সুফিদের ইতিহাসে হজরত আবু আবদুল্লাহ আল-মাগরিবি রহমাতুল্লাহি আলাইহি এক উজ্জ্বল ও বরকতময় নাম। আধ্যাত্মিক সাধনা, গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং দীর্ঘ মুজাহাদার জীবনের জন্য তিনি সুফি পরিমণ্ডলে বিশেষভাবে সমাদৃত। বলা হয়ে থাকে তিনি আল্লাহর পথে এমন এক নির্জন পরিভ্রমণকারী ছিলেন, যাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল জিকির, ধ্যান, আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল এবং দুনিয়াবিমুখ রুহানী সৌন্দর্য।

নাম ও পরিচয়:

তিনি আবু আবদুল্লাহ আল-মাগরিবি নামে পরিচিত হলেও তাঁর নাম ছিল মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল। তিনি ছিলেন ইবরাহিম আল-খাওয়াস ও ইবরাহিম ইবনে শাইবান— এই দুইজনের শিক্ষক। তিনি প্রখ্যাত সুফি আলী ইবনু রজিন (রহ.)-এর সোহবত লাভ করেছেন।১

তাঁর জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:

তিনি বলেছেন, “যে দরবেশ দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, যদিও সে অধিক নফল ইবাদত না করে; তবুও তার একটি কণা (সত্যিকার আল্লাহমুখী অবস্থা) ঐসব পরিশ্রমী ইবাদতকারীদের চেয়ে উত্তম, যাদের সাথে দুনিয়া লেগে আছে। আমি দুনিয়ার চেয়ে বেশি ন্যায়পরায়ণ কিছু দেখিনি। তুমি যদি তার খেদমত করো, সে তোমার খেদমত করবে; আর তুমি যদি তাকে ত্যাগ করো, সে-ও তোমাকে ত্যাগ করবে।”২

তাঁর রিয়াজত:

তিনি ছিলেন বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। দীর্ঘ বহু বছর তিনি এমন কিছুই আহার করেননি, যাতে মানুষের হাতের স্পর্শ লেগেছে। তিনি শুধু ঘাসজাতীয় কিছু শেকড় ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদ আহার করতেন, যা খাওয়া তার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল।৩

তাঁর সুফি-সত্তা :

আবু আবদুল্লাহ (রহ.) বলেছেন, “আমি যখন এই বিশেষ দলের (সুফিদের) অবস্থার গভীরতা বুঝতে পারলাম, তখনই আমি (আত্মিকভাবে) পুড়ে গেলাম এবং এই উপলব্ধিই আমাকে গ্রাস করল।”৪

তাঁর আধ্যাত্মিক অবস্থা:

ইবনু হাবিব বলেন, আমাদের ইবনু আবি সাদিক সংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের ইবনু বাকুইয়াহ সংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি আবু বকর আল-জাওযাকানিকে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন, আমি ইবরাহিম ইবনে শাইবানকে বলতে শুনেছি, “আবু আব্দুল্লাহ আল-মাগরিবি (রহ.) তাঁর সাথিদের সাথে বসতেন এবং তাদের উপদেশ দিতেন। আমি তাঁকে কখনো বিচলিত হতে দেখিনি, শুধু একদিন ছাড়া।

আমরা তখন তুর পাহাড়ে ছিলাম। তিনি এক খুরনুব গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসেছিলেন এবং আমাদের সাথে কথা বলছিলেন। কথার মাঝে তিনি হঠাৎ বললেন, “বান্দা কখনো তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না; যতক্ষণ না সে এককভাবে, এক আল্লাহর জন্য নিজেকে একান্ত করে দেয়।” এই কথা বলেই তিনি প্রবলভাবে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন, শরীরে কম্পন দেখা দিল। আমি দেখলাম চারপাশের পাথরগুলো পর্যন্ত কেঁপে উঠেছে ও ধসে পড়ছে।

এই অবস্থায় তিনি কিছুক্ষণ রইলেন। যখন তিনি স্বাভাবিক হলেন, তখন মনে হলো যেন তিনি নতুন করে কবর থেকে উত্থিত হয়েছেন।”৫

তাঁর আধ্যাত্মিক কবিতা:

আবুল ফারাজ আল-ওয়ারসানী বলেন, আমাকে আবু আলী আল-মাওসিলী আবু আবদুল্লাহ আল-মাগরিবির (রহ.) এই কবিতাটি শুনিয়েছেন—

يَا من يعد الْوِصَال ذَنبا … كَيفَ اعتذاري ولي ذنُوب

“হে প্রিয়তম, আপনি যদি মিলনকেই পাপ মনে করেন,

তবে আমার ক্ষমা প্রার্থনার অবস্থা কেমন হবে, যখন আমার এত পাপ!”

إِن كَانَ ذَنبي إِلَيْك حبي … فإنني مِنْهُ لَا أَتُوب

“যদি আপনাকে ভালোবাসা আপনার নিকট আমার পাপ হিসেবে গণ্য হয়

তবে জানুন, এ ভালোবাসা থেকে আমি কখনো তওবা করব না।”৬

আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত বান্দাদের তিন অবস্থা:

আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনু আহমদ ইবনু দিনার আদ-দিনুরি বলেন, আমি ইবরাহিম ইবনে শাইবানকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি আবু আবদুল্লাহ আল-মাগরিবিকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহমতপ্রাপ্ত বান্দারা তিন অবস্থানে থাকে—

১. একদলকে আল্লাহ বিপদ বা পরীক্ষা থেকে বাঁচিয়ে রাখেন, যাতে তাদের ধৈর্য দুর্বল হয়ে গিয়ে আল্লাহর হুকুমকে অপছন্দ না করে ফেলে। অথবা তাঁর সিদ্ধান্ত সম্পর্কে মনে কোনো সংকীর্ণতা না আসে।

২. একদলকে আল্লাহ পাপাচারীদের সাহচর্য থেকে দূরে রাখেন, যাতে তাদের হৃদয় দুঃখে ভারাক্রান্ত না হয় এবং এজন্য তাদের অন্তর সমগ্র জগৎ সম্পর্কে সৎ ও সুস্থ থাকে।

৩. আর একদলের উপর আল্লাহ বিপদকে প্রবলভাবে বর্ষণ করেন এবং তাঁরা ধৈর্যসহকারে তা বহন করেন ও আল্লাহ তাদের পছন্দ করেন। ফলে তারা পরীক্ষার মাধ্যমে আল্লাহর আরও কাছে আসে। আল্লাহর প্রতি তাদের ভালোবাসা বাড়ে এবং তাঁর সিদ্ধান্তে তারা আরও বেশি সন্তুষ্ট হয়।

এ ছাড়াও আল্লাহর এমন কিছু বান্দা আছেন, যাদের তিনি বারবার নেয়ামত দান করেন; যাদের উপর তিনি অন্তরঙ্গ ও প্রকাশ্য উভয় জ্ঞান বিস্তৃত করেন; এবং যাদের স্মরণ ও মর্যাদা তিনি সুউচ্চ করে রাখেন।৭

সত্যিকারের আল্লাহর বান্দার পরিচয়:

আবু আবদুল্লাহ (রহ.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর বন্দেগির দাবি করে; অথচ তার নিজের ইচ্ছা এখনো তার মধ্যে অবশিষ্ট থাকে, সে তার দাবিতে মিথ্যাবাদী। সত্যিকারের বন্দেগি তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন মানুষ নিজের সব আকাঙ্ক্ষা মুছে ফেলে এবং পুরোপুরি তার প্রভুর ইচ্ছা অনুযায়ী দাঁড়ায়।

বান্দা সেই নামেই পরিচিত হবে, যে নামে তাকে ডাকা হবে এবং যে বিশেষণ দ্বারা তাকে অলংকৃত করা হবে। যখন তাকে ‘নামে’ ডাকা হয়, তখন সে কেবল দাসত্বের দাবিতেই সাড়া দেয়। সুতরাং তার নিজের কোনো নাম নেই, কোনো পরিচয়ের চিহ্নও নেই, সে শুধু তার প্রভুর দাসত্বের আহ্বানেই সাড়া দেয়। অন্যান্য কোনো নামে তাকে ডাকা হলে সে উত্তর দেয় না। শুধু যে তাকে তার প্রভুর দাসত্বের নাম ধরে ডাকবে, সে-ই তার জবাব পাবে।”

এ কথা বলার পর আবু আবদুল্লাহ (রহ.) কেঁদে ফেললেন, এবং বললেন—لَا تدعني إِلَّا بيا عَبدهَا فَإِنَّهَا أصدق أسمائي “আমাকে তুমি কেবল তাঁর ‘দাস’ বলে ডাকো, কারণ এটিই আমার সবচেয়ে সত্যনিষ্ঠ নাম।”৮

প্রকৃত সুফি দরবেশের পরিচয় ও মর্যাদা:

আবু আবদুল্লাহ (রহ.) বলেছেন, “সেই-ই প্রকৃত দরবেশ, যে এই সৃষ্টিজগতে কোনো ভরসা বা আশ্রয় খোঁজে না; শুধু তার রবের দিকে ফিরে যায়, যাঁর প্রতি সে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। তার রব-ই তাকে পরিপূর্ণ নির্ভরতার মাধ্যমে অভাবমুক্ত করেন, যেমন তিনি তাকে দরিদ্রতার মাধ্যমে মর্যাদাবান করেছেন।”

আবু আবদুল্লাহ (রহ.) আরও বলেছেন, “যে-সব দরবেশ আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট, তারা আল্লাহর জমিনে তাঁর বিশ্বস্ত আমানতদার এবং বান্দাদের প্রতি তাঁর পক্ষ থেকে দলিলস্বরূপ প্রমাণ। তাদের বরকতেই সৃষ্টিজগত থেকে বিপদ-আপদ দূর হয়।”৯

তাঁর বাণী ও নসিহত:

১. সর্বোত্তম আমল হলো সময়ের প্রতিটি ক্ষণকে আল্লাহর অনুকূল কাজে পূর্ণ করে রাখা।

২. সবচেয়ে লাঞ্ছিত মানুষ সে, যে দরিদ্র, অথচ ধনীর মন রক্ষা করতে গিয়ে তার কাছে নিজেকে ছোটো করে ফেলে। আর সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ সে, যে ধনী হওয়া সত্ত্বেও দরিদ্রের সামনে বিনয় প্রদর্শন করে এবং তার মর্যাদা রক্ষা করে।১০

ওফাত:

বলা হয় তিনি একশ বিশ বছর বেঁচেছিলেন এবং জাবাল তুর বা সিনাই পাহাড়ে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মাজারও সেখানে, তাঁর শিক্ষক আলী ইবনে রজিন (রহ.)-এর মাজারের পাশে অবস্থিত। তাঁর মৃত্যু-সন ২৭৯ হিজরি বলা হলেও ২৯৯ হিজরি-ই অধিক গ্রহণযোগ্য।১১