এক সময়ের ভয়ংকর ডাকাত হঠাৎ আল্লাহর রহমতে এমনভাবে বদলে গেলেন যে, দুনিয়া তাঁকে চিনলো আবিদুল হারামাইন নামে। ইসলামের ইতিহাসে সেই উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম হজরত ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.)। নসবনামা ফুজাইল ইবনে ইয়াজ ইবনে মাসউদ ইবনে বিশর আত-তামীমী আল-ইরবুঈয়ী আল খোরাসানী। কুনিয়াত আবু আলী। লকব শাইখুল ইসলাম, আবিদুল হারামাইন।১

তিনি সমরকন্দে জন্মগ্রহণ করেন। বড় হয়েছিলেন আবিউরদ শহরে, যা সারাখস ও নিশার মধ্যবর্তী একটি নগরী।২

ইলম অর্জন:

তিনি ইলম অর্জনের জন্য কুফায় সফর করেন। সেখানে গিয়ে মানসুর, আল-আমাশ, বায়ান ইবনে বিশর, হুসাইন ইবনে আবদুর রহমান, লাইস, আতা ইবনে আস-সাইব, সাফওয়ান ইবনে সুলাইম, আবদুল আযীয ইবনে রাফি, আবু ইসহাক আশ-শাইবানী, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-আনসারী, হিশাম ইবনে হাসসান, ইবনে আবী লায়লা, মুজালিদ, আশ’আস ইবনে সাওওয়ার, জাফর আস-সাদিক, হুমাইদ আত-তাওয়ীল এবং কুফা ও হিজাজের অন্যান্য বহু ব্যক্তির নিকট থেকে ইলম অর্জন করেন।৩

উল্লেখযোগ্য শাগরেদবৃন্দ:

হাফিজ ইবনে হাজার (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.)-এঁর জ্ঞান থেকে একদল প্রখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস উপকৃত হয়েছিলেন। মজার বিষয় হলো, তাঁর নিজের শিক্ষক ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.)-ও তাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন, যা ইসলামী জ্ঞানের ধারাবাহিকতায় একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত। এছাড়াও তাঁর সমকালীন ইমাম সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা (রহ.)-ও তাঁর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে ইমাম আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক (রহ.)ও আছেন, যিনি ফুজাইল (রহ.)-এর আগেই ইন্তেকাল করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য ছাত্রদের তালিকায় আরও আছেন— ইয়াহইয়া আল-কাত্তান, ইবনে মাহদী, হুসাইন ইবনে আলী আল-জু’ফী, আবদুর রাজ্জাক, ইসহাক ইবনে মানসুর আস-সুলুলী, আল-আসমাআই, ইবনে ওয়াহাব, আশ-শাফেয়ী, মারওয়ান ইবনে মুহাম্মদ, মুয়াম্মিল ইবনে ইসমাঈল, হুরাইম ইবনে সুফিয়ান, ইউসুফ ইবনে মারওয়ান, ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া আত-তামীমী, আল-কাআনাবী, আহমদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে ইউনুস, মুসাদ্দাদ, মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে আবি উমর, আল-হুমাইদী, ইব্রাহীম ইবনে মুহাম্মদ আশ-শাফেয়ী, দাউদ ইবনে আমর, আবু আম্মার হুসাইন ইবনে হারিস আল-মরোজী, হুসাইন ইবনে রাবী আল-বুরানি, হাসান ইবনে ইসমাঈল আল-মাজালদী, আহমদ ইবনে আবদাহ আদ্বদ্বুবী, কুতাইবাহ ইবনে সাঈদ, উবায়দুল্লাহ ইবনে উমর আল-কাওয়ারিরী, উবদাহ ইবনে আব্দুর রহিম আল-মরোজী, মুহাম্মদ ইবনে জানবুর আল-মাক্কি, মুহাম্মদ ইবনে সুলায়মান লুইন এবং আরও অনেকে।৪

তাওবার ঘটনা:

ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.) এক সময় দস্যু হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি আবীবর্দ ও সারখাস-এর মধ্যবর্তী পথে ডাকাতি করতেন। তাঁর জীবনে পরিবর্তনের সূচনা ঘটে এক দাসীকে কেন্দ্র করে। ঐ দাসীর প্রতি আকর্ষণের কারণে তিনি তাওবা করতে প্ররোচিত হন। একবার তিনি প্রিয় দাসীর কাছে পৌঁছানোর জন্য দেয়াল টপকানোর চেষ্টা করছিলেন। সেই সময় তিনি শুনলেন কেউ কুরআন তিলাওয়াত করছেন। তিলাওয়াতরত আয়াতটি ছিল— أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ “হে ঈমানদারগণ, এখনও কি সেই সময় আসেনি যে, তোমাদের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে নম্র হবে?” (সুরা হাদিদ, আয়াত:১৬)। ফুজাইল (রহ.) এই আয়াত শুনে মনে মনে বললেন, ‘হ্যাঁ, হে আমার রব, সময় সত্যিই এসেছে।’ কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে যাত্রা শুরু করেন। যাত্রা করতে করতে এক ধ্বংসস্তূপের কাছে পৌঁছলেন, যেখানে কিছু মুসাফির অবস্থান করছিল। কেউ বললেন, “আমরা রওনা হই।” অন্যরা বলল, “ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করি, কারণ ফুজাইল পথে ডাকাতি করতে পারে।”

ফুজাইল (রহ.) চিন্তা করলেন, “আমি রাতজুড়ে পাপের কাজে লিপ্ত থাকি, আর কিছু মুসলিম আমার ভয় থেকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিচ্ছে। আল্লাহ আমাকে এখানে পৌঁছে দিয়েছেন যেন আমি সংযত হই।” অতঃপর তিনি আল্লাহর নিকট তাওবা করলেন এবং সত্যিকারের তাওবা সম্পন্ন করলেন। তাঁর জীবন এই মুহূর্ত থেকে নতুন দিশায় পরিবর্তিত হলো।৫

ইবাদত ও আল্লাহভীতি:

ইব্রাহিম ইবনে ইসহাক আত-তাবারী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ফুজাইলের চেয়ে নিজের জন্য বেশি ভয় এবং মানুষের জন্য বেশি আশাবাদী আর কাউকে দেখিনি। তার কুরআন তেলাওয়াত ছিল বিষণ্ন, আনন্দদায়ক, ধীর এবং শান্ত, যেন তিনি কারো সাথে কথা বলছেন। যখন তিনি জান্নাতের কথা উল্লেখ করে কোনো আয়াত পড়তেন, তখন তিনি তা বারবার পড়তেন এবং প্রার্থনা করতেন। রাতের বেলায় তাঁর বেশিরভাগ নামাজ বসে হতো। তাঁর মসজিদে তাঁর জন্য একটি মাদুর রাখা হতো। তিনি রাতের শুরুতে এক ঘণ্টা নামাজ আদায় করতেন, তারপর তাঁর চোখ ভারি হয়ে আসত, তিনি মাদুরে শরীর এলিয়ে দিতেন এবং কিছুক্ষণ ঘুমাতেন, তারপর উঠে আবার নামাজ আদায় করতেন। যখনই ঘুম আসত, তিনি ঘুমাতেন, তারপর আবার উঠে নামাজ আদায় করতেন, এভাবেই সকাল পর্যন্ত। তাঁর অভ্যাস ছিল যখনই তিনি তন্দ্রা অনুভব করতেন, তখন ঘুমিয়ে যেতেন। বলা হয়: সবচেয়ে কঠিন ইবাদত হলো এমন ইবাদত।৬

ইব্রাহিম ইবনে আল-আশআস বলেন, আমি কখনো এমন কাউকে দেখিনি, যার অন্তর এতটাই আল্লাহপ্রেমে পূর্ণ, যেমন ফুজাইল ইবনে ইয়াজ। যখন তিনি আল্লাহকে স্মরণ করতেন অথবা আল্লাহর কথা শুনতেন কিংবা কুরআন পাঠের সুর কানে পৌঁছাত, তখন তাঁর হৃদয় ভয় ও গম্ভীর দুঃখে কেঁপে উঠত। চোখে অশ্রু ভরে উঠত এবং তাঁর উপস্থিতি দেখলে যে কেউ তাঁর প্রতি সহানুভূতি ও দয়া অনুভব করত। তিনি ছিলেন সদা চিন্তাশীল, গভীর দুঃখী— যেন প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর মন আল্লাহর দিকে কাতর। আমি ফুজাইল ছাড়া আর কাউকে দেখিনি, যে তাঁর জ্ঞান, অনুভূতি, প্রতিক্রিয়া, দান, নিষেধ, ঘৃণা, ভালোবাসা— সমস্ত আচরণে শুধু আল্লাহকে খুঁজে বেড়াত।৭

তাঁর দুনিয়াবিমুখতা ও আখিরাত ভাবনা:

ইসহাক ইবনে ইব্রাহিম বলেন, এক ব্যক্তি একদিন তাঁকে জিজ্ঞেস করল,“আপনি কেমন আছেন, হে আবু আলী?” তিনি এই প্রশ্নে বিরক্ত হলেন। উত্তর দিলেন,“তুমি কি দুনিয়ার অবস্থার কথা জানতে চাইছো, নাকি আখিরাতের? যদি দুনিয়ার অবস্থা জানতে চাও, দুনিয়া তো আমাদের নিয়ে বিভিন্ন দিকে চলে যাচ্ছে। আর যদি আখিরাতের কথা জানতে চাও, তাহলে তুমি কি মনে করো এমন একজনের অবস্থা কেমন হবে, যার গুনাহ অনেক, আমল দুর্বল, জীবন শেষ হয়ে গেছে, আখিরাতের জন্য কোনো প্রস্তুতি নেই, মৃত্যু সামনে দাঁড়িয়েছে অথচ সে দুনিয়ার সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত!”

তারপর তিনি নিজেকে নিজে এই বলে ভর্ৎসনা করতেন,“হায়রে, তুমি কি মৃত্যুকে মনে রাখো না? তোমার হৃদয়ে কি মৃত্যুর জন্য কোনো স্থান নেই? জানো না কখন তোমাকে ধরা হবে আর আখিরাতে নিক্ষেপ করা হবে? কবরের অন্ধকার ও একাকিত্ব কি তুমি কখনো ভেবেছ?”

তিনি কবরের দৃশ্য স্মরণ করে বলতেন,“তুমি কি কখনো দেখোনি কীভাবে মৃতকে কবরে নামানো হয়, মাটিচাপা দেওয়া হয়, পাথর দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়? এসব কি তোমার হৃদয়কে জাগ্রত করে না?”৮

ইবরাহীম ইবনে আহমদ আল-খুযায়ি বলেন, আমি ফুজাইল ইবনে ইয়াজকে বলতে শুনেছি—“যদি পুরো দুনিয়াটাই তার সমস্ত সাজসজ্জাসহ আমার জন্য হালাল করে দেওয়া হতো, তবুও আমি তা ঘৃণাভরে এড়িয়ে যেতাম।”

আবুল ফাদ্বল আল-খাজ্জাজ বলেন, আমি ফুজাইল ইবনে ইয়াজকে বলতে শুনেছি—“আমি তখন ভালো অবস্থায় থাকি, যখন আমি দরিদ্র থাকি। আর আমি যখন আল্লাহর অবাধ্য হই, তখন আমি তার প্রভাব আমার গাধার আচরণে এবং আমার খাদেমের আচরণে অনুভব করি।”

ফাইদ্ব ইবনে ইসহাক বলেন, আমি ফুজাইলকে বলতে শুনেছি—“যদি কেউ তোমাকে বলে ‘হে মুনাফিক, তুমি রাগ করবে, কষ্ট পাবে এবং অভিযোগ করবে। বলে উঠবে, ‘সে আমাকে মুনাফিক বলেছে!’ অথচ সম্ভবত সে সত্যই বলেছে। কেননা তুমি দুনিয়ার প্রেমে দুনিয়ার জন্য সাজছো, দুনিয়ার জন্য বাহ্যিক চাকচিক্য করছো।”

তিনি আরও বলেছিলেন, সাবধান, তুমি যেন এমন না হও যে তুমি রিয়া (লোক দেখানো) করছো অথচ নিজেই তা বুঝতে পারছ না। তুমি বাহ্যিক সাজসজ্জা করলে, আমলের আয়োজন করলে, এমনকি মানুষ তোমাকে চিনতে শুরু করল। তারা বলতে লাগল, ‘সে তো একজন নেককার মানুষ। তাই তারা তোমাকে সম্মান করল, তোমার কাজকর্ম করে দিল, তোমার জন্য মজলিসে স্থান প্রশস্ত করল। অথচ তারা তোমাকে চেনে তো আল্লাহর কারণেই। যদি আল্লাহর কারণে না হতো, তবে তুমি তাদের কাছে তুচ্ছ হয়ে যেতে।

তিনি আরও বলেছেন, “তুমি মানুষের কাছে নিজেকে রোজার মাধ্যমে সাজালে, কিন্তু দেখলে তারা তোমার কোনো কদর করল না। তুমি কুরআনের মাধ্যমে নিজেকে সাজালে, কিন্তু তারা তোমার কোনো মূল্য দিল না। তুমি একের পর এক জিনিস দিয়ে সাজালে, এসব কেবল দুনিয়ার ভালোবাসার কারণেই।”

ইউনুস ইবনে মুহাম্মদ আল-মাক্কী বলেন, ফুজাইল এক ব্যক্তিকে বললেন, “আমি তোমাকে এমন একটি কথা শিখাবো, যা দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে উত্তম। আল্লাহর কসম, যদি আল্লাহ জানেন যে তুমি তোমার অন্তর থেকে মানুষকে সরিয়ে দিয়েছ, এমনকি তোমার অন্তরে তাঁর ছাড়া আর কারো স্থান নেই, তবে তুমি আল্লাহর কাছে যা-ই প্রার্থনা করবে, তিনি অবশ্যই তা দান করবেন।”

ইবরাহীম ইবনে আশআস বলেন, আমি ফুজাইলকে বলতে শুনেছি—“তুমি কীভাবে নিশ্চিত হলে যে তুমি এমন কোনো কাজ করে আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করছ না, যেটির কারণে আল্লাহ তোমার প্রতি ঘৃণা করেন এবং ক্ষমার দরজা তোমার জন্য বন্ধ করে দেন, অথচ তুমি তখনও হাসছ! ভেবে দেখো, তোমার অবস্থা তখন কেমন হবে!”

আবদুস সামাদ ইবনে ইয়াজীদ বলেন, আমি ফুজাইলকে বলতে শুনেছি—“আমি এমন লোকদের পেয়েছি, যারা গভীর রাতে আল্লাহর সামনে লজ্জা পেতেন দীর্ঘ ঘুমানোর কারণে। তারা পাশ ফিরে শুয়ে থাকতেন, হঠাৎ যখন নড়াচড়া হতো, তখন নিজেদের বলতেন, ‘এটা তোমার কাজ নয়। উঠো, আখিরাতের অংশ নিয়ে নাও।”

বিশর ইবনে হারিস বলেন, ফুজাইল বলতেন— “আমি যদি দুনিয়া কামাই করতে চাই, তবে তা আমি ঢাক-ঢোল আর বাঁশি বাজিয়ে করতে রাজি আছি। কিন্তু আমি কখনোই ইবাদতের মাধ্যমে দুনিয়া কামাই করতে চাই না।”৯

ফুজাইল ইবনে ইয়াজ এবং খলিফা হারুনুর রশিদ:

ফদ্বল ইবনে রাবী বলেন, আমিরুল মুমিনীন খলিফা হারুনুর রশিদ যখন হজ পালনে গেলেন, তখন তাঁর মনে এক গভীর অস্থিরতা ভর করল। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘আমার অন্তরে কী যেন একটা খচখচ করছে। আমার এমন একজন জ্ঞানী মানুষ চাই, যার কাছে আমি আমার মনের কথা খুলে বলতে পারি।’ আমি বললাম, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, এখানে সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ আছেন।’ তিনি বললেন, ‘চলো, আমরা তাঁর কাছেই যাই।’ আমরা তাঁর বাড়িতে পৌঁছলাম। আমি দরজায় কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে জিজ্ঞেস হলো, ‘কে?’ আমি শ্রদ্ধার সাথে উত্তর দিলাম, ‘আমিরুল মুমিনীনকে সাড়া দিন।’ হজরত সুফিয়ান দ্রুত বেরিয়ে এলেন এবং বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, আপনি যদি শুধু ইশারা করতেন, আমি নিজেই আপনার খেদমতে হাজির হতাম।’

খলিফা হারুনুর রশিদ  বললেন, ‘আমি যে উদ্দেশ্যে এসেছি, সে বিষয়ে বলুন।’ হজরত সুফিয়ান কিছুক্ষণ আলোচনা করলেন। বিদায়ের সময় খলিফা হারুনুর রশিদ জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কি কোনো ঋণ আছে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ খলিফা হারুনুর রশিদ তখন আমাকে নির্দেশ দিলেন, ‘তাঁর ঋণ পরিশোধ করে দাও।’ আমরা বেরিয়ে এলাম। কিন্তু খলিফার মন ভরল না, তিনি বললেন, ‘তোমার এই সঙ্গী আমার মনের গহীনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারলেন না।’

আমি বললাম, ‘এখানে আব্দুর রাজ্জাক আছেন।’ হারুন বললেন, ‘চলো, তাঁর কাছে যাই।’ আমরা সেখানে গেলাম। কড়া নাড়তেই তিনি বেরিয়ে এলেন এবং কিছুক্ষণ খলিফা হারুনুর রশিদের সাথে আলাপ করলেন। খলিফা হারুনুর রশিদ তাঁকেও একই প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার কি কোনো ঋণ আছে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ খলিফা হারুনুর রশিদ আমাকে বললেন, ‘হে আবুল আব্বাস, তাঁর ঋণও মিটিয়ে দাও।’ আমরা যখন বেরিয়ে এলাম, খলিফা হারুনুর রশিদ আবারও অসন্তোষ নিয়ে বললেন, ‘তোমার সঙ্গীও আমাকে কিছুই দিতে পারলেন না। আমার জন্য এমন একজন মানুষ খোঁজো, যিনি আমার সংশয় দূর করবেন।’ আমি বললাম, ‘তবে চলুন ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এঁর কাছে যাই।’ খলিফা হারুনুর রশিদ যেন এই নামটির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন, বললেন, ‘চলো, তাঁর কাছেই যাব।’ আমরা তাঁর দরজায় পৌঁছে দেখলাম, তিনি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করছেন, আর একটি আয়াত বারবার ধরে অশ্রুসিক্ত নয়নে আওড়াচ্ছেন। খলিফা হারুনুর রশিদ বললেন, ‘দরজা ধাক্কা দাও।’ আমি কড়া নাড়তেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে এই রাতের আঁধারে?’ আমি বললাম, ‘আমিরুল মুমিনীনকে সাড়া দিন।’ তাঁর কণ্ঠে কোনো চাঞ্চল্য ছিল না, তিনি বললেন, “আমিরুল মুমিনীন-এর সাথে আমার কীসের লেনদেন?’ আমি হতবাক হয়ে বললাম, ‘সুবহানাল্লাহ, আপনি কি তাঁর আনুগত্য করতে বাধ্য নন?’ এই কথায় তিনি নিচে নেমে দরজা খুললেন। কিন্তু আমাদের বসার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত উপরে তাঁর চিলেকোঠার কামরায় চলে গেলেন। তিনি প্রদীপটি নিভিয়ে দিয়ে এক কোণে গুটিয়ে বসলেন। আমরা অন্ধকারে সেই ঘরে প্রবেশ করলাম এবং তাঁকে খুঁজতে লাগলাম। আমার আগে খলিফা হারুনুর রশিদের হাত তাঁর উপর পড়ল। সেই নরম স্পর্শে খলিফা হারুনের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো এক আশ্চর্য কথা— ‘আহা, কী কোমল এই হাত, যদি এটি আগামীকাল আল্লাহর আজাব থেকে মুক্তি পায়, তবেই রক্ষা!’ আমি তখন নিশ্চিত হলাম, আজ রাতে পবিত্র হৃদয়ের মানুষটি এই পরাক্রমশালী খলিফাকে এমন কিছু শোনাবেন, যা তাঁর জীবন বদলে দেবে।

খলিফা হারুনুর রশিদ বিনয়ী হয়ে বললেন, ‘আমরা যে কারণে এসেছি, সে বিষয়ে কিছু উপদেশ দিন, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন।’ ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি তখন দৃঢ় কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন, ‘উমার ইবনে আব্দুল আজিজ যখন খিলাফতের গুরুভার কাঁধে তুলে নিলেন, তখন তিনি সালিম ইবনে আব্দুল্লাহ, মুহাম্মাদ ইবনে কাব ও রাজা ইবনে হাইওয়াহকে ডেকে বললেন, ‘আমি এক মহাবিপদে জড়িয়ে পড়েছি, তোমরা আমাকে পথ দেখাও।’ তিনি খিলাফতকে মনে করতেন বিপদ, আর আপনি ও আপনার পরিষদ এটিকে মনে করেন আল্লাহর নেয়ামত।’ এরপর তিনি উমার ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.)-এঁর পরামর্শদাতাদের বাণী তুলে ধরলেন। যেমন— সালিম বলেছিলেন, ‘যদি আপনি মুক্তি চান, তবে দুনিয়ায় রোজা রাখুন; আর আপনার ইফতার হবে কেবল মৃত্যুর দিন।’ ইবনে কা’ব বলেছিলেন, ‘যদি আপনি আল্লাহর আজাব থেকে নিষ্কৃতি চান, তবে মুসলমানদের প্রবীণকে পিতা, মধ্যবয়সীকে ভাই এবং কনিষ্ঠদের সন্তান জ্ঞান করুন। আপনার পিতাকে সম্মান করুন, ভাইকে মর্যাদা দিন এবং সন্তানের প্রতি স্নেহশীল হোন।’ রাজা’ বলেছিলেন, ‘মুক্তি চাইলে নিজের জন্য যা পছন্দ করেন, মুসলিমদের জন্যও তাই পছন্দ করুন, আর নিজের জন্য যা অপছন্দ করেন, তাদের জন্যেও তা অপছন্দ করুন। এরপর যখন ইচ্ছা, আপনি মৃত্যুবরণ করুন।’

এই কথাগুলো বলে ফুজাইল হারুনকে বললেন, ‘আমি আপনাকে এই কথাগুলোই বলছি। আর আমি সেই দিনের জন্য আপনার উপর ভীষণভাবে ভীত, যেদিন মানুষের পা টলে যাবে! আপনার সাথে কি এমন কেউ আছেন, যিনি আপনাকে এমন খাঁটি পরামর্শ দেন?’ এ কথা শোনামাত্র হারুনুর রশিদ এমনভাবে কেঁদে উঠলেন যে, তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন। আমি তাঁকে বললাম, ‘আমিরুল মুমিনীনের প্রতি একটু সদয় হোন।’ ফুজাইল রহমাতুল্লাহি আলাইহি রাগতস্বরে বললেন, ‘ওহে উম্মুর রবীর পুত্র, তুমি আর তোমার সঙ্গীরাই তো তাঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছো, আর আমি তাঁর প্রতি সদয় হব?’

খলিফা হারুনের জ্ঞান ফিরলে তিনি কাতরকণ্ঠে বললেন, ‘আরও বলুন, আল্লাহ আপনাকে শান্তি দিন।’ ফুজাইল তখন উমার ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.)-এঁর শাসনামলের আরেক ঘটনা শোনালেন। এক গভর্নরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে উমর তাকে চিঠি লিখলেন, ‘হে আমার ভাই, আমি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি জাহান্নামের অধিবাসীদের অনন্তকালের জন্য জাহান্নামে দীর্ঘকাল জেগে থাকার কথা! সাবধান, এমন যেন না হয় যে, আপনার এই আমল (শাসন) আপনাকে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, আর আপনার সাথে তাঁর সকল সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়।’ গভর্নর চিঠিটি পড়েই সব ফেলে ছুটে এলেন এবং বললেন, ‘আপনার চিঠি আমার হৃদয় উপড়ে ফেলেছে! আল্লাহর সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত আমি আর কোনোদিন শাসনের দায়িত্ব নেব না।’

এই ঘটনা শুনে খলিফা হারুনুর রশিদ এবারও হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি আরও বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এঁর চাচা আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু যখন নেতৃত্ব চাইলেন, নবীজি তাঁকে বলেছিলেন, ‘নিশ্চয় নেতৃত্ব কিয়ামতের দিন আক্ষেপ ও অনুতাপ হয়ে দেখা দেবে। যদি তুমি আমির না হতে পারো, তবে সেটাই ভালো করবে।’

খলিফা হারুন আবারও কেঁদে উঠলেন এবং বললেন, ‘দয়া করে আরও কিছু বলুন।’ ফুজাইল এবার তাঁর চেহারার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওহে সুশ্রী চেহারার মানুষ, কিয়ামতের দিন আল্লাহ এই সমস্ত সৃষ্টি সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করবেন। যদি আপনি এই চেহারাকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে পারেন, তবে সেটাই করুন। আর সাবধান, সকাল-সন্ধ্যা আপনার হৃদয়ে যেন আপনার কোনো প্রজার প্রতি কোনো প্রকার প্রতারণা বা মন্দ ইচ্ছা না থাকে। কারণ নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রজার প্রতি প্রতারক (অসৎ শাসক) অবস্থায় সকালে উঠবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।’

খলিফা হারুন কাঁদলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কি কোনো ঋণ আছে?’ ফুজাইল রহমাতুল্লাহি আলাইহি উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, আমার রবের কাছে আমার ঋণ আছে, যার হিসাব তিনি এখনও নেননি। আমার দুর্ভাগ্য যদি তিনি আমাকে প্রশ্ন করেন! আমার দুর্ভাগ্য যদি তিনি সূক্ষ্ম হিসাব নেন! আর আমার দুর্ভাগ্য যদি আমি সেদিন কোনো যুক্তি খুঁজে না পাই!’ খলিফা হারুন বললেন, ‘আমি তো সাধারণ মানুষের ঋণের কথা জিজ্ঞেস করছি।’ তিনি বললেন, ‘আমার রব আমাকে এই কাজের নির্দেশ দেননি। তিনি আমাকে তাঁর ওয়াদা বিশ্বাস করতে এবং তাঁর আদেশ মান্য করতে বলেছেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি মানব ও জিন জাতিকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ খলিফা হারুনুর রশিদ তখন তাঁর সামনে এক হাজার দিনার পেশ করে বললেন, ‘এই নিন, আপনার পরিবারের জন্য খরচ করুন এবং এর মাধ্যমে আপনার রবের ইবাদতে শক্তি সঞ্চয় করুন।’ ফুজাইল রহমাতুল্লাহি আলাইহি বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ, আমি আপনাকে মুক্তির পথ দেখাচ্ছি, আর আপনি আমাকে এর প্রতিদান দিচ্ছেন? আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করুন এবং সফল করুন।’ এরপর তিনি আর কোনো কথা বললেন না।

আমরা বেরিয়ে এলাম। হারুন আমাকে মুগ্ধ হয়ে বললেন, ‘হে আবুল আব্বাস, ভবিষ্যতে যদি আমাকে কোনো দরবেশের কাছে নিয়ে যেতে হয়, তবে এমন মানুষের কাছেই নিয়ে যেও। ইনিই হচ্ছেন মুসলমানদের সত্যিকারের নেতা।’ পরে ফুজাইল রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এঁর স্ত্রীদের একজন এসে বললেন, ‘আপনি তো দেখছেন আমরা কত কষ্টে আছি। যদি আপনি এই অর্থটা গ্রহণ করতেন, তবে কী ক্ষতি হতো?’ তিনি তখন একটি চমৎকার উপমা দিলেন, ‘আমার ও তোমাদের উপমা এমন একদল লোকের মতো, যাদের একটি উট ছিল, আর তারা তার রোজগার থেকে খেত। কিন্তু যখন উটটি বুড়ো হয়ে গেল, তারা সেটিকে জবাই করে তার মাংস খেল।’ অর্থাৎ, এখন আমি আমার জীবনের শেষভাগেও যদি উপার্জনের জন্য দ্বীন বিক্রি করি, তবে আমার উপমা ঐ স্বার্থপর লোকগুলোর মতো হবে।

হারুন এই কথা জানতে পারলেন এবং বললেন, ‘চলো, আরেকবার যাওয়া যাক। হয়তো এবার তিনি অর্থটা গ্রহণ করবেন। কিন্তু ফুজাইল রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাদের আসার খবর জানতে পেরে ঘরের দরজা পেরিয়ে ছাদে এসে বসলেন। খলিফা হারুনুর রশিদ এসে তাঁর পাশে বসলেন এবং আবারও কথা বলার চেষ্টা করতে লাগলেন, কিন্তু ফুজাইল নীরব রইলেন। আমরা যখন এভাবে অপেক্ষায়, তখন একটি কৃষ্ণকায় দাসী বেরিয়ে এসে কঠোরভাবে বলল, ‘হে লোকেরা, আপনি আজ রাত ধরে শাইখকে কষ্ট দিচ্ছেন, চলে যান!’ সুতরাং আমরা নিরুপায় হয়ে ফিরে এলাম।১০

সালাফদের দৃষ্টিতে ইমাম ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.):

ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.)-এঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে যুগে যুগে আলেমরা গভীর শ্রদ্ধা ও প্রশংসা করেছেন। ইমাম ইবনে সাদ বলেন, “তিনি ছিলেন নির্ভরযোগ্য, শ্রেষ্ঠ, ইবাদতগুজার, পরহেজগার এবং প্রচুর হাদিস বর্ণনাকারী।”

ইবনে হিব্বান তার জীবনচিত্র এভাবে তুলে ধরেছেন, “তিনি কুফায় বেড়ে ওঠেন এবং সেখানেই হাদিস লিখতেন। পরে মক্কায় চলে যান এবং কাবা শরীফের প্রতিবেশী হয়ে জীবন কাটাতে থাকেন। তাঁর ভেতরে ছিল চরম জুহদ, পূর্ণ পরহেজগারিতা, অশ্রুসিক্ত হৃদয়, নির্জনবাসের অভ্যাস এবং দুনিয়ার মোহ ও মানুষের সঙ্গ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা। অবশেষে ১৮৭ হিজরিতে তিনি মক্কাতেই ইন্তেকাল করেন।”

হাফিজ ইমাম যাহাবী তাকে অভিহিত করেছেন এভাবে—“ফুজাইল ইবনে ইয়াজ ছিলেন এক জাহিদ, হারামের শায়খ এবং নির্ভরযোগ্য ইমামদের অন্যতম। আলেমরা সর্বসম্মতিক্রমে তাঁর মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা স্বীকার করেছেন।”তিনি আরও বলেন,“কিছু সমালোচনা যে এসেছে, তা কোনো গুরুত্ব রাখে না। কারণ সমালোচক নিজেই অযোগ্য ছিলেন। অথচ ফুজাইল ছিলেন মুসলিম উম্মাহর একজন বিশিষ্ট ইমাম।”

ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মদ আশ-শাফেয়ী জানান,“আমি সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা-কে বলতে শুনেছি, ফুজাইল ছিলেন বিশ্বস্ত।

ইমাম আজলী বলেন,“তিনি কুফাবাসী, নির্ভরযোগ্য, ইবাদতগুজার ও সৎ ব্যক্তি ছিলেন। পরে মক্কায় বসতি স্থাপন করেন।”

ইবনে মুবারক তার সম্পর্কে অভূতপূর্ব মন্তব্য করেছেন,“আমার দৃষ্টিতে পৃথিবীর বুকে ফুজাইল ইবনে ইয়াজের চেয়ে উত্তম কেউ বাকি নেই।”আরেক স্থানে তিনি বলেন, “ফুজাইল আল্লাহর সাথে সত্যবাদী ছিলেন। তাই আল্লাহ তার জিহ্বায় হিকমাহ প্রবাহিত করেছেন। তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের জ্ঞান তাদের উপকারে এসেছে।”

নাসির ইবনে মুগীরা আল-বুখারী জানান, ইবরাহীম ইবনে শামাস বলেছেন, “আমি সবচেয়ে ফকিহ, সবচেয়ে পরহেজগার এবং সবচেয়ে হাফেজ হিসেবে তিনজনকে দেখেছি। তারা হলেন— ওয়াকী, ফুজাইল এবং ইবনে মুবারক।”

ইমাম আবু নুয়াইম তার আধ্যাত্মিক জীবন এভাবে বর্ণনা করেছেন, “ফুজাইল ছিলেন এমন একজন, যিনি মরুভূমির নির্জনতা থেকে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন আল্লাহর ঘরে। ভয়ে তাঁর দেহ ছিল ক্ষীণকায়, আর কাবার তাওয়াফ ছিল তাঁর অন্তরের প্রিয়তম কাজ।”

ইমাম যাহাবী তাঁর জ্ঞান প্রসঙ্গে আরও মন্তব্য করেছেন,“তিনি শুবা, মালিক, সুফিয়ান, হাম্মাদ বা ইবনে মুবারকের মতো হাদীসের মহাসাগর ছিলেন না। কারণ তিনি অধিকাংশ সময় ইবাদত ও পরহেজগারিতায় মগ্ন থাকতেন। তবুও যা বর্ণনা করেছেন, তাতে তিনি অটল ও নির্ভরযোগ্য ছিলেন। তাঁর বর্ণিত একটিও হাদীসে ত্রুটি পাওয়া যায়নি।”

ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.) নিজেও হাদিস বর্ণনা নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। তিনি বলতেন, “মানুষকে সোনা-দানা বিলিয়ে দেওয়া আমার কাছে হাদিস বিলিয়ে দেওয়ার চেয়ে সহজ।”১১

সুন্নাহ অনুসরণ ও বাতিলপন্থীদের প্রতি নিন্দা:

আব্দুস সামাদ ইবনে ইয়াজিদ বলেন, আমি ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি-কে বলতে শুনেছি— “যে ব্যক্তি বাতিলপন্থীর সাথে ভালোবাসা রাখে, আল্লাহ তার আমল নষ্ট করে দেন এবং তার হৃদয় থেকে ইসলামের নূর তুলে নেন।”

আব্দুস সামাদ আরও বলেন: আমি তাঁকে বলতে শুনেছি—“যদি তুমি কোনো বাতিলপন্থীকে রাস্তায় দেখতে পাও, তবে অন্য রাস্তা বেছে নাও।”

ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহ. বলতেন, “বাতিলপন্থীর কোনো আমল আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। যে বাতিলপন্থীর সাহায্য করে, সে ইসলামের ধ্বংস সাধনে সাহায্য করল।”

হুসাইন ইবনে জিয়াদ বলেন, আমি ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহ.-কে বলতে শুনেছি— “কোনো মানুষের জন্য তিনটি গুণ থাকলেই যথেষ্ট। ১. সে যেন বাতিলপন্থী না হয়। ২. সে যেন সালফে সালিহীনকে গালি না দেয়। ৩. সে যেন শাসকদের সাথে মেলামেশা না করে।”অর্থাৎ, যদি কেউ এই তিনটি থেকে নিরাপদ থাকে, তবে অন্য দোষগুলো তুলনামূলকভাবে হালকা।

আব্দুস সামাদ ইবনে ইয়াযীদ আস-সায়িঘ বলেন, একবার সাহাবাদের প্রসঙ্গ উঠল এবং আমি উপস্থিত ছিলাম। তখন ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহ. বললেন, “তাঁদের অনুসরণ করো, কারণ তাঁরা তোমাদের জন্য যথেষ্ট। আবু বকর, উমর, উসমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম।”তাহলে যে অভিযোগ কুত্ববা করেছিলেন যে, ফুজাইল নাকি এমন হাদিস বর্ণনা করেছেন যাতে হজরত আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এঁর সমালোচনা আছে, তা ভিত্তিহীন এবং স্পষ্টভাবে অগ্রহণযোগ্য। এ কারণেই ইমাম যাহাবী (রহ.) মন্তব্য করেছেন,“তিনি ছিলেন সুন্নাহর অনুসারী ও বাতিলপন্থা থেকে দূরে থাকা একজন প্রকৃত আহলে সুন্নাহর ইমাম।”১২

কারামত:

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই উম্মতকে এমন অনেক আলেম দিয়ে ধন্য করেছেন, যারা সূর্যের মতো মানুষের অন্তর ও বুদ্ধির অন্ধকার দূর করেছেন। তারা মানুষকে জটিল বিষয় সহজ করে বুঝিয়েছেন, কল্যাণের পথ দেখিয়েছেন এবং অকল্যাণের পথ থেকে বিরত রেখেছেন। সেই মহান আলেমদের অন্যতম ছিলেন আলেম, আবিদ, জাহিদ ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.)। তাঁর বহু কারামাত প্রসিদ্ধ রয়েছে। এর মধ্যে কিছু নিম্নে উল্লেখ করা হলো—

১. ইবরাহীম ইবনে আবদুল্লাহ (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে, একদিন ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.) আমাদের কিছু বিষয়ে কথা বলছিলেন। তখন আমরা দেখলাম, পাহাড় তাঁর কথার প্রভাবে কেঁপে উঠছে। তিনি বলছিলেন, “যদি মানুষ সত্যিকার অর্থে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) করে এবং তারপর এই পাহাড়কে বলে, ‘কাঁপো, তবে তা অবশ্যই কেঁপে উঠবে।”তিনি বললেন, “আল্লাহর কসম, আমি নিজ চোখে দেখেছি যে, পাহাড় কেঁপে উঠল!”তখন ফুজাইল (রহ.) পাহাড়কে উদ্দেশ্য করে বললেন,“হে পাহাড়, আমি তোমাকে বুঝাইনি, আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করুন।”এ কথা বলার সাথে সাথেই পাহাড় থেমে শান্ত হয়ে গেল।

২. হারুন ইবনে সাওয়ার থেকে বর্ণিত, ফুজাইল ইবনে ইয়াজের একটি গাধা ছিল, যেটির মাধ্যমে তিনি পানি বহন করতেন। একদিন সেই গাধা হারিয়ে গেল। লোকেরা তাঁকে বলল, ‘আপনার গাধা তো হারিয়ে গেছে।’ তিনি তখন মসজিদের মিহরাবে বসে বললেন,‘আমি তো গাধাটিকে সব রাস্তার মোড়ে মোড়ে আমানতের সাথে রেখে দিয়েছি।’এরপর দেখা গেল, গাধাটি নিজে থেকেই ফিরে এসে মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়েছে!

৩. আবু বকর আল-আয়ান বলেন, একদিন ফুজাইল ইবনে ইয়াজ (রহ.) বসেছিলেন এবং তাঁর পাশে একজন লোক ছিল। লোকটি তাঁকে বলল,‘হে আবু আলী, আমি আপনার মুখ থেকে এক ধরনের গুঞ্জনের শব্দ শুনছি, এটা কার কথা?’ তিনি (ফুজাইল রহ.) বললেন,‘আমাদের ঘরের ফেরেশতারা আমার কাছে আসেন এবং তাঁদের দ্বীনের একেকটি বিষয়ে প্রশ্ন করেন। ‘১৩

নসিহত ও বাণী:

১. হজরত ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “আল্লাহ্ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তার দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেন, আর যখন কোনো বান্দাকে অপছন্দ করেন, তখন তার জন্য দুনিয়াকে প্রশস্ত করে দেন।”

২. “যদি এই গোটা পৃথিবী আমাকে দেওয়া হতো এই শর্তে যে, আমাকে এর জন্য কোনো হিসাব দিতে হবে না, তবুও আমি একে ঘৃণা করতাম, যেমন তোমাদের কেউ মৃতদেহ পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার কাপড় লেগে যাওয়াকে ঘৃণা করে।”

৩. “মানুষকে দেখানোর জন্য কোনো কাজ ছেড়ে দেওয়া হলো রিয়া (লোক দেখানো ইবাদত), আর মানুষকে দেখানোর জন্য কোনো কাজ করা হলো শিরক (অংশীদারিত্ব স্থাপন)।”

৪. “আমি আল্লাহর অবাধ্যতা করলে আমার গাধার স্বভাব এবং খাদেমের আচরণেও তা টের পাই।”

৫. “যদি আমার একটিমাত্র কবুল হওয়া দোয়া থাকত, তবে আমি তা কেবল শাসকের (ইমাম) জন্য করতাম। কারণ, শাসক যদি সৎ হয়ে যান, তবে দেশ ও বান্দা উভয়ই নিরাপদে থাকে।”

৬. “কোনো ব্যক্তির জন্য তার মজলিসের লোকদের প্রতি নম্র হওয়া এবং তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করা তার সারারাত ইবাদত এবং সারাদিন রোজা রাখার চেয়েও উত্তম।”১৪

৭. “আল্লাহ তায়ালার কাছে একজন ব্যক্তি পৃথিবীকে বলে—“হে পৃথিবী, আমার ভালোবাসার মানুষদের কাছে তুমি কখনও অনুজ্ঞিত হবে না, যেন তাদের পরীক্ষা করো।”

৮. “যে ব্যক্তি কোনো বিদআতের সঙ্গে সময় কাটায়, তাকে কোনো প্রকার জ্ঞান দেওয়া হয় না।”

৯. “শেষ সময়ে কিছু লোক থাকবে, যারা প্রকাশ্যে ভাই, গোপনে শত্রু।”

১০. “সত্য বলা এবং হালাল উপার্জন করা মানুষের জন্য সর্বোত্তম।”

১১. “যত বড় ধর্মীয় জ্ঞান বা ইবাদতই হোক, মূল জ্ঞান হলো আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি ও তৃপ্তি।”

১২. “যে মানুষ অন্যকে চিনে, সে শান্তি পায়।”

১৩. “মানুষের রোষে একে-অপরকে পারস্পরিক গ্রহণ করা কঠিন; তবে আল্লাহর পথে রোষে ধৈর্য ধরাই প্রকৃত বন্ধুত্ব।”

১৪. “প্রচলিত কুরআন-পাঠকের সঙ্গ থেকে দূরে থাকুন; যদি তারা আপনাকে ভালোবাসে, তারা আপনাকে এমন গুণের জন্য প্রশংসা করবে, যা আপনার নেই; যদি তারা বিরক্ত হয়, তারা আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।”

১৫. “নম্র হওয়া মানে হলো সত্যকে মান্য করা এবং যে কোনো উৎস থেকে তা গ্রহণ করা।”

১৬. “আমি এমন রোগ চাই, যা কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়াই চলে যায়।”

১৭. “অজ্ঞতার দুই লক্ষণ, অকারণে হাসি এবং অকারণে ভোরে ওঠা।”

১৮. “যে মুখে ভালোবাসা দেখায় কিন্তু অন্তরে শত্রুতা লুকায়, আল্লাহ তাকে অভিশাপ দিক।”

১৯. “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো গোপনে নেক কাজ করা, যা শয়তানের চোখে ধরা না পড়ে এবং রিয়ায়ও নয়।”

২০. “যে আল্লাহর দানকে স্বীকার করে, সেটাই প্রকৃত কৃতজ্ঞতা।”

২১. “আল্লাহ চাইলে তাকওয়ার জন্য রিজিক অপ্রত্যাশিতভাবে প্রদান করেন।”

২২. “যার কোনো উদ্দেশ্য নেই, তার কোনো কাজের মান নেই; যার হিসাব নেই, তার কোনো ফল নেই।”

২৩. “সেই ব্যক্তি সৌভাগ্যবান, যে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হয় এবং নিজের পাপের জন্য কাঁদে।”১৫

২৪. “তোমাদের মধ্যে দুটি গুণ রয়েছে, যা অজ্ঞতার পরিচয় দেয়, বোকা হাসি এবং বিনা রাত জাগায় ভোরবেলা উঠা।”

২৫.“যে ব্যক্তি মুখে বন্ধুত্ব ও আন্তরিকতা দেখায়, কিন্তু অন্তরে শত্রুতা লুকায়, আল্লাহ তাকে শাস্তি দিবেন এবং তার হৃদয় অন্ধ করবেন।”

২৬. “সব পাপের মূল হলো দুনিয়ার প্রতি আকাঙ্ক্ষা; সব কল্যাণের মূল হলো দুনিয়ার প্রতি ত্যাগ।”

২৭. “যে ব্যক্তি নিজের ক্ষতি থেকে বিরত থাকে, সে কখনও নিজের আনন্দ নষ্ট করবে না।”

২৮.“হৃদয়কে দুর্বল করে তিনটি বস্তু: অতিরিক্ত খাদ্য, অতিরিক্ত নিদ্রা এবং অতিরিক্ত কথা বলা।”

২৯. “সর্বোত্তম কাজ হলো গোপন রাখা; এটি শয়তানের কাছ থেকে রক্ষা করে এবং রিয়া থেকে দূরে রাখে।”

৩০.“অনুগ্রহের স্বীকৃতি হলো সেটি অন্যকে স্মরণ করানো।”

৩১. “আল্লাহ ছাড়া কেউ দাসদের রিজিক সেই স্থান থেকে দেয় না, যা তারা প্রত্যাশা করে না।”

৩২.“যার নেই নিয়ত, তার নেই কাজ; যার নেই ভয়, তার নেই প্রতিফল।”

৩৩.“যে ব্যক্তি মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হয় এবং নিজের পাপের জন্য কাঁদে, সে ধন্য।”

৩৪.“যত্নশীলতার মূল হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। আমি মানুষের সন্তুষ্টিতে বিশ্বাস করি না, কিন্তু তাঁর রাগে সতর্ক থাকা উচিত।”১৬

৩৫. মুহাম্মদ ইবনে হাসান আস-সামনী বলেন, আমি একসময় ফুজাইল ইবনে ইয়াজের মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। সেখানে সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহও ছিলেন। তখন ফুজাইল বললেন,“হে আলেম সমাজ, একসময় তোমরা ছিলে দেশের প্রদীপ, মানুষ তোমাদের আলোয় উপকৃত হতো। একসময় তোমরা ছিলে তারকা, মানুষ তোমাদের দ্বারা পথ পেত। অথচ আজ তোমরা হয়েছ বিভ্রান্তির উৎস। এখন তো এমন পর্যায়ে পৌঁছেছ যে, তোমাদের কেউ কোনো সংকোচ ছাড়াই জালিমদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করে। তারপর পিঠ ঠেকিয়ে বসে বলে, ‘আমাদের কাছে অমুক অমুক বর্ণনা করেছেন।” এ কথা শুনে সুফিয়ান বললেন, “যদি আমরা নেককার না-ও হই, তবে অন্তত আমরা নেককারদের ভালোবাসি।”১৭

ইন্তেকাল:

এ মহান মনীষী ১৮৭ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন।১৮