মুহাসাবা অর্থ আত্মসমালোচনা ও নফসের হিসাব গ্রহণ। হজরত হারিস আল-মুহাসিবী (রহ.)-এঁর নামের মধ্যেই তাঁর মিশন নিহিত। বাগদাদের এই আলিম ও সুফি জ্ঞান ও সাধনার অপূর্ব এক সমন্বয়। ইলমে কালাম, তাসাউফ, নফসের রোগ ও চিকিৎসা বিষয়ে তাঁর ভাবনা আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি মানুষকে শেখাতে চেয়েছেন— অন্তরকে পবিত্র না করলে বাহ্যিক ইবাদতও পূর্ণতা পায় না।
প্রাথমিক পরিচিতি:
তিনি ছিলেন জুহদপন্থী, আল্লাহর মারেফতের অধিকারী আলেম, সুফিদের শায়েখ আবু আব্দুল্লাহ আল-হারিস ইবনু আসাদ আল-বাগদাদী আল-মুহাসিবী (রহ.)। তিনি জুহদ ও আত্মশুদ্ধি বিষয়ক বহু গ্রন্থের প্রণেতা।১
ইলমের শামিয়ানা:
হাফিজ আবু বকর আল-খতিব (রহ.) বলেন, তিনি ছিলেন জ্ঞানী ও গভীর বোধসম্পন্ন। তাঁর দ্বীনের মূলনীতি (আকাইদ ও উসুলে দ্বীন) বিষয়ে রচিত গ্রন্থ রয়েছে, এবং জুহদ ও আত্মসংযম বিষয়েও বহু কিতাব লিখেছেন।
আরেক স্থানে হাফিজ আবু বকর আল-খতিব (রহ.) বলেন, যাঁদের মাঝে এক সাথে জুহদ এবং শরিয়তের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ জ্ঞানের সমন্বয় পাওয়া যায়, আব্দুল্লাহ আল-হারিস ইবনু আসাদ আল-বাগদাদী তাঁদের অন্যতম। তিনি হাদিস ও ইলম অর্জন করেছেন আব্দুল আজিজ ইবনু আব্দুল্লাহ, মুহাম্মদ ইবনু কাসির আল-কুফি এবং ইয়াজিদ ইবনু হারুন (রহ.)-এঁর কাছ থেকে।২
শিষ্য যারা:
তার কাছ থেকে হাদিস ও ইলম অর্জন করেছেন— ইবনু মাসরূক, আহমদ ইবনুল কাসিম,জুনাইদ, আহমদ ইবনুল হাসান সুফি, ইসমাঈল ইবনু ইসহাক আস-সাররাজ এবং আবু আলী ইবনু খাইরান আল-ফকিহ।৩
জুহদের ধরন:
হজরত হারিস আল-মুহাসিবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন,“দুনিয়া ত্যাগ করা অথচ তার স্মরণ থাকা—এটা জুহদপন্থীদের বৈশিষ্ট্য। আর দুনিয়া ত্যাগ করা এবং তাকে ভুলে থাকা, এটা আরিফ বিল্লাহদের বৈশিষ্ট্য।”
জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলেন, হজরত হারিস আল-মুহাসিবী রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে তাঁর পিতা প্রচুর সম্পদ দিয়ে গিয়েছিলেন, তিনি সবই ত্যাগ করেন এবং বলেন, “দুটি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ব্যক্তির মাঝে উত্তরাধিকার হয় না।” কারণ, তাঁর পিতা ওয়াকিফি মতাবলম্বী ছিলেন।৪
রিয়াজত:
হজরত জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলেন,“একদিন আমি ঘরের দরজার সামনে বসেছিলাম। হারিস খুব ক্ষুধার্ত অবস্থায় আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর মুখে ক্ষুধার তীব্রতা স্পষ্ট দেখতে পেলাম। আমি বললাম—
‘হে চাচা, আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করলে কিছু খাবার পেতে পারেন।’
তিনি বললেন, ‘তুমি কি সত্যিই দিবে?’
আমি বললাম, ‘জি হ্যাঁ, এতে আমি আনন্দিত হব এবং আপনার সেবা করতে পারব।’
তখন আমি তাঁকে বসতে বলে ঘরে প্রবেশ করলাম। আমি চাচার ঘরে গেলাম; যা আমাদের ঘরের চেয়ে প্রশস্ত এবং সেখানে সবসময় উন্নত মানের খাবার থাকত। সেখান থেকে বিভিন্ন ধরনের খাবার এনে তাঁর সামনে রাখলাম। তিনি হাত বাড়িয়ে একটি লোকমা তুলে নিলেন। দেখলাম তিনি চিবোচ্ছেন কিন্তু গিলছেন না। এরপর কোনো কথা ছাড়াই হঠাৎ উঠে চলে গেলেন। পরদিন দিন তাঁর সঙ্গে দেখা হলে বললাম—
‘হে চাচা, আপনি আমাকে আনন্দ দিলেন, আবার কষ্টও দিলেন!’
তিনি বললেন, ‘বেটা, সত্য কথা হচ্ছে ক্ষুধার কষ্ট তখন খুব তীব্র ছিল। আমি চেষ্টা করেছি যেন সেই খাবার থেকে খেতে পারি, যা তুমি আমার সামনে রেখেছিলে। কিন্তু আল্লাহর সাথে আমার একটি চিহ্ন আছে, যদি খাবারটি তাঁর সন্তুষ্টির হয়, তবে তা নাকে পৌঁছলে কোনো অসংগত গন্ধ থাকে না; আর যদি সন্তুষ্টির না হয়, নাকে এক ধরনের বিরূপ গন্ধ উঠতে থাকে; তখন নফস তা গ্রহণ করতে পারে না। সে কারণে আমি সেই লোকমাটি তোমাদের বারান্দায় ফেলে বেরিয়ে এসেছি’”৫
নফসের চিকিৎসা:
হাফিজ আবু নু‘আইম (রহ.) বলেন, আমাকে জাফর আল-খালাদী তাঁর কিতাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমি আল-জুনায়দ ইবনে মুহাম্মদ (রহ.)-কে বলতে শুনেছি,হারিস আল-মুহাসিবী আমাদের বাড়িতে আসতেন এবং বলতেন, ‘চলো, আমাদের সাথে বাইরে বের হও, একটু হাঁটি।’আমি বলতাম, ‘আপনি আমাকে আমার নির্জনতা ও নিজেকে নিরাপদ রাখার পরিবেশ থেকে রাস্তাঘাটের বিপদ, মানুষের ভিড় ও নফসের চাহিদা-উত্তেজনার দিকে বের হতে বলেন?’
তিনি বলতেন: ‘আমার সাথে বের হও, কোনো ভয় নেই।’আমি তাঁর সাথে বের হতাম, মনে হতো রাস্তা যেন সবকিছু থেকে খালি হয়ে গেছে; এমন কিছু চোখেই পড়ত না, যা নফসকে বিরক্ত করে। যখন আমরা সেই স্থানে পৌঁছতাম যেখানে তিনি বসতেন, তিনি বলতেন, ‘আমাকে জিজ্ঞেস করো।’আমি বলতাম, ‘আমার তো জিজ্ঞেস করার কিছুই নেই।’
তিনি বলতেন: ‘আমি তোমাকে বলছি, তোমার নফসে যে প্রশ্নগুলো বাঁধা হয়ে আছে সেগুলো জিজ্ঞাসা কর।’তখন আমার অন্তরের প্রশ্নগুলো যেন হঠাৎ ঝরনার মতো বের হয়ে আসত এবং আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করতাম। তিনি তখনই সেগুলোর জবাব দিতেন। তারপর তিনি বাড়িতে ফিরে গিয়ে সেগুলো কিতাব আকারে লিখে ফেলতেন।”৬
রচনাবলি:
হাফিজ আবু বকর আল-খতিব বলেন,“হারিস আল-মুহাসিবী-এর জুহদ ও আকিদা বিষয়ে বহু গ্রন্থ রয়েছে এবং বিভিন্ন ভ্রান্ত দলের— যেমন, মুতাযিলা, রাফেজি ইত্যাদির বিরুদ্ধে শক্তিশালী জবাবভিত্তিক কিতাবও রয়েছে। তার বহু রচনা আছে, যেগুলো উপকারী এবং মূল্যবান ফায়দায় পূর্ণ।”
আর আবু আলী ইবনু শাযান একদিন হারিসের ‘কিতাব ফি দিমা’ (সাহাবায়ে কেরামের মাঝে সংঘটিত যুদ্ধগুলোতে রক্তপাতে শরয়ি বিধান বিষয়ক গ্রন্থ) এর কথা উল্লেখ করে বলেন,“সাহাবায়ে কেরামের মাঝে সংঘটিত রক্তপাতের ফিককি বিধান নির্ধারণে আমাদের মাজহাবের আলেমগণের ভরসা ছিল হারিসের (এই) কিতাবের উপর।”৭
মুহাসাবার শিক্ষা:
জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলেন, আমি হারিস আল-মুহাসিবীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, “মুহাসাবা (আত্ম-পর্যালোচনা) ও মুওয়াজানা (তুলনা/পরিমাপ) চারটি স্থানে আবশ্যক।
১. ঈমান ও কুফরের মধ্যে।
২. সিদক্ (সত্যতা) ও কিযবের (মিথ্যার) মধ্যে।
৩. তাওহিদ ও শিরকের মধ্যে।
৪. ইখলাস (আন্তরিকতা) ও রিয়ার (লোক-দেখানোর) মধ্যে।”৮
বাণী ও নসিহত:
হজরত হারিস আল-মুহাসিবী (রহ.) বলেন,“মানুষের আসল রত্ন হলো তার ফজিলত; আর বুদ্ধির প্রকৃত রত্ন হলো আল্লাহর তাওফিক।”৯
আবুল আব্বাস আহমদ ইবনু মুহাম্মদ ইবনু মাসরূক বলেন, আমি হারিস আল-মুহাসিবীকে বলতে শুনেছি, তিনটি জিনিস বিরল বা অস্তিত্বহীন।
১. উত্তম মুখাবয়ব (সৌন্দর্য) এর সাথে সততা।
২. উত্তম চরিত্রের সাথে ধার্মিকতা।
৩. উত্তম বন্ধুত্বের সাথে বিশ্বস্ততা বা আমানতদারিতা।১০
খ. জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলেন, হারিস বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার অভ্যন্তরীণ অবস্থা সংশোধনের চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে উত্তম বাহ্যিক আচরণ দান করেন। আর যার বাহ্যিক আচরণ উত্তম হয় তার অভ্যন্তরীণ চেষ্টার সাথে আল্লাহ তায়ালা তাকে তাঁর দিকে হেদায়েত দান করেন।
কারণ মহান আল্লাহ বলেছেন, الَّذِیۡنَ جَاهَدُوۡا فِیۡنَا لَنَهۡدِیَنَّهُمۡ سُبُلَنَا. অর্থাৎ, আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। (সুরা আনকাবুত: ৬৯)।
আবু উসমান আল-বালাদি বলেছেন, আমার কাছে হারিস আল-মুহাসিবী থেকে পৌঁছেছে যে, তিনি বলেছেন,“জ্ঞান মানুষের ভয় (তাকওয়া) বৃদ্ধি করে, জুহুদ (দুনিয়াবিমুখতা) মানুষকে মানসিক শান্তি দেয়, আর মারেফাত (দ্বারা আল্লাহকে জানার জ্ঞান) মানুষকে তওবায় প্রবৃত্ত করে।”তিনি আরো বলেন, “এই উম্মতের মধ্যে তারাই শ্রেষ্ঠ, যাদের আখিরাত তাদের দুনিয়া থেকে বিমুখ করে না এবং যাদের দুনিয়া তাদের আখিরাত থেকে বিমুখ করে না।”
তিনি বলেন, “যে জিনিস বান্দাকে তওবার (অনুশোচনা করে ফিরে আসার) দিকে ধাবিত করে, তা হলো ইসরার (পাপে জিদ বা লেগে থাকা) ছেড়ে দেওয়া। আর যে জিনিস তাকে ইসরার ছেড়ে দিতে ধাবিত করে, তা হলো ভয়কে আঁকড়ে থাকা।”
হজরত হারিস বলেন, “বান্দার উচিত নয় যে, ওয়াজিব কাজকে নষ্ট করে পরহেজগারিতা অর্জন করার চেষ্টা করা।” তিনি বলেছেন, “উবুদিয়্যাতের (দাসত্ব/আল্লাহর বান্দা হওয়ার) বৈশিষ্ট্য হলো— নিজের জন্য কোনো মালিকানা না দেখা এবং জানা যে, তুমি নিজের জন্য ক্ষতি বা উপকার কোনো কিছুই করার ক্ষমতা রাখো না।”
হজরত হারিস বলেছেন, তাসলিম (সমর্পণ) হলো— বিপদের সময় বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ কোনো পরিবর্তন ছাড়াই দৃঢ় থাকা।”
হজরত হারিসকে আশা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি বললেন, তা হলো মহান আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণার আকাঙ্ক্ষা এবং মৃত্যুর সময় তাঁর সম্পর্কে উত্তম ধারণা পোষণ করা।”
তিনি আরো বলেছেন, দুঃখ কয়েক প্রকারের হয়। যথা—
১. এমন কিছু হারানোর দুঃখ, যা সে পেতে ভালোবাসে।
২. ভবিষ্যতে কোনো কিছুর ভয়ের দুঃখ।
৩. কাঙ্ক্ষিত কোনো কিছু অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার বা দেরি হওয়ার দুঃখ।
৪. এমন দুঃখ, যখন সে নিজের মধ্যে আল্লাহর হকের বিপরীতে কাজ করার কথা স্মরণ করে অনুতপ্ত হয়।
তিনি আরও বলেন, “উত্তম চরিত্র হলো কষ্ট সহ্য করা, কম রাগ করা, মুখ প্রফুল্ল রাখা এবং সুন্দর কথা বলা।
তিনি বলেছেন, “প্রত্যেক জিনিসের একটি সারমর্ম আছে। মানুষের সারমর্ম হলো বুদ্ধি, আর বুদ্ধির সারমর্ম হলো ধৈর্য।’ বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নড়াচড়ার মাধ্যমে (শারীরিক ইবাদত) কাজ করার চেয়ে গায়েবের প্রতি মনোযোগ দিয়ে অন্তরের নড়াচড়ার (আত্মিক ইবাদত) মাধ্যমে কাজ করা অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ।’
তিনি বলেছেন, “যদি তুমি আল্লাহর আহ্বান না শোনো, তবে তুমি আল্লাহর আহবানকারীকে কীভাবে সাড়া দেবে? আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা নিজেকে ধনী মনে করে, সে আল্লাহর মর্যাদা সম্পর্কে অজ্ঞ।”
তিনি বলেছেন, “জালিম ক্ষতিগ্রস্ত, যদিও মানুষ তার প্রশংসা করে; আর মজলুম নিরাপদ, যদিও মানুষ তার নিন্দা করে। অল্পে তুষ্ট ব্যক্তি ধনী, যদিও সে ক্ষুধার্ত থাকে; আর লোভী ব্যক্তি দরিদ্র, যদিও সে মালিক হয়।”
তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি মুরাকাবা (আল্লাহর ধ্যান) ও ইখলাস (আন্তরিকতা) দ্বারা তার অভ্যন্তরীণ অবস্থা সংশোধন করে, আল্লাহ তার বাহ্যিক অবস্থা মুজাহাদা (আত্ম সংগ্রাম) এবং সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে সুসজ্জিত করেন।”
হজরত হারিস আল-মুহাসিবীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘মানুষের মধ্যে কে তার নফসের (প্রবৃত্তির) উপর সবচেয়ে বেশি বিজয়ী?’ তিনি বললেন, “যে তাকদিরের উপর সন্তুষ্ট।”
তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি নেয়ামতের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে না, সে মূলত সেটির অপসারণ ডেকে আনে।”১১
ওফাত:
প্রসিদ্ধ মত অনুসারে তিনি ২৪৩ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন।১২
আবু সাওর বলেছেন, “আমি হারিস আল-মুহাসিবীর মৃত্যুর সময় উপস্থিত ছিলাম। তিনি বললেন, ‘যদি আমি এমন কিছু দেখি যা আমি পছন্দ করি (অর্থাৎ জান্নাতে যাওয়ার সুসংবাদ), তবে আমি তোমাদের দিকে মুচকি হেসে দেব, আর যদি তার বিপরীত কিছু দেখি, তবে তোমরা আমার চেহারায় পরিবর্তন (বা বিষণ্ণতা) দেখতে পাবে।’ তখন তিনি মুচকি হাসলেন, অতঃপর তিনি ইন্তেকাল করলেন।’১৩