আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের মধ্যে কিছু মানুষ এমন আছেন, যাঁদের জীবন আল্লাহপ্রেম, ইলম, ও জুহদের (দুনিয়ার প্রতি বিমুখতা) জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁদের অন্তর আল্লাহর দিকে এমনভাবে নিবিষ্ট থাকে যে, দুনিয়ার ঝলমলে মোহ তাঁদের এক বিন্দুও আকৃষ্ট করতে পারে না। তাঁদের জীবন, চিন্তা ও ত্যাগের ইতিহাস আমাদের জন্য আলোকবর্তিকা। তেমনি এক মহান অলি, জাহেদের প্রতীক, ইলম ও আখলাকের মূর্তপ্রতিক হজরত দাউদ আত্-ত্বায়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি।
প্রাথমিক পরিচিতি:
তাঁর নাম আবু সুলায়মান দাউদ ইবনু নুসাইর আত্-ত্বায়ী আল-কুফি। লকব— ইমামুল ফকিহ, আল কুদওয়াতুজ জাহেদ, আলেমে রব্বানী। তিনি তৎকালীন সময়ে আল্লাহর অলি হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন।১
১০০ হিজরির আশেপাশে ‘আস-সাওয়াদ’নামক অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানেই শৈশব ও কৈশোরকাল অতিবাহিত করেন। পরবর্তীতে ইলম ও আধ্যাত্মিকতার অন্বেষণে কুফা নগরীতে চলে যান, যা সে সময় ইসলামি জ্ঞানের প্রধান কেন্দ্র ছিল।
তাঁর বংশোদ্ভব ছিল খোরাসানী, অর্থাৎ পূর্বাঞ্চলের এক জ্ঞানপিপাসু ও মর্যাদাসম্পন্ন পরিবারে তাঁর জন্ম। তবে তাঁর শৈশবকাল, পারিবারিক অবস্থা ও লালন-পালনের বিষয়ে ঐতিহাসিক তথ্য অত্যন্ত অল্প পাওয়া যায়। তবুও এতটুকু স্পষ্ট যে, শৈশব থেকেই তিনি চিন্তা, অধ্যবসায় ও ইলমপ্রেমে অনন্য ছিলেন। পরবর্তীতে এই গুণাবলিই তাঁকে ফিকহ ও ইবাদতের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।২
ইলম অর্জন:
হজরত দাউদ আত্-ত্বায়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম ও মুহাদ্দিসদের কাছ থেকে ইলম ও হাদিস শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল মালিক ইবনু উমাইর, হুমায়দ আত্-তাওয়ীল, হিশাম ইবনু উরওয়া, এবং সুলাইমান আল-আ‘মাশ রহিমাহুমুল্লাহ। এছাড়াও তিনি বহু বিশিষ্ট মুফাসসির ও মুহাদ্দিসের সান্নিধ্যে থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এঁর কাছে অধ্যয়ন করে তিনি ইলমে ফিকহে অগ্রগণ্য হয়ে ওঠেন। কিন্তু পরে তিনি সম্পূর্ণভাবে দুনিয়াবিমুখ হয়ে নিজের আত্মার পরিশুদ্ধিতে মনোনিবেশ করেন, নীরবতা অবলম্বন করেন, আত্মগোপন করেন এবং আল্লাহর পথে নিজেকে উৎসর্গ করেন।৩
তাঁর ছাত্রগণ:
তাঁর জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের বহু আলেমের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর নিকট থেকে বহু খ্যাতনামা মুহাদ্দিস ও তাবি‘উত-তাবিঈন হাদিস ও ফিকহ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন— ইসহাক ইবনে মানসুর আস-সালুলী, ইসমাঈল ইবনে উলিয়াহ, আফলাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে জুর‘আহ আস-সুলামী আল-বুখারী,হাম্মাদ ইবনে আবি হানিফা,যাফির ইবনে সুলায়মান, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ,শু‘আইব ইবনে হারব, সালিহ ইবনে মূসা, যাফার ইবনে আবদুর রহমান আল-হিম্মানী, আবাআহ ইবনে কুলাইব, আবদুল্লাহ ইবনে ইদরিস, আতা ইবনে মুসলিম আল-হালাবী আল-খাফাফ, আবু নু‘আইম আল-ফাদল ইবনে দুকাইন, আল-ফাদল ইবনে মূসা আস-সিনানী, আল-কাসিম ইবনে আজ-জাহহাক ইবনে আল-মুখতার ইবনে ফুলফুল, মুস‘আব ইবনে আল-মিকদাম, মু‘আবিয়া ইবনে হাফস, ওয়াকী ইবনে আল-জাররাহ, এবং আল-ওয়ালীদ ইবনে উকবা আশ-শাইবানী সহ আরও বহু জ্ঞানান্বেষী ছাত্র।৪
দ্বীনে ফেরার গল্প:
মুহাম্মদ ইবনু হাতিম আল-বাগদাদি বলেন, আমি আল-জামানি নামের এক ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি, ‘দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.)-এঁর তাওবা বা পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল একটি ঘটনার মাধ্যমে। একদিন তিনি কবরস্থানে গিয়েছিলেন। সেখানে এক নারী কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল—‘তুমি এই কবরেই থাকছো যতক্ষণ না আল্লাহ পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত মানুষকে উঠিয়ে দেবেন। তোমার সঙ্গে দেখা হবে বলে আশা করা যায় না, অথচ তুমি খুব কাছেই আছো। প্রতিদিন ও প্রতি রাতে তোমার শরীরের ক্ষয় বাড়ছে, অথচ তুমি সেই প্রিয়জন, যার স্মৃতিও আমার হৃদয়ে মলিন হয়ে যাচ্ছে।’এই কথাগুলো শুনে দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.) গভীরভাবে প্রভাবিত হন। এভাবেই তাঁর হৃদয়ে দুনিয়ার প্রতি বিমুখতা ও আখিরাতের চিন্তা জাগ্রত হয়।
ইবনু ‘আইশা বলেন, ‘একবার দাউদ (রহ.) একটি কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি শুনলেন, এক নারী কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে এবং বলছে— ‘হে আমার প্রিয়জন, জানতে ইচ্ছে করে, তোমার কোন গাল থেকে পচন শুরু হয়েছে? ডান দিক থেকে, না বাম দিক থেকে?’ এই কথা শুনে দাউদ আত-তায়ী (রহ.) অচেতন হয়ে পড়েন।৫
তাঁর জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:
একবার একজন লোক তাঁকে একটি হাদিস সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন— “আমাকে ছাড়ুন, আমার প্রাণ যে কোনো মুহূর্তে বেরিয়ে যেতে পারে!”
ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.) তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করতেন এবং বলতেন,“দাউদ নিজ পথকে চিনে নিয়েছেন।”
ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহ.) বলতেন,“সত্যিকার ধর্মচর্চা ও তাসাউফ বলতে যা বোঝায়, তা-ই ছিল দাউদ আত-তায়ী।”
কেউ কেউ বলেছেন, তিনি তাঁর সমস্ত বই ও পাণ্ডুলিপি পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। যখন জায়েদা নামক এক আলিম তাঁকে কোনো আয়াতের তাফসির জিজ্ঞেস করলেন, তিনি বললেন,“হে মানুষ, এখন উত্তরের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।”অর্থাৎ তিনি নিজেকে আল্লাহর স্মরণে এতটাই নিমগ্ন রেখেছিলেন যে দুনিয়ার কোনো আলোচনা তাঁর অন্তরে স্থান পেত না।৬
আবু হাফস বলেন, আমি ইবনু আবি আদি থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.) চল্লিশ বছর রোজা রাখতেন, অথচ তাঁর পরিবার এ বিষয়ে কিছুই জানতো না। তিনি নিজে রেশম ব্যবসায়ী ছিলেন, পথে খাওয়া–দাওয়া নিয়ে চলতেন এবং যে খাবার সাথে থাকত তা অভাবীদের মাঝে সদকা করে দিতেন। এরপর রাতে বাড়ি ফিরতেন এবং পরিবারের সঙ্গে ইফতার করতেন, তারা জানতো না তিনি দিনভর রোজা ছিলেন।
ওয়ালিদ ইবনু উকবাহ বলেন, দাউদ আত-তায়ীর জন্য ষাটটি রুটি বানানো হতো। তিনি সেগুলো দড়িতে ঝুলিয়ে রাখতেন, প্রতিদিন রাতে কেবল দুটি রুটি, একটু লবণ ও পানি দিয়ে ইফতার করতেন। এক রাতে তিনি রুটি সামনে রেখে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর এক কৃষ্ণাঙ্গ দাসী দেখছিলেন। তিনি উঠে এসে খেজুরভর্তি একটি থালা এনে দিলেন। তিনি সেই খেজুরে ইফতার করলেন, তারপর সারা রাত নামাজে কাটালেন এবং সকালে আবার রোজা রাখলেন। পরের রাতে তিনি রুটি ও লবণ নিয়ে ইফতারের প্রস্তুতি নিলেন।
ওয়ালিদ বলেন, তার এক প্রতিবেশী আমাকে বললেন, “আমি শুনেছি, তিনি আপনাআপনি বলছিলেন— ‘গতরাতে তুমি খেজুর খেতে চেয়েছিলে, আমি তা দিলাম; আজ আবার খেজুর খেতে চাও? দাউদ, তুমি দুনিয়ায় থাকা পর্যন্ত আর খেজুরের স্বাদ পাবে না।”৭
মুহাম্মদ ইবনে হাসান বর্ণনা করেছেন, একদিন তাঁর চাচা বললেন,‘মুহাম্মদ ইবনে কাহতাবা কুফায় এসেছিলেন। তিনি বললেন,“আমি এমন একজন শিক্ষক চাই যিনি আমার সন্তানদের শিক্ষা দেবেন— কুরআন হিফজকরণ, রসুলুল্লাহ ﷺ-এঁর সুন্নাহ ও আসার (সহীহ বর্ণনা), ফিকহ, ব্যাকরণ, কবিতা ও ইতিহাস ইত্যাদি।”তখন লোকেরা বলল,“এই সব গুণ একত্রে কার মাঝে আছে জানো? কেবল দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.)-এঁর মাঝেই।”তখন মুহাম্মদ ইবনে কাহতাবা (যিনি দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.)-এর চাচাতো ভাই) তাঁকে খবর পাঠালেন, এবং প্রস্তাব করলেন যেন তিনি তাঁর সন্তানদের শিক্ষক হন। সাথে প্রচুর অর্থ ও সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কিন্তু দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.) তা প্রত্যাখ্যান করলেন। তখন তিনি তাঁর কাছে এক বস্তা অর্থ (দশ হাজার দিরহাম) পাঠালেন। বললেন, “এগুলো তোমার যুগের কষ্ট লাঘবে কাজে লাগাও।”কিন্তু তিনিও সেটি ফিরিয়ে দিলেন। অতঃপর তিনি আবার দুই বস্তা দিরহাম ও দুইজন দাস পাঠালেন, এবং তাদের বললেন—“যদি তিনি এগুলো গ্রহণ করেন, তাহলে তোমরা উভয়েই মুক্ত।” যখন তারা সেই সম্পদ নিয়ে দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.)-এর কাছে গেলেন, তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। তখন তারা বলল,“হে আমাদের মুনিব, আপনি যদি এগুলো গ্রহণ করেন, তবে আমরা মুক্ত হব।”দাউদ আত্-তায়ী (রহ.) বললেন, আমি আশঙ্কা করি, এগুলো গ্রহণ করলে আমার গলা হয়তো জাহান্নামের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যাবে! তাই এগুলো ফিরিয়ে দাও। এবং তাকে (মুহাম্মদ ইবনে কাহতাবাকে) বলো, এই সম্পদ সেই ব্যক্তির কাছেই ফিরিয়ে দিক, যাঁর কাছ থেকে এটি নেওয়া হয়েছিল। আমায় দেওয়ার চেয়ে সেটি অনেক উত্তম।”৮
একবার কেউ তাঁকে বলল, “আপনি তো দুনিয়ার সামান্য জিনিসেই সন্তুষ্ট হয়ে গেছেন!” তিনি বললেন, “আমি কি তোমাকে এমন এক ব্যক্তির কথা বলব, যিনি আমার থেকেও কম জিনিসে সন্তুষ্ট হয়েছেন? তিনি সেই ব্যক্তি, যিনি পুরো দুনিয়াকেই আখিরাতের বদলে গ্রহণে সন্তুষ্ট হয়েছেন!” (অর্থাৎ, আমি যদিও সামান্য দুনিয়ায় খুশি, কিন্তু তারা তো দুনিয়ার বিনিময়ে আখিরাত হারিয়ে খুশি হয়ে গেছে!)
আরো বর্ণিত আছে একদিন তিনি বাজারে গেলেন। সেখানে তিনি তাজা খেজুর দেখতে পেলেন, তাঁর মন তা খাওয়ার বাসনা করল। তিনি বিক্রেতাকে বললেন, “আমাকে এক দিনারের পরিমাণ খেজুর দিন, আমি কালকে দাম দিয়ে যাব।”বিক্রেতা বলল, “যান, কাজকর্ম করুন!” এই কথা শুনে সেখানে উপস্থিত এক পরিচিত ব্যক্তি তাঁর জন্য এক থলি টাকা বের করলেন, যার মধ্যে ছিল একশত দিনার। বললেন,“এই নিন, যদি কেউ আপনাকে এক দিনারের খেজুর দেয় তাহলে এই একশত দিনারই আপনার।”তখন বিক্রেতা দৌড়ে এসে বলল,“আচ্ছা হজরত, ফিরে আসুন, আপনি আপনার খেজুর নিয়ে যান।”কিন্তু দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.) বললেন,“আমার এখন আর তার প্রয়োজন নেই। আমি এই নফসকে (মনকে) পরীক্ষা করেছি এবং দেখেছি এই দুনিয়ার দামে এর মূল্য এক দিনারও নয়। তবু এটি চায় জান্নাতের দাম!”৯
আত্মশুদ্ধি অর্জন:
ইবনু উয়াইনা (রহ.) বলেন,“দাউদ এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি জ্ঞান ও ফিকহে গভীরভাবে দক্ষ ছিলেন। একদিন তিনি ভুলক্রমে কাউকে আঘাত করেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) তাঁকে বললেন, ‘হে আবু সুলায়মান, তোমার জবান ও হাত দীর্ঘ হয়ে গেছে।’এরপর তিনি পুরো এক বছর মানুষ থেকে দূরে একাকী থেকে আত্মসমালোচনায় নিমগ্ন থাকলেন, কারও সাথে কথা বললেন না, কোনো প্রশ্নের উত্তরও দিলেন না।”বর্ণনাকারী বলেন,“তিনি নিজেকে এমন কঠোরভাবে প্রশিক্ষিত করেছিলেন যে, একাকিত্ব ও নীরবতাই তাঁর আত্মার খাদ্যে পরিণত হয়েছিল।”১০
ইবাদত ও রিয়াজত:
আবু উসামা বলেন,“আমি ও ইবনু উয়াইনা একবার তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলাম। তিনি বললেন, ‘তোমরা একবার এসেছিলে, আবার এসেছো, কিন্তু আর যেন না আসো।”(অর্থাৎ তিনি চেয়েছিলেন সম্পূর্ণ নির্জনতা ও আল্লাহর সাথে একান্ত সম্পর্ক।)
কেউ কেউ বলেছেন,“তিনি যখন ফরজ নামাজ শেষ করতেন, তখন দ্রুত নিজের ঘরে ফিরে যেতেন।”
ইসহাক আস-সালুলী বলেন, আমাকে উম্মে সাঈদ নামের এক মহিলা বলেছিলেন,“আমাদের ও দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.)-এঁর বাড়ির মধ্যে একটি ছোট দেয়াল ছিল। আমি প্রতি রাতে তাঁর কান্নার শব্দ শুনতাম। তিনি কখনোই শান্ত হতেন না। রাতের শেষ প্রহরে তিনি কখনো কখনো এমন সুরে কুরআন তিলাওয়াত করতেন যে, মনে হতো দুনিয়ার সব সুখ যেন তাঁর কণ্ঠেই একত্রিত হয়েছে। তিনি কখনো বাতি জ্বালাতেন না।”
আবু দাউদ আল-হাফরী বলেন,“তিনি আমাকে বলেছিলেন— ‘তুমি একসময় আমার কাছে আসতে, এখন আর আমি চাই না তুমি আসো।’১১
মুহাম্মদ ইবনু উসমান আস-সাইরাফি বলেন,“আবু রুবাই’ আল-আ‘রাজ নামের এক ব্যক্তি ওয়াসিত শহর থেকে বিশেষভাবে দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.)-এঁর সাক্ষাৎ লাভের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন যেন কিছু শুনতে ও তাঁকে দেখতে পারেন। তিনি তাঁর দরজার সামনে তিনদিন অবস্থান করেন, কিন্তু দেখা করার সুযোগ পাননি। তিনি বলেন,‘দাউদ আত-তায়ী (রহ.) নামাজের জন্য যখন আজান শুনতেন, তখন ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদে যেতেন; ইমাম সালাম ফিরিয়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গে উঠে ঘরে ফিরে যেতেন।”তিনি আরো বলেন, আমি এক মসজিদে নামাজ পড়লাম, তারপর অন্য মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করলাম। এরপর আমি হজরত দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.)-এর দরজার সামনে গিয়ে বসলাম। যখন তিনি ঘরে প্রবেশের জন্য এলেন, আমি বললাম, “আমি একজন মেহমান, আল্লাহ আপনাকে রহম করুন।”তিনি বললেন, “যদি তুমি মেহমান হও, তবে ভেতরে প্রবেশ করো।”আমি ঘরে প্রবেশ করলাম এবং টানা তিনদিন তাঁর সাথে ছিলাম, কিন্তু তিনি আমার সাথে কোনো কথা বললেন না। তিনদিন পর আমি বললাম,“আল্লাহ আপনাকে রহম করুন, আমি ওয়াসিত শহর থেকে এসেছি। আমি আপনার কাছ থেকে কিছু উপদেশ চাই।”তিনি বললেন, “দুনিয়াকে রোজা রাখো, আর তোমার ইফতার হোক মৃত্যু।”আমি বললাম, “আরও কিছু বলুন।”তিনি বললেন, “মানুষের কাছ থেকে এমনভাবে দূরে থাকো, যেমন সিংহ থেকে পালানো হয়। কিন্তু তাদের সমালোচনা করো না, এবং মুসলমানদের জামাআত ত্যাগ করো না।”আমি আরও কিছু জানতে চাইলাম, কিন্তু তিনি উঠে দাঁড়িয়ে মিহরাবে গেলেন এবং নামাজে দাঁড়িয়ে বললেন— আল্লাহু আকবার।
আবু রাবি’ আল-আরাজ বলেন, আমি হজরত দাউদ আত্-ত্বায়ীর কাছে গিয়েছিলাম। তিনি ঘর থেকে বের হতেন না, যতক্ষণ না মসজিদে ক্বদ ক্বামাতিস সালাত বলা হতো। তখন তিনি বের হতেন, নামাজ আদায় করতেন এবং ইমাম সালাম ফিরানোর পর সঙ্গে সঙ্গে জুতা নিয়ে ঘরে ফিরে যেতেন। অনেকদিন এই অবস্থা দেখে একদিন আমি তাঁকে থামালাম এবং বললাম,“হে আবু সুলাইমান, একটু দাঁড়ান।”তিনি দাঁড়ালেন। আমি বললাম,“হে আবু সুলাইমান, আমাকে কিছু উপদেশ দিন।”তিনি বললেন,“আল্লাহকে ভয় করো, আর যদি তোমার পিতা-মাতা জীবিত থাকেন, তবে তাঁদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো।”তারপর বললেন, “হায় আফসোস, দুনিয়াকে রোজা রাখো, আর তোমার ইফতার হোক মৃত্যু। মানুষের সঙ্গ থেকে দূরে থাকো, তবে জামাআত ত্যাগ করো না”১২
আত্মসমালোচনা:
এক ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,“তোমার কী প্রয়োজন?” লোকটি বলল, “আপনার জিয়ারত করতে এসেছি।”তখন হজরত দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.) বললেন, “তুমি নিশ্চয়ই ভালো কাজ করেছ যে তুমি জিয়ারতের জন্য এসেছ। কিন্তু ভাবো তো, আমার কী অবস্থা হবে, যখন আল্লাহ আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন—‘কে তুমি, যার জিয়ারত করতে লোক আসে?’ তুমি কি আল্লাহভীরু জাহিদদের অন্তর্ভুক্ত? আল্লাহর কসম, না। তুমি কি ইবাদতগোজারদের অন্তর্ভুক্ত? আল্লাহর কসম, না। তুমি কি নেককারদের অন্তর্ভুক্ত? আল্লাহর কসম, না।”এরপর তিনি নিজের নফসকে ভর্ৎসনা করতে করতে বললেন, “তরুণ বয়সে আমি ছিলাম পাপাচারী; বার্ধক্যে এসে আমি হয়ে গেছি কপট পরহেজগার।”১৩
জীবনযাপন:
আবু নু‘আইম (রহ.) বলেন,“আমি দাউদ আত্-ত্বায়ীকে দেখেছি। তিনি ছিলেন আরবী ভাষায় সর্বাধিক জ্ঞানী ও মানুষদের মধ্যে স্পষ্টভাষী ব্যক্তি। তিনি একটি লম্বা কালো টুপি পরতেন।”
হাফস আল-জুআফি বলেন,“তিনি তাঁর মায়ের কাছ থেকে চারশত দিরহাম উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। সেই অর্থ দিয়ে তিনি ত্রিশ বছর পর্যন্ত জীবনধারণ করেন। যখন টাকাগুলো শেষ হয়ে যায়, তখন তিনি তাঁর কুঁড়েঘরের ছাদের কাঠ খুলে বিক্রি করে দিন কাটাতেন।”
আতা ইবনু মুসলিম বলেন,“তিনি মাত্র তিনশ দিরহাম দিয়ে বিশ বছর কাটিয়েছিলেন।”১৪
আহমদ ইবনে আবি হাওয়ারি বর্ণনা করেন আবু সুলায়মান আদ-দারানী রহ. থেকে বর্ণিত,“দাউদ আত্-ত্বায়ী তাঁর মায়ের উত্তরাধিকারসূত্রে একটি বাড়ি পেয়েছিলেন। তিনি সেই বাড়ির একটি কক্ষ নষ্ট হয়ে গেলে অন্য কক্ষে চলে যেতেন। কিন্তু কখনোই কোনো ঘর মেরামত করতেন না, এমনকি একে একে পুরো বাড়িটাই ভেঙে পড়ল।
উবায়দ ইবনে জান্নাদ বর্ণনা করেন, আতা ইবনে মুসলিম থেকে, তিনি বলেন, আমরা যখন দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.)-এঁর ঘরে প্রবেশ করতাম, সেখানে কিছুই পাওয়া যেত না। কেবল একটি খড়ের চাটাই, একটি কাদার ইট যার উপর তিনি মাথা রাখতেন, একটি থালা যাতে কিছু শুকনো রুটি থাকত এবং একটি পানি রাখার পাত্র, যেখান থেকে তিনি অজু করতেন এবং পান করতেন। অর্থাৎ, তাঁর জীবন ছিল সম্পূর্ণ দুনিয়াবিমুখ, শুধু প্রয়োজনীয়তার সীমায় সীমাবদ্ধ।১৫
এতিম ও অসহায়দের প্রতি সহানুভূতি:
হাম্মাদ ইবনু আবি হানিফা বলেন, দাউদ আত্-ত্বায়ীর এক দাসী তাঁকে বলল, “হে দাউদ, যদি আমি আপনার জন্য কিছু চর্বি রান্না করে দিই?” তিনি বললেন,“ঠিক আছে, করে আনো।”সে রান্না করল এবং নিয়ে এলো। তখন তিনি বললেন,“অমুক বংশের এতিমদের কী অবস্থা?” সে বলল, “তাঁরা এখনও কষ্টে আছে।”তিনি বললেন,“এই খাবারটি ওদের কাছে নিয়ে যাও।”সে বলল, “আমার প্রাণ আপনার উদ্দেশে কুরবান হোক! আপনি কি শুধু রুটি আর পানি খাবেন?” তিনি বললেন, “আমি যদি এটা খাই, তবে তা পায়খানায় যাবে; কিন্তু ওই এতিমরা যদি খায়, তবে তা আল্লাহর কাছে সওয়াব হিসেবে জমা হবে।”
ক্বুবাইসা বর্ণনা করেন, এক মহিলা দাউদ আত-তায়ীর জন্য ঘি দিয়ে তৈরি ছারীদ (রুটি ও মাংস দিয়ে তৈরি বিশেষ খাবার) পাঠালেন। তিনি সেটি খাওয়ার আগে একজন দরিদ্র ব্যক্তি এলো। তিনি তাকে থালাটি তুলে দিলেন এবং দরিদ্র ব্যক্তির সঙ্গে বাইরে বসে খাওয়ালেন। এরপর ঘরে ফিরে থালাটি ধুয়ে রাখলেন। তারপর নিজের ইফতারের জন্য থাকা খেজুরটি দরিদ্র ব্যক্তিকে দিয়েছেন এবং নিজে যা ইফতার করেছেন তা খেয়েছেন। তাঁর এই ভক্তি এবং আত্মসংযম দেখে মনে হয় তিনি রাত কাটাতেন বসে বা মাথা নিচু করে। ক্বুবাইসা বলেন,“আমি দেখেছি, তিনি অত্যন্ত সংযত ছিলেন।”১৬
বাণী ও নসিহত:
একজন ব্যক্তি তাঁর নিকট উপদেশ চাইলে তিনি বললেন,“আল্লাহকে ভয় করো, তোমার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করো। হায় মানুষ, দুনিয়াকে রোজা রাখো আর তোমার ইফতার হোক মৃত্যু! মানুষ থেকে দূরে থাকো, তবে তাদের জামাতে (সালাতে) অংশগ্রহণ করতে ভুলো না।”তিনি আরও বলেছেন, “নিশ্চয়তা (ইয়াকিন) হলো সর্বোত্তম জুহদ, জ্ঞানই সর্বোত্তম ইবাদত, আর ইবাদতই সর্বোত্তম ব্যস্ততা।”১৭
আহমদ ইবনু আবি আল-হাওয়ারি বলেন, আমাকে মুহাম্মদ ইবনু ইয়াহইয়া বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.) বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা কখনও কোনো বান্দাকে গুনাহের লজ্জা ও হীনতা থেকে তাকওয়ার মর্যাদায় উন্নীত করেন না, যতক্ষণ না তিনি তাঁকে এমনভাবে সমৃদ্ধ করেন যে, সে অর্থহীন হয়েও ধনী হয়ে যায়। কোনো গোত্র বা পরিবারের শক্তি ছাড়াই সম্মানিত হয় এবং মানুষের সঙ্গ ছাড়াই আনন্দ ও সান্ত্বনা লাভ করে।”
বকর ইবনু মুহাম্মদ বলেন, দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.) আমাকে বলেছিলেন, “মানুষের কাছ থেকে এমনভাবে পালাও, যেমন তুমি সিংহ থেকে পালাও।”
আব্দুল্লাহ ইবনু ইদরিস বলেন, আমি দাউদ আত-তায়ীকে বললাম, “আমাকে উপদেশ দিন।”তিনি বললেন,“মানুষের সাথে পরিচয় কম রাখো।”আমি বললাম, “আরও বলুন।”তিনি বললেন,“যেমন দুনিয়ার মানুষরা ধর্ম হারিয়ে সামান্য দুনিয়াতেই সন্তুষ্ট থাকে, তুমিও ধর্ম ঠিক রেখে দুনিয়ার সামান্যে সন্তুষ্ট থাকো।”আমি বললাম, “আরও বলুন।”তিনি বললেন,“দুনিয়াকে এমন মনে করো যেন আজ তুমি রোজা রেখেছো, আর ইফতার করবে কেবল মৃত্যুর সময়।”
সাদাকা আয যাহেদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একবার কুফায় একটি জানাজায় অংশগ্রহণ করছিলাম। দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.) কবরের পাশে বসেছিলেন। মানুষ তাঁর আশেপাশে এসে বসেছিল। তখন তিনি বললেন, “যে আল্লাহর শাস্তির ভয় পায়, দূরের বিপদ তার কাছে ছোট মনে হয়। যে দীর্ঘ জীবন আশা করে, তার আমল দুর্বল হয়। যা আসতে চলেছে তা সবই নিকটবর্তী। হে ভাই, যা কিছু তোমাকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক থেকে বিভ্রান্ত করে, তা সবই তোমার জন্য বিপদসংকেত। কবরের লোকরা শুধু তাদের প্রদানকৃত বস্তুতে আনন্দ পায় এবং যা পিছিয়ে যায়, তা নিয়ে অনুতপ্ত হয়। আর দুনিয়ার লোকেরা যেভাবে লড়াই ও প্রতিযোগিতা করে, কবরের লোকেরা ঠিক সেভাবে অনুতপ্ত হয়।”
মুহাম্মদ ইবনু আশকাব বলেন, এক ব্যক্তি দাউদ আত্-ত্বায়ীর কাছে গেল। তিনি তাকে বললেন, “হে ভাই, রাত ও দিন মানুষের জন্য ধাপে ধাপে নেমে আসে; প্রতিটি পর্যায়কে ঠিকমতো পার করতে হবে। যদি তুমি প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পার, তবে তা করো। পথের অবসান দ্রুত হবে; তাই প্রস্তুত হও এবং নিজের কাজ সমাধা করো। আমি তোমাকে এটা বলছি, অথচ আমি নিজেও এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ।”এরপর তিনি উঠে চলে গেলেন।
আবদুল্লাহ ইবনু সালেহ বলেন, দাউদ আত্-ত্বায়ী বলতেন,“হে মানুষের সন্তান, তুমি তোমার ইচ্ছার পূর্ণতা দেখে আনন্দিত হও, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা তুমি পাও কেবল তোমার জীবনের মেয়াদের শেষ হওয়াযর মাধ্যমে। এবং তুমি তা অর্জন করলেও তোমার কাজ যেন অন্যের উপকারে যায়।”
ইবনুস-সামাক বলেন, আমার ভাই দাউদ আত্-ত্বায়ী আমাকে একটি উপদেশ দিয়েছিলেন,“খেয়াল রেখো, আল্লাহ যেন তোমাকে এমন স্থানে না দেখেন যেখানে তিনি যেতে নিষেধ করেছেন; আর তিনি যেন তোমাকে সেই স্থানে অনুপস্থিত না পান, যেখানে তিনি থাকতে আদেশ করেছেন। তাঁর নৈকট্য এবং তোমার উপর তাঁর ক্ষমতা স্মরণ করে লজ্জা করো।”১৮
ইবরাহিম ইবনে বাশশার আস-সুফি হজরত ইবরাহিম ইবনে আদহাম রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,“দাউদ আত্ব-ত্বায়ী (রহ.) বলতেন— খাওফ (ভয়) এর এমন কিছু আলোড়ন আছে যা আল্লাহভীরু লোকদের মাঝে স্পষ্টভাবে দেখা যায়; মুহাব্বাত এর এমন কিছু মর্যাদা আছে যা আল্লাহপ্রেমিকরাই চিনে নেয়; এবং আকুল আকাঙ্ক্ষা (শওক)-এর এমন কিছু ব্যাকুলতা আছে, যা কেবল অন্তরে তৃষ্ণার্ত আরেফিনরাই অনুভব করে। কিন্তু আজ তারা কোথায়? তারা-ই তো প্রকৃত সফল!”
ইবরাহিম ইবনে আদহাম আরও বলেন, “একবার দাউদ আত্-ত্বায়ী সুফিয়ান আস-সাওরি (রহ.)-কে বললেন,‘হে সুফিয়ান, তুমি যদি ঠান্ডা পানি পান করো, সুস্বাদু খাবার খাও আর ঘন ছায়ায় হেঁটে বেড়াও, তবে মৃত্যুকে ভালোবাসবে কবে? আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কখন জাগবে তোমার অন্তরে?’ এই কথা শুনে সুফিয়ান (রহ.) কেঁদে ফেললেন।”
ইন্তেকাল:
মশহুর তিনি হিজরি ১৬২ সালে ইন্তেকাল করেন। আরেক বর্ণনা মতে ১৬৫ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। বলা হয়, তাঁর জানাযায় এমন ভিড় হয়েছিল যে, তিন রাত পর্যন্ত মানুষ জেগে ছিল এই আশঙ্কায় যে,“যদি ঘুমিয়ে পড়ি তবে হয়তো দাউদ আত্-ত্বায়ী রহ.-এর জানাযা পাব না।” হাসান ইবনু বিশর বলেন,“আমি তাঁর জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। এত লোক হয়েছিল যে, তাঁর মরদেহ একের পর এক দুই বা তিনটি বিছানায় বহন করতে হয়েছিল, কারণ ভিড়ে জানাযার খাট ভেঙে যাচ্ছিল।”২০
আবু হাতিম আর-রাজী (রহ.) বর্ণনা করেন, (মুহাম্মদ ইবনু ইয়াহইয়া আল-ওয়াসিতী – মুহাম্মদ ইবনু বশীর – হাফস ইবনু ওমর আল-জুফি সূত্রে)“হজরত দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.) কিছুদিন অসুস্থ ছিলেন। তাঁর অসুস্থতার কারণ ছিল এক রাতে কুরআনের এমন একটি আয়াতের কাছে পৌঁছলেন, যাতে জাহান্নামের উল্লেখ ছিল। তিনি রাতভর ঐ আয়াতটি বারবার পাঠ করলেন, ভাবলেন এবং কাঁদলেন। সকালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং সেই অবস্থাতেই ইন্তিকাল করলেন।
তাঁকে এমন অবস্থায় পাওয়া গেল যে, একটি কাঁচা ইটের উপর মাথা রাখা আছে। যখন দরজা খোলা হলো, তাঁর কয়েকজন ভাই, প্রতিবেশী ও হজরত ইবনুস সাম্মাক (রহ.) প্রবেশ করলেন। তাঁর মাথার অবস্থান দেখে ইবনুস সাম্মাক বললেন, “হে দাউদ, তুমি ক্বারিদের (কুরআন পাঠকদের) লজ্জিত করে গেলে!”
এরপর যখন তাঁকে জানাযার জন্য বহন করা হলো, অসংখ্য মানুষ তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করল। এমনকি পর্দানশীন নারীরাও বেরিয়ে এলেন। তখন ইবনুস সাম্মাক (রহ.) কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন“হে দাউদ, তুমি মৃত্যুর আগে নিজেকে কারাগারে আবদ্ধ করেছিলে (দুনিয়ার মোহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে)। তুমি নিজের হিসাব নিজেই করে নিয়েছিলে, হিসাবের দিনের আগেই। আজ তুমি সেই পুরস্কার দেখতে পাবে, যার জন্য তুমি ক্লান্ত ছিলে, যার আশায় পরিশ্রম করেছিলে।”এ কথা শোনার পর হজরত আবু বকর ইবনু আয়্যাশ (রহ.) কবরের কিনারায় দাঁড়িয়ে দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ, দাউদকে তাঁর আমলের উপর নির্ভরশীল করে দেবেন না (বরং আপনার দয়া দ্বারা ক্ষমা করুন)।”মানুষ তাঁর এই দোয়াতে গভীরভাবে মুগ্ধ হয়েছিল।
ইসহাক ইবনু মনসুর আস-সালুলি (রহ.) বলেন,“যখন হজরত দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.) মৃত্যুবরণ করলেন, তখন অসংখ্য মানুষ তাঁর জানাযায় শরিক হলো। দাফনের পর হজরত ইবনুস সাম্মাক (রহ.) তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হে দাউদ, তুমি রাত্রে জেগে থাকতে, যখন মানুষ ঘুমিয়ে পড়ত।’তখন উপস্থিত সবাই একসঙ্গে বলল, ‘সত্য বলেছ।’তিনি আবার বললেন, ‘তুমি লাভ করেছিলে, যখন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।’লোকেরা বলল, ‘সত্য বলেছ।’তিনি বললেন, ‘তুমি নিরাপদে ছিলে, যখন মানুষ তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত ছিল।’সবাই বলল, ‘সত্য বলেছ।’এরপর ইবনুস সাম্মাক তাঁর সব গুণাবলি একে একে স্মরণ করলেন। তিনি শেষ করলে হজরত আবু বকর আন-নাহশালী (রহ.) দাঁড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন—“হে প্রভু, মানুষ তাদের জ্ঞানের সীমা অনুযায়ী যা জানে, তাই বলেছে। হে আল্লাহ, আপনার রহমতে তাকে ক্ষমা করুন, তার আমলের উপর নির্ভরশীল করে দেবেন না।”২১
জাফর ইবনু নফীল আর-রাহবী বর্ণনা করেছেন,“আমি দাউদ আত্-ত্বায়ী (রহ.)-কে মৃত্যু পরেও দেখেছি। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,‘আখিরাতের কল্যাণ তুমি কেমন দেখেছ?’ তিনি বললেন, ‘আমি অনেক কল্যাণ দেখেছি।’আমি জিজ্ঞেস করলাম,‘অবশেষে তুমি কোথায় পৌঁছেছ?’ তিনি বললেন, ‘আমি কল্যাণে পৌঁছেছি, আল্লাহর রহমতে।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম,‘সুফিয়ান ইবনু সাঈদের সম্পর্কে তোমার কোনো জানা আছে?’ তিনি বললেন, ‘তিনি কল্যাণ ও তার অনুরাগীদের ভালোবাসতেন, আল্লাহ তাঁকে কল্যাণের সঙ্গে সম্মান প্রদান করেছেন।’২২