ইসলামি আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসে হজরত আবুল হাসান খারকানি (রহ.) এক জ্যোতির্ময় নক্ষত্র। হিজরি চতুর্থ শতকের এই মহান সুফিসাধক ও মরমী পুরুষ তাঁর গভীর প্রজ্ঞা এবং সৃষ্টির প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার জন্য বিশ্বজুড়ে বরেণ্য হয়ে আছেন। কোনো প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তিনি আধ্যাত্মিক সাধনার এক অনন্য উচ্চতায় আরোহণ করেছিলেন, যা সুফি পরিভাষায় ‘ইলমে লাদুন্নি’ বা ঐশী জ্ঞান হিসেবে পরিচিত।
পারস্যের খোরাসানে নিভৃতচারী এই সাধকের জীবন ছিল মূলত ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল এবং স্রষ্টার সন্ধানে উৎসর্গীকৃত। হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.)-এঁর আধ্যাত্মিক ধারার উত্তরসূরি হিসেবে তিনি ইসলামের মর্মবাণীকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁর দর্শন কেবল ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং আর্তমানবতার সেবা ও পরম সহিষ্ণুতার যে শিক্ষা তিনি রেখে গেছেন, তা আজও বিশ্বজনীন ও সমকালীন।
প্রাথমিক পরিচিতি:
তিনি ছিলেন একজন মহান জহিদ, আদর্শ অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। কুনিয়াত আবুল হাসান। পূর্ণ নাম আলী ইবনু আহমদ আল-খারকানি আল-বিসতামি। তিনি বর্তমান ইরানের সেমনান প্রদেশের বিস্তামের নিকটস্থ খারকান নামক একটি গ্রামে ৩৫২ হিজরিতে (৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দ) জন্মগ্রহণ করেন।৩
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ, সাম‘আনী বলেন, “তিনি ছিলেন তাঁর যুগের শায়খ। তাঁর মধ্যে কারামত ও আধ্যাত্মিক অবস্থা (আহওয়াল) প্রকাশ পেত। এক সময় তিনি পশুপালন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন; অতঃপর আল্লাহ তাঁর ওপর বিশেষ অনুগ্রহের দরজা খুলে দেন। গজনীর শাসক মাহমুদ ইবনু সবুক্তগীন তাঁর কাছে এসেছিলেন। তিনি তাঁকে নসিহত করেন; কিন্তু তাঁর কাছ থেকে কোনো উপহার বা দান গ্রহণ করেননি।১
তাজকিরাতুল আউলিয়াতে এসেছে— “তিনি ছিলেন সুলতানুল মাশায়েখ এবং আউলিয়াদের জগতের ‘কুতুবুল আওতাদ’ ও ‘আবদাল’ (আধ্যাত্মিক উচ্চ স্তর)। শরিয়ত ও হাকিকতের অনুসারীদের আদর্শ। নিজ আধ্যাত্মিক অবস্থায় সুপ্রতিষ্ঠিত এবং মারেফত বা খোদাপ্রদত্ত জ্ঞানে অনন্য। তাঁর অন্তর সর্বদা আল্লাহর ‘মুশাহাদা’য় (দিদারে) মগ্ন থাকতো এবং দেহ কঠোর রিয়াজত বা পরিশ্রমে লিপ্ত থাকতো। বিনয়, একাগ্রতা ও কঠোর সাধনার মূর্তপ্রতীক, মহান রহস্য ও ‘মুকাশাফা’ (অদৃশ্য জগতের উন্মোচন), উচ্চ হিম্মত এবং সুউচ্চ মাকামের অধিকারী, আল্লাহর সাথে ‘মাকামে ইনবিসাত’ বা আধ্যাত্মিক প্রফুল্লতার স্তরে উন্নীত একজন মহাপুরুষ।
বর্ণিত আছে যে, সুলতানুল আরেফিন হজরত আবু ইয়াজিদ (বায়েজিদ) আল-বোস্তামী (রহ.) প্রতি বছর ‘দেহিস্তান’ নামক গ্রামের ‘সাররিক’ নামক স্থানে শহিদদের কবর জিয়ারত করতে যেতেন। যাওয়ার পথে তিনি হজরত আবুল হাসান (রহ.)-এর গ্রাম ‘খারকান’ পার হতেন। যখনই তিনি এই গ্রামে পৌঁছাতেন, দাঁড়িয়ে পড়তেন এবং দীর্ঘশ্বাস (ঘ্রাণ) নিতেন।
তাঁর কিছু সাথি এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন, “আমি এই গ্রাম থেকে (যা বর্তমানে চোরদের আস্তানা) এক বিশেষ সুঘ্রাণ পাচ্ছি। এখানে ‘আলী’ নামে এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটবে, যাঁর কুনিয়াত (উপনাম) হবে ‘আবুল হাসান’। আধ্যাত্মিক মর্যাদায় তিনি আমার চেয়ে তিন ধাপ অগ্রগামী হবেন। তিনি পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণের বোঝা বহন করবেন এবং কৃষিকাজ ও বৃক্ষরোপণ করবেন।”২
ইবাদত-বন্দেগি:
বর্ণিত আছে যে, শায়খ আবুল হাসান (রহ.) টানা চল্লিশ বছর বালিশে মাথা রাখেননি (অর্থাৎ রাতে ঘুমাননি)। এই দীর্ঘ সময় তিনি সর্বদা এশার অজু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করতেন।
এত কঠোর ইবাদত সত্ত্বেও তিনি বলেছিলেন, “আমি জেনে নিয়েছি যে, আল্লাহ তায়ালা আমার ইবাদত থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী। কিন্তু আমি তো তাঁর একজন বান্দা, আর দাসের কাজই হলো দাসত্বের মর্যাদা ও সীমা বজায় রাখা।”৪
বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) মাজার জিয়াজত:
বর্ণিত আছে যে, হজরত আবুল হাসান খারকানি (রহ.) তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের শুরুর দিকে টানা বারো বছর এভাবেই কাটিয়েছেন যে, তিনি খারকানে এশার নামাজ পড়তেন, তারপর পায়ে হেঁটে বোস্তাম অভিমুখে রওনা হতেন এবং হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.)-এঁর মাজার জিয়ারত করতেন।
সেখানে গিয়ে তিনি দোয়া করতেন, “হে আল্লাহ, আপনি হজরত বায়েজিদকে যা পান করিয়েছেন (যে আধ্যাত্মিক সুধা দান করেছেন) আমাকেও তা পান করান; আর আপনি তাঁকে যে নেয়ামত দিয়েছেন তার ঘ্রাণ আমাকেও দান করুন।” অতঃপর তিনি খারকানে ফিরে আসতেন এবং এশার অজু দিয়েই জামাতের সাথে ফজরের নামাজ আদায় করতেন।
বর্ণিত আছে, তিনি একবার কোনো এক চোর সম্পর্কে জানতে পারলেন যে, সে কিছু চুরি করে পেছনের দিকে হেঁটে (উল্টো পায়ে) ফিরে এসেছে। অর্থাৎ, সে তার মুখ চুরিকৃত ঘরের দিকে এবং পিঠ নিজের বাড়ির দিকে রেখে পথ চলেছে, যাতে মানুষ তার পায়ের চিহ্ন দেখে চুরির হদিস না পায়। তা দেখে আবুল হাসান (রহ.) বললেন, “আমি আমার কাজে (সাধনায়) এই চোরের চেয়েও কম হতে পারি না।” এরপর থেকে তিনি যখনই বায়েজিদ (রহ.)-এঁর মাজার থেকে খারকানে ফিরতেন, দীর্ঘ সময় নিজের মুখ মাজারের দিকে এবং পিঠ খারকানের দিকে রেখে উল্টো পায়ে হেঁটে আসতেন। হজরত বায়েজিদ (রহ.)-এঁর মাজারের প্রতি অসীম সম্মান প্রদর্শনার্থেই তিনি এমনটি করতেন।
অতঃপর বারো বছর পর তিনি শায়খ বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.)-এঁর রওজা মোবারক থেকে একটি গায়েবি আওয়াজ শুনতে পেলেন, “হে আবুল হাসান, এখন তোমার শান্ত হওয়ার এবং নিজের ঘরে (মাকামে) বসার সময় হয়েছে।” আবুল হাসান (রহ.) আরজ করলেন, “হে শায়খ, আমি তো একজন সাধারণ উম্মি (অক্ষরজ্ঞানহীন) মানুষ; কুরআন ও শরিয়ত সম্পর্কে আমার বিশেষ কোনো প্রজ্ঞা নেই।” তখন তিনি পুনরায় আওয়াজ শুনলেন, “হে আবুল হাসান, মহান আল্লাহ আমাকে যা কিছু রিজিক (আধ্যাত্মিক সম্পদ) দান করেছেন, তা তোমারই বরকতে।”
আবুল হাসান (রহ.) বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করলেন, “তা কীভাবে সম্ভব? আপনি তো আমার জন্মের ৩০ বছরেরও বেশি আগে গত হয়েছেন!” শায়খ বায়েজিদ (রহ.) বললেন, “হ্যাঁ, তা ঠিক। কিন্তু আমি যখনই খারকান এলাকা দিয়ে যেতাম, তখনই আমি মাটি থেকে আসমান পর্যন্ত একটি নুরানি স্তম্ভ দেখতে পেতাম। দীর্ঘ ত্রিশ বছর যাবৎ আল্লাহর কাছে আমার একটি বিশেষ হাজত (প্রার্থনা) ছিল যা পূর্ণ হচ্ছিল না। অবশেষে আমার অন্তরে ইলহাম হলো— ‘হে বায়েজিদ, আমার কাছে ওই নুরের ওসিলা দিয়ে সুপারিশ করো, তবেই তোমার হাজত পূর্ণ হবে।’
আমি বললাম, ‘হে ইলাহি, এই নুর কীসের?’ তখন এক গায়েবি আওয়াজ এলো— ‘এই নুর হলো আমার এক খাস ও মুখলিস বান্দার নুর, যার নাম আবুল হাসান।’ “অতঃপর আমি সেই নুরের ওসিলা বা সুপারিশ পেশ করলাম এবং আমার প্রয়োজন পূরণ করা হলো ও আমি আমার কাঙ্ক্ষিত মাকাম লাভ করলাম।”
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.)-এঁর মাজার থেকে আওয়াজ শুনলেন— “হে আবুল হাসান, সুরা ফাতিহা দিয়ে (কুরআন পাঠ) শুরু করো।” তিনি বলেন, “আমি বোস্তাম থেকে খারকানে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই পুরো কুরআন তিলাওয়াত করে খতম সম্পন্ন করলাম।”৫
দুনিয়াবিমুখতা:
বর্ণিত আছে যে, শায়খ আবুল হাসান (রহ.)-এর একটি ছোটো বাগান ছিল এবং তিনি নিজ হাতে সেখানে কাজ করতেন। একদিন তিনি কোদাল দিয়ে মাটি খনন করছিলেন, হঠাৎ মাটি ওঠার বদলে সেখান থেকে রৌপ্যমুদ্রা (দিরহাম) বের হতে শুরু করল। তিনি সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করলেন না। দ্বিতীয়বার যখন কোদাল চালালেন, তখন সেখান থেকে স্বর্ণমুদ্রা (দিনার) বের হয়ে এলো। এবারও তিনি সেদিকে তাকালেন না এবং নিজের কাজে মগ্ন রইলেন। তৃতীয়বার কোদাল চালাতেই সেখান থেকে দামি মুক্তা ও মহামূল্যবান জহরত বেরিয়ে এলো। তখন তিনি (আল্লাহর দরবারে আরজ করে) বললেন, “হে আমার ইলাহি, আবুল হাসান এই জাতীয় বস্তুর দ্বারা প্রতারিত হবে না এবং দুনিয়ার মোহে পড়ে আপনার স্মরণ থেকে বিচ্যুত হবে না।”
তিনি বলেন, “আমার সামনে দুনিয়ার সমস্ত ধন-ভাণ্ডার পেশ করা হয়েছিল, কিন্তু আমি সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করিনি। তখন সত্যের (আল্লাহর) পক্ষ থেকে আওয়াজ এলো— হে আবুল হাসান, দুনিয়াতে তোমার কোনো অংশ বা লালসা নেই; সমস্ত জগতের পরিবর্তে কেবল আমিই তোমার জন্য যথেষ্ট।” তিনি বলেন, “আমি একবার যা কিছু ত্যাগ করেছি (দুনিয়া), পুনরায় কখনো তার দিকে ফিরে তাকাইনি।”৬
সু-উচ্চ মাকাম ও মর্তবা:
বর্ণিত আছে যে, জনৈক ‘শায়খুল মাশায়েখ’ আবুল হাসান (রহ.)-এঁর নিকট আসলেন। তখন তাঁর সামনে পানিভর্তি একটি পাত্র ছিল। সেই শায়খ পানির ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটি জ্যান্ত মাছ বের করে আনলেন এবং মাটিতে ছেড়ে দিলেন।
এটি দেখে আবুল হাসান (রহ.) ঘরের ভেতরে জ্বলন্ত তন্দুর বা চুলার দিকে তাকালেন এবং আগুনের ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটি জ্যান্ত মাছ বের করে আনলেন। তিনি মাছটি সেই শায়খের সামনে রাখলেন এবং বললেন, “হে আল্লাহর বান্দা, আসুন আমরা ‘ফানা’র (নিজ অস্তিত্ব বিসর্জন দেওয়া) সমুদ্রে নিমজ্জিত হই, তারপর দেখি ‘বাকা’র (আল্লাহর মাঝে স্থায়িত্ব লাভ) জগত থেকে কার মাথা উঁকি দেয়।” এটি শুনে সেই শায়খ নিশ্চুপ হয়ে গেলেন এবং একটি শব্দও উচ্চারণ করলেন না।
সেই ‘শায়খুল মাশায়েখ’ থেকে আরও বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, “আমি আবুল হাসান (রহ.)-এঁর ভয়ে দীর্ঘ ত্রিশ বছর ঘুমাইনি। আমি আধ্যাত্মিকতার যে মাকামেই এক কদম এগিয়েছি, দেখেছি তিনি আমার আগেই সেখানে পৌঁছে আছেন। এমনকি গত দশ বছর ধরে আমি চেষ্টা করছি বোস্তামে হজরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.)-এঁর মাজার জিয়ারতে তাঁর আগে পৌঁছাতে, কিন্তু একবারও তা সম্ভব হয়নি; যদিও আমার থাকার জায়গা আবুল হাসানের জায়গার তুলনায় মাজারের অনেক বেশি কাছে ছিল।”৭
বর্ণিত আছে যে, শায়খ আবুল হাসান আল-খারকানি (রহ.)-এঁর এক শিষ্য তাঁর কাছে লেবানন পাহাড়ের (সিরিয়া অঞ্চল) উদ্দেশ্যে সফরের অনুমতি চাইলেন। শিষ্যটি শুনেছিলেন যে, কুতুব (উচ্চপর্যায়ের অলী) সাধারণত সেখানেই অবস্থান করেন, তাই তিনি তাঁর সাক্ষাতের আশায় বের হলেন।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অত্যন্ত ক্লান্তি ও কষ্টের পর তিনি লেবানন পাহাড়ে পৌঁছালেন। সেখানে উঠে তিনি দেখতে পেলেন একদল লোক একটি জানাজা সামনে নিয়ে বসে আছেন, কিন্তু তারা সালাত শুরু করছেন না। মুরিদ (শিষ্য) তাদের কাছে সালাত শুরু না করার কারণ জানতে চাইলে তারা বললেন, “আমরা কুতুবের জন্য অপেক্ষা করছি; তিনি এসে ইমামতি করবেন আর আমরা তাঁর পেছনে ইকতিদা করব।”
লোকটি জিজ্ঞেস করলেন, “কুতুব কখন আসবেন?” তারা উত্তর দিলেন, “তিনি প্রতিদিন এখানে পাঁচবার আসেন এবং আমাদের নিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন।” এ কথা শুনে লোকটি মনে মনে খুব খুশি হলেন।
এমন সময় এক ব্যক্তির আগমন ঘটল। তাঁকে দেখে উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করলেন। তিনি সালাম দিয়ে এগিয়ে গেলেন এবং জানাজার নামাজ শুরু করলেন। তাঁকে দেখে শিষ্যটি এতটাই বিম্মিত হলেন যে, তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। যখন তাঁর জ্ঞান ফিরল, তখন দেখলেন নামাজ শেষ, দাফন সম্পন্ন এবং সেই ইমাম সেখান থেকে চলে গেছেন।
শিষ্যটি তখন উপস্থিত লোকদের আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এই ব্যক্তিটি কে?” তারা বললেন, “উনি আবুল হাসান আল-খারকানি।” শিষ্যটি অবাক হয়ে বললেন, “তিনি কি আবারও আমাদের কাছে আসবেন?” তারা বললেন, “হ্যাঁ, জোহরের নামাজের সময় তিনি আসবেন।”
শিষ্যটি সেখানে অবস্থান করলেন এবং উপস্থিত লোকদের কাছে মিনতি করে বললেন যে, তিনি শেখের একজন মুরিদ। তিনি চাইলেন তারা যেন শেখের কাছে সুপারিশ করেন যাতে শেখ তাঁকে সাথে করে পুনরায় খারকানে নিয়ে যান। কারণ সেখানে পৌঁছাতে তাঁর দীর্ঘ সময় এবং অবর্ণনীয় কষ্ট হয়েছিল।
যখন নামাজের সময় হলো, শায়খ আসলেন এবং ইমামতি করলেন। নামাজ শেষ হওয়া মাত্রই শিষ্যটি তাঁর জামার আঁচল ধরে ফেললেন এবং আবারও জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। যখন তাঁর জ্ঞান ফিরল, তিনি নিজেকে ‘রাই’ শহরের বাজারে দেখতে পেলেন। খারকান ছিল রাই শহরের পাশের একটি গ্রাম।
শায়খ তাঁকে এই অলৌকিক ঘটনার কথা গোপন রাখার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন, “আমি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি যেন তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে আমাকে (আমার মর্তবা) গোপন রাখেন।”
শায়খ আব্দুল্লাহ আনসারি (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন, “একবার লোকেরা আমাকে বন্দি করল, পায়ে শিকল পরাল এবং বলখ শহরে নিয়ে গেল। আমি শুনলাম যে, মানুষ আমাকে পাথর মারার জন্য পাথর হাতে নিয়ে ছাদে উঠে অপেক্ষা করছে। আমি মনে মনে ভাবলাম আমি আমার পা দিয়ে এমন কী বেয়াদবি করেছি, যার কারণে আমাকে এভাবে শিকল পরানো হলো এবং আমি এই শাস্তির যোগ্য হলাম?
তখন আল্লাহ তায়ালা আমার মনে ইলহাম দিলেন যে, একদিন আমি আমার পীর বা শায়খের জায়নামাজ বিছিয়েছিলাম এবং অসাবধানতাবশত আমার পা তাঁর জায়নামাজের ওপর পড়েছিল। আমি বুঝতে পারলাম, সেই কারণেই এই শাস্তি। আমি অনুতপ্ত হলাম এবং আল্লাহর কাছে তওবা করলাম। এরপর আমি দেখলাম, যারা আমাকে পাথর মারতে চেয়েছিল তাদের হাত আর সায় দিচ্ছে না। পাথর ছুড়তে পারছে না। এর কিছুকাল পরেই আমার পায়ের শিকল খুলে দেওয়া হয়।”৮
রসুল ﷺ কে দেখে দেখে হাদিস বর্ণনা:
বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি হাদিস শোনার উদ্দেশ্যে ইরাক যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেন। তিনি শায়খ আবুল হাসান আল-খারকানি (রহ.)’র সাথে পরামর্শ করলে শায়খ তাকে সফরে যেতে নিষেধ করলেন।
শায়খ বললেন, “এখানে (আমার কাছে) এমন ব্যক্তি আছেন যার হাদিসের সনদ বা সূত্র ইরাকবাসীদের চেয়েও অনেক উঁচুতে।” লোকটি এই কথা অস্বীকার করলেন এবং তা মেনে নিতে পারলেন না। তখন শায়খ বললেন, “আল্লাহর নেয়ামত আমার ওপর গণনা করার সাধ্যের অতীত। তিনি নিজ করুণায় আমাকে জ্ঞান দান করেছেন।” লোকটি প্রশ্ন করলেন, “আপনি কার কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করেছেন?” শায়খ বললেন, “আমি সরাসরি রসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছ থেকে শুনেছি এবং তাঁর কাছ থেকেই নিয়েছি।”
লোকটি এই কথা বিশ্বাস না করে চলে গেলেন। এরপর তিনি স্বপ্নে রসুলুল্লাহ ﷺ-কে দেখলেন। নবীজি ﷺ তাকে বললেন, “এই যুবকদের (আল্লাহর অলিদের) কথার প্রতিবাদ করো না, কারণ তারা সত্য কথাই বলে।” পরের দিন লোকটি শায়খের কাছে এসে হাদিস পড়া শুরু করলেন। যখনই কোনো জাল বা ভিত্তিহীন হাদিস পড়া হতো, শায়খ বলতেন, ‘এটি নবীজি ﷺ-এর কথা নয়।’ পাঠক জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে শায়খ, আপনি এটি কীভাবে জানলেন?’ শায়খ উত্তর দিলেন, ‘হাদিস পাঠ করার সময় আমি নবীজি ﷺ-এর পবিত্র চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকি। যখনই কোনো জাল হাদিস পাঠ করা হয়, আমি তাঁর চেহারায় অসন্তুষ্টি বা বিষণ্নতা দেখতে পাই। তা থেকেই আমি বুঝতে পারি যে, এটি নবীজি ﷺ-এর কথা নয়।”
আমি (শায়খ ফরিদুদ্দীন আত্তার) বলছি: এই বিষয়টি কিছুটা জটিল মনে হতে পারে যে, দুনিয়ায় জাগ্রত অবস্থায় কীভাবে নবীজি ﷺ-কে দেখা সম্ভব? এর উত্তরে বলা যায়, নবীজি ﷺ থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল, সে অচিরেই আমাকে জাগ্রত অবস্থায় দেখবে।’
ব্যাখ্যাকারীদের মতে, এর অর্থ হলো— হয়তো সে কেয়ামতের দিন তাঁকে দেখবে অথবা মৃত্যুর সময় তাঁর সাক্ষাৎ পাবে। আবার কিছু মুহাক্কিক আরেফিন (গভীর জ্ঞানের অধিকারী সুফি) বলেছেন যে, জাগ্রত অবস্থায় নবীজি ﷺ-কে দেখা সম্ভব। যখন মানুষের অন্তর নফসের আবিলতা ও দেহের অন্ধকার থেকে মুক্ত হয়ে পবিত্র নুর ও খোদায়ি ইলহামের আলোতে আলোকিত হয় এবং আল্লাহর মহব্বতের সাগরে নিমজ্জিত হয়ে নবীজি ﷺ-এর রুহের দিকে মনোযোগ দেয়, তখন তাঁর রুহ মুমিনের সামনে উন্মোচিত হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। এর পদ্ধতি আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। এমনকি অনেকে বাস্তবে এমনটি ঘটেছে বলে দাবিও করেছেন।
শায়খ আবুল হাসানের কথা এই অর্থকেই জোরালো করে। আল্লাহর কুদরত এবং নবীজি ﷺ-কে দেখার সম্ভাবনা বিবেচনা করলে এই সংক্রান্ত সকল সংশয় দূর হয়ে যায়। আল্লাহই ভালো জানেন।৯
ইবনে সিনা ও শায়খ আবু হাসানের সাক্ষাতের গল্প:
বর্ণিত আছে যে, ইবনে সিনা যখন শায়খ আবু হাসানের কথা শুনলেন, তখন তিনি তাঁর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। যখন তিনি শায়খের বাড়ির দরজায় পৌঁছে করাঘাত করলেন, তখন শায়খের স্ত্রী বেরিয়ে এলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী চাও?’
ইবনে সিনা বললেন, ‘আমি শায়খ আবু হাসানকে খুঁজছি।’
স্ত্রী বললেন, ‘সেই যিন্দিক; মিথ্যাবাদকে দিয়ে তোমার কী কাজ? কেন তার জন্য কষ্ট করছ?’
ইবনে সিনা বললেন, ‘তাঁর সান্নিধ্য আমার জন্য অপরিহার্য।’
স্ত্রী তখন বললেন, ‘সে তো কাঠ কুড়াতে গেছে।’
ইবনে সিনা তখন শায়খের সন্ধানে বনের দিকে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখলেন, শায়খ একটি সিংহের পিঠে কাঠের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে তা চালিয়ে নিয়ে আসছেন। এই দৃশ্য দেখে ইবনে সিনা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়লেন। শায়খ তাঁর কাছে পৌঁছে বললেন, “আবু আলী, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমরা ওই নেকড়ের (নিজের কটুভাষী স্ত্রী) বোঝা সবর ও ধৈর্যের সাথে বহন করেছি বলেই আজ এই সিংহ আমাদের বোঝা বহন করছে।”১০
সুফিত্বের মানদণ্ড:
বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি শায়খ আবু হাসানের কাছে এসে তাঁর কাছ থেকে একটি ‘খিরকা’ (সুফিদের বিশেষ পোশাক) চেয়ে বসলেন, যেন তিনি তা পরিধান করতে পারেন। শায়খ বললেন, “আমি তোমাকে আগে একটি প্রশ্ন করব, তারপর তোমাকে খিরকা পরিয়ে দেব। আচ্ছা বলো তো, কোনো পুরুষ যদি নারীদের পোশাক পরে বা তাদের ওড়না দিয়ে মাথা-গা ঢাকে, তবে সে কি নারী হয়ে যাবে? অথবা কোনো নারী যদি পুরুষের পোশাক পরে এবং মাথায় পাগড়ি বাঁধে, তবে সে কি পুরুষ হয়ে যাবে?”
লোকটি উত্তর দিলেন, “না, কখনোই না।” শায়খ তখন বললেন, “তেমনিভাবে কেবল তালি দেওয়া পশমি পোশাক (খিরকা) পরলেই কোনো মানুষ সুফি হয়ে যায় না। কারণ, এই পোশাক মূলত প্রকৃত পুরুষদের (আধ্যাত্মিক সুফিদের) প্রতীক; আর এই পোশাক কেবল তাদের জন্যই মানানসই, যারা সত্যিকারের মানুষ হতে পেরেছেন।” ১১
শায়খ আবুল হাসান খারকানি ও সুলতান মাহমুদ গজনবি:
বর্ণিত আছে যে, সুলতান মাহমুদ গজনবি (রহ.) গজনি থেকে শায়খ আবুল হাসান আল-খারকানির জিয়ারতের উদ্দেশ্যে খারকানে আসলেন। তিনি গ্রামের বাইরে তাঁবু ফেললেন এবং শায়খের কাছে একজন দূত পাঠিয়ে এই বার্তা দিলেন, “সুলতান দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আপনার কাছে এসেছেন, তাই আপনার উচিত নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে তাঁর তাবুতে এসে দেখা করা। যদি তিনি আসতে রাজি না হন, তবে তাঁকে কুরআনের এই আয়াত পড়ে শোনাবেন— ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রসুলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যকার উলিল আমরের (নেতৃস্থানীয় বা শাসক) আনুগত্য করো।’ সুরা নিসা: ৫৯)।”
দূত যখন শায়খকে সুলতানের উদ্দেশ্য জানালেন, শায়খ যেতে অনীহা প্রকাশ করলেন এবং ওজর পেশ করলেন। আর উত্তর দিলেন, “আমি আল্লাহর আনুগত্য করো (আতিউল্লাহ)—এই নির্দেশের মাঝে এতটাই নিমগ্ন যে, ‘রসুলের আনুগত্য করো’—এই অংশে মনোযোগ দেওয়ার ফুরসত পাচ্ছি না এবং এর জন্য আমি লজ্জিত; এমতাবস্থায় ‘উলিল আমরের’ দিকে তাকানোর সময় আমার কোথায়?”
দূত ফিরে গিয়ে সুলতানকে সব জানাল। সুলতানের অন্তর বিগলিত হলো এবং তিনি বললেন, “চলো আমরাই তাঁর কাছে যাই, আমরা যা ভেবেছি তিনি তার চেয়েও উঁচুমত মর্তবার অধিকারী।” সুলতান তাঁর পোশাক ও সাজসজ্জা তাঁর ‘আইয়াজ’ নামক গোলামকে পরিয়ে দিলেন এবং তাকে আগে পাঠিয়ে নিজে সাধারণ ভৃত্যের বেশে পেছনে হাঁটতে লাগলেন।
আইয়াজ সুলতানের বেশে ঘরে প্রবেশ করে সালাম দিলে শায়খ উত্তর দিলেন, কিন্তু উঠে দাঁড়ালেন না এবং আইয়াজের দিকে বিশেষ ভ্রুক্ষেপও করলেন না; বরং তিনি সুলতানের দিকে তাকালেন এবং আধ্যাত্মিক নুরের (ফিরাত) মাধ্যমে তাঁকে চিনে ফেললেন। শায়খ সুলতানের হাত ধরে নিজের পাশে বসালেন। সুলতান মাহমুদ তখন শায়খের কাছে শায়খ আবু ইয়াজিদ বোস্তামী (রহ.)-এর কোনো বাণী শুনতে চাইলেন। শায়খ বললেন, “মজলিস থেকে এই দাসীদের বের করে দাও, কারণ তারা এখানে পরনারী।”
এরপর শায়খ বললেন, “আবু ইয়াজিদ বলেছিলেন, যে আমাকে দেখেছে, সে দুর্ভাগ্যের তালিকা থেকে মুক্তি পেয়েছে।” সুলতান মাহমুদ বললেন, “এই কথা থেকে তো মনে হচ্ছে আবু ইয়াজিদ নবীজি ﷺ-এর চেয়েও শ্রেষ্ঠ, কারণ আবু লাহাব ও আবু জেহেলের মতো কাফেররা তো নবীজিকে দেখেছিল, কিন্তু তারা তো দুর্ভাগ্য থেকে মুক্তি পায়নি?”
শায়খ বললেন, “বেয়াদবি করো না। নবীজিকে তাঁর সাহাবিগণ ছাড়া আর কেউ প্রকৃতপক্ষে দেখেনি। কাফেররা তাঁকে দেখেনি, যদিও তারা তাকিয়েছিল। এর দলিল আল্লাহর এই বাণী— ‘তুমি দেখবে তারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে, অথচ তারা দেখছে না।’ সুরা আরাফ: ১৯৮।”
আবু ইয়াজিদের কথার অর্থ হলো— যেভাবে সাহাবিগণ নবীজিকে দেখেছিলেন যে তাঁকে সেভাবে দেখেছে, অর্থাৎ বিশ্বাস ও ভালোবাসার সাথে তাঁর কথার অনুগামী হয়ে এবং তাঁর আমল ও সাধনাকে অনুসরণ করে। এমন ব্যক্তি নিশ্চিতভাবেই নাজাত পাবে। কারণ শায়খ তাঁর কওমের মাঝে ঠিক তেমনই, যেমন নবী তাঁর উম্মতের মাঝে।
সুলতান শায়খের কথায় অভিভূত হলেন এবং তাঁর কাছে অসিয়ত (উপদেশ) চাইলেন। শায়খ বললেন, “চারটি জিনিস আঁকড়ে ধরো—
১. তাকওয়া (খোদাভীতি)
২. জামায়াতের সাথে নামাজ
৩. দানশীলতা
৪. আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দয়া।
সুলতান বললেন, ‘আমার জন্য দোয়া করুন।’ শায়খ বললেন, ‘আমি তো প্রতিদিন মুমিন-মুসলমানদের জন্য দোয়া করি।’ সুলতান বললেন, ‘আমি বিশেষ দোয়া চাই।’ শায়খ বললেন, ‘আল্লাহ মাহমুদের পরিণাম ‘মাহমুদ’ (প্রশংসিত) করুন।’
সুলতান তখন শায়খকে এক তোড়া স্বর্ণমুদ্রা উপহার দিতে চাইলেন। পরিবর্তে শায়খ সুলতানকে একটি যবের রুটি দিয়ে খেতে বললেন। সুলতান রুটির এক লোকমা মুখে নিয়ে চিবালেন, কিন্তু যখনই গিলতে চাইলেন, তা গলায় আটকে গেল। শায়খ বললেন, “হে সুলতান, যেমন আপনি এই ফকিরের শুকনো রুটি গিলতে পারছেন না, তেমনি আমিও আপনার এই স্বর্ণমুদ্রা গ্রহণ করতে পারছি না।” শায়খ তা ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেন, “আমি দুনিয়াকে তিন তালাক দিয়েছি, আর তিন তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী কখনো ফিরে আসে না।”
যাওয়ার সময় সুলতান স্মৃতি হিসেবে কিছু চাইলে শায়খ নিজের গায়ের একটি জামা (কামিজ) খুলে তাঁকে দিলেন। ফেরার সময় শায়খ সুলতানের সম্মানে উঠে দাঁড়ালেন। সুলতান অবাক হয়ে বললেন, “আসার সময় আপনি দাঁড়ালেন না; অথচ যাওয়ার সময় দাঁড়ালেন কেন?”
শায়খ বললেন, “আসার সময় আপনি এসেছিলেন সুলতানি অহংকার ও আমাকে পরীক্ষা করার মানসিকতা নিয়ে। কিন্তু এখন আপনি ফিরছেন বিনয় ও আধ্যাত্মিক নুর নিয়ে। তখন আপনার রাজত্বের কারণে আমি দাঁড়াইনি, এখন আপনার আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের সম্মানে দাঁড়িয়েছি।”
এরপর সুলতান ভারতের সোমনাথ অভিযানে গেলেন। সেখানে কাফের বাহিনীর বিশাল শক্তির সামনে মুসলমানরা পরাজিত হওয়ার উপক্রম হলো। সুলতান তখন নির্জনে গিয়ে শায়খের সেই জামাটি হাতে নিলেন এবং আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে বললেন, “হে আল্লাহ, এই জামার মালিকের সম্মানে আমাদের বিজয় দান করুন।”
তৎক্ষণাৎ খোরাসানের দিক থেকে এক অন্ধকার ঘূর্ণিঝড় আসলো। কাফেররা একে অপরকে চিনতে না পেরে নিজেদের মাঝেই কাটাকাটি শুরু করল। শেষ পর্যন্ত মুসলমানরা বিজয়ী হলো। সেদিন রাতে সুলতান স্বপ্নে দেখলেন শায়খ বলছেন, “হে মাহমুদ, তুমি কেন আল্লাহর দরবারে আমার ছেঁড়া জামার দোহাই দিলে? যদি তুমি সেই মুহূর্তে সকল কাফেরের ঈমানের জন্য দোয়া করতে, তবে আল্লাহর তৌফিকে তারা সবাই আজ মুসলমান হয়ে যেত!” ১২
তাঁর আধ্যাত্মিক দুরদর্শিতা ও একটি পরীক্ষা:
বর্ণিত আছে যে, এক রাতে শায়খ আবু হাসান আল-খারকানি (রহ.) বললেন, “এই মুহূর্তে একদল ডাকাত অমুক উপত্যকায় একটি কাফেলাকে লুণ্ঠন করছে এবং তাদের সর্বস্বান্ত করে তাড়িয়ে দিচ্ছে।” পরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, ঘটনাটি ঠিক তেমনই ছিল।
অথচ সেই একই রাতে শায়খের এক শত্রু তাঁর নিজের পুত্রকে হত্যা করে মাথা কেটে শায়খের ঘরের ভেতর ফেলে রেখে গিয়েছিল। শায়খ ঘরের ভেতরের এই ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। শায়খের স্ত্রী (যিনি সবসময় তাঁর বিরোধিতা করতেন) বিদ্রূপ করে বললেন, “কী আশ্চর্য! তিনি মাইলের পর মাইল দূরের খবর দিচ্ছেন, অথচ ঘরের ভেতর নিজের সন্তানের কী দশা হয়েছে সেই খবর তাঁর কাছে নেই!”
শায়খ (রহ.) উত্তরে বললেন, “হ্যাঁ, বিষয়টি এমনই। কারণ, মহান আল্লাহ সেই ডাকাতদের এবং আমার মাঝখানের পর্দা সরিয়ে দিয়েছিলেন (তাই আমি তা দেখতে পেয়েছি), কিন্তু আমার এবং আমার সন্তানের মাঝখানের পর্দাটি তিনি সরাননি।”১৩
শায়খের নির্ভীকতা ও মারেফতে নিমগ্নতা:
বর্ণিত আছে যে, একদিন শায়খ এক বিশেষ আধ্যাত্মিক অবস্থায় ছিলেন এবং পরম তৃপ্তির সাথে কথা বলছিলেন। তখন তাঁর অন্তরে একটি গায়েবি আওয়াজ এলো, ‘তুমি কি মৃত্যুকে ভয় পাও না?’ শায়খ উত্তর দিলেন, ‘আমার এক ভাই ছিল, যে মৃত্যুকে ভয় পেত, কিন্তু আমি ভয় পাই না।’ আবার আওয়াজ এলো, ‘কবরে প্রবেশের সময় তুমি কি মুনকার-নাকিরের (সওয়াল-জওয়াব) কথা ভেবে আতঙ্কিত হও না?’ শায়খ বললেন, ‘উট কখনো ঘণ্টার আওয়াজে আতঙ্কিত হয় না।’ অর্থাৎ উট যেমন ঘণ্টার ধ্বনি শুনে পথ চলে, আমার কাছেও তা তেমনই স্বাভাবিক।
আবার প্রশ্ন করা হলো, ‘তুমি কি কিয়ামত এবং তার ভয়াবহতা নিয়ে ভীত নও?’ শায়খ বললেন, ‘হে আমার ইলাহ, যখন কিয়ামত কায়েম হবে এবং তার ভয়াবহতা শুরু হবে, তখন আমি আপনার ‘তাওহিদ’ এর সাগরে এমনভাবে নিমগ্ন থাকব যে, ওইসব ভয়াবহ অবস্থা থেকে আমি শান্তিতে থাকব।’
বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছিলেন, “হে আমার ইলাহ, আমার রুহ কবজ করার জন্য মালাকুল মউতকে আমার কাছে পাঠাবেন না। কারণ আমি তো তাঁর কাছ থেকে এই রুহ গ্রহণ করিনি যে, তাঁর হাতে তা সোপর্দ করব। আমি তো কেবল আপনার কাছ থেকেই এটি গ্রহণ করেছি, আর আপনার কাছেই তা সমর্পণ করতে চাই।”
বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছিলেন, “আল্লাহ তায়ালা আমার ওপর চিন্তার (ফিকর) দরজা খুলে দিয়েছেন। ফলে আমি দেখতে পেলাম— আল্লাহ তায়ালা যেন আমাকে বলছেন, ‘আমি তোমাকে শয়তানের কাছ থেকে এমন এক মূল্যে কিনে নিয়েছি যার পরিমাণ বর্ণনা করা সম্ভব নয়। অতএব, আল্লাহর ব্যাপারে গাফেল হয়ো না এবং কীভাবে তাঁর সন্তুষ্টি রক্ষা করতে হয় সে ব্যাপারে সজাগ থেকো।”
বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছিলেন, “আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা আমাকে এমন এক কদম (গতি) দিয়েছেন যে, আমি এক কদমে মাটির নিচ (ছারা) থেকে আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যাই, আবার আরশ থেকে মাটির নিচে ফিরে আসি। এরপর আমি চিন্তা করি এবং বুঝতে পারি যে, আমি আসলে মোটেও হাঁটিনি! তখন আমি বলি সুবহানাল্লাহ! এই সফর কতই না দীর্ঘ আবার কতই না সংক্ষিপ্ত!”১৪
তিন জিনিসের কোনো শেষ নেই:
বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছিলেন, “সৃষ্টিজগতের প্রতিটি জিনিসেরই একটি সমাপ্তি বা সীমা আছে, কেবল তিনটি বিষয় ছাড়া। প্রথমত মুহাম্মদ মুস্তফা ﷺ-এর সুউচ্চ মর্তবা বা মর্যাদার কোনো শেষ নেই; দ্বিতীয়ত নফসের প্রবঞ্চনা বা চক্রান্তের কোনো শেষ নেই; তৃতীয়ত আল্লাহর পরিচয় বা মারিফতের কোনো শেষ নেই।”১৫
তাঁর আধ্যাত্মিক উক্তি:
১. দিন এবং রাত মিলে চব্বিশ ঘণ্টা; আমি এর মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে এক হাজার বার মৃত্যুবরণ করি (ফানা হয়ে যাই)। তাহলে বাকি ঘণ্টাগুলোতে আমার অবস্থা কেমন হয়, তা তোমরা ভেবে দেখো!
২. মায়ের গর্ভে যখন আমি প্রথম নড়াচড়া শুরু করি, তখন থেকে আজ পর্যন্ত আমার ওপর যা যা ঘটেছে, তার সবকিছুই আমার স্মরণে আছে।
৩. আমি মানুষ, ফেরেশতা, জিন, বন্যপ্রাণী এবং পাখিদের গতিবিধির দিকে তাকাই। আল্লাহর তৌফিকে আমি বিশ্বের সবচেয়ে দূরপ্রান্তে কী ঘটছে তা সেভাবেই বলে দিতে পারি, যেভাবে আমাদের আশেপাশে ঘটে যাওয়া বিষয়ের খবর দিই।
৪. এই হৃদয়ের ভেতরে এমন এক সমুদ্র আছে যে, যখন সেখানে বাতাস প্রবাহিত হয়, মেঘমালা আসে এবং বৃষ্টি বর্ষণ শুরু হয়; তখন সেই বৃষ্টি আরশ থেকে শুরু করে মাটির গভীর নিচ পর্যন্ত সবকিছুকে সিক্ত করে দেয়।
ব্যাখ্যাকারীর মন্তব্য: আমি (শায়খ ফরিদুদ্দীন আত্তার নিসাপুরী) বলছি, এখানে ‘বাতাস’ বলতে আল্লাহর তৌফিকপ্রাপ্ত বুদ্ধিবৃত্তিক মনোযোগকে বুঝিয়েছেন, ‘মেঘমালা’ বলতে গভীর চিন্তা বা ফিকিরকে বুঝিয়েছেন এবং ‘বৃষ্টি’ বলতে মারিফত বা খোদায়ী জ্ঞানকে বুঝিয়েছেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, পবিত্র আত্মার মনোযোগের পর সঠিক চিন্তার মাধ্যমে যে মারিফত অর্জিত হয়, তা আরশ এবং সমস্ত সৃষ্টিজগতকে পরিবেষ্টন করে নেয়। তবে এর শর্ত হলো— আত্মার পরিশুদ্ধি, নিরন্তর সাধনা, কঠোর রিয়াজত, ইবাদতে নিমগ্নতা, মোরাকাবা এবং মহান আল্লাহর দরবার থেকে সাহায্য প্রার্থনা করা। যখন সেই পবিত্র দরবার থেকে সাহায্য আসে, তখনই এমন স্তরে পৌঁছানো সম্ভব। আর এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। আল্লাহই ভালো জানেন।
৫. মহাদাতা আল্লাহর হেদায়েতে আমি এক আধ্যাত্মিক সফরে বের হলাম। আমি অনেক মনজিল অতিক্রম করলাম; পাড়ি দিলাম উপত্যকা, পাহাড়, টিলা, নিচু ভূমি, নালা, নদী, সমুদ্র এবং ভয় ও আশার জগত। এরপর আমি বুঝতে পারলাম যে— আমি তো প্রকৃতপক্ষে মুসলিমই হতে পারিনি! তখন আমি আরজ করলাম, হে আমার ইলাহ, মানুষের দৃষ্টিতে আমি মুসলিম, কিন্তু আপনার কাছে আমি মুসলিম নই। অতএব, আপনার মেহেরবানিতে আমার অন্তর থেকে শিরকের পৈতা (অদৃশ্য বাঁধন) ছিন্ন করে দিন, যাতে আপনার কাছেও আমি একজন প্রকৃত মুসলিম হতে পারি।
৬. একবার এক আলিম বা শায়খ হাতে একটি কিতাব (পুস্তিকা) নিয়ে তাঁকে বললেন, “আমি এই কিতাব দেখে (কিতাবি জ্ঞান থেকে) কথা বলছি, আপনি কোথা থেকে কথা বলছেন?” শায়খ আবুল হাসান (রহ.) উত্তর দিলেন, “আমি এমন এক মাকাম বা অবস্থায় আছি, যেখানে কোনো কথা বা আওয়াজ শোনাই যায় না (অর্থাৎ যা বর্ণনাতীত ও সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত)।”
৭. আমি জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব অস্বীকার করি না; তবে আমি বলি— আমার কাছে (আমার অন্তরে আল্লাহর প্রেমের তুলনায়) এ দুটোর কোনো স্থান নেই।
৮. বিশ বছর হলো আমি কাফন পরিধান করেছি এবং কাফনের ভেতর থেকেই মাথা বের করে মানুষের সাথে কথা বলছি। আমি যখন মায়ের পেটে ছিলাম তখনই প্রেমের আগুনে পুড়ে গিয়েছিলাম, ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় গলে গিয়েছিলাম এবং যখন প্রাপ্তবয়স্ক হলাম তখন পুড়ে ছাই হয়ে গেলাম।
৯. আমি সশরীরে আল্লাহর সেই দরবারে উপস্থিত হলাম এবং আমার অন্তরকে খুঁজলাম, কিন্তু অন্তর আমাকে সাড়া দিলো না। তবে আমার ইমান, দ্বীন, আকল ও নফস আমার অনুগামী হলো। আমি আমার অন্তরকে সেখানে প্রবেশ করালাম; অতঃপর ইখলাসের মাধ্যমে ইয়াকিন (দৃঢ় বিশ্বাস) লাভ করলাম। আর ইখলাস আমলের অনুগামী হলো। এভাবে আমরা ‘হক’ বা পরম সত্যের নিকট পৌঁছলাম। আমি এমন এক মাকামে পৌঁছলাম যেখানে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর অস্তিত্ব দেখলাম না; বরং সবকিছুর মাঝেই কেবল আল্লাহকে দেখলাম।”
১০. মহান আল্লাহ সম্পর্কে আমি যা জেনেছি তা অনেক; কিন্তু যা জানতে পারিনি তা আরও বেশি।
১১. আমি তোমাদের কাছে আমার নিজের হাল বা কার্যাবলি সম্পর্কে কোনো খবর দিচ্ছি না; বরং আমি তোমাদের মহান আল্লাহর পবিত্রতা, তাঁর রহমত এবং তাঁর প্রেমিকদের সম্পর্কে খবর দিচ্ছি। কেননা এই দুটি হলো উত্তাল সমুদ্র, যার ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে এবং যেখানে একের পর এক সাধনার তরী ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
১২. আমি সত্তর বছর জীবন অতিবাহিত করেছি, এর মধ্যে শরীয়তের পরিপন্থী একটি সেজদাও দেইনি এবং নিজের নফসের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী একটি শ্বাসও গ্রহণ করিনি।
১৩. একবার তিনি তাঁর সাথির জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি হজরত খিজির (আ.)-এর সান্নিধ্য চাও?’ একজন উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ।’ শায়খ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার বয়স কত?’ সে বলল, ‘ষাট বছর।’ শায়খ তখন বললেন, ‘নতুন করে জীবন ও বন্দেগি শুরু করো। আল্লাহ তোমাকে সৃষ্টি করেছেন; অথচ তুমি খিজিরের সঙ্গ খুঁজছো! আমি যখন থেকে আল্লাহর সান্নিধ্য পেয়েছি, তখন থেকে খিজিরের সঙ্গও আমার কাছে আল্লাহর সান্নিধ্যে রূপ নিয়েছে। আমার অন্তরে এখন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সঙ্গ লাভের আকাঙ্ক্ষা অবশিষ্ট নেই।”
১৪. কেয়ামতের দিন আল্লাহ যদি আমাকে বলেন, আমার বান্দাদের জন্য সুপারিশ করো; তবে আমি বলব, হে আমার ইলাহি, এই বান্দারা আপনারই বান্দা এবং সমস্ত রহমতও আপনারই। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আপনি তাদের প্রতি আমার চেয়েও অনেক বেশি দয়ালু এবং অধিক করুণাময়।
১৫. আমি যখন তাঁর স্থায়িত্বের দিকে তাকালাম, তিনি আমাকে আমার নশ্বরতা দেখালেন। আর যখন আমি আমার নশ্বরতার দিকে তাকালাম, তিনি আমাকে তাঁর স্থায়িত্বের দর্শন করালেন।
১৬. দিবা-রাত্রির চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আমার মাত্র একটিই শ্বাস (হৃদস্পন্দন); আর তা কেবল মহান ‘হক’ বা সত্যের (আল্লাহর) সাথেই মিশে থাকে।
১৭. আমি নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে নফসকে মারার জন্য নিজেকে পানিতে নিক্ষেপ করলাম, কিন্তু পানি আমাকে ডুবালো না। আগুনে নিক্ষেপ করলাম, আগুন আমাকে পুড়ালো না। এরপর মানুষ যা খায়, তা চার মাস দশ দিন বর্জন করলাম, তবুও আমি মরলাম না। অবশেষে আমি যখন ‘আজয’ বা চরম অক্ষমতার চৌকাঠে মাথা রাখলাম, তখন আমার ওপর বিজয়ের (আধ্যাত্মিক উন্মোচনের) দ্বারগুলো খুলে গেল এবং আমি এমন এক মাকামে পৌঁছলাম যা বর্ণনা করার শক্তি আমার নেই।
১৮. যে ব্যক্তি আধ্যাত্মিক শক্তি বা কারামত চায়, সে যেন একদিন খায় এবং তিন দিন না খেয়ে থাকে। তারপর একদিন খেয়ে চার দিন না খেয়ে থাকে। এভাবে পর্যায়ক্রমে চৌদ্দ দিন, চল্লিশ দিন, চার মাস এবং এক বছর পর্যন্ত না খেয়ে থাকার অভ্যাস করে। এরপর তার সামনে একটি কালো সাপ আবির্ভূত হবে, যার মুখে কিছু একটা থাকবে, যা সে ওই ব্যক্তির মুখে দেবে। এরপর তার আর কোনোদিন খাবারের প্রয়োজন হবে না।
১৯. আমি একবার দাঁড়িয়ে ছিলাম এবং ক্ষুধার তীব্রতায় আমার পেট শুকিয়ে গিয়েছিল। তখন সেই সাপটি তার মুখে কিছু একটা নিয়ে আমার কাছে এলো। আমি বললাম, হে ইলাহি, আমি কোনো মাধ্যমের (ওসিলা) সাহায্যে কিছু চাই না।’ অমনি আমি আমার পাকস্থলীতে কস্তুরীর চেয়ে সুঘ্রাণযুক্ত এবং মধুর চেয়ে মিষ্টি কিছু একটা অনুভব করলাম। তখন গায়েবি আওয়াজ এলো— “আমরা তোমার দগ্ধ কলিজা থেকেই তোমাকে পান করাব এবং তোমার পাকস্থলী থেকেই তোমাকে তৃপ্ত করব।”
২০. নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার সামনে (দুনিয়ার) এক বাজার উন্মোচিত করেছিলেন। সেখানে আমি অনেক কিছু দেখলাম, যার কিছু জানা, কিছু শোনা আর কিছু বলাবলি করা হয়। যখন আমি সেই বাজার ঘুরে দেখলাম, তখন আমার অন্তর থেকে দুনিয়ার সকল বাজারের প্রতি ভালোবাসা উঠে গেল।
২১. আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর রাস্তা অসংখ্য, যার কোনো গণনা নেই। আমি যে পথেই হাঁটতে চেয়েছি, দেখেছি সেখানে মানুষের অনেক ভিড়। তখন আমি আরজ করলাম— ইলাহি, আমি আপনার কাছে পৌঁছানোর এমন একটি পথ চাই যা অন্য কেউ মাড়ায়নি। তখন তিনি আমাকে ‘হুজুন’ বা দুঃখ-বেদনার পথ দেখালেন এবং বললেন: এই দুঃখ এক ভারী বোঝা, যা বহন করার শক্তি সাধারণ মানুষের নেই।
২২. আল্লাহ যখন একত্ববাদের জিকিরে আমার জবান খুলে দিলেন, তখন আমি দেখলাম আসমান ও জমিন আমার চারদিকে তওয়াফ করছে; অথচ সাধারণ মানুষ এ সম্পর্কে গাফেল (অচেতন)।
২৩. আমার অন্তরে গায়েবি আওয়াজ এলো— মানুষ আমার কাছে জান্নাত চায়, অথচ বাস্তবতা হলো তারা এখনো ‘ইমান’ নামক নেয়ামতের শুকরিয়াই আদায় করে শেষ করতে পারেনি।
২৪. নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ মানুষকে দুনিয়া ও আখেরাতে যা দিয়ে জীবিত রাখেন, তা থেকে আমাকে ৩০ দিন বিরত রেখেছিলেন। অর্থাৎ পার্থিব জীবনবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন। এরপর তিনি আমাকে এমন এক জীবন দিয়ে জীবিত করেছেন, যার পরে আর কোনো মৃত্যু নেই।
২৫. আমি দুনিয়াকে দুনিয়াদারদের জন্য এবং আখেরাতকে আখেরাতকামীদের জন্য ছেড়ে দিয়েছি; আর আমি এমন এক মাকামে উন্নীত হয়েছি, যা এই উভয় জগতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ ও মহান।
২৬. সাপ যেভাবে তার খোলস ত্যাগ করে বেরিয়ে আসে, আমিও ঠিক সেভাবেই নিজের আমিত্ব থেকে বেরিয়ে এসেছি।
২৭. আমি কোথাও স্থির হয়ে থাকি না, আবার (জাগতিকভাবে) মুসাফিরও নই; বরং আমি তো কেবল ‘তাওহিদ’ বা একত্ববাদের মাকামে সফর করছি।
২৮. আমি আরজ করলাম, ইলাহি, আপনার (পার্থিব) নেয়ামত নশ্বর, কিন্তু আমার নেয়ামত অবিনশ্বর। কারণ আমি আপনার নেয়ামত (সৃষ্টি), আর আপনি হলেন আমার নেয়ামত।
২৯. আমি ৪০টি কদম ফেলেছি; যার এক কদমেই আমি আরশ থেকে জমিনের গভীর পর্যন্ত অতিক্রম করেছি।
৩০. যদি জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব না-ও থাকত, তবুও আমি আপনার প্রেমিক হওয়া, আপনার ইবাদত করা এবং আপনার আদেশ পালনের যে অবস্থায় এখন আছি, ঠিক সেই অবস্থাতেই থাকতাম।
৩১. হে ইলাহি, আপনি আমাকে অস্তিত্ব দিয়েছেন এবং সৃষ্টি করেছেন; আপনি আমাকে কেবল আপনার জন্যই সৃষ্টি করেছেন, আর আমার মা-ও আমাকে কেবল আপনার জন্যই জন্ম দিয়েছেন। হে ইলাহি, আপনি আমাকে আপনার কোনো সৃষ্টির হাতে সোপর্দ করবেন না। কেননা তাদের কেউ রোজা ও নামাজ ভালোবাসে, কেউ হজ ও জিহাদ ভালোবাসে, আবার কেউ ইলম বা জ্ঞান ভালোবাসে। কিন্তু আমি কেবল আপনাকে চাই। আপনি আমাকে স্মরণ করুন; কেননা আমি কেবল আপনার জন্যই এই জীবনকে ভালোবাসি এবং আপনি ছাড়া অন্য কোনোকিছুকে ভালোবাসি না।
৩২. আমি দেখেছি দুনিয়ার সবকিছু পাওয়ার আগে তা খুঁজতে হয়; কিন্তু এই আধ্যাত্মিক জগতের বিষয়টি ভিন্ন; এখানে পাওয়ার বিষয়টি খোঁজার আগেই ঘটে যায়। অর্থাৎ আল্লাহর দয়া আগে আসে, তারপর বান্দা তাঁকে খোঁজে।
৩৩. ফেরেশতারা আকাশে ‘বাইতুল মামুর’ তওয়াফ করে, মানুষ জমিনে ‘কাবা’ তওয়াফ করে; আর প্রকৃত বীরপুরুষরা (আসহাবে ফুতুওয়াত) আল্লাহর একত্ববাদের কাবার চারপাশে তওয়াফ করে।
৩৪. আল্লাহ তায়ালা প্রেমিকদের অন্তরে যে মহব্বতের সুধা জমা করেছেন, সেখান থেকে যদি এক ফোঁটা পানিও ঝরে পড়ে, তবে সারা বিশ্ব প্লাবিত হয়ে যাবে। আর যদি প্রেমিকদের অন্তরে জ্বলতে থাকা শওক বা আকাঙ্ক্ষার আগুনের একটি শিখাও প্রকাশ পায়, তবে আরশ থেকে পাতাল পর্যন্ত সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।
৩৫. এই সমুদ্র— অর্থাৎ মারেফত বা একত্ববাদের সমুদ্র এমন নয়, যার গভীরতা পরিমাপ করা যায় কিংবা যার কিনারা দেখা যায়। কত নৌকা যে এখানে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে; অথচ কিনারায় পৌঁছাতে পারেনি! বরং কত মানুষ তো এই সমুদ্রে পৌঁছানোর আগেই কিনারায় ডুবে মরেছে!
৩৬. বান্দা থেকে তাওহিদের মূল কেন্দ্র পর্যন্ত এক হাজার মঞ্জিল বা স্তর রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম মঞ্জিলটি হলো ‘কারামত’ (অলৌকিক ক্ষমতা)। যদি কোনো হীনবল বান্দা এই কারামত দেখেই তাতে মজে যায় বা প্রতারিত হয়, তবে সে আর বাকি উচ্চতর মাকামগুলোতে পৌঁছাতে পারে না।
৩৭. আল্লাহর এমন কিছু মহান পুরুষ আছেন, যদি পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত বিস্তৃত আসমান ও জমিন তাঁদের সিনা বা হৃদয়ের এক কোণে রাখা হয়, তবে তাঁরা তার অস্তিত্বই টের পাবেন না। অর্থাৎ তাঁদের অন্তরের জগত এতোই বিশাল।
৩৮. বিচক্ষণ ব্যক্তিরা আল্লাহকে দেখেন হৃদয়ের আলো দিয়ে, প্রেমিকেরা দেখেন ইয়াকিন বা দৃঢ় বিশ্বাসের আলো দিয়ে, আর কামেল পুরুষেরা দেখেন সরাসরি সাক্ষাতের (মুআয়ানা) আলো দিয়ে।
৩৯. কামেল পুরুষদের সাধনা হয় চল্লিশ বছর ব্যাপী; এর মধ্যে দশ বছর জিহ্বাকে সংশোধন করার জন্য, দশ বছর অন্তরকে জাগতিক পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করার জন্য, দশ বছর রুহকে কলুষমুক্ত করার জন্য এবং শেষ দশ বছর ‘সির’ বা আধ্যাত্মিক রহস্যকে উজ্জ্বল করার জন্য। এই সময়কাল পূর্ণ হলেই কেবল মানুষের ভেতর থেকে কুপ্রবৃত্তি বা নফস বিদায় নিতে পারে।
৪০. একজন মানুষের মারেফতের চূড়ান্ত পর্যায় হলো নিজেকে সেভাবে জানা যেভাবে আল্লাহ তাকে জানেন।
৪১. কামেল পুরুষদের এমন এক দুঃখ আছে, যা দুনিয়া ও আখেরাতেও ধরবে না। কারণ তাঁরা আল্লাহকে তাঁর শান অনুযায়ী স্মরণ করতে চান; কিন্তু মানুষ হিসেবে সীমাবদ্ধতার কারণে তা পুরোপুরি পারেন না; এই অপূর্ণতার আক্ষেপ থেকেই তাঁদের দীর্ঘস্থায়ী দুঃখের জন্ম হয়।
৪২. বান্দা যখন আল্লাহর মহব্বতে তৃষ্ণার্ত হয়, তখন তাকে আসমান ও জমিনের সমস্ত সম্পদ দিলেও তার সেই তৃষ্ণা মিটবে না এবং সে পরিতৃপ্ত হবে না।
৪৩. যে ব্যক্তি আল্লাহর শওক বা আকাঙ্ক্ষার আগুনে দগ্ধ হয়ে ছাই হয়ে যায়, অতঃপর মহব্বতের বাতাস সেই ছাই উড়িয়ে আসমান-জমিনময় ছড়িয়ে দেয়; সেই ব্যক্তি যদি (পরম সত্যকে) শুনতে চায় তবে সেখানেই শুনতে পায়, দেখতে চাইলে সেখানেই দেখে এবং স্বাদ আস্বাদন করতে চাইলে সেখানেই তা পায়।
৪৪. একজন আরেফ বা আধ্যাত্মিক জ্ঞানীর উচিত প্রথম কদমে ‘আল্লাহ’ বলা এবং তাঁকে চেনা; দ্বিতীয় কদমে ‘আগুন’ (অর্থাৎ বিরহ) অনুভব করা এবং তৃতীয় কদমে ‘দহন’ (অর্থাৎ আল্লাহর প্রেমে সম্পূর্ণ বিলীন হওয়া) প্রত্যক্ষ করা।
৪৫. যদি কেউ প্রশ্ন করে—নশ্বর মানুষ কীভাবে অবিনশ্বর সত্তাকে দেখবে? তবে আমরা বলব, ‘নশ্বর মানুষ এই নশ্বর জগতেই অবিনশ্বর সত্তাকে চিনতে পারে। অতঃপর তার সেই চেনা বা মারেফত পরকালে ‘বাকা’ বা স্থায়িত্ব লাভ করে। ফলে সে পরকালে অবিনশ্বর সত্তাকে সেই অবিনশ্বর নুরের সাহায্যেই দেখতে পাবে।
৪৬. একজন মুরিদের ভালোবাসা তার শায়খ বা পীরের প্রতি যত শক্তিশালী হবে, তার মারেফত বা আধ্যাত্মিক জ্ঞানও তত বেশি পূর্ণাঙ্গ ও সমৃদ্ধ হবে।
৪৭. আমার আফসোস সেই লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য, যারা কুফরি ও মূর্খতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে এই দুনিয়া ত্যাগ করেছে; অথচ তারা ইমান ও মারেফতের (খোদা-পরিচয়) প্রকৃত স্বাদ সম্পর্কে কিছুই জানতে পারল না।১৬
কারামাত:
১. শায়খ আবুল হাসান একদিন তাঁর বাড়ির দেয়াল মেরামতের জন্য কাদা দিয়ে কাজ করছিলেন। তিনি দেয়ালের ওপর উঠে কাজ করার সময় তাঁর হাতের কোদালটি নিচে পড়ে গেল। ইবনে সিনা কোদালটি কুড়িয়ে দিতে এগিয়ে গেলেন, কিন্তু তিনি পৌঁছানোর আগেই কোদালটি নিজেনিজেই উপরে উঠে শায়খের হাতে পৌঁছে গেল। এটি দেখে ইবনে সিনা অবাক হলেন।
২. বাগদাদের খলিফার উজির ‘আবদুদ দৌলা’ কঠিন পেটের অসুখে আক্রান্ত হয়েছিলেন। চিকিৎসকরা তাঁর চিকিৎসা করতে ব্যর্থ হলেন। পরিশেষে শায়খ আবু হাসান (রহ.)-এর একজোড়া জুতো তাঁর পেটের ওপর বুলিয়ে দেওয়া হলো এবং আল্লাহ তায়ালা তাঁকে পূর্ণ সুস্থতা দান করলেন।১৭
তাঁর দৃষ্টিতে ইলমের স্তরভেদ:
তিনি বলেন, “জ্ঞানের একটি বাহ্যিক রূপ (জাহের) আছে। সেই বাহ্যিক রূপের আবার একটি বহির্ভাগ এবং একটি অভ্যন্তরীণ রূপ (বাতেন) আছে। আর সেই বাতেনের আবার এক গভীরতম বাতেন (বাতেনুল বাতেন) আছে। জ্ঞানের বাহ্যিক ও অতি-বাহ্যিক অংশ হলো তা-ই, যা আলেম সমাজ চর্চা করেন। আর বাতেন বা অভ্যন্তরীণ জ্ঞান হলো তা, যা কামেল পুরুষগণ (অলি-আল্লাহ) একে অপরের সাথে আলোচনা করেন। আর বাতেনুল বাতেন বা অতি-গোপন জ্ঞান হলো তা, যা কামেল পুরুষগণ সরাসরি মহান আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালার সাথে আলাপ করেন।”১৮
আধ্যাত্মিক সফরের পাঁচ স্তর:
হজরত আবুল হাসান খারকানি রহ. বলেন, “সফর পাঁচ প্রকার। প্রথমটি পায়ের সাহায্যে, দ্বিতীয়টি হৃদয়ের মাধ্যমে, তৃতীয়টি উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা হিম্মতের মাধ্যমে, চতুর্থটি সাক্ষাতের মাধ্যমে এবং পঞ্চমটি ‘ফানা’ বা আল্লাহর কুদরতে বিলীন হওয়ার মাধ্যমে।”১৯
বাণী-চিরন্তন:
১. আমি সুস্থতা ও প্রশান্তি খুঁজেছি, তা পেয়েছি নির্জনতায়। আর নিরাপত্তা খুঁজেছি, তা পেয়েছি নীরবতায়।
২. একজন আলেম যখন সকাল করেন, তখন তাঁর লক্ষ্য থাকে জ্ঞান বৃদ্ধি করা; একজন জাহিদ তথা দুনিয়াত্যাগী যখন সকাল করেন, তখন তাঁর লক্ষ্য থাকে জুহদ বৃদ্ধি করা। আর আবুল হাসান যখন সকাল করেন, তখন তাঁর সংকল্প থাকে কোনো একজন মুসলমানের হৃদয়ে আনন্দ পৌঁছে দেওয়া।
৩. আমি কখনো নিজেকে আলেম বা জাহিদ (পরহেজগার) বলি না; বরং আমি বলি— হে আল্লাহ, আপনি একক, আর আমি কেবল আপনার সৃষ্টি হিসেবে বিদ্যমান ছিলাম।
৪. একদিন আমি ফরজ নামাজের তাকবির দিতে চেয়েছি, অমনি আমার সামনে রিদওয়ান ফেরেশতাসহ সজ্জিত জান্নাত এবং মালেক ফেরেশতাসহ প্রজ্জ্বলিত জাহান্নাম পেশ করা হলো। আমি জান্নাতের দিকে ফিরেও তাকালাম না এবং জাহান্নাম দেখেও ভীত হলাম না; বরং আমার দৃষ্টি ছিল সেই সত্তার দিকে যেখানে জান্নাত বা জাহান্নাম কিছুই দৃশ্যমান নয়; অর্থাৎ কেবল আল্লাহর দিকে।
৫. আল্লাহর পথে অবিচল থাকাই হলো প্রকৃত বীরত্ব (ফুতুওয়াত)।
৬. মানুষের বেশে আল্লাহর এমন কিছু অলি আছেন, যাঁদের কেউ যদি আল্লাহর কাছে কিছু চান, তবে আসমান ও জমিনের অধিবাসীরা তাঁদের দোয়ার প্রভাবে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
৭. যার মনে এমন কোনো চিন্তার উদ্রেক হয় যার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা প্রয়োজন, সেই ব্যক্তির উচিত তার জন্য কান্না করা, অর্থাৎ কৃত অপরাধের অনুশোচনায় ব্যথিত হওয়া।
৮. নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে অলি-আল্লাহদের আধ্যাত্মিক রহস্যসমূহ গোপন রাখেন।
৯. আল্লাহ তায়ালার আদেশ-নিষেধের প্রতি অত্যধিক সম্মান প্রদর্শন করা— অধিক জ্ঞানার্জন, জুহদ এবং অনেক ইবাদত করার চেয়েও উত্তম।
১০. জমিনের বুকে সর্বদা আল্লাহর এমন বান্দা থাকেন, তিনি যখন আল্লাহর জিকির করেন, তখন তাঁর ভয়ে সিংহরা মূত্রত্যাগ করে, সমুদ্রের মাছসমূহ এবং আসমান-জমিনের ফেরেশতারা নিথর হয়ে যায় এবং তাঁর জিকিরের নুরে সারা বিশ্ব আলোকিত হয়ে ওঠে।
১১. তিনটি স্থানে ফেরেশতারা আউলিয়াদের দেখে প্রভাবান্বিত ও ভীত হন। ক. মৃত্যুর সময় মালাকুল মউত; খ. আমলনামা লেখার সময় কেরামান-কাতেবিন; গ. কবরে সওয়াল-জওয়াবের সময় মুনকার ও নাকির।
১২. যখন আমি দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত হলাম যে, আমার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর হাতে, তখন আমি তালাশ করা ছেড়ে দিলাম। আর যখন আমি মানুষের অক্ষমতা সম্পর্কে জানতে পারলাম, তখন তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে একমাত্র আল্লাহর মুখাপেক্ষী হলাম।
১৩. বান্দার অবস্থা এমন হওয়া উচিত, যেন গুনাহ না থাকার কারণে ফেরেশতা তার কাছ থেকে ফিরে যায় এবং আমলনামায় মন্দ কিছু লেখার সুযোগ না পায়; অথবা তার আধ্যাত্মিক মাকাম এমন হওয়া উচিত, যেন সে ফেরেশতার কাছ থেকে নিজের আমলনামা নিয়ে নেয় এবং সেখান থেকে যা খুশি মুছে ফেলে আর যা খুশি রেখে দেয়। অর্থাৎ আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর নেক আমল এত বেশি হয়; যা সব মন্দকে মিটিয়ে দেয়।
১৪. তোমরা মহান আল্লাহর সাহচর্য অবলম্বন করো, সৃষ্টির সাহচর্য নয়। কারণ একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাই এমন সত্তা যাঁর অন্বেষণ করা উচিত, যাঁকে নিয়ে এবং যাঁর সাথে কথা বলা উচিত, যাঁর কালাম (কুরআন) শ্রবণ করা উচিত, যাঁর দিকে পথনির্দেশ করা উচিত এবং কেবল যাঁর নিকটই অভিযোগ ও ফরিয়াদ পেশ করা উচিত।
১৫. প্রত্যেকেই নিজ বিদ্যা নিয়ে অহংকারে মগ্ন। কিন্তু যখন কেউ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে সে বুঝতে পারে যে, আসলে সে কিছুই জানে না, তখন সে জ্ঞান ও মারেফতের দাবি করতে লজ্জা পায়। আর ঠিক তখনই তার মারেফত বা জ্ঞান পূর্ণতা লাভ করে।
১৬. মানুষ যতক্ষণ দুনিয়ার আকাঙ্ক্ষা করে, ততক্ষণ দুনিয়া তার ওপর শাসন চালায়। আর যখনই সে দুনিয়া ত্যাগ করে, তখন সে নিজেই দুনিয়ার ওপর শাসকে পরিণত হয়।
১৭. আল্লাহ যেভাবে সময়ের আগে তোমার কাছে নামাজ দাবি করেন না, ঠিক তেমনি তুমিও সময়ের আগে আল্লাহর কাছে রিজিকের জন্য হাহাকার করো না।
১৮. প্রকৃত পুরুষত্ব হলো একটি সমুদ্র, যেখান থেকে তিনটি ঝরনা প্রবাহিত হয়: প্রথমটি হলো দানশীলতা, দ্বিতীয়টি সৃষ্টির প্রতি মমতা, আর তৃতীয়টি হলো সর্বাবস্থায় আল্লাহর মুখাপেক্ষী হওয়া এবং আল্লাহর মাধ্যমে সৃষ্টির পরোয়া না করা।
১৯. আমরা এক কাফেলার যাত্রী; যার অগ্রভাগে রয়েছেন মুহাম্মদ মুস্তফা (ﷺ), তাঁর পেছনে রয়েছেন সাহাবায়ে কেরাম, আর আমরা রয়েছি তাঁদের পেছনে। ধন্য সেই ব্যক্তি, যে এই কাফেলার অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছে।
২০. যে হৃদয়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো স্থান রয়েছে, হোক তা ইবাদতের গৌরব; সেই হৃদয় মৃত।
২১. আল্লাহ এবং সৃষ্টির মাঝে ‘নফস’ বা প্রবৃত্তি ছাড়া আর কোনো পর্দা নেই। স্বয়ং অলি-আল্লাহগণ এই নফসের ব্যাপারে অভিযোগ করেছেন, এমনকি নবীগণও (আ.) এর ফিতনা থেকে পানাহ চেয়েছেন।
২২. দ্বীনের মধ্যে শয়তানের পক্ষ থেকে তেমন বড়ো কোনো ফিতনা নেই; বরং দ্বীনের জন্য বড়ো ফিতনা বা বিপর্যয় আসে দুই ধরনের লোকের মাধ্যমে। এক. সেই আলেম যে দুনিয়ার প্রতি লোভী। দুই. সেই জাহিদ (সাধক) যার কাছে পর্যাপ্ত দ্বীনি জ্ঞান নেই।
২৩. সর্বোত্তম আমল হলো আল্লাহ তায়ালার জিকির, তাকওয়া, দানশীলতা এবং নেককার বা সালেহিনদের সাহচর্য।
২৪. উপকারী ইলম বা জ্ঞান হলো তা; যা অনুযায়ী আমল করা হয়। আর সর্বোত্তম আমল হলো আল্লাহর নির্ধারিত ফরজ ইবাদতসমূহ।
২৫. মোজাহাদা তিন প্রকার। নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ এনে আনুগত্য করা, জিহ্বায় জিকির করা এবং হৃদয়ে আল্লাহর ধ্যান বা ফিকির করা।
২৬. সমস্ত সৃষ্টি এমন আমল করার চেষ্টা করে, যা কেয়ামতের দিন তাদের উপকারে আসবে; অথচ আল্লাহর কাছে বান্দার পক্ষ থেকে নিজের অক্ষমতা ও দৈন্য প্রকাশের চেয়ে অধিক উপকারী আর কোনো আমল নেই।
২৭. আল্লাহ তায়ালা যাকে ভালোবাসেন, তার জন্য নিজের দিকে আসার পথ প্রশস্ত করে দেন এবং সেই পথকে তার জন্য সংক্ষিপ্ত করে দেন।
২৮. কামেল পুরুষদের খাদ্য এবং পানীয় হলো মহান আল্লাহর মহব্বত বা ভালোবাসা।
২৯. তোমার জিহ্বাকে এমনভাবে মোহরবদ্ধ করো, যাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জিকির না আসে; তোমার হৃদয়কে এমনভাবে আগলে রাখো যাতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভালো না বাসে। ঠিক তেমনি মুখ ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকেও সংযত করো, যাতে হালাল ছাড়া কিছু না খাও এবং ইখলাস ছাড়া কোনো আমল না করো।
৩০. প্রকৃত সুফি হলো সে, যার দেহ কামনা-বাসনায় মৃত, হৃদয় আল্লাহর প্রেমে বিলীন এবং নফস বা প্রবৃত্তি রিয়াজতের আগুনে দগ্ধ।
৩১. যে কাজ তুমি আল্লাহর জন্য করো, তা-ই ইখলাস; আর যা সৃষ্টিকে দেখানোর জন্য করো তা-ই রিয়া বা লোকদেখানো আমল।
৩২. বান্দার এমন হওয়া উচিত, যেন সফরের ক্লান্তিতে তার পা ফুলে যায়, নীরবতার সাধনায় তার শরীর নিস্তেজ হয় এবং চিন্তার গভীরে তার অন্তর ব্যাকুল থাকে।
৩৩. আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ হলো প্রেমিকদের জন্য, আর তাঁর সাধারণ রহমত হলো পাপীদের জন্য।
৩৪. যে ব্যক্তি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো মুমিনকে কষ্ট দেয় না, সে যেন স্বয়ং নবী করীম ﷺ-এর সাহচর্য লাভ করল। আর যদি কেউ কোনো মুমিনকে কষ্ট দেয়, তবে সেই দিনের কোনো ইবাদতই কবুল হবে না।
৩৫. আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাকে যা কিছু দান করেছেন, তার মধ্যে একটি পরিচ্ছন্ন অন্তর এবং একটি সত্যবাদী জিহ্বার চেয়ে উত্তম আর কিছু নেই।
৩৬. তিন শ্রেণীর লোক আল্লাহর পথের যাত্রী। এক. জ্ঞানান্বেষী (আলেম), যার সাথে কলম ও কালির দোয়াত থাকে; দুই. সাধক, যার সাথে তালি দেওয়া পোশাক ও জায়নামাজ থাকে; তিন. সেই মেহনতি মানুষ, যে নিজ হাতে কাজ করে নিজের ও পরিবারের ভরণপোষণ চালায়। মনে রেখো, অলস বসে থাকা এবং কোনো কাজে লিপ্ত না হওয়া নফসের জন্য ধ্বংসাত্মক।
৩৭. আমার কোনো মুরিদ বা ছাত্র নেই; কারণে আমি পীর বা পথপ্রদর্শক হওয়ার দাবি করি না। আমি কেবল বলি— আমার জন্য আমার আল্লাহই যথেষ্ট।
৩৮. যদি তুমি সারা জীবনে একবারও আল্লাহ তায়ালার নাফরমানি করো, তবে তোমার উচিত সারা জীবন সেই গুনাহের জন্য ক্রন্দন করা। এমনকি আল্লাহ যদি তোমাকে ক্ষমাও করে দেন, তবুও তাঁর দরবারে তোমার সেই বাড়াবাড়ি বা অবহেলার জন্য যে আক্ষেপ বা দীর্ঘশ্বাস, তা তোমার হৃদয়ে অনন্তকাল থেকে যাওয়া উচিত।
৩৯. সৃষ্টির ইবাদত বা আনুগত্য তিনটি জিনিসের ওপর দাঁড়িয়ে। নফস, অন্তর এবং জিহ্বা দ্বারা সর্বদা আল্লাহর স্মরণে লিপ্ত থাকা। যে ব্যক্তি এই তিনটির মাধ্যমে আল্লাহর কাজে মগ্ন থাকে, সে মৃত্যুপরবর্তী জীবনে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
৪০. আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো ফয়সালা করেন এবং বান্দা তাতে সন্তুষ্ট থাকে, তখন সেই সন্তুষ্টি বান্দার জন্য এমন লক্ষ লক্ষ আমলের চেয়েও উত্তম, যাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি নেই।
৪১. দুনিয়াতে কারো সাথে শত্রুতা বা বিবাদ থাকার চেয়ে কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক আর কিছু নেই।
৪২. যে ব্যক্তি সারা রাত ঘুমানোর এবং সারা দিন খাওয়ার ইচ্ছা রাখে, সে তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছাবে কবে?”
৪৩. আলেম তার ইলম নিয়ে ব্যস্ত, জাহেল তার মূর্খতা নিয়ে, জাহিদ তার সংসারবিরাগ নিয়ে এবং আবেদ তার ইবাদত নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু আরেফ (আল্লাহকে যিনি চিনেন) ব্যস্ত থাকেন নিজের নফসের পবিত্রতা নিয়ে, যার মাধ্যমে সে আল্লাহর নৈকট্য পায়। কারণ, আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি কেবল পবিত্রতাকেই পছন্দ করেন।
৪৪. যখন তুমি তোমার মানবীয় আমিত্ব বা নফসের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসবে, তখনই তোমার প্রকৃত জীবন আল্লাহর সাথে শুরু হবে।
৪৫. আলেমগণ কুরআনের তাফসির নিয়ে মগ্ন থাকেন, আর আরেফগণ (আধ্যাত্মিক জ্ঞানী) মগ্ন থাকেন নিজের নফস ও নিজ আধ্যাত্মিক অবস্থার ব্যাখ্যা ও সংশোধনে।
৪৬. সমস্ত নবী ও অলিগণ এই দুনিয়ায় আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন আল্লাহকে তাঁর যথাযথ হক অনুযায়ী চেনার জন্য, কিন্তু কেউ-ই তাঁর সত্তাকে পরিপূর্ণভাবে জানার দাবি করতে পারেননি। মহান সেই সত্তা, যিনি তাঁর পরিচয় লাভের একমাত্র পথ রেখেছেন তাঁর পরিচয় লাভে নিজের অক্ষমতা স্বীকার করার মধ্যে।
৪৭. তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘উবুদিয়্যাত বা দাসত্ব কী?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর ইচ্ছার সামনে নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দেওয়া।’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘তাওয়াক্কুল কী?’ তিনি বললেন, ‘হিংস্র বাঘ, বিষধর সাপ, লেলিহান আগুন কিংবা উত্তাল সমুদ্র— কোনো কিছুকেই ভয় না পাওয়া (অর্থাৎ কেবল আল্লাহকেই ভয় করা)।’ ২০
অন্তিম অসিয়ত:
বর্ণিত আছে যে, যখন তাঁর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলো, তখন তিনি তাঁর সাথিদের অছিয়ত করলেন যেন তাঁর কবর তিরিশ গজ গভীর করে খনন করা হয়। তিনি এর কারণ হিসেবে বললেন, ‘আমাদের খারকানের ভূমি বাসতামের ভূমির চেয়ে উঁচুতে অবস্থিত। আর আদব হলো— হজরত বায়েজিদ বোসতামী (রহ.)-এর মাজার যেন আমার কবরের চেয়ে নিচে না থাকে। অতঃপর তাঁর সাথিরা তাঁর সেই আদেশ পালন করলেন।
তাঁকে দাফন করার পর মানুষ তাঁর কবরের পাশে একটি সিংহকে পাহারারত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। পরের দিন তারা দেখল যে, তাঁর কবরের ওপর একটি বিশাল পাথর রাখা হয়েছে এবং সেই পাথরের ওপর সিংহের পায়ের ছাপ অঙ্কিত রয়েছে। তখন তারা বুঝতে পারল যে, এটি সেই সিংহেরই কাজ ছিল। অর্থাৎ আল্লাহর কুদরতে সিংহটি সেই পাথরটি কবরের ওপর স্থাপন করেছে।২১
ইন্তেকাল ও ইন্তেকাল পরবর্তী ঘটনা:
তিনি ৪২৫ হিজরি (১০৩৩ খ্রিষ্টাব্দ) সনের আশুরার দিনে খারকানে ইন্তেকাল করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল তিয়াত্তর বছর।২২ বলা হয় যে, এটি একটি পরীক্ষিত বিষয়, যে ব্যক্তি তাঁর মাজার জিয়ারত করে এবং মহান আল্লাহর কাছে কোনো হাজত পেশ করে, আল্লাহ তায়ালা তা পূরণ করে দেন।
জনৈক নেককার ব্যক্তি স্বপ্নে আবুল হাসান (রহ.)-কে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহ আপনার সাথে কী আচরণ করেছেন?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তায়ালা আমার ডান হাতে আমলনামা তুলে দিলেন। তখন আমি বললাম— ‘হে ইলাহি, এই আমলনামা দিয়ে আপনি আমাকে আপনার থেকে দূরে সরিয়ে রাখবেন না। কারণ, আমার অস্তিত্বের আগে এবং এই আমলনামায় যা লেখা আছে তা করার আগেই আপনি সব জানতেন। আর আমি আমার অভাব ও অক্ষমতা সত্ত্বেও জানি আমার থেকে কী কী প্রকাশ পেয়েছে। তাই আপনার করমের কাছে আমার আরজি— আপনি এই আমলনামা সম্মানিত ফেরেশতাদের কাছে দিয়ে দিন এবং আমাকে এক মুহূর্তের জন্য আপনার মহান সৌন্দর্য (জামাল) অবলোকন করার অনুমতি দিন।’
শায়খ মুহাম্মদ বিন হুসাইন (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একবার আমি কঠিন অসুস্থ হয়ে পড়লাম। মরণকালে আমার পরিণতি কী হবে এই ভয়ে আমি প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা ও শোকে নিমজ্জিত ছিলাম। তখন শায়খ আবুল হাসান (রহ.) আমাকে দেখতে এলেন এবং বললেন, ‘তুমি কি মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছ?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ‘ভয় পেয়ো না; আমি তোমার আগে মারা গেলে তোমার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হব এবং আল্লাহর কাছে তোমার কষ্ট লাঘবের দোয়া করব।’ এরপর আমি সুস্থ হয়ে উঠলাম এবং এর কিছুদিন পর শায়খ আবুল হাসান (রহ.) ইন্তেকাল করলেন।’
দীর্ঘদিন পর যখন শায়খ মুহাম্মদ বিন হুসাইন (রহ.)-এর মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হলো, তখন তাঁর পুত্র বর্ণনা করেন, “আমি আমার পিতার অন্তিম সময়ে তাঁর পাশে ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম তিনি সজোরে উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম, ভেতরে আসুন।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আব্বাজান, আপনি কাকে দেখছেন?’ তিনি বললেন, ‘শায়খ আবুল হাসান খারকানি (রহ.)-কে। তিনি অনেকদিন আগে আমাকে কথা দিয়েছিলেন যে, আমার মৃত্যুর সময় তিনি উপস্থিত হবেন। আজ তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন; আমার মৃত্যুভয় দূর করতে তিনি আল্লাহর একদল অলিকে সাথে নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন।’ এ কথা বলেই তিনি জান্নাতি রুহ সমর্পণ করলেন।” ২৩