হিজরি তৃতীয় শতকের বাগদাদে যখন জ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা ও তাসাউফ বিকাশের স্বর্ণযুগ প্রবাহিত হচ্ছিল, তখন সেই আলো-ছায়ার অঙ্গনে দাঁড়িয়ে জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) তাসাউফকে দিলেন সংযম, জ্ঞান, হিকমত ও সুন্নাহর মেলবন্ধন— যা আজ পর্যন্ত সুফি ঐতিহ্যের মূলধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর এই সংস্কারবাদী চিন্তাধারা আধ্যাত্মিক সাধনাকে এক স্বচ্ছ ও বিশুদ্ধ ভিত্তি প্রদান করেছে।

জন্ম ও পরিচয়:

ইতিহাসের পাতায় তাঁর পরিচিতি অত্যন্ত উজ্জ্বল। তাঁর নাম জুনাইদ ইবনু মুহাম্মদ ইবনুল জুনাইদ নাহাওয়ান্দী আল-বাগদাদি আল-কাওয়ারীরী। তিনি ছিলেন শায়খুস-সুফিয়্যাহ তথা সুফিদের শায়েখ। তিনি ২২৩ হিজরির পরবর্তী সময়ে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন রেশমী কাপড়ের ব্যবসায়ী। ১

তাঁর পিতা কাঁচপাত্রও বিক্রি করতেন, এজন্য মানুষ তাকে আল-কাওয়ারীরী (কাঁচ বিক্রেতার পুত্র) বলত। তাঁর শৈশব থেকেই হালাল উপার্জন ও সততার শিক্ষা তাঁর চরিত্রের বুনিয়াদ গড়ে দিয়েছিল। তার বংশ নিহাওয়ান্দ অঞ্চলে, আর জন্ম ও লালন-পালন—উভয়ই ছিল ইরাকে। ২

ইলম অর্জন:

আধ্যাত্মিকতার গূঢ় রহস্য উন্মোচনের আগে তিনি নিজেকে জ্ঞানের সাগরে নিমজ্জিত করেন। তিনি ইমাম আবু সাওর–এর কাছে ফিকহের ইলম শিক্ষা গ্রহণ করেন। এছাড়াও হজরত সাররি আস-সাকত্বির নিকট ইলমে হাদিস শিক্ষা করেন এবং তাঁর সোহবতও লাভ করেছিলেন। তা ছাড়া হাসান ইবনে আরাফা থেকেও হাদিস শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। প্রখ্যাত সুফি হারিস আল-মুহাসিবী ও আবু হামজা আল-বাগদাদীর সোহবতও লাভ করেন। এভাবে তিনি গভীর ইলম হাসিল করেন। তারপর আধ্যাত্মিক পথে মনোনিবেশ করেন। আল্লাহমুখী হন, ইবাদতে নিমগ্ন থাকেন, হিকমতপূর্ণ বাণী উচ্চারণ করতে থাকেন, যার ফলে তাঁর বক্তব্যে তেমন কোনো অস্পষ্টতা দেখা যেত না।৩

তাঁর জ্ঞান ও আমলের এই সমন্বয় তাঁকে সমকালীন সবার থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছিল।

শরিয়ত ও মারেফাতের ইলমি গভীরতা:

তিনি কেবল একজন সাধক ছিলেন না, বরং ছিলেন এক মহান পণ্ডিত। ইবনুল মুনাদি বর্ণনা করেন, হজরত জুনাইদ বাগদাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বহু জ্ঞান অর্জন বিশেষত হাদিসের দরস নিয়েছেন এবং বহু সৎকর্মশীল ব্যক্তি ও মারিফতসম্পন্ন (আল্লাহর জ্ঞান) লোকের সাহচর্য লাভ করেছেন। তিনি বুদ্ধিদীপ্ত এবং যথাযথ উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। তাঁর সময়ে ইফফাহ (আত্মসংযম) এবং উজুফ (দুনিয়ার প্রতি বিমুখতা)-এর ক্ষেত্রে তাঁর সমতুল্য আর কেউ ছিলেন না।

তিনি নিজেই একবার বলেছিলেন, “যখন আমার বয়স বিশ বছর, তখন আমি আবু সাওর আল-কালবীর (ফিকাহের) মজলিসে ফাতোয়া দিতাম।” আহমাদ ইবনে আ-তাও এটির পক্ষে সমর্থন দিয়ে বলেছেন, “হজরত জুনাইদ বাগদাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহি সেই মজলিসে ফতোয়া দিতেন।” হজরত জুনাইদ বাগদাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহি নিজে বর্ণনা করেছেন, “আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে মানুষ উপকৃত হবার মতো যত জ্ঞান পাঠিয়েছেন সব আমি পেয়েছি।”

আবু নু’আইম (রহ.) থেকে বর্ণিত, আলী ইবনে হারুন ও অন্য একজন বলেন, “আমরা হজরত জুনাইদ বাগদাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে একাধিকবার বলতে শুনেছি, “আমাদের দ্বীনের জ্ঞান কিতাব (কুরআন) ও সুন্নাহ— এই দুটির মাধ্যমে গঠিত। যে ব্যক্তি কিতাব মুখস্থ করেনি, হাদিস লিখে রাখেনি এবং ফিকহে পারদর্শী নয়, তাকে অনুসরণ করা যায় না।” এর মাধ্যমে তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, শরিয়ত ছাড়া মারেফাতের দাবি ভিত্তিহীন। আব্দুল ওয়াহিদ ইবনু ইলোয়ান বর্ণনা করেন, তিনি হজরত জুনাইদ বাগদাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে বলতে শুনেছেন, “আমাদের এই জ্ঞান; অর্থাৎ তাসাউফ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসের সঙ্গে যুক্ত।”

আবুল আব্বাস ইবনে সুরাইজ বর্ণনা করেন, তিনি একদিন কোনো একটি বিষয়ে কথা বললেন এবং লোকেরা তাতে বিস্মিত হলো। তখন তিনি বললেন, “আবুল কাসিম জুনাইদের মজলিসে বসার বরকতে (আমার এমন জ্ঞান অর্জিত হয়েছে)।” আবুল কাসিম আল-কাবী বর্ণনা করেন, তিনি একবার বললেন, “আমি বাগদাদে এমন একজন শায়েখকে দেখেছি, যাঁকে জুনাইদ নামে ডাকা হতো। আমার চোখ তাঁর মতো আর কাউকে দেখেনি।”

সাহিত্যিক ও বাগ্মীগণ তাঁর শব্দ ও বাক্যের গাঁথুনির (আলফাজ) জন্য তাঁর মজলিসে উপস্থিত হতেন। দার্শনিকগণ অর্থের গভীরতার জন্য উপস্থিত হতেন। আল-মুতাকাল্লিমুন তথা ধর্মতত্ত্ববিদগণ তাঁর জ্ঞানের পরিমিতবোধের জন্য উপস্থিত হতেন। কিন্তু তাঁর কথার হাকিকত তাদের বোধগম্যতা এবং জ্ঞানের সীমার অনেক ঊর্ধ্বে ছিল। আল-খুলদী বলেছেন, “আমরা আমাদের শায়খদের মধ্যে এমন কাউকে দেখিনি, যার কাছে শরিয়তের জ্ঞান এবং আধ্যাত্মিক অবস্থা একত্রিত হয়েছিল, কেবল হজরত জুনাইদ বাগদাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছাড়া। তাঁর আধ্যাত্মিক অবস্থা ছিল গভীর ও প্রভাবশালী, এবং শরিয়তের জ্ঞান ছিল বিপুল। যখন আপনি তাঁর আধ্যাত্মিক অবস্থাকে দেখতেন, তখন মনে হতো তা তাঁর জ্ঞানের চেয়ে প্রাধান্য রাখে; আর যখন তিনি কথা বলতেন, তখন মনে হতো তাঁর জ্ঞান তাঁর আধ্যাত্মিক অবস্থার চেয়ে প্রাধান্য রাখে।”

আবু সাহল আস-সু’লুকী বর্ণনা করেন, আমি আবু মুহাম্মাদ আল-মুরতাইশকে বলতে শুনেছি, তিনি জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন, জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলেছেন, “আমি যখন সাত বছর বয়সী বালক, তখন হজরত সাররি আস-সাকত্বি রহমাতুল্লাহি আলাইহির সামনে খেলছিলাম। তাঁরা শোকর (কৃতজ্ঞতা) নিয়ে আলোচনা করছিলেন। সাররি (রহ.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওহে বৎস, শোকর কী?’ আমি বললাম, ‘আল্লাহর নিয়ামত ব্যবহার করে আল্লাহর অবাধ্যতা না করা।’ তখন তিনি বললেন, ‘আমি ভয় করি যে, তোমার জিহ্বাটিই যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার একমাত্র প্রাপ্তি না হয়। (অর্থাৎ, তোমার জ্ঞান যেন শুধু মুখে সীমাবদ্ধ না থাকে, কর্মে যেন প্রকাশ পায়)।’ জুনাইদ (রহ.) বলেন, “এরপর থেকে তাঁর এই কথাটি স্মরণ হলে আমি সবসময় কাঁদি।”৪

জীবনের শুরুতে পাওয়া এই নসিহত তাঁর সারাজীবনের আমলের পাথেয় হয়ে ছিল। জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলেছেন, “রিদা (আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকা) হলো মারিফতের দ্বিতীয় স্তর। যে ব্যক্তি রিদায় পরিপূর্ণ হলো, তার মারিফত সুদৃঢ় ও সত্য হয়, কারণ সে সর্বক্ষণ আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্ট থাকে।’৫

ইবাদত-বন্দেগি:

তাঁর ইবাদত ছিল কঠোর রিয়াজতের নামান্তর। শায়েখ আবু আলি আদ-দাক্কাক (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “একবার জুনাইদ বাগদাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহির হাতে তাসবিহ দেখা গেল। তাঁকে বলা হলো, “আপনার মতো এমন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হাতে তাসবিহ নেন?” তিনি বললেন, “যে পথ ধরে আমি আমার রবের কাছে পৌঁছেছি, সে পথ আমি ছাড়তে পারি না।” তিনি আরো বর্ণনা করেন, “জুনাইদ বাগদাদি রহ. প্রতিদিন তাঁর দোকানে যেতেন, পর্দা টেনে দিতেন এবং চারশত রাকাত নামাজ আদায় করতেন, এরপর নিজের বাড়িতে ফিরে আসতেন।”৬

প্রসিদ্ধি রয়েছে তিনি তাঁর দোকানে থাকতেন এবং তাঁর প্রতিদিনের ‘অজিফা’ (দৈনিক আমল) ছিল তিনশত রাকাত নামাজ এবং কয়েক হাজার তাসবিহ। আস-সুলামী (রহ.) থেকে বর্ণিত, আমার দাদা ইবনে নুজাইদ আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, “জুনাইদ (রহ.) তাঁর দোকান খুলতেন এবং ভেতরে প্রবেশ করতেন, তারপর পর্দা টেনে দিতেন এবং চারশত রাকাত নামাজ আদায় করতেন।”৭.

কর্মব্যস্ততা যে মহান রবের ইবাদতে বাধা হতে পারে না, তা তিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন।

ফারিস ইবনে মুহাম্মাদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আবুল কাসিম জুনাইদ খুব বেশি নামাজ পড়তেন। এরপর আমরা তাঁর মৃত্যুর সময়েও তাঁকে কুরআন তিলাওয়াত করতে দেখলাম। তাঁকে বালিশ এগিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, আর তিনি সেটির ওপর সিজদা করছিলেন। তাঁকে বলা হলো, ‘আপনি আপনার শরীরকে কিছুটা বিশ্রাম দিন না কেন?’ তিনি বললেন, ‘এটি এমন একটি পথ, যা দিয়ে আমি আল্লাহ্‌র কাছে পৌঁছেছি; এটি আমি ছিন্ন করতে পারি না।” এমনকি মৃত্যুর কঠিন মুহূর্তেও তিনি আমল থেকে বিচ্যুত হননি।

আবু বকর আল-আত্তার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমাদের একদল সঙ্গীর সাথে আমি জুনাইদের মৃত্যুকালে উপস্থিত ছিলাম। তিনি বসে নামাজ পড়ছিলেন এবং যখনই সিজদা করতে চাইতেন, তখনই নিজের পা গুটিয়ে নিতেন। (শেষের দিকে) তাঁর পা ভারী হয়ে যাওয়ায় তা নাড়াতে কষ্ট হচ্ছিল, তাই তিনি পা দুটি লম্বা করে দিলেন। পা দুটি ফুলে গিয়েছিল। তাঁর বন্ধুদের একজন এটি দেখে বললেন, ‘হে আবুল কাসিম, এটা কী?’ তিনি বললেন, ‘এ হলো আল্লাহ্‌র বড়ো বড়ো নেয়ামত!’ যখন তিনি নামাজ শেষ করলেন, তখন আবু মুহাম্মাদ আল-হারীরি তাঁকে বললেন, ‘আপনি যদি শুয়ে বিশ্রাম নিতেন!’ তিনি বললেন, ‘হে আবু মুহাম্মদ, এটা এমন একটি সময়, যখন তা থেকে (আমল) গ্রহণ করা হয়। আল্লাহু আকবার।’ তাঁর মৃত্যু হওয়া পর্যন্ত তাঁর অবস্থা এমনই ছিল, আল্লাহ্ তাঁকে রহম করুন।”৮

জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:

তিনি ছিলেন ত্যাগের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলছেন, “যদি তোমার ঘরের সরঞ্জাম মাটির পাত্র ছাড়া আর কিছু না হয় (অর্থাৎ, সবচেয়ে সস্তা ও সাধারণ জিনিস হয়), তবে তুমি তা নিয়েই জীবনযাপন করো।”৯ তিনি আরও বলেছেন, “দুনিয়ার প্রতিটি প্রয়োজন পূরণের সঠিক পথ— তা ত্যাগ করা।”১০

দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করার মাধ্যমেই তিনি প্রকৃত আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা লাভ করেছিলেন।

আবুল হাসান বলেন, আমি জুনাইদকে বলতে শুনেছি, “আমার প্রতি দুনিয়া থেকে যা কিছু আসে, তাতে আমার খুব বেশি কষ্ট বা চাপ অনুভূত হয় না। কারণ আমি একটি মূলনীতি স্থাপন করে রেখেছি, তা হলো— এই পৃথিবী দুঃখ, দুশ্চিন্তা, পরীক্ষা এবং ফিতনার স্থান। আর দুনিয়ার সমৃদ্ধি সম্পূর্ণরূপে অকল্যাণকর। এর নিয়ম হলো, যা আমি অপছন্দ করি তাই নিয়ে সে আমার সামনে আসবে। যদি আমার পছন্দের কিছু নিয়ে আসে, তবে তা আল্লাহ্‌র বিশেষ অনুগ্রহ। অন্যথায়, প্রথম মূলনীতিটিই বহাল থাকবে।”১১

তাঁর এই প্রজ্ঞা তাঁকে ধৈর্যশীল ও স্থিরচিত্ত করে তুলেছিল।

আব্দুল ওয়াহহাব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হজের মওসুমে জুনাইদের কাছে বসেছিলাম। তাঁর চারপাশে অনেক লোক ছিল, অনারব এবং স্থানীয় (আরব) উভয়ই। একজন লোক পাঁচশো দিনার নিয়ে এলো এবং তাঁর সামনে রেখে বলল, ‘আপনি এগুলো এদের মাঝে বণ্টন করে দিন।’ জুনাইদ জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কাছে কি এই মাল ছাড়া অন্য কোনো সম্পদ আছে?’ লোকটি বলল, ‘হ্যাঁ, আমার কাছে আরও অনেক দিনার আছে।’ তিনি বললেন, ‘আপনি কি আপনার মালিকানায় যা আছে তার চেয়ে বেশি কিছু চান?’ লোকটি বলল, ‘হ্যাঁ।’ তখন জুনাইদ বললেন, ‘এই সম্পদ আপনি নিয়ে যান, কারণ আমাদের চেয়ে আপনার এর প্রয়োজন বেশি।’ অর্থাৎ, তিনি ঐ ব্যক্তির সম্পদ গ্রহণ করলেন না।”১২

তাঁর এই নির্লোভ চরিত্র সবার জন্য এক বিরাট শিক্ষা।

কাশফ-শক্তি:

আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে তিনি প্রখর অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী ছিলেন। খায়ের বর্ণনা করেন, “একদিন আমি আমার ঘরে বসেছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, আবুল কাসিম জুনাইদ (রহ.) দরজার কাছে আছেন, তাই আমি তার দিকে যাওয়ার কথা চিন্তা করলাম। কিন্তু মুহূর্তেই মনে হলো এটা কেবল আমার কল্পনা বা ওয়াসওয়াসা। পর মুহূর্তে আবার মনে হলো, আমাকে দরজা খুলে বের হতে হবে। কিন্তু আমি আবারও এড়িয়ে গেলাম। তৃতীয়বার মনে হলো, এটা সত্য; কল্পনা নয়। উঠে গিয়ে দরজা খুলি। দেখি জুনাইদ (রহ.) দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আমাকে সালাম দিয়ে বললেন, “হে খায়ের, তুমি কেন প্রথমবারের ভাবনা অনুসরণ করে বের হওনি!”

আবু আমর ইবনে আলওয়ান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “একদিন আমি একটি প্রয়োজনে ‘আর-রাহবাহ’ বাজারে গেলাম। সেখানে একটি জানাজা দেখতে পেলাম, তাই নামাজ পড়া এবং লোকজনের সাথে মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা পর্যন্ত অপেক্ষা করার জন্য আমি সেই জানাজার সাথে চললাম। অনিচ্ছাকৃতভাবে আমার চোখ একজন বেপর্দা মহিলার ওপর পড়ল। এরপর আমি বারবার তার দিকে দেখতে লাগলাম। হুশ আসতেই আমি ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পড়লাম এবং আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমা চাইলাম। পরে আমি আমার বাড়িতে ফিরে এলাম। তখন একজন বৃদ্ধা আমাকে বললেন, ‘হে আমার কর্তা, কী হলো, আপনার চেহারা এমন কালো দেখছি কেন?’ আমি আয়না নিয়ে নিজের দিকে তাকালাম এবং দেখলাম যে আমার চেহারা সত্যিই কালো হয়ে গেছে। তখন আমি অন্তরের দিকে মনোযোগ দিলাম, এটি জানার জন্য যে, এই বিপদ কোথা থেকে এলো? তখন আমার সেই বেপর্দা মহিলার দিকে তাকানোর কথা মনে পড়ল। এরপর আমি একা একটি জায়গায় চল্লিশ দিন ধরে আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমা এবং মুক্তি চাইতে লাগলাম। একটা সময় মন আমাকে বলল যে, ‘তোমার পীর জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) এঁর সাথে দেখা করো।’ ফলে আমি বাগদাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। যখন আমি তাঁর হুজরার কাছে পৌঁছালাম এবং দরজায় টোকা দিলাম, তিনি ভেতর থেকে বললেন, ‘এসো হে আবু আমর, তুমি ‘আর-রাহবাহ’তে গুনাহ করো, আর আমি বাগদাদে তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করি!”১৩

এটি ছিল তাঁর মুরিদদের সংশোধনের এক অলৌকিক ও আধ্যাত্মিক পদ্ধতি।

তাঁর দোয়া:

তাঁর প্রার্থনাগুলো ছিল বিনয় ও সমর্পণের আধার। আলি ইবনে হারুন ইবনে মুহাম্মাদ বলেন, তিনি জুনায়েদ ইবনে মুহাম্মাদকে একটি দোয়া পাঠ করতে শুনেছেন। একবার একজন ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে দুর্দশা ও দারিদ্র্যের অভিযোগ করলে, তিনি তাকে এই দোয়া শিক্ষা দিয়ে বললেন, “বলো, হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে চাই কেবল সেই জিনিস যা শুধু আপনার জন্যই প্রযোজ্য এবং আমি আপনার অসন্তুষ্টি জন্মানো সব বিষয় থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি। হে আল্লাহ, আমি সেই পরিপূর্ণ স্বচ্ছতা চাই, যার মাধ্যমে আমি আপনার পক্ষ থেকে উচ্চ মর্যাদা লাভ করতে সক্ষম হই। হে আল্লাহ, আমাকে এমন কোনো ব্যস্ততায় আবদ্ধ করবেন না, যা আমাকে আপনার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, যদি না তা কেবল আপনার জন্য হয়। হে আল্লাহ, আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা আপনাকে এমনভাবে স্মরণ করে, যে স্মরণের মাধ্যমে তারা কেবল আপনার সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায়। হে আল্লাহ, আপনার দিকে আমার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হোক একমাত্র তা, যা আমি আপনার কাছ থেকে চাই। হে আল্লাহ, আমার অন্তরকে আপনার দ্বারা আনন্দে পূর্ণ করুন, আমার জিহ্বাকে আপনার জিকিরে সচল রাখুন এবং আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আপনার সন্তুষ্টিতে ব্যস্ত রাখুন। হে আল্লাহ, আমার অন্তর থেকে আপনার জিকির ছাড়া সব জিকির, আপনার ভালোবাসা ছাড়া সব ভালোবাসা, আপনার প্রীতি ছাড়া সব প্রীতি, আপনার সম্মান ছাড়া সব সম্মান, আপনার শ্রেষ্ঠত্ব ছাড়া সব শ্রেষ্ঠত্ব, আপনার প্রতি আশা ছাড়া সব আশা, আপনার ভয় ছাড়া সব ভয়, আপনার প্রতি আকাঙ্ক্ষা ছাড়া সব আকাঙ্ক্ষা, এবং আপনার কাছে চাওয়া ছাড়া সব চাওয়া মুছে দিন।

হে আল্লাহ, আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা আপনার জন্য দান করে, আপনার জন্য বিরত থাকে, আপনার সাহায্য চায়, কেবল আপনার দিকে আশ্রয় নেয়, আপনার দ্বারা গর্বিত হয়, আপনার জন্য ধৈর্য ধারণ করে এবং আপনার বিধানে সন্তুষ্ট থাকে। হে আল্লাহ, আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা শুধু আপনার দিকে লক্ষ্য করে, যার প্রত্যাবর্তনস্থল কেবল আপনার দিকে। হে আল্লাহ, আমার সন্তুষ্টি হোক সব পরীক্ষায় আপনার বিধানের সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে সংযুক্ত। হে আল্লাহ, আমার ধৈর্য হোক সেই ধৈর্যের মতো, যার জন্য আর কোনো ধৈর্য নেই, কেবল ধৈর্য পালনেই প্রতিষ্ঠিত। হে আল্লাহ, যারা আপনার শক্তিতে নির্ভরশীল, আমাকে তাদের মতো আপনার অসন্তুষ্টিকর কাজ থেকে বিরত থাকার ধৈর্য দিন। হে আল্লাহ, আমাকে তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা আপনার সাহায্য প্রার্থনা করে, যাঁরা আপনার শক্তিতে সমস্ত সৃষ্টি থেকে নির্বিঘ্ন। হে আল্লাহ, আমাকে তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন যারা আপনার নিকট আশ্রয় নেয়, যাঁদের আর কোনো আশ্রয় নেই।

হে আল্লাহ, যতদিন পর্যন্ত আপনি আমাকে জীবিত রাখবেন, ততদিন পর্যন্ত তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা আপনার সান্ত্বনা দ্বারা সান্ত্বনা পায় এবং আপনার ফয়সালায় ধৈর্য ধারণ করে। হে আল্লাহ, আমি যা কিছু প্রার্থনা করি, তা কেবল আপনারই আদেশ ও সন্তুষ্টির জন্য করি। তাই আমার প্রার্থনা হোক কেবল আপনার প্রিয় বিষয়ের জন্য, এবং আমাকে অন্তর্ভুক্ত করুন তাদের মধ্যে যারা আপনার অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট থাকে, কেবল পার্থিব স্বার্থের জন্য নয়।১৪

তাঁর এই দীর্ঘ দোয়াটি আধ্যাত্মিক জগতের এক অমূল্য পাথেয়।

ওয়াজ করার জন্য তাঁর প্রতি রসুলুল্লাহ ﷺ এঁর নির্দেশ:

তাঁর দাওয়াহ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল খোদ নবীজি ﷺ-এর ইঙ্গিতে। হজরত জুনাইদ বাগদাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “আমার মামা, সাররি আস-সাকত্বি রহমাতুল্লাহি আলাইহি আমাকে বললেন, “তুমি মানুষের সামনে (আধ্যাত্মিক বিষয়ে) বক্তব্য দেওয়া শুরু করো।” কিন্তু মানুষের সামনে কথা বলার ব্যাপারে আমার হৃদয়ে দ্বিধা ছিল, কারণ আমি নিজেকে এর যোগ্য মনে করতাম না। এরপর এক জুমার রাতে আমি স্বপ্নে রসুলুল্লাহ ﷺ-কে দেখলাম। তিনি আমাকে বললেন, “তুমি মানুষের সামনে বক্তব্য দেওয়া শুরু করো।”

ঘুম থেকে উঠে আমি ফজর হওয়ার আগেই সাররি আস-সাকত্বি রহমাতুল্লাহি আলাইহির দরজায় কড়া নাড়লাম। তিনি আমাকে বললেন, “তিনি (নবী ﷺ) তোমাকে না বলা পর্যন্ত তুমি আমাদের কথা বিশ্বাস করো না?” পরের দিন আমি জামে মসজিদে লোকজনের সামনে কথা বলা শুরু করলাম। মানুষের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ল যে, জুনাইদ বক্তব্য দিচ্ছেন। তখন ছদ্মবেশে একজন খ্রিষ্টান যুবক আমার সামনে এসে দাঁড়াল এবং বলল, “হে শায়খ, রসুলুল্লাহ ﷺ-এঁর এই কথা— ‘তোমরা মুমিনের অন্তর্দৃষ্টিকে ভয় করো, কারণ সে আল্লাহ্‌র নুর দ্বারা দেখে’র অর্থ কী?” আমি মাথা নিচু করলাম, এরপর মাথা তুলে বললাম, ‘আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন, কারণ আপনার ইসলাম গ্রহণের সময় এসে গেছে।’ তখন সেই যুবকটি ইসলাম গ্রহণ করল।”১৫

তাঁর প্রথম ওয়াজেই মানুষের হৃদয়ে সত্যের আলো প্রতিফলিত হয়েছিল।

তাসাউফ সম্পর্কে তাঁর ভাষ্য:

তিনি সুফিবাদকে এক সুসংগত রূপ প্রদান করেন। একদিন এক ধর্মতত্ত্ববিদকে (আল-মুতাকাল্লিমীন) বলা হয় যে তিনি ইবনে কুল্লাব ছিলেন— যদিও তা প্রমাণিত নয়। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, “আপনি বিভিন্ন গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করেছেন, তাদের মতের খণ্ডন করেছেন, কিন্তু সুফিদের কথা উল্লেখ করেননি।” তিনি শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “আমি তাদের সম্পর্কে কোনো জ্ঞান পাইনি, তাদের কথা শুনিনি, এমনকি যা তারা চেয়েছে, তা-ও আমি জানি না।” সেখানে উপস্থিত কেউ বলল, “না, বরং তাদেরই তো বলা যায় সম্মানিত ব্যক্তি।”

এরপর তাঁরা হজরত জুনাইদ বাগদাদি (রহ.)-এঁর কথা উল্লেখ করলেন। লোকেরা জুনাইদ বাগদাদির কাছে গিয়ে তাসাউফ বা সুফিবাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। জুনাইদ বাগদাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহি উত্তর দিলেন, “তাসাউফ হলো—

১. ‘ক্বাদিম’ অর্থাৎ চিরন্তন বা স্রষ্টাকে ‘হাদাস’ বা নতুন সৃষ্টি থেকে আলাদা করা, অর্থাৎ স্রষ্টাকে একত্ব বোঝা।

২. নিজের স্বদেশ বা পরিচিত স্থানের প্রতি আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসা।

৩. প্রিয় সম্পর্ক ও প্রিয় বস্তু থেকে দূরে থাকা।

৪. যা জানা আছে বা অজানা, সবকিছু ত্যাগ করা।

৫. বান্দা এমন হওয়া— যেন আল্লাহর কাছে যা আছে (দুনিয়া ও আখিরাতের নেয়ামত) সেসব চাওয়া বা পাওয়ার ব্যাপারে নির্লোভ হয়; বরং তার চাওয়া-পাওয়ার কেন্দ্রে যেন একমাত্র আল্লাহই থাকে।”

তিনি আরও বললেন, “যখন কেউ এমন হয়, তখন আল্লাহ তার জন্য জ্ঞান উন্মোচন, বিভিন্ন দিক থেকে ইবারাহ (বাক্য প্রকাশের ক্ষমতা), গোপন রহস্যের জ্ঞান এবং আত্মার ফিকহ লাভে সৌভাগ্য দান করেন।”

ধর্মতত্ত্ববিদ বললেন, “আল্লাহর কসম, এটি তো এক উৎকৃষ্ট জ্ঞান। আপনি যদি আবার এটি বলতেন, তবে আমরা তা লিখে রাখতাম।” জুনাইদ (রহ.) বললেন, “কখনোই না, এটি সেই স্থানে ফিরে গেছে যেখান থেকে এসেছিল।”

এরপর তিনি দীর্ঘ একটি বক্তব্য দিলেন, যা গভীর অর্থপূর্ণ ও শিক্ষণীয়।

ধর্মতত্ত্ববিদ অবশেষে বললেন, “যদি কেউ এমন ব্যক্তির কথা বলে, যে শুধু একটি বাক্য দিয়ে যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বিষয়কে খণ্ডন করতে পারে, তবে ইনিই সেই ব্যক্তি। কারণ, তার কথার বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি টিকে থাকতে পারে না।”

আবু মুহাম্মাদ আল-জারিরী বলেন, “আমি জুনাইদ বাগদাদি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, আমরা কথার বা কেবল বাচনের মাধ্যমে তাসাউফ শিখিনি; বরং শিখেছি ক্ষুধার মাধ্যমে, দুনিয়া ত্যাগের মাধ্যমে এবং পরিচিত সম্পর্ক বা স্বাচ্ছন্দ্যের বন্ধন ছিন্ন করার মাধ্যমে।”১৬

‘তাসাউফ’ নামটির বাস্তবতা:

নাসর ইবনে আবি নাসর আল-আত্তার বলেন, আমি আহমদ ইবনু আল-আলাকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি আবু বকর আল-মুলাআকিকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি জুনাইদ (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “তাসাউফ’ এমন একটি গুণ, যা একজন বান্দাকে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।” আমি বললাম, “হে আমার সাইয়্যিদ, এটি কি বান্দার গুণ, নাকি আল্লাহর গুণ?” তিনি বললেন, “বাস্তবতা হিসেবে এটি আল্লাহর গুণ, আর চিহ্ন ও রূপ (অভ্যাস ও প্রকাশ) হিসেবে এটি বান্দার গুণ।”১৭.

তাসাউফ যে রবের পক্ষ থেকে আসা এক মহান বৈশিষ্ট্য, তিনি তা স্পষ্ট করেন।

অলি হওয়ার জন্য আমলের অপরিহার্যতা:

তিনি শরীয়তের কঠোর অনুসারী ছিলেন। আবু আলি আর-রূযবারী (রহ.) বলেন, জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) এমন এক ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে কথা বলছিলেন, যে আল্লাহর মারিফত নিয়ে আলোচনা করছিল। সেই ব্যক্তি বলেছিল, “আল্লাহর মারিফত অর্জনকারীরা আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের জন্য এবং পুণ্যের পথে (শরিয়তের মাধ্যমে) পৌঁছানোর জন্য সমস্ত বাহ্যিক কাজ বা নড়াচড়া (শারীরিক ইবাদত) ত্যাগ করে।”

জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) তখন তীব্রভাবে প্রতিবাদ করে বললেন, “এটি সেই লোকদের কথা, যারা আমল (ইবাদত) অবহেলার কথা প্রচার করে। আমার কাছে এটি এক গুরুতর বিষয়। এমনকি যে চুরি করে বা ব্যভিচার করে, তার অবস্থাও এই ধরনের প্রবক্তার চেয়ে ভালো। কারণ, আল্লাহর মারিফতপ্রাপ্ত আরিফগণ তাদের সমস্ত আমল আল্লাহর কাছ থেকে গ্রহণ করেন এবং সবকিছু আল্লাহর উদ্দেশ্যে সম্পাদন করেন। আমি যদি এক হাজার বছরও বেঁচে থাকি তবু নেক আমল থেকে এক কণাও কমবে না, যদি না আমার এবং আমলের মধ্যে কোনো বাধা এসে পড়ে।”১৮

নির্বাচিত অলিদের মর্যাদা:

আলি ইবনে হারুন বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি জুনাইদ ইবনে মুহাম্মাদকে আবুল আব্বাস আদ-দীনওয়ারীকে লেখা তাঁর এক চিঠিতে পেয়েছি, “যে ব্যক্তিকে আল্লাহ তাঁর একনিষ্ঠ স্মরণের জন্য বিশুদ্ধ করেন এবং যার অন্তর আল্লাহর বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়, আল্লাহ তাকে নির্বাচিত, সম্মানিত এবং অবিচ্ছিন্ন অলি হিসেবে কবুল করে নেন। আল্লাহ তাকে নবীদের গভীর ও অলৌকিক জ্ঞান দান করেন, যা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হয়। তিনি তাকে নিকটবর্তী করেন, অতি উচ্চতায় উন্নীত করেন এবং গোপন আলাপ ও অন্তরঙ্গ আলোচনার মজলিসে দৃঢ় অবস্থানে স্থাপন করেন। তিনি তাকে তৈরি করেন আন্তরিক বন্ধুত্বের জন্য, মনোনয়ন ও আলোকিত পথে পরিচালনার জন্য। তাকে উন্নীত করেন চূড়ান্ত লক্ষ্য ও সর্বোচ্চ মর্যাদায় পৌঁছানোর জন্য। তার দৃষ্টি পৌঁছায়— সঠিক পথ ও হেদায়েতের স্থানসমূহে, পুণ্যবান ও খোদাভীরুদের স্তরে, মনোনীত ও অলিদের মর্যাদাপূর্ণ মনজিলে। ফলে তার জীবন সুসংগঠিত থাকে এবং ক্ষমতা তাকে ঘিরে রাখে।

সে আল্লাহর আদেশ ও সংবাদ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ও জ্ঞানী হয়, এবং শক্তি ও সমর্থনের মাধ্যমে সে আল্লাহর ইচ্ছা বাস্তবায়নে সমর্থ হন। সে অনুসন্ধানকারীদের জন্য পথপ্রদর্শক এবং তাদের কল্যাণ, উপকার ও সুবিধা অবিরামভাবে বহন করে।

যেসব ইমামদের প্রতিপালনের দায়িত্ব কোনো অলিকে প্রদান করা হয়েছে, তাদের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত থাকে। সেই অলিই তাদের পথপ্রদর্শক ইমাম, মহান দূত, সম্মানিত ও প্রভাবশালী নেতা, যাদের (অলিদের) আল্লাহ ধর্মের স্তম্ভ এবং পৃথিবীর ভিত্তি হিসেবে স্থাপন করেছেন।

আল্লাহ আমাদের এবং আপনাকে এই অলিদের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করুন, যেন আমরা তাঁদের মহিমার স্থানে পৌঁছাতে পারি। নিশ্চয়ই আমার রব নিকটবর্তী, শ্রবণকারী এবং সবকিছু জানেন।১৯

অলিদের প্রতি এই সম্মান প্রদর্শন তাঁর চারিত্রিক উচ্চতার প্রতীক।

আল্লাহর প্রকৃত অলির দিকে তাকানোর ফজিলত:

জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) বলেছেন, “যে কোনো আল্লাহর অলির দিকে তাকিয়ে তাকে সম্মান করল, আল্লাহ তাকে সমগ্র সৃষ্টির সামনে সম্মানিত করবেন।’২০

আধ্যাত্মিক সম্পর্কের এই বরকত তিনি উপলব্ধি করেছিলেন।

নবি ও অলিদের মুশাহাদা:

জাফর আল-খুলদি বলেন, “আমি স্বপ্নে জুনাইদ (রহ.)-কে দেখলাম। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘নবীদের কথা কি তাদের প্রত্যক্ষ (মুশাহাদা) অবস্থা থেকে ইঙ্গিতস্বরূপ নয়?’ তিনি হাসলেন এবং বললেন, “নবীদের কথা হলো নবুয়তের উপস্থিতি থেকে সরাসরি খবর, আর সিদ্দিকদের কথাবার্তা হলো মুশাহাদার ইঙ্গিত।” (অর্থাৎ নবীরা যা বলেন তা আল্লাহর সান্নিধ্যে প্রত্যক্ষ উপলব্ধ সত্যের সরাসরি বার্তা; আর অলিরা বলেন তাদের অন্তরের রুহানি অভিজ্ঞতার ইঙ্গিত।)২১

নবুওয়াত ও বেলায়েতের এই সূক্ষ্ম পার্থক্য তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

পৃথিবীতে আউলিয়ায়ে কেরামের প্রভাব:

আবুল হাসান আলি ইবনে হারুন ইবনে মুহাম্মাদ বলেছেন, তিনি জুনায়েদ ইবনে মুহাম্মাদকে বলতে শুনেছি, যখন তিনি তাঁর কিছু ভাইয়ের কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিতে তিনি বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তাঁর আউলিয়াদের থেকে পৃথিবীকে শূন্য রাখেন না এবং তাঁর প্রিয়জনদের থেকে এটিকে মুক্ত করেন না। যাতে তিনি তাদের মাধ্যমে পৃথিবীকে রক্ষা করেন, যাদের তিনি তাঁর সুরক্ষার কারণ বানিয়েছেন, এবং তাদের মাধ্যমে রক্ষা করেন, যাদের তিনি তার অস্তিত্বের নিদর্শন বানিয়েছেন।

আমি মহা দাতার কাছে তাঁর অনুগ্রহ ও দয়া প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাকে এবং আপনাকে তাঁর গোপন রহস্যের বিশ্বস্ত আমানতদাতা বানান, যারা তাঁর মহান আদেশ সংরক্ষণ করবে। এই সর্বোচ্চ পদমর্যাদা আমাদের জন্য সৌন্দর্য এবং সম্মান বৃদ্ধি করবে এবং দৃশ্যমান ও গোপন সবকিছুর ওপর আমাদের সম্মান প্রদান করবে। আমি দেখেছি যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর জমিনের বিস্তৃত অঞ্চল এবং রাজত্বের প্রশস্ততা আউলিয়া এবং জ্ঞানীদের দ্বারা সজ্জিত করেছেন। তাঁরা এমন আলো, যার নুর উজ্জ্বলভাবে ছড়ায় এবং আরেফিনদের হৃদয়ে উদিত হয়।

তাঁরা নক্ষত্র, সূর্য ও চাঁদের আলোতে দীপ্তিময় আকাশের চেয়েও সুন্দর অলঙ্কার। তাঁরা আল্লাহর হেদায়েতের পথের জন্য চিহ্ন, এবং তাঁর আনুগত্যের দিকে অভিযাত্রীদের বাস্তব পথ প্রদর্শক। তাঁরা আল্লাহর পথে অনুগামী হওয়ার জন্য সচেষ্টদের পথসমূহে আলোর বাতিঘরের মতো।

তাঁরা সৃষ্টির কল্যাণে এবং মানবজাতিকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে নক্ষত্রপুঞ্জের চেয়েও স্পষ্ট ও উত্তম প্রভাব রাখেন; যা স্থল ও সমুদ্রের অন্ধকারে পথ নির্দেশ করে এবং যার চিহ্ন অনুসরণ করে পথ হারানো অবস্থায় পথ জানা যায়। কারণ, নক্ষত্রপুঞ্জের নির্দেশিকা দ্বারা ধন-সম্পদ ও শরীর রক্ষা পায়, আর আলেমদের নির্দেশিকা দ্বারা দ্বীনের নিরাপত্তা আসে। যে ব্যক্তি তাঁর দ্বীনের নিরাপত্তা লাভে সফল হয়, আর যে ব্যক্তি তাঁর দুনিয়া ও দেহের নিরাপত্তা লাভে সফল হয়, তাদের মধ্যে কতই না পার্থক্য!”২২

পৃথিবী যে অলিদের উসিলায় ধন্য হয়, তা এখানে ফুটে উঠেছে।

তাওহিদের প্রকৃত রূপ:

ইমাম হাফিজ আবু নুয়াইম আল ইস্পাহানী বলেন, আমি বাগদাদে তিনশত ঊনষাট হিজরিতে আবুল আব্বাস ইবনে আত্তারের সাথী, সুফি সমালোচক আবুল হুসাইন মুহাম্মদ ইবনে আলি ইবনু হুবাইশের নিকট তাঁর গ্রন্থ থেকে পাঠ করেছি এবং তিনি আমার পাঠকে অনুমোদন করেছেন। আমি বললাম, আমি আবুল কাসিম জুনাইদ ইবনে মুহাম্মদকে বলতে শুনেছি, “হিকমতের ভিত্তি ও প্রথম প্রয়োজন হলো— সৃষ্ট মানুষকে তার স্রষ্টার পরিচয় করানো। নবসৃষ্ট জিনিস কীভাবে সৃষ্টি হলো? তার প্রথম অবস্থা কী? মৃত্যুর পর আবার তাকে কীভাবে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে?

এভাবে সে সৃষ্টি এবং স্রষ্টার বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য জানতে পারে; চিরন্তন সত্তা আর সৃষ্ট সত্তার পার্থক্য বুঝতে পারে। ফলে বান্দা তার রবকে চেনে; সৃষ্ট বস্তু তার নির্মাতাকে চেনে; দুর্বল দাস তার মহান মালিককে চেনে। তখন সে তাঁর ইবাদত করে, একত্ব ঘোষণা করে, মহিমান্বিত মনে করে, তাঁর আহ্বানের সামনে বিনয়শীল হয় এবং তাঁর আনুগত্য যে অবশ্য কর্তব্য, তা স্বীকার করে। কারণ, যে ব্যক্তি তার মালিককে চিনে না, সে মালিকানার হক আদায়ও করতে পারে না; এবং সৃষ্টি-পরিচালনার বিষয়কে তার প্রকৃত অভিভাবকের দিকে সমর্পণ করতে পারে না।” তাওহিদের এই গভীর তত্ত্ব তাঁর ভাষণে মূর্ত হয়ে উঠত।

এরপর জুনাইদ (রহ.) বলেন, “তাওহিদ হলো— তোমার জ্ঞান ও স্বীকারোক্তি যে, আল্লাহ তাঁর প্রথমত্বে ও শেষহীনতায় একক, তাঁর সাথে দ্বিতীয় কেউ নেই; তাঁর কাজের মতো কোনো কাজ আর কেউ করতে পারে না। তিনিই সেই সত্তা, যিনি ছাড়া আর কেউ লাভ-ক্ষতি করতে পারে না, কেউ কিছু দিতে বা বারণ করতে পারে না; কেউ অসুস্থ করতে বা আরোগ্য দিতে পারে না; কেউ উচ্চে তুলে কিংবা নিচে নামাতে পারে না; কেউ সৃষ্টি করতে বা রিজিক দিতে পারে না; কেউ মৃত্যু বা জীবন দিতে পারে না; কেউ স্থির বা গতিশীল করতে পারে না। অর্থাৎ, হাকিকতের ক্ষমতা মহান আল্লাহ ছাড়া আর কারোর নয়।”

তিনি বলেন, “একজন আলেমকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘তাওহিদ ও আমাদের জ্ঞানের মাঝে পার্থক্য কী?’ তিনি বললেন, ‘ইয়াকীন।’ জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘ইয়াকিন কীভাবে?’ তিনি বললেন, ‘তুমি এই জ্ঞান অর্জন করবে যে, সমস্ত সৃষ্টির চলাফেরা ও স্থিরতা আল্লাহরই কাজ, তাঁর সাথে কোনো শরিক নেই। যখন তুমি এ বিশ্বাসে স্থির হবে, তখনই তুমি তাওহিদ প্রতিষ্ঠা করলে। অর্থাৎ তুমি আল্লাহকে তাঁর কর্মে একক জ্ঞানে মানলে; কারণ কেউ তাঁর কাজের মতো কাজ করতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে ইয়াকিন হলো সম্পূর্ণ ও বিশুদ্ধ তাওহিদের নাম। আর তাওহিদ যখন পূর্ণ হয়—তখন ভালোবাসা, তাওয়াক্কুলও পূর্ণতা পায় এবং তাকে ‘ইয়াকিন’ বলা হয়। তাওয়াক্কুল হলো হৃদয়ের কাজ আর তাওহিদ হলো জিহ্বার কথা। যখন হৃদয় তাওহিদকে জানে এবং তার ওপর কাজ করে—তখন তাওহিদ পূর্ণতা পায়।”

আরও বলা হয়েছে, “তাওয়াক্কুল হলো তাওহিদের শৃঙ্খলা বা মূল ব্যবস্থাপনা। যখন বান্দা জানার পর সেই অনুযায়ী আমল করে, তখন তার মধ্যে ভালোবাসা, তাওয়াক্কুল ও ইয়াকিন সবই পূর্ণ হয়; তার ইমান পরিপূর্ণ হয় এবং তার ফরজগুলো বিশুদ্ধ হয়। কারণ তুমি যদি জানো যে, আল্লাহর কাজ তিনি ছাড়া আর কেউ করতে পারে না, তারপরও তুমি অন্যকে ভয় করো বা তার আশা করো; তবে তুমি সঠিক পথে চলোনি। তুমি যদি সত্যিই তোমার জ্ঞান অনুযায়ী আমল করতে, তবে কেবল আল্লাহকেই ভয় করতে এবং একমাত্র আল্লাহকেই আশা করতে। কেননা তুমি জেনেছ— তাঁর কাজ তিনি ছাড়া আর কেউ করতে পারে না।”

তিনি বলেন, “যে ব্যক্তির হৃদয়ের জ্ঞান দুর্বল হয়ে পড়ে, সে তাওহিদে অপূর্ণ থাকে। কারণ তার হৃদয় ব্যস্ত থাকে ‘ফিতনা’য়; যা তাওহিদের ক্ষতি সাধনকারী।”

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “ফিতনা কী?” তিনি বললেন, “তোমার এমন ধারণা করা যে, আল্লাহর কাজ অন্য কেউ করতে পারে। এই ধারণার নামই ফিতনা। আর এই ফিতনাই সূক্ষ্ম শিরক।” আমি বললাম, “ফিতনা কি হৃদয়ের কোনো কাজ?” তিনি বললেন, “না; এটি হৃদয়ে প্রবেশ করে তাকে নষ্ট করে।’’ আমি বললাম, “তা হলে ফিতনা কী?” তিনি বললেন, “তোমার আল্লাহ সম্পর্কে ভুল ধারণা, যেখানে তুমি মনে করো যে, অন্য কেউ আল্লাহর কাজ করতে সক্ষম। এ নিয়ে আলোচনা দীর্ঘ, তবে যিনি বোঝেন, তার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট।”২৩

ঈমান ও তাওহিদের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন।

ঈমানের প্রকৃত রূপ:

আহমাদ ইবনে হানী বর্ণনা করেছেন, তিনি জুনাইদ ইবনে মুহাম্মাদকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ইমান কী?’ জুনাইদ (রহ.) উত্তর দিলেন, “ইমান হলো সত্যায়ন এবং সুদৃঢ় প্রত্যয়; যা চোখের সামনে নেই তার প্রতি জ্ঞানের বাস্তবতা। কারণ, যিনি আমাকে অদৃশ্য বিষয়ে খবর দেন, যদি তিনি সত্যবাদী হন এবং তাঁর সত্যায়নে আমার কোনো সংশয় না থাকে, তবে আমার পক্ষে তাঁকে সত্যায়ন করা অপরিহার্য। যদি তাঁর জানানো বিষয়টি আমার কাছে জ্ঞানের দ্বারা প্রমাণিত হয়, তাহলে আমি যেন তা চাক্ষুষ দেখছি; এভাবেই ঈমানের সত্যায়নের শক্তি গঠিত হয়।” তিনি আরও ব্যাখ্যা করলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘তুমি আল্লাহর ইবাদত করো যেন তুমি তাঁকে দেখছো, আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে জানো যে তিনি তোমাকে দেখছেন।’ জুনাইদ বাগদাদি বলেন, এই দুই অবস্থার মধ্যে প্রথমটি শক্তিশালী। কারণ, এটি অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস ও বাস্তব জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে। যদিও দ্বিতীয়টির মধ্যেও সত্যায়ন রয়েছে, প্রথমটি অধিক শক্তিশালী এবং উত্তম।” ঈমানের এই সংজ্ঞাই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি জোগাত।

অতঃপর আহমাদ ইবনে হানী জিজ্ঞেস করেছিলেন, ইমানের চিহ্ন সম্পর্কে। জুনাইদ বাগদাদি উত্তর দিলেন, “ঈমানের চিহ্ন হলো— যাকে তুমি বিশ্বাস করেছো, তাঁর প্রতি আনুগত্য করা; তিনি যা ভালোবাসেন এবং যাতে সন্তুষ্ট হন, সে অনুযায়ী কাজ করা; এবং তাঁর কাছ থেকে এমন কোনো বিষয়ে ব্যস্ত না থাকা, যা শেষ হয়ে যায়। বরং সব মনোযোগ তাঁকেই দেওয়া, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা চেষ্টা করা। এর অর্থ, ঈমানের বৈশিষ্ট্য হলো— তিনি যেন আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় ও গোপন বিষয়ের অধিকারী হন, আমি তাঁর আদেশ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করি। তখন আল্লাহর প্রতি আনুগত্য সমন্বিত হয়, সমস্ত অপ্রয়োজনীয় ইচ্ছা ত্যাগ করা যায়, শত্রুপ্রণোদনা এড়ানো যায়, দুনিয়ার প্রতি আসক্তি কমে এবং যে অধিক যোগ্য, তাঁর প্রতি মনোযোগী হওয়া যায়।”

আহমাদ আরও জিজ্ঞেস করলেন, “ইমান কী?” জুনাইদ (রহ.) বলেন, “এই প্রশ্নটি আদি দিক থেকে সঠিক নয়, কারণ এটি কোনো নতুন জ্ঞান প্রদর্শন করে না। প্রকৃত ইমান হলো আল্লাহর প্রতি নির্ভেজাল বিশ্বাস, তাঁর প্রশংসা এবং হৃদয়ে এককভাবে অবস্থান করা। ইমান হলো আল্লাহর প্রতি অন্তরে জ্ঞানের দৃঢ়তা এবং আসমান ও জমিনের সমস্ত বিষয়ের প্রতি সত্যায়ন করা, যা সম্পর্কে তিনি জানিয়েছেন। যদিও তা আমরা চোখে দেখি না। সত্য হলো হৃদয়ের কাজ এবং সুদৃঢ় প্রত্যয় হলো সেই জ্ঞান, যা আমাদের অন্তরে স্থির হয়েছে। ইমান ও সত্যায়ন একে অপরকে সমর্থন করে। যদি আমরা ইমানের জন্য ইমান বা সত্যায়নের জন্য সত্যায়ন ধরি, তবে তা সীমাহীনভাবে বৃদ্ধি পেতে পারত। এ সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা ইমান ও সত্যায়নের মূল বিষয়কে সংক্ষেপে তুলে ধরে।”২৪

মারিফতের স্বরূপ উন্মোচন:

মারিফত বা পরিচয় লাভ ছিল তাঁর জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। আমি (ইমাম হাফেজ আবু নুয়াইম আল ইস্পাহানী) মুহাম্মাদ ইবনু আলী ইবনু হুবাইশের কাছে এই বক্তব্য পাঠ করে বললাম, আমি আবুল কাসিম জুনাইদ ইবনে মুহাম্মদকে বলতে শুনেছি— “আমাকে মারিফত ও তার উপায়সমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। বাস্তবে মারিফত বিশেষ লোকের হোক বা সাধারণ মানুষের— মূলত বিষয় একটাই; কারণ যার মারিফত অর্জন করা হয়, তিনি আল্লাহ এবং তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তবে মারিফতের একটি শুরু আছে এবং একটি উচ্চতম স্তর আছে। বিশেষ আল্লাহওয়ালারা এর শীর্ষস্থানে থাকেন, যদিও তারা এর শেষ সীমায় পৌঁছাতে পারেন না; কেননা আল্লাহর পরিচয়ের কোনো শেষ নেই।

কীভাবে সেই সত্তাকে সম্পূর্ণরূপে জানা সম্ভব, যাকে চিন্তা-চেতণা ধারণ করতে পারে না, বুদ্ধি পরিবেষ্টন করতে পারে না, কল্পনা স্পর্শ করতে পারে না এবং দৃষ্টিও যার সত্তাকে বর্ণনা করতে পারে না। বরং আল্লাহর সর্বাধিক জ্ঞানী বান্দারাই তাঁর মহত্ত্ব ও সত্তার পূর্ণ উপলব্ধিতে নিজেদের অক্ষমতা সবচেয়ে বেশি স্বীকার করে; কারণ তাঁরা জানে, যাঁর তুলনা কিছুই নেই, তাঁকে সম্পূর্ণরূপে জানা কোনো সৃষ্টি বা মানুষের সাধ্যের বিষয় নয়।

আল্লাহ চিরন্তন, তাঁর বাইরে সবকিছু সৃষ্ট। তিনি অনাদি, অন্যসব তাঁর পরে। তিনি ইলাহ; বাকি সব সৃষ্টি তাঁর ইবাদতকারী। তিনি শক্তিশালী, কিন্তু কেউ তাঁকে শক্তি দেয়নি; বরং প্রতিটি শক্তিমান তাঁরই শক্তিতে শক্তিমান। তিনি জ্ঞানী, কিন্তু তিনি কারও নিকট থেকে জ্ঞান গ্রহণ করেননি; বরং প্রতিটি জ্ঞানী তাঁরই দানে জ্ঞানী। তিনি হলেন সেই সত্তা যিনি শুরুহীন এবং যাঁর শেষ নেই। এই মর্যাদা তাঁর বাইরে আর কারও উপযুক্ত নয়।

তাই আল্লাহর অলিরা মারিফতের সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করলেও কখনোই এর চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছাতে পারে না। আর সাধারণ মুমিন মারিফতের প্রথম স্তরে থাকে। মারিফতের উঁচু ও নিচু স্তরের প্রমাণ বা চিহ্নও আল্লাহর আরিফ ও আলেমগণ উল্লেখ করেছেন। নিম্নস্তরের চিহ্ন হলো—আল্লাহর একত্বে দৃঢ় বিশ্বাস, তাঁর বাইরে সব মিথ্যা উপাস্যকে অস্বীকার করা, আল্লাহ ও তাঁর কিতাবকে সত্য বলে মানা এবং তাঁর ফরজ ও নিষেধসমূহকে গ্রহণ করা।

আর মারিফতের সর্বোচ্চ স্তরের চিহ্ন হলো— আল্লাহর হক আদায় করা, প্রতি মুহূর্তে আল্লাহর ভয় বা সচেতনভাবে তাঁর দিকে মনোনিবেশ বজায় রাখা, তাঁর সৃষ্টির প্রতি সদয় হওয়া, উচ্চ চরিত্র অনুসরণ করা এবং এমন সব বিষয় বর্জন করা, যা আল্লাহর নৈকট্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এই মারিফতই মানুষকে প্রকৃত মানবিকতা দান করে।

মারিফতের সেই মহিমাই বিশেষ আল্লাহওয়ালাদের সাধারণ মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছে। তাদের হৃদয়ে আল্লাহর মর্যাদার গভীর উপলব্ধি, তাঁর মহত্ত্ব, অগাধ ক্ষমতা, সীমাহীন জ্ঞান, উদারতা, করুণা ও অগণিত নিয়ামতের অনুভব এত শক্তিশালী হয় যে, আল্লাহর জালাল, সুমহান মর্যাদা, তাঁর শাস্তির কঠোরতা, তাঁর পুরস্কারের মহত্ত্ব, তাঁর অনুগ্রহ ও দয়ার প্রভাব হৃদয়ে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে।

এই মারিফত যতই শক্তিশালী হয়, তাদের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ততই শ্রদ্ধা বাড়ে। তারা তাঁকে সম্মান করে, ভয় করে, ভালোবাসে, তাঁর সামনে লজ্জা অনুভব করে, তাঁর রহমতের আশা করে এবং তাঁর হক পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। তখন তারা তাঁর নিষিদ্ধ সবকিছুর থেকে দূরে থাকে, হৃদয় ও শরীর দিয়ে তাঁর প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য দেখায়। তাদের হৃদয়ে যে আল্লাহর মহিমার গভীর উপলব্ধি স্থির হয়; সেটিই তাদের সর্বদা আল্লাহর পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

এই শ্রেণির মানুষদেরই বলা হয়— অমুক ব্যক্তি আল্লাহর আরিফ, অমুক ব্যক্তি আল্লাহর আলেম। কারণ তাদের চরিত্রে দেখা যায়— শ্রদ্ধা, ভয়, আশা, আকুলতা, পরহেজগারি, কান্না, বিনয়, আত্মসমর্পণ, আল্লাহর প্রতি আকাঙ্ক্ষা এবং পূর্ণ নিষ্ঠা। এসব গুণ যখন মানুষের সামনে প্রকাশ পায়, তখন সবাই বুঝে যায়— এরা সাধারণ মানুষের তুলনায় আল্লাহকে অনেক বেশি চেনে এবং তাঁর ব্যাপারে বেশি জ্ঞানী। কুরআনেও বলা হয়েছে— “বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে সত্যিকার অর্থে ভয় করে।”

দাউদ (আ.) বলেছেন, “হে আল্লাহ, যে আপনাকে ভয় করেনি, সে আসলে আপনাকে চিনেইনি।”

যখন এই মারিফত হৃদয়ে স্থায়ী হয় এবং শক্তিশালী হয়, তখন তা পরিণত হয় দৃঢ় ইয়াকিনে। তখন মানুষের চরিত্র পরিপূর্ণ হয়, তার মন কলুষমুক্ত হয়, হৃদয় পরিশুদ্ধ হয়। সে সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা করে, আল্লাহ কীভাবে সৃষ্টি করলেন, কীভাবে অপূর্বভাবে তাদের গঠন করলেন, তাকদির নির্ধারণ করলেন এবং কীভাবে তাঁর ইচ্ছামতো প্রতিটি বিষয় পরিচালনা করছেন। কিছুই তাঁর ইচ্ছার বাইরে যেতে পারে না।

এ কারণেই বলা হয়— আল্লাহর শক্তি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে হৃদয়ে আল্লাহর মহিমা ও হায়বতের দরজা খুলে যায়। মালিক ইবন দিনারের সঙ্গে এক জ্ঞানী ব্যক্তিকে কেউ দেখেছিল। মালিক তাকে বললেন, “আমাকে নসিহত করুন।” তিনি জবাব দিলেন, “আমি তোমাকে কী নসিহত করব? যদি তুমি আল্লাহকে সত্যিকার অর্থে চিনতে তবে অন্য কোনো কথা তোমার প্রয়োজন হতো না।”

মানুষ রাত-দিনের পরিবর্তন, আকাশের বিশাল ছাদ, তারকার আবর্তন, নদী-সমুদ্রের প্রবাহ দেখে বুঝে যায়— এগুলোর একটি সৃষ্টিকর্তা, পরিচালক ও নিয়ন্ত্রক আছেন; যিনি তাঁর বান্দাদের কাজের কোনো ক্ষুদ্রতম অংশ থেকেও অজ্ঞ নন; এসব নিদর্শন তাদের আল্লাহর ইবাদতে এমনভাবে মনোযোগী করে; যেন তারা তাঁকে সরাসরি দেখছে, যদিও আল্লাহ দৃষ্টির ঊর্ধ্বে। এই মহাজাগতিক দর্শনই তাঁকে এক অনন্য সাধকে পরিণত করেছিল।

এ থেকে বোঝা যায় যারা এভাবে চিন্তা করে, তারা আল্লাহর মহিমা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞাত এবং সবচেয়ে বেশি আরিফ; কারণ তাদের হৃদয় আল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা, সুমহান মর্যাদা ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।”২৫

আরিফ কে?

হজরত জুনাইদ বাগদাদি (রহ.)-এর মতে ‘আরিফ’ হলেন সেই উচ্চতর চেতনার অধিকারী মানুষ, যাঁর নীরবতাও কথা বলে। মুহাম্মদ ইবনুল হাসান আল-বাগদাদি বলেন, আমি শুনেছি, জুনাইদ (রহ.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আরিফ কে?’ তিনি উত্তরে বলেন, “আরিফ হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি তোমার অন্তরের গোপন কথাগুলো প্রকাশ করেন, যখন তুমি নিজে নীরব থাকো।” আরিফদের গভীরতা কতটুকু হতে পারে, তা তাঁর পরবর্তী কথায় আরও স্পষ্ট হয়। আবুল হাসান আল-ফারসি বলেন, আমি আবু ইসহাক আদ-দিনাওরীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, জুনাইদ (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, “আরিফ কারা?” তিনি উত্তর দিলেন, “যাকে তার দৃষ্টি বন্দি করতে পারে না, আর যাকে তার বক্তব্যও বন্দি করতে পারে না।” (অর্থাৎ তার দৃষ্টি বা কথা তাকে নিজের দিকে টেনে রাখে না; বরং তার হৃদয় সর্বদা আল্লাহমুখী থাকে)।২৬

আরিফদের প্রকৃত প্রয়োজন:

মারেফত অর্জনের পরও একজন আরিফের অন্তরে বিনয় ও আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতা আরও বৃদ্ধি পায়। হুসাইন ইবনে ইয়াহিয়া বলেন, আমি জাফরকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি জুনাইদ (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “আরিফদের প্রকৃত দরকার হলো আল্লাহর রক্ষা ও পাহারা।” অতঃপর তিনি (জুনাইদ) আল্লাহর বাণী পড়লেন— ﴿قُلْ مَنْ يَكْلَؤُكُمْ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ مِنَ الرَّحْمَـٰনِ﴾ “বলুন, রাত-দিনে কে তোমাদের রহমানের (আল্লাহর) হাত থেকে রক্ষা করবে?” (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৪২)।২৭

এর মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছিলেন যে, আল্লাহর সুরক্ষা ছাড়া কোনো মাকামই নিরাপদ নয়।

দুনিয়াতে আরিফদের জীবনযাত্রা:

আরিফগণের জীবনযাপন কেবল বাহ্যিক ত্যাগ নয়, বরং এটি হৃদয়ের এক মহান বিপ্লব। আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ ইবনে ইয়াকুব বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমি আবুল কাসিম জুনাইদ ইবনে মুহাম্মাদকে বলতে শুনেছি, “আল্লাহর কিছু বান্দা আছেন, যারা দুনিয়ার সঙ্গে তাদের শরীর দিয়ে সম্পর্ক রাখেন, কিন্তু দৃঢ় ইমান ও প্রতিজ্ঞার মাধ্যমে তা ত্যাগ করেছেন। তাদের ইয়াকিনের জ্ঞান তাদের সেই পরিণতির উপর প্রকাশ পায়, যার দিকে তারা প্রত্যাবর্তন করবে, যেখানে তারা অবস্থান করবে এবং যার প্রতি তারা ফিরে যাবে।

তারা পালিয়েছেন সেই আত্মাদের থেকে, যারা মন্দের আদেশ দেয়, ধ্বংসের দিকে আহ্বান করে, শত্রুদের সহায়তা করে, প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, বিপদে নিমজ্জিত থাকে এবং খারাপের কোলে আশ্রয় নেয়। তারা গ্রহণ করেছেন সেই সুদৃঢ় কিতাবের আহ্বান, যা কোনো ব্যাখ্যার সুযোগ রাখে না, যখন তারা শুনলেন— يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلরَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ “হে মুমিনগণ, আল্লাহ ও তাঁর রসুল যখন তোমাদের আহ্বান করেন সেই উদ্দেশ্যে, যা তোমাদের জীবিত করবে, তখন তাড়াতাড়ি সাড়া দাও।” (সুরা আল-আনফাল, আয়াত: ২৪)।

এই আহ্বানের মাধুর্য তাদের হৃদয়ে আঘাত করল, যেন তারা পার্থক্য করতে পারে— তারা সেই পবিত্র আত্মার নিঃশ্বাস অনুভব করল, যা ঘরের ভালোবাসার অপবিত্রতা থেকে মুক্তি দিয়ে অন্তর্যামী উপলব্ধি দ্বারা তাদের কাছে পৌঁছায়। ফলে তারা দ্রুত সব বাধা দূর করল, যা মুরাকিবদের (আল্লাহকে যারা পর্যবেক্ষণ করে) হৃদয়কে ব্যস্ত রাখে। তারা মনকে উৎসাহিত করল আমলকে আলিঙ্গন করার জন্য, কষ্টের তিক্ততা স্বীকার করল, আল্লাহর সঙ্গে লেনদেনে সত্যবাদী হলো, এবং যে পথে মনোনিবেশ করল সেখানে সুন্দর আদব বজায় রাখল। বিপদ তাদের কাছে ক্ষুদ্র মনে হলো, তারা যা চায়, তার মর্যাদা বুঝল। তারা সময় ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নিরাপত্তা লাভ করল।

তারা আত্মার বাসনাকে নির্মূল করল এবং তাদের চিন্তাকে তাদের অভিভাবক (ওয়ালী) ছাড়া অন্য কিছুর দিকে মনোযোগী হতে দেয়নি। তারা হৃদয়কে গাফলতের পথে উঁকি দেওয়া থেকে রক্ষা করল এবং তাদের উপর একজন পর্যবেক্ষক স্থাপন করল, যিনি এমন জ্ঞানশক্তির অধিকারী, যার কাছে স্থল বা সমুদ্রের কোনো কণিকাও লুকানো নেই, যিনি সবকিছুকে জ্ঞান দ্বারা আবৃত করেছেন এবং সবকিছুর খবর রাখেন। অবশেষে, সেই অবাধ্য নফসগুলো বশীভূত হলো এবং সমমনা অন্যান্যদের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে (আল্লাহর পথে) এগিয়ে চলল। এই সেই নফস, যা পরিচালনা করেছেন স্বয়ং তাদের অভিভাবক (আল্লাহ), যার সুরক্ষা দিয়েছেন তাদের স্রষ্টা এবং যার দায়িত্ব নিয়েছেন স্বয়ং বিধানদাতা।

হে আমার ভাই, যদি তুমি দূরদর্শী হও, তবে কল্পনা করো, যখন তারা তাদের গোপন আলাপে থাকে, তখন তাদের উপর কী ঘটে এবং তাদের প্রয়োজনের মুহূর্তে তারা কীসের সম্মুখীন হয়। তুমি দেখবে, আত্মাগুলো এমন দেহে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা ভয়ে শুকিয়ে গেছে, সেবায় বিনয়ী হয়েছে, লজ্জায় আবৃত হয়েছে, নৈকট্য দ্বারা একত্রিত হয়েছে, গম্ভীরতা দ্বারা স্থিতিশীল হয়েছে এবং সতর্কতার দ্বারা আলোকিত হয়েছে। তাদের অন্তরঙ্গতা হলো নির্জনতা, তাদের আলোচনা হলো চিন্তা এবং তাদের পোশাক হলো জিকির (আল্লাহর স্মরণ)। আল্লাহর সঙ্গে তাদের ব্যস্ততা অবিচ্ছিন্ন আর তিনি ছাড়া অন্য সবকিছুর থেকে বিচ্ছিন্ন। তারা কোনো আগন্তুককে স্বাগত জানায় না, আর কোনো প্রস্থানকারীকে বিদায় জানায় না।

তাদের খাদ্য হলো ক্ষুধা ও তৃষ্ণা, বিশ্রাম হলো তাওয়াক্কুল (নির্ভরতা), ধন হলো আল্লাহর ওপর আস্থা, হাতিয়ার হলো ভরসা, ঔষধ হলো ধৈর্য এবং সঙ্গী হলো সন্তুষ্টি (রিদা)। এই আত্মাগুলোকে হক আদায়ের জন্য অগ্রগামী করা হয়েছে, সংরক্ষিত মূল্যবান জ্ঞানের দিকে উন্নীত করা হয়েছে এবং কঠিন পরীক্ষার ভার থেকে মুক্ত করা হয়েছে। তারা ভয় পায় না, কারণ বলা হয়েছে— لَا يَحْزُنُهُمُ الْفَزَعُ الْأَكْبَرُ وَتَتَلَقَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ هَذَا يَوْمُكُمُ الَّذِي কُنْتُمْ تُوعَدُونَ “মহাবিপদ তাদের চিন্তিত করবে না এবং ফেরেশতারা তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, এটি তোমাদের সেই দিন, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছিল।” (সুরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৩)। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন— نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنْفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ نُزُلًا مِنْ غَفُورٍ رَحِيمٍ “আমরা ইহকাল ও পরকালে তোমাদের বন্ধু, যা তোমাদের মন চাইবে এবং যা তোমরা দাবি করবে, তা তোমাদের জন্য রয়েছে, এটি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালুর আতিথেয়তা।” (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৩১-৩২)।২৮

আরিফদের এই মহান জীবনচরিত্রই মুমিনদের জন্য প্রকৃত আদর্শ।

আল্লাহর পথে পৌঁছানোর রাস্তা:

আল্লাহর পথের অভিযাত্রীদের জন্য তিনি অত্যন্ত কার্যকরী নির্দেশিকা প্রদান করেছেন। একজন লোক হজরত জুনাইদ বাগদাদি (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করল, ‘আল্লাহ্‌র পথে পৌঁছানোর রাস্তা কেমন?’ তিনি বললেন, “এমন তওবা; যা পাপের জেদ বা পুনরাবৃত্তির আকাঙ্ক্ষাকে ছিন্ন করে দেয়; এমন ভয় যা উদাসীনতা দূর করে; এমন আশা যা কল্যাণের পথে দ্রুত চালিত করে এবং হৃদয়ের প্রতিটি চিন্তায় আল্লাহ্‌র নিরীক্ষণ (মুরাকাবা) বজায় রাখা।”২৯

আল্লাহ ছাড়া অন্যকিছুর প্রতি নির্ভরশীল হওয়ার পরিণতি:

সতর্ককারী হিসেবেও জুনাইদ বাগদাদি (রহ.) ছিলেন অতুলনীয়। আবুল হাসান বলেন, আমি জাফরকে বলতে শুনেছি, “জুনাইদ (রহ.) তার কিছু ভাইদের উদ্দেশে লিখেছিলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করে কিন্তু অন্তরে দুনিয়ার অন্যকিছুর ওপর নির্ভর করে; আল্লাহ তাকে পরীক্ষায় ফেলেন এবং তাঁর স্মরণ তার হৃদয় থেকে আড়াল করে দেন; যদিও জবান তার স্মরণে ব্যস্ত থাকে। যদি সে জেগে ওঠে এবং যাদের ওপর ভরসা করছিল তাদের থেকে সম্পূর্ণ সরে আসে, আল্লাহ তার সব বিপদ ও দুঃখ দূর করে দেন। কিন্তু যদি সে সেই ভরসায় টিকে থাকে, আল্লাহ মানুষের হৃদয় থেকে তার প্রতি দয়া তুলে নেন, তার উপর লোভের পোশাক পরিয়ে দেন; ফলে মানুষ তার কাছে ক্রমেই আরও কিছু চাইতে থাকে, কিন্তু তাদের হৃদয়ে তার জন্য কোনো দয়া থাকে না। এভাবে তার জীবন হয়ে দাঁড়ায় অক্ষমতায় পূর্ণ, মৃত্যু হয় দুঃখে ভরা, আর পরিণতি— পরম হতাশায়। আর আমরা আল্লাহর কাছে আল্লাহ ছাড়া অন্যের ওপর নির্ভর করা থেকে আশ্রয় চাই।”৩০

প্রকৃত স্বাধীনতা ও দাসত্ব:

স্বাধীনতার এক চমৎকার সংজ্ঞা তিনি প্রদান করেছেন, যা সুফি দর্শনের মূল কথা। আবু বকর আর-রাযী বলেন, আমি আবু আমর আল-আনমাতীকে বলতে শুনেছি, আমি জুনাইদ (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “তুমি কখনোই তাঁর (আল্লাহর) প্রকৃত বান্দা হতে পারবে না, যতক্ষণ তিনি ছাড়া অন্য কোনোকিছুর প্রতি তোমার দাসত্বের অংশ অবশিষ্ট থাকে। আর তুমি কখনোই খাঁটি স্বাধীনতায় পৌঁছাতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর প্রকৃত দাসত্ব থেকে তোমার মনে কিছু বাকি থাকে। সুতরাং, যখন তুমি কেবল তাঁরই বান্দা হয়ে যাবে, তখন তুমি তিনি ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে মুক্ত হয়ে যাবে।”৩১

প্রকৃত মহব্বত:

ভালোবাসা বা মহব্বতের ক্ষেত্রে তিনি আবেগের চেয়ে আল্লাহর পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আবু আলী মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহিম আল-বাজ্জাজ বলেন, আমি আবু আমর আয জাজ্জাজীকে বলতে শুনেছি, “আমি জুনাইদ (রহ.)-কে ‘মহব্বত’ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন, “তুমি কি ‘ইশারা’ (রুহানি ভাষা) জানতে চাও? আমি বললাম, ‘না।’ তিনি বললেন, তুমি কি ‘দাওয়া’ (মিথ্যা দাবি) জানতে চাও? আমি বললাম: না। তিনি বললেন, তাহলে তুমি কী চাও? আমি বললাম, মহব্বতের স্বরূপ। তিনি বললেন, “আল্লাহ তাঁর বান্দাদের বিষয়ে যাকে ভালোবাসেন, তুমি তাকে ভালোবাসবে; এবং যাকে তিনি অপছন্দ করেন, তাকে তুমি অপছন্দ করবে— এটাই প্রকৃত মহব্বত।”

মহব্বতকারী বা প্রেমিকের হৃদয়ের হাহাকার ফুটে উঠেছে তাঁর পরবর্তী কথায়। মনসুর ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, আমি আবু আমর আল-আনমাতি-কে বলতে শুনেছি, “এক ব্যক্তি জুনাইদ (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করল, ‘মহব্বতকারী ব্যক্তি তার সময়ের কোন অংশের জন্য সবচেয়ে বেশি আফসোস করে?’ জুনাইদ (রহ.) বললেন, ‘যে সময়ের প্রশান্তি তাকে সংকোচের মাঝে ফেলে, অথবা যে সময়ের অন্তরঙ্গতা তাকে পরবর্তীতে একাকিত্বে ফেলে দেয়; মুহব্বতকারী সেই সময়গুলোর জন্য আফসোস করে।’ তারপর তিনি কবিতা আবৃত্তি করলেন— قد كَانَ لي مشرب يصفو برؤيتكم … فكدرته يَد الْأَيَّام حِين صفا “একসময় আমার পানপাত্র ছিল— যা তোমাদের দর্শনে নির্মল হতো; কিন্তু ভাগ্যের কঠিন হাত— সে নির্মলতা নষ্ট করে দিল— ঠিক তখনই, যখন তা সবচেয়ে বেশি বিশুদ্ধ হয়েছিল।”৩২

সঙ্গী নির্বাচন:

আধ্যাত্মিক পথে সুহবত বা সঙ্গীর প্রভাব অপরিসীম। আবুল আব্বাস আল-বাগদাদী (রহ.) বলেন, আমি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ আল-ফারঘানিকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি জুনাইদ (রহ.)-কে শিবলীর প্রতি বলতে শুনেছি, “হে আবু বকর শিবলী, যদি এমন কাউকে পাও, যে তোমার কথার যে-কোনো একটি শব্দেও তোমার সঙ্গে একমত, তবে তাকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো।”৩৩

তাঁর বাণী ও নসিহত:

হজরত জুনাইদ বাগদাদি (রহ.)-এর প্রতিটি বাণীই এক একটি হিকমতের মশাল। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু নসিহত নিচে তুলে ধরা হলো।

১. হজরত জুনাইদ বাগদাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, “সর্বোচ্চ অহংকার হলো নিজের অস্তিত্বকে অতিরিক্ত মূল্যায়ন করা; আর সর্বনিম্ন হলো নিজের সম্পর্কে উত্তম কোনো চিন্তা বা ধারণা হওয়া।”

২. আবু জাফর আল-ফারগানী বলেন, আমি জুনাইদ বাগদাদিকে বলতে শুনেছি, “কথা বলার সর্বনিম্ন ক্ষতি হলো মহান রবের ভয় ও প্রতাপ অন্তর থেকে কমে যাওয়া। আর অন্তর যখন ভয় ও প্রতাপ থেকে মুক্ত হয়, তখন তা ইমান থেকেও মুক্ত হয়ে যায়।”

৩. তিনি আরও বলেন, “বাগদাদের অধিবাসীদের ‘শাতহ’ (আধ্যাত্মিক উন্মোচন/উন্মাদনা) এবং ‘ইবারাহ’ (বাগ্মিতা) দেওয়া হয়েছে। খুরাসানের অধিবাসীদের ‘ক্বালব’ (আন্তরিকতা) এবং বদান্যতা দেওয়া হয়েছে। বসরার অধিবাসীদেরকে ‘জুহদ’ (দুনিয়াবিমুখতা) এবং ‘ক্বানাআহ’ (সন্তুষ্টি) দেওয়া হয়েছে। শামের অধিবাসীদের ‘হিলম’ (সহিষ্ণুতা) এবং ‘সালামাহ’ (নিরাপত্তা/শান্তি) দেওয়া হয়েছে। আর হিজাজের অধিবাসীদের ‘সবর’ (ধৈর্য) এবং ‘ইনাবাহ’ (আল্লাহর দিকে ফেরা/অনুশোচনা) দেওয়া হয়েছে।”৩৪

৪. জুনাইদ (রহ.) বলেন, “সকল মানুষের জন্য সমস্ত পথ বন্ধ, কেবল সেই ব্যক্তি ছাড়া, যে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পদাঙ্ক অনুসরণ করে।”

৫. আবু ওমর আল-আনমাতি বলেন, আমি জুনাইদ বাগদাদিকে বলতে শুনেছি, “যদি একজন সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি আল্লাহর দিকে হাজার হাজার বছর তাকিয়ে থাকে, তারপর এক মুহূর্তের জন্য তাকানো বন্ধ করে দেয়, তখন তিনি যা হারিয়েছেন তা তার যা অর্জিত হয়েছে তার চেয়ে কম হবে না।”৩৫

৬. আবদুল ওয়াহিদ ইবনে বকর বলেন, আমি হাম্মাম ইবনুল হারিসকে বলতে শুনেছি, আমি জুনাইদ (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “যে কোনো মূল্যবান ও মহৎ জ্ঞানের দ্বার হলো পরিশ্রমে নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়া। আল্লাহকে যে পরিশ্রম করে খোঁজে, সে কখনোই তাঁর সেই বান্দার মতো নয়, যে আল্লাহকে খোঁজে শুধু তাঁর অনুগ্রহের পথেই।”

৭. “আল্লাহ থেকে গাফেল হওয়া জাহান্নামে প্রবেশ করার চেয়েও কঠিন।”

৮. “যখন কোনো ফকিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তাকে জ্ঞান দিয়ে শুরু করো না। বরং প্রথমে কোমলতা ও সহানুভূতি দেখাও। কারণ জ্ঞান তাকে ভীত করে আর কোমলতা তাকে আপন করে।”

৯. “সময় একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। আর সময়ের চেয়ে মূল্যবান কিছুই নেই।”

১০. আবুল হাসান আল-কাজউইনী বলেন, আমি আবু তায়্যিব আল-উক্কিকে বলতে শুনেছি, তিনি জাফর আল-খুলদী থেকে এবং তিনি জুনাইদ (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন— “পরিপূর্ণ চেষ্টা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সম্মানজনক ও উচ্চ মর্যাদার প্রতিটি দরজা খুলে যায়।”

১১. “আল্লাহর প্রতি লজ্জাশীলতা আল্লাহর অলিদের হৃদয় থেকে অনুগ্রহ পাওয়ার আনন্দও দূর করে দেয়।”

১২. “ইয়াকিনে (অটল বিশ্বাসে) ভর করে কিছু লোক পানির উপর দিয়ে হেঁটেছেন; কিন্তু যে ব্যক্তি তৃষ্ণায় মারা গেছে তার ইয়াকিন তাদের চেয়ে উত্তম।”

১৩. “যে আল্লাহকে চিনে (মারিফত অর্জন করে), সে আল্লাহ ব্যতীত আর কিছুর সঙ্গে সুখ পায় না।”৩৬

১৪. আবুল কাসিম আল-মুতরিয থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জুনাইদ ইবনে মুহাম্মাদকে বলতে শুনেছি, “ধর্মপ্রাণ মানুষের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর জিনিস হলো দাবি-দাওয়া।”

১৫. আবু বকর আল-মুফিদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জুনাইদকে বলতে শুনেছি, “সাবধান, তুমি যেন প্রকাশ্যে প্রশংসিত এবং গোপনে দোষযুক্ত না হও।”

১৬. আব্বাস ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জুনাইদ ইবনে মুহাম্মাদকে বলতে শুনেছি, “মানুষের মার্জিত বা মহৎ গুণ হলো ভাই-বন্ধুদের ভুল-ত্রুটি সহ্য করা।”

১৭. আবুল-কাসিম আন-নাক্কাশ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জুনাইদকে বলতে শুনেছি, “মানুষ তার স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের জন্য সমালোচিত হয় না; বরং সে তখনই সমালোচিত হয়, যখন সে এমন কিছু করে যা তার স্বভাবের পরিপন্থী।”৩৭

ওফাত:

২৯৭ হিজরিতে (৯০৯/৯১০ খ্রিষ্টাব্দ) আধ্যাত্মিক জগতের এই সূর্য অস্তমিত হয়। তাঁর শেষ মুহূর্তের প্রতিটি ক্ষণ ছিল আল্লাহর জিকিরে মগ্ন। আবু বকর আল-আতাউয়ী বলেন, “আমি জুনাইদ বাগদাদি (রহ.)-এঁর মৃত্যুর সময় তাঁর পাশে ছিলাম। তিনি কুরআন খতম করলেন, এরপর সুরা আল-বাকারাহ থেকে শুরু করে সত্তরটি আয়াত পাঠ করলেন, এরপরই তিনি ইন্তেকাল করলেন। আল্লাহ তাঁর উপর রহমত বর্ষণ করুন।”৩৮

তাঁর ইবাদতের প্রতি নিবেদন মৃত্যুকালেও ছিল অমলিন। আবু মুহাম্মাদ আল-হারীরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হজরত জুনাইদ বাগদাদি রহমাতুল্লাহি আলাইহির মৃত্যুর সময় আমি তাঁর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দিনটি ছিল জুমার দিন। তিনি তখন কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। আমি বললাম, “হে আবুল কাসিম, নিজের ওপর কিছুটা দয়া করুন (কষ্ট কম করুন)।” তিনি বললেন, “হে আবু মুহাম্মাদ, এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি আর কিছুর প্রয়োজন নেই আমার, কারণ এখনই আমার আমলনামা গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরো বলেন, “তাঁর মৃত্যুর দুই ঘণ্টা আগে আমি তাঁর কাছে উপস্থিত ছিলাম। তিনি একটানা কাঁদছিলেন এবং সিজদায় ছিলেন। আমি তাঁকে বললাম, “হে আবুল কাসিম, কষ্টের যে অবস্থা দেখছি, তা অনেক বেশি!” তিনি বললেন, “হে আবু মুহাম্মাদ, এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি প্রয়োজন আমার আর কীসের হতে পারে?” এরপর তিনি ইন্তেকাল করা পর্যন্ত সিজদা অবস্থায় কাঁদতে থাকলেন।” আবু মুহাম্মাদ আল-হারীরি তাঁকে গোসল দেন এবং তাঁর ছেলে তাঁর জানাজার নামাজ পড়ান। তাঁর জানাজার নামাজে উপস্থিত লোকজনের সংখ্যা গণনা করা হয়েছিল, তা প্রায় ষাট হাজারে পৌঁছে গিয়েছিল।

তাঁর মৃত্যুর পর এক আধ্যাত্মিক স্বপ্ন তাঁর মহিমাকে আরও উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। জাফর আল-খুলদি তাঁর কিতাবে বলেন, “আমি স্বপ্নে জুনাইদকে দেখলাম। আমি তাঁকে বললাম, ‘আল্লাহ্ আপনার সাথে কেমন আচরণ করেছেন?’ তিনি বললেন, ‘সেই সমস্ত ইঙ্গিত-ইশারা বিলীন হয়ে গেছে, সেই সমস্ত কথা ও বর্ণনা অদৃশ্য হয়ে গেছে, সেই জ্ঞানসমূহ শেষ হয়ে গেছে এবং সেই সব নিয়ম-রীতি নিঃশেষ হয়ে গেছে। শেষ রাতে আমি যে ছোটো ছোটো রাকাতগুলো আদায় করেছি, সেগুলোই কেবল আমার কাজে দিয়েছে। আল্লাহ্ তাঁকে রহম করুন।”৩৯