁধ থেকে ছুটে গিয়েছিল। তার উপর এক বিশাল বিপদ নেমে এসেছিল। কিন্তু আল্লাহর কসম, এরপর থেকে ইমাম মালেকের মর্যাদা এবং সম্মান কেবল বৃদ্ধিই পেয়েছে। আমি বলি, এটি প্রশংসিত পরীক্ষার ফল, যা বান্দাকে মুমিনদের কাছে উচ্চ মর্যাদা দান করে। তবে এটি আমাদের হাতের কামাই এবং আল্লাহ অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন। আর আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে তিনি দুঃখ-কষ্ট দেন।

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, মুমিনের প্রতিটি ফায়সালা তার জন্য উত্তম। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “এবং আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব যতক্ষণ না তোমাদের মধ্য থেকে মুজাহিদ (সংগ্রামকারী) এবং ধৈর্যশীলদেরকে জেনে নেই।” উহুদের যুদ্ধের বিষয়ে তিনি নাযিল করেছেন, “যখন তোমাদের উপর একটি বিপদ এসেছিল, তখন তোমরা এর দ্বিগুণ লাভ করেছিলে, তোমরা বলেছিলে, ‘এটা কোথা থেকে এলো?’ বল, ‘এটা তোমাদের নিজেদের থেকে এসেছে।”

তিনি আরো বলেছেন, “তোমাদের উপর যে কোনো বিপদ আসে, তা তোমাদের নিজেদের হাতের কামাই এবং তিনি অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।” তাই মুমিন যখন পরীক্ষায় পড়ে তখন সে ধৈর্যধারণ করে, উপদেশ গ্রহণ করে এবং ক্ষমা চায়, এবং যারা তার উপর প্রতিশোধ নিয়েছে তাদের নিন্দা করতে ব্যস্ত থাকে না। কারণ আল্লাহ একজন ন্যায়বিচারক শাসক। এরপর সে তার দ্বীনের নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করে এবং জানে যে দুনিয়ার শাস্তি তার জন্য সহজ এবং উত্তম।১৭

ফিতনা ও মতভেদ বিষয়ে তাঁর অবস্থান:

আবু মুসহির বলেন,“আমি ইমাম মালিককে বললাম, এক ব্যক্তি আমার সাথে কদর (তাকদির) বিষয়ে কথা বলেছিল। বিষয়টি শাসকের কাছে পৌঁছে যায়। শাসক আমাকে ডেকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। আমি কি তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেব? মালিক বললেন, ‘হ্যাঁ’।”

মুআন ইবনে ঈসা বলেন, “একদিন ইমাম মালিক মসজিদ থেকে বের হলেন, আমি তাঁর হাত ধরে ছিলাম। তখন আবু আল-জুয়েরিয়্যা নামে এক ব্যক্তি (যাকে ইরজায় তথা এক প্রকার ভ্রান্ত মতবাদ এর অভিযোগে অভিযুক্ত করা হতো) এসে বলল,‘হে আবু আব্দুল্লাহ, আমাকে কিছু বলার সুযোগ দিন। আমি আপনার সাথে বিতর্ক করতে চাই এবং আমার মতামত আপনাকে জানাতে চাই।’

ইমাম মালিক বললেন,‘যদি আমি তোমাকে পরাজিত করি?’ সে বলল, ‘তাহলে আমি আপনার অনুসারী হব।’ইমাম মালিক বললেন,‘আর যদি তুমি আমাকে পরাজিত করো?’ সে বলল, ‘তাহলে আপনি আমার অনুসারী হবেন।’ইমাম মালিক বললেন,‘কিন্তু যদি তৃতীয় কেউ আসে এবং আমাদের দুজনকেই পরাজিত করে?’ সে বলল, ‘তাহলে আমরা তাঁর অনুসারী হব।’এ কথা শুনে ইমাম মালিক বললেন,‘হে আল্লাহর বান্দা, আল্লাহ তো মুহাম্মদ ﷺ-কে একটিমাত্র দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন। অথচ আমি দেখছি তুমি দ্বীনের মাঝে একমত থেকে আরেক মত পরিবর্তন করছ!”

উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.) বলেছেন,“যে ব্যক্তি তার দ্বীনকে বিতর্ক ও তর্কের লক্ষ্য বানায়, সে আসলে অনেক ঘুরাঘুরি (মত পরিবর্তন) করে।”

ইমাম মালিক (রহ.) বলতেন,“কুরআনে এমন কোনো আয়াত নেই যা আহলে হাওয়ার (ভ্রান্ত মতাবলম্বীদের) উপর এই আয়াতের চেয়ে কঠিন— يَوْمَ تَبْيَضُّ وُجُوهٌ وَتَسْوَدُّ وُجُوهٌ‘সেদিন কিছু মুখ উজ্জ্বল হবে আর কিছু মুখ কালো হয়ে যাবে।’(আলে ইমরান: ১০৬)। আল্লাহ বলেন, فَأَمَّا الَّذِينَ اسْوَدَّتْ وُجُوهُهُمْ أَكَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ‘যাদের মুখ কালো হয়ে যাবে, (তাদের বলা হবে) তোমরা কি ঈমান আনার পরও কুফরি করলে?”

তিনি আরও বলতেন,“কুরআনের এ আয়াত কদরিয়াদের জন্য সবচেয়ে স্পষ্ট ও কঠিন— وَلَوْ شِئْنَا لَآتَيْنَا كُلَّ نَفْسٍ هُدَاهَا وَلَكِنْ حَقَّ الْقَوْلُ مِنِّي‘আমি চাইলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার হিদায়াতের রাস্তা দিতাম। কিন্তু আমার পক্ষ থেকে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা অবশ্যই কার্যকর হবে।’ (আস-সাজদাহ ১৩) অতএব, আল্লাহ যা বলেছেন, তা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।”

তিনি বলতেন,“দ্বীনের ব্যাপারে তর্ক-বিতর্কের কোনো কল্যাণ নেই।”১৮

আহলে সুন্নাহ প্রসঙ্গে ইমাম মালিকের দৃষ্টিভঙ্গি:

এক ব্যক্তি ইমাম মালিক (রহ.)-এঁর কাছে এসে বলল,“হে আবু আব্দুল্লাহ, আমি আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই। আমি চাই আপনি আল্লাহর কাছে আমার জন্য প্রমাণ হয়ে থাকুন।”

মালিক (রহ.) বললেন,“মাশাআল্লাহ, লা হাওলা ওয়া লা কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। জিজ্ঞেস করুন।”

সে বলল, “আহলে সুন্নাহ কারা?”

ইমাম মালিক (রহ.) উত্তর দিলেন,“আহলে সুন্নাহ তাঁরা, যাঁদের কোনো বিশেষ উপাধি নেই। তারা না জাহেমি, না কদরি, আর না রাফেজি।”১৯

সুন্নাহ রক্ষা ও বদ আকিদাপন্থিদের প্রতি কঠোরতা:

মুতরিফ ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, আমি শুনেছি ইমাম মালিক (রহ.) বলেছেন, “রসুলুল্লাহ ﷺ-এঁর সুন্নাহ এবং তাঁর পরবর্তী শাসকগণ যেসব সুন্নাহ প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। এই সুন্নাহ গ্রহণ করা মানে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের পূর্ণতা এবং ধর্মে দৃঢ়তা। কারো অধিকার নেই এগুলো পরিবর্তন বা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার। যে ব্যক্তি এই সুন্নাহ অনুসরণ করে, সে পথপ্রদর্শক, যে ব্যক্তি এটি সমর্থন করে, সে বিজয়ী। যে ব্যক্তি এটিকে ত্যাগ করে এবং মুমিনদের পথের বিপরীতে চলে, আল্লাহ তাকে নেতৃত্ব দেবে না এবং সে জাহান্নামের দিকে যাবে।”

ইয়াহইয়া ইবনে খালাফ আত-তারসুসী বলেন, “আমি ইমাম মালিকের কাছে ছিলাম; তখন একজন লোক তাঁর কাছে প্রবেশ করে জিজ্ঞেস করল, “হে আবু আবদুল্লাহ, তুমি কী বলো সেই ব্যক্তিদের সম্পর্কে যারা বলে: ‘কুরআন সৃষ্টি’?” ইমাম মালিক বললেন, “এই ব্যক্তি কাফের, হত্যা করো তাকে।” লোকটি বলল, “হে আবু আবদুল্লাহ, আমি কেবল শুনেছি লোকেরা এ কথা বলছে।” মালিক উত্তর দিলেন, “তুমি কেবল আমার কাছ থেকে এটি শুনেছ, এই বক্তব্যের গুরুত্ত্ব অপরিসীম।”

আবু সাওর শাফিই বলেন, যখন কোনো নকল ধর্মের লোক ইমাম মালিকের কাছে আসত, তিনি বলতেন, “আমি আমার ধর্মে দৃঢ়, আর তুমি সন্দেহজনক। তোমার মতো অন্য সন্দেহজনক লোকের কাছে যাও, বিতর্ক কর।”

কাজি ইয়াদ বলেন, আবু তালিব আল-মাক্কি বলেছেন, “ইমাম মালিক  কল্পিত মতবাদ থেকে সবচেয়ে দূরে ছিলেন এবং ইরাকি আলেমদের কঠোর সমালোচক।”

সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ বলেন, একজন ব্যক্তি মালিককে জিজ্ঞেস করেছিল, “আর-রাহমানু আলা আরশিস্তাওয়া (সুরা তাহা: ৫) আয়াতে আল্লাহ কীভাবে ইস্তাওয়া বা আরশে সমাসীন হয়েছেন?” ইমাম মালিক (রহ.) প্রথমে চুপ থাকলেন। তারপর বললেন, “ইস্তাওয়া আল্লাহর পরিচিত। ‘কীভাবে’ বোঝা আমাদের জন্য উপলব্ধ নয়। এই বিষয়ে প্রশ্ন করা বিদয়াত, কিন্তু এতে বিশ্বাস করা বাধ্যতামূলক। আমি মনে করি তুমি পথভ্রষ্ট।” লোকটি বলল, “হে আবু আবদুল্লাহ, আল্লাহর শপথ, আমি এই প্রশ্ন বসরা, কুফা এবং ইরাকের আলেমদের কাছে করেছি, কিন্তু কেউ আমাকে সঠিকভাবে নির্দেশ করতে পারল না।”

সাঈদ ইবনে আবদুল জাব্বার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইমাম মালিককে বলতে শুনেছি, “আমার মতে কদরিয়াদের (যারা তাকদির অস্বীকার করে) তওবা করতে বলা হবে; যদি তারা তওবা করে, তাহলে ঠিক আছে; আর যদি না করে, তাহলে তাদের হত্যা করা হবে।”

উসমান ইবনে সালিহ ও আহমদ ইবনে সাঈদ আদ-দারামী বলেন, আমাদেরকে উসমান বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি মালিকের কাছে এসে একটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করল। মালিক বললেন, “রসুলুল্লাহ ﷺ এ ব্যাপারে এমন বলেছেন।” তখন লোকটি বলল, “আপনি কী বলেন?” ইমাম মালিক তখন এই আয়াত পাঠ করলেন— فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَن تُصِيبَهُمْ فتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ “অতএব যারা তাঁর (রসুল ﷺ-এঁর) আদেশের বিরুদ্ধে চলে, তারা যেন সাবধান থাকে, যাতে তাদের ওপর কোনো বিপদ না আসে অথবা তাদের কঠিন শাস্তি গ্রাস না করে।”(সুরা আন-নূর: ৬৩)

আবু হাফস বলেন, আমি মালিক ইবনে আনাসকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা বলেন— وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ نَاضِرَةٌ إِلَى رَبِّهَا نَاظِرَةٌ — সেদিন অনেক মুখমণ্ডল উজ্জ্বল থাকবে, তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে। (সুরা আল-কিয়ামাহ: ২২-২৩)। কিছু লোক বলে, এর অর্থ হলো—“তারা আল্লাহর প্রতিদানের দিকে তাকাবে।”মালিক বললেন, “তারা মিথ্যা বলছে। তবে তারা আল্লাহর এ বাণীকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে—  كَلَّا إِنَّهُمْ عَن رَّبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَّمَحْجُوبُونَ —“না, সেদিন তারা তাদের রব থেকে অবশ্যই আড়াল হবে।” (সুরা আল-মুতাফ্‌ফিফীন: ১৫)। অর্থাৎ— আল্লাহকে দেখা সম্ভব,  কেননা কাফেররা আড়াল হবে, আর মুমিনরা আল্লাহকে দেখবে।

ইমাম মালিক আরও বলতেন, “আমি মনে করি না যে, যারা রসুলুল্লাহ ﷺ-এঁর সাহাবাদের গালি দেয়, তাদের জন্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদে কোনো অংশ রয়েছে।”

আবদুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে রুমাহ বলেন, আমি মালিকের কাছে প্রবেশ করলাম,“হে আবু আব্দুল্লাহ, নামাজে কোনটি ফরজ? আর কোনটি সুন্নাহ বা নফল?” তখন ইমাম মালিক বললেন, “এগুলো হলো জিন্দিকদের কথা। তাকে বের করে দাও।”২০

কারামাত:

খালাফ বলেন, আমি মালিক ইবন আনাসের কাছে প্রবেশ করলাম। তিনি আমাকে বললেন, “আমার জায়নামাজ বা মাদুরের নিচে তাকাও।” আমি তাকালাম, সেখানে একটি কিতাব পেলাম। তিনি বললেন, “এটা পড়।”এতে তাঁর এক সাথির দেখা একটি স্বপ্ন লেখা ছিল। স্বপ্নে তিনি দেখেছিলেন, রসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর মসজিদে বসে আছেন এবং লোকেরা তাঁর চারপাশে জড়ো হয়েছে। নবী ﷺ তাদের বললেন, “আমি তোমাদের জন্য আমার মিম্বরের নিচে কিছু লুকিয়ে রেখেছি। তা হলো সুগন্ধি বা জ্ঞান। আর আমি মালিককে নির্দেশ দিয়েছি যেন সে তা মানুষদের মধ্যে বিতরণ করে।” এরপর লোকেরা বের হয়ে যাচ্ছিল এবং তারা বলছিল, “তাহলে মালিকই তা কার্যকর করবেন, যেটা রসুলুল্লাহ ﷺ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছেন।”এটা পড়ে মালিক কান্নায় ভেঙে পড়লেন।২১

মুহাম্মদ ইবনে রুমহ বলেন,“আমি নবী ﷺ-কে স্বপ্নে দেখেছি। তখন প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আল্লাহর রসুল, মালিক ও লায়সের মাঝে মতভেদ হয়েছে, আমি কাকে অনুসরণ করব?’ নবী ﷺ বললেন, ‘মালিক, মালিক’।”

দারাওয়ার্দী বলেন,“আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি মসজিদে নববীতে প্রবেশ করেছি। রসুল ﷺ খুতবা দিচ্ছিলেন। তখন মালিক ইবনে আনাস প্রবেশ করলেন। নবী ﷺ তাঁকে ডেকে বললেন, ‘এদিকে আসো।’ তারপর নিজের আঙুল থেকে আংটি খুলে মালিকের হাতে পরিয়ে দিলেন।”মুসআব ইবনে আবদুল্লাহ বলেন,“আমি ইমাম মালিকের সাথে মসজিদে বসেছিলাম। এক ব্যক্তি এসে তাঁকে আলিঙ্গন করে বলল, ‘আমি স্বপ্নে রসুল ﷺ-কে এ জায়গায় বসা অবস্থায় দেখেছি। তিনি বললেন, “মালিককে নিয়ে আসো।” তখন আপনাকে আনা হলো, আপনার শরীর কাঁপছিল। নবী ﷺ বললেন: “ভয় পেয়ো না, হে আবু আব্দুল্লাহ।” তিনি আপনাকে কুনিয়াত দিলেন এবং বললেন: “আপনার কোলে হাত রাখুন।” আপনি রাখলেন, আর নবী ﷺ আপনার কোল মেশকের সুগন্ধিতে ভরিয়ে দিলেন এবং বললেন, “এটাকে আমার উম্মতের মাঝে ছড়িয়ে দিন।”তখন মালিক কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, ‘রূহানি স্বপ্ন আনন্দ দেয়, বিভ্রান্ত করে না। যদি স্বপ্নটি সত্য হয় তবে সেটিই হচ্ছে জ্ঞান, যা আল্লাহ আমার মধ্যে আমানত হিসেবে দিয়েছেন।”২২

রচনাবলি:

ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.)-এঁর সংকলিত মুয়াত্তা ছাড়াও কিছু রিসালা ও গ্রন্থ ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। এর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে আল-কদর (তকদির) বিষয়ক একটি রিসালা, যা তিনি তাঁর ছাত্র ইবনে ওয়াহাবকে লিখেছিলেন। এর সনদ সহিহ হওয়ায় এটি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত। আরেকটি প্রসিদ্ধ রচনা হলো আল-নুজুম ওয়া মানাজিল আল-কামার (নক্ষত্র ও চাঁদের অবস্থান), যা সহনুন ইবনে নাফি আস-সাইগ থেকে বর্ণিত এবং খ্যাতিমান হিসেবে পরিচিত। একইভাবে তাঁর আল-আকদিয়াহ (বিচার ও রায়) সম্পর্কিত একটি রিসালা রয়েছে, যা এক খণ্ডে সংরক্ষিত হয়েছে।

এটি মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ ইবন মাতরূহ, আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল জলিল প্রমুখের সনদে বর্ণিত। অন্যদিকে হারুন আর-রশিদ-এর উদ্দেশ্যে ইমাম মালিক (রহ.)-এঁর নামে একটি আদব সম্পর্কিত রিসালা প্রচলিত আছে। তবে এর সনদ দুর্বল (মুনকাতি) হওয়ায় ইসমাইল আল-কাদ্বি ও অন্যান্য আলেম এটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। বরং আল-কাদ্বি আল-আবহারি মন্তব্য করেছেন, যদি ইমাম মালিক (রহ.) জানতেন কে এটি তাঁর নামে প্রচার করছে, তবে তিনি তাকে কঠোর শাস্তি দিতেন। কারণ এতে এমন সব হাদিস রয়েছে যা অপরিচিত ও ভিত্তিহীন। তাই এই রিসালাটি জাল বলে মত দিয়েছেন অনেক আলেম।

এ ছাড়াও ইমাম মালিক (রহ.)-এঁর তাফসিরের কিছু অংশ পাওয়া যায়, যা খালিদ ইবন আব্দুর রহমান আল-মাখযুমি থেকে বর্ণিত এবং একটি ধারাবাহিক সনদের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। তাঁর আরেকটি গ্রন্থ হলো কিতাব আস-সির (গোপন বিষয়), যা তাঁর বিখ্যাত ছাত্র ইবন আল-কাসিম থেকে বর্ণিত। এটি এক খণ্ডে সংরক্ষিত এবং বিভিন্ন সনদে প্রচলিত। এছাড়া তিনি আল-লাইস ইবন সাঈদ-এর উদ্দেশ্যে আহল আল-মাদিনাহর ইজমা সম্পর্কিত একটি প্রসিদ্ধ রিসালা লিখেছিলেন। আর তাঁর প্রধান ছাত্ররা তাঁর কাছ থেকে অসংখ্য মাসয়ালা, ফতোয়া ও উপকারী আলোচনা সংগ্রহ করেছেন। এসব সংগ্রহ থেকে পরবর্তীতে যে গ্রন্থসমূহ সংকলিত হয়েছে, তার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো আল-মুদাওয়ানা ও আল-ওয়াদিহা।২৩

সমকালীন আলেমদের প্রশংসা:

মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক বলেছেন, আমি ইমাম বুখারির কাছে জিজ্ঞাসা করলাম—কোন সনদ সবচেয়ে সহিহ? তিনি উত্তর দিলেন, “মালিক→ নাফি→ ইবনে উমর।”

আলী ইবনে মাদিনী ইবনে উয়াইনাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, “মালিক ছিলেন বর্ণনাকারীদের সমালোচনায় অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং তাদের বিষয়ে সবচেয়ে জ্ঞানী।”

সুফিয়ানকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, সুমাই ভালো হাফিজ ছিলেন নাকি সালিম আবু নাযর? তিনি বললেন, “মালিক তো উভয় থেকেই বর্ণনা করেছেন।”

ইবনে মাঈন বলেছেন, “যাদের থেকে মালিক বর্ণনা করেছেন তারা সবাই বিশ্বস্ত, শুধু আবদুল করিম ছাড়া।”

ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ বলতেন, “নাফির ছাত্রদের মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হচ্ছেন— আইয়ুব, আবদুল্লাহ এবং মালিক।”তিনি আরো বলেছেন, “সকলের মধ্যে মালিকের হাদিস সবচেয়ে সহিহ। সুফিয়ানদ্বয় ও মালিকের মধ্যে মালিক আমার কাছে শ্রেষ্ঠ।”

ইবনে লুহাইআ বলেন, যখন আমরা জিজ্ঞাসা করলাম মাদিনায় কার কাছ থেকে ফতোয়া নেওয়া হয়, তখন তিনি বললেন, “যু আসবাহ গোত্রের এক যুবক আছে, তার নাম মালিক; তার মতো কেউ নেই।”

ইবনে মাহদী বলতেন, “মালিক, উবায়দুল্লাহ ইবনে উমর, মুসা ইবনে উকবা, ইসমাঈল ইবনে উমাইয়ার চেয়েও বেশি নির্ভরযোগ্য।”

ইমাম শাফেয়ি রহ. বলতেন: “যখন হাদিস আসে, মালিক হচ্ছেন নক্ষত্র। তিনি ও ইবনে উয়াইনা যুগল ইমাম।”

ইমাম আহমদকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, মালিক ভালো হাদিস বর্ণনা করেছেন নাকি ইবনে উয়াইনা? তিনি বললেন, “মালিক।”২৪

বাণী-চিরন্তন:

১. এ জ্ঞান আসলে দ্বীন। তাই তোমরা কার কাছ থেকে দ্বীন নিচ্ছ, তা ভেবে নাও। আমি এমন সত্তরজনকে পেয়েছি যারা বলতেন, ‘রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন’, কিন্তু আমি তাঁদের কাছ থেকে কিছুই গ্রহণ করিনি। অথচ তাঁদের কাউকে যদি ‘বাইতুল মাল’এর দায়িত্ব দেওয়া হতো তবে তিনি নিঃসন্দেহে বিশ্বস্ত থাকতেন। কিন্তু তাঁরা এ বিষয়ে (হাদিসের সঠিক গ্রহণ-বর্জন) যোগ্য ছিলেন না।”২৫

২. আবদুল্লাহ ইবনে ওহাব বলেন, আমি ইমাম মালিক ইবনে আনাসকে বলতে শুনেছি,“জ্ঞান অনেক বেশি বর্ণনা করার নাম নয়; বরং এটা এমন এক আলো যা আল্লাহ হৃদয়ে স্থাপন করেন।”অন্য বর্ণনায় আছে, তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, “ইলম অর্জন সম্পর্কে আপনার কী মত?” তিনি বললেন, “এটা সুন্দর ও মহৎ কাজ। তবে তুমি প্রথমে লক্ষ্য করো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তোমার জন্য সবচেয়ে জরুরি কী বিষয়, আর সেটার উপর দৃঢ় থাকো।”২৬

৩. ইবন ওহাব বলেন, আমি মালেককে বলতে শুনেছি, “জ্ঞান অন্বেষণকারীর জন্য ধৈর্য, স্থিরতা এবং আল্লাহর ভয় থাকা আবশ্যক। যার ভাগ্যে কল্যাণ রয়েছে, তার জন্য জ্ঞান উত্তম। আর এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ দান। মানুষকে নিজের উপর প্রভাব বিস্তার করতে দেবে না, কারণ মানুষের সৌভাগ্যের একটি অংশ হলো কল্যাণের জন্য সফল হওয়া। আর মানুষের দুর্ভাগ্যের একটি অংশ হলো বারবার ভুল করা। জ্ঞানের জন্য অবমাননাকর এবং অসম্মানজনক হলো এমন ব্যক্তির কাছে জ্ঞান সম্পর্কে কথা বলা, যে তা গ্রহণ করে না।”

৪. ইবন ওহাব, মালেক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “যখন কোনো ব্যক্তি নিজের প্রশংসা করতে শুরু করে, তখন তার সৌন্দর্য চলে যায়।”২৭

৫. যে ব্যক্তি শুনে সবকিছু মেনে ফেলে সে ইমাম হতে পারে না।

৬. জ্ঞানপ্রার্থীর জন্য অবশ্যক যে, সে হবে মর্যাদাপূর্ণ, শান্ত ও ভয়বোধসম্পন্ন। এছাড়া তার উচিত পূর্ববর্তী আলেমদের পথ অনুসরণ করা।২৮

৭. আবদুল আযিয আল-জারবী, হজরত হারিস ইবনে মিসকিন এবং আবদুল্লাহ ইবনে ইউসুফ থেকে বর্ণনা করেছেন, তারা উভয়েই বলেন, মালিক ইবনে আনাসকে দুরারোগ্য ব্যাধি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি বললেন, “ধর্মের মধ্যে অপবিত্রতা।”

৮. আল-ফারওয়ী বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি ইমাম মালিককে বলতে শুনেছি, “যদি কোনো ব্যক্তির নিজের মধ্যে কোনো কল্যাণ না থাকে, তাহলে মানুষের জন্য তার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।”

৯. মুতাররিফ বলেন, “মালিক আমাকে বললেন, “মানুষ আমার সম্পর্কে কী বলে?” আমি বললাম, “বন্ধুরা আপনার প্রশংসা করে আর শত্রুরা আপনাকে নিন্দা করে।” তিনি বললেন, “মানুষ বরাবরই এমন; তাদের বন্ধু এবং শত্রু থাকে। তবে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই, যখন সব জিহ্বা (একসাথে) নিন্দা করে।” ২৯

ইন্তেকাল:

ইসমাইল ইবন আবি উওয়াইস (রহ.) বর্ণনা করেন, ইমাম মালিক (রহ.) যখন অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন তিনি পরিবারের একজনকে জিজ্ঞেস করলেন মৃত্যুকালে তিনি কী বলেছেন। তারা উত্তর দিলেন, ইমাম মালিক (রহ.) প্রথমে শাহাদাতের কালিমা পাঠ করেন, তারপর বলেন,  لِلَّهِ الْأَمْرُ مِنْ قَبْلُ وَمِنْ بَعْدُ — “আদেশ আল্লাহরই, পূর্বেও এবং পরেও।” তিনি ১৭৯ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের ১৪ তারিখে ফজরের সময় ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানাযার নামাজ পড়ান আমির আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইব্রাহিম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আলি ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস আল-হাশিমী, যিনি জয়নাব বিনতে সুলাইমান আল-আব্বাসিয়াহ-এর পুত্র এবং মায়ের নামেই পরিচিত ছিলেন। সর্বসম্মতিক্রমে তিনি মদিনার জান্নাতুল বাকিতে সমাহিত হন। তাঁর কবর শরিফ প্রসিদ্ধ এবং তা সর্বদা জিয়ারত করা হয়। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।

ইমাম কাদ্বি ইয়ায (রহ.) বর্ণনা করেছেন, আসাদ ইবনে মুসা (রহ.) বলেন,“আমি ইমাম মালিক (রহ.)-কে তাঁর ইন্তেকালের পর স্বপ্নে দেখেছি। তিনি একটি লম্বা টুপি এবং সবুজ পোশাক পরিহিত অবস্থায় একটি উটের উপর চড়ে আকাশ ও জমিনের মাঝখানে উড়ছিলেন। আমি তাঁকে ডেকে বললাম, ‘হে আবু আব্দুল্লাহ, আপনি কি মারা যাননি?’

তিনি উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ।’

আমি আবার বললাম, ‘তাহলে আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’

তিনি বললেন,‘আমি আমার প্রতিপালকের কাছে গিয়েছি। তিনি সরাসরি আমার সাথে কথা বলেছেন এবং বলেছেন, আমার কাছে চাও, আমি তোমাকে দেবো; আমার কাছে আকাঙ্ক্ষা করো, আমি তোমাকে সন্তুষ্ট করব।’৩০