গাউসুল আজম হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) এমন এক সময় পৃথিবীতে এসেছিলেন, যখন মুসলিম সমাজে জ্ঞানগত বিভ্রান্তি, নৈতিক অবক্ষয় এবং আধ্যাত্মিক দুর্বলতা ছড়িয়ে পড়েছিল। এই অন্ধকার সময়ে তিনি ছিলেন আলোর দিশারী। তার ওয়াজ-নসিহত ও শিক্ষার মাধ্যমে লাখো মানুষ সঠিক পথ খুঁজে পায়। তার কথা কঠিন হৃদয়কে নরম করতো, তার চরিত্র মানুষের আত্মাকে পবিত্র করতো।
তিনি ছিলেন একাধারে হাদিস-বিশারদ, ফকিহ, মুফাসসির, সুফি এবং সমাজ সংস্কারক। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া তরিকা শুধু একটি সুফি ধারা নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও মানবসেবার এক পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ। তার জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি কীভাবে জ্ঞান ও কর্ম, শরিয়ত ও তরিকতের মধ্যে ভারসাম্য রেখে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়। তার উজ্জ্বল বংশ-পরিচয় এবং ইবাদত-নিবেদিত জীবন আজও আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
প্রাথমিক পরিচিতি:
তাঁর মূল নাম হলো আব্দুল কাদের এবং উপনাম আবু মুহাম্মদ। তাঁর পিতা ছিলেন আবু সালেহ আবদুল্লাহ ইবনে জিনকি (ফারসিতে জঙগি, বাংলায় যোদ্ধা) দোস্ত আল-জিলানী আল-হাম্বলী, শায়খে বাগদাদি। জন্মস্থান জিলান শহরে এবং তিনি জন্মগ্রহণ করেন হিজরি ৪৭১ সনে।[1]
তাঁর বংশগত শাজরা হজরত আলি ইবনে আবু তালিব (রা.) হয়ে রাসুল ﷺ পর্যন্ত পৌঁছেছে। সেটি হচ্ছে— আব্দুল কাদের ইবনে আবু সালেহ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে জিনকি দোস্ত ইবনে আবু আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ আল-জিলানী ইবনে ইয়াহইয়া আজ-জাহিদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে দাউদ ইবনে মুসা ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে মুসা আল-জাওন ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান আল-মুসান্না ইবনে হাসান ইবনে আলী ইবনে আবু তালিব (রা.)।[2]
কেবল পিতৃবংশ নয়, তাঁর মাতৃবংশও ছিল আধ্যাত্মিক সাধনায় সমৃদ্ধ। তাঁর মা এবং নানা দুজনেই ছিলেন সে সময়ের প্রখ্যাত বুজুর্গ, যাঁর প্রভাব আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর ওপর গভীরভাবে পড়েছিল। গাউসে পাকের মাতার নাম ছিল ফাতিমা, তাঁর কুনিয়াত (উপনাম) ছিল ‘উম্মুল জাব্বার’ এবং লকব (উপাধি) ছিল ‘উম্মুল খায়ের। ইউনীনী (রহ.) বলেন, ‘খায়ের ও নেক আমলের ক্ষেত্রে তিনি এক বিশাল ও মহান উদাহরণ ছিলেন।’ আবু সাঈদ আল-হাশেমী বলেন, ‘আধ্যাত্মিকতার পথে তাঁর দৃঢ় অবস্থান ছিল।’ তিনি ছিলেন প্রখ্যাত জাহিদ সুফি শায়খ আবু আব্দুল্লাহ আস-সাওমায়ীর কন্যা। তাঁর সততা ও ধার্মিকতার গুণ সর্বত্র বর্ণিত ছিল। ইমাম শানতুফী, শায়খ আরেফ মুহাম্মদ আর-রব্বানী আল-কাযভীনীর সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “গাউসে পাকের নানা সাওমায়ী ছিলেন আমার দেখা মাশায়েখদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ। তিনি ছিলেন মুজিবুদ দাওয়াহ, অর্থাৎ যার দোয়া কবুল হয়। তিনি জিলান বা গিলান অঞ্চলের প্রধান মাশায়েখদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি কারও ওপর রাগ করলে সেই ব্যক্তি দ্রুত কোনো মুসিবতে আক্রান্ত হতো। তাঁর বহু কারামত প্রকাশিত হয়েছিল।”
এই মহান অলির জন্মের পর থেকেই তাঁর জীবনের অলৌকিক দিকগুলো ফুটে উঠতে থাকে। বিশেষ করে রমজান মাসে শিশু বয়সে তাঁর রোজা রাখার ঘটনাটি আজ অবধি মুমিনদের মনে বিস্ময় জাগায়। ইমাম শানতুফী নসর ইবনে আব্দুর রাজ্জাকের সূত্রে বর্ণনা করেন, আমি অনারব (আজমি) বড় বড় মাশায়েখ ও আলেমদের তাঁদের পূর্বপুরুষদের সূত্রে বর্ণনা করতে শুনেছি যে, শায়খ আব্দুল কাদের (রা.) রমজান মাসে দিনের বেলা তাঁর মায়ের দুধ পান করতেন না। অন্য সূত্রে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, একবার রমজানের চাঁদ দেখা নিয়ে মানুষের মাঝে সংশয় তৈরি হলো। তখন তারা শায়খের মায়ের শরণাপন্ন হলো। মা জানালেন যে, আজ তাঁর সন্তান দুধ পান করেনি। পরবর্তীতে নিশ্চিত হওয়া গেল যে, সেদিন রমজান মাস শুরু হয়েছিল। শানতুফী আরও বলেন, এলাকায় এই খবর ছড়িয়ে পড়েছিল যে, শরীফ বংশে এমন এক সন্তান জন্ম নিয়েছে, যে রমজান মাসে দুধ পান করে না। তাঁর আয়েশা নামে এক নেককার ফুফুও ছিলেন।[3]
মাওলানা নুরুদ্দীন আব্দুর রহমান জামী (রহ.) তাঁর ‘নাফাহাতুল উনস’ কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, “নিশ্চয়ই শায়খ আব্দুল কাদের বংশগতভাবে অত্যন্ত সুদৃঢ় মর্যাদা ও আভিজাত্যের অনন্য সমন্বয়। তিনি পিতার দিক থেকে আলভী-হাসানী (হজরত হাসান রা.-এঁর বংশধর) এবং মায়ের দিক থেকে আবু আব্দুল্লাহ আস-সাওমায়ীর দৌহিত্র, যিনি ছিলেন মহান শায়খ ও উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন অলিদের একজন।”[4]
ইলম অর্জন:
শৈশব ও কৈশোরের এই পবিত্র পরিবেশ পার করে তিনি জ্ঞানের নেশায় বিভোর হন। উচ্চতর শিক্ষা লাভের জন্য তিনি সেই সময়ের বিখ্যাত শহর বাগদাদে পাড়ি জমান। সেখানে আবু সা’দ আল-মুখাররিমী (রহ.)-এঁর নিকট ফিকহ শাস্ত্রে শিক্ষা লাভ করেন। এছাড়াও শায়েখ আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) হাদিস শিক্ষা গ্রহণ করেছেন— আবু গালিব আল-বাকিল্লানী, আহমদ ইবনুল মুজাফফর ইবনু সুস, আবুল কাসিম ইবনু বায়ান, জাফর ইবনে আহমদ আস-সাররাজ, আবু সা’দ ইবনে খুশাইশ, আবু তালিব আল-ইউসুফি এবং আরও বহু আলেমের নিকট থেকে।[5]
তিনি শায়খ হাম্মাদ আদ-দাব্বাস জাহেদ-এঁর নিকট আধ্যাত্মিক দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং তাঁর হাতেই তরিকতের পথে চলেন। এ ছাড়াও তিনি শায়খ ইউসুফ বিন আইয়ুব জাহেদ (যখন তিনি শেষ বয়সে বাগদাদে আসেন) এবং তাজুল আরেফিন আবুল ওয়াফা (রহ.)-এঁর নিকট থেকে জ্ঞান লাভ করেন।[6]
ইলম অর্জনের ঘটনা ও ডাকাতদলের তাওবা:
জ্ঞান অর্জনের এই লম্বা সফরে কেবল পড়াশোনাই নয়, বরং তাঁর জীবনের নৈতিক ভিত্তি কতটা মজুত ছিল তা একটি ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। তাঁর বাগদাদ যাত্রার পথে ডাকাতদের সাথে ঘটা সেই ঘটনাটি সততার এক অনন্য দলিল। ইবনুন নাজ্জার তাঁর সনদে বর্ণনা করেন, আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ বিন আবুল হুসাইন আল-হায়ানি আমাকে লিখেছেন এবং আমি তাঁর হস্তাক্ষর থেকে এটি নকল করেছি। তিনি বলেন, শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, “আমার মা আমাকে বলেছিলেন, ‘বাগদাদে যাও এবং ইলম (জ্ঞান) অর্জন করো।’ তখন আমার বয়স ছিল সতেরো বা আঠারো বছর। আমি এক শহর থেকে অন্য শহর পার হয়ে বাগদাদে পৌঁছালাম এবং ইলম অর্জনে আত্মনিয়োগ করলাম।”
মুহাম্মদ বিন কায়েদ আল-আওয়ানি বলেন, আমি শায়খকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার জীবনের ভিত্তি কিসের ওপর?’ তিনি বললেন, ‘সত্যের ওপর। আমি জীবনে কখনও মিথ্যা বলিনি। এমনকি যখন আমি মক্তবে পড়তাম, তখনও না। শায়খ আরও বলেন, “শৈশবে আমাদের এলাকায় থাকাকালীন একদিন আরাফাতের দিন আমি গবাদি পশুর পেছনে পেছনে মাঠে গেলাম। আমি একটি লাঙল টানা গরুর অনুসরণ করছিলাম। হঠাৎ গরুটি আমার দিকে ফিরে তাকাল এবং (আল্লাহর হুকুমে) বলল, ‘হে আব্দুল কাদের, তুমি তো এই কাজের জন্য সৃষ্টি হওনি এবং তোমাকে এই আদেশও দেওয়া হয়নি!’ আমি আতঙ্কিত হয়ে বাড়ি ফিরে এলাম এবং ঘরের ছাদে উঠলাম। সেখান থেকে দেখলাম মানুষ আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তৎক্ষণাৎ আমার মায়ের কাছে গেলাম এবং বললাম, ‘আমাকে আল্লাহর পথে সঁপে দিন। আমি বাগদাদে গিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে চাই এবং নেককারদের সান্নিধ্য পেতে চাই।’ মা আমাকে কারণ জিজ্ঞেস করলে আমি পুরো ঘটনাটি খুলে বললাম। শুনে মা কেঁদে ফেললেন। তিনি বললেন, ‘আমার কাছে আশিটি দিনার আছে, যা আমি তোমার পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। এর অর্ধেক (৪০ দিনার) তোমার ভাইয়ের জন্য রাখলাম, আর বাকি ৪০ দিনার তোমার জামার বগলের নিচে সেলাই করে দিচ্ছি।’
মা আমাকে যাত্রার অনুমতি দিলেন এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্য বলার অঙ্গীকার নিলেন। বিদায়লগ্নে তিনি বললেন, ‘হে আমার কলিজার টুকরা সন্তান, যাও, তোমাকে আল্লাহর হাতে সঁপে দিলাম। তোমার এই চেহারা হয়তো কিয়ামতের আগে আর দেখতে পাব না।”
আমি বাগদাদগামী একটি ছোট্ট কাফেলার সাথে যাত্রা করলাম। যখন আমরা হামাদান এলাকা পার হয়ে এক নির্জন প্রান্তরে পৌঁছলাম, তখন ষাটজন ঘোড়সওয়ার ডাকাত আমাদের ওপর আক্রমণ করল। তারা পুরো কাফেলা লুট করল; কিন্তু আমাকে কেউ কিছু বলল না। হঠাৎ একজন ডাকাত আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করল, ‘ওহে ফকির, তোমার কাছে কি কিছু আছে?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, ৪০টি দিনার আছে।’ সে বলল, ‘সেগুলো কোথায়?’ আমি বললাম, ‘আমার জামার বগলের নিচে সেলাই করা আছে।’ সে ভাবল আমি হয়তো তার সাথে উপহাস করছি, তাই সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল। এরপর আরেকজন ডাকাত এসে একই প্রশ্ন করল এবং আমিও একই উত্তর দিলাম। সেও আমাকে গুরুত্ব না দিয়ে চলে গেল। এরপর তারা দুজন তাদের সর্দারের কাছে গিয়ে বিষয়টি জানাল। সর্দার তখন একটি উঁচু টিলার ওপর বসে কাফেলার মালামাল ভাগ করছিল। সে আমাকে ডেকে পাঠাল।
সর্দার জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কাছে কী আছে?’ আমি বললাম, ‘৪০টি দিনার।’ সে বলল, ‘কোথায় সেগুলো?’ আমি বললাম, ‘আমার জামার বগলের নিচে সেলাই করা।’ সর্দারের আদেশে আমার জামাটি ছিঁড়ে ফেলা হলো এবং ঠিক ৪০টি দিনারই পাওয়া গেল। সর্দার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমাকে এই সত্য কথা বলতে কিসে উদ্বুদ্ধ করল?’ (তুমি তো চাইলে লুকাতে পারতে)। আমি উত্তর দিলাম, ‘আমার মা আমার কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, যেন আমি সর্বদা সত্য কথা বলি। আমি আমার মায়ের সাথে করা অঙ্গীকারের খেয়ানত করতে চাইনি।’ একথা শুনে ডাকাত সর্দার ডুকরে কেঁদে উঠল এবং বলল, ‘তুমি তোমার মায়ের সাথে করা অঙ্গীকার ভাঙলে না, অথচ আমি দীর্ঘ এত বছর ধরে আমার রবের সাথে করা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে আসছি!’ এরপর সে আমার হাতে হাত রেখে তওবা করল। সর্দারের অনুসারীরা তখন বলল, ‘আপনি যখন ডাকাতি বা পথিমধ্যে লুণ্ঠনের সময় আমাদের সর্দার ছিলেন, এখন তওবার ক্ষেত্রেও আপনিই আমাদের সর্দার।’ এরপর তারা সবাই আমার হাতে তওবা করল এবং কাফেলার কাছ থেকে যা লুট করেছিল সব ফিরিয়ে দিলো। এরাই ছিল প্রথম দল যারা আমার হাতে তওবা করেছিল।”[7]
তাঁর ছাত্রগণ:
এই মহান সাধক যখন জ্ঞান অর্জনে সফল হলেন, তখন তাঁর চারপাশে ছাত্র ও ভক্তদের ভিড় জমতে শুরু করল। তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে বহু মানুষ ইসলামের আলো ছড়িয়েছেন। তাঁর কাছ থেকে যারা ইলম ও হাদিস শিক্ষা লাভ করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলো— ইমাম সামআনী, উমর ইবনে আলী আল-কুরাইশী, হাফিজ আবদুল গনী, শায়েখ মুওয়াফফাকুদ্দীন ইবনু কুদামা; তাঁর দুই পুত্র আবদুর রাজ্জাক ও মুসা; শায়েখ আলী ইবনে ইদরিস, আহমদ ইবনে মুতী’ আল-বাজসরায়ী, আবু হুরাইরা, মুহাম্মদ ইবনে লায়স আল-ওয়াসিতানী, আকমাল ইবনে মাসউদ আল-হাশিমী, আবু তালিব আবদুল লতীফ ইবনে মুহাম্মদ ইবনুল কুব্বাইতী এবং আরও অসংখ্য ব্যক্তি। আর ইজাজতের মাধ্যমে তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন রশীদ আহমদ ইবনে মাসলামা।[8]
তাঁর শারীরিক বৈশিষ্ট্য:
হজরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর ব্যক্তিত্ব ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাঁর শারীরিক গঠন এবং চলন-বলন সম্পর্কে তাঁর ছাত্ররা যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা থেকে তাঁর মহত্ত্ব ফুটে ওঠে। শায়খুল মুয়াফফাক ইবনে কুদামা আল-মাকদিসী বলেন, ‘তিনি (আব্দুল কাদের জিলানী) ছিলেন হালকা-পাতলা গড়নের অধিকারী, উচ্চতায় ছিলেন মাঝারি, বুক ছিল প্রশস্ত। তাঁর দাড়ি ছিল ঘন ও দীর্ঘ, গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা এবং দুই ভ্রু ছিল জোড়া লাগানো। কণ্ঠস্বর ছিল অত্যন্ত গম্ভীর ও দারাজ।” ইব্রাহিম বিন সাঈদ আদ-দারী বলেন, “তিনি আলেমদের পোশাক পরিধান করতেন এবং কাঁধে চাদর ঝুলিয়ে রাখতেন। যাতায়াতের জন্য তিনি খচ্চর ব্যবহার করতেন।”[9]
তাঁর মাজহাব ও দ্বীনি গুণাবলি:
জ্ঞান ও আমলের দিক থেকে তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের সবার সেরা। তবুও তিনি মাজহাব অনুসরণ করতেন। ইমাম সামআনী (রহ.) বলেন, হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.) ছিলেন জিলান অঞ্চলের একজন মনীষী; তিনি তাঁর যুগে হাম্বলি মাজহাবের ইমাম ও শায়েখ ছিলেন। ফকিহ, সৎকর্মশীল, দ্বীনদার ও কল্যাণপ্রবণতা তাঁর বৈশিষ্ট্য। তিনি অধিক জিকিরকারী, গভীর চিন্তাশীল, অতি দ্রুত অশ্রুসজল হতেন। তিনি আবু সাদ আল-মুখাররিমী (রহ.)-এঁর নিকট ফিকহ শিক্ষা লাভ করেন এবং শায়েখ হাম্মাদ আদ-দাব্বাস (রহ.)-এর সান্নিধ্যে থেকেছেন।
তিনি বাগদাদের বাবুল আজাজ এলাকায় তাঁর জন্য নির্মিত একটি মাদরাসায় বসবাস করতেন। একবার আমরা তাঁর জিয়ারতে গেলাম। তিনি বেরিয়ে এসে তাঁর সাথিদের মাঝে বসেন। তারা কুরআন খতম করেন। এরপর তিনি একটি দরস প্রদান করেন; যার কিছুই আমি বুঝতে পারিনি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁর সাথিরা উঠে দাঁড়িয়ে সেই দরসটি পুনরায় ব্যাখ্যা করলেন। সম্ভবত তাঁর কথাবার্তা ও ভাষাশৈলীর সঙ্গে পরিচিত থাকার কারণে তারা তা বুঝতে পেরেছিলেন।[10]
শিক্ষাদান ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা:
শিক্ষাদানের পাশাপাশি তিনি একটি মাদ্রাসার তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে দ্বীনি শিক্ষার এক মজবুত কেন্দ্র গড়ে তোলেন। এই মাদ্রাসা নির্মাণের পেছনেও রয়েছে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও ত্যাগের গল্প। বাগদাদের ফকিহ আবুল খাইর ইবনুত তাব্বান বর্ণনা করেন, কাজী মাখরামীর একটি মাদ্রাসা যখন শায়েখ আব্দুল কাদেরের নিকট অর্পণ করা হয়, তখন তিনি এর সংস্কার ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত দানে এটি নির্মিত হয়। এক দরিদ্র মহিলার মহরানা মওকুফের বিনিময়ে তাঁর দিনমজুর স্বামী মাদ্রাসার নির্মাণকাজে শ্রম দেন। লোকটির দারিদ্র্য বিবেচনায় শায়েখ তাকে একদিন অন্তর কাজের সুযোগ দেন। ৫ দিনার সমমূল্যের কাজ সম্পন্ন হলে শায়েখ তাকে লিখিত দলিলটি ফেরত দিয়ে বলেন, “বাকি কাজের দায় থেকে আমি তোমাকে মুক্ত (হালাল) করে দিলাম।” [11]
ইবনুল জাওযী (রহ.) বলেন, শায়েখের আধ্যাত্মিক প্রভাব ও জনপ্রিয়তার কারণে মাদ্রাসায় মানুষের উপচে পড়া ভিড় তৈরি হতো। তাঁর জুহদ ও গাম্ভীর্যপূর্ণ নসিহতে অসংখ্য মানুষ তাওবা করতো। ফলে মানুষের প্রবল আবেগ ও সহায়তায় মাদ্রাসাটি বিশালাকারে পুনর্নির্মিত হয়। তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেখানেই ইলম প্রচার অব্যাহত রাখেন এবং সেখানেই তাঁর ওফাত হয়।
প্রখ্যাত ফকিহ শায়েখ মুওয়াফফাকুদ্দীন ইবনু কুদামা (রহ.) শায়েখের শেষ জীবনের সান্নিধ্য সম্পর্কে বলেন, “আমরা তাঁকে তাঁর জীবনের শেষ দিকে পেয়েছি। তিনি আমাদের তাঁর মাদরাসায় বসবাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন এবং আমাদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতেন। কখনো কখনো তিনি তাঁর পুত্র ইয়াহইয়াকে আমাদের কাছে পাঠাতেন, সে আমাদের জন্য প্রদীপ জ্বালিয়ে দিত। আবার কখনো তাঁর ঘর থেকে আমাদের জন্য খাবার পাঠাতেন। তিনি আমাদের নিয়ে ফরজ নামাজের ইমামতি করতেন। আমি সকালে তাঁর কাছে ‘কিতাবুল খিরাকী’ মুখস্থ থেকে পাঠ করতাম, আর হাফিজ আবদুল গনী (রহ.) তাঁর কাছে ‘আল-হিদায়া’ গ্রন্থ থেকে পাঠ করতেন। সে সময় আমরা ছাড়া আর কেউ তাঁর কাছে পড়তো না। আমরা তাঁর কাছে এক মাস ও নয়দিন অবস্থান করেছি। এরপর তিনি ইন্তেকাল করেন। রাতে তাঁর মাদরাসাতেই আমরা তাঁর জানাজার নামাজ আদায় করি। আমি এমন কাউকে দেখিনি, যাঁর সম্পর্কে তাঁর চেয়ে বেশি কারামতের কথা বর্ণিত হয়েছে; আর দ্বীনের কারণে মানুষ যাঁকে তাঁর চেয়ে বেশি সম্মান করেছে। আমরা তাঁর নিকট থেকে অল্প কিছু হাদিসের অংশ শ্রবণ করেছি।”[12]
তাঁর রচনাবলী:
মানুষের হেদায়েতের জন্য তিনি কেবল মুখে বলেননি, বরং কলম ধরেছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁর পক্ষ থেকে তাঁর শাগরেদরা এই অনুলিপির কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। তাঁর লেখা গ্রন্থগুলো আজও মুসলিম উম্মাহর জন্য অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে। তাঁর বেশকিছু অমূল্য গ্রন্থ রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো—
১. আল-গুনিয়া (الغنية): এটি একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কিতাব, যাতে মানুষের দ্বীনি বিষয়ের জ্ঞানের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়।
২. ফুতুহুল গাইব (فتوح الغيب): এটি দোষমুক্ত ও বিশুদ্ধ তাসাউফের এক নির্যাস।
৩. জালাউল খাতির (جلاء الخاطর): যা মানুষের জাহের ও বাতেনকে (বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ) উজ্জ্বল করে।
৪. ফারসি পত্রাবলি: যা তিনি তাঁর অনারব বন্ধুদের কাছে লিখেছিলেন, যাতে জ্ঞানীদের জন্য অনেক শিক্ষা রয়েছে।
৫. মনোরম কবিতা: তাঁর এমন কিছু সূক্ষ্ম কবিতা রয়েছে, যা সুউচ্চ আধ্যাত্মিক মাকাম ও রহস্যে ভরপুর।[13]
৬. আল-ফাতহুর রব্বানী ওয়াল ফায়যুর রহমানী (الفتح الرباني): ওয়াজ ও নসিহত বিষয়ে শায়খের মজলিশগুলোর সংকলন।
৭. সিররুল আসরার ফিত তাসাউফ (سر الأسرار): তাসাউফ বা আধ্যাত্মিকতার রহস্যসমূহ।
৮. আত-ত্বরিকু ইলাল্লাহ (الطريق إلى الله): আল্লাহর পথে চলার পদ্ধতি।
৯. ইগাসাতুল আরেফীন ওয়া গায়াতু মুনা আল-ওয়াসিলীন (إغاثة العارفين): আরেফীনদের সহায়তা ও কামেলদের পরম লক্ষ্য।
১০. আদাবু সুলুক ওয়াত তাওয়াসসুল (آداب السلوك): আধ্যাত্মিক আচরণের শিষ্টাচার।
১১. দিওয়ানে আব্দুল কাদের জিলানী: তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ।
১২. আল-হিযবুল কবীর (الحزب الكبير): একটি বিশেষ দোয়া বা অজিফা।
১৩. দুয়াউল বাসমালাহ (دعاء البسملة): বিসমিল্লাহর ফজিলত সম্বলিত দোয়া।
এছাড়াও গাউসুল আজম (রহ.)র কাসিদায়ে গাউসিয়া শরিফের পঙক্তিগুলো আহলে তাসাউফদের মধ্যে বিশেষভাবে সমাদৃত।
কলবের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হওয়া:
তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ছিল বর্ণনাতীত। তিনি মানুষের মনের কথা বা সন্দেহগুলো বুঝতে পারতেন এবং সে অনুযায়ী তাদের সংশোধন করতেন। হাফিজ সাইফুদ্দীন ইবনুল মাজদ (রহ.)-এঁর হস্তলিখিত নোট থেকে বর্ণিত, আমি মুহাম্মদ ইবনে মাহমুদ আল-মারাতিবীর কাছ থেকে শুনেছি; তিনি বলেন, আমি শায়েখ আবু বকর আল-ইমাদ (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “আমি দ্বীনের মূলনীতি (উসুলুদ্দীন) অধ্যয়ন করছিলাম। এতে আমার মনে কিছু সন্দেহ সৃষ্টি হয়। তখন আমি মনে মনে ভাবলাম, আমি শায়েখ আবদুল কাদের (রহ.)-এঁর মজলিসে যাব; কেননা শুনেছি, তিনি অন্তরের ভাবনা নিয়েই কথা বলেন।
অতঃপর আমি তাঁর মজলিসে গেলাম। তিনি তখন বক্তব্য রাখছিলেন। তিনি বললেন, “আমাদের আকিদা হলো সালাফে সালেহিন ও সাহাবায়ে কেরামের আকিদা।” আমি মনে মনে বললাম, এটা তো কাকতালীয়ভাবে বলেছেন। এরপর তিনি আমার দিকে ফিরে একই কথা পুনরায় বললেন। আমি মনে মনে বললাম, একজন ওয়ায়েজ তো এদিক-সেদিক তাকাতেই পারেন। তিনি তৃতীয়বার আমার দিকে তাকালেন এবং বললেন, ‘হে আবু বকর, তারপর আবার সেই কথাই বললেন। এরপর বললেন, ‘উঠে দাঁড়াও, তোমার পিতা এসে গেছেন।’ অথচ আমার পিতা তখন অনুপস্থিত ছিলেন। আমি দ্রুত উঠে দাঁড়ালাম, দেখি, সত্যিই আমার পিতা এসে গেছেন!”
আবুল কাসিম ইবনু মুহাম্মদ আল-ফকিহ (রহ.) বর্ণনা করেন, আমাদের শায়েখ জামালুদ্দীন ইয়াহইয়া ইবনুস সাইরাফী (রহ.) আমাকে বলেছেন, আমি আবুল বাকা আন-নাহভী (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “আমি শায়েখ আবদুল কাদের (রহ.)-এঁর মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। সেখানে তাঁর সামনে সুর করে পাঠ করা হচ্ছিল। আমি মনে মনে বললাম,শায়েখ কেন এটার প্রতিবাদ করছেন না? তখন তিনি বললেন, “একজন এমন আসবে, যে ফিকহের কিছু অধ্যায় পড়ে এসেছে এবং সে এতে আপত্তি করবে।” আমি মনে মনে বললাম, সম্ভবত তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করেননি। তখন তিনি বললেন, “এই কথা আমি তোমাকেই উদ্দেশ্য করে বলেছি।” তখন আমি মনে মনে আমার আপত্তির জন্য তওবা করলাম। তিনি বললেন, “আল্লাহ তোমার তওবা কবুল করেছেন।”
ইমাম আবু আব্বাস আহমদ বিন আব্দুল হালিম বর্ণনা করেন, তিনি শায়খ ইযযুদ্দীন আল-ফারুসী থেকে শুনেছেন, তিনি আমাদের শায়খ শিহাবউদ্দীন সোহরাওয়ার্দী (বিখ্যাত সুফি ও তাসাউফের ইমাম)-কে বলতে শুনেছেন, “আমি উসুলে দ্বীন (দর্শননির্ভর কালাম শাস্ত্র) নিয়ে পড়াশোনা করার সংকল্প করলাম এবং মনে মনে বললাম, এ বিষয়ে শায়খ আব্দুল কাদিরের পরামর্শ নেব। আমি তাঁর কাছে যাওয়ার পর মুখ খোলার আগেই তিনি বলে উঠলেন, ‘হে উমর, ওটা কবরের পাথেয় নয়; হে উমর, ওটা কবরের পাথেয় নয়!’ (অর্থাৎ পরকালের জন্য দর্শনশাস্ত্রের চেয়ে আমল ও মারেফত বেশি জরুরি)।[14]
তাঁর ইলমের গভীরতা:
শরীয়তের জ্ঞানে তিনি ছিলেন পাহাড়ের মতো অটল। দেশ-বিদেশের কঠিন সব প্রশ্নের সমাধান তিনি যেভাবে দিতেন, তা দেখে সমসাময়িক বড় বড় আলেমরাও অবাক হয়ে যেতেন। ইবনুল জাওজি ‘মিরআতুয যামান’ গ্রন্থে বলেন, ইরাক ও অন্যান্য দেশ থেকে তাঁর কাছে ফাতোয়া আসতো। কোনো ফাতোয়া তাঁর কাছে রাতভর পড়ে থাকত না; বরং তিনি পড়ার পরপর চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই তার উত্তর লিখে দিতেন। তিনি ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.)-এঁর মাজহাব অনুযায়ী ফতোয়া দিতেন। তাঁর উত্তরগুলো যখন সমসাময়িক আলেমদের কাছে পেশ করা হতো, তখন তাঁর উত্তরের ধরন দেখে তারা বিস্ময় প্রকাশ করতেন।
যে কেউ তাঁর কাছ থেকে কোনো বিশেষ বিদ্যায় পারদর্শী হতে চায়তো, সে সেই বিদ্যায় এমন দক্ষতা অর্জন করতো যে, সে সমসাময়িকদের ছাড়িয়ে যেত এবং মানুষ তার মুখাপেক্ষী হতো। বড়ো বড়ো আলেমদের কাছ থেকে বর্ণিত আছে যে, শায়খ তেরোটি বিষয়ে (শাস্ত্রে) পাঠদান করতেন। তিনি তাঁর মাদ্রাসায় তাফসির, হাদিস, ফিকহ এবং ইলমুল খিলাফ (বিভিন্ন মাজহাবের যুক্তি-তর্ক) এর দরস দিয়ে শুরু করতেন। জোহরের পর তাঁর কাছে বিভিন্ন রেওয়ায়েতসহ কিরাত পাঠ করা হতো।[15]
গাউসে পাকের নাতি নাসর বিন আব্দুর রাজ্জাকের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, “একবার পারস্য থেকে বাগদাদে একটি ফাতোয়া এলো। এটি ইরাকের বড়ো বড়ো আলেমদের সামনে পেশ করা হলেও কেউ এর সন্তোষজনক ও স্পষ্ট উত্তর দিতে পারছিলেন না। ফতোয়াটি ছিল এমন—‘কোনো ব্যক্তি যদি এই মর্মে তিন তালাকের শপথ করে যে, সে আল্লাহ তায়ালার এমন একটি ইবাদত করবে, যে ইবাদতটি করার সময় পুরো পৃথিবীর আর কোনো মানুষ সেই ইবাদতে লিপ্ত থাকবে না (অর্থাৎ সে একা ওই ইবাদতটি করবে)। এখন প্রশ্ন হলো, সে কোন ইবাদতটি করলে তার শপথ পূর্ণ হবে এবং তালাক পড়বে না?’ বর্ণনাকারী বলেন, প্রশ্নটি আমার পিতা শায়খ আব্দুল কাদের জিলানির কাছে আনা হলে তিনি সাথেসাথেই এর সমাধান লিখে দিলেন; ‘ওই ব্যক্তি মক্কায় যাবে এবং তার জন্য তাওয়াফ করার স্থানটি (মাতাফ) খালি করে দেওয়া হবে। এরপর সে একা সাতবার কাবা ঘর তাওয়াফ করবে। এতেই তার শপথ পূর্ণ হয়ে যাবে!’ এই সমাধান পাওয়ার পর ফাতোয়া নিয়ে আসা ব্যক্তি আর এক রাতও বাগদাদে অবস্থান করেনি। অর্থাৎ সে খুশি মনে মক্কার পথে রওনা হলো)।[16]
তাঁর জীবন পরিক্রমা:
তাঁর সারা জীবনের পরিক্রমা যদি আমরা দেখি, তবে সেখানে কঠোর সাধনা এবং মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসার এক অপূর্ব সমন্বয় খুঁজে পাব। ইবনে নাজ্জার তাঁর ‘তারিখ’গ্রন্থে বলেন, শায়খ আব্দুল কাদের ৪৮৮ হিজরিতে বাগদাদে প্রবেশ করেন। তিনি ইবনে আকিল, আবুল খাত্তাব, আল-মুখরিমী এবং আবুল হুসাইন ইবনুল ফাররা’র নিকট ফিকহ শিক্ষা করেন; এমনকি তিনি উসুল, ফুরু (শাখা মাসয়ালা) ও তুলনামূলক ফিকহ শাস্ত্রে পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি হাদিস শ্রবণ করেন এবং আবু জাকারিয়া আত-তাবরিজীর কাছে সাহিত্য পড়েন। এরপর তিনি ওয়াজ-নসিহতে আত্মনিয়োগ করেন এবং তাতে অনন্য হয়ে ওঠেন। এরপর দীর্ঘকাল নির্জনতা (খালওয়াত), রিয়াজত (আধ্যাত্মিক সাধনা), মুজাহাদা, পরিভ্রমণ এবং জনশূন্য স্থান ও প্রান্তরে অবস্থান করেন। তিনি শায়খ হাম্মাদ দাব্বাসের সাহচর্য গ্রহণ করেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁকে মানুষের সামনে প্রকাশ করে দেন এবং তাঁর প্রতি মানুষের বিশাল গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে দেন।
৫২১ হিজরিতে তিনি ওয়াজ-মাহফিল শুরু করেন এবং আল্লাহ তাঁর জবান দিয়ে হিকমত (প্রজ্ঞা) প্রকাশ করতে থাকেন। এরপর তিনি পাঠদান ও ফতোয়া প্রদান শুরু করেন। মানুষ তাঁর কাছে জিয়ারতের জন্য এবং মানত নিয়ে আসতে শুরু করে। তিনি উসুল ও ফুরু বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন এবং তরিকাপন্থীদের পরিভাষায় তাঁর অতি উচ্চাঙ্গের বহু বাণী রয়েছে।[17]
জীবিকা নির্বাহ:
এত বড় মাপের একজন মানুষ হওয়ার পরেও তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং নিজের উপার্জিত খাবার সবার সাথে ভাগ করে খেতেন। ইবনে নাজ্জার আল-জুব্বইর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, শায়খের একটি হালাল জমি ছিল। ‘রাশাক’ অঞ্চলে তাঁর জনৈক বন্ধু চাষাবাদ করতেন। সেই জমি থেকে যা পেতেন তা দিয়েই শায়খ নিজের জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি নিজেই গম পিষতেন এবং তাঁর কোনো এক বন্ধু তা দিয়ে রুটি তৈরি করে দিতেন। প্রতিদিন তাঁর জন্য চার বা পাঁচটি রুটি আনা হতো। তিনি উপস্থিত সবার মাঝে সেগুলো ছোটো ছোটো টুকরো করে বিলিয়ে দিতেন এবং সামান্য কিছু নিজের খাবারের জন্য রাখতেন। তিনি নিজের কাছে কোনো সম্পদ জমিয়ে রাখতেন না। যখনই তাঁর কাছে কিছু আসত, তিনি বলতেন, এটি জায়নামাজের নিচে রাখো।” এরপর যখন তাঁর খাদেম আসত, তখন তিনি নির্দেশ দিতেন, “এটি মুদি দোকানদার বা সবজি বিক্রেতার পাওনা পরিশোধের জন্য দিয়ে দাও।”[18]
মর্যাদা ও ইলমি মজলিসের বিবরণ:
গাউসে পাকের মজলিস বা মাহফিল ছিল এমন এক জায়গা, যেখানে মানুষের সাথে সাথে জিন জাতিও উপস্থিত হয়ে হেদায়েত লাভ করত। তাঁর বাণীর প্রভাব ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। শায়খ আলী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এবং শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রা.)-এঁর কবর জিয়ারত করলাম। তখন তিনি কবর থেকে বেরিয়ে এলেন এবং শায়খ (আব্দুল কাদের)-কে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এরপর তাঁকে একটি সম্মানসূচক পোশাক (খিলাত) পরিয়ে দিলেন এবং বললেন, “শরিয়ত ও হাকিকত উভয় জ্ঞান লাভ করতে মানুষ এখন আপনার মুখাপেক্ষী হয়েছে।”
শায়খ উমর বর্ণনা করেন, এক রাতে আমি জিনদের ডাকার জন্য তদবির করছিলাম, কিন্তু তারা আসতে দেরি করল। পরে যখন তারা আসল, তখন বলল, “ভবিষ্যতে শায়খের মজলিসের দিন আমাদের ডাকবেন না।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনারাও কি শায়খ আব্দুল কাদিরের মজলিসে উপস্থিত হন?” তারা বলল, “হ্যাঁ, আল্লাহর কসম, আমাদের এক বড়ো দল তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং অনেকে (তাঁর মজলিসেই) মৃত্যুবরণ করেছে।”
শায়খের পুত্র আব্দুল ওয়াহাব বর্ণনা করেন, আমার পিতা সপ্তাহে তিনদিন আলোচনা (ওয়াজ) করতেন। শুক্রবার সকালে এবং মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মাদ্রাসায়, আর রবিবার সকালে খানকায়। তাঁর মজলিসে আলেম ও মাশায়েখগণ উপস্থিত হতেন। ৫২১ হিজরির শুরু থেকে তিনি মানুষের মাঝে কথা বলা শুরু করেন এবং ৪০ বছর তা জারি রাখেন। মানুষের মাঝে ওয়াজ ও নসিহতের মাধ্যমে ফতোয়া ও শিক্ষাদানের কাজ তিনি টানা সাত বছর করেছেন। যা তিনি বলতেন তা লিখে নেওয়ার জন্য তাঁর মজলিসে চারশ জন কালি-কলম নিয়ে বসতেন। তাঁর মজলিসে দুইজন ক্বারী কোনো সুর ছাড়াই তারতিলের সাথে কোরআন পাঠ করতেন। অনেক সময় তাঁর মজলিসে আবেগ ও আধ্যাত্মিক প্রভাবে মানুষ মৃত্যুবরণ করত। (কখনো কখনো) তিনি উপস্থিত মানুষের মাথার উপর দিয়ে শূন্যে হেঁটে যেতেন এবং পুনরায় তাঁর আসনে (কুরসিতে) ফিরে আসতেন।
শায়খের পুত্র আব্দুল ওয়াহাব আরও বলেন, আমি জ্ঞান অন্বেষণে বিভিন্ন দেশে সফর করি। বাগদাদে ফিরে আমি আমার পিতাকে বললাম, “আমি আপনার উপস্থিতিতে মানুষের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চাই।” তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন। আমি আসনে আরোহণ করলাম এবং আল্লাহ যা চেয়েছিলেন সেই অনুযায়ী বিভিন্ন ইলম ও নসিহত প্রদান করলাম, কিন্তু কারো হৃদয়ে কোনো পরিবর্তন হলো না বা কারো চোখ থেকে এক ফোঁটা পানিও পড়ল না। তখন উপস্থিত জনতা আমার পিতাকে কথা বলার জন্য অনুরোধ করল। আমি নেমে এলাম এবং তিনি উপরে উঠলেন।
তিনি বললেন, “আমি গতকাল রোজা ছিলাম। উম্মে ইয়াহইয়া (গাউসে পাকের স্ত্রী) আমাকে কয়েকটি ডিম রান্না করে একটি পাত্রে দিয়েছিলেন। হঠাৎ একটি বিড়াল এসে সেটি ফেলে দিলো এবং পাত্রটি ভেঙে গেল।” এটুকু বলতেই পুরো মজলিসের মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়ল এবং শোরগোল শুরু হলো। যখন তিনি নেমে এলেন, আমি তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, “হে বৎস, তুমি তোমার সফর নিয়ে গর্বিত ছিলে। কিন্তু তুমি কি সেখানে সফর করেছিলে?” এই বলে তিনি আঙুল দিয়ে আকাশের দিকে ইশারা করলেন। তারপর বললেন, “বৎস, আমি যখন আসনে বসলাম, তখন আল্লাহর নুর আমার হৃদয়ে প্রকাশিত হলো এবং আমি যা শুনলাম তাই বর্ণনা করলাম, আর তার ফলাফল তুমি দেখলে।”
আব্দুল ওয়াহাব আরও বলেন, এরপরও আমি মাঝেমধ্যে আসনে উঠে মানুষের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন শাস্ত্রীয় জ্ঞান নিয়ে কথা বলতাম। আমার পিতা তা শুনতেন কিন্তু কেউ প্রভাবিত হতো না। আমি নেমে যাওয়ার পর তিনি উপরে উঠে বলতেন, “ওহে কাপুরুষেরা, সাহসিকতা হলো এক মুহূর্তের ধৈর্য।” আর অমনি মজলিসের মানুষ কান্নায় ফেটে পড়ত। আমি এর রহস্য জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতেন, “তুমি নিজের পক্ষ থেকে কথা বলো, আর আমি কথা বলি অন্যের (আল্লাহর) পক্ষ থেকে।”
ওয়াজ চলাকালীন তাঁকে কোনো প্রশ্ন করা হলে অনেক সময় তিনি বলতেন, “দাঁড়াও, আমি কথা বলার অনুমতি চেয়ে নিই।” এরপর তিনি মাথা নিচু করে থাকতেন এবং এক বিশেষ গাম্ভীর্য ও নুর তাঁকে আবৃত করে ফেলত। এরপর তিনি সেই প্রশ্নের জবাব দিতেন এবং বলতেন, “মাবুদের ইজ্জতের কসম, আমি ততক্ষণ কথা বলি না যতক্ষণ না আমাকে বলা হয়, হে আব্দুল কাদের, কথা বলো, আমরা তোমার সাথে আছি। হে আব্দুল কাদের, কথা বলো, তোমার কথা শোনা হবে।”[19]
তাঁর ইবাদত ও রিয়াজত:
সবশেষে তাঁর ইবাদত ও আল্লাহর প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। তিনি সারারাত জেগে ইবাদত করতেন এবং আল্লাহর ভয়ে সবসময় কম্পমান থাকতেন। আবু উমর আস-সারিফি এবং আব্দুল হক আল-হারিমি বলতেন, আমাদের শায়খ কাঁদতেন এবং বলতেন, “হে রব, আমি কীভাবে আমার রুহ আপনার কাছে উপহার হিসেবে পেশ করব, যেখানে অকাট্য দলিলে প্রমাণিত যে, এটি আপনারই দান?”
তিনি প্রায়ই এই কবিতাটি আবৃত্তি করতেন—
وما ينفع الأعراب إن لم يكن تقى, وما ضر ذا تقوى لسان معجم
“তাকওয়া না থাকলে আরবের হওয়াতে কী লাভ? আর খোদাভীরু মানুষের জবান অনারব (অস্পষ্ট) হলেও তাতে তার কী ক্ষতি?
ইমাম শানুতুফি, আবু আব্দুল্লাহ বিন আবুল ফাতাহর সূত্রে বর্ণনা করেন, আমি চল্লিশ বছর শায়খ আব্দুল কাদের জিলানীর খেদমত করেছি। তিনি এশার অজু দিয়ে ফজরের নামাজ পড়তেন। এশার পর তিনি নির্জনে (হুজরায়) প্রবেশ করতেন এবং ফজর না হওয়া পর্যন্ত বের হতেন না।
বর্ণনাকারী বলেন, আমি এক রাতে তাঁর সাথে ছিলাম; তিনি রাতের প্রথম ভাগে অল্প সময় নামাজ পড়লেন, তারপর রাতের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত জিকির করলেন। তখন তিনি শূন্যে এত উপরে উঠে গেলেন যে, আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলেন। এরপর তিনি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়লেন এবং দীর্ঘ সিজদা করলেন। তারপর তিনি মোরাকাবায় (ধ্যানে) বসলেন এবং এক অদ্ভুত নুর তাঁকে আবৃত করে ফেলল, যা দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেওয়ার উপক্রম করছিল।[20]
তাঁর দ্বীন প্রচার:
হজরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর ইসলাম প্রচারের পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। তাঁর পবিত্র সান্নিধ্যে এসে হাজার হাজার পথভ্রষ্ট মানুষ সত্যের পথে ফিরে এসেছিল। ইমাম শানতুফি, আবু আব্দুল্লাহ বিন আবুল ফাতাহর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, গাউসুল আজম হজরত আবদুল কাদের জিলানীর হাতে পাঁচশর বেশি ইহুদি ও খ্রিষ্টান ইসলাম গ্রহণ করেছে। শুধু তাই নয়, এক লাখের বেশি দস্যু ও অপরাধী তাঁর হাতে তওবা করেছে; যা ইসলামের ইতিহাসে এক বিশাল কল্যাণ হিসেবে গণ্য হয়।
সন্তানদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল সম্পূর্ণ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। যখনই তাঁর কোনো সন্তান জন্ম নিত, তিনি তাকে হাতে নিয়ে বলতেন, “এ তো মৃত।” অর্থাৎ তিনি তাকে শুরুতেই নিজের অন্তর থেকে বের করে দিতেন এবং আল্লাহর জন্য সঁপে দিতেন। এর ফলে কোনো সন্তান মারা গেলে তাঁর ওপর কোনো শোক বা প্রভাব পড়ত না। এ কারণেই দেখা যেত ওয়াজ মাহফিলে থাকা অবস্থায় তাঁর সন্তানের মৃত্যুর খবর আসলে তিনি দাফন-কাফনের নির্দেশ দিতেন; কিন্তু নিজের ওয়াজ থামাতেন না। অনেক সময় যখন লাশের গোসল করানো হতো, তখনও তিনি ওয়াজ চালিয়ে যেতেন। গোসল শেষ হলে জানাজা আনা হতো, তখন তিনি আসন থেকে নেমে জানাজা পড়তেন এবং দাফন শেষে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসতেন।
তাঁর মজলিসের বরকত ছিল এতটাই বেশি যে, সেখানে প্রতিদিন অমুসলিমরা ইসলামে দীক্ষিত হতো। উমর আল-কিমায়ি বলেন, শায়খের মজলিস ইহুদি-খ্রিষ্টানদের ইসলাম গ্রহণ অথবা ডাকাত-খুনিদের তওবা করা ছাড়া কখনো খালি থাকত না। এক খ্রিষ্টান সন্ন্যাসি তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করে মানুষকে বলেছিলেন, “আমি ইয়েমেনের লোক। আমার মনে ইসলামের প্রতি ঝোঁক সৃষ্টি হলে আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম যে, আমার মতে ইয়েমেনের যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, তাঁর হাতেই ইসলাম গ্রহণ করব। একদিন এই চিন্তায় ঘুমিয়ে পড়লে স্বপ্নে ইসা ইবনে মারিয়াম (আ.)-কে দেখলাম। তিনি আমাকে বললেন, ‘হে সাত্তান, বাগদাদে যাও এবং শায়খ আব্দুল কাদিরের হাতে ইসলাম গ্রহণ করো, কারণ তিনি বর্তমানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ’।”
ইসলাম গ্রহণের এই ধারা কেবল ইয়েমেন নয়, বরং আরবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল। একবার ১৩ জন খ্রিষ্টান ব্যক্তি একসাথে এসে তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করে বললেন, “আমরা আরবের খ্রিষ্টান, ইসলাম গ্রহণ করতে চেয়েও দ্বিধায় ছিলাম কার কাছে যাব। তখন এক অদৃশ্য আহ্বানকারী আমাদের ডাক দিয়ে বলল, যাকে দেখা যাচ্ছিল না কিন্তু কণ্ঠ শোনা যাচ্ছিল— ‘হে হেদায়াত প্রত্যাশী কাফেলা, বাগদাদে যাও এবং শায়খ আব্দুল কাদিরের হাতে ইসলাম গ্রহণ করো। তাঁর বরকতে তোমাদের অন্তরে এমন ঈমান দেওয়া হবে যা বর্তমান সময়ের অন্য কারো কাছে পাওয়া যাবে না’।”[21]
আধ্যাত্মিক দীক্ষা লাভ:
পড়াশোনা ও সাধনার শুরুর দিনগুলো ছিল অত্যন্ত কষ্টের। আল্লাহর ওপর গভীর ভরসা রেখেই তিনি তাঁর এই যাত্রা অব্যাহত রেখেছিলেন। ইবনে নাজ্জার বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আবুল হাসান আল-জুব্বায়ি আমাকে লিখেছেন যে, শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) তাকে বলেছেন, “আমি মরুভূমিতে বা নির্জন স্থানে ফিকহ শাস্ত্র অধ্যয়ন করতাম। তখন আমি অত্যন্ত অভাবের মধ্যে ছিলাম। একদিন অদৃশ্য থেকে এক বক্তা আমাকে বলল, ‘তোমার ফিকহ অন্বেষণে সহায়তার জন্য ঋণ গ্রহণ করো’। আমি বললাম, ‘আমি তো একজন নিঃস্ব ফকির, কীভাবে ঋণ নেব? আমার তো পরিশোধ করার ক্ষমতা নেই’। সে বলল, ‘তুমি ঋণ নাও, পরিশোধের দায়িত্ব আমাদের’।”
আল্লাহর সাহায্যের ওপর ভরসা করে তিনি এক সাধারণ মানুষের দ্বারস্থ হলেন। শায়খ বলেন, “এরপর আমি এক মুদি দোকানদারের কাছে গেলাম এবং বললাম, ‘আমি আপনার সাথে এই শর্তে লেনদেন করতে চাই যে, যদি আল্লাহ আমাকে সচ্ছলতা দান করেন তবে আমি পরিশোধ করব, আর যদি আমি মারা যাই তবে আপনি আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আপনি কি আমাকে প্রতিদিন একটি রুটি এবং কিছু শাক-সবজি দেবেন?’ দোকানদার কেঁদে ফেলল এবং বলল, ‘আমি আপনার শর্তে রাজি’।”
দীর্ঘদিন তিনি এভাবেই চললেন এবং পরে অলৌকিকভাবে তাঁর ঋণের বোঝা নেমে গেল। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন আমি তার কাছ থেকে এভাবে খাবার নিতাম। এরপর আমার মনে দুশ্চিন্তা হতে লাগল কীভাবে ঋণ শোধ করব। তখন আমাকে বলা হলো, ‘অমুক স্থানে যাও, সেখানে একটি উঁচু পাটাতনের ওপর যা দেখবে তা নিয়ে মুদি দোকানদারকে দিয়ে দাও’। আমি সেখানে গিয়ে একটি বড় স্বর্ণখণ্ড পেলাম এবং সেটি নিয়ে দোকানদারকে দিয়ে দিলাম।”
আধ্যাত্মিক এই পথে চলতে গিয়ে তাঁকে অনেক কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, এমনকি মানুষ তাঁকে মৃত ভেবে কাফনও পরিয়েছিল। তিনি বলেন, “একবার আমার আধ্যাত্মিক ভাবাবেগ বা উন্মাদনা দেখা দিল এবং আমাকে হাসপাতালে নেওয়া হলো। আমার অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে মানুষ ভাবল আমি মারা গেছি। তারা কাফন নিয়ে এলো এবং আমাকে গোসল করানোর জায়গায় রাখল। এরপর হঠাৎ আমার সেই দশা কেটে গেল এবং আমি উঠে দাঁড়ালাম। এরপর বাগদাদে প্রচুর বিশৃঙ্খলা বা ফিতনা ছড়িয়ে পড়ার কারণে আমার মনে হলো শহর ছেড়ে চলে যাই।”
কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল অন্যরকম, তাই তাঁকে বারবার মানুষের সেবায় ফিরে আসতে হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি যখন শহরের হালাবা গেটের কাছে পৌঁছালাম, তখন অদৃশ্য এক বক্তা আমাকে বলল, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ সে আমাকে এমন এক ধাক্কা দিল যে আমি পড়ে গেলাম। সে বলল, ‘ফিরে যাও, মানুষের তোমার মাধ্যমে উপকৃত হওয়া বাকি আছে’। আমি বললাম, ‘আমি তো শুধু আমার দ্বীনের নিরাপত্তা চাই’। সে বলল, ‘তা তুমি পাবে’। অথচ তখনও আমি কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না।”
তাঁর এই জটিল আধ্যাত্মিক অবস্থাগুলো বোঝার জন্য তিনি একজন পূর্ণ পীরের সন্ধান করছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন, “এরপর আমার ওপর আধ্যাত্মিক বিভিন্ন অবস্থা আসতে লাগল এবং আমি এমন কাউকে খুঁজছিলাম যিনি এগুলো আমার কাছে পরিষ্কার করবেন। একদিন আমি জাফারিয়া পাড়া দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন এক ব্যক্তি তাঁর ঘরের দরজা খুললেন এবং বললেন, ‘হে আব্দুল কাদের, গত রাতে তুমি কী চেয়েছিলে?’ কথা শুনে বিস্ময়ে আমি তা ভুলে গেলাম এবং চুপ করে রইলাম। তিনি রাগান্বিত হয়ে সজোরে আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমি যখন কিছুদূর হাঁটলাম, তখন আমার মনে পড়ল আমি কী চেয়েছিলাম। আমি দরজাটি খুঁজতে ফিরে এলাম কিন্তু সেটি আর খুঁজে পেলাম না।”
পরবর্তীতে এই রহস্যময় ব্যক্তিই ছিলেন তাঁর মুর্শিদ শায়খ হাম্মাদ দাব্বাস (রহ.)। শায়খ বলেন, “পরবর্তীতে আমি জানতে পেরেছি তিনি ছিলেন শায়খ হাম্মাদ আদ-দাব্বাস (রহ.)। পরে আমি তাঁকে চিনেছিলাম এবং তিনি আমার সমস্ত জটিলতা নিরসন করে দিয়েছিলেন। আমি যখন জ্ঞান অর্জনের জন্য তাঁর কাছ থেকে অনুপস্থিত থাকতাম এবং ফিরে আসতাম, তখন তিনি বলতেন, ‘তুমি আবার আমাদের কাছে কেন এলে? তুমি তো একজন ফকিহ, ফকিহদের কাছেই যাও’। আমি চুপ করে থাকতাম।”
পীর সাহেবের কঠোর পরীক্ষাগুলো তিনি অত্যন্ত ধৈর্য ও আদবের সাথে সহ্য করতেন। তিনি বলেন, “একদিন জুমার দিনে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে আমি এক কাফেলার সাথে বের হলাম। তিনি আমাকে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দিলেন। আমি বললাম, ‘বিসমিল্লাহ, জুমার গোসল হয়ে গেল’। আমার গায়ে একটি পশমি জুব্বা ছিল এবং আমার আস্তিনে শিক্ষার কিছু পাণ্ডুলিপি ছিল। আমি আস্তিনটি উঁচু করে ধরলাম যাতে পাণ্ডুলিপিগুলো নষ্ট না হয়। তারা আমাকে রেখে চলে গেল। আমি জুব্বাটি নিয়ে তাদের পেছন পেছন গেলাম এবং শীতে প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছিলাম। শায়খ আমাকে মাঝে মাঝে কষ্ট দিতেন এবং প্রহার করতেন।”
শায়খ হাম্মাদ (রহ.) কেন তাঁর প্রতি এমন কঠোর হতেন, তার আসল রহস্য পরে শিষ্যদের কাছে প্রকাশ পায়। তিনি বলেন, “আমি যখন আসতাম, তিনি অন্যদের বলতেন, ‘আজ আমাদের এখানে প্রচুর রুটি ও ফালুদা এসেছিল, আমরা সব খেয়ে ফেলেছি, তোমার জন্য কিছুই রাখিনি’। এতে তাঁর অন্য শিষ্যরা আমার ওপর চড়াও হওয়ার সাহস পেল। তারা বলত, ‘তুমি তো ফকিহ, আমাদের সাথে তোমার কাজ কী?’ শায়খ যখন দেখলেন তারা আমাকে কষ্ট দিচ্ছে, তখন তাঁর মাঝে আমার জন্য মমতা জেগে উঠল। তিনি বললেন, ‘ওহে কুত্তার দল, তোমরা কেন ওকে কষ্ট দিচ্ছ? আল্লাহর কসম, তোমাদের মাঝে ওর মতো আর একজনও নেই। আমি তো শুধু তাকে পরীক্ষা করার জন্য কষ্ট দিচ্ছি, আমি তাকে একটি অটল পাহাড়ের মতো দেখতে পাচ্ছি, যার নড়চড় হয় না’।”
এরপর তাঁর জীবনে ইউসুফ হামাদানি (রহ.)-এর মতো মহান অলিদের স্পর্শ লাগে, যারা তাঁকে মানুষের সামনে ওয়াজ করার প্রেরণা দেন। তিনি বর্ণনা করেন, “কিছুদিন পর হামাদান থেকে ইউসুফ হামাদানি (রহ.) নামে এক ব্যক্তি এলেন, যাকে ‘কুতুব’ বলা হতো। তিনি একটি খানকায় অবস্থান করছিলেন। আমি তাঁর সাথে দেখা করতে গেলাম কিন্তু তাঁকে দেখতে পেলাম না। আমাকে বলা হলো তিনি ভূগর্ভস্থ কক্ষে আছেন। আমি সেখানে গেলাম। তিনি আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং সম্মান করে বসালেন। তিনি আমার সব হাল-হকিকত বর্ণনা করলেন এবং সমস্যার সমাধান করে দিলেন। এরপর তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি কি মানুষের সামনে ওয়াজ করবে?’ আমি বললাম, ‘সাইয়িদি, আমি তো একজন অনারব বা আজমি মানুষ, তোতলা; আমি কীভাবে বাগদাদের এই পণ্ডিতদের সামনে কথা বলব?’ তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি ফিকহ, উসুল, ব্যাকরণ এবং তাফসির সব আয়ত্ত করেছ; এখন তোমার জন্য কথা না বলা সাজে না। তুমি মিম্বরে বা আসনে আরোহণ করো এবং মানুষের সামনে কথা বলো। কারণ আমি তোমার মধ্যে এমন একটি খেজুরের কাঁদি দেখতে পাচ্ছি, যা অচিরেই একটি বিশাল খেজুর গাছে পরিণত হবে’।”
অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে বারবার নির্দেশ আসার পর তিনি দ্বীন প্রচারের ময়দানে নামেন এবং তাঁর মজলিসে মানুষের ঢল নামে। জুব্বায়ি বলেন, শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) আমাকে আরও বলেছেন, “ঘুম এবং জাগরণ—উভয় অবস্থাতেই আমাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের কল্যাণে কাজ করার আদেশ দেওয়া হতো এবং অলসতা থেকে নিষেধ করা হতো। একসময় কথা বলার প্রবল ইচ্ছা আমার ওপর জয়ী হলো। আমার অন্তরে জ্ঞানের এত ভিড় জমে যেত যে যদি আমি তা প্রকাশ না করতাম তবে আমার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হতো। শুরুতে আমার মজলিসে মাত্র দু-তিনজন লোক বসত। এরপর ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে আমার কথা জানাজানি হলো এবং মানুষের উপচে পড়া ভিড় তৈরি হলো; এমনকি এক পর্যায়ে আমার মজলিসে প্রায় সত্তর হাজার মানুষ উপস্থিত হতে শুরু করল।”
জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আর্তমানবতার সেবা ছিল তাঁর জীবনের প্রধান ব্রত। তিনি বলেন, “আমি সমস্ত নফল আমল পরীক্ষা করে দেখেছি, কিন্তু ‘ক্ষুধার্তকে খাবার দান’ করার চেয়ে উত্তম আর কোনো আমল আমি পাইনি। আমার মনে আকাঙ্ক্ষা জাগে—পুরো দুনিয়াটা যদি আমার হাতে থাকত, তবে আমি তার সবটুকু ক্ষুধার্তদের খাইয়ে দিতাম। আমার হাতের তালু যেন ছিদ্রযুক্ত বা ফাঁকা; যদি আমার কাছে এক হাজার দিনারও আসত, আমি তা রাত হওয়ার আগেই বিলিয়ে দিতাম। কেউ যদি তাঁর কাছে স্বর্ণ নিয়ে আসত, তিনি বলতেন, ‘এটি জায়নামাজের নিচে রেখে দাও’।”
এত বড় দায়িত্ব পালনের মাঝেও তাঁর অন্তর সেই নির্জনতা বা নিরালা পরিবেশের জন্য কাঁদত, যেখানে তিনি প্রথম জীবনে সাধনা করেছিলেন। তিনি বলেন, “আমার খুব ইচ্ছে হয় আগের মতো মরুভূমি আর বন-জঙ্গলে একাকী বিচরণ করি। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা আমার মাধ্যমে সৃষ্টির উপকার করার ইচ্ছা করেছেন। আমার হাতে পাঁচশোর বেশি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং এক লাখের বেশি মানুষ তওবা করেছে; এটি অনেক বড় কল্যাণ। এই বিশাল দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমার ওপর এমন সব বিপদের পাহাড় ও ভারী বোঝা এসে পড়ে, যা যদি পাহাড়ের ওপর রাখা হতো তবে পাহাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেত। তখন আমি মাটিতে শুয়ে পড়ি এবং বলতে থাকি ‘নিশ্চয় কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে’ (সুরা ইনশিরাহ)। এরপর যখন আমি মাথা তুলি, দেখি আমার সমস্ত বিপদ দূর হয়ে গেছে।”
পারিবারিক বন্ধনের ক্ষেত্রেও তিনি সবসময় আল্লাহর ভালোবাসাকে সবার উপরে রাখতেন। তিনি আরও বলেন, “যখনই আমার কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করে, আমি তাকে দুই হাতে তুলে নিয়ে বলি, এটি তো মৃত। এভাবেই আমি সন্তানকে আমার অন্তর থেকে বের করে দিই এবং আল্লাহর ভালোবাসার জায়গায় অন্য কাউকে রাখি না। ফলে যখন তারা মারা যায়, তখন তাদের মৃত্যু আমার ওপর কোনো মানসিক প্রভাব ফেলে না।”[22]
তাঁর আধ্যাত্মিক দূরদৃষ্টি:
শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) মানুষের মনের লুকানো চিন্তাগুলোও অনায়াসে বুঝে নিতে পারতেন। জুব্বায়ি বলেন, আমি একবার ‘হিলিয়াতুল আউলিয়া’ গ্রন্থটি পড়ার সময় ভাবলাম সবকিছু ছেড়ে নির্জনে ইবাদতে মগ্ন হতাম। শায়খ আব্দুল কাদেরের পেছনে নামাজ পড়ার পর তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি যদি নির্জনে ইবাদতে মগ্ন হতে চাও, তবে ততক্ষণ পর্যন্ত যেয়ো না যতক্ষণ না তুমি ফিকহ ভালোভাবে আয়ত্ত করো এবং আদব শিক্ষা করো। অন্যথায় তুমি এমন এক পাখির ছানার মতো হবে যার এখনো পাখা গজায়নি।”
তাঁর পবিত্র শরীরে মাছি না বসার বিষয়টি নিয়ে যখন একজন ভক্তের মনে প্রশ্ন জাগল, তখন তিনি এর আধ্যাত্মিক কারণ ব্যাখ্যা করলেন। আবু সানা আন-নাহরমিলকি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে আলোচনা হতো যে মাছি কখনো শায়খের গায়ে বসে না। আমি তাঁর কাছে আসতেই তিনি বললেন, “মাছি আমার কাছে কী করবে, আমার কাছে তো দুনিয়ার গুড় বা মোহ নেই, আর আখেরাতের মধু বা জান্নাতের বিলাসিতাও নেই! অর্থাৎ আমি শুধু আল্লাহর প্রেমে নিমগ্ন।”
মানুষের গুনাহ মাফের জন্য তাঁর দোয়া ছিল এক বিশেষ নেয়ামত। আবু বাকা আল-উকবারী বলেন, সাহিত্যিক ইয়াহইয়া ইবনে নাজাহ একবার মনে মনে চাইলেন শায়খ কতজনের তওবা করাচ্ছেন তা গুনবেন। তিনি মজলিসের শেষে বসে একটি সুতায় গিঁট দিচ্ছিলেন। শায়খ মিম্বর থেকে বলে উঠলেন, “আমি মানুষের গোনাহের গিঁট খুলছি, আর তুমি গিঁট দিচ্ছ?”
তরুণ বয়সের বিখ্যাত সুফি উমর ইবনে মুহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী যখন দর্শন বা ইলমে কালাম পড়ার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তখন শায়খ তাঁকে সঠিক পথ দেখান। ইবনে নাজ্জার বলেন, সোহরাওয়ার্দী সাহেব শায়খের নির্দেশের বিরোধিতা করার পর তাঁর সব কাজ এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। পরে তিনি বুঝতে পারেন শায়খের দূরদৃষ্টি কতটা প্রবল ছিল।[23]
এমনকি ঈদের নামাজের মতো সাধারণ বিষয়ের অন্তরালে থাকা বিশেষ কারণগুলোও তিনি ছাত্রদের বুঝিয়ে দিতেন। আবুল হাসান ইবনে নাজা আল-ওয়ায়েজ বলেন, শায়খ যখন ঈদের নামাজের আগে নফল নামাজ পড়ছিলেন, তখন তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল। শায়খ সাথে সাথেই তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই নামাজের বিশেষ কারণ আছে।’[24]
শায়খের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা কেবল ছাত্রদের নয়, বরং যারা তাঁকে অস্বীকার করত তাদেরও ভুল ভাঙিয়ে দিত। আবুল ফারাজ বিন আল-হামামি একবার অজু ছাড়া শায়খের পেছনে নামাজ পড়লে শায়খ সাথে সাথেই তাঁকে তাঁর ভুলের কথা জানিয়ে দেন। বর্ণনাকারী বলেন, “তাঁর এই অবস্থা দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম যে, আমার নিজের অবস্থা যা আমি জানতাম না, তা তিনি জেনে ফেলেছেন। সেই থেকে আমি তাঁর সান্নিধ্য গ্রহণ করলাম এবং তাঁর মহব্বতে লিপ্ত হলাম।”[25]
হজের সফর ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা:
যুবক বয়সে হজের সফরে শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) এক বিরল অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তিনি বলেন, আমি যখন প্রথমবার বাগদাদ থেকে হজে বের হলাম, তখন আমার সাথে শায়খ আদী বিন মুসাফিরের দেখা হলো। আমরা রিক্তহস্তে বা কোনো পাথেয় ছাড়াই একসাথে চলতে লাগলাম। পথিমধ্যে এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী আমাদের দেখে বলল, “আল্লাহ তয়ালা আপনার অন্তরে বিশেষ নূর অবতীর্ণ করেছেন এবং আপনাকে বিশেষ অনুগ্রহ দান করেছেন। আজ আমি আপনাদের সাথে ইফতার করব।”
সেই রাতে আকাশ থেকে অলৌকিকভাবে খাবার নাজিল হওয়ার ঘটনাটি তাঁর বেলায়েতের পরিচয় দেয়। শায়খ বলেন, “এশার সময় হঠাৎ আকাশ থেকে একটি খাবারের থালা নেমে এল, যাতে ছয়টি রুটি ও ফলমূল ছিল। সেই পুণ্যবতী নারী বলল, আল্লাহ প্রতিদিন তাঁর জন্য দুটি করে রুটি নাজিল করেন। আমরা খাবার খেলাম এবং স্বর্গীয় স্বাদের পানি পান করলাম।”
মক্কায় পৌঁছানোর পর সেই নারী পুনরায় দেখা দিয়ে শায়খ আদীর অচেতন অবস্থায় সাহস দেন এবং শায়খ আব্দুল কাদেরের ওপর আসা বিশেষ নূরের কথা ঘোষণা করেন। শায়খ বলেন, “তওয়াফ অবস্থায় আমার ওপর বিশেষ নূর অবতীর্ণ হলো এবং আমি গায়েবি আওয়াজ শুনলাম— ‘হে আব্দুল কাদের, বাহ্যিক রিক্ততা ত্যাগ করো এবং একনিষ্ঠ তাওহিদ বা আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন হও। অচিরেই আমি তোমাকে আমার কুদরতের বিস্ময়কর নিদর্শনসমূহ দেখাব। অস্তিত্বের মাঝে আমি ছাড়া অন্য কারো কর্তৃত্ব দেখো না; তবেই আমার দর্শন তোমার জন্য স্থায়ী হবে। এখন তুমি মানুষের উপকারের জন্য বা নসিহতে বসে যাও; কারণ আমার কিছু খাস বান্দাকে আমি তোমার মাধ্যমে আমার সান্নিধ্যে পৌঁছে দেব’।”
সেই নারী বিদায়লগ্নে বলেছিলেন, “হে যুবক, আজ তোমার ওপর নূরের একটি তাঁবু টানিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ফেরেশতারা তোমাকে ঘিরে রেখেছে।” এরপর সেই মহীয়সী নারীকে আর কখনো দেখা যায়নি।[26]
কঠোর আধ্যাত্মিক সাধনা (মুজাহাদা):
গাউসুল আজম যে উচ্চ মাকাম লাভ করেছিলেন, তার পেছনে ছিল পঁচিশ বছরের দীর্ঘ ও কঠোর সাধনা। তিনি নিজেই মিম্বরে বসে বলেছেন, “আমি পঁচিশ বছর পর্যন্ত রিক্তহস্তে ইরাকের বন-জঙ্গল ও নির্জন প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছি। টানা চল্লিশ বছর আমি এশার অজু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছি। পনেরো বছর পর্যন্ত আমার অবস্থা এমন ছিল যে এশার পর এক পায়ে দাঁড়িয়ে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করতাম এবং ঘুমের ভয়ে দেওয়ালে হাত বেঁধে রাখতাম। এভাবে সারারাত দাঁড়িয়ে পুরো কুরআন খতম করতাম।”
ক্ষুধা ও ঘুমের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জনের মাধ্যমে তিনি নিজের নফসকে সম্পূর্ণ বশ করেছিলেন। তিনি বলেন, “আমি কখনো টানা চল্লিশ দিন পর্যন্ত কোনো কিছু না খেয়ে থাকতাম। দুনিয়া তার চাকচিক্য নিয়ে আমার কাছে আসত কিন্তু আমি সেগুলোর ওপর কঠোর হতাম।”
এক পর্যায়ে তিনি আল্লাহর সাথে এক বিশেষ অঙ্গীকার করেছিলেন। তিনি বলেন, “আমি বাগদাদের এক মিনারে থাকাকালীন অঙ্গীকার করলাম যে যতক্ষণ না কেউ আমাকে নিজ হাতে লোকমা তুলে খাইয়ে দেবে ততক্ষণ আমি খাব না। টানা চল্লিশ দিন পর এক ব্যক্তি খাবার রেখে গেল কিন্তু আমি আমার অঙ্গীকার ভাঙলাম না। ক্ষুধার জ্বালায় আমার নফস ছটফট করছিল কিন্তু আমি শান্ত থাকলাম।”
অবশেষে শায়খ আবু সাঈদ আল-মাখজুমি এবং হজরত খিজির (আ.)-এর নির্দেশে তাঁর সেই বিশেষ সাধনার সমাপ্তি ঘটে। শায়খ আবু সাঈদ নিজ হাতে তাঁকে খাইয়ে দেন এবং আধ্যাত্মিক খেলাফতের পোশাক বা ‘খিরকা’ পরিয়ে দেন। এর আগে বনে-জঙ্গলে থাকার সময় হজরত খিজির (আ.) টানা তিন বছর তাঁর পরীক্ষা নিয়েছিলেন এবং শেষে একসাথে খাবার খেয়ে তাঁকে বাগদাদে প্রবেশের নির্দেশ দিয়েছিলেন। শায়খকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল সেই তিন বছর তিনি কী খেয়ে বেঁচে ছিলেন, তিনি উত্তরে বলেছিলেন, “মানুষের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট বা পরিত্যক্ত জিনিস কুড়িয়ে খেয়ে।”[27]
তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনযাত্রা:
ইবনে নাজ্জার বলেন, আমি আবু মুহাম্মদ ইবনুল আখদারকে বলতে শুনেছি, “আমি হাড়কাঁপানো শীতের প্রকোপের মধ্যে শায়খ আব্দুল কাদেরের কাছে প্রবেশ করতাম। তখন তাঁর গায়ে থাকত মাত্র একটি কামিজ (পাতলা জামা) এবং মাথায় একটি টুপি। আর তাঁর পাশে থাকা লোকেরা তাঁকে পাখা দিয়ে বাতাস করত! তিনি বলেন, তখন (তীব্র শীতের মধ্যেও) প্রচণ্ড গরমের মতো তাঁর শরীর থেকে ঘাম ঝরছিল।”
ইবনে নাজ্জার বলেন, আমি আব্দুল আজিজ ইবনে আব্দুল মালিক আল-শায়বানি থেকে, তিনি হাফেজ আব্দুল গনি থেকে এবং তিনি প্রখ্যাত ব্যাকরণবিদ আবু মুহাম্মদ ইবনুল খাশশাব আল-নাহবিকে বলতে শুনেছেন, “আমি যখন যুবক ছিলাম, তখন ব্যাকরণ (নাহু) শাস্ত্র পড়তাম। আমি লোকমুখে শায়খ আব্দুল কাদেরের চমৎকার বাচনভঙ্গির প্রশংসা শুনতাম। আমারও তাঁর মজলিসে যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সময়ের অভাবে পারছিলাম না। একদিন সুযোগ বুঝে আমি তাঁর মজলিসে হাজির হলাম। তিনি যখন কথা বলতে শুরু করলেন, তখন আমার কাছে তাঁর কথাগুলো খুব একটা ভালো লাগল না এবং আমি তা বুঝতেও পারছিলাম না। আমি মনে মনে বললাম, “আজকের দিনটাই আমার লস হলো।”
তখনই তিনি আমার দিকে ফিরে তাকালেন এবং বললেন, “আফসোস তোমার জন্য, তুমি জিকিরের মজলিসের চেয়ে ব্যাকরণ চর্চাকে প্রাধান্য দিচ্ছ এবং সেটাকেই সেরা মনে করছ! আমাদের সাহচর্যে থাকো, আমরা তোমাকে সীবওয়াই (ব্যাকরণের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত) বানিয়ে দেব।” আহমদ ইবনে জুফর ইবনে হুবাইরা বলেন, “আমি আমার দাদার কাছে শায়খ আব্দুল কাদেরের জিয়ারত করার অনুমতি চাইলাম। তিনি আমাকে শায়খকে দেওয়ার জন্য কিছু স্বর্ণমুদ্রা দিলেন। শায়খ যখন মিম্বর থেকে নামলেন, আমি তাঁকে সালাম করলাম। কিন্তু এত মানুষের ভিড়ের মধ্যে তাঁকে স্বর্ণমুদ্রা দিতে আমি সংকোচ বোধ করছিলাম। তখন তিনি নিজেই বললেন, “তোমার কাছে যা আছে তা নিয়ে এসো এবং মানুষের পরোয়া করো না।” এরপর তিনি আমার উজির দাদাকে সালাম জানালেন।
পদমর্যাদা ও তাঁর বিখ্যাত ঘোষণা:
শায়খ শানতুফি তাঁর ‘মুনফারিদাত’ গ্রন্থে যা বর্ণনা করেছেন এবং পরবর্তীগণ তা থেকে গ্রহণ করেছেন, অসংখ্য বড় বড় আলেম ও অলিদের থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁরা বলেছিলেন, শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রা.) একসময় ঘোষণা করবেন, “আমার এই পা প্রত্যেক আল্লাহর অলির কাঁধের ওপর।” তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এ কথা তাঁর জন্মের আগে বলেছিলেন, কেউ তাঁর জন্মের অল্পকাল পরে, কেউ তাঁর দায়িত্বভার গ্রহণের আগে এবং কেউ তাঁর বিশ্ববিখ্যাত হওয়ার আগে।
শায়খ আবু বকর বিন হাওয়ার আল-বাতায়িহি, শায়খ আব্দুল্লাহ বিন আলী বিন মুসা, শায়খ তাজুল আরেফিন ইবনুল আবিল ওয়াফা, শায়খ আকিল আল-মানবিজি এবং শায়খ আলী বিন ওয়াহাব, শায়খ হাম্মাদ আদ-দাব্বাস— এই সকল মহান মনীষীগণ বিভিন্ন সময়ে মহান আল্লাহ্র এক উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন অলির আবির্ভাবের আগাম সংবাদ দিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকের বর্ণনার সারকথা হলো— অচিরেই ইরাকের বাগদাদে অনারব বংশোদ্ভূত আব্দুল কাদের নামে এক মহান ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটবে, যিনি তাঁর সময়ের ‘কুতুব’ বা শ্রেষ্ঠ অলি হবেন। তিনি জনসমক্ষে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করবেন— “আমার এই পা প্রত্যেক আল্লাহর অলির কাঁধের ওপর।” তাঁর এই উচ্চমর্যাদা ও কারামতের কারণে সাধারণ ও বিশেষ সকল স্তরের মানুষ তাঁর মুখাপেক্ষী হবে। এরপর আরও চল্লিশজন শায়খের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁরাও অনুরূপ কথা বলেছেন।
আবু সাঈদ আল-কাইলুবি থেকে বর্ণিত আছে যে, শায়খ যখন এই কথা বলেন, তখন তাঁর অন্তরে আল্লাহর বিশেষ নূর প্রকাশিত হয় এবং একদল ফেরেশতার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এঁর পক্ষ থেকে তাঁর কাছে একটি সম্মানসূচক পোশাক আসে। সেই মজলিসে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অলিগণ— যাঁরা জীবিত ছিলেন তারা সশরীরে এবং যাঁরা ইন্তেকাল করেছিলেন রূহানিভাবে, সবাই উপস্থিত ছিলেন। ফেরেশতারা এবং রিজালুল গায়িব (অদৃশ্য জগতের পুরুষরা) তাঁর মজলিস ঘিরে রেখেছিলেন এবং শূন্যে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন, এমনকি তাঁরা দিগন্ত রুদ্ধ করে ফেলেছিলেন। পৃথিবীতে এমন কোনো আল্লাহর অলি বাকি ছিলেন না, যিনি তখন নিজের ঘাড় নুইয়ে দেননি।
এরপর শায়খ আদি বিন মুসাফির এবং শায়খ আহমাদ রেফায়ী (রহ.)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁরা উভয়েই বলেছেন, “শায়খ যখন এই কথাটি বলেন, তখন একযোগে ৩৭০ জন অলি তাঁদের ঘাড় নুইয়ে দিয়েছিলেন।” শায়খ লুলু আল-আরমানি সেই অলিগণের ভৌগোলিক অবস্থানের বিস্তারিত সংখ্যা উল্লেখ করে বলেন— হারামাইন (মক্কা ও মদিনা): ১৭ জন। ইরাক: ১০৬ জন। আজম (পারস্য/অনারব অঞ্চল): ৪ জন। শাম (সিরিয়া অঞ্চল): ৩০ জন। মিশর: ২০ জন। মাগরিব (মরক্কো/উত্তর আফ্রিকা): ১৭ জন। ইয়েমেন: ২৩ জন। হাবশা (ইথিওপিয়া): ২১ জন। ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীর সংলগ্ন এলাকা: ১০ জন। সমুদ্রের দ্বীপসমূহ: ৪৭ জন। সারান্দীপ (শ্রীলঙ্কা) উপত্যকা: ২৪ জন। কাফ পর্বত এলাকা: ৭ জন।[28]
নফসের সাথে লড়াই:
আবদুল্লাহ ইবনে আবিল হাসান আল-জুব্বায়ি (রহ.) লিখেছেন, শায়েখ আবদুল কাদের (রহ.) আমাকে বলেছেন, “একদিন আমার নফস আমাকে প্রবল কামনার দিকে টানছিল। আমি তাকে দমন করতে করতে মরুভূমির দিকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এক গলি দিয়ে ঢুকতাম, আরেক গলি দিয়ে বের হতাম। হঠাৎ আমি মাটিতে পড়ে থাকা একটি কাগজের টুকরা দেখতে পেলাম। তাতে লেখা ছিল, ‘শক্তিশালীদের জন্য কামনা নয়; কামনা সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বলদের জন্য।’ তখনই আমার অন্তর থেকে সেই কামনা বের হয়ে গেল।” তিনি বলেন, “সে সময় আমি নদীর ধারে কাঁটাযুক্ত গাছের ফল (খাররূব) ও লেটুস পাতায় জীবনধারণ করতাম।”[29]
ধৈর্য ও আমানতদারিতার এক অলৌকিক দৃষ্টান্ত:
ইবনু নাজ্জার (রহ.) বলেন, “আমি আবু বকর আব্দুল্লাহ ইবনে নাসর ইবনে হামজা আত-তাইমী (রহ.)-এঁর হাতের লেখা থেকে পড়েছি। তিনি বলেন, আমি শায়েখ আবদুল কাদের (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “একবার চরম দুর্ভিক্ষের সময় আমি এমন কঠিন সংকটে পড়লাম যে, বেশ কয়েকদিন আমি কোনো খাবার জোগাড় করতে পারলাম না। এমনকি আমি রাস্তায় ফেলে দেওয়া পরিত্যক্ত উচ্ছিষ্ট কুড়িয়ে খাওয়ার চেষ্টা করতাম। একদিন খাবারের খোঁজে নদীর তীরে গেলাম, কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলাম আমার আগেই অন্যান্য অভাবী মানুষরা সেখানে ভিড় করে আছে, অর্থাৎ সেখানেও খাওয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট নেই। আমি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম যে, নিজের শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারছিলাম না।
অগত্যা আমি একটি মসজিদে গিয়ে বসে পড়লাম; অবস্থা এমন হলো যে, আমি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এমন সময় পারস্যের এক যুবক মসজিদে প্রবেশ করল, তার সাথে ছিল রুটি এবং ঝলসানো মাংস। সে বসে খেতে শুরু করল। সে যখনই মুখে লোকমা তুলছিল, (ক্ষুধার তাড়নায়) আমার মুখও অজান্তেই খুলে যাচ্ছিল। যুবকটি আমার দিকে তাকিয়ে দেখে বলল, ‘বিসমিল্লাহ, আসুন, আমার সাথে খান)।’ আমি প্রথমে অস্বস্তি বোধ করে মানা করলাম, কিন্তু সে বারবার বলায় আমি সামান্য খেলাম। এরপর সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার পেশা কী? বাড়ি কোথায়?’ আমি বললাম, ‘আমি জিলান অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থী।’ সে বলল, ‘আমিও তো জিলান থেকেই এসেছি। আপনি কি জিলানের সেই যুবককে চেনেন যার নাম আব্দুল কাদের? তিনি দরবেশ আবু আব্দুল্লাহ আল-সাওমায়ীর নাতি হিসেবে পরিচিত।’ আমি বললাম, ‘আমিই সেই ব্যক্তি।’
একথা শুনে যুবকটি বিচলিত হয়ে পড়ল এবং তার চেহারার রঙ বদলে গেল। সে বলল, ‘আল্লাহর কসম ভাই, আমি আপনার সন্ধানেই বাগদাদে এসেছি। আমার কাছে আমার কিছু খরচ করার মতো টাকা ছিল, কিন্তু আমি আপনার ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। খুঁজতে খুঁজতে আমার সব টাকা ফুরিয়ে গেল। এমনকি গত তিনদিন ধরে আমি নিজের খাবারের জন্য একটি পয়সাও জোগাড় করতে পারিনি, যা ছিল তা শুধু আপনার গচ্ছিত আমানত। আজ চতুর্থ দিনে আমি ভাবলাম, তিনদিন পার হয়ে গেছে এবং ক্ষুধার তীব্রতায় এখন আমার জন্য (মৃত প্রাণীর মাংসের মতো) হারাম খাবারও জায়েজ হয়ে গেছে। তাই নিরুপায় হয়ে আমি আপনার আমানত থেকে এই রুটি ও মাংসটুকু কিনেছি। অতএব, আপনি এখন নিশ্চিন্তে ও সানন্দে এটি খান। কারণ প্রকৃতপক্ষে এটি আপনারই সম্পদ, আর আমি এখন আপনার মেহমান!’ আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী আমানত?’ সে বলল, ‘আপনার মা আমার কাছে আপনার জন্য আটটি দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) পাঠিয়েছিলেন। আল্লাহর কসম, আজ পর্যন্ত আমি এতে কোনো খিয়ানত (আত্মসাৎ) করিনি।’ তখন আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম, তার মন শান্ত করলাম এবং সেই টাকা থেকে তাকে কিছু হাদিয়া হিসেবে দান করলাম।”[30]
শাসকের সাথে তাঁর আচরণ:
শায়েখ ইবনে রজব দামেস্কের ইমাম নাসিহুদ্দীন আব্দুর রহমান ইবনে নাজমের হাতে লেখা নোটে পড়েছেন, আমাদের শায়খ আবুল-হাসান ইবনে গারিবা আল-ফকিহ বর্ণনা করেছেন, “একদা খলিফা হজরত উজির ইবনে হুবাইরা (রহ.)-এর কাছে শায়খ আব্দুল কাদেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন। খলিফা বললেন, ‘তিনি (আব্দুল কাদের) আমাকে অবজ্ঞা করেন এবং আমার সমালোচনা করেন। তাঁর খানকায় একটি ছোটো খেজুর গাছ আছে; তিনি কথা বলার সময় সেই গাছটিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘হে ছোটো খেজুর গাছ, সীমালঙ্ঘন করো না, নতুবা আমি তোমার মাথা কেটে ফেলব! আসলে তিনি আমাকেই ইঙ্গিত করে এ-কাজ করেন। আপনি তাঁর কাছে নির্জনে গিয়ে বলুন যে, খলিফার সাথে এমন আচরণ করা আপনার জন্য শোভা পায় না, আর খিলাফতের মর্যাদা সম্পর্কে তো আপনি অবগতই আছেন।”
শায়খ আবুল হাসান বলেন, “আমি শায়খের কাছে গেলাম এবং সেখানে একদল লোককে বসা দেখলাম। আমি নির্জনে কথা বলার সুযোগের অপেক্ষায় বসে রইলাম। হঠাৎ আমি তাঁর কথা বলার মাঝে বলতে শুনলাম, “হ্যাঁ, আমি সেটির মাথা কেটে ফেলব!” আমি বুঝতে পারলাম তাঁর এই ইঙ্গিত আমার দিকেই (অর্থাৎ আমার আমার উদ্দেশ্য তিনি বুঝে ফেলেছেন)। আমি তখনই উঠে চলে এলাম। উজির আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি বার্তাটি পৌঁছে দিয়েছেন?’ আমি যা ঘটেছিল তা বিস্তারিত বললাম। শুনে উজির কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, ‘শায়খ আব্দুল কাদেরের নেককার ও অলি হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।”[31]
গাউসে পাক বনাম শয়তান:
গাউসে পাকের পুত্র মুসা বর্ণনা করেন, শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী বলতেন, “একবার আমার কোনো এক আধ্যাত্মিক ভ্রমণে আমি মরুভূমিতে বের হলাম এবং টানা কয়েকদিন পানির দেখা পেলাম না। পিপাসায় আমি কাতর হয়ে পড়েছিলাম। এমন সময় একটি মেঘখণ্ড এসে আমাকে ছায়া দান করল এবং তা থেকে শিশিরের মতো কিছু একটা আমার ওপর বর্ষিত হলো, যা পান করে আমি তৃষ্ণা নিবারণ করলাম। এরপর আমি এক বিশাল নূর দেখতে পেলাম, যাতে দিগন্ত উদ্ভাসিত হয়ে উঠল এবং আমার সামনে একটি আকৃতি ফুটে উঠল। সেই আকৃতি থেকে আমাকে সম্বোধন করে বলা হলো, “হে আব্দুল কাদের, আমি তোমার রব! আমি তোমার জন্য সমস্ত হারাম বস্তুকে হালাল করে দিলাম।” অথবা বলেছিলেন, “যা অন্যের জন্য হারাম ছিল, তা তোমার জন্য বৈধ করে দিলাম।” আমি তৎক্ষণাৎ বললাম, “বিতাড়িত শয়তান থেকে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি। ওরে অভিশপ্ত, তুই দূর হ!”
সাথে সাথে সেই আলো অন্ধকারে রূপ নিল এবং সেই আকৃতিটি ধোঁয়ায় পরিণত হলো। এরপর সে (শয়তান) আমাকে লক্ষ্য করে বলল, “হে আব্দুল কাদের, তোমার রবের বিধান সম্পর্কিত জ্ঞান এবং তোমার আধ্যাত্মিক মাকাম ও অবস্থা সম্পর্কে গভীর প্রজ্ঞার কারণে তুমি আজ আমার হাত থেকে বেঁচে গেলে। অথচ এই একই কৌশলে আমি ইতঃপূর্বে আধ্যাত্মিক পথের সত্তরজন সাধককে পথভ্রষ্ট করেছি!” আমি বললাম, “যাবতীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও অনুগ্রহ কেবল আমার রবেরই।” পরবর্তীতে শায়খকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আপনি কীভাবে বুঝলেন যে সে শয়তান?” তিনি উত্তর দিলেন, “তার এই কথার দ্বারা যে, আমি তোমার জন্য হারামকে হালাল করে দিলাম। (কারণ আল্লাহর বিধান বা শরিয়ত কখনো পরিবর্তন হয় না)।” [32]
মাকামুল মাখদু বা নিভৃত মাকাম:
আব্দুর রহমান তফসুনাজী (রহ.) নামক এক বুজুর্গ একবার বলেছিলেন, “আমি কেবল জমিনের বুজুর্গদের আলোচনাতেই শায়খ আব্দুল কাদেরের নাম শুনতে পাই। অথচ আমি দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ‘বাবে কুদরত’ বা কুদরতের দরজার স্তরগুলোতে বিচরণ করছি, সেখানে তো আমি তাঁকে কখনো প্রবেশ করতে বা বের হতে দেখলাম না!” এরপর তিনি তাঁর একদল মুরিদকে বললেন, “তোমরা বাগদাদে যাও এবং শায়খ আব্দুল কাদেরকে বলো যে, আব্দুর রহমান আপনাকে সালাম জানিয়েছে এবং জিজ্ঞাসা করেছে যে, তিনি ৪০ বছর ধরে কুদরতের দরজায় অবস্থান করেও আপনাকে সেখানে কখনো যাতায়াত করতে দেখেননি কেন?”
ঠিক সেই মুহূর্তে শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) বাগদাদে বসে তাঁর মুরিদদের বললেন, “তোমরা শায়খ আব্দুর রহমান তফসুনাজীর কাছে যাও। পথিমধ্যে তাঁর পাঠানো একদল লোকের দেখা পাবে যারা আমার কাছে অমুক বার্তা নিয়ে আসছে। তোমরা তাদের ফিরিয়ে নিয়ে পুনরায় শায়খের কাছে যাও এবং বলো, “আব্দুল কাদের আপনাকে সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন, আপনি আছেন দরজায় (বাইরের স্তরে)। আর যে দরজায় থাকে সে ভেতরের মজলিসে যারা আছে তাদের দেখতে পায় না। আর যারা মজলিসে আছে তারা নিভৃত কক্ষের বাসিন্দাদের দেখে না। আর আমি হলাম সেই নিভৃত কক্ষের (মখদউল খাস) বাসিন্দা। আমি আল্লাহর গোপন দরজা দিয়ে প্রবেশ করি ও বের হই, যে কারণে আপনি আমাকে দেখতে পান না। এর প্রমাণ হলো অমুক রাতে আমার হাত দিয়েই আপনি ‘রেজা’ বা সন্তুষ্টির খেলাফত লাভ করেছেন। প্রমাণ হলো অমুক রাতে আমার হাত দিয়েই আপনি ‘ফাতহ’ বা বিজয়ের সম্মান পেয়েছেন। আর বড়ো প্রমাণ হলো ‘বাবে কুদরত’ বা দরকাতের স্তরে বারো হাজার আউলিয়ায়ে কেরামের উপস্থিতিতে আপনাকে যে সবুজ রঙের অলির পোশাক পরানো হয়েছিল, যার ওপর ‘সুরা ইখলাস’ নকশা করা ছিল, তা আমার হাত দিয়েই আপনার কাছে পৌঁছেছিল।” মুরিদরা মাঝপথে তফসুনাজীর মুরিদদের দেখা পেলেন এবং তাঁদের নিয়ে পুনরায় শায়খ আব্দুর রহমানের কাছে গিয়ে বার্তাটি পৌঁছে দিলেন। সব শুনে শায়খ আব্দুর রহমান তফসুনাজী (রহ.) বললেন, “শায়খ আব্দুল কাদের সত্য বলেছেন। তিনিই বর্তমান সময়ের সুলতান এবং সবকিছুর ওপর আধ্যাত্মিক কর্তৃত্বের অধিকারী।”[33]
খিলাফত লাভ:
গাউসুল আজম হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) আধ্যাত্মিক খেলাফতের পোশাক বা ‘খিরকা’ পরিধান করেছেন শায়খ আবু হাসান আলী বিন মুহাম্মদ বিন ইউসুফ আল-কুরাশী আল-হাক্কারী-এর হাত থেকে। তিনি (হাক্কারী) তা পরেছেন শায়খ আবুল ফরাজ আল-ত্বরসূসীর হাত থেকে। তিনি পরেছেন শায়খ আবুল ফজল আব্দুল ওয়াহিদ বিন আব্দুল আজিজ তামীমীর হাত থেকে। আর তিনি তা লাভ করেছেন শায়খ আবু বকর শিবলী (রহ.)-এর হাত থেকে।[36] এ ছাড়াও গাউসুল আজম হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) বিভিন্ন মাধ্যমে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে খিরকা পেয়েছিলেন।
কারামাত:
প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘আল-মুগনি’র লেখক শায়খ মুওয়াফকুদ্দীন (ইবনে কুদামা আল-মাকদিসী) বলেন, “শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর ব্যাপারে যত অধিক কারামত (অলৌকিক ঘটনা) বর্ণিত হয়েছে, অন্য কারো ব্যাপারে আমি তা শুনিনি। আর দ্বীনের কারণে তাঁর মতো এত বেশি সম্মান ও শ্রদ্ধা পেতেও আমি অন্য কাউকে দেখিনি।”[34]
শায়েখ হাফিজ আবুল হুসাইন আলী ইবনে মুহাম্মদ (রহ.) বলেন, আমি শায়েখ আবদুল আজিজ ইবনে আবদুস সালাম আশ-শাফেয়ী (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “আমাদের কাছে কোনো ব্যক্তির কারামত এত ব্যাপকভাবে (তাওয়াতুরের মতো) বর্ণিত হয়নি, যতটা শায়েখ আবদুল কাদের (রহ.)-এর কারামত বর্ণিত হয়েছে।[35]
তাঁর কিছু প্রসিদ্ধ কারামাত হচ্ছে—
১. শায়খ আদি বিন মুসাফির থেকে বর্ণিত, একদিন শায়খ আবদুল কাদের জিলানী ওয়াজ করছিলেন এমন সময় বৃষ্টি শুরু হলো। এতে মজলিসের মানুষ এদিক-ওদিক ছোটাছুটি শুরু করল। তখন শায়খ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি মানুষ জমা করছি আর আপনি কি তাদের ছড়িয়ে দিচ্ছেন?” তৎক্ষণাৎ মাদরাসার ওপর বৃষ্টি থেমে গেল। কিন্তু মাদরাসার চারপাশে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল।
২. একবার দজলা নদীর পানি এত বেড়ে গেল যে, মানুষ ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় পড়ে গেল। তারা গাউসে পাকের কাছে এসে সাহায্য চাইলে তিনি তাঁর হাতের লাঠিটি নিয়ে নদীর পাড়ে গেলেন এবং মাটিতে লাঠি দিয়ে গুঁতো দিয়ে বললেন, ‘এই পর্যন্ত!’ তৎক্ষণাৎ পানি কমতে শুরু করল। এবং ঐ চিহ্ন পর্যন্ত গিয়ে থেমে গেল।
৩. গাউসে পাকের নাতি নাসর বিন আব্দুর রাজ্জাক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার পিতা একবার জুমার নামাজ পড়তে বের হলেন। আমি এবং আমার ভাই আব্দুল ওয়াহাব ও ঈসা তাঁর সাথে ছিলাম। পথে সুলতানের তিনটি মদের বোঝাই (গাধা বা খচ্চর দ্বারা) আমাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল এবং মদের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছিল। শায়খ আবদুল কাদের জিলানী রক্ষীদের বললেন, ‘থামো!’ কিন্তু তারা দ্রুত পশুগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে যেতে লাগল। তখন গাউসে পাক পশুগুলোকে উদ্দেশ্য করে বললেন, থামো!’ অমনি পশুগুলো দাঁড়িয়ে গেল। রক্ষীরা পশুগুলোকে অনেক মারধর করলেও সেগুলো নড়ল না। এরপর রক্ষীরা প্রচণ্ড পেটের ব্যথায় আক্রান্ত হলো। তারা আর্তনাদ করে তওবা করলে তাদের ব্যথা সেরে গেল। আর মুহূর্তের মধ্যে সেই মদগুলো সিরকায় পরিণত হয়ে গেল। পশুগুলো আবার চলতে শুরু করল এবং চারদিকে আল্লাহর তাসবিহ উচ্চারিত হলো। সুলতান এই খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়লেন, ভয়ে কাঁপতে লাগলেন এবং শায়খের সাথে দেখা করতে আসলেন।
৪. মনসুর বিন আল-মুবারক আল-ওয়াসিতি বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “আমি যখন যুবক ছিলাম, একদিন শায়খ আব্দুল কাদিরের কাছে গেলাম। আমার সাথে একটি বই ছিল, যাতে দর্শন (Philosophy) এবং আধ্যাত্মিকতা (জাদুবিদ্যা সংক্রান্ত) বিষয়ক কিছু আলোচনা ছিল। শায়খ আমার বইটির দিকে তাকানোর আগেই আমাকে বললেন, ‘হে মনসুর, তোমার এই বইটি তোমার জন্য খুব মন্দ সঙ্গী। ওঠো এবং এটি ধুয়ে ফেলো।’ আমি মনে মনে স্থির করলাম যে, বইটি বাড়িতে রেখে আসব, আর কখনো সাথে বহন করব না; কিন্তু সেটি ধুয়ে ফেলতে আমার মন সায় দিচ্ছিল না। তাছাড়া বইটির কিছু বিষয় আমার মাথায় গেঁথে গিয়েছিল। আমি যখন উঠে যাওয়ার চেষ্টা করলাম, শায়খ আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন। আমি নড়াচড়া করার শক্তি হারিয়ে ফেললাম। মনে হলো কেউ আমাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে। এরপর তিনি বললেন, “তোমার বইটি আমাকে দাও।” আমি বইটি তাঁর হাতে দিলে তিনি তা খুললেন। দেখলাম সেটি একটি সাদা কাগজের স্তূপ, তাতে কোনো লেখাই নেই! তিনি পাতাগুলো উল্টেপাল্টে দেখে বললেন, ‘এটি তো উত্তম হাতের লেখায় লেখা ‘ফাযায়িলুল কুরআন’ (কুরআনের ফজিলত) এর বই।’ এরপর তিনি বইটি আমাকে ফেরত দিলেন। আমি তাকিয়ে দেখি সত্যিই তা অত্যন্ত চমৎকার হস্তাক্ষরে লেখা কুরআনের ফজিলতের একটি বই হয়ে গেছে! শায়খ আমাকে বললেন, ‘তওবা করো যেন তোমার মুখে এমন কিছু না আসে যা তোমার অন্তরে নেই।’ আমি যখন তাঁর মজলিস থেকে উঠে দাঁড়ালাম, দেখলাম আমার স্মৃতি থেকে সেই দর্শন শাস্ত্রের আগের মুখস্থ থাকা সমস্ত কথা আমি পুরোপুরি ভুলে গিয়েছি।”
৫. কুতুব আল-ইউতিনি ‘মুখতাসারুল মিরাআত’ গ্রন্থে শায়খ আবু সাঈদ আল-কাইলুবি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “আমি শায়খের মজলিসে একাধিকবার আম্বিয়া আলাইহিস সালামগণকে দেখেছি। কারণ নবীদের রূহসমূহ আসমান ও জমিনের মাঝে দিগন্তজুড়ে বাতাসের মতো বিচরণ করে।” তিনি আরও বলেন, “আমি অদৃশ্য জগতের পুরুষদের (রিজালুল গায়িব) তাঁর মজলিসে আসার জন্য প্রতিযোগিতা করতে দেখেছি। আমি খিজির (আ.)-কেও প্রচুর পরিমাণে তাঁর মজলিসে উপস্থিত হতে দেখেছি। আমি তাঁকে (খিজির আ.) এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি কামিয়াবি বা সফলতা চায়, তার উচিত শায়খের সাহচর্য আঁকড়ে ধরা।”
৬. শায়খ মাতার বিন আল-বাদরানির পুত্র আবুল খায়ের কারাম বলেন, “যখন আমার পিতার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলো, আমি বললাম, “আপনার পর আমি কার অনুসরণ করব, আমাকে অসিয়ত করুন।” তিনি বললেন, “শায়খ আব্দুল কাদের।” আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে পুনরায় একই কথা জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, “হে বৎস, যে জামানায় শায়খ আব্দুল কাদের থাকবেন, সে জামানায় তিনি ছাড়া আর কারো অনুসরণ করো না।” পিতা মারা যাওয়ার পর আমি বাগদাদে এলাম এবং শায়খ আব্দুল কাদিরের মজলিসে উপস্থিত হলাম। সেখানে শায়খ বাকা, আবু সাঈদ আল-কাইলুবি, আলী বিন আল-হিতী-সহ অনেক বড়ো বড়ো মাশায়েখ উপস্থিত ছিলেন। আমি শায়খকে বলতে শুনলাম, “আমি তোমাদের সাধারণ ওয়ায়েজদের মতো নই, আমার আলোচনা তো শূন্যে অবস্থানরত পুরুষদের (রিজালুল গায়িব) জন্য।” আমি মাথা তুলে তাকালাম এবং দেখলাম তাঁর সামনে নূরের ঘোড়ায় সওয়ার নূরের একদল মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের আধিক্যে আমার দৃষ্টি আর আকাশের মাঝে আড়াল তৈরি হয়েছে। তাঁরা মাথা নিচু করে আছেন; কারো চোখে পানি, কেউ কাঁপছেন, আবার কারো পোশাকে আগুনের আভা দেখা যাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে আমি মানুষের ভিড় ঠেলে দৌড়ে তাঁর আসনের (মিম্বর) কাছে পৌঁছলাম। শায়খ আমার কান ধরলেন এবং বললেন, ‘হে কারাম, তোমার পিতার সেই প্রথম অসিয়ত কি তোমার জন্য যথেষ্ট ছিল না?’ তাঁর গাম্ভীর্য দেখে আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলাম।”
৭. মুফাররিজ বিন শিহাব আশ-শাইবানি বর্ণনা করেন, যখন শায়খের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল, তখন বাগদাদের শীর্ষস্থানীয় একশ জন ফকিহ একত্রিত হলেন। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, প্রত্যেকে আলাদা আলাদা শাস্ত্র থেকে এমন জটিল প্রশ্ন করবেন, যা অন্যের প্রশ্নের সাথে মিলবে না, যাতে শায়খকে নিরুত্তর বা লাজবাব করা যায়। তাঁরা তাঁর ওয়াজ মাহফিলে এলেন এবং আমিও সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলাম। যখন তাঁরা মজলিসে বসলেন, শায়খ মাথা নিচু করলেন। হঠাৎ তাঁর বুক থেকে একটি নূরের ঝলকানি বিচ্ছুরিত হলো এবং সেই একশজন ফকিহ’র বুকের ওপর দিয়ে চলে গেল। সেই নূর যার ওপর দিয়েই যাচ্ছিল, সে-ই অস্থির হয়ে পড়ছিল। তাঁরা সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠলেন, নিজেদের কাপড় ছিঁড়ে ফেললেন এবং মাথার টুপি ফেলে দিয়ে মিম্বরের কাছে গিয়ে শায়খের পায়ে মাথা রাখলেন। পুরো মজলিসে এমন শোরগোল শুরু হলো যে, আমার মনে হলো বাগদাদ শহরটিই বুঝি কেঁপে উঠছে। শায়খ একে একে সবাইকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এরপর তিনি একেকজনকে লক্ষ্য করে বললেন, “তোমার প্রশ্ন ছিল এই এবং তার উত্তর হলো এই।” এভাবে তিনি প্রত্যেকের প্রশ্ন এবং তার উত্তর বলে দিলেন। মজলিস শেষ হলে আমি তাঁদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনাদের কী হয়েছিল?’ তাঁরা বললেন, ‘আমরা যখন বসলাম, তখন আমাদের অর্জিত সমস্ত জ্ঞান আমরা ভুলে গেলাম; মনে হচ্ছিল আমরা জীবনে কখনো কিছুই পড়িনি। কিন্তু শায়খ যখন আমাদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন, তখন আমাদের ছিনিয়ে নেওয়া জ্ঞান পুনরায় ফিরে এলো। শুধু তাই নয়, তিনি আমাদের সেই প্রশ্নগুলো বলে দিলেন যা আমরা মনে মনে নিয়ে এসেছিলাম এবং এমন সব উত্তর দিলেন, যা আমাদের জানা ছিল না।”
৮. হামিদ আল-হাররানি বলেন, আমি বাগদাদে শায়খের মাদ্রাসায় তাঁর কাছে গেলাম এবং তাঁর জায়নামাজে বসলাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “হে হামিদ, অচিরেই তুমি বাদশাহর আসনে বসবে।” পরবর্তীতে আমি যখন হাররানে ফিরে গেলাম, সুলতান নুরুদ্দিন (মাহমুদ জাঙ্গি) আমাকে তাঁর সান্নিধ্যে থাকার নির্দেশ দিলেন, আমাকে তাঁর অত্যন্ত কাছে টেনে নিলেন, তাঁর রাজকীয় গালিচায় বসালেন এবং ওয়াকফ সম্পত্তির দায়িত্ব দিলেন। তখন আমার শায়খের সেই কথা মনে পড়ে গেল।
৯. ইবনে নাজ্জার বর্ণনা করেন, বিচারক আবু নাসর আল-রাশি বলেছেন, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম শায়খ আব্দুল কাদেরের কাছে যাব এবং অনুরোধ করব তিনি যেন দোয়া করেন যাতে আল্লাহ আমাকে একদল অত্যাচারীর অনিষ্ট থেকে বাঁচান। ঘটনাক্রমে ‘জামে আল-কাসর’-এর দরজায় তাঁর সাথে আমার দেখা হলো। আমি কথাটি বলতে চাওয়ার আগেই তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন এবং বললেন, “অচিরেই আল্লাহ তাদের পক্ষ থেকে তোমার জন্য যথেষ্ট হবেন, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।” (সুরা বাকারা-১৩৭)। ফলে আমার আর কিছু চাওয়ার প্রয়োজন পড়ল না।
১০. খিজির বিন আব্দুল্লাহ বর্ণনা করেন, একদিন খলিফা মুসতানজিদ বিল্লাহ শায়খের মাদ্রাসায় এলেন এবং দশটি সোনার থলে নজরানা দিলেন। শায়খ তা নিতে অস্বীকার করলেন। খলিফা বারবার পিড়াপিড়ি করলে শায়খ দুটি থলে দুই হাতে নিয়ে চাপ দিলেন। দেখা গেল থলে দুটি থেকে রক্ত ঝরছে! শায়খ বললেন, ‘হে আবু মুজাফফর, মানুষের রক্ত চুষে তা আমার কাছে আনতে তোমার লজ্জা করল না?’ তা দেখে খলিফা জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। শায়খ বললেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বংশধর হওয়ার খাতিরে তোমার সম্মান না করলে এই রক্ত তোমার ঘর পর্যন্ত প্রবাহিত হতে দিতাম। অন্য একদিন খলিফা চাইলেন শায়খ তাকে কিছু দেখান। শায়খ বললেন, ‘কী চাও?’ তিনি বললেন, ‘আপেল।’ শায়খ শূন্যে হাত বাড়িয়ে দুটি আপেল ধরলেন। একটি খলিফাকে দিলেন, অন্যটি নিজে ভাঙলেন। শায়খের আপেল থেকে মিশকের সুঘ্রাণ বের হলো; কিন্তু খলিফা যখন নিজের আপেলটি ভাঙলেন, দেখা গেল ভেতরে পোকা। শায়খ বললেন, ‘এটি একজন জালিমের হাত স্পর্শ করেছে, তাই এটি পোকায় ধরেছে।’
১১. আব্দুস সামাদ বিন হাম্মাম নামক এক ধনী ব্যক্তি শায়খের কারামত অস্বীকার করতেন। একদিন বাধ্য হয়ে তিনি শায়খের মজলিসে আটকা পড়লেন। তার প্রচণ্ড টয়লেটের বেগ পেল, কিন্তু মানুষের ভিড়ে বের হতে পারছিলেন না। লজ্জায় এবং কষ্টে তার মরার মতো অবস্থা হলো। শায়খ মিম্বর থেকে নেমে এসে তাঁর জামার আস্তিন আব্দুস সামাদের মাথার ওপর ধরলেন। মুহূর্তের মধ্যে আব্দুস সামাদ নিজেকে এক সবুজ বাগানে এবং বহমান ঝরনার পাশে আবিষ্কার করলেন। তিনি সেখানে প্রাকৃতিক কাজ সারলেন, অজু করলেন এবং দুই রাকাত নামাজ পড়লেন। এরপর শায়খ আস্তিন সরালে তিনি দেখলেন তিনি মিম্বরের নিচেই আছেন এবং তাঁর সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে! অবাক করা বিষয় হলো, তাঁর হাত-পা অজুর পানিতে ভেজা ছিল; কিন্তু তিনি তাঁর রুমাল ও সিন্দুকের চাবি হারিয়ে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে ইরাক ভ্রমণে গিয়ে ঠিক সেই বাগানটি তিনি বাস্তবে খুঁজে পান এবং সেখানে তাঁর হারিয়ে যাওয়া রুমাল ও চাবিগুলো পড়ে থাকতে দেখেন।
১২. বাগদাদের ব্যবসায়ী আবু গালিব শায়খকে দাওয়াত দিয়ে বললেন, “আপনার দাদা রসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কেউ দাওয়াত দিলে তা কবুল করো।” শায়খ আল্লাহর অনুমতি পেয়ে দাওয়াতে গেলেন। সেখানে বাগদাদের বড়ো বড়ো আলেম ও মাশায়েখ উপস্থিত ছিলেন। দস্তরখানে নানা পদের খাবার সাজানো ছিল, কিন্তু একপাশে একটি বড়ো সিলমোহর করা খাঁচা রাখা ছিল। শায়খ মাথা নিচু করে বসে থাকলেন, নিজে খেলেন না এবং কাউকে খাওয়ার অনুমতি দিলেন না। পুরো মজলিসে পিনপতন নীরবতা। অতঃপর শায়খ ইঙ্গিত করলে খাঁচাটি তাঁর সামনে আনা হলো। সেটি খোলা হলে দেখা গেল তার ভেতরে আবু গালিবের এক পুত্রসন্তান, যে জন্মান্ধ, পঙ্গু এবং কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত। শায়খ বললেন, “আল্লাহর অনুমতিতে সুস্থ হয়ে ওঠো!” মুহূর্তের মধ্যে ছেলেটি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল এবং সুস্থ হয়ে দৌড়াতে লাগল। শায়খ কিছুই না খেয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসলেন।
১৩. এক নারী তাঁর ছেলেকে শায়খের খেদমতে দিয়ে গেলেন আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য। কিছুদিন পর মা এসে দেখলেন ছেলে অনাহারে ও রাত জাগরণে জীর্ণশীর্ণ হয়ে গেছে এবং যবের রুটি খাচ্ছে। অথচ শায়খের সামনে একটি পাত্রে ভাজা মুরগির হাড় পড়ে আছে; যা তিনি খেয়েছেন। মা আক্ষেপ করে বললেন, “হুজুর, আপনি মুরগি খাচ্ছেন আর আমার ছেলে যবের রুটি?” শায়খ তখন ওই হাড়গুলোর ওপর হাত রেখে বললেন, “সেই আল্লাহর হুকুমে দাঁড়িয়ে যাও যিনি পচা হাড়কে জীবিত করেন!” তখনই হাড়গুলো জোড়া লেগে একটি মুরগি হয়ে ডাকতে লাগল। শায়খ বললেন. “তোমার ছেলে যখন এই মাকামে পৌঁছাবে, তখন সেও যা ইচ্ছা খেতে পারবে।”
১৪. একবার শায়খ অজু করার পর হঠাৎ একটি চিৎকার দিয়ে নিজের কাঠের পাদুকা শূন্যে ছুড়ে মারলেন। সেটি সবার চোখের আড়ালে চলে গেল। ২৩ দিন পর এক কাফেলা এসে শায়খের জন্য অনেক স্বর্ণ ও রেশমি বস্ত্র নিয়ে এলো এবং সেই পাদুকা জোড়াও ফেরত দিল। তারা জানাল, “৩রা সফর আমাদের ওপর দস্যুরা আক্রমণ করে সব লুট করে নিয়েছিল। আমরা তখন শায়খের ওসিলায় আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলাম। হঠাৎ আকাশ থেকে দুটি বিকট চিৎকার শোনা গেল এবং এই পাদুকা দুটি এসে দস্যু সর্দারদের মাথায় আঘাত করল। সাথে সাথে তারা দুজনই মারা গেল এবং পাদুকা দুটি ভেজা অবস্থায় সেখানে পড়ে ছিল। এরপর দস্যুরা ভয় পেয়ে আমাদের সব মাল ফেরত দিয়ে তওবা করেছে।”
১৫. আবু হাসান বাগদাদী (রহ.) বলেন, এক রাতে আমি শায়খের মাদরাসায় তাঁর খেদমতের অপেক্ষায় ছিলাম। তিনি বাইরে বের হলে আমি পানির পাত্র দিতে চাইলাম; কিন্তু তিনি নিলেন না। তিনি বাগদাদের দরজার কাছে পৌঁছাতেই তালাবদ্ধ দরজা নিজে নিজে খুলে গেল। কিছুদূর হাঁটার পর আমরা এমন এক শহরে পৌঁছলাম যা আমি চিনি না। সেখানে একটি খানকাহর মতো জায়গায় সাতজন লোক বসা ছিলেন। হঠাৎ একজনের যন্ত্রণাকাতর গোঙানি শোনা গেল, যা কিছুক্ষণ পর থেমে গেল। এরপর একজন লোক ভেতর থেকে একজনকে কাঁধে করে বের করে নিয়ে গেলেন। তারপর একজন দীর্ঘ গোঁফধারী লোক ভেতরে প্রবেশ করে শায়খের সামনে বসলেন। শায়খ তাঁকে কালিমা পড়িয়ে মুসলমান করলেন, তাঁর চুল-গোঁফ ছেঁটে দিলেন এবং মাথায় একটি টুপি পরিয়ে নাম রাখলেন ‘মুহাম্মদ’। শায়খ উপস্থিত অন্যদের বললেন, “একে মৃত ব্যক্তির স্থলাভিষিক্ত (আবদাল) হিসেবে গ্রহণ করার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি।” তাঁরা বললেন, “শুনলাম ও আনুগত্য করলাম।” পরদিন আমি শায়খকে এই রহস্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, “ওই শহরটি ছিল ‘নেহাওয়ান্দ’। ওই সাতজন ছিলেন ‘আবদাল’। যার গোঙানি শুনেছিলে তিনি ছিলেন সপ্তম আবদাল; তিনি মারা যাওয়ায় তাঁর দাফন-কাফনের তদারকি করতে হজরত খিজির (আ.) তাঁকে কাঁধে করে নিয়ে গেছেন। আর যাকে মুসলমান করলাম, তিনি ছিলেন কনস্টান্টিনোপলের (তুরস্ক) এক খ্রিষ্টান পাদরি। তাঁকে মৃত আবদালের জায়গায় স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। খবরদার, আমি জীবিত থাকা অবস্থায় এই গোপন কথা কাউকে বলবে না।” [36]
তাজাল্লি বা নুরের বিকিরণ:
আধ্যাত্মিক জগতের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছালে আল্লাহর বিশেষ নুরের দর্শন লাভ হয়, যাকে সুফিবাদে ‘তাজাল্লি’ বলা হয়। শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) তাজাল্লি বা আধ্যাত্মিক জ্যোতি প্রকাশের তিনটি স্তর বর্ণনা করেছেন। যথা—
- প্রথম তাজাল্লি: এটি এমন এক বিশেষ গুণ বা অবস্থায় প্রকাশিত হয়, যা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়; কেবল নবীগণের বিশেষ সাহায্য ও সমর্থন (তায়ীদ) থাকলেই তা সহ্য করা সম্ভব।
- দ্বিতীয় তাজাল্লি: এটি মহান আল্লাহর ‘জালাল’ বা গাম্ভীর্যপূর্ণ গুণাবলির মাধ্যমে প্রকাশিত হয় (যাতে মানুষের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়)।
- তৃতীয় তাজাল্লি: এটি আল্লাহর ‘জামাল’বা সৌন্দর্যমণ্ডিত গুণাবলির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, যা কেবল পর্যবেক্ষণের (মুশাহাদা) স্তরে অনুভব করা যায়।[37]
মনসুর হাল্লাজ এবং শায়খের অভয়বাণী:
ইতিহাসে অনেক আধ্যাত্মিক সাধক প্রেমের আতিশয্যে বিভ্রান্ত হয়েছেন, যাদের সাহায্যে এগিয়ে আসার কেউ ছিল না। শায়খ আবুল কাসেম বাযযার (রহ.) থেকে বর্ণিত, শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) বলেছেন, “মনসুর হাল্লাজ (আধ্যাত্মিক অবস্থায়) হোঁচট খেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সময়ে এমন কেউ ছিল না, যে তাঁর হাত ধরে তাঁকে টেনে তুলবে। আমি যদি তাঁর সময়ে থাকতাম, তবে অবশ্যই তাঁর হাত ধরতাম।” এরপর তিনি একটি কালজয়ী ঘোষণা দিয়ে বলেন, “কেয়ামত পর্যন্ত আমার যত সাথি, মুরিদ এবং মুহিব্বীন (অনুরাগী) বিপদে পড়বে বা আধ্যাত্মিক পথে হোঁচট খাবে, আমি তাদের প্রত্যেকের হাত ধরব তথা তাদের সাহায্য করব।”[38]
বাণী ও নসিহত:
মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং জীবন গড়ার পাথেয় হিসেবে গাউসে পাকের বাণীসমূহ এক অমূল্য রত্নভাণ্ডার। তাঁর কিছু গুরুত্বপূর্ণ নসিহত নিচে দেওয়া হলো:
১. জুব্বায়ি বলেন, শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) বলতেন, “সৃষ্টিজগত তোমার এবং তোমার নিজের (আসল সত্তার) মাঝে পর্দা স্বরূপ; আর তোমার নফস বা অহমিকা তোমার এবং তোমার রবের মাঝে পর্দা স্বরূপ।”[39]
২. পরকালের ভয় এবং দুনিয়ার অস্থিরতা সম্পর্কে সতর্ক করে গাউসুল আজম হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) বলেন, দুনিয়া হলো ব্যস্ততা আর আখেরাত হলো ভয়াবহতা। বান্দা এই ব্যস্ততার মাঝেই থাকে যতক্ষণ না সে তার স্থায়ী গন্তব্যে অর্থাৎ জান্নাত বা জাহান্নামে পৌঁছায়।
৩. পরোপকার ও সৃষ্টির সেবাকে তিনি ইবাদতের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করতেন। তিনি বলেছেন, আমি সমস্ত নেক আমল তল্লাশি করেছি, কিন্তু ‘ক্ষুধার্তকে অন্নদান’ করার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কোনো আমল খুঁজে পাইনি। আমার ইচ্ছা হয়, গোটা দুনিয়া যদি আমার হাতের মুঠোয় থাকত, তবে আমি তা ক্ষুধার্তদের খাইয়ে দিতাম।[40]
৪. দুনিয়া ও আখেরাতের স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, দুনিয়া হলো ব্যস্ততা আর আখিরাত হলো বিভীষিকা। বান্দা এই দুইয়ের মাঝখানে অবস্থান করে; জান্নাত অথবা জাহান্নামে না পৌঁছানো পর্যন্ত তার চূড়ান্ত স্থিরতা বা শান্তি আসে না।
৫. মানুষের আধ্যাত্মিক উত্তরণের ক্রমধারা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আধ্যাত্মিক পথে মুমিনের অন্তরে প্রথমে ‘প্রজ্ঞার নক্ষত্র’ উদিত হয়, তারপর ‘ইলমের চাঁদ’ এবং সবশেষে ‘মারেফাতের সূর্য’ উদিত হয়। প্রজ্ঞার নক্ষত্র দিয়ে সে দুনিয়ার অসারতা দেখে। ইলমের চাঁদ দিয়ে সে পরকালের স্বরূপ দেখে। মারেফাতের সূর্য দিয়ে সে খোদ মালিক বা রবের দিদার লাভ করে।[41]
৬. মুমিনের নিত্যদিনের পথচলায় তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনের উপায় হিসেবে তিনি বলেন, প্রত্যেক মুমিনের জন্য তার জীবনের সর্বাবস্থায় তিনটি জিনিস অপরিহার্য: আল্লাহর আদেশ পালন করা, নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বেঁচে থাকা এবং তাকদির বা ভাগ্যের ওপর সন্তুষ্ট থাকা।
৭. আল্লাহর সাথে সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে তিনি বলেন, যে ব্যক্তি তার মওলা বা রবের সাথে সত্যতা ও একনিষ্ঠতার সাথে আচরণ করে, সে সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে বিমুখ হয়ে যায়।
৮. ইবাদতের ক্ষেত্রে আন্তরিকতা ও রিয়া (লোকদেখানো ভাব) সম্পর্কে তিনি সতর্ক করেন। প্রবৃত্তি থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া কোনোকিছু গ্রহণ করা হলো অবাধ্যতা ও হঠকারিতা। প্রবৃত্তিহীন অবস্থায় (আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য) গ্রহণ করা হলো ঐকমত্য ও সঠিকতা। আর কোনো কিছু ত্যাগ করা যদি লোকদেখানো হয়, তবে তা রিয়াকারি ও মুনাফিকি।
৯. তিনি সুন্নাতের অনুসরণের ওপর জোর দিয়ে বলতেন, প্রত্যেক মুমিনের উচিত হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসটিকে নিজের অন্তরের আয়না এবং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বানিয়ে নেওয়া। নবীজী ﷺ আমাকে বললেন, “হে যুবক, তুমি আল্লাহর হুকুমের হেফাজত করো, আল্লাহ তোমার হেফাজত করবেন। আল্লাহকে স্মরণ করো, তাঁকে তোমার সামনেই পাবে। যখন কিছু চাইবে, আল্লাহর কাছেই চাও। যখন সাহায্য চাইবে, আল্লাহর কাছেই চাও। যা কিছু ঘটার তা কলম লিখে ফেলেছে (তাকদির নির্ধারিত)। যদি সমস্ত সৃষ্টিজগত তোমার কোনো উপকার করতে চায়— যা আল্লাহ লিখে রাখেননি, তবে তারা তা পারবে না। আর যদি তারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে চায়— যা আল্লাহ লিখে রাখেননি, তবে তারা সেটিরও ক্ষমতা রাখবে না। যদি পারো তবে দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে আল্লাহর শোকর আদায় করো। আর যদি তা না পারো, তবে জেনে রেখো, যা তোমার অপছন্দ তার ওপর সবর বা ধৈর্য ধরার মধ্যে অনেক কল্যাণ রয়েছে। জেনে রেখো, ধৈর্যের সাথেই বিজয় আসে, বিপদের সাথেই মুক্তি আসে এবং কষ্টের সাথেই স্বস্তি আসে।”
১০. অভাবের সময় মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়ার নেপথ্যে যে দুর্বলতা কাজ করে তা নিয়ে তিনি বলেন, মানুষ কেবল আল্লাহর প্রতি অজ্ঞতা, ঈমানের দুর্বলতা এবং ধৈর্যের অভাবেই অন্যের কাছে হাত পাতে। আর যে ব্যক্তি অন্যের কাছে হাত পাতা থেকে বিরত থাকে, সে কেবল আল্লাহর ওপর গভীর জ্ঞান, সুদৃঢ় ঈমান এবং প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর মারেফত বৃদ্ধির কারণেই তা করতে পারে।
১১. সমাজ ও স্রষ্টার মাঝে ভারসাম্য রক্ষার অনন্য সূত্র হিসেবে তিনি বলেন, আল্লাহর সাথে এমনভাবে থাকো যেন তোমার সাথে কোনো সৃষ্টি নেই; আর সৃষ্টির সাথে এমনভাবে থাকো যেন তোমার মাঝে কোনো নফস বা অহমিকা নেই। যখন তুমি সৃষ্টির মায়া ত্যাগ করে আল্লাহর সাথে থাকবে, তখন তুমি সবকিছু পাবে। আর যখন নিজের নফস ত্যাগ করে মানুষের সাথে থাকবে, তখন তুমি ইনসাফ ও তাকওয়া অবলম্বন করতে পারবে এবং ক্লান্তি থেকে রক্ষা পাবে।
১২. নিজের মাকাম বা আধ্যাত্মিক উচ্চতা সম্পর্কে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে বলতেন, আমার মাঝে এবং তোমাদের ও সমস্ত সৃষ্টির মাঝে আসমান-জমিন ব্যবধান রয়েছে। সুতরাং আমাকে কারো সাথে তুলনা করো না এবং কাউকে আমার সাথে তুলনা করো না। কারণ বাদশাহর সাথে কামারের তুলনা হয় না। (এগুলো ‘ফুতুহুল গায়ব’ থেকে নেওয়া)
১৩. আল্লাহর নৈকট্য লাভের সংক্ষিপ্ততম পথ দেখিয়ে তিনি বলেন, মাত্র দুটি কদম বা পদক্ষেপ; তাতেই তুমি আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাবে। একটি হলো ‘নফস’ (প্রবৃত্তি) ত্যাগ করা, অন্যটি হলো ‘খলক’ তথা সৃষ্টির মায়া ত্যাগ করা। (অন্য বর্ণনায় এসেছে, দুনিয়া ও আখেরাত ত্যাগ করা)।[42]
অন্তিম মুহূর্ত:
মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর সন্তানদের যে নসিহত করেছিলেন, তা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক চিরন্তন পাথেয়। ফুতুহুল গায়ব কিতাবের শেষে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শায়খ যখন তাঁর অন্তিম রোগে আক্রান্ত হলেন, তখন তাঁর পুত্র আব্দুল ওয়াহহাব আরজ করলেন, “হে আমার সাইয়্যেদ পিতা, আপনার পরে আমি কী আমল করব সে বিষয়ে আমাকে অসিয়ত করুন।’ তিনি বললেন, “তুমি আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো। আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করো না এবং আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে আশা রেখো না। তোমার সকল প্রয়োজন আল্লাহর ওপর সঁপে দাও এবং তিনি ছাড়া আর কারো ওপর ভরসা করো না। যা চাওয়ার তাঁর কাছেই চাও এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ওপর আস্থা রেখো না।”
পার্থিব বেদনার উর্ধ্বে তাঁর রূহানি অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, অতঃপর তাঁর অপর পুত্র আব্দুল আজিজ তাঁর অসুস্থতা ও শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি উত্তরে বললেন, “আমাকে কোনো বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করো না। আমি এই মুহূর্তে আল্লাহর ইলম বা জ্ঞানের সাগরে বিচরণ করছি।” তাঁর পুত্র আব্দুল জব্বার তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার শরীরের কোন অঙ্গে ব্যথা হচ্ছে?’ তিনি উত্তরে বললেন, “আমার শরীরের প্রতিটি অঙ্গেই ব্যথা হচ্ছে, কেবল আমার অন্তর (কলব) ছাড়া। আমার অন্তরে কোনো ব্যথা নেই; সেটি আল্লাহর সাথে সুস্থ ও সঠিক অবস্থায় আছে।[43]
ওফাত:
দীর্ঘ নব্বই বছরের কর্মময় এবং আধ্যাত্মিক জীবন শেষে বাগদাদের এই মহান সাধক চিরবিদায় নেন। শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) নব্বই বছর জীবন অতিবাহিত করেছিলেন। তিনি ৫৬১ হিজরি সালের ১০ই রবিউস সানি মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে গমন (ইন্তেকাল) করেন। অগণিত মানুষ তাঁর জানাজায় শরিক হয়েছিল এবং তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাতেই তাঁকে দাফন করা হয়।[44] তাঁর জানাযার নামাজ তাঁরই পুত্র আবদুল ওয়াহহাবের ইমামতিতে আদায় করা হয়।[45]
তাঁর সন্তান:
বিশাল বংশপরম্পরার অধিকারী গাউসে পাকের পরিবারও ছিল জ্ঞানে ও গুণে সমৃদ্ধ। গাউসে পাকের পুত্র আব্দুর রাজ্জাক (রহ.) বলেন, “আমার পিতার মোট উনপঞ্চাশ জন সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিলেন; তাঁদের মধ্যে সাতাশ জন ছিলেন পুত্র এবং বাকিরা ছিলেন কন্যা।[46]
নাতি ও দৌহিত্র:
গাউসে পাকের উত্তরাধিকারীরা কেবল বংশীয় গৌরবে নয়, বরং ইলমে দ্বীনের প্রসারেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। গাউসে পাকের সেই সব নাতিদের মধ্যে যারা সরাসরি তাঁদের দাদার কাছে ফিকহ শাস্ত্রের শিক্ষা গ্রহণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন, আফিফ মোবারক আন-নাসিখ, আব্দুস সালাম বিন আব্দুল ওয়াহহাব এবং তাঁর ভাই শায়খ সুলাইমান; তাঁরা হাদিসও বর্ণনা করেছেন। আর শায়খ নাসর বিন আব্দুর রাজ্জাক সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর পিতা ও চাচার কাছে ফিকহ শিক্ষা করেছেন। তিনি হাদিস বর্ণনা করেছেন, হাদিসের পাঠ দান (ইমলা) করেছেন, ওয়াজ-নসিহত করেছেন এবং ফতোয়া প্রদান করেছেন। এছাড়াও তিনি ‘মদিনাতুস সালাম’ (বাগদাদ) শহরের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাগদাদেই ইন্তেকাল করেন।
পরবর্তী বংশধরদের মধ্যেও অনেকে শহীদি মর্যাদা লাভ করেন এবং জ্ঞানের চর্চা অব্যাহত রাখেন। তাঁর ভাইদের মধ্যে রয়েছেন আব্দুর রহিম বিন আব্দুর রাজ্জাক; তিনি বহু শায়খের নিকট ইলম অর্জন করেছেন এবং হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনিও বাগদাদে ইন্তেকাল করেন এবং ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর মাজার সংলগ্ন কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। আরেক নাতি আবু আল-মাহাসিন; তিনি তাঁর পিতা ও অন্যদের কাছে ফিকহ শিক্ষা করেছেন। তিনি তাঁর পিতা, চাচা আব্দুল ওয়াহহাব, আবুল ফাতহ এবং আরও অনেকের কাছ থেকে হাদিস শ্রবণ করেছেন। পরিশেষে তিনি বাগদাদে তাতারিদের (মঙ্গোলীয় আক্রমণকারী) হাতে শহীদ হন।”[47]