ইসলামি আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের জীবন ও চিন্তা যুগে যুগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। তাঁদের কেউ শুদ্ধ প্রেমের আগুনে দগ্ধ হয়েছেন, কেউবা নিঃস্বার্থ সত্যের অনুসন্ধানে বহন করেছেন অবর্ণনীয় ত্যাগের ভার। সেই বিরলতম মনীষীর এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন হজরত হুসাইন ইবনে মনসুর আল-হাল্লাজ (রহ.); যাঁকে সুফি ঐতিহ্যে “শহীদ-এ-ইশ্ক” নামে অভিহিত করা হয়। তাঁর জীবন ছিল প্রেম, ত্যাগ, রহস্যময় আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা ও সত্য-সন্ধানের এক উত্তাল অভিযাত্রা; আর তাঁর মৃত্যু হয়ে উঠেছিল তাসাউফের ইতিহাসে আত্মত্যাগ ও নিবেদনের এক অনন্য প্রতীক।
নাম ও পরিচয়:
ইতিহাসের পাতায় এই মহান সাধকের পরিচয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সংরক্ষিত হয়েছে। তাঁর পূর্ণ নাম হুসাইন ইবনু মানসুর ইবনু মাহমী। উপনাম আবু আব্দুল্লাহ, আবার কেউ কেউ তাঁকে আবু মুঘীস বলেও উল্লেখ করেছেন। তিনি ছিলেন মূলত পারস্যদেশীয়, বায়দ্বা শহরের একজন বিশিষ্ট সুফি। বায়দ্বা ছিল ইরানের একটি সুপরিচিত নগর। আর তাঁর দাদা মাহমী ছিলেন মাজুসী (অগ্নিপূজক) ধর্মের অনুসারী।
তাঁর আধ্যাত্মিক শিক্ষার হাতেখড়ি এবং পথচলা সম্পর্কে জানা যায় যে, হুসাইন ইবনু মানসুর আল-হাল্লাজ বড়ো হয়েছেন তুস্তার শহরে। সেখানেই তিনি তাঁর প্রথম আধ্যাত্মিক শিক্ষক সাহ্ল ইবনু আব্দুল্লাহ আত-তুস্তারী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে দুই বছর শিক্ষাগ্রহণ করেন। এরপর তিনি বাগদাদে এসে শায়েখ জুনাইদ বাগদাদি (রহ.), আবুল হুসাইন আন-নূরী (রহ.), এবং আমর ইবন উসমান আল-মাক্কী (রহ.) এর সোহবত গ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘ সময়জুড়ে ভ্রমণ করেছেন, সাধনা করেছেন এবং আত্মশুদ্ধির নানান পথ অনুসরণ করেছেন। ১
তবে তাঁর আধ্যাত্মিক মাকাম ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে সমকালীন আলিমদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন অভিমত ছিল। তাঁর বিষয়ে শায়েখদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেক শায়েখ তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং সুফিবাদের মধ্যে তাঁর কোনো স্থান থাকা অস্বীকার করেছেন। তবে অনেকে আবার গ্রহণ করেছেন। যারা তাঁকে গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেন: আবুল আব্বাস ইবনে আতা, আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে খাফীফ এবং আবুল কাসিম ইব্রাহিম ইবনে মুহাম্মাদ আন-নাসরাবাযী। তাঁরা তাঁর প্রশংসা করেছেন, তাঁর অবস্থাকে সঠিক বলে মনে করেছেন, তাঁর কথা বর্ণনা করেছেন এবং তাঁকে মুহাক্কিকীন (সত্য উপলব্ধিকারী)-দের মধ্যে গণ্য করেছেন। এমনকি মুহাম্মাদ ইবনে খাফীফ বলেছেন: “আল-হুসাইন ইবনে মনসূর হলেন একজন রব্বানী আলেম।” ২
তাঁর জীবন পরিক্রমা:
হাল্লাজের জীবন-পরিক্রমা ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং নাটকীয়তায় ভরা। ইবনু আল্লান ও অন্যরা বর্ণনা করেছেন যে, আবুল-ইয়ামান আল-কিন্দী তাঁদের জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদেরকে জানিয়েছেন আবু মনসুর আশ-শাইবানী; তিনি বলেন, আমাদেরকে জানিয়েছেন আবু বকর আল-খতীব; তিনি বলেন, আমাকে বর্ণনা করেছেন মাসউদ ইবন নাসির আস-সিজ্জী; তিনি বলেন, আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন ইবন বাকুওয়াইহ; তিনি বলেন, আমাকে জানিয়েছেন (মানসুর হাল্লাজের পুত্র) হাম্মাদ ইবনুল হাল্লাজ। তিনি বলেন, “আমার পিতার জন্ম হয়েছিল তুরুল-বাইদ্বা নামক স্থানে, আর তাঁর বেড়ে ওঠা তুস্তার শহরে। তিনি সাহ্ল (রহ.)-এর শিষ্যত্বে দুই বছর অতিবাহিত করেন, তারপর বাগদাদে যাত্রা করেন। তিনি কখনো উলের খসখসে পোশাক পরতেন, কখনো মোটা জামা, পাগড়ি ও কাবা (এক ধরনের লম্বা পোশাক) পরিধান করতেন; আবার কখনও মাত্র দুটি ছেঁড়া কাপড় পরে চলাফেরা করতেন। তুস্তার থেকে তাঁর প্রথম সফর ছিল বসরার দিকে। তখন তাঁর বয়স ছিল আঠারো বছর। এরপর তিনি আমর আল-মাক্কীর নিকট যান এবং তাঁর সঙ্গে আঠারো মাস অবস্থান করেন। এরপরে তিনি ইমাম জুনাইদ বাগদাদি (রহ.)-এর নিকট আসেন।
আধ্যাত্মিক এই যাত্রায় গুরুর সাথে তাঁর মতবিরোধও ছিল দেখার মতো। পরবর্তীতে একটি বিষয়ে তাঁর এবং জুনাইদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দেয়। জুনাইদ তাঁকে ‘দাবিদার’ বলে অভিহিত করেন। এতে তিনি বিস্মিত ও দুঃখিত হন, এবং মাকে সঙ্গে নিয়ে তুস্তারে ফিরে আসেন। সেখানে তিনি এক বছর অবস্থান করেন এবং মানুষের মধ্যে তাঁর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি হয়। এদিকে আমর ইবনু উসমান তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগ সম্বলিত চিঠি লিখতে থাকলেন। এমনকি আমার পিতা রাগ করে সুফি- পোশাক ত্যাগ করলেন, কাবা পরিধান করলেন এবং দুনিয়াদার লোকদের সঙ্গ গ্রহণ করলেন।
এরপর তিনি বেরিয়ে পড়লেন এবং আমাদের কাছ থেকে পাঁচ বছর সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। তিনি মাওয়ারাউন-নাহর (নদীর ওপারের অঞ্চল) পর্যন্ত ভ্রমণ করলেন। তারপর পারস্যে ফিরে এলেন এবং মানুষের সামনে বক্তব্য রাখা, মজলিস করা, আল্লাহর পথে আহ্বান জানানো ও তাঁদের জন্য গ্রন্থ রচনা শুরু করলেন। তিনি মানুষের অন্তরের কথা অনুযায়ী আলোচনা করতেন। এ কারণে তাঁকে “হাল্লাজুল-আসরার” (গোপন রহস্যের হাল্লাজ) বলা হলো এবং এই উপাধিতেই তিনি পরিচিত হলেন।
পরবর্তীতে তাঁর সফরের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। এক পর্যায়ে তিনি আহওয়াজে আসেন এবং আমাকে ডাকেন। আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে আসা হলো। তারপর তিনি বসরায় গেলেন, সেখান থেকে মক্কায় গেলেন এবং মুরাক্কা (জোড়াতালি দেওয়া সুফিবস্ত্র) পরিধান করলেন। তাঁর সঙ্গে অনেক লোকও ছিল। এ সময় আবু ইয়াকুব নাহরজুরি তাঁর ওপর হিংসা করলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলতে লাগলেন। এরপর তিনি আহওয়াজে ফিরে এলেন এবং আমার মা ও আহওয়াজের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে বাগদাদে গেলেন। সেখানে তিনি এক বছর অবস্থান করলেন। এরপর দ্বিতীয়বার ভারতের দিকে যাত্রা করলেন এবং মাওয়ারাউন নাহর পর্যন্ত গেলেন। সেখানে তিনি আল্লাহর পথে দাওয়াত দিলেন এবং তাঁদের জন্য বই রচনা করলেন। পরে তিনি ফিরে এলেন।
তাঁর বিশ্বব্যাপী পরিচিতি ও বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল ভিন্ন ভিন্ন নামে। যেমন—
- ভারতের মানুষ তাঁকে “আল-মুঘীস” (সহায়ক) নামে চিঠি লিখতেন।
- মাসীন ও তুর্কিস্তানের লোকেরা তাঁকে “আল-মুকীত” (রিজিকদাতা) বলে সম্বোধন করত।
- খুরাসানে তাঁকে বলা হতো “আবু আব্দুল্লাহ আল-জাহিদ”।
- খুজেস্তানে তিনি পরিচিত ছিলেন “শায়খ হাল্লাজুল-আসরার” নামে।
- বাগদাদে কিছু লোক তাঁকে “আল-মুস্তালিম” এবং বসরায় তাঁকে “আল-মুহাইয়্যার” (বিভ্রান্তকারী) বলে ডাকতো।
এরপর তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের কথা প্রচার হতে থাকল। বিশেষত এই দীর্ঘ সফর থেকে ফেরার পর। পরে তিনি তৃতীয়বার হজে গেলেন এবং দুই বছর মক্কায় অবস্থান করলেন। তারপর তিনি ফিরে এলেন এবং আগের জীবনধারার তুলনায় বদলে গেলেন। তিনি বাগদাদে জমি-সম্পত্তি ক্রয় করলেন, একটি বাড়িও নির্মাণ করলেন; এবং লোকদের এমন এক বিষয়ের দিকে আহ্বান জানালেন— যার সম্পূর্ণ প্রকৃতি আমি জানতে পারিনি, কেবল তার কিছু অংশ সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি। পরে তাঁর ও শিবলী (রহ.) এবং আরও কিছু সুফি-মাশায়িখের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। তখন কেউ বলত— “তিনি জাদুকর”, আর কেউ বলত— “তিনি পাগল।” আবার অনেকে বলত— “তিনি কারামতের অধিকারী।” এভাবে কথা চলতে চলতে শেষপর্যন্ত তাঁকে সুলতান গ্রেপ্তার করেন।৩
হাল্লাজ নামের রহস্য:
কেন তাঁকে ‘হাল্লাজ’ নামে ডাকা হতো, সে প্রসঙ্গে সুলামী বলেন, তাকে (মানসুর আল-হাল্লাজকে) আল-হাল্লাজ (তুলা ধুনাকারী) এই জন্য বলা হতো যে, তিনি ওয়াসিত-এ এক তুলা ধুনাকারীর (হাল্লাজ) কাছে গিয়েছিলেন এবং তাকে একটি কাজের জন্য পাঠিয়েছিলেন। তখন লোকটি বলল, আমি আমার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। তখন মানসুর আল-হাল্লাজ বললেন, আপনি যান, আমি আপনাকে সাহায্য করব। লোকটি যখন ফিরে এলো, সে দেখল তার কাছে থাকা সমস্ত তুলা ধুনা করা (বা বীজ থেকে আলাদা করা) হয়ে গেছে।
ইব্রাহিম বিন উমর বিন হানযালা আল-ওয়াসিতী আস-সাম্মাক তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করে বলেন, হুসাইন বিন মনসুর (আল-হাল্লাজ) ওয়াসিত-এ প্রবেশ করেন। সেখানে এক তুলা ব্যবসায়ী (কাত্তান) তাঁর সাথে দেখা করে। হুসাইন তাকে একটি কাজ গুছিয়ে দেওয়ার জন্য বললেন, কিন্তু লোকটি তাতে সময়ক্ষেপণ করছিল। তখন হুসাইন বললেন, যান, আমি আপনাকে সাহায্য করছি। লোকটি চলে গেল। যখন সে ফিরে এলো, সে দেখল তার কাছে থাকা সমস্ত তুলা ধুনা করা ও ফুঁকে পরিষ্কার করা অবস্থায় রয়েছে। আর তা ছিল চব্বিশ হাজার রতল। প্রায় ১১ হাজার কেজি।
অন্য এক মতে বলা হয়েছে: বরং তাঁকে এই নামে ডাকা হতো, কারণ তিনি গোপন রহস্য (আল-আসরার) নিয়ে কথা বলতেন। আরেকটি মতে বলা হয়েছে— তাঁর পিতা একজন তুলা ধুনাকারী (হাল্লাজ) ছিলেন। ৪
মক্কায় তাঁর কঠোর রিয়াজত:
আল্লাহর প্রেমে তাঁর আত্মত্যাগ ছিল সীমাহীন। তিনি খোরাসান থেকে ইরাকে আসেন, সেখান থেকে মক্কায় যান। মক্কায় তিনি হাজরে আসওয়াদে অবস্থান গ্রহণ করেন। গ্রীষ্ম বা শীত— কোনো ঋতুতেই ছাদের নিচে আশ্রয় নিতেন না। তিনি সারাবছর রোজা রাখতেন। রাতে তাঁর জন্য পানি ও একটা রুটি আনা হতো— তিনি পানি পান করতেন এবং রুটির কেবল তিন কোণা কামড়ে খেতেন; বাকি অংশ রেখে দিতেন, তা তাঁর সাথিরা নিয়ে যেত। তিনি পরের দিন বিকেল পর্যন্ত আর কিছু খেতেন না। ৫
মক্কার সুফি শায়েখের পর্যবেক্ষণ:
হাল্লাজের এই কৃচ্ছ্রসাধন দেখে মক্কার প্রধান সুফি শায়েখ একটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তিনি যখন মক্কায় অবস্থান করেন সেসময় মক্কায় সুফিদের শায়েখ ছিলেন আব্দুল্লাহ আল-মাগরিবী। তিনি একদিন তাঁর মুরিদদের নিয়ে হাল্লাজকে দেখতে গেলেন; কিন্তু তাঁকে হাজরে আসওয়াদে পেলেন না। বলা হলো— তিনি জাবাল আবু কুবাইস পাহাড়ে উঠেছেন। শায়েখ সেখানে গিয়ে দেখলেন হাল্লাজ খালিপায়ে একটি পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন, মাথা খোলা, তাঁর দেহ থেকে মাটিতে ঘাম ঝরছে। শায়েখ তাঁকে কিছু বললেন না; সাথিদের নিয়ে ফিরে এসে বললেন— “এই লোকটি আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর ধৈর্য প্রদর্শন করছে; কিন্তু আল্লাহ শীঘ্রই তাকে এমন পরীক্ষায় ফেলবেন, যা তার ধৈর্য ভেঙে দেবে।” ৬
তাঁর আধ্যাত্মিক কবিতা:
হাল্লাজের হৃদয়ের প্রেম ও বিরহ তাঁর লেখাতে ফুটে উঠত। নিচে তাঁর কয়েকটি কবিতা উল্লেখ করা হওেলা।
এক
أنت بين الشغاف والقلب تجري
مثل جري الدموع من أجفاني
“আপনি আমার হৃদয়ের গভীরতম স্তর ও অন্তরভাগের মধ্যে প্রবাহিত হন—
যেমন চোখের পাতা বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।”
وتحل الضمير جوف فؤادي
كحلول الأرواح في الأبدان
“আপনি আমার অন্তরের গভীরে এমনভাবে অবস্থান করেন—
যেমন আত্মা দেহে অবস্থান করে।”
ليس من ساكن تحرّك إلا
أنت حركته خفي المكان
“আমার ভেতরের যে স্থির জিনিসটিও নড়ে—
সেটিকে আপনিই এক গোপন স্থানের শক্তিতে নড়ান।”
يا هلالا بدا لأربع عشر
لثمان وأربع واثنتان
“হে আমার প্রিয়, আপনি এমন এক চাঁদের মতো উদিত হন—
যেন চৌদ্দ তারিখের পূর্ণ চাঁদ,
আট, চার এবং দুই— সব মিলিয়ে আলোয় পরিপূর্ণ।”
দুই
مواجيد حق أوجد الْحق كلهَا
وَإِن عجزت عَنْهَا فهوم الأكابر
“হকের সমস্ত আধ্যাত্মিক অনুভূতি হক-ই সৃষ্টি করেন;
যদি কেউ তা বুঝতে নাও পারে, তবুও আরিফদের গভীর জ্ঞান তা অনুধাবন করে।”
وَمَا الوجد إِلَّا خطرة ثمَّ نظرة
تثير لهيبا بَين تِلْكَ السرائر
“ওয়াজদ (আত্মস্থ উচ্ছ্বাস) আসলে একটি ঝলক, তারপর আরেক দৃষ্টি—
যা অন্তরের গোপন গভীরতাকে দাউদাউ আগুনের মতো প্রজ্বলিত করে।”
إِذا سكن الْحق السريرة ضوعفت
ثَلَاثَة أَحْوَال لأهل البصائر
“যখন হক অন্তরের অন্তস্তলে স্থির হন,
তখন অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের জন্য তিনটি আধ্যাত্মিক অবস্থা বেড়ে যায়।”
فحال يبيد السِّرّ عَن كنه وجده
ويحضره للوجد فِي حَال حائر
“এক অবস্থা— যেখানে সত্তার গোপন রহস্য বিস্ময়ের তীব্রতায় বিলীন হয়,
আর মানুষ বিস্মিত অবস্থায় ওয়াজদের দিকে আকৃষ্ট হয়।”
وحال بِهِ زمت ذرى السِّرّ فانثنت
إِلَى منظر أفناه عَن كل نَاظر
“আরেক অবস্থা— যেখানে অন্তরের রহস্য সংকুচিত হয়ে এমন একটি দৃশ্যে রূপ নেয়
যা তাকে সমস্ত দৃষ্টিকে ছেড়ে শুধু হকের দিকে নিবিষ্ট করে দেয়।”৭
তিন
لَمْ يَبْقَ بَيْنِي وَبَيْنَ الْحَقِّ تِبْيَانٌ
وَلَا دَلَائِلُ آيَاتٍ وَبُرْهَانِ
আমার আর হকের মাঝে কোনো ব্যাখ্যার পর্দা নেই,
না আছে আয়াতের দালিল, না কোনো যুক্তি-প্রমাণের প্রয়োজন।
كُلُّ الدَّلِيلِ لَهُ، مِنْهُ، إِلَيْهِ، بِهِ
حَقٌّ، وَجَدْنَاهُ فِي عِلْمٍ وَفُرْقَانِ
সমস্ত দালিল তাঁর— তা তাঁর কাছ থেকেই আসে, তাঁর দিকেই ফিরে যায়, তাঁর মাধ্যমেই সব।
এগুলো সবই সত্য; জ্ঞান ও ফুরকানের আলোতে আমরা তা পেয়েছি।
هَذَا وُجُودِي وَتَصْرِيحِي وَمُعْتَقَدِي
هَذَا تَوَحُّدُ تَوْحِيدِي وَإِيمَانِي
এটাই আমার অস্তিত্ব, আমার ঘোষণা ও অন্তরের আকিদা।
এটাই আমার তাওহিদের একত্ব ও আমার ঈমানের সারমর্ম।
هَذَا تَجَلِّي طُلُوعِ الشَّمْسِ نَائِرَةً
قَدْ أَزْهَرَتْ فِي تَلَالِيهَا بِسُلْطَانِ
এ এমন এক তাজাল্লি— যেন সূর্যের দীপ্তিময় উদয়।
যা তার জ্যোতির রাজত্বে দিগন্তকে আলোকিত করে।
لَا يُسْتَدَلُّ عَلَى الْبَارِي بِصَنْعَتِهِ
وَأَنْتُمْ حَدَثٌ يَفْنَى لِإِرْمَانِ
স্রষ্টাকে তাঁর সৃষ্টি দ্বারা বিচার করো না।
তোমরা তো সৃষ্ট; সময়ের আঘাতে একদিন নিশ্চিহ্ন হবে।
هَذَا وُجُودُ الْوَاجِدِينَ لَهُ
بَيْنَ التَّجَانُسِ، أَصْحَابِي وَخِلَّانِي
এটাই সেই অস্তিত্ব— যা তাঁকে খুঁজে পাওয়া হৃদয়রা অনুভব করে।
এই সামঞ্জস্য আমার সাথি ও প্রিয়জনদের অন্তরজগতে বিদ্যমান।৮
মুরিদের পরিচয়:
একজন মুরিদের আদর্শিক অবস্থান কেমন হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে তিনি আলোকপাত করেছেন। আবদুল ওয়াহিদ আস-সিয়্যারি বলেন, ফারিস আল-বাগদাদি থেকে শুনেছি যে, তিনি হাল্লাজকে জিজ্ঞাসা করলেন— “মুরিদ কাকে বলে?” হাল্লাজ বললেন— “মুরিদ হলো সে, যে তার সব উদ্দেশ্য আল্লাহর উপর সোপর্দ করে দেয়। এবং সে আর কোথাও থামে না; যতক্ষণ না আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়।” তিনি আরও বলেন— “মুরিদ হলো সে, যে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতের সব কারণ-উপলক্ষ্য থেকে বেরিয়ে আসে এবং এর জন্য সে এ দুনিয়ার মানুষদের ওপরেও অগ্রাধিকার লাভ করে।” ৯
তাওহিদ, তাজরিদ ও আধ্যাত্মিক নেশা:
আধ্যাত্মিক নেশায় মত্ত থাকা প্রসঙ্গে হুসাইন ইবনু মানসুর হাল্লাজ বলেন, “যাকে তাওহিদের আলো মাতোয়ারা করে, সে তাজরিদের (অহমবর্জিত নিখাদ ঈমান) ভাষা থেকে আড়াল হয়ে যায়। আর যাকে তাজরিদের আলো মাতোয়ারা করে, সে তাওহিদের খাঁটি সত্য প্রকাশ করে; কারণ মাতাল ব্যক্তি লুকোনো সব কথাও বলে ফেলে।” ১০
তাওহিদ সম্পর্কে তাঁর আকিদা:
সৃষ্টিকর্তার নিরঙ্কুশ একত্ববাদ নিয়ে তাঁর বয়ান ছিল তাত্ত্বিক। শায়খ আবু আব্দুর রহমান আস-সুলামী বলেন, আমি মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ বিন গালিবকে বলতে শুনেছি। তিনি বললেন, আমি আবু নসর আহমদ বিন সাঈদ আল-ইসফানজানীকে বলতে শুনেছি। হুসাইন ইবনু মনসুর আল-হাল্লাজ বলেছেন, “সৃষ্টির সবকিছুকে নশ্বরতার সীমার মধ্যে বাঁধো, কারণ চিরন্তনতা কেবল তাঁরই। যার প্রকাশ শরীরের মাধ্যমে হয়, তার জন্য আকস্মিকতা আবশ্যক। যা উপকরণের মাধ্যমে একত্রিত হয়, তার শক্তি তাকে ধরে রাখে। যা সময় দ্বারা গঠিত হয়, সময়ই তাকে বিচ্ছিন্ন করে। যা অন্যের ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠিত হয়, তার জন্য অসহায়ত্ব থাকে। যা কল্পনা দ্বারা উপলব্ধি হয়, রূপায়ণ সেখানে পৌঁছে যায়। যাকে কোনো স্থান আশ্রয় দেয়, প্রশ্ন “কোথায়?” তাকে গ্রাস করে। যার কোনো জাতি বা শ্রেণি আছে, প্রশ্ন “কেমন?” তাকে অনুসরণ করে।
আল্লাহ্র নিরঙ্কুশ পবিত্রতা:
তিনি পবিত্র। কোনো ঊর্ধ্বদেশ তাঁকে ছায়া দেয় না। কোনো নিম্নদেশ তাঁকে বহন করে না। কোনো সীমা তাঁর সঙ্গে মুখোমুখি হয় না। কোনো নিকটবর্তিতা তাঁর সাথে প্রতিযোগিতা করে না। কোনো পশ্চাৎ তাঁকে গ্রাস করে না। কোনো সম্মুখ তাঁকে সীমাবদ্ধ করে না। তিনি আগে প্রকাশিত হননি, পরে বিনাশিতও হননি। তিনি কোনো সমষ্টি একত্রিত করেননি। তিনি অস্তিত্বে আসেননি, হারিয়েও যাননি। দুনিয়াবি গুণের মতো তাঁর কোনো গুণ নেই। তাঁর কাজের কোনো কারণ নেই। তাঁর অস্তিত্বের কোনো সীমা নেই। তিনি তাঁর সৃষ্টির অবস্থা থেকে পবিত্র। তাঁর সৃষ্টির কোনো স্বভাব নেই, এবং তাঁর কাজে কোনো প্রক্রিয়া নেই। তিনি চিরন্তনভাবে তাদের থেকে আলাদা, যেমন তারা তাদের নশ্বরতা দ্বারা আলাদা।
যদি তুমি বলো “কবে?” সময় তাঁর অস্তিত্বের আগে চলে গেছে। যদি বলো “هو (তিনি)?” – (هو) শব্দের অক্ষর ‘হা’ এবং ‘ওয়াও’ হলো তাঁর সৃষ্টি। যদি বলো “কোথায়?” – স্থান তাঁর অস্তিত্বের আগে ছিল। অতএব, অক্ষরগুলো হলো তাঁর নিদর্শন, তাঁর অস্তিত্ব হলো তাঁর প্রতিষ্ঠা, তাঁর জ্ঞান হলো তাওহিদ (একত্ব), এবং তাঁর একত্ব হলো তাঁকে সৃষ্টির থেকে পৃথক করা। যা কিছু কল্পনার মধ্যে চিত্রিত হয়, তা তাঁর বিপরীত। তাঁর থেকে যা শুরু হয়েছে, তা তাঁর মধ্যে সমাধান করতে পারে না। অথবা তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তা তাঁর দিকে ফিরে আসে না। চোখগুলো তাঁকে উপলব্ধি করতে পারে না, অনুমানও তাঁকে ধরতে পারে না। তাঁর নৈকট্য তাঁর সম্মান, তাঁর দূরত্ব তাঁর অবমাননা। তাঁর উচ্চতা কোনো আরোহণের মাধ্যমে নয়, তাঁর আগমন কোনো স্থানান্তরের মাধ্যমে নয়। তিনি আদি ও অন্ত, প্রকাশ্য ও লুক্কায়িত, নিকটবর্তী ও দূরবর্তী, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ তাঁর মতো কিছুই নেই, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। (সুরা আশ-শুরা: ১১)। ১১
তাঁর কারামাত:
হাল্লাজের জীবনে বহু অলৌকিক কারামাত প্রকাশ পেয়েছে, যা অনেককে তাঁর প্রতি অনুরক্ত করেছিল। তাঁর জীবনের প্রারম্ভিক সময় এমন ছিল যে, তিনি মানুষদের সামনে জুহদ ও তাসাউফের চিত্র জাহির করতেন, দেখাতেন অদ্ভুত সব কারামাত। গ্রীষ্মে শীতের ফল এবং শীতে গ্রীষ্মের ফল বের করে আনতেন। তিনি হাত আকাশে তুললে ফের নামতো দিরহামে ভরা অবস্থায়। এবং প্রতিটি দিরহামে লেখা থাকত “قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَد”। তিনি এগুলোকে বলতেন ‘দিরহামুল কুদরাহ’— অর্থাৎ ক্ষমতার দিরহাম। তিনি লোকদের জানিয়ে দিতেন তারা কী খেয়েছে, ঘরে কী করেছে— মানুষের অন্তরের কথাও বলে দিতেন। ফলে বহু মানুষ মোহগ্রস্ত হয়ে তাঁর অনুসারী হয়ে যায়। ১২
হজরত মুসা আলাইহিস সালাম কর্তৃক আল্লাহকে দেখতে চাওয়ার রহস্য:
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত মুসা (আ.)-এঁর দর্শন প্রার্থনা সম্পর্কে হাল্লাজকে জিজ্ঞাসা করা হলো— “কেন হজরত মুসা (আ.) আল্লাহর দর্শনের আশা করেছিলেন এবং তা প্রার্থনা করেছিলেন?” তিনি উত্তর দিলেন— “কারণ মুসা (আ.) নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর জন্য নিবেদিত করেছিলেন এবং আল্লাহও তাঁর সব দিক দিয়ে মুসা (আ.)-কে নিজের জন্যই বেছে নিয়েছিলেন। ফলে আল্লাহই তাঁর প্রতিটি দৃষ্টির সামনে প্রতিভাত হতেন, আল্লাহ ব্যতীত আর কিছুই তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করত না। এই স্পষ্ট উন্মোচনের অবস্থাই তাঁকে আল্লাহর দর্শনের আবেদন করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল— এর বাইরে আর কোনো কারণ নেই।” ১৩
তাঁর আধ্যাত্মিক উক্তি:
হাল্লাজের বাণীগুলো যেন আধ্যাত্মিক জ্ঞানের এক একটি রত্ন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু বাণী তথা উদ্ধৃতি হলো—
১. আবদুল ওয়াহিদ ইবনু বকর বলেন- আমি আহমদ ইবনু ফারিসকে বলতে শুনেছি, তিনি বললেন- আমি হুসাইন ইবনু মানসুর হাল্লাজ-কে বলতে শুনেছি— “আল্লাহ তাঁদের তাঁর ‘নামের’ পর্দায় আচ্ছাদিত করেছেন— এ কারণে তারা বেঁচে আছে। যদি তাঁর ‘কুদরতের জ্ঞান’ তাঁদের সামনে প্রকাশ পেত, তারা উন্মত্ত হয়ে যেত। আর যদি তাদের জন্য হাকিকতের পর্দা সম্পূর্ণ উন্মোচিত হয়ে যেত, তারা তা সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুবরণ করত।”
২. তিনি আরো (আহমদ ইবনু ফারিস) বলেন, হাল্লাজ আরও বলতেন— “হে আমার প্রভু, আপনি জানেন আপনার শোকর আদায় করার স্থানগুলোতে আমি অক্ষম। সুতরাং, আপনি নিজেই আমার পক্ষ থেকে আপনারই শোকর আদায় করুন; কারণ প্রকৃত শোকর তো আপনি ছাড়া কেউ করতে পারে না।”
৩. বর্ণনাকারী বলেন, আমি হাল্লাজকে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি আমলের দিকে দৃষ্টি দেয়, সে যার জন্য আমল করা হচ্ছে (আল্লাহ), তাঁর থেকে আড়াল হয়ে যায়। আর যে ব্যক্তি যার জন্য আমল করা হচ্ছে, তাঁর দিকে দৃষ্টি দেয়, সে আমলগুলো দেখা থেকে আড়াল হয়ে যায়।” অর্থাৎ, যে ব্যক্তি নিজের নেক আমল নিয়ে ভাবে, ‘আমি কত ভালো কাজ করেছি’, সে আসল উদ্দেশ্য অর্থাৎ আল্লাহকে ভুলে যায়। আর যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে মনোযোগ দেয়, তার কাছে নিজের আমল তুচ্ছ মনে হয়, সে সেগুলো নিয়ে গর্ব করে না।
৪. “কোনো বান্দা যখন পরিশুদ্ধ হয়ে ‘মারিফতের’ (আল্লাহ-জ্ঞান) স্তরে পৌঁছে যায়, তখন আল্লাহ তায়ালা তার অন্তরে নিজ থেকেই আন্তরিকতা নাজিল করেন এবং তার গোপন রহস্যকে পাহারা দেন; যাতে সেখানে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো আন্তরিকতা প্রবেশ করতে না পারে।”
৫. “আল্লাহই ইবাদতের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং তিনিই আনুগত্যের একমাত্র গন্তব্য। যে তাঁর বাইরে কাউকে দেখে, সে সত্যকে দেখে না। যে তাঁর বাইরে কিছু বুঝতে চায়, সে সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে না। আল্লাহর খেয়াল ও নজরদারির সুবাসেই চরিত্র পরিশুদ্ধ হয়। আর তাঁর দিকে সম্পূর্ণ মিলনে (জামউল্লাহ) পৌঁছলেই শান্তি লাভ হয়।”
৬. “জিহ্বাগুলো তার (আল্লাহর) ইচ্ছায় কথা বলে এবং সে কথার আড়ালে তারা নিজেরাই বিলীন হয়ে যায়। আর নফসগুলো তার ব্যবহারের অধীন এবং সেই ব্যবহারের ভেতরে তারাও বিলীন হয়ে থাকে।”
৭. “প্রভুর লজ্জাশীলতা তাঁর অলিদের অন্তর থেকে নিয়ামতের আনন্দ দেখার অনুভূতিই সরিয়ে দিয়েছে। বরং ইবাদতের লজ্জাশীলতাই অলিদের অন্তর থেকে ইবাদতের আনন্দ দেখার ক্ষমতাও মিটিয়ে দিয়েছে।” অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য ও লজ্জাশীলতা এত গভীর হয় যে, অলিরা নিজেদের আমলের আনন্দ দেখতেই লজ্জা পান। কারণ, সব আল্লাহর অনুগ্রহ।
৮. “যে ঈমানের আলো দিয়ে হককে খুঁজতে চায়, সে যেন নক্ষত্রের আলো দিয়ে সূর্য খুঁজতে চায়।” অর্থাৎ হকের নুর এত মহান যে, ঈমানের নুর তার তুলনায় অপর্যাপ্ত।
৯. তিনি এক ভ্রান্ত মুতাজিলার শায়েখ জব্বায়ীর অনুসারীকে বলেছিলেন, “যেহেতু আল্লাহ কোনো কারণ ছাড়াই দেহ সৃষ্টি করেছেন, তেমনিভাবে তিনি কোনো কারণ ছাড়াই সেই দেহে গুণাবলি সৃষ্টি করেছেন। যেমন বান্দা তার কাজের মূল সত্তার মালিক নয়, তেমনি সে কাজের ওপরও তার প্রকৃত মালিকানা নেই।”
১০. “মানবীয় সত্তা কখনো তাঁর (আল্লাহর) থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়, আবার পুরোপুরি যুক্তও নয়।” ১৪
তাঁর মৃত্যুদণ্ডের কারণ:
হাল্লাজের জীবনের করুণ ও চূড়ান্ত পর্যায় শুরু হয় খলিফার প্রশাসনের সাথে সংঘাতের মাধ্যমে। যখন তিনি বাগদাদে ফিরে এলেন, তাঁর সম্পর্কে খলিফা আল-মুক্তাদির মন্ত্রীর কাছে খবর পৌঁছায় মন্ত্রী হামিদ ইবন আব্বাস। খবর ছিল— তিনি বহু মানুষকে জীবিত করেছেন, মৃতদের পুনরুজ্জীবিত করেন, জিন তাঁকে সেবা করে এবং তার ইচ্ছামতো জিনিসপত্র এনে দেয়, খলিফার দরবারের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি তাকে সম্মান দেয়, নাসর আল-হাজিব তাঁর প্রতি ঝুঁকে গেছে।
তখন মন্ত্রী হামিদ খলিফার কাছে অনুরোধ করেন— হাল্লাজ ও তার অনুসারীদের তার হাতে সোপর্দ করা হোক। নাসর আল-হাজিব প্রথমে তাকে রক্ষা করলেও মন্ত্রীর বারংবার অনুরোধের কারণে আল-মুক্তাদির অবশেষে হাল্লাজ ও তার অনুসারীদের তার হাতে তুলে দেন। মন্ত্রী হাল্লাজ এবং কিছু অনুসারীকে বন্দি করেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন আশ-শিমরী। বলা হতো, তারা তাকে ‘ইলাহ’ মনে করতো। মন্ত্রী তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা স্বীকার করে— “হ্যাঁ, আমরা বিশ্বাস করি— তিনি ইলাহ এবং তিনি মৃতদের জীবিত করেন।” হাল্লাজকে এর মুখোমুখি করা হলে তিনি অস্বীকার করে বলেন— “আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই এমন দাবি থেকে; আমি কখনো রবুবিয়্যত বা নবুয়ত দাবি করিনি। আমি শুধু একজন বান্দা, আল্লাহর ইবাদতকারী।”
মন্ত্রী তখন কাজী আবু আমর, কাজী আবু জাফর ইবনে বাহলুল এবং আরও বহু আলেম ও সাক্ষীদের ডাকলেন। তিনি তাদের কাছে ফতোয়া চান। তারা বলেন, “এ বিষয়ে আমরা কিছু বলব না; যতক্ষণ পর্যন্ত প্রমাণ না পাওয়া যায় যে, তিনি এমন কথা বলেছেন, যার কারণে তাঁর হত্যা বৈধ হয়। এ ধরনের অভিযোগ সাক্ষ্য বা স্বীকারোক্তি ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়।” হাল্লাজকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও শরিয়তের বিরুদ্ধ কিছু তাঁর মুখ থেকে বের হয়নি। এভাবে দীর্ঘদিন চলে নাটকীয় রাজনৈতিক টানাপোড়েন। অবশেষে মন্ত্রীর হাতে আসে হাল্লাজের একটি বই।
সেখানে লেখা ছিল— যদি কারো হজে যাওয়ার সামর্থ্য না থাকে তবে সে নিজের বাড়ির একটি ঘরকে পাক-পবিত্র রাখবে। হজের দিনগুলোতে সে সেই ঘরের চারদিকে তওয়াফ করবে, হজের কাজগুলো সেখানে সম্পন্ন করবে। তারপর সে ৩০ জন এতিমকে আমন্ত্রণ করবে, সেরা খাবার রান্না করে তাদের খাওয়াবে, তাদের পোশাক দেবে এবং প্রত্যেককে ৯ দিরহাম করে দেবে। বইটিতে দাবি করা হয়— এটা করলে তার হজের সওয়াব হয়ে যাবে। এই বই পড়ে কাজী আবু আমর তাকে জিজ্ঞেস করেন, “এটা কোথায় পেলেন?” হাল্লাজ বলেন, “হাসান আল-বাসরির ‘কিতাবুল ইখলাস’ থেকে।” কাজী বলেন, “তুমি মিথ্যা বলেছো, হাল্লাজ; আমরা মক্কায় সেই বই পড়েছি। এতে এমন কিছুই নেই।” ফলে কাজী ও উপস্থিত আলেমরা তাঁর রক্ত হালাল (হত্যা বৈধ) বলে ফতোয়া লেখেন। মন্ত্রী তা খলিফার কাছে পাঠান। খলিফা মৃত্যুদণ্ডের অনুমতি দেন। ১৫
হত্যা ও মৃত্যুর বিবরণ:
হাল্লাজের মৃত্যুদণ্ড ছিল নির্মমতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ। হাল্লাজকে পুলিশের বরখাস্তকর্তার হাতে দেওয়া হয়। তাকে ১০০০ বার চাবুক মারা হয়; কিন্তু তিনি আর্তচিৎকার করেননি, এরপর কেটে ফেলা হয় তাঁর চার অঙ্গ; তিনি নড়লেন না, তারপর তাঁকে হত্যা করা হয়, তাঁর দেহ আগুনে পোড়ানো হয়, ছাই দাজলায় নিক্ষেপ করা হয়, তাঁর মাথা বাগদাদে প্রদর্শন করা হয়।
ইবনে খালিকান উল্লেখ করেন, আল-মুক্তাদির নির্দেশ দেন যেন তাঁকে মুহাম্মদ বিন আবদুস সামাদ, পুলিশের প্রধানের কাছে হস্তান্তর করা হয়। জনগণের ক্ষোভের ভয়ে এশার নামাজের পর তাঁকে গ্রহণ করা হয়। ৩০০ হিজরি সনের জিলকদ মাসের শেষ ছয়দিন বাকি থাকতে মঙ্গলবার তাঁকে বাব আল-তাক-এর কাছে বের করা হয়। বিপুল জনসমাগম ঘটে। জল্লাদকে এক হাজার বেত্রাঘাত করার নির্দেশ দেওয়া হয়; কিন্তু তিনি ক্ষমা চাননি বা উহ্ শব্দও করেননি। এরপর তাঁর চার হাত-পা কেটে ফেলা হয়; তিনি শান্ত ছিলেন, কাঁপছিলেন না। এরপর তাঁর মাথা কেটে ফেলা হয়, দেহ পুড়িয়ে ছাই দজলা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। মাথাটি বাগদাদে টাঙানো হয় এবং তারপর বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরানো হয়।
ইমাম ইযযুদ্দীন ইবনে আব্দুস সালাম বলেন, যখন তাকে ক্রুশবিদ্ধ করতে আনা হলো, তিনি কাঠ ও পেরেক দেখে উচ্চস্বরে হেসে ওঠেন। তিনি জনতার ভিড়ে শিবলীকে দেখে বলেন, “আবু বকর, তোমার কাছে কি জায়নামাজ আছে?” শিবলী বলেন, “হ্যাঁ।” হাল্লাজ বলেন, “এখানে বিছিয়ে দাও।” তিনি দুই রাকাত নামাজ পড়লেন—
- প্রথম রাকাতে— সুরা আল-ফাতিহা ও “وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ…” এই আয়াত পড়েন।
- দ্বিতীয় রাকাতে— সুরা আল-ফাতিহা ও “كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ” এই আয়াত পড়েন।
পরে জল্লাদ তাঁর মুখে আঘাত করে নাক-মুখ চূর্ণ করে। শিবলী চিৎকার করেন, বেহুঁশ হয়ে যান। হাল্লাজ বলেন, “জেনে রাখো, আল্লাহ তোমাদের জন্য আমার রক্ত হালাল করেছেন। আমাকে হত্যা করো! মুসলমানদের আজ আমার হত্যার চেয়ে বড়ো কোনো কাজ নেই।”
মানুষ তাঁর ব্যাপারে চরম বিভ্রান্তিতে পড়ে। কেউ তাঁকে সম্মান করে, কেউ তাঁকে কাফির বলে। ইমাম গাজালী ‘মিশকাতুল আনোয়ার’-এ তাঁর বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করে বলেন— হাল্লাজ যখন বলেছিলেন— “أنا الحق” (আমি আল-হক) অথবা— “মা ফি জুব্বাতি ইল্লাল্লাহ” (পোশাকের ভেতরে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই) এসব ছিল চরম প্রেম, ভয়, ও ভক্তির বহিঃপ্রকাশ। যেমন একজন প্রেমিক বলে— “আমি যাকে ভালোবাসি, আমিই সে, সে-ই আমি।” ইমাম গাজালী তাঁর বিষয়ে সুপ্রসন্ন ব্যাখ্যা দেন। ১৬