খোরাসানের প্রাচীন জ্ঞাননগর ‘নিশাপুর’। সেই নগরের বাতাসে একসময় ভেসে বেড়াত কুরআনের তিলাওয়াত, হাদিসের মজলিস এবং আরিফদের নীরব নিশ্বাস। সেখানেই জন্ম নেন তাসাউফের ইতিহাসের উজ্জ্বল দীপশিখা হজরত আবু আবদুর রহমান আস-সুলামি নিশাপুরি রহমাতুল্লাহি আলাইহ।

তিনি এমন একজন সাধক ও গবেষক, যার অন্তরে ছিল ইহসান, চরিত্রে ছিল বিনয় এবং কলমে ছিল আত্মশুদ্ধির সুর। তাঁর সংগ্রহ, সংকলন ও রচনাসমূহ না থাকলে প্রারম্ভিক সুফি-ঐতিহ্যের অগণিত মূল্যবান তথ্য ও মহাপুরুষদের জীবনী আজ হারিয়ে যেতে পারতো। তিনি শুধু পথ দেখাননি; পথকে লিখে রেখে গেছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। তাঁর প্রতিটি বই তাঁর জীবনের গভীর সাধনা ও রুহানিয়্যতময় অনুভূতির প্রতিচ্ছবি।

জ্ঞানী ও ইতিহাসবিদদের বর্ণনায় তিনি ছিলেন খোরাসানের সুফি সমাজের প্রধান শিক্ষক, বিশ্বস্ত মুহাদ্দিস এবং বহু বিদ্যায় পারদর্শী একজন আলোকিত ব্যক্তিত্ব। চরিত্রে তিনি ছিলেন নরম, আচরণে নম্র, আর ইলমে ছিলেন গভীর সমুদ্রের ন্যায় বিস্তৃত।

নাম ও পরিচয়

হজরত আবু আবদুর রহমান আস-সুলামি নিশাপুরি রহমাতুল্লাহি আলাইহির পূর্ণ নাম মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু মূসা ইবনু খালিদ ইবনু সালিম ইবনু জাবিয়াহ ইবনু সাঈদ ইবনু কুবাইসাহ ইবনু সাররাক। তাঁর উপাধির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— আল-আযদি এবং আস-সুলামি; যেখানে ‘সুলামি’ উপাধি এসেছে তাঁর মাতৃকূল থেকে।

তাঁকে যুগের মানুষ সম্মান করত ইমাম, হাফিজ, মুহাদ্দিস, খোরাসানের শায়খ এবং সুফিদের বড় নেতা হিসেবে। আধ্যাত্মিক জগতে তিনি সুপরিচিত ছিলেন আবু আব্দুর রহমান আন-নিশাপুরি আস-সুফি নামে, যিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের রচয়িতা এবং প্রারম্ভিক সুফি ঐতিহ্যের অন্যতম সংরক্ষণকারী।

তাঁর জন্ম ৩২৫ হিজরির জমাদিউল আখের মাসের দশ তারিখে। এই পবিত্র আগমনের মাধ্যমে নিশাপুর লাভ করেছিল এমন এক আলোকিত ব্যক্তিত্ব, যিনি পরবর্তীকালে ইসলামি আধ্যাত্মিক ইতিহাসে স্থায়ী দাগ রেখে যান।১

তিনি বিশিষ্ট সুফি আবু আমর ইসমাইল ইবনু নুহাইদ আস-সুলামির ভাগ্নে। তিনি সুফিদের খবর-আখবার বর্ণনায় শীর্ষস্থানীয় ছিলেন। সুফিবিদ্যার জন্য তিনি ‘সুনান’, ‘তাফসির’ ও ‘তারিখ’ রচনা করেছেন। নিশাপুরে তাঁর একটি ছোটো খানকাহ ছিল, যা সে সময় সুপরিচিত ছিল। তাঁর মাজারও মানুষের কাছে বরকতময় হিসেবে গণ্য ছিল।২

জ্ঞানার্জন:

হজরত আবু আবদুর রহমান আস-সুলামি (রহ.)-এর শিক্ষাজীবন জ্ঞানার্জনের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তিনি ৩৩৩ হিজরিতে নিজ হাতে হাদিস লিখতে শুরু করেন এবং যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসদের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেন। বিশেষ করে তিনি হাদিস লিপিবদ্ধ করেছেন আবু বকর আস-সিবাগি, আল-আসসাম, এবং আবু আব্দুল্লাহ ইবনু আল-আখরাম এর নিকট থেকে।

এছাড়াও তিনি তাঁর মাতামহ ইসমাঈল ইবনু নুজাইদ এবং আরও অনেক বিশিষ্ট আলিম ও মুহাদ্দিসের নিকট থেকে প্রচুর হাদিস শ্রবণ করেন। শিক্ষার তৃষ্ণা মেটাতে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সফর করেন, যার গন্তব্য ছিল ইরাক, যা তাঁর বিদ্যা, গবেষণা ও তাসাউফের বোঝাপড়াকে আরও গভীর করে।৩

তাঁর শিক্ষকগণ:

তিনি অনেক মুহাদ্দিস, সুফি ও তৎকালীন জ্ঞানীগুণী আলেমদের নিকট জ্ঞানার্জন করেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ইমাম আবুল হাসান আদ-দারা কুতনি, আবুল আব্বাস আল-আসসাম, আহমাদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুস আত-তরায়িফি, ইসমাঈল ইবনে নুজাইদ আস-সুলামি, মুহাম্মাদ ইবনুল মুয়াম্মাল আল-মাসেরজিসি, মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে সাঈদ আর-রাজি, আল-হাফিজ আবু আলী আন-নিশাপুরী এবং আরও অনেকে।৪

তাঁর ছাত্র:

তাঁর নিকট বহু জ্ঞানপিপাসু শরিয়ত ও তাসাউফের জ্ঞানে নিজেদের সিক্ত করেন। তন্মধ্যে আবুল কাসিম আল-আজহার, কাজি আবুল আলা আল-ওয়াসিতী, আহমাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহিদ আল-ওয়াকীল, আহমাদ ইবনে আলী আত-তাওযী, আবুল হাসান মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহিদ মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনুল ফাতহ আল-হারবী, ইমাম বায়হাক্বী, ইমাম কুশাইরী, মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া আল-মুযাক্কী, মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আত-তাফলিসী, উল্লেখযোগ্য।৫

গ্রন্থ রচনা:

হজরত আবু আবদুর রহমান আস-সুলামি (রহ.) ছিলেন জ্ঞানের আসল সমৃদ্ধির এক অনন্য প্রতীক। ৩৫০ হিজরির কিছু পর তিনি গ্রন্থ রচনা শুরু করেন, আর সেই থেকে তাঁর কলমে জন্ম নেয় অসংখ্য রচনা। সুফিবাদের জ্ঞান নিয়ে তিনি লিখেছেন প্রায় সাতশো খণ্ড, যা তাসাউফের তত্ত্ব, জ্ঞানচর্চা এবং আধ্যাত্মিকতা নিয়ে বিস্তৃত। এ ছাড়াও নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদিস সংকলন নিয়ে, বিভিন্ন অধ্যায়, শায়খদের বর্ণনা ও শ্রবণ সূত্রসহ, তিনি রচনা করেছেন তিনশো খণ্ড।

তাঁর রচনাবলি কেবল সংখ্যা দিয়ে নয়; বরং মান, গভীরতা ও গ্রহণযোগ্যতায় অনন্য। শিক্ষাবিদ, অনুসারী এবং সাধকরা তাঁর এই গ্রন্থসমূহকে মর্যাদাপূর্ণ ও অনন্য প্রমাণিত জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করেছেন। প্রতিটি পৃষ্ঠায় ফুটে উঠেছে তাঁর অন্তরের গভীর আধ্যাত্মিকতা, শিক্ষার প্রতি অদম্য আগ্রহ এবং মুসলিম জ্ঞানচর্চার প্রতি আন্তরিক দায়িত্ববোধ।৬

তাঁর গ্রন্থাবলি:

আস-সুলামি (রহ.) ছিলেন সুফিদের শায়খ ও আধ্যাত্মিক শিক্ষক। তিনি সুফিদের ইতিহাস, তাবাকাত ও তাফসির-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর রচনার সংখ্যা একশরও বেশি, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হলো—

১. হাকায়িকুত তাফসির (সংক্ষেপিত, সুফিদের পদ্ধতি অনুযায়ী; মদীনার আল-মাকতাবাহ আল-মাহমুদিয়্যায় সংরক্ষিত)

২. তাবাকাতুস সুফিয়্যাহ (মুদ্রিত)

৩. মুকাদ্দিমা ফিত-তাসাউফ (হস্তলিখিত)

৪. মানাহিজুল আরিফিন (হস্তলিখিত)

৫. রিসালাতুন ফি গালত্বাতিস সুফিয়্যাহ (হস্তলিখিত)

৬. রিসালাতুল মালামাতিয়্যাহ (মুদ্রিত)

৭. আদাবুল ফুকারা ওয়া শারায়িতুহ (হস্তলিখিত)

৮. বায়ানু যাল্লিল ফুকারা ওয়া মানাকিবু আদাবিহিম (হস্তলিখিত)

৯. আল-ফুতুওয়াহ (হস্তলিখিত)

১০. আদাবুস সুহবাত (মুদ্রিত)

১১. আস-সুআলাত (হস্তলিখিত)

১২. সুলুকুল আরিফিন (হস্তলিখিত)

১৩. ‘উয়ুবুন নাফসি ওয়া মুদাওয়াতুহা (মুদ্রিত)

১৪. আল-ফারক বাইনাশ-শারীয়াহ ওয়াল-হাকিকাহ (হস্তলিখিত)

১৫. আদাবুস সুফিয়্যাহ (হস্তলিখিত)

১৬. কিতাবুল আরবাঈন ফিল হাদিস (মুদ্রিত)

১৭. দারাজাতুল মু‘আমালাত (হস্তলিখিত) ইত্যাদি।৭

জনপ্রিয়তা ও রচনাবলির প্রভাব:

হজরত আবু আবদুর রহমান আস-সুলামি (রহ.) ছিলেন এমন এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব, যিনি সকলের হৃদয়ে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। সাধারণ মানুষ হোক বা অভিজাত, সমর্থক হোক বা বিরোধী, শাসক হোক বা প্রজা—সকলেই তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর খ্যাতি শুধু নিজ দেশে নয়, মুসলিম বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। আল্লাহর অনুগ্রহে তাঁর গ্রন্থাবলি মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছিল এবং সর্বোচ্চ মূল্যে বিক্রি হতো।

মুহাদ্দিস খাশশাব বর্ণনা করেন, “একদিন আমি তাঁর একটি কিতাব বিক্রি করেছিলাম; যদিও আমার হাতের লেখা খারাপ ছিল, তাও বিশ দিনার মূল্যে। তখন তিনি জীবিত ছিলেন।”

আবুল আব্বাস আন-নাসাবী ‘হাক্বায়েকুত তাফসির’ কিতাবটি সরাসরি সুলামির নিকট থেকে শ্রবণ করেন। কিতাবটি মিসরে পৌঁছালে তা সেখানে আবুল আব্বাসের কাছে পাঠ করা হয় এবং তাঁকে এক হাজার দিনার প্রদান করা হয়, যদিও শায়খ সুলামি তখন বাগদাদে জীবিত ছিলেন। কিতাব পাঠের প্রভাবও অসাধারণ ছিল।

আবু মুসলিম গালিব ইবনু আলী আর-রাজি বর্ণনা করেন, “যখন আমরা ৩৪৪ হিজরির মাসগুলোতে রাই শহরে ‘তারিখুস সুফিয়্যাহ’ কিতাবটি পাঠ করছিলাম, তখন ভিড়ের কারণে একটি ছেলে মারা যায় এবং একজন লোক মজলিসে চিৎকার করে ওঠে এবং মারা যায়। আর যখন আমরা হামদান থেকে বের হলাম, তখন লোকজন ইজাজাত (অনুমতি) নেওয়ার জন্য এক মনজিল পথ পর্যন্ত আমাদের পিছু নিয়েছিল।”

সুলামি নিজেই বলেন, “যখন আমরা বাগদাদে প্রবেশ করলাম, শায়খ আবু হামেদ আল-ইসফারায়িনি আমাকে বললেন, “আমি তোমার ‘হাক্বায়েকুত তাফসির’ কিতাবটি দেখতে চাই।’ আমি সেটি তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিলাম। তিনি দেখলেন এবং বললেন, ‘আমি এটি শুনতে চাই।’ এরপর তাঁরা আমার জন্য একটি মিম্বার স্থাপন করলেন।”

সুলামি আরও বর্ণনা করেন, “আমরা হামদানের পথে একজন আমিরকে দেখলাম। আমি তাঁর সাথে দেখা করলাম। তিনি বললেন, ‘আমার হাক্বায়েকুত তাফসির কিতাবটি লেখা চাই-ই চাই।’ তখন তাঁর জন্য একদিনেই কিতাবটি নকল করা হলো। ৮৫ জন নুসখাকারীর মধ্যে কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল, যারা আসরের আগেই তা শেষ করে ফেললেন।

আমির আমাকে একটি উৎকৃষ্ট ঘোড়া, একশো দিনার এবং প্রচুর কাপড় দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। আমি বললাম, ‘আপনি আমার মন খারাপ করে দিয়েছেন, আমাকে ভয় দেখিয়েছেন এবং হাজিদেরও ভয় দেখিয়েছেন। অথচ নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমকে ভয় দেখাতে নিষেধ করেছেন। আপনি যদি চান আপনার কিতাবে বরকত হোক, তাহলে আমার একটি প্রয়োজন পূরণ করুন।’ আমির বললেন, ‘সেটা কী?’ আমি বললাম, ‘আপনি যেন এই হাদিয়া থেকে আমাকে মুক্তি দেন। কারণ আমি এটি গ্রহণ করব না।’ তখন আমির সেই দিনারগুলো কাফেলার নেতৃবৃন্দের মধ্যে ভাগ করে দিলেন এবং আমাদের পাহারার জন্য লোক পাঠালেন।

আমির ছিলেন নসর ইবনু সুবুকতাকিন, যিনি একজন জ্ঞানী সেনাপতি। তিনি যখন সেই তাফসিরটি দেখলেন, মুগ্ধ হলেন এবং দশটি বড় খণ্ডে সেটি নকল করার এবং আয়াতগুলো স্বর্ণের পানি দিয়ে লেখার নির্দেশ দিলেন। এরপর তাঁরা বললেন, ‘আপনি আসুন, যাতে আমির কিতাবটি শুনতে পারেন।’ আমি বললাম, ‘আমি তাঁর কাছে মোটেও যাব না।’ এরপরও তাঁরা আমার পিছু পিছু খানকাহতে এলেন। আমি আত্মগোপন করলাম। তারপর তিনি প্রথম খণ্ডটি পাঠালেন এবং আমি তাঁকে ইজাজত (বর্ণনার অনুমতি) লিখে দিলাম।৮

এই সমস্ত ঘটনা প্রমাণ করে, হজরত আস-সুলামি (রহ.) কেবল তাঁর রচনা দ্বারা নয়, বরং তাঁর চরিত্র, বিনয় এবং আধ্যাত্মিক মর্যাদা দ্বারাও মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিলেন। সাধারণ মানুষ থেকে শাসক; সকলেই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও আনুগত্য ছিল। তিনি ছিলেন একজন জীবন্ত অধ্যাপক, যিনি কলম ও জ্ঞান দিয়ে মুসলিম বিশ্বের আধ্যাত্মিক ও সাহিত্যিক ঐতিহ্যকে স্থায়ী করেছেন।

সুলামির পারিবারিক সম্পদ ও হজে গমন:

সুলামি (রহ.) বর্ণনা করেন, যখন আমার নানা আবু আমর ইন্তেকাল করলেন, তিনি একটি গ্রামের মধ্যে তিনটি অংশ সম্পদ রেখে গেলেন, যার মূল্য ছিল তিন হাজার দিনার। এই সম্পদ তাঁরা তাঁর দাদা আহমদ ইবনু ইউসুফ আস-সুলামি থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি কিছু জমি ও বস্তু-সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন। তাঁর কোনো উত্তরাধিকারী ছিলেন না, শুধু আমার মা ছাড়া। সম্পত্তিগুলোর ওপর একজন প্রভাবশালী লোক নজর রাখছিল, কিন্তু আল্লাহর কৃপায় তিনি তা থেকে কিছুই নিতে পারলেন না এবং সবই আমার কাছে হস্তান্তরিত হলো।

হজের প্রস্তুতির সময় যখন শায়খ আবুল কাসেম আন-নাসরাবাজি যাত্রার প্রস্তুতি নিলেন, আমি মায়ের অনুমতি নিয়ে হজে গিয়েছিলাম। হজের পথে যাওয়ার আগে আমি সম্পত্তির একটি অংশ এক হাজার দিনারে বিক্রি করেছিলাম এবং ৩৬৬ হিজরিতে হজের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলাম। আমার মা তখন আমাকে নসিহত করে বললেন, “তুমি আল্লাহর ঘরের দিকে যাচ্ছ, তাই তোমার দুই রক্ষক ফেরেশতা যেন এমন কিছু লিপিবদ্ধ না করেন, যার জন্য আগামীকাল তোমাকে লজ্জিত হতে হয়।”৯

শায়খ নাসরাবাজির সোহবত লাভ

সুলামি (রহ.) বর্ণনা করেন, হজের পথে আমি শায়খ আবুল কাসেম আন-নাসরাবাজির সঙ্গে ছিলাম। আমরা যে কোনো শহরে যেতাম, তিনি বলতেন, ‘চল, আমরা হাদিস শুনি।’ আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, “যখন তোমার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সত্যের স্ফুলিঙ্গ প্রকাশ পাবে, তখন তা অনুসরণ কর, তবে জান্নাত বা জাহান্নামের দিকেও মনোযোগ দিও না।” শায়খের এই নির্দেশ আমাকে সতর্ক ও বিনীতভাবে সত্যের অনুসন্ধানে মনোযোগী হতে শেখালো।১০

সুলামির দৃষ্টিতে সুফিবাদের ভিত্তি:

সুলামি (রহ.) বলেন, তাসাউফ বা সুফিবাদের মূলনীতি হলো, “কুরআন ও সুন্নাহর অনুগামী হওয়া, ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা (কুপ্রবৃত্তি) ও বিদআত পরিহার করা, মাশায়েখদের সম্মানকে মহিমান্বিত করা, সৃষ্টির ভুল-ত্রুটির অজুহাত খুঁজে দেখা, সেখান থেকে পরিত্রাণের উপায় খোঁজা, নিয়মিত আমল বা অজিফা বজায় রাখা।১১

জিকির ও ফিকর— কোনটি শ্রেষ্ঠ?

আবুল ওয়ালিদ আল–কুশাইরী (রহ.) বলেন, আমি আবু আবদুর রহমান আস–সুলামি (রহ.)-কে আবু আলী আদ-দাক্কাক (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করতে শুনেছি। তিনি বললেন, “জিকির (আল্লাহকে স্মরণ) পূর্ণতর নাকি ফিকর (চিন্তন) পূর্ণতর?” আবু আলী জবাব দিলেন, “শাইখের জন্য কোন দিক উন্মুক্ত হয় তা-ই মুখ্য।” এ সময় আবু আবদুর রহমান (রহ.) বললেন, “আমার নিকট জিকিরই অধিক পূর্ণ। কারণ, ‘জিকির’-এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার গুণকীর্তন করা যায়; কিন্তু ‘ফিকর’-এর মাধ্যমে তা করা যায় না।” আবু আলী (রহ.) তাঁর এই কথাকে খুবই পছন্দ করলেন।১২

পীর ও মুরিদের শিষ্টাচার:

কুশাইরী (রহ.) বলেন, আমি আবু আবদুর রহমান আস-সুলামি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “আমি যখন মার্ভ নগরীর উদ্দেশ্যে বের হলাম, তখন আমার শায়খ আবু সাহল আস-সুলুকি (রহ.) জীবিত ছিলেন। আমার রওনা হওয়ার আগে প্রতি শুক্রবার সকালে তাঁর একটি নিয়মিত মজলিস হতো, যেখানে কুরআন খতম করা হতো।

ফিরে এসে দেখলাম তিনি সেই কুরআন খতমের মজলিস তুলে দিয়েছেন এবং তার বদলে ইবনুল উকাবির জন্য ‘মজলিসুল কাওল’ (অর্থাৎ কাওয়ালীর আসর) বসিয়েছেন। এ ঘটনা দেখে আমার মনে কিছুটা প্রশ্ন জাগল; আমি মনে মনে ভাবলাম, ‘শায়খ তো কুরআনের মজলিসের পরিবর্তে কাওয়ালীর মজলিস স্থাপন করলেন!’

একদিন শায়খ আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আবু আবদুর রহমান, লোকেরা আমার সম্পর্কে কী বলছে?”

আমি বললাম, ‘তারা বলছে আপনি কুরআনের মজলিস উঠিয়ে দিয়েছেন এবং কাওলের মজলিস বসিয়েছেন।’

তিনি তখন বললেন, ‘যে তার শায়খকে ‘এটা কেন?’ বলে প্রশ্ন তোলে, সে কখনো সফল হয় না।”

সুলামি (রহ.) বলেন, মুরিদের উচিত তার শায়খের কাছে ‘কেন?’— এ প্রশ্ন না তোলা, যদি সে বিশ্বাস করে যে, শায়খ ভুল থেকে মাহফুজ এবং ভুল করা তাঁর জন্য সম্ভব নয়। কিন্তু যদি শায়খ ভুল থেকে মুক্ত না হন, আর তবুও তিনি ‘কেন?’ প্রশ্ন করতে অপছন্দ করেন, তাহলে সেই শায়খের অনুসরণে কখনো সফলতা পাওয়া যায় না।

অতঃপর তিনি আল্লাহ তায়ালার বাণী উল্লেখ করেন—  وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى“তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সাহায্য করো।” সুরা আল-মায়িদা, ৫:২। তিনি আরও বলেন— وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالْمَرْحَمَةِ  “তারা পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় এবং পরস্পরকে দয়া-করুণার উপদেশ দেয়।” সুরা আল-বালাদ, ৯০:১৭।

সুলামি (রহ.) আরও বলেন, “হায়, আজকাল এমন কিছু মুরিদ আছে, যারা নিজ হাতে নিজেদের ভারী বোঝা বানিয়েছে; আপত্তি তোলে কিন্তু অনুসরণ করে না; কথা বলে কিন্তু আমল করে না। এদের সফলতা নেই।”১৩

‘সামা’ নিয়ে সুলামি ও হজরত আবু আলী দাক্কাক রহমাতুল্লাহির ঘটনা:

খতিব বাগদাদি বলেছেন, আমাদের কাছে আবু আল-কাসিম আল-কুশাইরী বর্ণনা করেছেন, আস-সুলামির আলোচনা চলছিল এবং বলা হচ্ছিল যে, তিনি ফুক্বারা তথা দরবেশদের সাথে সঙ্গতি রেখে ‘সামা’র সময় দাঁড়িয়ে যান। তখন আবু আলী আদ-দাক্কাক বললেন, “তাঁর মতো মর্যাদার ব্যক্তির জন্য সম্ভবত চুপ থাকাটাই বেশি উপযুক্ত।”

তারপর আবু আলী আল-কুশাইরীকে বললেন, “তুমি তাঁর (আস-সুলামির) কাছে যাও। তুমি তাঁকে তাঁর কিতাবখানায় বসা অবস্থায় পাবে, আর তাঁর কিতাবগুলোর উপরে একটি বাঁধাই করা, চৌকো চামড়ার মলাট রাখা আছে, যার ভেতরে মানসুর আল-হাল্লাজের কবিতা রয়েছে। তুমি সেটি নিয়ে এসো এবং তাঁকে কিছু বলবে না।”

কুশাইরী বললেন, আমি তাঁর কাছে গেলাম এবং দেখলাম যে, তিনি সত্যিই তাঁর কিতাবখানায় আছেন, আর বাঁধাই করা মলাটটি ঠিক সেই জায়গায় রাখা আছে যেখানে তিনি বলেছিলেন। যখন আমি বসলাম, তিনি কথা বলা শুরু করলেন— “কোনো এক ব্যক্তি এক আলিমের প্রতি ‘সামা’র সময় তাঁর নড়াচড়ার জন্য আপত্তি জানাতেন। একদিন সেই মানুষটিকে একাকী ঘরের মধ্যে দেখা গেল আর তিনি যেন ‘মুতাওয়াজিদ’ (প্রেম/অনুভূতিতে আত্মহারা) ব্যক্তির মতো ঘুরছেন। তাঁকে তাঁর এই অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তখন তিনি বললেন, ‘আমার কাছে একটি কঠিন বিষয় ছিল, যার অর্থ আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। ফলে আনন্দের আতিশয্যে আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি, এমনকি উঠে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছি।” আস-সুলামি বললেন, “তাকে বলো যে, এদের (যারা সামা-এর সময় দাঁড়ান) অবস্থাও ঠিক তেমনই হয়।”

আল-কুশাইরী বললেন, “যখন আমি এই দুজনের (আবু আলী আদ-দাক্কাক এবং আস-সুলামি) এই অবস্থা দেখলাম, তখন আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম যে আমি তাদের দুজনের মাঝে কী করব।” তখন আমি বললাম, সত্য কথা বলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাই আমি বললাম, “আবু আলী আদ-দাক্কাক এই বাঁধাই করা কিতাবটির বর্ণনা দিয়েছেন এবং বলেছেন, “শায়খকে না জানিয়ে এটি আমার কাছে নিয়ে এসো।” আমি আপনাকে ভয় পাচ্ছি, আবার তাঁর কথা অমান্য করাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং আপনি কী আদেশ করেন?”

তখন তিনি হুসাইন ইবনু মানসুর আল-হাল্লাজের কিছু অংশ বের করলেন, যার মধ্যে তাঁর রচিত একটি কিতাব ছিল, যার নাম ছিল ‘আস-সাইহুর ফি নক্বদিদ-দুহুর’। এবং তিনি বললেন, ‘তুমি এগুলো তাঁর কাছে নিয়ে যাও।’১৪

তাঁর ওফাত:

আস-সুলামি (রহ.) ৪১২ হিজরির শা’বান মাসে ওফাত লাভ করেন। আরেক বর্ণনা অনুযায়ী তিনি রজব মাসে নিশাপুর শহরে মৃত্যুবরণ করেন। তার জানাজায় ব্যাপক লোক সমাগম ঘটেছিল।১৫