তাসাউফ ও আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসে হজরত মারুফ আল-কারখী (রহ.) এমন এক মহাপুরুষ, যাঁর জীবন আল্লাহভীতি, প্রেম ও নিষ্কলুষ আত্মসমর্পণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি বাগদাদের নিকটবর্তী কারখ অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক জীবনে খ্রিষ্টান ছিলেন, পরে হজরত আলী ইবনে মূসা আর-রিদ্বা (রহ.)-এঁর সংস্পর্শে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। অতঃপর আল্লাহর প্রেমে আত্মনিয়োগ, দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তি ও মানুষের কল্যাণে নিবেদন— এই তিন গুণেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন তাসাউফের প্রাথমিক যুগের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর আখলাক, দোয়া ও কারামাত পরবর্তী যুগের অলিদের কাছে ছিল প্রেরণার উৎস।

নাম ও লকব:

নাম মারুফ, উপনাম আবু মাহফুজ আল বাগদাদী। আলামুয যুহহাদ (যুহদ তথা দুনিয়াবিমুখের প্রতীক), বারাকাতুল আসর (যুগের বরকতময় ব্যক্তিত্ব) তাঁর উপাধি। পিতার নাম ফাইরুজ, আবার কেউ কেউ বলেন ফাইরুজান। তিনি মূলত সাবিয়ান সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন। ১

শৈশবে ইসলাম গ্রহণের ঘটনা:

আবু আলী আল-দাক্কাককে বলেন, মারুফ-এঁর মাতা-পিতা ছিলেন খ্রিষ্টান। তারা মারুফকে ছোটবেলায় তাদের শিক্ষকের কাছে সোপর্দ করেন। সেই শিক্ষক তাকে বলতেন, বলো— ‘তিনজনের একজন’ (অর্থাৎ ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করো)। কিন্তু মারুফ বলতেন, ‘বরং তিনি একক।’  একদিন শিক্ষক তাকে প্রচণ্ড মারধর করেন, ফলে মারুফ পালিয়ে যান। তাঁর মাতা-পিতা তখন বলতেন, যদি সে আমাদের কাছে ফিরে আসে, তবে সে যে ধর্মই গ্রহণ করুক, আমরা তাতেই তার সাথে একমত হবো।

এরপর তিনি আলী ইবনে মুসা আল-রিদ্বা রহমাতুল্লাহি আলাইহির হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজের বাড়িতে ফিরে এসে দরজায় কড়া নাড়েন। জিজ্ঞেস করা হলো, দরজায় কে? তিনি বললেন, মারুফ। তারা জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোন ধর্মে? তিনি বললেন, ‘হানিফি’ ধর্মে (অর্থাৎ ইসলামে)। ফলে তাঁর মাতা-পিতাও ইসলাম গ্রহণ করলেন।

আবু সালিহ আব্দুল্লাহ ইবনে সালিহ বলেন, “আবু মাহফুজকে আল্লাহ শৈশবেই বিশেষভাবে নির্বাচিত (ঐশী আকর্ষণ দ্বারা সম্মানিত) করেছিলেন।” মারুফ আল-কারখীর ভাই ঈসা স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমি এবং আমার ভাই মারুফ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তাম। তখন আমরা খ্রিষ্টান ছিলাম। শিক্ষক শিশুদের ‘পিতা’ ও ‘পুত্র’—অর্থাৎ ত্রিত্ববাদের অংশ শিখাতেন। কিন্তু আমার ভাই মারুফ চিৎকার করে বলতেন, ‘একক, একক!’ (আহাদ, আহাদ)।

শিক্ষক তার এই বলার ধরন সহ্য করতে পারতেন না। তিনি মারুফকে কঠোরভাবে মারধর করতেন। একদিন তাকে এমন মারধর করা হয় যে মারুফ মুখ ঘুরিয়ে পালিয়ে যায়। এই দৃশ্য দেখেই আমাদের মা কাঁদতে কাঁদতে বলতেন, ‘হে আল্লাহ, যদি তুমি আমার পুত্র মারুফকে ফেরত দাও, যে ধর্মেই সে থাকুক, আমি তাকে অনুসরণ করব।’ বহু বছর পর মারুফ মায়ের কাছে ফিরে আসেন। মা জিজ্ঞেস করলেন, “হে আমার পুত্র, তুমি এখন কোন ধর্মে?” মারুফ উত্তর দিলেন, “আল্লাহর ধর্মে, ইসলাম ধর্মে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর রসুল।” এই দৃঢ় বিশ্বাস ও সাহসিকতা দেখে মা ইসলাম গ্রহণ করলেন। এরপর পুরো পরিবার ইসলামে প্রবেশ করল।২

ইবাদত ও পরহেজগারিতা:

একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো “আপনি কীভাবে রোজা রাখেন?” তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে বললেন “আমাদের নবী ﷺ-র রোজা ছিল এভাবে, আর দাউদ (আলাইহিস সালাম)-এর রোজা ছিল এভাবে…” যখন প্রশ্নকারী জোর দিল, তখন তিনি বললেন “আমি সারা জীবন রোজা রেখে চলি; কেউ আমন্ত্রণ জানালে আমি খেয়ে নিই, কিন্তু কখনো বলি না— ‘আমি রোজাদার।”

একবার এক লোক তাঁর দাড়ি ছাঁটছিল, মারুফ (রহ.) তখনও আল্লাহর জিকির থামাননি। লোকটি বলল “আপনি কি জিকির থামাবেন না? আমি কীভাবে ছাঁটব?” তিনি বললেন “তুমি তোমার কাজ করছো, আমিও আমার কাজ করছি।”

আরেকবার কেউ তাঁর সামনে কারো নামে গিবত করল। তিনি বললেন “মনে রাখো, একদিন তোমার চোখের উপর তুলো রাখা হবে (অর্থাৎ মৃত্যু আসবে)।”

মুহাম্মাদ ইবনু মানসূর আত-তুসী বলেন, আমি একবার হজরত মারুফ (রহ.)-এর পাশে বসেছিলাম। তিনি ক্রমাগত বলছিলেন, “ওয়া আঘওসাহ্‌, ইয়া আল্লাহ!” অর্থাৎ, “হে আল্লাহ, সাহায্য করুন!” তিনি এই বাক্যটি দশ হাজারবার উচ্চারণ করেন। এরপর তিনি এই আয়াত তেলাওয়াত করলেন, إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ — “যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সাহায্য প্রার্থনা করলে, তখন তিনি তোমাদের আবেদন কবুল করলেন।” (সুরা আল-আনফাল: ৯)

আবুল আব্বাস ইবনু মাসরূক বলেন, আমাদের কাছে মুহাম্মাদ ইবনু মানসূর আত-তুসী বর্ণনা করেন, আমি একদিন মারুফ (রহ.)-এঁর কাছে ছিলাম। পরে যখন আবার তাঁর কাছে গেলাম, তাঁর মুখে আঘাতের দাগ দেখলাম। কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করল “হে শায়খ, এই দাগ কীসের?” তিনি বললেন, “আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন, নিজের কাজে মন দাও, যা তোমার উপকারে আসে।” কিন্তু যখন জিজ্ঞাসাকারী শপথ করে জানতে চাইল, তখন মারুফ (রহ.)-এঁর চেহারায় লজ্জা ও কষ্টের ভাব ফুটে উঠল। তিনি বললেন “গত রাতে আমি নামাজ পড়েছিলাম, তারপর মক্কায় গিয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করি, এরপর জমজমের পানি পান করতে গিয়েছিলাম। তখন আমার পা পিছলে পড়ে যাই, সেই সময় আমার মুখে এই আঘাত লাগে।”৩

ইয়াহইয়া ইবনে জাফার বলেছেন, আমি মারুফ আল-কারখিকে আজান দিতে দেখেছি। যখন তিনি ‘আশহাদু আল-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বললেন, তখন আমি দেখলাম তাঁর দাড়ি ও কানের পাশের চুলগুলো ফসলের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।

কাসিম ইবনে মুহাম্মদ আল-বাগদাদি বলেছেন, ‘আমি মারুফ আল-কারখীর প্রতিবেশী ছিলাম। আমি তাকে ভোরের সময় আর্তনাদ করে কাঁদতে এবং নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করতে শুনেছি—

আমার কাছে পাপেরা আর কী চায়?

তারা আমাকে ঘিরে ধরেছে, তাই আমা হতে তারা দূরে সরে না।

পাপেরা যদি আমাকে মুক্ত করে দিত, তবে তাদের কী ক্ষতি হতো?

আমার প্রতি দয়া করো, কারণ, শুভ্রতা (পক্ককেশ) আমাকে আচ্ছন্ন করেছে।৪

জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:

মারুফ আল-কারখী (রহ.) বলেন, ‘দুনিয়া তো একটি ফুটন্ত হাঁড়ি, আর একটি বর্জ্য ফেলার স্থান।’৫

এক ব্যক্তি একবার দশ দিনার নিয়ে তাঁর কাছে এল। এসময় একজন ভিক্ষুক সেদিকে যাচ্ছিল, মারুফ (রহ.) সেই দশ দিনার ভিক্ষুককে দিয়ে দিলেন। তারপর তিনি কাঁদতে লাগলেন এবং নিজেকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “হে প্রাণ, তুমি কত কাঁদবে? নিজেকে খালিস (বিশুদ্ধ) কর, তবেই তুমি মুক্তি পাবে।”

একবার এক বিপর্যস্ত লোক তাঁর কাছে এল। সে বলল, “আমার এক হাজার দিনার চুরি হয়ে গেছে, আপনি আমার জন্য দোয়া করুন।” মারুফ (রহ.) বললেন, “আমি কীভাবে দোয়া করব? আল্লাহ তো তাঁর নবী ও অলিদের থেকেও দুনিয়ার ধনসম্পদ ফিরিয়ে নেন, আর তুমি বলছো আমি তোমার টাকা ফেরত আসার দোয়া করি!” (অর্থাৎ, দুনিয়ার সম্পদ হারানোতে আফসোসের চেয়ে আত্মার সংশোধনই শ্রেয়)।৬

আবু সুলাইমান আদ-দারানি বলেছেন, ‘আমি মারুফ আল-কারখীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আল্লাহর অনুগত বান্দারা কিসের মাধ্যমে ইবাদতে সক্ষম হন? তিনি বললেন, তাদের অন্তর থেকে দুনিয়াকে বের করে দেওয়ার মাধ্যমে; যদি তাদের অন্তরে দুনিয়ার সামান্য কিছুও থাকত, তবে তাদের কোনো সিজদাই বিশুদ্ধ হতো না। আর এর মাধ্যমেই তিনি বলেছেন (মারুফ আল-কারখিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল) কীভাবে দুনিয়া অন্তর থেকে দূর করা যায়? তিনি বললেন, বিশুদ্ধ ভালোবাসা এবং উত্তম আচরণের মাধ্যমে। জিজ্ঞেস করা হলো, ভালোবাসা কী? তিনি বললেন, ভালোবাসা সৃষ্টির কাছ থেকে শেখার বিষয় নয়, বরং এটি হকের (আল্লাহর) দান এবং অনুগ্রহ।৭

বিনয় ও প্রজ্ঞা:

মারুফ আল-কারখী (রহ.)-এঁর ভাগ্নে থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি আমার মামা মারুফকে বললাম, হে মামা, আমি আপনাকে দেখি, যে আপনাকে ডাকে তার ডাকেই সাড়া দেন! তিনি বললেন, হে আমার পুত্র, তোমার মামা তো একজন অতিথি, যেখানেই স্থান হয় সেখানেই তিনি অবতরণ করেন। (অর্থাৎ, আমি বিনয়ী এবং নিজেকে সামান্য মনে করি।)

সিররি ইবনে সুফিয়ান আল-আনসারি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, মারুফ সালাতের জন্য ইকামত দিলেন, এরপর মুহাম্মদ ইবনে আবি তওবাকে বললেন, সামনে অগ্রসর হয়ে আমাদের নামাজ পড়ান। (এর কারণ হলো, মারুফ কখনও ইমামতি করতেন না, বরং কেবল আজান দিতেন ও ইকামত দিতেন এবং অন্য কাউকে ইমাম হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিতেন)। মুহাম্মদ ইবনে আবি তওবা বললেন, যদি আমি আপনাদের এই নামাজ পড়াই, তবে অন্য কোনো নামাজ আপনাদের পড়াবো না। তখন মারুফ বললেন, আর আপনি নিজেকে এই বলে বোঝাচ্ছেন যে আপনি আরেকটি নামাজ পড়বেন! আমরা সুদীর্ঘ আশা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। সুদীর্ঘ আশা উত্তম আমল থেকে বিরত রাখে।৮

দয়াশীলতা:

সিররি আস-সাকতি (রহ.) বলেছেন, আমি এখন যে অবস্থানে আছি, তা মারুফেরই বরকত। আমি একবার ঈদের নামাজ থেকে ফিরে এসে মারুফের সাথে একটি যত্নহীন শিশুকে দেখলাম।  আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সে কে?’ তিনি বললেন, ‘আমি দেখলাম বাচ্চারা খেলা করছে, আর এ ছেলেটা একাকী ও বিষণ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন সে খেলছে না? সে বলল, ‘আমি এতিম।’ সিররি বললেন, ‘আমি তখন তাঁকে বললাম, আপনি তাকে নিয়ে কী করবেন ভাবছেন?’ মারুফ বললেন, ‘আমি তার জন্য খেজুরের আঁটি (বা বীজ) সংগ্রহ করব, যা দিয়ে সে আখরোট কিনে আনন্দ করতে পারবে।’ আমি তাঁকে বললাম, ‘আমাকে দিন, আমি তার অবস্থার পরিবর্তন করে দেব।’ মারুফ বললেন, ‘আপনি কি সত্যিই তা করবেন?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’ তিনি আমাকে বললেন, ‘তাকে নিন, আল্লাহ আপনার অন্তরকে ধনী করুন!’ এরপর থেকে দুনিয়া আমার কাছে এর চেয়েও সামান্য হয়ে গেল।৯

একদিন হজরত মারুফ আল-কারখী অজু করার জন্য দজলা নদীর তীরে নামলেন এবং তাঁর পবিত্র কোরআন ও একটি চাদর উপরে রাখলেন। তখন এক মহিলা এসে সেগুলো নিয়ে চলে গেল। তিনি তার পিছু নিলেন এবং বললেন, ‘আমি মারুফ, তোমার কোনো ভয় নেই, তোমার কি এমন কোনো সন্তান আছে যে কোরআন পড়ে?’ মহিলা বলল, ‘না।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে কি তোমার কোনো স্বামী আছে?’ মহিলা বলল, ‘না।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে আমাকে কোরআনটি দাও, আর চাদরটি তুমি রাখো!’১০

বদদোয়ার বদলে উত্তম দোয়া:

ইব্রাহিম আল-আত্রাশ বলেছেন, ‘একবার মারুফ আল-করখি বাগদাদে দজলা (টাইগ্রিস) নদীর তীরে বসেছিলেন। এমন সময় একটি নৌকা পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, যাতে কিছু যুবক মদ্যপান করছিল ও বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছিল। তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে বললেন, ‘আপনি কি দেখছেন না? এই লোকগুলো আল্লাহর নাফরমানি করছে, তাও আবার এই পানির ওপর। আপনি তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করুন।’ তখন তিনি আকাশের দিকে হাত তুলে বললেন, ‘হে আমার প্রভু ও মনিব, আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করি, আপনি যেন তাদের জান্নাতে তেমনি আনন্দ দেন, যেমন আনন্দ তাদের দুনিয়াতে দিয়েছেন!’ ‘তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে বললেন, ‘আমরা তো আপনাকে তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে বলেছিলাম, তাদের জন্য দোয়া করতে বলিনি।’ তিনি বললেন, ‘যদি আল্লাহ তাদের পরকালে আনন্দ দেন, তবে তিনি দুনিয়াতেই তাদের তওবা কবুল করে নেবেন, আর এর দ্বারা তোমাদের কোনো ক্ষতি হবে না।’১১

তাঁর মতে অলিদের আলামত:

হজরত মারুফ আল-কারখীকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আল্লাহর অলিদের চিহ্ন কী?’ তিনি বললেন, ‘তাদের চিন্তা আল্লাহর জন্য, তাদের ব্যস্ততা তাঁরই মাঝে আর তাদের ফিরে যাওয়া তাঁরই দিকে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘আরিফের (আল্লাহকে যিনি জানেন) জন্য কোনো একটি বিশেষ নিয়ামত নেই, কারণ তিনি তো প্রতিটা নিয়ামতের মধ্যেই আছেন।’১২

কারামাত:

ইবনু শিরওয়াইহ বলেন, আমি মারুফ (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘শুনেছি আপনি নাকি পানির উপর দিয়ে চলেন?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘এমন কিছু কখনো ঘটেনি। তবে যখন আমি নদী পার হওয়ার ইচ্ছা করি, তখন আল্লাহ তায়ালা নদীর দুই তীরকে একত্র করে দেন, আমি তখন সহজেই হেঁটে পার হয়ে যাই।’

ইবনু মাসরূক বলেন, আমাদের কাছে ইয়াকুব (মারুফ (রহ.)-এঁর ভাতিজা) বর্ণনা করেছেন— একদিন প্রচণ্ড গরমে মারুফ (রহ.) লোকদের জন্য বৃষ্টির দোয়া করলেন। দোয়ার পর মুহূর্তেই আকাশ থেকে বৃষ্টি নেমে এলো।১৩

খালিল আস-সায়্যাদ বলেছেন, আমার ছেলে আনবার শহরে চলে গিয়েছিল। তার মা খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাই আমি মারুফের কাছে এসে তাঁকে বললাম, ‘হে আবু মাহফুজ, আমার ছেলে নিখোঁজ, আর তার মা চরম দুশ্চিন্তায় আছেন।’ তিনি বললেন, ‘আপনি কী চান?’ আমি বললাম, ‘আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন তিনি তাকে ফিরিয়ে দেন।’ তখন তিনি হাত তুলে বললেন, ‘হে আল্লাহ, আসমান আপনার, জমিন আপনার, আর এ দুয়ের মাঝে যা আছে সবই আপনার। অতএব, তাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিন।’ খালিল বলেছেন, ‘আমি শামের (সিরিয়ার) ফটকে পৌঁছাতেই দেখি আমার ছেলে সেখানে ক্লান্ত ও হতভম্ব অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি বললাম, ‘ওহে মুহাম্মদ!’ সে বলল, ‘হে আব্বা, এইমাত্র আমি আনবারেই ছিলাম।’১৪

বাণী ও নসিহত:

১. যখন আল্লাহ কোনো বান্দার জন্য অমঙ্গল নির্ধারণ করেন, তখন তাঁর জন্য আমলের দরজা বন্ধ করে দেন আর বিতর্কের (বাগবিতণ্ডার) দরজা খুলে দেন।

২. যদি তুমি ঠিকভাবে পরহেযগারি করতে না জানো, তবে তুমি সুদ খাবে, নারীর দিকে চেয়ে দৃষ্টি নিচু করবে না, তলোয়ার তুলে রাখবে নিজের কাঁধে (অন্যদের প্রতি অত্যাচার করবে)। এমনকি এই আমাদের বৈঠকখানাও আমাদের জন্য ভয় করার বিষয়, কারণ এটি নেতৃত্বপ্রাপ্তের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ, আর অনুসারীর জন্য লাঞ্ছনার কারণ।

৩. ধার্মিক মানুষ অনেক, কিন্তু সত্যনিষ্ঠ মানুষ খুব অল্প।

৪. যে আল্লাহর সঙ্গে বিরোধ করে, আল্লাহ তাকে পরাজিত করেন; যে তাঁর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে, আল্লাহ তাকে দমন করেন; যে তাঁকে ধোঁকা দিতে চায়, আল্লাহ তাকে প্রতিহত করেন; যে তাঁর উপর ভরসা করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান; যে তাঁর জন্য বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে মর্যাদা দান করেন; আর যে ব্যক্তি নিজের কথায় এমন বিষয়ে জড়িয়ে যায় যা তার জন্য নয়, সে আসলে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রত্যাখ্যাত।

৫. যে ব্যক্তি তার ইমামকে (ধর্মীয় নেতা বা শাসককে) অভিশাপ দেয়, সে তার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।১৫

৬. মারুফ আল-কারখীকে  এক ব্যক্তি বলল, ‘আমাকে পরামর্শ দিন।’ তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর উপর ভরসা করো। তিনি তোমার শিক্ষক, সঙ্গী এবং অভিযোগের স্থান হোন। মানুষ তোমাকে সাহায্য করতে পারবে না বা ক্ষতি করতে পারবে না।’

৭. সিররি সাকতি রহ. বলেছেন, আমি মারুফ আল-কারখিকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখো, এমনকি যদি তা কোনো স্ত্রী মেষের দিকেও হয়।’

৮. বিশ্বস্ততার বাস্তবতা হলো উদাসীনতার ঘুম থেকে ভেতরের গোপন সত্তার জেগে ওঠা এবং বিপথগামী দোষ-ত্রুটির বাহুল্য থেকে চিন্তাকে মুক্ত করা। বদান্যতা  হলো অসচ্ছলতার সময়ে নিজের প্রয়োজনীয় বিষয়টিকে অন্যের জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া।

৯. আমল ছাড়া জান্নাত কামনা করা গুনাহগুলোর মধ্যে একটি গুনাহ। কারণ ছাড়া সুপারিশের (শাফায়াত) অপেক্ষা করা এক ধরনের প্রবঞ্চনা । আর যার আনুগত্য করা হয় না, তার কাছ থেকে রহমত আশা করা হলো অজ্ঞতা এবং নির্বুদ্ধিতা।

১০. আবুল ফাতহ আল-কাওয়াস আয্-যাহিদ বলেছেন, আমি আবু আমর আল-বুজুরিকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, মারুফ বলেছেন, ‘পবিত্র ব্যক্তিদের অন্তর তাকওয়া (আল্লাহভীতি) দ্বারা প্রসারিত হয় এবং পূণ্যের দ্বারা উজ্জ্বল হয়। আর পাপীদের  অন্তর পাপাচারে অন্ধকার হয় এবং খারাপ নিয়তের কারণে অন্ধ হয়ে যায়।’

১১. যখন আল্লাহ কোনো বান্দার জন্য কল্যাণ চান, তখন তিনি তার জন্য কর্মের দরজা খুলে দেন, আর তার থেকে অবসাদ ও আলস্যের দরজা বন্ধ করে দেন।১৬

১২. দুনিয়া চারটি জিনিস— সম্পদ, কথা, ঘুম এবং খাদ্য। সম্পদ মানুষকে বিদ্রোহী করে, কথা মানুষকে ভুলিয়ে রাখে, ঘুম মানুষকে ভুলিয়ে দেয় এবং খাদ্য মানুষকে সিক্ত করে (পাপে অথবা চিন্তায় জড়িয়ে রাখে)।১৭

ইন্তেকাল:

আবু জাফর ইবনুল মুনাদি ও সা‘লাব বলেছেন, ‘মারুফ আল-কারখী (রহ.) ওফাত লাভ করেছেন হিজরী ২০০ সালে।’ ইমাম খতীব আল-বাগদাদী বলেছেন, ‘এটিই ঠিক মত।’ তবে ইয়াহইয়া ইবনু আবী ত্বালিব বলেছেন, ‘তিনি ওফাত লাভ করেছেন ২০৪ হিজরিতে।’ আল্লাহ তাঁর প্রতি রহমত বর্ষণ করুন।

ইব্রাহিম আল-হারবী (রহ.) বলেছেন, ‘মারুফ আল-কারখীর (রহ.)-এঁর মাজার শরিফ হলো এক পরীক্ষিত তির্যক (অর্থাৎ, নিশ্চিতভাবে পরীক্ষিত প্রতিষেধক)।’ তিনি এর দ্বারা বোঝাতে চেয়েছেন—যে ব্যক্তি তাঁর মাজারের পাশে অসহায় অবস্থায় আল্লাহর নিকট দোয়া করে, তার দোয়া কবুল হয়; কারণ বরকতময় স্থানগুলোতে দোয়া কবুল হওয়া স্বভাবসিদ্ধ। যেমন— রাতের শেষ প্রহরে করা দোয়া, ফরজ নামাজের পরের দোয়া এবং মসজিদে করা দোয়া গ্রহণযোগ্য হওয়ার আশাবাদ থাকে।১৮

আবু বকর আল-খায়্যাত বললেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম যেন আমি কবরস্থানে প্রবেশ করেছি, আর কবরবাসীরা তাদের কবরের ওপর বসে আছে এবং তাদের সামনে সুগন্ধি (রাইহান) রাখা আছে। আর তাদের মাঝে মারুফ আসা-যাওয়া করছেন। আমি বললাম, ‘আবু মাহফুজ, আল্লাহ আপনার সাথে কী করেছেন? আপনি কি মারা যাননি?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই!’ এরপর তিনি আবৃত্তি করলেন, ‘মুত্তাকীর মৃত্যু এমন এক জীবন, যার কোনো শেষ নেই। কত লোক তো মরেও গেছে, কিন্তু তারা মানুষের মাঝে জীবিত।’১৯

আব্দুল্লাহ ইবনে সাঈদ আল-আনসারি বলেছেন, ‘আমি মারুফ আল-কারখীকে স্বপ্নে দেখলাম, যেন তিনি আরশের নিচে আছেন। তখন আল্লাহ্ আযযা ওয়া জাল্লা তাঁর ফেরেশতাদের বলছেন, হে আমার ফেরেশতারা, ইনি কে?’ ফেরেশতারা বললেন, ‘আপনিই সবচেয়ে ভালো জানেন। ইনি মারুফ আল-কারখী, যিনি আপনার প্রেমে মাতোয়ারা, আপনার সাক্ষাৎ ছাড়া তাঁর হুঁশ ফিরবে না।’

আহমদ ইবনে আল-ফাতহ বলেছেন, ‘আমি বিশর ইবনে আল-হারিসকে স্বপ্নে দেখলাম, তিনি একটি বাগানে বসে আছেন এবং তাঁর সামনে একটি দস্তরখান আর তিনি সেখান থেকে খাচ্ছেন। আমি তাঁকে বললাম, ‘হে আবু নসর, আল্লাহ আপনার সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন?’ তিনি বললেন, ‘তিনি আমাকে ক্ষমা করেছেন, আমার প্রতি দয়া করেছেন এবং আমাকে পুরো জান্নাত উপভোগের অধিকার দিয়েছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, তুমি এর সকল ফল খাও, এর নদীগুলো থেকে পান করো এবং এর ভেতরের সবকিছু ভোগ করো। কারণ, তুমি দুনিয়ার জীবনে নিজেকে কামনা-বাসনা থেকে বঞ্চিত রাখতে।’

‘আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর আপনার ভাই আহমদ ইবনে হাম্বল কোথায়?’ তিনি বললেন, ‘তিনি জান্নাতের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি সুন্নাহপন্থীদের জন্য সুপারিশ করছেন, যারা বলেন, কুরআন আল্লাহর বাণী, সৃষ্ট নয়।’ আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মারুফ আল-কারখী কী করছেন?’ তিনি মাথা নেড়ে আমাকে বললেন, ‘দূর! আমাদের আর তাঁর মাঝে পর্দা আড়াল করে রেখেছে। মারুফ আল্লাহর জান্নাতের আকাঙ্ক্ষায় বা তাঁর আগুনের ভয়ে ইবাদত করেননি; বরং তিনি ইবাদত করেছেন তাঁর প্রতি ভালোবাসার কারণে। তাই আল্লাহ তাঁকে সর্বোচ্চ বন্ধুদের (আর-রাফিক আল-আ’লা) কাছে তুলে নিয়েছেন এবং তাঁর ও মারুফের মাঝের সকল পর্দা উঠিয়ে দিয়েছেন। তিনিই সেই পবিত্র ও পরীক্ষিত আরোগ্য! সুতরাং, যার আল্লাহর কাছে কোনো প্রয়োজন থাকে, সে যেন তাঁর কবরের (মাজার শরীফ) কাছে আসে এবং দোয়া করে। ইনশাআল্লাহ, তাঁর দোয়া কবুল হবে।’২০