তাসাউফের ইতিহাসে যে-সব মহাপুরুষ অন্তরজগৎকে নতুন ভাষা, নতুন দিশা ও নতুন বোধ দিয়েছেন, তাদের তালিকার শীর্ষে আছেন হজরত আবু বকর শিবলি রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি সেই বিরল আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের একজন, যাঁদের জীবন ছিল আল্লাহর প্রেমে দগ্ধ, রুহের পরিশুদ্ধি ছিল যাঁর জিকির, আর আত্মসমর্পণ ছিল যাঁর স্বভাবজাত পরিচয়। বাগদাদের রাস্তায়, জিকিরের মজলিসে, মুজাকারা আর জ্ঞান-বুদ্ধির আসরে— যেখানে যেখানে তাঁর পদচিহ্ন পড়েছে, সেখানেই সৃষ্টি হয়েছে তাপসী আত্মার সঞ্চার, রুহানি ভাবের গভীরতা এবং আল্লাহভক্তির অনুপম আবেশ।
শিবলি রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন জুনাইদ বাগদাদী রহ.-এর খানকাহে পরিপূর্ণতা লাভকারী অদ্বিতীয় শিষ্য। তিনি ছিলেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ফানা ও মহব্বতের এক বিস্ময়কর সমন্বয়। তাঁর অন্তরজগৎ এতটাই দগ্ধ ও আল্লাহমুখী ছিল যে, সমসাময়িক আলেম, সুফি ও জুহদপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ তাঁকে দেখলেই আল্লাহর স্মরণে নিমজ্জিত হয়ে যেতেন।
জন্ম-পরিচয়:
বলা হয় তার নাম ছিল দুলাফ ইবনে জাহদার; আবার কেউ বলেন জাফর ইবনে ইউনুস; এবং কেউ বলেন জাফর ইবনে দুলাফ। সব মিলিয়ে তিনি শাইখুত-তায়ফা, আবু বকর শিবলি আল-বাগদাদি নামে পরিচিত। তার মূল নিবাস ছিল আশ-শিবলিয়া— একটি গ্রাম; আর জন্মস্থান সামাররায়।
তার পিতা ছিলেন খিলাফতের উচ্চপদস্থ দরবারিদের অন্যতম। পরে শিবলি নিজেও আবু আহমদ আল-মুওয়াফ্ফাক-এর দরবারে হিজাবা (দরবার-পরিচালনার দায়িত্ব) গ্রহণ করেন। কিন্তু যখন আবু আহমদকে পদচ্যুত করা হলো, তখন শিবলি (রহ.) একধরনের আধ্যাত্মিক সাধকের এক মজলিসে উপস্থিত হলেন এবং সেখানে তিনি তাওবা করে নিলেন। এরপর তিনি জুনাইদ (রহ.) ও অন্যান্য বুজুর্গদের সোহবত গ্রহণ করেন, পরে তার মধ্যে যে অবস্থা সৃষ্টি হয়, তা সবার নিকট সুপরিচিত।
তিনি মালিকি মাজহাবের একজন ফকিহ ছিলেন, হাদিসও বহু জনের নিকট থেকে লিখেছেন। কবিতাও বলতেন। তার বহু বাণী, হিকমত, আধ্যাত্মিক অবস্থা ও মকাম প্রসিদ্ধ ছিল। তবে মাঝে মাঝে তার মস্তিষ্কে শুষ্কতা বা আধ্যাত্মিক মাতালভাব (মজ্জুব হালত) দেখা দিত; তখন তিনি এমন কিছু কথা বলতেন, যার জন্য তাকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হতো—কারণ এসব কথার মাঝে কিছু জোশ বা অতিরিক্ত ভাবপ্রকাশ থাকত, যা অনুসরণযোগ্য নয়।১
শিষ্য যারা:
তাঁর নিকট ইলম ও হাদিস শিক্ষা গ্রহণ করেছেন— মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ আর-রাযী, মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আল-বাগদাদী, মানসুর ইবন আব্দুল্লাহ আল-হারবী আল-খালিদী, আবুল কাসিম আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ আদ-দিমাশকী, ইবনু জুমাই’ আল-গাসসানী – এবং আরও অনেকে।২
ইলমি গভীরতা:
আহমদ ইবন আতা আর-রুযবারী বলেন, আমি শিবলি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি— “আমি বিশ বছর ধরে হাদিস লিখেছি এবং বিশ বছর ধরে ফুকাহাদের সঙ্গ পেয়েছি।”৩
একদিন শিবলি (রহ.) মন্ত্রী আলী ইবনে ঈসা আল-জাররাহের দরবারে প্রবেশ করলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিখ্যাত কারি ইবনে মুজাহিদও। ইবনে মুজাহিদ মন্ত্রীর কাছে বললেন, ‘আমি এখনই তাকে (শিবলিকে) চুপ করিয়ে দেব।’
শিবলির অভ্যাস ছিল— যখনই কোনো পোশাক পরতেন, সেখান থেকে একটি অংশ ছিঁড়ে ফেলতেন (দুনিয়াবিমুখতার নিদর্শন হিসেবে)। তিনি বসার পর ইবনে মুজাহিদ তাকে বললেন, ‘হে আবু বকর, জ্ঞানের কোথায় আছে— যা থেকে উপকার পাওয়া যায় তা নষ্ট করা?’
শিবলি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন, ‘আর শরিয়তে এমন কোথায় আছে যে, কাঁদতে কাঁদতে নিজের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলো?’ (হজরত ইউসুফের বিরহে ইয়াকুব আলাইহিস সালাম দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন, সেদিকেই তিনি ইঙ্গিত দিলেন।)
ইবনে মুজাহিদ চুপ হয়ে গেলেন। মন্ত্রী ইবনে জাররাহ তাকে বললেন, তুমি তাকে চুপ করাতে চেয়েছিলে, কিন্তু সে-ই তোমাকে চুপ করিয়ে দিল!’
তারপর শিবলি ইবনে মুজাহিদকে বললেন, ‘মানুষ একমত যে, তুমি এই যুগের শ্রেষ্ঠ কারি। তাহলে কুরআনে কোথায় আছে— ‘প্রেমিক তার প্রিয়জনকে শাস্তি দেয় না?’
ইবনে মুজাহিদ নীরব হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, ‘হে আবু বকর, আমি বলতে পারবন না, আপনিই বলুন।’
শিবলি সুরা মায়িদাহ ১৮ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করলেন: وَ قَالَتِ الۡیَہُوۡدُ وَ النَّصٰرٰی نَحۡنُ اَبۡنٰٓؤُا اللّٰہِ وَ اَحِبَّآؤُہٗ ؕ قُلۡ فَلِمَ یُعَذِّبُکُمۡ بِذُنُوۡبِکُمۡ ؕ بَلۡ اَنۡتُمۡ بَشَرٌ مِّمَّنۡ خَلَقَ ؕ یَغۡفِرُ لِمَنۡ یَّشَآءُ وَ یُعَذِّبُ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ لِلّٰہِ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ وَ مَا بَیۡنَہُمَا ۫ وَ اِلَیۡہِ الۡمَصِیۡرُ-
অর্থ: ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা বলেছিল, ‘আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়জন।’ বলুন, তাহলে তোমাদের পাপের কারণে আল্লাহ তোমাদের শাস্তি দেন কেন? বরং তোমরা তো তাঁরই সৃষ্টি মানবজাতির অন্তর্ভুক্ত। তিনি যাকে চান ক্ষমা করেন, যাকে চান শাস্তি দেন। আকাশসমূহ ও পৃথিবীর এবং তাদের মধ্যবর্তী সবকিছুর মালিক আল্লাহ। এবং তাঁর দিকেই সবার প্রত্যাবর্তন।
ইবন মুজাহিদ বিস্ময়ে বললেন, ‘মনে হয় এই আয়াতটি আমি কখনো শুনিইনি!’৪
আধ্যাত্মিক হাল:
বলা হয়, একবার তিনি ‘আহ্!’ বলে উঠলেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘কীসের জন্য এই আহ্?’ তিনি বললেন, “সবকিছুর জন্য। আমি যখনই ‘আল্লাহ’ বলি, সাথে সাথে আমার ‘আল্লাহ’ বলার জন্যও আবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।”
আহমদ বিন আতা আর-রুজবারী (রহ.) বর্ণনা করেন, জুমার দিনে তাঁর এক বিশেষ আধ্যাত্মিক অবস্থা তৈরি হতো এবং তিনি উচ্চস্বরে ‘আর্তনাদ’ করতেন। একদিন তিনি এমনই এক আর্তনাদ করলেন যে, উপস্থিত সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত ও বিচলিত হয়ে পড়ল। এতে আবু ইমরান আল-আশয়াব এবং অন্যান্য ফকিহগণ তাঁর ওপর বেশ ক্ষুব্ধ হলেন।
শিবলী তখন তাঁদের কাছে এগিয়ে এলে ফকিহগণ তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য জটিল এক মাসআলা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আবু বকর, একজন নারীর কাছে যদি হায়েজ ও ইস্তিহাজার রক্তের বিষয়টি সন্দেহজনক হয়ে যায়, তাহলে কী করণীয়?’
শিবলি (রহ.) তখন আঠারোটি ভিন্ন ভিন্ন উত্তর দিলেন। এ কথা শুনে আবু ইমরান দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তাঁর মাথায় চুম্বন করলেন।
কাব্য-প্রতিভা:
হজরত শিবলি (রহ.) প্রেমাশ্রিত গজল কবিতা ও প্রেম-ভালোবাসার (আল্লাহ প্রেম) বিষয়াবলিতে অত্যন্ত আসক্ত ছিলেন; এ বিষয়ে তার গভীর রুচি ও স্বাদ ছিল। তার অনেক বিস্ময়কর রিয়াজত (মুজাহাদা) ছিল, যার প্রভাবে তার স্বভাব-প্রকৃতিও অনেকটা বদলে গিয়েছিল।
সুলামী বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান থেকে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি শিবলি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “আমি এমন একজনকে জানি, যিনি এই পথে (আধ্যাত্মিক তরিকায়) প্রবেশ করেননি, যতক্ষণ না তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি ব্যয় করেছেন, নিজের হাতে লেখা সত্তর কিমতার (বড় বড় কিতাব রাখার বাক্স) দজলা নদীতে ডুবিয়ে দিয়েছেন। তিনি ‘মুওয়াত্তা’ হিফজ করেছিলেন এবং বহু কিরআতের সাথে কুরআন তিলাওয়াতও করেছিলেন।” এটা বলে তিনি মূলত নিজেকেই ইঙ্গিত করছিলেন।
একজন তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আরিফ (আল্লাহর মারিফাত লাভকারী)–এর লক্ষণ কী?’
তিনি বললেন, ‘তার বক্ষ প্রশস্ত, তার হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত, আর তার দেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন ও ক্লান্ত-পরিত্যক্ত।’৫
তিনি বলতেন, “আমার বাবা রেখে গিয়েছিলেন ষাট হাজার দিনার। বাগান ও বাড়ি-ঘর বাদে। সবই খরচ করে দিলাম; তারপর দরবেশদের সঙ্গে বসে থাকলাম। কোনো আশ্রয়ে ফিরলাম না, কোনো জ্ঞানকে অবলম্বন করলাম না।”
তিনি প্রায়ই বলতেন, “হে পথহারা মানুষদের পথপ্রদর্শক, আমার সংশয় আরও বাড়িয়ে দাও।” অর্থাৎ, তোমার জালালিয়্যাত ও মহিমার উপলব্ধিতে আমি আরও মগ্ন হতে চাই।
একদিন এক ব্যক্তি শিবলির কাছে গিয়েছিলেন। তখন তার উচ্ছ্বাস তুঙ্গে, আর তিনি বারবার বলছিলেন—
على بعدك لا يصبر من عادته القرب
ولا يقوى على حجبك من تيمه الحب
فإن لم ترك العين فقد يبصرك القلب
“তোমার দূরত্ব সে সহ্য করতে পারে না; যার অভ্যাস তোমার নৈকট্য।
আর যে তোমার প্রেমে মগ্ন, সে তোমার পর্দা সহ্য করতে পারে না।
চোখ যদি তোমায় না-ও দেখে, হৃদয় তো তোমায় দেখেই।”
তাঁকে একবার বলা হলো, “আপনাকে তো স্থূলকায় তথা মোটা শরীরের দেখায়! অথচ প্রেম তো মানুষকে ক্ষয় করে ফেলে?” জবাবে তিনি কবিতায় বললেন—
أحب قلبي وما درى بدني … ولو درى الحب ما أقام في السمن
“প্রেম আমার হৃদয়কে গ্রাস করেছে, কিন্তু দেহ তা বোঝেনি!
যদি প্রেম দেহকেও জানতে দিত, তবে কি এ শরীর এমন মোটা থাকতে পারত?”
একদিন ঈদের সময় তাঁকে মসজিদ থেকে বের হতে দেখা গেল, আর তিনি বলতে বলতে যাচ্ছিলেন—
إذا ما كنت لي عيداً … فما أصنع بالعيد؟
جرى حبك في قلبي … كجري الماء في العود
“হে আল্লাহ, যখন আপনি-ই আমার কাছে ঈদ,
তখন আমার আর ঈদ নিয়ে কী কাজ?
আপনার প্রেম আমার হৃদয়ে চলে—
ডালের ভেতর যেমন পানি সহজে বয়ে যায়।”৬
মুহাম্মদ ইবনু ইব্রাহিম ইবনে আহমদ বর্ণনা করেন, আমাকে আবু মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ আল-হাজবি কবিতাদ্বয় শুনিয়েছিলেন। তিনি বলেন, আমি বহুবার শিবলিকে এই দু’টি শের আবৃত্তি করতে শুনেছি—
وَالْهَجْرُ لَوْ سَكَنَ الْجِنَانَ تَحَوَّلَتْ نِعَمُ الْجِنَانِ عَلَى الْعَبِيدِ جَحِيمَا
وَالْوَصْلُ لَوْ سَكَنَ الْجَحِيمَ تَحَوَّلَتْ حَرُّ السَّعِيرِ عَلَى الْعِبَادِ نَعِيمَا-
“বিচ্ছেদ যদি জান্নাতে বসবাস করত,
তবু জান্নাতের সব নিয়ামত বান্দাদের কাছে জাহান্নামে পরিণত হত।
আর মিলন যদি জাহান্নামে বাস করত,
তবে জ্বালামুখীর আগুনও বান্দাদের জন্য নেয়ামত হয়ে যেত।”৭
তাঁর আধ্যাত্মিক মর্যাদা:
আবু বকর আর-রাজি বলেন, “আমি সুফিদের মধ্যে শিবলির মতো জ্ঞানী কাউকে দেখিনি।”
আর জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলেছেন, “তিনি (শিবলি) আল্লাহর নজরের উৎসসমূহের একটি উৎস।”
“প্রতিটি জাতির একটি মুকুট থাকে, আর এই (সুফি) সম্প্রদায়ের মুকুট হলো— শিবলি (রহ.)।”
ইরাকের শাইখগণ বলতেন, “বাগদাদের সুফিবাদের তিনটি আশ্চর্য হলো—
১. শিবলির ইশারা,
২. মারতাআশের নুকতাহ তথা গভীর বাণী
৩. জাফর আল-খালিদির কাহিনিসমূহ।৮
আবু নসর আত-তুসি, আল-হুসরীর বরাতে বর্ণনা করেন, শিবলি বলেছেন, “আল্লাহ সেই চোখকে অন্ধ করুক, যা আমাকে দেখে; কিন্তু আমার মধ্যে কুদরতের নিদর্শন বুঝতে পারে না। কারণ, আমি কুদরতের একটি নিদর্শন এবং মর্যাদার সাক্ষী। আমাকে এত বিনীত করা হয়েছে যে, আমার বিনয় বা হীনতার মধ্যে সব হীনতাই মর্যাদা পেয়েছে। আর আমাকে এত সম্মান দেওয়া হয়েছে যে, কেউ আমার মাধ্যম ছাড়া সম্মানিত হতে পারে না, অথবা যার মাধ্যমে আমি সম্মানিত হয়েছি তার মাধ্যম ছাড়া। আমরা কখনও আলাদা হইনি, আর কীভাবে আলাদা হতে পারি, যখন আমাদের ওপর একত্র থাকার অবস্থা কখনও প্রয়োগই হয়নি!”৯
রিয়াজত:
আধ্যাত্মিক জীবনের শুরুতে তাঁর কঠোর সাধনা ছিল কল্পনাতীত। ওস্তাদ আবু আলী আদ-দাক্কাক (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে, “আমি শুনেছি, শিবলী (রহ.) চোখে লবণের অঞ্জন (সুরমার মতো) ব্যবহার করতেন, যাতে তিনি রাত জেগে ইবাদতে অভ্যস্ত হতে পারেন এবং ঘুম যেন তাঁকে কাবু করতে না পারে।”
রমজান মাসে শিবলি (রহ.) তাঁর যুগের সমসাময়িকদের চেয়ে কঠোর পরিশ্রম করতেন এবং ঘোষণা করতেন, “এই মাসটি আমার প্রভু মহিমান্বিত করেছেন; আমি প্রথম ব্যক্তি, যিনি এটিকে রিয়াজতের মাধ্যমে মহিমান্বিত করব।”১০
তাঁর জুহদ:
হজরত আবু বকর শিবলি রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘জুহদ কী?’
তিনি বললেন, “জুহদ হলো— সমস্ত জিনিস থেকে হৃদয়কে সরিয়ে জিনিসের রবের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া।’
আর তিনি বলতেন, ‘তাসাউফ হলো নিজের ইন্দ্রিয়-চেতনাকে সংযত রাখা এবং প্রতিটি নিশ্বাসের হেফাজত করা।”
তাঁকে দুনিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন, “দুনিয়া হলো এক ফুটন্ত হাঁড়ি, আর এক ভরা বন্য জানোয়ার।” অর্থাৎ বিপদ-আপদ, ফিতনা ও ধোঁকার এক অন্তহীন মাঠ।১১
আবু সাঈদ রাজি বলেন, আমি শিবলিকে বলতে শুনেছি, “আমার হৃদয়ে সৃষ্ট জগতের কোনো চিন্তা আসে না, আর যে স্রষ্টাকে চেনে, তার হৃদয়ে কীভাবে জগতের চিন্তা আসতে পারে?” অর্থাৎ, স্রষ্টার জ্ঞান তাঁকে সৃষ্টিজগতের চিন্তা থেকে দূরে রাখে।১২
হুসাইন ইবনু আহমদ আস-সাফফার বলেন, একদিন আমি শিবলি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “যে জিকিরে প্রশান্তি পায়, তার অবস্থা আরেক রকম; আর যে ‘মাজকুর’-এ (আল্লাহতে) প্রশান্তি পায়—তার অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন।”
তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘জুহ্দ কী?’
তিনি বললেন, “জুহ্দকে ভুলে যাওয়া— এটাই জুহ্দ।”
আবু হাতিম আত-তাবরী বলেন, আমি আবু বকর শিবলি রহ.-কে বলতে শুনেছি, “তুমি যদি দুনিয়াকে পুরোপুরি দেখতে চাও, তবে একটি আবর্জনার স্তূপের দিকে তাকাও— এটাই দুনিয়া। আর যদি নিজের দিকে তাকাতে চাও, তবে এক মুঠো মাটি হাতে নাও: তোমাকে এ থেকেই সৃষ্টি করা হয়েছে, এতেই ফিরিয়ে নেওয়া হবে, আবার এ থেকেই পুনরুত্থান হবে। আর যদি জানতে চাও তুমি আসলে কী; তবে শৌচাগারে যাও; তোমার ভেতর থেকে কী বের হয় তা দেখো! যে এমন অবস্থার মানুষ, সে তার মতো আরেকজনের ওপর অহংকার করতে পারে না।”১৩
এক মন্ত্রীর সাথে:
মুহাম্মদ ইবন আলী ইবন হুবাইশ বলেন, শিবলি (রহ.)-কে চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় মন্ত্রী আলী ইবনে ঈসা তাঁকে দেখতে এলেন। শিবলি (রহ.) তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোমার রব কী করেন?’
মন্ত্রী বললেন, ‘তিনি আসমানে ফায়সালা করেন এবং বাস্তবায়ন করেন।’
শিবলি বললেন, ‘আমি তোমার সেই ‘রব’ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছি, যাকে তুমি উপাসনা করো,
সেই ‘রব’ সম্পর্কে নয়, যাকে তুমি উপাসনা করো না।’
মন্ত্রী আলী তার সঙ্গে থাকা একজনকে বললেন, ‘এর জবাব দাও।’
সে ব্যক্তি শিবলিকে বলল, ‘হে আবু বকর, আপনাকে সুস্বাস্থ্যের সময় বলতে শুনেছি, ‘প্রত্যেক সিদ্দিক যিনি কোনো কারামত দেখাতে পারেন না; তিনি মিথ্যাবাদী। আপনি তো সিদ্দিক; তাহলে আপনার কারামত কী?’
শিবলি (রহ.) উত্তর দিলেন, ‘আমার কারামত হলো, আমার ‘সচেতন অবস্থার ভাবনা’ আর ‘মত্ত আত্মহারার অবস্থার ভাবনা।’ উভয়ই আল্লাহর ইচ্ছার সাথে এমনভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে যে, কখনোই তা আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে বিচ্যুত হয় না।’১৪
ঈদের দিনের ফরিয়াদ:
মনসুর ইবনে মুহাম্মাদ আল-মু’করি, আহমাদ ইবনে নসর ইবনে মনসূর আশ-শাযযাবী আল-মু’করীর বরাতে বর্ণনা করেন, আবু বকর শিবলিকে (রহ.) জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘আপনি আপনার সব পোশাক ছিঁড়ে ফেলেছেন এবং পুরোনো করে ফেলেছেন, অথচ ঈদ সমাগত! সবাই সাজসজ্জা করছে, আর আপনি এমন অবস্থায় আছেন?’
তখন তিনি এই কবিতাটি আবৃত্তি করলেন—
قَالُوا أَتَى الْعِيدُ مَاذَا أَنْتَ لَابِسُهُ ؟ فَقُلْتُ خُلْعَةَ سَاقٍ حُبَّهُ جَزَعًا
فَقْرٌ وَصَبْرُهُمَا ثَوْبَايَ تَحْتَهُمَا قَلْبٌ يَرَى إِلْفَهُ الْأَعْيَادَ وَالْجُمُعَا
الدَّهْرُ لِي مَأْتَمٌ إِنْ غِبْتَ يَا أَمَلِي وَالْعِيدُ مَا كُنْتَ لِي مَرْءًا وَمُسْتَمَعَا
أَحْرَى الْمَلَابِسِ مَا تَلْقَى الْحَبِيبَ بِهِ يَوْمَ التَّزَاوُرِ فِي الثَّوْبِ الَّذِي خَلَعَا-
তারা বলল, ‘ঈদ এসেছে, তুমি কী পরিধান করবে?
আমি বললাম, ‘যার ভালোবাসা আমাকে অস্থির করেছে,
আমি তাঁরই ত্যাগ করা পোশাক পরিধান করব।
দারিদ্র্য ও এর উপর ধৈর্য— এই হলো আমার দুটি পোশাক;
তার নিচে এমন একটি হৃদয় আছে,
যে তার বন্ধুকে ঈদ ও জুমআর দিন হিসেবে দেখে।
হে আমার আশা, যদি তুমি আমার কাছ থেকে দূরে থাকো,
তবে এই সময়টা আমার জন্য শোকের দিবস;
আর ঈদ তো তখনই, যখন তুমি আমার নিকটে থাকো এবং আমার কথা শোনো।
পোশাকের মধ্যে সবচেয়ে উপযুক্ত হলো সেটাই,
যা দিয়ে তুমি প্রিয়তমের সাথে দেখা করবে—
সেই ত্যাগ করা পোশাকে, যা তিনি খুলে ফেলেছিলেন।১৫
আল্লাহকে কোথায় খুঁজব?
আবু নসর নিসাবুরি বলেন, আমি আহমদ ইবনে মুহাম্মদ খতিবকে বলতে শুনেছি, শিবলি (রহ.)-এর শিষ্য বুকাইর তাঁকে বলল, ‘হে ওস্তাদ, আমি তাঁকে কোথায় খুঁজবো?’
শিবলি (রহ.) উত্তর দিলেন, “তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক! যাকে তুমি খুঁজতে চাও, তিনি সেই সত্তা, যিনি আকাশসমূহকে এক আঙুলে আর জমিনসমূহকে এক আঙুলে নেন, তারপর সেগুলো ঝাঁকিয়ে বলেন, ‘আমি বাদশাহ, কোথায় রাজারা?’ আল্লাহ কখনোই তাঁর সৃষ্টি থেকে আড়াল হননি; বরং সৃষ্টিরাই দুনিয়ার ভালোবাসায় ডুবে গিয়ে তাঁর কাছ থেকে আড়াল হয়ে গেছে।”১৬
আল্লাহর নৈকট্য লাভের পন্থা:
শাইখ আবু বকর আর রাযী বলেন, শিবলি (রহ.) যখন তাঁর সঙ্গীদের যাত্রা করতে দেখতেন এবং সফরে তাদের কষ্ট বা বিচ্ছিন্নতা অনুভব করতেন, তখন তিনি বলতেন, “হায়, আপসোস তোমাদের জন্য, তোমরা কি এমন কিছু থেকে পালাচ্ছ, যা থেকে পালানোর উপায় নেই, নাকি এমন এক সত্তা থেকে পালাচ্ছ, যার কাছ থেকে পালানো সম্ভব নয়?”
অর্থাৎ, মানুষকে অপ্রতিরোধ্য ভাগ্যের পথে নয়; বরং সেই মহাসত্তার দিকে ফিরে আসা উচিত, যার কাছে শরণাপন্ন হওয়াই মুক্তির একমাত্র পথ— এ সত্তা হলো আল্লাহ।
তিনি আরও বলতেন, “রুহগুলো কোমল হয়ে ওঠে এবং যখন তারা বাস্তবতার জ্বালা (লজ্জাতুল হাকিকাহ) অনুভব করে, তখন তারা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ইবাদতের উপযুক্ত হিসেবে দেখতে পায় না। তারা নিশ্চিত হয় যে, সৃষ্ট (মুহদাস) কোনো সত্তা তার ত্রুটিপূর্ণ গুণাবলির মাধ্যমে চিরন্তন সত্তার সম্পূর্ণ স্বরূপকে উপলব্ধি করতে পারে না। তাই যখন আল্লাহ বান্দাকে পবিত্র করেন, তখন আল্লাহই তাকে তাঁর কাছে পৌঁছে দেন; বান্দার নিজস্ব প্রচেষ্টা নয়; এটি শুধু আল্লাহর অনুগ্রহ ও পবিত্রতার মাধ্যমে সম্ভব।”১৭
আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার হাকিকত:
মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে ইয়াকুব আল-ওয়াররাক বলেন, আমি শিবলি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, তাঁকে যখন মহব্বত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বললেন, “মহব্বত হলো প্রিয়তমের জন্য পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে যাওয়া, এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর কোনো আপত্তি না তোলা।”
তিনি আরও বললেন:
“যখন মনে করি আমি হারিয়ে গেছি, সেই মুহূর্তেই আমি পাওয়া যাই।
আর যখন মনে করি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি, সেখানেই আমি হারিয়ে যাই।”
তিনি বলেন, “অলিদের সরল পথ (সিরাতুল আউলিয়া) হলো মহব্বত।”
তিনি আরও বলেন, “পূর্ণাঙ্গ মহব্বত হলো তুমিই তাঁকে তাঁর পক্ষ থেকে ভালোবাসো। অর্থাৎ তাঁর অনুগ্রহে, তাঁর তাওফিকে।”
আর তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহকে তাঁর দয়া ও অনুগ্রহের প্রতিদান হিসেবে ভালোবাসে, সে আসলে মুশরিক। অর্থাৎ তার ভালোবাসায় বিশুদ্ধতা নেই; স্বার্থমিশ্রিত ভালোবাসা।”১৮
রবের দরবারে তাঁর আকুতি:
হুসাইন ইবনু আহমদ আস-সাফফার বলেন, একদিন শিবলি রহ. ক্রন্দন করছিলেন এবং বলতে লাগলেন, “তিনি অনুগ্রহের মাধ্যমে তোমাকে টানলেন, আর তুমি ভুলে গেলে। তোমাকে অবকাশ দিলেন, আর তুমি পাপেই মত্ত রইলে। তিনি তোমাকে তাঁর দৃষ্টি থেকে ফেলে দিলেন, আর তুমি তা টেরও পেলে না, গুরুত্বও দিলে না!”
তিনি আরও বলতেন—
“আহ, আমার নাম কাল আপনার কাছে কী হবে, হে সর্বজ্ঞাত আল্লাহ?
হে গুনাহ ক্ষমাকারী, আমার পাপগুলোর ব্যাপারে আপনি কী করবেন?
হে অন্তর পরিবর্তনকারী, কোন অবস্থায় আপনি আমার আমলসমূহের পরিসমাপ্তি করবেন?”
রাতের গভীরে শিবলি রহ. বলতে থাকতেন—
“হে আমার হৃদয়ের সুখ, হে আমার চোখের শীতলতা!
কীসের কারণে আপনি আমাকে আপনার দৃষ্টির বাইরে ফেলেছেন?”
এ কথা বলে তিনি চিৎকার করতেন এবং কাঁদতেন।১৯
তাঁর আধ্যাত্মিক উক্তিসমূহ:
মুহাম্মদ ইবনে আহমদ ইবনে ইয়াকুব আল-ওয়াররাক বলেন:
আমি শিবলিকে বলতে শুনেছি, “মুরিদের জন্য অলসতা নেই, আরিফদের জন্য ‘জানার’ নামের কিছু নেই, ‘মারিফাত’-এর সঙ্গে কোনো আসক্তিও নেই, প্রেমিকের স্থিরতা নেই, সত্যবাদীর কোনো দাবি নেই, ভীতের শান্তি নেই, আর আল্লাহর সৃষ্টির তাঁর কাছ থেকে পালানোর পথও নেই।”
তিনি আরও বলতেন— “একটি দৃষ্টিপাত— কুফর, একটি চিন্তার ঝলক— শিরক, ইশারা— প্রতারণা। দৃষ্টি— বঞ্চনা, চিন্তার ঝিলিক— অসহায়তা, ইশারা— বিচ্ছেদ।”
উসমান ইবন মুহাম্মদ আল-উসমানী বলেন, শিবলি বলতেন, “যে বিচ্ছিন্ন হলো (দুনিয়া থেকে), সে যুক্ত হলো (আল্লাহর সঙ্গে); আর যে যুক্ত হলো (দুনিয়ার সঙ্গে), সে বিচ্ছিন্ন হলো (আল্লাহ থেকে)।”
আবুল কাসিম আব্দুস সালাম ইবন মুহাম্মদ আল-মুখরামী বলেন, আমি শিবলিকে বলতে শুনেছি, যখন তাকে আল্লাহর বাণী, “আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের সাড়া দেব।” সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি বললেন, “তোমরা আমাকে ডাকো অসাবধানতা ছাড়া, আমি তোমাদের সাড়া দেব বিলম্ব ছাড়া।”
মুহাম্মদ ইবন ইব্রাহিম বলেন, আমি শিবলিকে বলতে শুনেছি, “মানুষ ব্যস্ত হয়েছে হরফ (বাহ্যিক জ্ঞান) নিয়ে, আর সত্যসন্ধানীরা ব্যস্ত হয়েছে হুদুদ (আল্লাহ নির্ধারিত সীমা) নিয়ে। যারা হরফ নিয়ে ব্যস্ত, তারা ব্যস্ত হয় পরাজয়ের ভয়ে। যারা হুদুদ নিয়ে ব্যস্ত, তারা ব্যস্ত হয় কেয়ামতের লজ্জার ভয়ে।
আবু নসর নিশাপুরি বলেন, আমি আবু আলী আহমদ ইবনে মুহাম্মদকে বলতে শুনেছি, শিবলি বলতেন, “তোমরা সব শক্তিশালী মানুষ এসেছো এক পাগলের কাছে। তোমাদের আমাকে দিয়ে কী লাভ? আমাকে এতবার পাগলাগারদে ঢোকানো হয়েছে, এত রকম ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে, তবু আমি আরও বেশি পাগল হয়েছি!”২০
প্রকৃত কবর:
আবু নসর বলেন, তিনি আহমাদকে বলতে শুনেছেন, আমি শিবলির (রহ.) এঁর কাছে উপস্থিত ছিলাম। তাঁকে কারো এই উক্তিটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, “তোমাদের যেন এই কবরসমূহ এবং তাদের নিস্তব্ধতা ধোঁকা না দেয়; কারণ সেখানে কতই না আনন্দিত ও সুখি ব্যক্তি আছেন, আবার কতই না আছেন যারা ধ্বংস ও দুর্ভোগের জন্য আর্তনাদ করছেন।”
তখন শিবলি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার মতে কবর কোনটা?’
জিজ্ঞাসাকারী বলল, ‘মৃতদের দেহ যেখানে থাকে।’
শিবলি বললেন, “না, বরং তোমরাই কবর! তোমাদের প্রত্যেকেই নফসের ভেতরে সমাহিত। যে ব্যক্তি আল্লাহ থেকে বিমুখ, সে-ই ধ্বংস ও দুর্ভোগের জন্য আর্তনাদকারী। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে মনোনিবেশকারী, সে-ই আনন্দিত ও সুখি।”
এরপর তিনি কবিতা আবৃত্তি করলেন—
قُبُورُ الْوَرَى تَحْتَ التُّرَابِ وَلِلْهَوَى رِجَالٌ لَهُمْ تَحْتَ الثِّيَابِ قُبُورٌ
মানুষের কবর তো মাটির নিচে; কিন্তু প্রবৃত্তির অনুসারী কিছু মানুষ আছে,
যাদের পোশাকের নিচেও রয়েছে কবর।
তখন আমি (আহমাদ) তাঁকে বললাম, ‘হে আমার সায়্যিদ, তাহলে কি আমরাও মৃতদের মধ্যে গণ্য?’
উত্তরে তিনি কবিতাটি আবৃত্তি করলেন—
يُحِبُّكَ قَلْبِي مَا حَيِيتُ فَإِنْ أَمُتْ يُحِبُّكَ عَظْمٌ فِي التُّرَابِ رَمِيمٌ
যতদিন আমি বেঁচে থাকি, আমার হৃদয় তোমাকে ভালোবাসবে;
আর যদি আমি মারা যাই, মাটিতে মিশে যাওয়া আমার হাড়গুলোও তোমাকে ভালোবাসবে।২১
তাঁর বাণী ও নসিহত:
১. তাঁকে ওয়াফা তথা আনুগত্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি বললেন, “তা হলো মুখের কথায় ইখলাস এবং অন্তরের গোপন বিষয়াদিকে সত্য দ্বারা পরিপূর্ণ করা।”
২. তাসাউফ মানে হলো অন্তরের মধ্যে মিলন ও একে-অপরের প্রতি সহমর্মিতা।
৩. তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘মানুষ কখন সত্যিকারের মুরিদ হয়?’ তিনি বললেন, “যখন তার অবস্থা সমান থাকে— যাত্রা ও অবস্থানে, প্রকাশ্য ও গোপনে।”
৪. তোমরা তোমাদের মধ্যে নিচে অবস্থিত, আর আমি আমার মধ্যে উপরে অবস্থিত। এতে আল্লাহর কাছে মনোভাব ও অবস্থার পার্থক্য নির্দেশ করা হয়েছে।
৫. যে আল্লাহকে চিনতে পেরেছে, সবকিছুই তার কাছে নতি স্বীকার করে; কারণ সে তাতে আল্লাহর রাজত্বের প্রভাব স্বচক্ষে দেখেছে।
৬. তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘কী দ্বারা হাওয়া (নফসের কামনা) দমন করা যায়?’ তিনি বলেন, “স্বভাবের সাধনা এবং পর্দা উন্মোচন। অর্থাৎ, নফসকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং হৃদয়ের পর্দা সরিয়ে সত্যকে দেখা।”
৭. তোমার উদ্দেশ্য যেন তোমার সাথেই থাকে, তা যেন সামনেও না যায় এবং পিছনেও না আসে। অর্থাৎ, অতীত বা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে বর্তমান মুহূর্ত এবং আল্লাহর সাথে তোমার যে অবস্থা, তাতে স্থির থাকো।
৮. আরেফিনদের জন্য চোখের পলকের সমপরিমাণ সময় আল্লাহ থেকে অন্যমনস্ক হওয়াও আল্লাহর সাথে শিরক করার শামিল।
৯. আল্লাহর সামনে দুঃখিত থাকার চেয়ে আল্লাহর প্রতি আনন্দিত থাকা উত্তম।
১০. হকের অনুসারীদের অন্তর মারিফাতের ডানা মেলে তাঁর দিকে উড়ে যায় এবং মহব্বতের মিত্রতার মাধ্যমে তাঁর দিকে সুসংবাদ লাভ করে।
১১. স্বাধীনতা হলো একমাত্র হৃদয়ের স্বাধীনতা, অন্য কিছু নয়।
১২. যে ব্যক্তি সৃষ্টিকর্তা থেকে সৃষ্টবস্তু দ্বারা আড়াল হয়েছে, সে তার মতো নয়, যে সৃষ্টবস্তু থেকে সৃষ্টিকর্তা দ্বারা আড়াল হয়েছে। আর যাকে তাঁর কুদসের (পবিত্রতার) আলো তাঁর আনন্দের দিকে আকর্ষণ করেছে, সে তার মতো নয়, যাকে তাঁর রহমতের আলো তাঁর ক্ষমার দিকে আকর্ষণ করেছে।২২
১৩. তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘সর্বাধিক বিস্ময়কর জিনিস কী?’ তিনি উত্তর দিলেন, “একটি হৃদয়; যা তার রবকে চিনে, তারপরও তাঁর অবাধ্য হয়।”
১৪. নফসের সাথে নফসকে লড়াই করানো— অন্যের সাথে লড়াই করার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।”
১৫. তুমি নিজের ওপর নিরাপদ হতে পারো না; যদিও পানির ওপর দিয়ে হাঁটো। নিরাপদ হবে তখনই, যখন প্রতারণার ঘর (দুনিয়া) থেকে আশার ঘরে (আখিরাত) চলে যাবে।”
১৬. যখন দেখবে তোমার হৃদয় আল্লাহর সঙ্গে, তখন নিজের নফস থেকে সাবধান হও। আর যখন দেখবে তোমার হৃদয় নিজের নফসের দিকে, তখন আল্লাহ থেকে সাবধান হও।
১৭. যে আল্লাহকে চিনেছে, তার জন্য কোনো দুঃখ থাকে না।
১৮. মানুষ আপনাকে ভালোবাসে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের জন্য; আর আমি আপনাকে ভালোবাসি আপনার দেওয়া পরীক্ষা-বিপদের জন্য।
১৯. অন্ধ ব্যক্তি জাহরার সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে পারে না, সে শুধু তাকে স্পর্শ করে। তেমনি, জাহিল ব্যক্তি আল্লাহকে চিনতে পারে না, সে শুধু জিহ্বায় তাঁর নাম উচ্চারণ করে।২৩
২০. উচ্চ হিম্মতওয়ালা ব্যক্তি কোনোকিছুরই তোয়াক্কা করে না। আর যার ইরাদা (নির্দিষ্ট লক্ষ্য) আছে, সে অবশ্যই কোনো না কোনো কিছুর ব্যস্ততায় পড়ে থাকে।
২১. হিম্মত কেবল আল্লাহর জন্য; তাঁর ছাড়া অন্য কিছুকে লক্ষ্য বানানো হিম্মত নয়।
২২. কল্পনায় ভেবেছ, চিন্তায় ধরেছ, বুদ্ধিতে উপলব্ধি করেছ; সবই তোমাদের দিকে ফেরত যায়; এগুলো সৃষ্টি ও বানানো জিনিস—আল্লাহর সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
২৩. যে বলে— আল্লাহকে অভ্যাস দিয়ে চেনা যায়, সে মূর্খ। যে বলে— আল্লাহকে আকস্মিকতা বা ঘটনাচক্রে পাওয়া যায়, সে নির্বোধ। আর যে বলে— আমি আল্লাহর খাতিরে একনিষ্ঠ; তার একনিষ্ঠতার মধ্যেও শিরকের বাসা থাকে।
২৪. যে বলে আল্লাহ এমন এক সত্য, যাকে আমরা বাহ্যিক বাস্তবতা দিয়ে বুঝি, সে আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞ। যে বলে আমি ওই বাস্তবতা আঁকড়ে আল্লাহকে ধরেছি, সে তাঁর ‘আদি সত্তা’ সম্পর্কে অজ্ঞ, যতক্ষণ পর্যন্ত সে এ কথা না বলে: ‘আল্লাহকে আল্লাহর মাধ্যমেই জানা যায়।
২৫. রুহগুলো সূক্ষ্ম হয়ে যায়; সত্যের দংশনে যখন চেতন হয়, তখন সত্য ছাড়া আর কোনো উপাস্যকে দেখতেই পায় না। তারা নিশ্চিত হয়ে যায়— সৃষ্ট জিনিস সীমাবদ্ধ গুণাবলি দিয়ে কখনোই চিরন্তন সত্তাকে উপলব্ধি করতে পারে না। যখন ‘হক’ তাকে পরিশুদ্ধ করেন, তখন তিনিই তাকে নিজের দিকে পৌঁছে দেন; বান্দা নিজে গিয়ে পৌঁছায় না।
২৬. সৃষ্টিকুল জ্ঞানের মধ্যে হারিয়ে গেছে; জ্ঞান নামের ভেতর হারিয়েছে; আর নাম সত্তার ভেতর হারিয়ে গেছে।২৪
ওফাত:
তিনি ৩৩৪ হিজরিতে বাগদাদে ওফাত লাভ করেন, তার বয়স ছিল আশির কিছু বেশি।২৫
জাফর ইবনু নুসাইর বাকরান আদ-দিনাওরী, যিনি শিবলি রহ.-এর সেবক ছিলেন, তিনি যা দেখেছেন সে সম্পর্কে বলেন, শিবলি (রহ.) বলেছেন, “আমার কাছে এক দিরহাম ঋণের ব্যাপারে সন্দেহ আছে; আমি সেই ব্যক্তির পক্ষ থেকে সদকা করে দিয়েছি। তবুও আমার হৃদয়ে এর চেয়ে বড় কোনো চিন্তা নেই।” তারপর তিনি বললেন, “আমার জন্য অজু প্রস্তুত করো।” আমি তা করলাম, কিন্তু তাঁর দাড়ির আঙ্গুল-চালানো (খিলাল করতে) ভুলে গেলাম। তিনি তখন নিজের জিহ্বা শক্ত করে ধরে আমার হাত চেপে ধরলেন এবং তা তাঁর দাড়ির মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিলেন; তারপরই তিনি ইন্তেকাল করলেন।”২৬