হজরত জুননুন আল-মিসরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি এমন এক আলোকিত নাম, যার জীবন ও চিন্তা তাসাউফের ইতিহাসে এক নবজাগরণের সূচনা ঘটিয়েছিল। তিনি ছিলেন জ্ঞানের দীপশিখা, ইরফানের মহাসমুদ্র, আল্লাহভক্তি ও আত্মশুদ্ধির জীবন্ত উদাহরণ। মিশরের নীলনদ তীরবর্তী ভূমি তাঁকে যেমন জন্ম দিয়েছিল, তেমনি ইসলামি আধ্যাত্মিকতার ইতিহাস তাঁকে অমর করে রেখেছে।

নাম ও পরিচয়:

তাঁর নাম সাওবান ইবনে ইব্রাহিম। আবার কেউ কেউ বলেন, তাঁর নাম ছিল ফায়য ইবনে আহমদ, এবং অন্য বর্ণনায় আছে ফায়য ইবনে ইব্রাহিম আন-নুবী আল-ইখমীমী। উপাধি ছিল আবুল ফাইজ, কেউ কেউ বলেন আবুল ফাইয়্যায। জন্মগ্রহণ করেন খলিফা আল-মানসুরের আমলের শেষ সময়ে। ১

ইলম অর্জন:

হজরত জুননুন আল-মিসরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইলম অর্জন করেছেন এবং হাদিস বর্ণনা করেছেন— ইমাম মালিক, আল-লাইস, ইবনে সা‘দ, ইবনে লহীআহ, ফুদ্বাইল ইবনে ইয়াদ্ব, সালম আল-খাওয়াস, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা এবং আরও একদল আলেমের কাছ থেকে।২

শাগরেদবৃন্দ:

তাঁর কাছ থেকে ইলম অর্জন ও হাদিস বর্ণনা করেছেন— আহমদ ইবন সাবিহ আল-ফাইয়ূমী, রাবিয়া ইবনু মুহাম্মদ আত-তাঈ, রিদওয়ান ইবনু মুহাইমিদ, হাসান ইবনে মুসআব, জুনায়েদ ইবনু মুহাম্মদ আয-যাহিদ, মিকদাম ইবনে দাউদ আর-রু‘আইনী এবং আরও অনেকে।৩

তাওবার ঘটনা:

ইউসুফ ইবনুল হুসাইন বলেন, ‘যখন আমি জুননুন আল-মিসরি (রহ.)-এঁর সঙ্গে সখ্যতা লাভ করলাম, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, হে শায়েখ, আপনার জীবনের শুরুটা কেমন ছিল?’ তিনি বললেন, ‘আমি যুবক বয়সে খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদে মত্ত ছিলাম, তারপর আমি তওবা করলাম এবং এসব ছেড়ে দিলাম। এরপর পবিত্র কাবা শরিফে হজ করার উদ্দেশ্যে বের হলাম। আমার সাথে সামান্য কিছু সম্পদও ছিল। আমি কিছু মিশরীয় ব্যবসায়ীর সাথে নৌকায় উঠলাম।

আমাদের সাথে একজন সুদর্শন যুবকও ছিল, যার চেহারা ঝলমল করছিল। যখন আমরা মাঝনদীতে পৌঁছলাম, তখন নৌকার মালিক একটি টাকার থলি হারালেন। তিনি নৌকা থামাতে এবং তাতে থাকা সকলের দেহ তল্লাশি করার নির্দেশ দিলেন, এতে সবাই খুব হয়রানি শিকার হয়। যখন তারা সেই যুবককে তল্লাশি করতে গেল, তখন সে নৌকা থেকে এক লাফে সমুদ্রের ঢেউয়ের উপর গিয়ে বসল। ঢেউগুলো তার জন্য যেন সিংহাসনের মতো উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। আমরা নৌকা থেকে তাকে দেখতে পাচ্ছিলাম।

সে বলল, ‘হে আমার মাওলা, এরা আমাকে সন্দেহ করছে। আর আমি আমার প্রাণের প্রিয়তমের কসম করে বলছি যে, তুমি এই স্থানের প্রতিটি জলজ প্রাণীকে আদেশ করো যেন তারা তাদের মুখের ভেতর রত্ন নিয়ে তাদের মাথা বের করে।’

তার কথা শেষ না হতেই আমরা দেখলাম যে, নৌকার সামনে সমুদ্রের জলজ প্রাণীরা তাদের মাথা বের করেছে, আর প্রত্যেকটির মুখে একটি করে দ্যুতিময় চকচকে রত্ন রয়েছে। এরপর সেই যুবক ঢেউ থেকে সমুদ্রে লাফিয়ে পড়ল এবং পানির উপর পায়ের ছাপ দিয়ে চলতে থাকলেন এবং বলতে লাগল— اِیَّاكَ نَعۡبُدُ وَ اِیَّاكَ نَسۡتَعِیۡنُ“আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি এবং শুধু তোমারই সাহায্য চাই।”এভাবে সে আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল।

এই ঘটনাই আমাকে দেশভ্রমণে বেশ উৎসাহিত করেছিল। তখন আমি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই কথাটি স্মরণ করলাম, “এই উম্মতের মধ্যে সর্বদা ত্রিশ জন এমন থাকবে, যাদের অন্তর ইবরাহিম খলিলুর রহমান (আলাইহিস-সালাম)—এঁর অন্তরের মতো। যখনই তাদের মধ্যে কেউ মারা যায়, আল্লাহ তার জায়গায় অন্য একজনকে স্থলাভিষিক্ত করেন।” (মুসনাদে আহমাদ ৫/৩২২)৪

রিয়াজত:

আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে খালাফ আল-মুয়াদ্দিব বলেছেন,“আমি জুননুন আল-মিসরীকে সমুদ্রের তীরে দেখেছি। রাত যখন গভীর হলো, তখন তিনি বাইরে বের হয়ে আকাশ ও সমুদ্রের দিকে তাকালেন এবং বললেন,‘সুবহানাল্লাহ, তোমাদের মহিমা কত মহান! কিন্তু তোমাদের সৃষ্টিকর্তার মহিমা তোমাদের চেয়ে অনেক মহান!’রাত যত গভীর হচ্ছিল, তিনি বারবার এই ছন্দপূর্ণ কবিতা উচ্চারণ করছিলেন—

“নিজেদের জন্য খুঁজুন… যেমন আমি পেয়েছি।

আমি আমার জন্য একটি বাসস্থান পেয়েছ… যার প্রতি কোনো আবেগ নেই।

যদি তুমি দূরে থাকো, আমি কাছে আসি, আর যদি কাছে থাকো, আমি দিগন্তে পৌঁছাই।”৫

যতক্ষণ না ভোরের আলো উঠল তিনি এটি আবৃত্তি করতে থাকলেন।

জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:

ইউসুফ ইবনুল হুসাইন বলেছেন, আমি হজরত জুননুন (রহ.)-কে বলতে শুনেছি,“আমার এক দরিদ্র বন্ধু ছিল। সে মারা গেল, আমি স্বপ্নে তাকে দেখলাম। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আল্লাহ তোমার সঙ্গে কেমন আচরণ করেছেন?’ সে বলল,‘আল্লাহ আমাকে বললেন, আমি তোমার অতীতের সেই দুঃখ-যাতনা ক্ষমা করে দিয়েছি, যখন তুমি এই নীচ দুনিয়ার সন্তানদের (ধনীদের) দরজায় এক টুকরো রুটির আশায় বারবার গিয়েছিলে। রুটি পাওয়ার আগেই আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম।”

আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনু আহমদ ইবন সাঈদ আর-রাজি বলেন— আমি আবুল ফদ্বল আব্বাস ইবনে হামযা থেকে শুনেছি, তিনি হজরত জুননুন আল-মিসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছেন,“আগে (সালাফ যুগে) তিনি জ্ঞানী মানুষ ছিলেন, যিনি জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে দুনিয়ার প্রতি বিতৃষ্ণা ও ত্যাগে অগ্রসর হতেন। আর আজকের দিনে মানুষ জ্ঞান অর্জন করে দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়ে। আগে মানুষ জ্ঞান অর্জন করত জীবনের সঠিক পথ জানার জন্য, আজ মানুষ জ্ঞানের মাধ্যমে জীবিকা ও সম্পদ অর্জন করছে। আগে জ্ঞানী ব্যক্তির অন্তর ও বাহিরে নুর ও উন্নতি দেখা যেত, আর আজ বহু শিক্ষিত মানুষের অন্তর ও বাহির উভয়েই দুর্নীতি ও অন্ধকারে নিমজ্জিত।”৬

মারিফত প্রাপ্তি:

সাঈদ ইবনে উসমান বলেন, আমি জুননুন আল-মিসরিকে বলতে শুনেছি, তিনি বলতেন,“হে আল্লাহ, যদি আমি তোমার দিকে প্রার্থনার হাত বাড়াই, তবুও তুমি বহুবার আমার অচেতন অবস্থাতেও আমাকে রক্ষা করেছো! আমি কি আমার হাতের করা কাজের কারণে তোমার প্রতি নিরাশ হব? আমার এটিই জন্য যথেষ্ট যে, তুমি আমার অবস্থা জানো, এটাই আমার সকল প্রার্থনার প্রতিস্থাপন।”

জুননুন আল-মিসরি বলতেন, “প্রত্যেক দাবিদার (যে বলে ‘আমি আল্লাহকে চিনেছি’, ‘আমি আল্লাহর প্রেমিক’) সে তার এই দাবির কারণেই পর্দার আড়ালে থাকে (আল্লাহর সাক্ষাৎ থেকে বঞ্চিত হয়)। কারণ হক (সত্য) নিজেই সত্যবাদীদের সাক্ষী। আর আল্লাহই হলেন ‘আল-হক্‌’। তাঁর বাক্যই সত্য, সুতরাং যাঁদের জন্য আল্লাহই সাক্ষী হয়ে যান, তাঁদের আর নিজেদের দাবি করার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু যারা আল্লাহ থেকে গায়েব, বিচ্ছিন্ন; তারাই দাবিদার হয়। প্রকৃতপক্ষে দাবি কেবল সেইসব পর্দাপ্রাপ্তদের কাছ থেকেই প্রকাশ পায়।”৭

আল্লাহর প্রেমে হজরত জুননুন আল-মিসরি রহমাতুল্লাহি আলাইহির কবিতা:

أَمُوتُ وَمَا انْبَثَّتْ إِلَيْكَ صَبَابَتِي

وَلَا قُضِيَتْ مِنْ صِدْقِ حُبِّكَ أَوْطَارِي

আমি মরে যাব,

তবুও আমার গভীর প্রেম তোমার দিকে পুরোপুরি পৌঁছাবে না;

তোমার প্রতি ভালোবাসার সত্য আকাঙ্ক্ষাও পরিপূর্ণ হবে না।

وَبَيْنَ ضُلُوعِي مِنْكَ مَالُكَ قَدْ بَدَا

وَلَمْ يُبْدِ بَادِيِهِ لِأَهْلٍ وَلَا جَارِ

আমার বক্ষের গভীরে তোমার জন্য যে সম্পদ রক্ষিত, তা প্রকাশিত,

কিন্তু তা আমার স্বজন বা প্রতিবেশীদের কাছে প্রকাশ পায়নি।

وَبِي مِنْكَ فِي الْأَحْشَاءِ دَاءٌ مُخَامِرٌ

فَقَدْ هَدَّ مِنِّي الرُّكْنَ وَانْبَثَّ إِسْرَارِي

তোমার ভালোবাসা আমার অন্তরে এমন গভীর ব্যাধি হয়ে আছে,

যা আমার শক্তি ক্ষয় করেছে, আমার গোপন রহস্য উন্মোচন করেছে।

أَلَسْتَ دَلِيلَ الرَّكْبِ إِذْ هُمْ تَحَيَّرُوا

وَمُنْقِذَ مَنْ أَشْفَى عَلَى جُرُفٍ هَارِ؟

তুমি কি সেই পথপ্রদর্শক নও, যখন কাফেলা বিভ্রান্ত হয়?

তুমি কি সেই উদ্ধারকর্তা নও, যিনি ধ্বংসের কিনারায় থাকা মানুষকে রক্ষা করো?

فَنَلْنِي بِعَفْوٍ مِنْكَ أَحْيَا بِقُرْبِهِ

وَغِثْنِي بِيُسْرٍ مِنْكَ يَطْرُدُ إِعْسَارِي

তোমার ক্ষমা আমাকে দান করো, যেন আমি তোমার নিকটে জীবিত থাকি,

তোমার সহজ অনুগ্রহে আমাকে সাহায্য করো, যা আমার দুঃখ-দারিদ্র্য দূর করবে।৮

হজরত জুননুন আল-মিসরী (রহ.)-এঁর মুনাজাত:

“হে আমার প্রভু, তোমার দিকে পৌঁছার একমাত্র মাধ্যম হলো তোমারই অগণিত অনুগ্রহসমূহ, আর তোমারই দয়া ও কল্যাণ আমার শাফাআতের মাধ্যম। হে আল্লাহ, জনসম্মুখে আমি তোমাকে ডাকি রাজাধিরাজ হিসেবে, আর নির্জনে তোমাকে ডাকি প্রিয়তম হিসেবে। সবার সামনে বলি, ‘হে আমার মাবুদ, আর একান্ত নির্জনে বলি, ‘হে আমার প্রিয়!’ আমি তোমার দিকে ফিরে চাই এবং সাক্ষ্য দিই যে, তুমিই আমার রব, তোমারই দিকে আমার প্রত্যাবর্তন। তুমি আমাকে তোমার রহমতের মাধ্যমে শুরু থেকেই অনুগ্রহ করেছ, যখন আমি কোনো উল্লেখযোগ্য অস্তিত্ব ছিলাম না।

তুমি আমাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছ, তারপর পিতার পিঠে অবস্থান দিয়েছ, তারপর মাতৃগর্ভে স্থানান্তর করেছ। তুমি তোমার অনুগ্রহে আমাকে এমন সময়ে জন্ম দাওনি, যখন কুফর বা অবিশ্বাসের রাজত্ব ছিল। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ মানববীজ থেকে, তারপর তিনটি অন্ধকারের (গর্ভের) ভেতর রাখলে— রক্ত, মাংস ও অন্তরের আবরণে। তুমি আমাকে নারী নয়, পুরুষরূপে সৃষ্টি করলে, তারপর পূর্ণাঙ্গ ও সুষমভাবে দুনিয়ায় প্রকাশ করলে।

তুমি আমাকে শৈশবে দোলনায় রক্ষা করলে, আমাকে দুধের মাধ্যমে পুষ্টি দিলে, আমাকে মাতাদের কোলের মমতা দিলে, তাদের হৃদয়ে আমার প্রতি স্নেহ ও করুণা স্থাপন করলে। তুমি আমাকে সর্বোত্তমভাবে প্রতিপালন করলে, চমৎকারভাবে পরিচালনা করলে, জিনদের কুমন্ত্রণার হাত থেকে রক্ষা করলে, মানুষের শয়তান থেকে নিরাপদ রাখলে। তুমি আমার দেহকে অতিরিক্ত কোনোকিছু থেকে রক্ষা করলে, যা বিকৃতি আনে, আর এমন কোনো ঘাটতি থেকেও বাঁচালে, যা ত্রুটি সৃষ্টি করে।

অতএব, তুমি মহান, হে আমার পরম করুণাময় প্রভু। যখন আমি কথা বলা শুরু করলাম, তুমি তখন আমার উপর অনুগ্রহের পূর্ণতা দান করলে। প্রতিবছর তুমি আমার দেহ-মন বৃদ্ধি করেছ, অতএব, তুমি মহান, হে মহিমা ও দয়ার অধিপতি! যখন তুমি আমাকে স্বাধীনতা দিলে, আমার দেহকে দৃঢ় করলে, আমার বুদ্ধিকে পরিপূর্ণ করলে, তুমি তখন আমার হৃদয় থেকে গাফিলতির পর্দা সরিয়ে দিলে। তুমি আমাকে তোমার সৃষ্টি-শিল্পের বিস্ময় নিয়ে চিন্তা করতে অনুপ্রাণিত করলে, তোমার নিদর্শনগুলো দেখালে, তোমার প্রেরিত নবীদের বার্তাগুলো চিনতে শেখালে।

তুমি আমাকে জীবিকার নানান রূপ ও ভোগ্যপণ্য দান করলে, তোমার আদি অনুগ্রহ ও করুণা দ্বারা আমাকে সম্মানিত করলে। তুমি আমাকে পূর্ণাঙ্গ করে সৃষ্টি করেছ এবং কেবল একটি নিয়ামত দিয়ে সন্তুষ্ট হওনি; বরং তোমার সকল নিয়ামত আমার উপর পরিপূর্ণ করলে, সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করলে।

তুমি আমাকে ভালো ও মন্দ চিনিয়ে দিলে, যাতে আমি মন্দ থেকে দূরে থাকি এবং তাকওয়া অর্জন করি। তুমি আমাকে সেই পথ দেখালে, যা তোমার নিকট নিয়ে যায়।

যখন আমি তোমাকে ডাকলাম, তুমি সাড়া দিলে; যখন আমি যা চাইলাম, তুমি তাই দিলে; যখন আমি প্রশংসা করলাম, তুমি আমাকে কৃতজ্ঞ বানালে; আর যখন আমি কৃতজ্ঞ হলাম, তুমি আরও দান করলে।

হে আমার প্রভু, আমি তোমার কত নিয়ামত গুনে শেষ করব? কয়টি দানার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব? তুমি তো আমাকে অনন্ত নিয়ামতে আচ্ছাদিত করেছ, বিপদগুলো দূর করেছ। হে আল্লাহ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি— আমার অন্তর, বাহির ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গসমূহ তোমার একত্বের সাক্ষী। হে আল্লাহ, আমি তোমার নিয়ামত গণনা করতে অক্ষম; তাহলে কীভাবে তাদের শোকর আদায় করব? তুমি তো নিজেই বলেছ, “আর যদি তোমরা আল্লাহর নিয়ামত গুনতে চাও, কখনোই গুনে শেষ করতে পারবে না।” (সুরা ইবরাহিম, ১৪:৩৪)।

তোমার নিয়ামতের জন্য শোকর আদায় করাও এক বিশাল নিয়ামত, আর সেই শোকরের তাওফিকও তুমি দান করেছ। যেমন তুমি নিজেই বলেছ,  “তোমাদের উপর যে নিয়ামতই আছে,  আল্লাহরই কাছ থেকে।” (সুরা আন-নহল, ১৬:৫৩)। আমি তোমার এই বাণীকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি।

হে আমার প্রভু, হে আমার মালিক, তোমার প্রেরিত রসুলগণ তোমার ওহির বাণী পৌঁছে দিয়েছেন। আমি আমার সামর্থ্য, জ্ঞান ও হৃদয়ের পরিমাণ অনুযায়ী বলি— “সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল অনুগ্রহ দান করেছেন, একটি প্রশংসা যা নিকটবর্তী ফেরেশতাগণ ও প্রেরিত নবীগণের প্রশংসার সমতুল্য।”৯

তাসাউফের ইতিহাসে নবজাগরণ সৃষ্টিকারী:

ইমাম সুলামী তাঁর গ্রন্থ ‘মিহানুস সুফিয়্যাহ’য় বলেন, হজরত জুননুন আল-মিসরি (রহ.) ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি তাঁর অঞ্চলে আহওয়াল ও মাকামাতুল আওলিয়া; অর্থাৎ আধ্যাত্মিক অবস্থা ও অলিদের মর্যাদার স্তরসমূহ নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু এ বিষয়ে তাঁর উপর আবদুল্লাহ ইবনু আবদুল হাকাম আপত্তি জানান এবং মিশরের অনেক আলেম তাঁর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। সমাজে ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি এমন এক নতুন জ্ঞানের সূচনা করেছেন, যা নিয়ে পূর্ববর্তী সালাফগণ কিছু বলেননি। ফলে তাঁকে ‘বিদআতি’ বলা হয় এবং এমনকি কেউ কেউ তাঁকে ‘জিন্দিক’ (অবিশ্বাসী বা বিভ্রান্ত) বলে অভিযুক্ত করেছে।

একদিন তাঁর ভাই তাঁকে বললেন, ‘তারা তোমাকে জিন্দিক বলছে।’

তখন তিনি শান্তভাবে উত্তর দিলেন—

وَمَا لِي سِوَى الْإِطْرَاقِ وَالصَّمْتِ حِيلَةٌ

وَوَضْعِي كَفِّي تَحْتَ خَدِّي وَتَذْكَارِي-

অর্থাৎ, “আমার পক্ষে একমাত্র উপায় হলো নীরব থাকা ও মাথা নত করা। আমি আমার হাত গালের নিচে রাখি, আর আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকি।”১০

মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে ফেরা:

আমর ইবনুস সরাহ বলেন, আমি জুননুন (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল তো আপনাকে হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন, আপনি কীভাবে বেঁচে গেলেন?’

তিনি বললেন,“যখন দাস আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন আমি মনে মনে এ দোয়া পড়েছিলাম,‘হে প্রভু, অগুনতি পানির ফোঁটা, বাতাসের প্রবাহ, মাটির গোপন রহস্য ও হৃদয়ের চিন্তাধারা সবকিছুই আপনার জানা, এ সবকিছুই আপনার সাক্ষ্য বহন করে, আপনার ক্ষমতার সামনে তারা বিভ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হে আল্লাহ, যাঁর মাধ্যমে আপনি আসমান ও জমিনের সকল সৃষ্টিকে রক্ষা করেন, সেই শক্তি ও ক্ষমতার দ্বারা মুতাওয়াক্কিলের হৃদয়কে আমার প্রতি নরম করে দিন।’আমি প্রার্থনা করি, আপনি মুহাম্মদ ﷺ ও তাঁর পরিবার-পরিজনের উপর দরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন।”

এরপর কী আশ্চর্য, খলিফা মুতাওয়াক্কিল দাঁড়িয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন, আমাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন, “হে আবুল ফাইয, আমরা আপনাকে কষ্ট দিয়েছি!”১১

খলিফার সাথে তাঁর সম্পর্ক:

ইউসুফ ইবনুল হুসাইন বলেন, আমি জুননুন (রহ.)-এঁর সঙ্গে খলিফা মুতাওয়াক্কিলের দরবারে উপস্থিত ছিলাম। খলিফা তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন এবং তাঁকে অন্যান্য জাহিদদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করতেন। একদিন খলিফা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন,“আমাকে আল্লাহর অলিদের সম্পর্কে বর্ণনা করুন।”তিনি উত্তর দিলেন,“হে আমিরুল মুমিনীন, তারা এমন এক জাতি, যাদের আল্লাহ তাঁর ভালোবাসার উজ্জ্বল নুরের পোশাক পরিয়েছেন, তাঁদের ওপর ঢেলে দিয়েছেন নিজের সম্মান ও মর্যাদার আভা এবং তাঁদের কপালে স্থাপন করেছেন আনন্দ ও তৃপ্তির মুকুট।” এরপর তিনি দীর্ঘ সময় ধরে আওলিয়াদের গুণাবলি ও আধ্যাত্মিক অবস্থার কথা বলেছিলেন।১২

বাদশাহকে উপদেশ প্রদান:

সুলামী বলেন,“ হজরত জুননুন আল-মিসরি রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে মিশর থেকে ডাকবাহকের মাধ্যমে (রাজ আদেশে) খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিলের দরবারে পাঠানো হয়েছিল, যেন তিনি তাঁকে উপদেশ দেন  (২৪৪ হিজরি সনে)। এবং যখন মুতাওয়াক্কিলের সামনে তিনি আল্লাহভীরু মানুষদের কথা উল্লেখ করতেন, তখন খলিফা কান্নায় ভেঙে পড়তেন।”১৩

আল্লাহ ও কুরআন সম্পর্কে তাঁর আকিদা:

আলী ইবন হাতিম বলেন, আমি জুননুন আল-মিসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “القرآن كلام الله غير مخلوق.” অর্থাৎ, “কুরআন আল্লাহর বাণী, এটি সৃষ্ট নয়।”

ইউসুফ ইবনুল হুসাইন বলেন, আমি জুননুন (রহ.)-কে বলতে শুনেছি,“যে চিত্র বা ধারণাই তোমার মনে উদ্ভূত হয়, জেনে রেখো আল্লাহ তায়ালা তার বিপরীত।”অর্থাৎ, আল্লাহ কোনো কল্পনা বা চিন্তার গণ্ডিতে বন্দি নন।১৪

আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়:

ইউসুফ ইবনুল হুসাইন বলেছেন, আমি হজরত জুননুন (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “আল্লাহর পথে প্রথম পদক্ষেপেই যদি তুমি সত্যভাবে তাঁকে খোঁজো, তবে তুমি তাঁকে পেয়ে যাবে।”

একই বর্ণনাকারী বলেন, আমি হজরত জুননুন (রহ.)-কে বলতে শুনেছি,“আল্লাহর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সর্বনিম্ন স্তর হলো— যদি মানুষকে আগুনে নিক্ষেপও করা হয়, তবুও তার মন যেন কখনও প্রিয়তম আল্লাহর স্মৃতি ও আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়।”

ইবনু আল-বারকী বলেছেন, আমি হজরত জুননুন (রহ.) কে বলতে শুনেছি, “আল্লাহর সঙ্গে অন্তরঙ্গতা হলো এক দীপ্তিমান নুর, আর সৃষ্টির সঙ্গে অতিরিক্ত সখ্যতা হলো এক স্থায়ী দুঃখ।”

ইউসুফ ইবনুল হুসাইন বলেছেন, আমি হজরত জুননুন (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “আল্লাহর কিছু বান্দা আছেন, যাঁরা প্রথমে তাঁর শাস্তির ভয়ে গোনাহ ত্যাগ করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর অসীম দয়া ও উদারতার প্রতি লজ্জাবোধ থেকে গোনাহকে আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। যদি আল্লাহ তাঁদের উদ্দেশে বলেন যে, তুমি যা ইচ্ছা করো, আমি তোমার পাপের জন্য তোমাকে ধরব না, তবুও তারা তাঁর লজ্জায় ও মহিমার ভয়ে পাপ থেকে বিরত থাকবে। কেননা, তুমি যদি একজন মুক্ত, সম্মানিত ও কৃতজ্ঞ বান্দা হও, তবে কেমন করে তুমি পাপ করবে, বিশেষত যখন তিনি নিজেই তোমাকে সতর্ক করেছেন?”১৫

তাঁর দৃষ্টিতে সুফির পরিচয়:

আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মাইমুন বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি জুননুন আল-মিসরিকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সুফি কাকে বলে?’ তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি যখন কথা বলে, তার কথা সত্য ও বাস্তবতার মিলে যায়, আর যখন নীরব থাকে, তখন তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আল্লাহর সাথে সম্পর্কবিহীন সকল বন্ধন ছিন্ন করার সাক্ষ্য দেয়।”

একই সূত্রে বর্ণিত, আমি জুননুন আল-মিসরিকে বলতে শুনেছি,“আল্লাহর সঙ্গে অন্তরঙ্গতা (উনস বিল্লাহ) আসে তখনই, যখন অন্তর হয় আল্লাহর সঙ্গে নির্মল, যখন মানুষ নিজেকে একমাত্র আল্লাহর জন্য একান্ত করে নেয় এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে।”১৬

আল্লাহর অলিদের পরিচয়:

ইউসুফ ইবনুল হুসাইন (রহ.) বলেন, একদিন আমি হজরত জুননুন আল-মিসরি (রহ.)-এর সঙ্গে খলিফা মুতাওয়াক্কিলের দরবারে উপস্থিত ছিলাম। খলিফা মুতাওয়াক্কিল তাঁকে অন্যান্য জাহিদ ও আবেদদের চেয়ে অধিক মর্যাদা দিতেন। তিনি শ্রদ্ধাভরে বললেন, ‘হে আবুল ফায়য, আপনি কি আমার কাছে আল্লাহর অলিগণের পরিচয় দিতে পারেন?’ তখন জুননুন (রহ.) বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, অলিগণ এমন এক সম্প্রদায়, যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর ভালোবাসার উজ্জ্বল নুর দ্বারা অলঙ্কৃত করেছেন, তাঁর সম্মানের চাদরে আবৃত করেছেন, তাদের মস্তকে সন্তুষ্টির মুকুট পরিয়েছেন এবং তাঁর সৃষ্টির হৃদয়ে তাদের জন্য ভালোবাসা ছড়িয়ে দিয়েছেন।

তিনি তাদের অন্তরে অদৃশ্য রহস্যের ভাণ্ডার সংরক্ষণ করেছেন, যাতে তাদের হৃদয় সদা প্রিয়তমের মিলনে মগ্ন থাকে, তাদের চোখ থাকে আল্লাহর মহিমার দিকে নিবদ্ধ আর তাদের প্রাণ চিরদিন তাঁর দিকে ধাবমান। আল্লাহ তাঁদের জ্ঞানের আলোতে সমাসীন করেছেন, অজ্ঞতার রোগ থেকে মুক্ত করেছেন, আর সত্য ও মিথ্যার রোগ নির্ণয়ের প্রজ্ঞা দান করেছেন। তিনি পরহেজগার ও মুত্তাকিদের তাদের শিষ্য বানিয়েছেন, তাদের দোয়ায় সাড়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাদের উদ্দেশ্যে বলেন—

“হে আমার অলিগণ, যদি কেউ আমার বিচ্ছেদে ক্লান্ত হয়ে তোমাদের কাছে আসে, তাকে সান্ত্বনা দিও। যদি কেউ আমার ইচ্ছায় কষ্ট পায়, তাকে আরোগ্য দাও। যদি কেউ আমার ভয়ে ভীত হয়, তাকে নিরাপত্তা দাও। যদি কেউ আমার সাক্ষাৎ কামনা করে, তাকে মৃত্যুর স্মরণ করিয়ে দিও (দুনিয়ার মোহ ভুলিয়ে দিও)। যদি কেউ আমার পথে চলতে চায়, তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করো। যদি কেউ আমার রহমত থেকে নিরাশ হয়, তাকে আশা দেখাও। যদি কেউ আমার অনুগ্রহ চায় তাকে সুসংবাদ দাও। যদি কেউ আমার প্রতি ভালো ধারণা রাখে, তাকে সান্ত্বনা দাও। যদি কেউ আমাকে ভালোবাসে, তাকে সহায়তা করো।

যদি কেউ আমার মর্যাদাকে শ্রদ্ধা করে, তাকে সম্মান দাও। যদি কেউ আমার অনুগ্রহের পর ভুল করে, তাকে সতর্ক করো। যদি কেউ আমার দান ভুলে যায়, তাকে স্মরণ করিয়ে দিও। যদি কোনো বিপদগ্রস্ত তোমাদের কাছে সাহায্য চায়, তাকে রক্ষা করো। যে তোমাদের সাথে সম্পর্ক রাখে, তোমরাও তার সাথে সম্পর্ক রাখো। যদি কেউ দূরে সরে যায়, তার খবর নাও। যদি কেউ তোমাদের প্রতি অন্যায় করে, ধৈর্য ধরো। যদি কেউ কোনো হক আদায়ে ব্যর্থ হয়, তাকে ক্ষমা করো। যদি কেউ ভুল করে, তাকে সংশোধন করো। যদি কেউ অসুস্থ হয়, তার সেবা করো। যদি আমি তোমাদের রিজিক দিই, অন্যকেও তাতে অংশীদার করো।”

“হে আমার অলিগণ, তোমাদের আমি নির্বাচিত করেছি, তোমাদেরই আমি আমার রহস্যের ধারক বানিয়েছি। তোমাদের সাথেই আমি কথা বলি, তোমাদের প্রতিই আমি আহ্বান জানাই। আমি অহংকারী ও সীমালঙ্ঘনকারীদের ব্যবহার করতে চাই না, দুষ্টদের আনুগত্যও চাই না। আমার প্রতিদান তোমাদের জন্য সর্বোত্তম প্রতিদান, আমার দান তোমাদের জন্য অশেষ দান, আমার দয়া তোমাদের জন্য সর্বোত্তম দয়া, আর আমার অনুগ্রহ তোমাদের জন্য সর্বোচ্চ অনুগ্রহ।

আমি অন্তরের গোপন চিন্তার পরীক্ষক, আমি অদৃশ্যের মহাজ্ঞানী, আমি ক্ষণিক দৃষ্টির পর্যবেক্ষক, আমি চিন্তাভাবনার তত্ত্বাবধায়ক, আমি চোখের পাতার নড়াচড়াতেও অবগত।

অতএব, হে আমার অলিগণ, আমি ছাড়া অন্য কোনো শাসক বা ক্ষমতাধর যেন তোমাদের ভীত না করে। যে তোমাদের ক্ষতি করতে চায় আমি তাকে ভেঙে ফেলব। যে তোমাদের কষ্ট দেয় আমিও তাকে কষ্ট দেব। যে তোমাদের সাথে শত্রুতা করবে আমি তার শত্রু হব। যে তোমাদের ভালোবাসবে আমি তাকে ভালোবাসব। যে তোমাদের উপকার করবে আমি তাকে সন্তুষ্ট করব। তোমরাই আমার অলি, তোমরাই আমার প্রিয়জন। তোমরাই আমার জন্য, আর আমি তোমাদের জন্য।”১৭

আরিফদের আলামত:

ইউসুফ ইবনুল হুসাইন বলেছেন, আমি হজরত জুননুন (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “একজন আরিফ (আল্লাহকে চিনে ফেলা ব্যক্তি) প্রতিদিন আরও বেশি বিনয়ী হয়ে যায়, কারণ প্রতি মুহূর্তে সে তার প্রভুর দিকে আরও নিকটে পৌঁছাতে থাকে।”

হজরত জুননুন (রহ.) আরও বলেছেন, “হে মুরিদগণ, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সত্যিকারভাবে এই পথ (তাসাউফের পথ) অনুসরণ করতে চায়, সে যেন বিনয়ের সঙ্গে আলেমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, যেন সে অজ্ঞ; সে যেন আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জাহিদদের (সংযমী ব্যক্তিদের) সঙ্গে সাক্ষাৎ করে; আর আল্লাহর আরিফদের সঙ্গে নীরবতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।”(অর্থাৎ: আলেমদের কাছে নম্র হয়ে শেখো, জহিদদের কাছে অনুপ্রাণিত হয়ে থেকো, আর আল্লাহর নিকটজনদের সামনে নীরব থাকো। কারণ, তাদের ভাষা অন্তরের।)

আবু জাফর আর-রাজি বলেন, আমি আব্বাস ইবনে হামযা থেকে শুনেছি, তিনি হজরত জুননুন (রহ.)-কে বলতে শুনেছেন, “আল্লাহর আরিফ কখনো একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় স্থির থাকে না; বরং সে সর্বাবস্থায়, সর্বদিকেই তার রবের (প্রভুর) সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।”১৮

তাঁর দৃষ্টিতে ইস্তিগফার:

হজরত জুননুন আল-মিসরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) এমন এক শব্দ, যা বহু অর্থ ধারণ করে।

১. পূর্বের পাপের প্রতি অনুশোচনা করা।

২. ভবিষ্যতে সে পাপ না করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা।

৩. যে ফরজ ইবাদতগুলো নষ্ট হয়েছে, তা পূরণ করা।

৪.  মানুষের প্রতি অন্যায় ও সম্পদসংক্রান্ত অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, এবং তাদের সঙ্গে মীমাংসা করা।

৫. যে শরীর ও রক্ত হারাম খাদ্য দ্বারা গঠিত হয়েছে, তা গলিয়ে ফেলা (অর্থাৎ তাওবা ও ত্যাগের মাধ্যমে পবিত্র হওয়া)।

৬. যেভাবে পাপে মিষ্টতা অনুভব করেছিলে, সেভাবেই এখন আনুগত্যে কষ্ট সহ্য করা।১৯

তাঁর দৃষ্টিতে মুহাব্বত:

মুহাম্মদ ইবনে সাঈদ আল-খাওয়ারিজমী বলেন, জুননুন আল-মিসরিকে ভালোবাসা তথা মুহাব্বত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি বললেন,“আল্লাহ যা ভালোবাসেন, সেটিই তুমি ভালোবাসবে,

আর আল্লাহ যা অপছন্দ করেন, সেটি তুমি অপছন্দ করবে। সমস্ত ভালো কাজ করবে, আর যা কিছু তোমাকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তা পরিত্যাগ করবে। আল্লাহর পথে সমালোচকের ভয় করবে না, মুমিনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে, আর কাফিরদের প্রতি কঠোর থাকবে। এবং ধর্মে রসুলুল্লাহ ﷺ-এঁর অনুসরণ করবে।”২০

পাঁচের শিক্ষা; জুননুন মিসরি (রহ.)-এ৭র তাসাউফি দর্শনের মুক্তা:

ইবরাহিম আল-বান্না আল-বাগদাদী (রহ.) বলেন, আমি একবার হজরত জুননুন মিসরী (রহ.)-এঁর সঙ্গে ইহমিম নামক স্থান থেকে আলেকজান্দ্রিয়া পর্যন্ত সফর করেছিলাম। যাত্রাপথের কোনো এক পর্যায়ে তাঁর ইফতারের সময় হলো। তখন আমি আমার সঙ্গে রাখা কিছু শুকনো রুটি ও লবণ বের করে বললাম, ‘হে শায়েখ, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন, একটু গ্রহণ করুন।’

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার এই লবণটা কি গুঁড়া করা?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে তুমি সফল হবে না।’আমি অবাক হয়ে গেলাম। তাঁর থলিতে তাকিয়ে দেখি সামান্য পরিমাণ যবের গুঁড়া (সাওয়িক) রয়েছে। প্রতিদিন রাতে তিনি শুধু তারই কিছুটা খেতেন, যতটুকু আল্লাহ তাঁর জন্য নির্ধারণ করতেন।

আমরা আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছানো পর্যন্ত তিনি ওই অল্প খাবারেই সন্তুষ্ট থাকতেন। আমি লজ্জা অনুভব করলাম— আমার দুনিয়াবি ভাবনা ও তাঁর দার্শনিক সংযমের তুলনায় আমি কত তুচ্ছ!

যখন তাঁর কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় এলো, আমি বললাম, ‘হে আবুল‌ ফাইয, আমাকে একটি উপদেশ দিন, যা আমি আপনার কাছ থেকে স্মরণে রাখব।’তিনি বললেন, ‘তুমি কি তা মনে রাখতে পারবে?’ আমি বললাম, ‘ইনশাআল্লাহ পারব।’তখন তিনি বললেন, ‘হে ইবরাহিম, পাঁচটি বিষয় মনে রেখো, যদি তুমি এগুলো রক্ষা করো, তবে এরপর যা-ই ঘটুক, তাতে তোমার কিছুই আসে যায় না।

১. দারিদ্র্যতাকে আলিঙ্গন করো।

২. ধৈর্যকে বালিশ বানাও।

৩. কামনা-বাসনাকে শত্রু বানাও।

৪. নফসের বিরোধিতা করো।

৫. সব কাজে আল্লাহর দিকে ফিরে যাও।

অতঃপর তিনি বললেন, যখন তুমি এ পাঁচটি অর্জন করবে, তখন তা তোমাকে এনে দেবে পাঁচটি গুণ। ১. কৃতজ্ঞতা, ২. সন্তুষ্টি, ৩. ভয়, ৪. আশা, ৫. ধৈর্য।

আর এই পাঁচটি গুণ তোমাকে দেবে আরও পাঁচটি বরকত। ১. ইলম তথা জ্ঞান, ২. আমল, ৩. ফরজ আদায়, ৪. হারাম থেকে বিরত থাকা, ৫. অঙ্গীকার রক্ষা।

কিন্তু যতক্ষণ না তোমার মধ্যে আরও পাঁচটি জিনিস থাকবে ততক্ষণ এই পাঁচটি তুমি পাবে না। ১. গভীর চিন্তা, ২. পরিপূর্ণ জ্ঞান, ৩. প্রজ্ঞা ও ভাষার সৌন্দর্য, ৪. তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, এবং ৫. জাগ্রত আত্মা।

তিনি আরও বললেন, ধ্বংস, পরম ধ্বংস তার জন্য, যে পাঁচটি অভিশাপে আক্রান্ত হয়। ১. বঞ্চনা, ২. অবাধ্যতা, ৩. অপমান, ৪. নিজের গোনাহে আত্মতুষ্টি, ৫. এবং অন্যের দোষ অনুসন্ধান।

আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট কুৎসিত পাঁচটি বিষয় হলো— ১. কুকর্ম, ২. নিকৃষ্ট আচরণ, ৩. গোনাহের ভার, ৪. মানুষের দোষ খোঁজা, ৫. আল্লাহর প্রকাশ্য অবাধ্যতা।

ধন্য সেই ব্যক্তি, যে আন্তরিকতা আনে নিজের— ১. জ্ঞান ও আমলে, ২. ভালোবাসা ও ঘৃণায়, ৩. দেওয়া ও নেওয়ায়, ৪. কথা ও নীরবতায়, ৫. বলা ও কর্মে।

তিনি আরও বললেন, হে ইবরাহিম, হালাল জীবিকার পাঁচটি উৎস আছে। ১. সত্যবাদিতার সঙ্গে ব্যবসা, ২. সৎভাবে কাজ বা পেশা, ৩. স্থল ও জল শিকার, ৪. বৈধ উত্তরাধিকার, ৫. অনুমোদিত উপহার।

আর শুধু এই পাঁচটি ছাড়া দুনিয়ার সব কিছুই অপ্রয়োজনীয়। ১. রুটি যা তৃপ্ত করে, ২. পানি যা তৃষ্ণা মেটায়, ৩. পোশাক যা ঢেকে রাখে, ৪. ঘর যা আশ্রয় দেয়, ৫. জ্ঞান যা কাজে লাগে।

তিনি বললেন, তোমার সঙ্গে থাকা উচিত আরও পাঁচটি জিনিস। এগুলো সবসময় নিজের সঙ্গে রাখবে। ১. ইখলাস (নিয়ত ও আন্তরিকতা), ২. তাওফিক (আল্লাহর সহায়তা), ৩. সত্যের অনুসরণ, ৪. হালাল আহার, ৫. হালাল পোশাক।

আর আরামের পাঁচটি উৎস হলো— ১. খারাপ সঙ্গ ত্যাগ, ২. দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি, ৩. নীরবতা, ৪. গোপনে ইবাদতের স্বাদ, ৫. বান্দাদের নিন্দা পরিহার।

যখন এগুলো অর্জন করবে, তখন তোমার অন্তর থেকে পাঁচটি জিনিস ঝরে যাবে। ১. বিতর্ক, ২. ঝগড়া, ৩. দেখানো, ৪. আত্মঅলঙ্কার, ৫. পদমর্যাদার লোভ।

অবশেষে তিনি বললেন, হে ইবরাহিম, মানুষের উদ্বেগের কারণ পাঁচটি। ১. আল্লাহ ছাড়া সব সম্পর্ক ছিন্ন করা, ২. যে ভোগে হিসাব আছে তা ত্যাগ করা, ৩. বন্ধু ও শত্রুর বিরক্তি ত্যাগ করা, ৪. সরল জীবনধারা গ্রহণ, ৫. সঞ্চয় ত্যাগ করা।

একজন আলেমের এই পাঁচ বিপদ থেকে সর্বদা ভয় করা উচিত। ১. নেয়ামতের বিলোপ, ২. হঠাৎ নেমে আসা বিপদ, ৩. মৃত্যুর ফয়সালা, ৪. ধ্বংসাত্মক ফিতনা, ৫. দৃঢ়তার পর পা পিছলে যাওয়া।

শেষে জুননুন মিসরী (রহ.) বললেন, “হে ইবরাহিম, আমি তোমাকে যা শিক্ষা দিয়েছি, তাতেই তোমার জন্য যথেষ্ট।”২১

দারুল আমান— আত্মার চিরস্থায়ী নিবাস:

একদিন মুহাম্মদ ইবনুজ যায়েদ আত-তামীমী (রহ.) হজরত জুননুন মিসরী (রহ.)-এঁর সান্নিধ্যে ছিলেন। হঠাৎ তাঁদের দৃষ্টি পড়ল এক বিশাল দালানের দিকে। উঁচু, আকাশচুম্বী এবং জাঁকজমকপূর্ণ। দালানের ছায়ায় দাঁড়িয়ে এক যুবক গর্বভরে আদেশ-নিষেধ করছে। তার চোখে অহংকার, কণ্ঠে গর্ব, হাতে রাজসিক ভঙ্গি; যেন সে পৃথিবীর মালিক!

এই দৃশ্য দেখে হজরত জুননুন (রহ.)-এঁর হৃদয় বিষণ্ন হয়ে উঠল। তিনি গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে সেই যুবকের উদ্দেশে বললেন,“হে প্রতারিত মানুষ, তুমি দুনিয়ার ধোঁকার ঘরে (দারুল গুরুর) বিভোর হয়ে আছো, অথচ চিরস্থায়ী ঘর, দারুল বাকায় উদাসীন হয়ে পড়েছো! তুমি কেন তোমার প্রভুর কাছ থেকে এমন এক ঘর ক্রয় করছো না, যা থাকবে নিরাপত্তার দেশে (দারুল আমান)। যেখানে কখনও স্থান সংকীর্ণ হবে না, বাসিন্দারা অস্থির হবে না, সময়ের বিপর্যয় সেখানে আঘাত করবে না, আর যা নির্মাণে পাথর বা মাটির প্রয়োজন হবে না?”

তিনি বলতে লাগলেন, এই চিরস্থায়ী শান্তির ঘরটির চারটি সীমারেখা রয়েছে।

১. প্রথম সীমা পৌঁছে আশাবাদী ও সংরক্ষিত মুমিনদের বাসস্থানে।

২. দ্বিতীয় সীমা পৌঁছে আল্লাহভীত ও বিনম্র হৃদয়ের বান্দাদের আবাসে।

৩. তৃতীয় সীমা পৌঁছে প্রেমিকদের ঘরে, যাদের ভালোবাসা শুধু আল্লাহর জন্য।

৪. আর চতুর্থ সীমা পৌঁছে সাফল্যপ্রাপ্তদের রাজপ্রাসাদে, যাঁরা দুনিয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।

এই ঘরের সামনে রয়েছে এক আলোকিত ও প্রশস্ত রাস্তা; যা নিয়ে যায় জান্নাতের তীরে স্থাপিত শিবির ও গম্বুজের দিকে। সেগুলো বিশাল ময়দানে ছড়িয়ে আছে, যেখানে আকাশ আলোয় ভরা, ঘরগুলো উঁচু, সুসজ্জিত ও দৃষ্টিনন্দন। সেখানে রয়েছে সোনালি আসন, মখমলের পর্দা, প্রবাহিত হচ্ছে দুধের নদী, তীরভূমিতে মিশক ও জাফরানের সুবাস। সেখানে জান্নাতবাসীরা মিলিত হয় পরম সৌন্দর্যময় হুরদের সঙ্গে, যাদের হাসি ফুলের মতো কোমল, চোখের দৃষ্টি শান্তির সমুদ্রের মতো গভীর।

এই সেই জান্নাতি প্রাসাদ, যা প্রকৃত বাদশাহ পরম দয়ালু আল্লাহর কাছ থেকে বুদ্ধিমান বান্দারা কিনে নেয়। পাপের লজ্জা থেকে ফিরে এসে আনুগত্যের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে। কিন্তু হায়! অধিকাংশ মানুষ জানে না তারা কী বিক্রি করছে, আর কী কিনছে। তারা তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, চুক্তি ছিন্ন করে, আর আল্লাহর ইবাদত থেকে বিমুখ হয়ে পড়ে। এই সত্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে কুরআনের মহান আয়াত — إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ

يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ ۖ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ وَالْقُرْآنِ-

“নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে জান্নাতের বিনিময়ে তাদের জান ও মাল ক্রয় করেছেন। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, হত্যা করে ও শহিদ হয়। এ প্রতিশ্রুতি আল্লাহ দিয়েছেন তাওরাত, ইনজিল ও কুরআনে।”(সুরা আত-তাওবা, আয়াত ১১১)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় জুননুন (রহ.) যেন বলতে চাইলেন— জীবন এক ব্যবসা, যেখানে ক্রেতা আল্লাহ, আর বিক্রেতা মানুষ। যে তার প্রাণ ও সম্পদ আল্লাহর পথে সমর্পণ করে, সে-ই লাভবান হয়; সে-ই পায় ‘দারুল আমান’— আত্মার চিরস্থায়ী নিবাস।২২

কাশফ ও কারামাত:

মুহাম্মদ ইবনুল ফারখি বলেন,“আমি একবার জুননুন আল-মিসরির (রহ.) সঙ্গে একটি নৌকায় ছিলাম। তখন আরেকটি নৌকা পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। কেউ তাঁকে বলল, ‘হে জুননুন, ঐ নৌকার লোকেরা শাসকের কাছে যাচ্ছে, আপনার বিরুদ্ধে কুফরির সাক্ষ্য দিতে।’তখন জুননুন (রহ.) হাত তুলে বললেন, اللَّهُمَّ إِنْ كَانُوا كَاذِبِينَ، فَغَرِّقْهُمْ – অর্থাৎ, “হে আল্লাহ, যদি তারা মিথ্যাবাদী হয়, তবে তাদের ডুবিয়ে দাও।”তৎক্ষণাৎ সেই নৌকা উল্টে গেল এবং সবাই ডুবে মারা গেল।

আমি (মুহাম্মদ ইবনুল ফারখি) তাঁকে বললাম,“নাবিক (নৌকার চালক) তো নির্দোষ ছিল, তার কী দোষ?” তিনি বললেন, “সে কেন তাদের বহন করল, যখন জানত তারা কী উদ্দেশ্যে যাচ্ছে? বরং আল্লাহর সামনে ডুবে মরা অবস্থায় উপস্থিত হওয়া তাদের জন্য ভালো, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার অপরাধী হিসেবে উপস্থিত হওয়ার চেয়ে।”

এরপর তিনি কেঁপে উঠলেন, মুখমণ্ডল পরিবর্তিত হয়ে গেল এবং কাঁদতে কাঁদতে বললেন—‘হে আল্লাহ, তোমার মহিমার কসম, আমি আর কখনো কারও বিরুদ্ধে বদদোয়া করব না।’এরপর মিশরের আমির তাঁকে ডেকে পাঠালেন এবং তাঁর বিশ্বাস ও মতবাদ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তিনি স্পষ্টভাবে তাঁর আকিদা ব্যাখ্যা করলেন এবং আমির তাঁর বক্তব্যে সন্তুষ্ট হলেন। পরবর্তীতে খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল তাঁকে বাগদাদে ডেকে পাঠালেন। যখন তিনি জুননুন (রহ.)-এঁর কথা শুনলেন, তখন গভীরভাবে প্রভাবিত হলেন ও তাঁর প্রতি ভালোবাসা জন্ম নিল। খলিফা প্রায়ই বলতেন— “إِذَا ذُكِرَ الصَّالِحُونَ، فَحَيَّهَلَا بِذِي النُّونِ.” – “যখন সৎ ও নেককার ব্যক্তিদের কথা বলা হয়, তখন জুননুন আল-মিসরির নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ কর।”২৩

আবু আব্দুল্লাহ ইবনুল জিল্লা (রহ.) বলেন, আমি মক্কায় হজরত জুননুন মিসরী (রহ.)-এঁর সঙ্গে অবস্থান করছিলাম। আমরা বহুদিন ধরে প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ছিলাম; আমাদের কাছে কিছুই পৌঁছায়নি। একদিন জোহরের নামাজের আগে জুননুন (রহ.) অজু করার উদ্দেশ্যে পাহাড়ের দিকে উঠতে লাগলেন, আমিও তাঁর পেছনে ছিলাম। হঠাৎ দেখি, উপত্যকার ভেতর কিছু তাজা এবং নরম কলার খোসা পড়ে আছে। আমি মনে মনে ভাবলাম, এর মধ্যে থেকে এক–দুমুঠো তুলে জামার ভিতরে রাখি, যাতে শায়েখ দেখতে না পান। পরে যখন পাহাড়ে উঠব, আর শায়েখ অজু করবেন, তখন আমি ওটা খেয়ে নেব।

অতঃপর আমি সেটা তুলে জামার ভিতরে রাখলাম এবং শায়েখ যেন আমাকে না দেখতে পান, সে জন্য সতর্ক দৃষ্টিতে তাঁর দিকেই তাকিয়ে রইলাম। যখন আমরা পাহাড়ে উঠলাম এবং লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেলাম, তখন শায়েখ হঠাৎ আমার দিকে ফিরে বললেন, তোমার জামায় যা রেখেছো, সব ফেলে দাও।

আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম, তবুও আদেশ মান্য করে কলার খোসাগুলো ফেলে দিলাম। এরপর আমরা অজু করলাম, নামাজ পড়লাম এবং মসজিদে ফিরে এলাম। আমরা জোহর, আসর, মাগরিব ও এশা সব নামাজ একত্রে আদায় করলাম। কিছুক্ষণ পরে একজন মানুষ এলেন, তাঁর হাতে খাবার ভর্তি একটি থালা ঢাকা দিয়ে আনা হয়েছে। তিনি জুননুন (রহ.)-এঁর দিকে তাকিয়ে দাঁড়ালেন। শায়েখ বললেন, ওটা এখানে রাখো, ঐ পাশে।

লোকটি সেই থালাটি আমার সামনে রেখে চলে গেল। আমি শায়েখের দিকে তাকিয়ে রইলাম, ভাবলাম, তিনি কখন খাবেন। কিন্তু তিনি চুপচাপ বসে রইলেন, খাননি। তারপর তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,‘তুমি খাও।’ আমি বললাম, ‘আমি একাই?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, একাই। কারণ তুমি চেয়েছিলে, আমরা কিছুই চাইনি। খাবার তার জন্যই আসে, যে তা চায়।’

আমি লজ্জা ও অনুতাপ মিশ্রিত অবস্থায় খেতে শুরু করলাম, আর অন্তরে গভীরভাবে লজ্জিত হলাম যে, এমন গোপন চিন্তাও শায়েখের অন্তর্দৃষ্টি থেকে আড়াল রইল না।২৪

ইসমে আজম জানার বর্ণনা:

ইউসুফ ইবনুল হুসাইন (রহ.) বলেন, আমাকে কেউ বলেছিল, “হজরত জুননুন মিসরি (রহ.) ইসমে আজম জানেন।”আমি সেই কথা শুনে মিশরে গিয়ে তাঁর খিদমত করি এক বছর। এক বছর পূর্ণ হলে আমি তাঁকে বললাম,“হে শায়েখ, আমি দীর্ঘদিন আপনার সেবা করেছি। এখন আমার পাওয়ার অধিকার মজবুত হয়েছে। আমাকে বলা হয়েছে, আপনি ইসমে আজম জানেন। আমি আপনার সেবক হিসেবে নিজেকে তার উপযুক্ত মনে করি। অতএব, দয়া করে আমাকে সেই নাম শিখিয়ে দিন।”

হজরত জুননুন (রহ.) আমার কথায় কোনো উত্তর দিলেন না, নীরব রইলেন। তাঁর নীরবতা দেখে বুঝলাম, তিনি হয়তো আমাকে পরীক্ষা করতে চান। এরপর ছয় মাস পর্যন্ত তিনি আমাকে কিছুই বললেন না। ছয় মাস পর একদিন তিনি তাঁর ঘর থেকে একটি থালা বের করলেন, যার উপর একটি ঢাকনা বাঁধা ছিল এবং সেটি মোড়ানো ছিল একটি কাপড়ে। তিনি বললেন, ‘তুমি কি আমাদের ফুস্তাত (কায়রো) শহরের অমুক বন্ধুকে চেনো?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, চিনি।’তিনি বললেন, ‘তুমি অনুগ্রহ করে এই থালাটি ওর কাছে পৌঁছে দিও।’

আমি থালাটি নিলাম এবং রওনা হলাম। পথে চলতে চলতে মনে মনে ভাবতে লাগলাম,‘জুননুন মিসরী (রহ.)-এঁর মতো একজন মহান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব কোনো সাধারণ জিনিস পাঠাবেন না। নিশ্চয়ই এই থালায় কোনো বিশেষ রহস্য বা আধ্যাত্মিক নিদর্শন আছে।’এই কৌতূহল আমাকে শান্তিতে থাকতে দিল না। অবশেষে যখন নাইল নদীর সেতুতে পৌঁছলাম, আমি আর ধৈর্য ধরতে পারলাম না। আমি কাপড়ের বাঁধন খুললাম এবং ঢাকনাটা উঠালাম।

কিন্তু একি দেখলাম! একটি ইঁদুর থালা থেকে লাফিয়ে বের হয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল! আমার রাগ ও লজ্জায় মুখ লাল হয়ে গেল। আমি ক্ষুব্ধ হয়ে বললাম, ‘জুননুন মিসরি (রহ.) আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন! আমার মতো একজন সেবকের মাধ্যমে তিনি ইঁদুর পাঠালেন!’

রাগে-ক্ষোভে আবার তাঁর কাছে ফিরে গেলাম। তিনি আমার মুখের ভাব দেখেই বুঝলেন কী ঘটেছে। তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন,“হে মূর্খ মানুষ, আমি তো কেবল তোমাকে পরীক্ষা করেছি। আমি তোমার ওপর একটি ইঁদুরের আমানত রেখেছিলাম, অথচ তুমিই সেই আমানতে বিশ্বাসঘাতকতা করলে! তুমি যদি একটি ইঁদুরের আমানতে খেয়ানত করতে পারো, তবে কি আমি তোমার হাতে ইসমে আজম অর্পণ করতে পারি? যাও, আমার সামনে থেকে সরে যাও। আমি আর তোমাকে দেখতে চাই না।”২৫

বাণী ও নসিহত:

হজরত জুননুন আল-মিসরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “সত্যিকার আরিফ (আল্লাহর জ্ঞানপ্রাপ্ত ব্যক্তি) কোনো নির্দিষ্ট অবস্থায় আবদ্ধ থাকেন না; বরং তিনি প্রতিটি অবস্থায় তাঁর প্রভুর আদেশের অনুগত থাকেন।”২৬

ইউসুফ ইবনুল হুসাইন বলেন, আমি জুননুন‌ (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, সৎকর্মশীলদের সাথে থাকলে জীবন সুখকর হয় এবং উত্তম সাথির মধ্যে কল্যাণ নিহিত থাকে; যদি তুমি ভুলে যাও, সে তোমাকে স্মরণ করিয়ে দেবে, আর যদি তুমি স্মরণ করো, সে তোমাকে সাহায্য করবে।

ইউসুফ বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে জুননুনকে জিজ্ঞাসা করতে শুনলাম, আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন, কী এমন জিনিস যা বান্দাদের ক্লান্ত ও দুর্বল করে দিয়েছে? তিনি তাকে বললেন, গন্তব্যের (পরকালের) চিন্তা, পাথেয় (নেক আমল) কম থাকা, এবং হিসাবের ভয়। আর আমলকারীদের শরীর কেন গলবে না এবং তাদের বুদ্ধি কেন লোপ পাবে না, যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো, অবস্থায় তাদের আমলনামা পড়া হবে এবং ফেরেশতারা বিচারকের (আল্লাহর) সামনে দাঁড়িয়ে নেককার ও বদকারদের বিষয়ে তাঁর আদেশের অপেক্ষা করছেন? তারপর তিনি বললেন, তারা যেন এই বিষয়গুলো তাদের অন্তরে মূর্ত করে তোলে এবং তাদের চোখের সামনে রাখে। তিনি আরো বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে জুননুনকে জিজ্ঞাসা করতে শুনলাম, কখন মানুষের জন্য নির্জনতা (আযলাতুল খালক) সঠিক হয়?  তিনি বললেন, যখন তুমি নিজের নফসের (প্রবৃত্তির) কাছ থেকে নির্জনতা অবলম্বন করার শক্তি লাভ করবে।

ইউসুফ ইবনুল হুসাইন বলেন, আমি জুননুনকে বিদায়ের সময় বলেছিলাম, আমি কার সাথে উঠাবসা করব? তিনি বললেন, তোমাকে এমন ব্যক্তির সাহচর্য নিতে হবে, যার দর্শন তোমাকে আল্লাহ-কে স্মরণ করিয়ে দেয়, যার ভয় তোমার অন্তরে প্রভাব ফেলে, যার কথা তোমার আমলে বৃদ্ধি ঘটায়, যার কাজ তোমাকে দুনিয়ার প্রতি অনাসক্ত করে তোলে এবং যার সান্নিধ্যে তুমি আল্লাহ্‌র অবাধ্য হবে না, যে তার কাজের ভাষা দিয়ে তোমাকে উপদেশ দেবে, কথার ভাষা দিয়ে নয়।

আমি জুননুনকে বলতে শুনেছি, শরীরের অসুস্থতা হলো ব্যাধি, আর অন্তরের অসুস্থতা হলো পাপ। যেমন অসুস্থতার সময় শরীর খাবারের স্বাদ পায় না, তেমনি পাপের সাথে অন্তর ইবাদতের মিষ্টতা অনুভব করে না। আমি তাকে বলতে শুনেছি, যে নেয়ামতের মূল্য জানে না, সে না জেনে তা থেকে বঞ্চিত হয়।

ইউসুফ ইবনুল হুসাইন বলেন, আমি জুননুনকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের মধ্যে কারো উপর আকলের (বুদ্ধির) চেয়ে উত্তম কোনো পোশাক দেননি, আর ইলমের (জ্ঞানের) চেয়ে সুন্দর কোনো হার পরিয়ে দেননি, আর হিলমের (ধৈর্য ও সহনশীলতার) চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো সাজে সাজাননি, আর এই সবকিছুর পূর্ণতা হলো তাকওয়া (আল্লাহভীতি)।

মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ ইবনে সালামাহ আন-নিশাপুরী বলেন, আমি জুননুন আল-মিসরিকে বলতে শুনেছি, সতর্ক থেকো যেন তুমি তাঁর (আল্লাহর) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে না যাও, তাহলে তুমি প্রতারিত হবে। আমি বললাম, সেটা কীভাবে? তিনি বললেন, কারণ প্রতারিত সে, যে তাঁর দানগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে এবং সেগুলোর দিকে তাকানোর কারণে তাঁকে দেখা (তাঁর দিকে মনোনিবেশ করার) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এরপর তিনি বললেন, মানুষ যেভাবে পার্থিব উপকরণাদির সাথে যুক্ত থাকে, সিাদ্দকগণ (সত্যবাদী ও উচ্চস্তরের সাধকগণ) সেভাবে উপকরণের মালিকের (আল্লাহর) সাথে যুক্ত থাকেন। এরপর তিনি বললেন, দানগুলোর প্রতি তাদের হৃদয়ের আসক্তির লক্ষণ হলো তারা তাঁর কাছে দানগুলোই চায়। আর সিদ্দিকের হৃদয়ের, দানের মালিকের প্রতি আসক্তির লক্ষণ হলো— তাঁর উপর দান বর্ষিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি সেগুলোর চেয়ে তাঁকে (আল্লাহকে) নিয়েই ব্যস্ত থাকেন।

এরপর তিনি বললেন: আল্লাহর উপর তোমার নির্ভরতা যেন বর্তমান অবস্থার ভিত্তিতে হয়, অবস্থার সাথে আল্লাহকে মিলিয়ে নয়। এরপর তিনি বললেন, বুঝতে চেষ্টা করো, কারণ এটি তাওহিদের গুণাগুণ।

মুহাম্মাদ ইবনে আহমদ ইবনে সালামাহ বলেন, আমি জুননুন আল-মিসরিকে বলতে শুনেছি, যখন আমি বিদায়ের সময় তাঁর কাছে উপদেশ চেয়েছিলাম, তখন তিনি বললেন, মানুষের দোষত্রুটি যেন তোমাকে নিজের দোষ দেখা থেকে বিরত না রাখে; তুমি তাদের উপর পর্যবেক্ষক নও। এরপর তিনি বললেন, আল্লাহর কাছে বান্দাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় সে, যে তাঁকে সবচেয়ে বেশি বোঝে।

আর মানুষের বুদ্ধিমত্তার পূর্ণতা এবং বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে তার বিনয়ের প্রমাণ পাওয়া যায় কতগুলো আচরণের মাধ্যমে।

১. যখন কেউ কথা বলে, তখন তা মনোযোগ দিয়ে শুনে, যদিও সে নিজে ওই বিষয়ে জানে।

২. দ্রুততার সাথে সত্যকে গ্রহণ করে, যদিও সত্য বহনকারী তার চেয়ে নিম্নস্তরের হয়।

৩. নিজের ভুল হলে তা স্বীকার করে।

সাঈদ ইবনে উসমান বলেন, আমি জুননুন আল-মিসরিকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে আল্লাহকে স্মরণ করে, সে তাঁর আল্লাহ ছাড়া সবকিছু ভুলে যায়। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া সবকিছু ভুলে যায়, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য সবকিছু রক্ষা করেন এবং তিনি তার জন্য সবকিছুর বিনিময় হয়ে যান।

তিনি (সাঈদ ইবনে উসমান) বলেন, আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, বাহ্যিকভাবে যারা আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ইঙ্গিত করে (বা আলোচনা করে), তারা আল্লাহ থেকে সবচেয়ে দূরে থাকে।

হে আমার ইলাহ, যদি আপনার আনুগত্যের পাশে আমার আমল ছোটো হয়েও থাকে, তবে আপনার আশার পাশে আমার আশা অনেক বড়ো।

যে ব্যক্তি আশা হারানোর তরবারি দিয়ে লোভের কণ্ঠনালী জবাই করে, এবং লোভের পরিখা ভরাট করে দেয়; সে খেদমতের কিমিয়া লাভ করে।

যে ব্যক্তি মারুফ (সৎকর্ম)-এর বালতি দিয়ে জুহদ (দুনিয়াবিমুখতা)-এর রশি ব্যবহার করে পানি তোলে; সে হিকমত (জ্ঞান)-এর কূপ থেকে পানি তোলে।

যে ব্যক্তি কষ্টের উপত্যকা অতিক্রম করে, সে অনন্ত জীবন লাভ করে।

যে ব্যক্তি আল্লাহভীতির কাস্তে দিয়ে গুনাহের ঘাস কাটে, তার জন্য ইস্তিকামাতের (দৃঢ়তার) বাগান আলোকিত হয়ে ওঠে।

যে ব্যক্তি নীরবতার ছুরি দিয়ে তার জিহ্বা কর্তন করে, সে আরামের মিষ্টতা খুঁজে পায়।

যে ব্যক্তি সত্যবাদিতার বর্ম পরিধান করে, সে বাতিলের (মিথ্যার) সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার শক্তি পায়।

আর যে ব্যক্তি অজ্ঞের প্রশংসায় আনন্দিত হয়, শয়তান তাকে নির্বুদ্ধিতার পোশাক পরিয়ে দেয়।

হিলাল ইবনুল আলা বলেন, জুননুন আল-মিসরি বলেছেন, যে নত হয়, সে তাজা ফল সংগ্রহ করে, আর যে অহংকার করে, সে ধ্বংসের সম্মুখীন হয়।

সাঈদ ইবনে উসমান বলেন, আমি জুননুন আল-মিসরিকে বলতে শুনেছি, এমন ব্যক্তির ভালোবাসার উপর কখনোই নির্ভর করো না, যে তোমাকে শুধু মাসুম (নিষ্কলুষ বা নিষ্পাপ) থাকলেই ভালোবাসে।

তিনি আরো বললেন, যে ব্যক্তি তোমার সাথে বন্ধুত্ব রাখে এবং তুমি যা পছন্দ করো তাতে তোমার সাথে একমত হয়, কিন্তু তুমি যা অপছন্দ করো তাতে তোমার বিরোধিতা করে; সে তো মূলত তার নিজের প্রবৃত্তির সাথে বন্ধুত্ব রাখে। আর যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তির সাথে বন্ধুত্ব রাখে, সে তো কেবল দুনিয়ার আরামই তালাশকারী।

আমি তাঁকে আরো বলতে শুনেছি, প্রত্যেক অনুগত ব্যক্তিই ঘনিষ্ঠতা (আনুগত্যের সুখ) অনুভব করে। প্রত্যেক পাপীই একাকিত্ব (শূন্যতা) অনুভব করে। প্রত্যেক প্রেমিকই বিনীত। প্রত্যেক ভীত ব্যক্তিই পলায়নকারী। প্রত্যেক আশাবাদী ব্যক্তিই তালাশকারী। আবু উসমান, সাঈদ ইবনে উসমান আল-খাইয়্যাত বলেন, আমি জুননুন আল-মিসরিকে বলতে শুনেছি, আমি একাকিত্বের মতো ইখলাস (একনিষ্ঠতা) অর্জনের জন্য বেশি প্রেরণা সৃষ্টিকারী আর কিছু দেখিনি। কারণ, যখন সে নির্জনে থাকে, তখন আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে দেখে না। আর যখন সে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে দেখে না, তখন আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য কিছু তাকে চালিত করে না। আর যে ব্যক্তি নির্জনতা ভালোবাসে, সে ইখলাসের খুঁটি আঁকড়ে ধরেছে।২৭

ইবরাহিম ইবনে ইউনুস বলেন, আমি জুননুন আল-মিসরিকে বলতে শুনেছি, তিনি বলতেন, “সাবধান! যেন তুমি মারিফাতের নামের দাবিদার না হও, বা জুহদের (দুনিয়াবিমুখতা) মাধ্যমে জীবিকা অর্জনের পথ না বানাও কিংবা ইবাদতের সাথে স্বার্থ বা নির্ভরতার সম্পর্ক স্থাপন না করো।”

একই সূত্রেই বর্ণিত আছে যে, আমি জুননুন (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, তাঁকে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো ‘সবচেয়ে সূক্ষ্ম এবং সবচেয়ে কঠিন পর্দা কোনটি?’ তিনি বললেন, ‘নিজেকে দেখা ও নিজের পরিকল্পনা করা— এ দু’টোই সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও কঠিন পর্দা।’

সাঈদ ইবনে উসমান আল-খাইয়াত বলেন, আমি জুননুন আল-মিসরিকে বলতে শুনেছি, তিনি বলতেন,“যে বিনয় অর্জন করতে চায়, সে যেন নিজের মনকে আল্লাহর মহত্ত্বের দিকে মনোযোগী করে। কারণ, তখন তার আত্মা গলে যাবে ও পরিশুদ্ধ হবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পরম ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের দিকে দৃষ্টি দেয়, তার নিজের অহংকার ও প্রভুত্ব বিলীন হয়ে যায়। কেননা সমস্ত আত্মা তাঁর মহান মহিমার সামনে নিঃস্ব ও অসহায়।”

সাঈদ ইবনে উসমান বলেন, আমি জুননুন আল-মিসরিকে বলতে শুনেছি, তিনি বলতেন,“আমি এমন কোনো অজ্ঞ ডাক্তার দেখি না, যে মাতাল অবস্থায় মদ্যপকে চিকিৎসা করতে চায়। কারণ, মাতালের চিকিৎসা হয় না যতক্ষণ না সে সুস্থ হয়ে ওঠে। তেমনি, পাপাচারীরও চিকিৎসা নেই যতক্ষণ না সে তওবা করে।”

একই সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলতেন,“আমি এমন কোনো কিছু দেখিনি, যা ইখলাস (নির্মল নিয়ত ও একান্ততা)-এর অনুপ্রেরণা জাগায়, একাকিত্ব এর চেয়ে বেশি। কারণ, যখন মানুষ একাকী হয়, তখন সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে দেখে না। আর যখন সে আল্লাহ ছাড়া কাউকে দেখে না, তখন তার সমস্ত নড়াচড়া কেবল আল্লাহর হুকুমেই হয়। সুতরাং, যে ব্যক্তি নির্জনতা ভালোবাসে, সে যেন ইখলাসের স্তম্ভকে আঁকড়ে ধরে, এবং সত্যবাদিতার অন্যতম মহান স্তম্ভে দৃঢ়ভাবে অবিচল থাকে।”

আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার লক্ষণ হলো— আল্লাহর প্রিয়জন (হজরত মুহাম্মদ ﷺ)-এর অনুসরণ করা, তাঁর চরিত্রে, আচরণে, আদেশে ও সুন্নতে।

যখন অন্তরে ইয়াকিন (দৃঢ় বিশ্বাস) সত্য ও পরিপূর্ণ হয়, তখনই অন্তরে প্রকৃত ভয় (খাশিয়ত) জন্ম নেয়।

যে মানুষ সৃষ্টির সাথে অতিরিক্ত সখ্য স্থাপন করে, সে যেন ফিরআউনের আসনে বসেছে (অর্থাৎ, অহংকার ও আত্মমুগ্ধতার আসনে)। আর যে ব্যক্তি নিজেকে পর্যবেক্ষণ থেকে গায়েব হয়ে যায় (অর্থাৎ নিজের অস্তিত্বকে ভুলে শুধু আল্লাহর দিকে মনোযোগ দেয়), সে নিখাদ ইখলাস অর্জন করে। আর যার সমস্ত মনোযোগ কেবল আল্লাহর প্রতি নিবদ্ধ থাকে, তার কাছে দুনিয়ার কোনো কিছু হারানো বা না-পাওয়া কোনো অর্থ বহন করে না।

ইউসুফ ইবনুল হুসাইন বলেছেন, আমি হজরত জুননুন (রহ.) কে বলতে শুনেছি,“সত্য হচ্ছে আল্লাহর তরবারি, পৃথিবীতে যেখানেই এটা নেমে আসে, সেটা মিথ্যা ও কপটতার পর্দা কেটে ফেলে।”

অন্য সূত্রে বর্ণিত, হজরত জুননুন (রহ.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার আমল (ইবাদত) দিয়ে নিজেকে সাজায় (লোক দেখানোর জন্য কাজ করে), তার সৎকর্মগুলোই পরিণত হয় পাপরূপে।”

হজরত জুননুন (রহ.) বলেছেন,“ভয় হলো আমলের প্রহরী, আর আশা হলো বিপদের সময়ে শাফাআতকারী (সান্ত্বনাদাতা)।”

তোমার প্রয়োজন আল্লাহর কাছে চাইবে দারিদ্র্যের ভাষায় ,প্রজ্ঞার ভাষায় নয়।”(অর্থাৎ, অহংকার বা যুক্তি দিয়ে নয়; ভিক্ষুকের মতো বিনম্র হৃদয়ে চাও।)

আলী ইবনু আবদুল্লাহ আল-কারজি থেকে বলেছেন, আমি হজরত জুননুন (রহ.) কে বলতে শুনেছি,“ইবাদতের চাবিকাঠি হলো চিন্তা-মনন, প্রবৃত্তির নিদর্শন হলো কামনার অনুসরণ, আর তাওয়াক্কুলের (আল্লাহর উপর ভরসা) লক্ষণ হলো লোভের সম্পূর্ণ ছেদন।”২৮

ওফাত:

তিনি ওফাত বরণ করেন হিজরি ২৪৫ সনের জিলকদ মাসে। যখন তিনি ওফাত লাভ করলেন, তখন তাঁর জানাযার উপরে পাখিরা ছায়া দিয়ে উড়ছিল। এতে মানুষ তাঁর মর্যাদা বুঝতে পারল এবং মৃত্যুর পর তাঁকে সম্মান করতে শুরু করল।২৯

হাইয়্যান ইবনে আহমাদ আস-সাহমী (রহ.) বলেছেন, তিনি গিযাহ-তে ইন্তেকাল করেন। পরে লোকসমাগমের ভয়ে তাঁর দেহকে নৌকায় করে মিশরে নিয়ে যাওয়া হয়, কারণ সেতুতে মানুষের ভিড় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। এটি ঘটেছিল জিলকদ মাসের দুই রাত অতিবাহিত হওয়ার পর, ২৪৬ হিজরিতে।

অপর বর্ণনায় তিনি ২৪৮ হিজরিতে ইন্তেকাল করেছেন। কিন্তু প্রথম বর্ণনাটিই অধিক নির্ভরযোগ্য।৩০