ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু আলোকিত মানুষ আছেন, যাদের জীবন দুনিয়ার অন্ধকার থেকে আখিরাতের আলোয় ফিরে আসার চিরন্তন দৃষ্টান্ত। তাঁদের জীবনকথা শুধু ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করছে তা নয়, বরং মানুষের অন্তরেও আলো জ্বালায়। তাদেরই একজন হজরত মালেক ইবনে দিনার রহমাতুল্লাহি আলাইহি।

তিনি তাবেইনদের একজন। একটা সময় দুনিয়ার মোহে নিমগ্ন ছিলেন। কিন্তু এক হৃদয়বিদারক ঘটনার পর আল্লাহর রহমতের ছোঁয়ায় তিনি তওবা করেন এবং জাহিদানা (দুনিয়া-বিমুখ) জীবনে প্রবেশ করেন। দুনিয়ার চাকচিক্য ও আরাম-আয়েশ থেকে মুখ ফিরিয়ে কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, সিয়াম-সাধনাসহ নানামুখী ইবাদতের মাধ্যমে নিজের জীবনকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করেন।

প্রাথমিক পরিচিতি:

হজরত মালেক ইবনে দিনার (রহ.) তাবেয়ি যুগের একজন খ্যাতিমান বুজুর্গ, জাহিদ, আধ্যাত্মিক সাধক ও প্রাথমিক পর্যায়ের তাসাউফের অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর কুনিয়াত আবু ইয়াহ্ইয়া। তিনি ছিলেন ‘সামা ইবনে লুয়াই’ বংশের এক মহিলা সাহাবির দাস। পরে মুক্তি লাভ করেন।১ পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে ইলম, তাকওয়া ও আধ্যাত্মিকতার এমন উচ্চতায় পৌঁছে দেন যে, তিনি যুগের অন্যতম আলোকবর্তিকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুর সমকালীন বসরা শহরে তাঁর জন্ম। আনুমানিক ৭০ হিজরির কাছাকাছি। প্রাথমিক জীবনে তিনি কুরআনের নুসখা (কপি) লেখক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন।২

তওবার ঘটনা:

হজরত মালেক ইবনে দিনার (রহ.)-কে তাঁর তওবার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি বলেন, আমি একজন নিরাপত্তাকর্মী ছিলাম এবং মদে আসক্ত ছিলাম। এরপর আমি একটি মূল্যবান দাসী কিনলাম, যাকে আমার খুব পছন্দ হলো। সে আমার জন্য একটি মেয়ে সন্তানের জন্ম দিল। আমি তাকে খুব ভালোবাসতাম। যখন সে হামাগুড়ি দিতে শুরু করল, তখন আমার হৃদয়ে তার ভালোবাসা আরও বেড়ে গেল। সেও আমাকে ভালোবাসতো এবং আমিও তাকে ভালোবাসতাম। যখনই আমি মদ সামনে রাখতাম, সে আমার কাছে এসে আমার হাত থেকে নিয়ে মদগুলো আমার কাপড়ের ওপর ঢেলে দিত। কিন্তু যখন তার বয়স দুই বছর হলো, অকস্মাৎ সে মারা গেল। তার মৃত্যু আমাকে গভীরভাবে শোকাহত করল।

পরবর্তী শাবান মাস শবে বরাত এলো। শুক্রবার রাত। আমি মদ খেয়ে মাতাল হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। এশার নামাজও আদায় করিনি। স্বপ্নে দেখলাম, যেন কেয়ামত শুরু হয়ে গেছে, শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হয়েছে, কবর থেকে মানুষ উঠে আসছে এবং সবাই হাশরের ময়দানে একত্রিত হচ্ছে, আমিও তাদের সাথে আছি। হঠাৎ আমার পেছন থেকে একটি আওয়াজ শুনলাম। ফিরে তাকাতেই দেখি একটি বিশাল, কালো, নীল রঙের সাপ মুখ হা করে দ্রুত আমার দিকে আসছে। আমি ভয় ও আতঙ্কে পালাতে লাগলাম।

পথে এক পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা, সুগন্ধিযুক্ত বৃদ্ধেকে পেলাম। আমি তাকে সালাম দিলাম, তিনিও সালামের উত্তর দিলেন। বললাম’ “হে বৃদ্ধ, আল্লাহ আপনাকে আশ্রয় দিন, আমাকে এই সাপ থেকে বাঁচান।” বৃদ্ধ কেঁদে ফেললেন এবং আমাকে বললেন, “আমি দুর্বল এবং এটি আমার চেয়ে শক্তিশালী। আমি এর বিরুদ্ধে কিছু করতে পারব না। তবে তুমি দ্রুত যাও, হয়তো আল্লাহ তোমার জন্য এমন কিছু ব্যবস্থা করবেন, যা তোমাকে এর থেকে রক্ষা করবে।”

আমি প্রাণপণে পালাতে লাগলাম এবং শেষ পর্যন্ত কেয়ামতের ময়দানের একটি উঁচু স্থানে উঠে পড়লাম। সেখান থেকে জাহান্নামের স্তরগুলো দেখা যাচ্ছে। সাপের ভয়ে আমি প্রায় তাতে পড়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটি আওয়াজ এলো। বলল, “ফিরে যাও, তুমি এর যোগ্য নও।” তার কথা শুনে আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম এবং ফিরে এলাম।

সাপটি আবার আমার পিছু নিল। আমি আবার সেই বৃদ্ধের কাছে এসে বললাম, “হে বৃদ্ধ, আমি আপনাকে সাপ থেকে আশ্রয় দিতে বলেছিলাম, কিন্তু আপনি তা করেননি।” বৃদ্ধ কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, “আমি দুর্বল, তবে তুমি এই পাহাড়ের দিকে যাও। মুসলিম শিশুদের আমানতগুলো সেখানে আছে। যদি তোমার কোনো আমানত থাকে, তবে তা তোমাকে সাহায্য করবে।”

অতঃপর আমি সেদিকে ছুটলাম, যেতে যেতে একটি রূপার তৈরি গোলাকার পাহাড় দেখলাম, যেখানে ছোটো ছোটো ছিদ্র, জানালা ও ঝুলন্ত পর্দা ছিল। প্রতিটি ছিদ্র ও জানালার সামনে স্বর্ণ দিয়ে তৈরি দুটি করে কপাট ছিল, যা ইয়াকুত ও মুক্তা দ্বারা সজ্জিত। প্রতিটি কপাটে রেশমের পর্দা। পাহাড়টি দেখে আমি আরো দ্রুত দৌড়াতে লাগলাম, সাপটি আমার পেছনেই ছিল।

যখন আমি কাছাকাছি পৌঁছলাম, তখন একজন ফেরেশতা চিৎকার করে বললেন, “পর্দাগুলো সরাও এবং কপাটগুলো খোলো। (ভেতরে থাকা শিশুদের লক্ষ করে) সবাই তাকিয়ে দেখো, হয়তো এই হতভাগার কোনো আমানত আছে, যা তাকে তার শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করবে।” তখন পর্দাগুলো তুলে নেওয়া হলো এবং কপাটগুলো খুলে দেওয়া হলো। সেই ছোটো ছিদ্রগুলো থেকে চাঁদের মতো উজ্জ্বল চেহারার শিশুরা আমার দিকে তাকিয়ে দেখছিল। সাপটি আমার আরও কাছে চলে আসছিল, আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। একজন শিশু চিৎকার করে বলল, “তোমাদের কী হয়েছে, সবাই তার দিকে তাকাও, তার শত্রু তার কাছাকাছি চলে এসেছে।”

একের পর এক শিশুরা তাকাতে লাগল। আমি আমার মৃত মেয়েটিকে তাদের সাথে দেখতে পেলাম। সে আমাকে দেখেই কেঁদে উঠল এবং বলল, “আল্লাহর কসম, ইনি আমার বাবা।” এরপর সে নুরের একটি পালকের ওপর ধনুকের তীরের মতো লাফিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। সে তার বাম হাত দিয়ে আমার ডান হাত ধরল এবং তার ডান হাত দিয়ে সাপটিকে ইশারা করল। সাথে সাথে সাপটি পালিয়ে গেল।

এরপর সে আমাকে বসিয়ে আমার কোলে চড়ে বসল। তার ডান হাত দিয়ে আমার দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলল, “বাবা, যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্য কি এখনো সময় আসেনি যে, আল্লাহর স্মরণে তাদের হৃদয় বিগলিত হবে?” (সুরা আল-হাদিদ: ১৬)। আমি কেঁদে ফেললাম এবং বললাম, “হে আমার প্রিয় ছোটো কন্যা, তোমরাও কি কুরআন জানো?” সে বলল, “হ্যাঁ বাবা! আমরা তোমাদের চেয়েও ভালো জানি।”

বললাম, “যে সাপটি আমাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, তার সম্পর্কে আমাকে বলো।” সে বলল, “এটা ছিল আপনার মন্দ কাজ, যাকে আপনি শক্তিশালী করেছিলেন, তাই সে আপনাকে জাহান্নামের আগুনে ডুবিয়ে দিতে চেয়েছিল।” আমি বললাম, “যে বৃদ্ধের পাশ দিয়ে আমি গিয়েছিলাম, তার সম্পর্কে বলো।” সে বলল, “বাবা, এটা ছিল আপনার ভালো কাজ, যাকে আপনি এত দুর্বল করে দিয়েছিলেন যে, সে আপনার মন্দ কাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি রাখেনি।” আমি বললাম, “হে আমার ছোটো কন্যা, তোমরা এই পাহাড়ে কী করো?” সে বলল, “আমরা মুসলিম শিশুদের দল। কেয়ামত পর্যন্ত আমাদের এখানে রাখা হয়েছে। আমরা অপেক্ষা করছি, কখন আপনারা আমাদের কাছে আসবেন, যেন আমরা আপনাদের জন্য সুপারিশ করতে পারি।”

মালেক বিন দিনার (রহ.) বলেন, “এ আজব স্বপ্নের পর আমি ভীত অবস্থায় ঘুম থেকে জেগে উঠলাম, সাথে সাথে আমার সমস্ত মদ ফেলে দিলাম, পাত্রগুলোও ভেঙে ফেললাম এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে খাস দিলে তওবা করলাম।” ৪

শায়খগণ:

তিনি হজরত আনাস ইবনে মালিক, আহনাফ ইবনে কায়স, সাঈদ ইবনে জুবাইর, হজরত হাসান আল-বাসরি, মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন এবং কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ-সহ অনেকের কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। ৫

শাগরিদবৃন্দ:

তাঁর নিকট থেকে হজরত সাঈদ ইবনে আবি আরুবাহ, আবদুল্লাহ ইবনে শাওজাব, হাম্মাম ইবনে ইয়াহ্ইয়া, আবান ইবনে ইয়াজিদ আল-আত্তার, আবদুস সালাম ইবনে হারব, হারিস ইবনে ওয়াজিয়াহ এবং আরও অনেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। ৬

ইবাদত ও দুনিয়াবিমুখতা:

জাফর ইবনে সুলায়মান (রহ.) বলেন, আমি মুঘিরাহ ইবনে হাবিব আবু সালেহকে (যিনি মালিক ইবনে দিনারের আত্মীয়) বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, একদিন আমার ভাবনায় এলো- মালিক ইবনে দিনার মারা যাবেন, আর আমি তাঁর সাথে একই বাড়িতে থেকেও তাঁর আমল জানব না? এ উদ্দেশ্যে আমি এক রাত তাঁকে পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

ইশার নামাজ তাঁর সাথে আদায় করলাম। তারপর তিনি ঘরে গেলেন, আমি নিজেও বিছানায় গেলাম। তিনি সামান্য রুটি খেলেন, তারপর নামাজে দাঁড়ালেন। শুরুতেই দাড়ি ধরে বলতে লাগলেন,“হে আমার রব, যখন তুমি প্রথম ও শেষ বারের মতো সবাইকে একত্রিত করবে, তখন মালিক ইবনে দিনারের চুল-দাড়ি যেন জাহান্নামের আগুনে পোড়ানো না হয়।”আল্লাহর কসম, তিনি এমনভাবেই রাত কাটালেন— এক পা বাড়ান, এক পা পিছান, আর যতক্ষণ না ফজর হলো সেই দোয়া করতে থাকলেন। আমি ভাবলাম, যদি মালিক বের হয়ে আমাকে দেখে, তবে আর কখনোই আমাকে গুরুত্ব দেবেন না। তাই আমি তাঁকে তাঁর অবস্থায় রেখে বাড়ি চলে গেলাম।

হজরত মালেক ইবনে দিনার রহমাতুল্লাহি আলাইহ বলতেন— “হে লোকেরা, তোমাদের মধ্যে অজ্ঞ লোক অনেক বেশি, না হলে আমি মোটা কাপড় পরিধান করে নিতাম। হে লোকেরা, তোমরা তোমাদের পেটকে শয়তানের থলে বানিও না, যাতে ইবলিশ ইচ্ছেমতো সেখানে চরে বেড়ায়।”

ইউসুফ ইবনে আতিয়্যা আস-সাফফার থেকে বর্ণিত: মালেক ইবনে দিনার (রহ.) বলতেন—“যে আমার ঘরে প্রবেশ করে কিছু নিয়ে যায়, তা তার জন্য হালাল। আমি তো কোনো তালা বা চাবির প্রয়োজন অনুভব করি না।”

তিনি মসজিদ থেকে কংকর কুড়িয়ে নিতেন এবং বলতেন—“আমি যদি চাইতাম, তবে এগুলোই আমার জীবনের জন্য যথেষ্ট হতো; আমি শুধু এগুলো চুষেই জীবন কাটিয়ে দিতাম, আর কিছু খাওয়া-দাওয়ার প্রয়োজন হতো না।”

তিনি আরও বলতেন—“যদি আমার জন্য ছাই খাওয়া বৈধ হতো, আমি তাই খেতাম। যদি আমার জন্য বাঁশ ফালি করে অর্ধেক দিয়ে লুঙ্গি আর অর্ধেক দিয়ে চাদর বানানো বৈধ হতো, আমি তাই করতাম।”

জাফর ইবনে সুলাইমান থেকে বর্ণিত, মালেক ইবনে দিনার (রহ.) বলতেন—“আমার ইচ্ছে হয় যে, মৃত্যুর পর আমি বাঁধা অবস্থায় আমার রবের কাছে গিয়ে পৌঁছাই, যেমন পালানো দাসকে তার প্রভুর কাছে বাঁধা অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়।”

উসমান ইবনে ইবরাহীম (রহ.) বলেন, মালেক ইবনে দিনার তাঁর এক সাথিকে বলেছিল“আমার তো ইচ্ছা হয় টক দুধসহ এক টুকরা রুটি খেতে।”তখন লোকটি গিয়ে টক দুধ আর রুটি নিয়ে এলো। মালেক রুটির উপর দুধ রাখলেন, তারপর তাকিয়ে দেখতে লাগলেন। তারপর বললেন—“হে আমার নফস, আমি তোমাকে এই খাবারের জন্য চল্লিশ বছর ধরে চাওয়া থেকে বিরত রেখেছি। আজ তুমি আমাকে পরাজিত করতে চাও? দূরে যাও, আমি এটা খাবো না।”

সালাম ইবনে আবি মুতী (রহ.) বলেন, “আমরা এক রাতে মালেক ইবনে দিনারের ঘরে প্রবেশ করলাম। ঘরে কোনো প্রদীপ ছিল না, আর তাঁর হাতে একটি রুটি ছিল, তিনি তা খাচ্ছিলেন। আমরা বললাম,“আবু ইয়াহ্ইয়া, আপনার কাছে প্রদীপ নেই? রুটি রাখার জন্য কিছু নেই?” তিনি বললেন,“আমাকে আমার মতো থাকতে দাও। আল্লাহর কসম, অতীত জীবনের জন্য আমি অনুতপ্ত।”

মালেক ইবনে দিনার বসরার বাজারে ঘুরতেন, সুস্বাদু জিনিসপত্র দেখতেন যেগুলো তাঁর নফস চায়, তারপর ঘরে ফিরে নিজেকে বলতেন—“হে নফস, খুশি হও, আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে যা থেকে বঞ্চিত করেছি তা তোমার অপমানের কারণে নয়, বরং তোমার মর্যাদার কারণে।”

আবদুল মালিক ইবনে কুরাইব (রহ.) বলেন, বসরার এক নেককার ব্যক্তি আমাকে জানালেন: মালিক ইবনে দিনারের বাড়িতে একবার আগুন লাগল। তখন তিনি কেবল কুরআনের কপি ও একটি চাদর নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। লোকেরা তাঁকে বলল, “হে আবু ইয়াহ্ইয়া, বাড়িটা আগুনে পুড়ে যাচ্ছে।”তিনি বললেন,“বাড়িতে তো কেবল ধাতব জিনিসপত্র আছে, ওগুলো পুড়ে গেলে আমার কিছু যায় আসে না।”

জাফর বলেন, “আমি মালিক ইবনে দিনারের কাছে বসেছিলাম। তখন হিশাম ইবনে হাসান এলেন। তিনি, সাঈদ ইবনে আবি আরুবাহ এবং হুশাইব প্রায়ই তাঁর কাছে আসতেন অন্তরের প্রশান্তির জন্য।

হিশাম জিজ্ঞেস করলেন, “আবু ইয়াহ্ইয়া কোথায়?” আমরা বললাম: “তিনি বাজারের সবজি বিক্রেতার কাছে আছেন।”তিনি সেখানে গেলেন। মালিক ইবনে দিনার তাঁকে বললেন,“হে হিশাম, আমি এই সবজি বিক্রেতাকে প্রতি মাসে এক দিরহাম ও দুই দানিক দিই। এর বিনিময়ে প্রতি মাসে সে আমাকে ষাটটি রুটি দেয়। প্রতিদিন রাতে আমি দুটি রুটি খাই। যদি তা গরম পাই তবে সেটাই আমার তরকারি। হিশাম, আমি দাউদ (আ.)–এর জবুর কিতাবে পড়েছি— ‘হে আমার রব, আমি আমার চিন্তা-দুঃখ তোমার কাছে প্রকাশ করছি, আর তুমি আসমানের ওপরে থেকে আমার চিন্তাগুলো দেখছো। হিশাম, তুমি ভেবে দেখো, তোমার চিন্তা কী?”

হারিস ইবনে নুহবান (রহ.) বলেন, আমি মক্কা থেকে ফিরে এসে মালিক ইবনে দিনারকে একটি পানির পাত্র (রাকওয়া) উপহার দিলাম। একদিন তাঁর কাছে গেলাম। তিনি বললেন,“হে হারিস, এই পাত্রটি নিয়ে যাও, এটি আমার হৃদয়কে ব্যস্ত করে ফেলেছে।”আমি বললাম, “হে আবু ইয়াহ্ইয়া, আমি তো এটি আপনার জন্য এনেছি যাতে আপনি এর মাধ্যমে অজু করেন ও পানি পান করেন।”তিনি বললেন,“হে হারিস, আমি যখন মসজিদে ঢুকি, শয়তান আমাকে কানে কানে বলে— ‘মালিক, তোমার পাত্রটি চুরি হয়ে গেছে।’তাই এটি আমার মনকে ব্যস্ত রাখছে।”

হুসাইন ইবনে আলী আল-হালওয়ানি বলেছেন, ডাকাতরা মালিক ইবনে দিনারের ঘরে প্রবেশ করল, কিন্তু ঘরে কিছুই পেল না। তারা যখন বেরিয়ে যেতে চাইল, তখন মালিক বললেন,“তোমাদের ক্ষতি কী, যদি বেরোনোর আগে দুই রাকাত নামাজ পড়ে যাও?” ৭

তিনি আরও বলতেন,“আমার জীবনে এমনও বছর আসে যে, পুরো বছরে একবারও মাংস খাই না। কেবল ঈদুল আজহার দিন আমার কুরবানির অংশ থেকে খাই, কারণ সেদিনই এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।” ৮

জীবন-জীবিকা:

মুহাম্মদ ইবনে উমর বলেন, মালেক ইবনে দিনার (রহ.)-এঁর জীবিকা ছিল সামান্য। তাঁর কাছে দুটি দিরহাম থাকত: একটি কাগজ কেনার জন্য, আরেকটি খেজুর পাতার জন্য, যেগুলো দিয়ে কিছু তৈরি করতেন। তাঁর গোটা বছরের তরকারি ছিল কেবল দুই ফালস মূল্যের লবণ।

তিনি হাতে কুরআনের অনুলিপি তৈরি করতেন।। এর বিনিময়ে কখনো নিজের পরিশ্রমের চেয়ে বেশি নিতেন না। তিনি একটি মাসহাফ চার মাসে লিখতেন। তিনি বলতেন,“আমি দোকানদারকে প্রতি মাসে এক দিরহাম ও দেড় দানিক দিই। এর বিনিময়ে সে আমাকে ৬০ রুটি দেয়, প্রতিদিন রাতে আমি দুটি করে রুটি খাই। ৯

কুরআন ও কারিদের সম্পর্কে তাঁর অভিব্যক্তি:

হজরত মালেক ইবনে দিনার বলতেন, ‘হে কুরআন বহনকারীরা, কুরআন তোমাদের হৃদয়ে কী ফল দিয়েছে? নিশ্চয়ই কুরআন হলো মুমিনের বসন্ত, যেমন বৃষ্টি হলো জমিনের বসন্ত। কখনো বৃষ্টি আবর্জনার উপরও পড়ে, তবুও ভেতরের দানাটি অঙ্কুরিত হয়ে সবুজ হয় ও সৌন্দর্য লাভ করে।

কোথায় তারা, যারা একটি সুরার মানুষ?

কোথায় তারা, যারা দুই সুরার মানুষ?

তোমরা এগুলো নিয়ে কী কাজ করেছ?”

ইবনে বাকুউইহ্ বর্ণনা করেন, মালেক ইবনে দিনার বলেছিলেন,“আমাদের যুগের কারিদের দৃষ্টান্ত হলো এক শিকারির মতো, যে ফাঁদ পাতল এবং তাতে একটি শস্যদানা রাখল। একটি চড়ুই এসে বলল, ‘এটা মাটির নিচে কেন লুকানো?’

সে বলল, ‘এটা বিনয়।’

চড়ুই বলল, ‘তাহলে তুমি ঝুঁকেছ কেন?’

সে বলল, ‘অনেক ইবাদতের কারণে।’

চড়ুই বলল, ‘এই শস্যদানা কেন রেখেছ?’

সে বলল, ‘আমি এটা রোজা পালনকারীদের জন্য রেখেছি।’

কিন্তু যখন মাগরিব হলো, চড়ুই সেটি খেতে এগোলো, এবং ফাঁদ তাকে চেপে ধরল।

চড়ুই বলল, ‘যদি সব ইবাদতকারী তোমার মতো হয়, তবে আজ ইবাদতে কোনো কল্যাণ নেই।’১০

“এই যুগের কুরআন পাঠকদের উদাহরণ হলো সেই রান্না করা ঝোলের মতো— যার গন্ধ ভালো, কিন্তু স্বাদহীন।” ১১

বসরার গভর্নরের সমালোচনা:

জাফর ইবনে সুলাইমান আদ-দাব’ঈ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন বসরার গভর্নর অহংকারী ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তখন মালিক বিন দিনার তাকে ডেকে বললেন, ‘তোমার হাঁটার ধরন পাল্টাও, এই হাঁটা আল্লাহ এবং তাঁর রসুল অপছন্দ করেন।’গভর্নরের সহকারীরা তাকে থামানোর চেষ্টা করল। সে বলল, ‘তাকে ছেড়ে দাও।’

তারপর সে মালিক বিন দিনারকে বলল, ‘হে মালিক, আমি মনে করি তুমি আমাকে চেনো না।’মালিক ইবনে দিনার বললেন, ‘আমার চেয়ে কে তোমাকে বেশি চেনে? তোমার শুরু ছিল এক ফোটা বীর্যতে, তোমার শেষ হবে একটি দুর্গন্ধময় লাশে, আর এর মাঝে তুমি যা বহন করো তা ময়লা-আবর্জনা।’ এ কথা শুনে গভর্নর মাথা নত করে চলে গেলেন।১২

দরবারী বন্ধুর ঘটনা:

ইমাম ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেন: হজরত মালেক ইবনে দিনারের এক বন্ধু ছিল, যে শাসকের সেবা করতো। একদিন তাকে বন্দি করা হলো এবং শিকল পরানো হলো। মালেক ইবনে দিনার তার সাথে দেখা করতে গেলেন। তাঁকে বাঁধা অবস্থায় দেখে মালেক ইবনে দিনার ব্যথিত হলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন,“কে তোমাকে বেঁধেছে?” সে বলল, “সুলতান।”মালেক ইবনে দিনার তার মাথার ওপরে ঝুলানো ঝুড়ি দেখলেন। জিজ্ঞেস করলেন: “এটা কী?” বন্ধু বলল, “এতে খাবার আছে।”মালেক ইবনে দিনার সেটা নামিয়ে দেখলেন— মুরগি, মিষ্টান্ন আর বিশেষ রুটি। তখন মালেক বললেন,“আল্লাহর কসম, তোমাকে এগুলোই বেঁধে রেখেছে ।”১৩

চাঁদাবাজদের নসিহত:

ইমাম ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেন, কিছু ডাকাত এক ব্যবসায়ীর জাহাজ আটকে দিলো। সে মালেক ইবনে দিনারকে খবর পাঠাল। মালেক ইবনে দিনার এলেন। তাঁকে দেখে তারা সম্মান জানাল, জাহাজ ছেড়ে দিলো এবং বলল, “হে মালেক ইবনে দিনার, আমাদের জন্য দোয়া করুন।”

তাদের পাশে একটি হাঁড়ি ঝুলছিল, যেখানে তারা মানুষের কাছ থেকে আদায় করা টাকা রাখত। মালেক ইবনে দিনার বললেন, “তোমরা ওই হাঁড়িকে বলো যেন সে তোমাদের জন্য দোয়া করে! আমি কীভাবে তোমাদের জন্য দোয়া করব, যখন হাজারো মানুষ তোমাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করছে? তুমি কি মনে করো, একজনের দোয়া কবুল হবে, আর হাজার জনেরটা প্রত্যাখ্যাত হবে?” ১৪

এক যুবক ও মালেক ইবনে দিনারের ঘটনা:

আবু আবদুল্লাহ ইবনে বাকুউইহ্ বর্ণনা করেন, জাফর ইবনে সুলাইমান বলেন, আমি মালেক ইবনে দিনারের সঙ্গে বসরার রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম। সেখানে এক সুন্দর যুবক প্রাসাদ নির্মাণ করছিল এবং নির্দেশ দিচ্ছিল, “এটা করো, ওটা করো।”মালেক ইবনে দিনার তার কাছে গিয়ে বললেন,“তুমি এ প্রাসাদের পেছনে কত খরচ করার ইচ্ছা করছো?” যুবক বলল: “এক লক্ষ দিরহাম।”মালেক ইবনে দিনার বললেন,“এ টাকা আমাকে দাও, আমি তা সদকা করব, আর আল্লাহর কাছে তোমার জন্য জান্নাতে প্রাসাদ নিশ্চিত করব। যেখানে থাকবে খোরাস, গম্বুজ, হুর ও প্রাসাদ।

”যুবক বলল, “আমাকে আজ রাত পর্যন্ত সময় দাও।”মালেক ইবনে দিনার রাজি হলেন। সেদিন রাতভর মালেক ইবনে দিনার কান্না ও দোয়া করতে লাগলেন। ভোরে যুবক তার অর্থ নিয়ে এলো। মালেক ইবনে দিনার কাগজ-কালি আনালেন এবং লিখলেন,“মালেক ইবনে দিনার অমুকের পুত্র অমুকের জন্য আল্লাহর কাছে অঙ্গীকার করেছেন যে, তাঁর জন্য জান্নাতে প্রাসাদ হবে।”যুবকটি দলিলটি নিল এবং মালেক ইবনে দিনারকে টাকা দিয়ে দিলো। মালেক ইবনে দিনার সেই টাকা গরিব ও মিসকিনদের মাঝে বিলিয়ে দিলেন।

চল্লিশ দিন পর, মালেক ইবনে দিনার একদিন ফজরের নামাজ শেষে মেহরাবে বসা ছিলেন। হঠাৎ দেখলেন— সেই কাগজটি তাঁর সামনে রাখা। এর পেছনে নুরানি অক্ষরে লেখা আছে,“এটি মহান ক্ষমাশীল আল্লাহর পক্ষ থেকে মালেক ইবনে দিনারের জন্য। আমরা ওই যুবকের জন্য প্রতিশ্রুত প্রাসাদ দিয়েছি, বরং তাকে আরও সত্তরটি প্রাসাদ অতিরিক্ত দিয়েছি!”

এটা দেখে মালেক ইবনে দিনার ভীত হলেন এবং যুবকের বাড়িতে ছুটলেন। গিয়ে দেখলেন বাড়ির দরজা কালো কাপড়ে ঢাকা, কান্নার শব্দ আসছে। জিজ্ঞেস করলেন, “কি হয়েছে?” লোকজন বলল, “যুবকটি গতরাতে মারা গেছে।”মালেক ইবনে দিনার জিজ্ঞেস করলেন, “তাকে কে গোসল দিয়েছে?” তারা বলল: “অমুক।”মালেক ইবনে দিনার তাকে ডাকলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন,“মৃত্যুর আগে সে তোমাকে কী অসিয়ত করেছিল?” গোসলদাতা বলল, “সে আমাকে একটি কাগজ দিয়েছিল এবং বলেছিল, ‘এটা আমার কাফনের সাথে রেখে দিও।”মালেক বিন দিনার নিজের কাছে থাকা কাগজটি বের করে দেখালেন। গোসলদাতা বলল, “আল্লাহর কসম, এটাই সে কাগজ!” সে কেঁদে উঠল, সাথে সাথে সারা বাড়িতে কান্নার রোল উঠল।

এই ঘটনা দেখে এক প্রতিবেশী যুবক মালেক ইবনে দিনারকে বলল,“হে মালেক ইবনে দিনার, আমার কাছ থেকে দুই লক্ষ দিরহাম নাও, আর আমার জন্যও এরকম লিখে দাও।”মালেক ইবনে দিনার বললেন,“হায় হায়, যা হয়ে গেছে, তা হয়ে গেছে।”১৫

বাণী-চিরন্তন:

১. মালেক ইবনে দিনার (রহ.) বলতেন,“মানুষ দুনিয়া থেকে চলে গেছে অথচ দুনিয়ার সবচেয়ে মিষ্টি জিনিসটি তারা আস্বাদনই করেনি।”লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, “হে আবু ইয়াহইয়া, সেটি কী?” তিনি বললেন, “আল্লাহর পরিচয় লাভ।”

২.“কোনো সুখ-ভোগই আল্লাহর জিকিরের মতো নয়।”

৩.“যেমন অসুস্থ শরীরে কোনো খাবার, পানীয়, ঘুম বা বিশ্রাম কাজে আসে না; তেমনি হৃদয় যদি দুনিয়ার প্রেমে আসক্ত হয়, তবে উপদেশ-নসিহত তাতে কোনো প্রভাব ফেলে না।”

৪. ইন্তেকালের আগে তিনি বলেছেন,“আমি ইচ্ছে করছি আমার মৃত্যুর পর আমাকে আমার রবের কাছে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হোক, দাস পালিয়ে গেলে যেমন প্রভুর কাছে ফেরত পাঠানো হয়, তেমন অবস্থায় যেন আমি তার কাছে যাই।”

তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,“হে আল্লাহ, আপনি জানেন, আমি দুনিয়াতে কখনো পেট বা যৌনতার জন্য থাকতে ভালোবাসিনি।”

৫. “যে সঙ্গ থেকে কল্যাণ পাওয়া যায় না, তাকে এড়িয়ে চল। আর যে জ্ঞান কর্মের উদ্দেশ্যে অর্জন করা হয়, তা শিখিয়ে দেয় বিনয়; কিন্তু যে জ্ঞান কর্মহীন উদ্দেশ্যে শিখে, তা বাড়ায় অহংকার।”

৬. “মুমিন ও মুনাফিক কখনো মেলামেশা করবে না, যতক্ষণ না নেকড়ে ও মেষশাবক একত্র হয়।”

৭.“মুমিনের উদাহরণ হলো মুক্তার মতো। যেখানে থাকে, তার সৌন্দর্য সেখানেই থাকে।”

৮.“সৎকর্মশীলরা একে অপরকে তিনটি বিষয়ে উপদেশ দিত— জিহ্বাকে বন্দি রাখা, প্রচুর ইস্তিগফার, এবং নিভৃতচারিতা।”

৯.“প্রত্যেক খতিবের বক্তব্য তার আমলের উপর উপস্থাপন করা হয়। যদি সে সত্যবাদী হয়, তার বক্তব্যও সত্য হয়। আর যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তবে তার ঠোঁট আগুনের কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলা হয়; বারবার কাটা হলে আবার জন্মায়।”

১০.“কোনো ব্যক্তি যদি হারাম থেকে একটি দিরহাম ফেরত দেয়, তবে তা তার জন্য এক লক্ষ দিরহাম দান করার চেয়ে উত্তম।”

১১.“যদি দেখো হৃদয় কঠিন হয়ে গেছে, শরীর দুর্বল, আর রিজিক কমে গেছে, তবে বুঝে নাও তুমি অপ্রয়োজনীয় কথা বলেছ।”

১২.“আল্লাহর বান্দা হৃদয়ের কঠোরতার চেয়ে বড়ো কোনো শাস্তি পায় না।”

১৩. তিনি কবিতা পাঠ করতেন—

কোথায় সেই বড়ো মানুষ আর তুচ্ছ মানুষ?

কোথায় সেই গর্বিত, শক্তিশালী আর ক্ষমতাবান?

আমি কবরের কাছে গিয়ে ডাক দিলাম —

কোথায় সেই হাজির ডাক শোনার মানুষ?

কোথায় রাজকীয় শাসক?

এক অদৃশ্য কণ্ঠ উত্তর দিল—

সবাই বিলীন হয়ে গেছে, কেউ খবরদাতা নেই।

মাটির কন্যারা (কবর) তাদের ঢেকে রেখেছে।

হে জিজ্ঞাসু, তারা সবাই চলে গেছে, খবরও মরে গেছে।

সেই রূপগুলো বিলীন হয়ে গেছে।

তুমি কি এতে শিক্ষা নেবে না?”

এরপর তিনি বললেন—

ধিক এই দুনিয়া ও তার চাওয়াকে!” ১৬

১৪. ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেন, মালেক ইবনে দিনার রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলতেন,“মানুষের জন্য এতটুকুই গোনাহ যথেষ্ট যে, সে বিশ্বাসঘাতকদের আমানতদার হয়। আর মানুষের জন্য এতটুকুই মন্দ যথেষ্ট যে, সে নিজে নেককার না হয়েও নেককারদের সমালোচনা করে।”

১৫.“তুমি যদি সত্যবাদী না হও, তবে বৃথা কষ্ট কোরো না।”

১৬. আবু নু’আইম বর্ণনা করেছেন, মালেক ইবনে দিনার বলতেন—“তোমরা দুনিয়া থেকে সাবধান থাকো। কেননা এ দুনিয়া হলো এক জাদুকরী বস্তু, যা আলিমদের হৃদয়কেও মুগ্ধ করে ফেলে।”

১৭. “আলিম যদি নিজের জ্ঞান অনুযায়ী আমল না করে, তবে তার উপদেশ মানুষের হৃদয়ে প্রভাব ফেলে না, যেমন শিশিরফোঁটা মসৃণ পাথর থেকে গড়িয়ে পড়ে যায়।”

১৮.“এক নারীর সন্তানকে বাঘে ধরে নিয়ে গেল। তখন সে একটি লুকমা সদকা করল। ফলে বাঘ তার সন্তানকে ছেড়ে দিল। আর আকাশ থেকে আওয়াজ এলো— ‘এক লুকমার বিনিময়ে এক লুকমা।”১৭

১৯. “একজন মানুষ সুন্দরী ধনী নারীকে বিয়ে করে, তারপর তার লোভ-চাহিদা পূরণে মগ্ন হয়। অথচ সে যদি কোনো এতিমা-দরিদ্রাকে বিয়ে করত, তাকে পোশাক দিত, তেল মাখাত, তবে তার প্রতিটি কাজে সওয়াব পেত।”

২০. মুসলিম (রহ.) বলেন, মালেক ইবনে দিনার বলতেন—“যখন থেকে আমি মানুষকে চিনেছি, তখন থেকে তাদের প্রশংসায় আমি খুশি হইনি, আবার তাদের নিন্দাতেও কষ্ট পাইনি।”লোকেরা জিজ্ঞেস করল, “কেন?” তিনি বললেন, “কারণ প্রশংসাকারী অতিরঞ্জিত করে, আবার নিন্দাকারীও অতিরঞ্জিত করে।”

২১. মুহাম্মদ ইবনে আবদুল আজিজ ইবনে সালমান বলেন, আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি, তিনি মালেক ইবনে দিনারকে বলতে শুনেছেন—“আশ্চর্য, যে জানে মৃত্যু তার চূড়ান্ত গন্তব্য, কবর তার আবাসস্থল, সে কীভাবে দুনিয়ায় নিশ্চিন্ত থাকতে পারে? কীভাবে এ দুনিয়ায় তার জীবন মিষ্ট হতে পারে?” এরপর মালেক বিন দিনার এত কেঁদেছিলেন যে, অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান।

২২. আবু সামীর (রহ.) থেকে বর্ণিত, মালেক ইবনে দিনার (রহ.) বলতেন—“প্রত্যেক কিছুর একটি বীজ আছে। আর নেক আমলের বীজ হলো দুঃখ। কেউ এ পথে ধৈর্য ধরতে পারে না, যতক্ষণ না আখিরাতের দুঃখ তাকে ঘিরে ধরে। আল্লাহর কসম, কখনো কোনো বান্দার অন্তরে আখিরাতের দুঃখ ও দুনিয়ার আনন্দ একসাথে থাকতে পারে না। এদের একজন অবশ্যই অন্যজনকে বিতাড়িত করে।”

২৩.“আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তাঁর দুনিয়ার জিনিসপত্র কমিয়ে দেন, তাঁর দায়-দায়িত্ব হালকা করে দেন এবং বলেন, ‘আমার সামনে থেকে যেয়ো না।’ তখন সে পুরোপুরি তার রবের ইবাদতে মগ্ন অবস্থায় রয়ে যায়। আর যখন আল্লাহ কোনো বান্দাকে অপছন্দ করেন, তখন তাঁর দিকে দুনিয়ার ভোগবিলাস ঠেলে দেন এবং বলেন, ‘আমার সামনে থেকে দূরে যাও, আমি চাই না তোমাকে আমার সামনে দেখতে।’ তখন তার হৃদয় দুনিয়ার কোনো ভূমি বা ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে ঝুলে থাকে।”

২৪. জাফর (রহ.) বলেন, আমি মালিক ইবনে দিনারকে বলতে শুনেছি,“হৃদয়ে যদি দুঃখ না থাকে তবে তা ধ্বংস হয়ে যায়; যেমন একটি ঘর মানুষহীন হলে ভেঙে পড়ে।”

২৫.“যাদুকরী নারীদের (অলঙ্কারময় কথার) থেকে বেঁচে থাকো, বেঁচে থাকো, কারণ তারা আলেমদের হৃদয়কে মুগ্ধ করে দেয়।”

২৬. যদি জানতাম আমার হৃদয় শহরের আবর্জনার স্তূপে বসলে ঠিক হয়ে যাবে, তবে সেখানেই বসতাম।”

২৭.“আমি চাই যে কিয়ামতের দিনে আল্লাহ আমাকে অনুমতি দিন, আমি তাঁর সামনে একটি মাত্র সিজদা করি, তারপর তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হন, এবং বলেন, হে মালিক, মাটি হয়ে যা।”

২৮.“তুমি যদি জ্ঞান অর্জন কর আমলের জন্য, তবে জ্ঞান তোমাকে বিনয়ী করবে। কিন্তু যদি জ্ঞান চাও আমল ছাড়া, তবে তা তোমার অহংকার ছাড়া আর কিছু বাড়াবে না।”

২৯. “যদি কারো ইচ্ছে করার অধিকার থাকত, তবে আমি চাইতাম আখিরাতে আমার জন্য খেজুর কাঠের একটি ছোটো ঘর থাকুক, সেখানে আমি পানি পান করব, আর জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাব।”

৩০. তিনি তাঁর জামাতা মুগিরাহ ইবনে হাবিবকে বলতেন,“হে মুগিরাহ, যে বন্ধু বা সঙ্গী থেকে তোমার দ্বীনের কোনো উপকার নেই, তাকে ছেড়ে দাও।”

৩১.“হে আমার ভাইয়েরা, একটা সত্য কথা বলি— যদি প্রস্রাবের প্রয়োজন না থাকত, তবে আমি মসজিদ থেকে বের হতাম না।”

৩২. “আসল আলেম সেই ব্যক্তি, যার ঘরে গেলে যদি তাঁকে নাও পাও, তবুও ঘরের কিছু অবস্থা দেখে তার আখিরাতের প্রস্তুতি বোঝা যায়, যে ঘরে থাকে এক কোণে নামাজের মাদুর, একটি কোরআন আর অজুর পাত্র।”

৩৩.“সৎ লোকদের হৃদয় নেক কাজের উত্তাপে উথলে উঠে আর অসৎ লোকদের হৃদয় পাপের উত্তাপে উথলে উঠে। আল্লাহ তোমাদের দুশ্চিন্তা দেখেন, তাই ভেবে দেখো তোমাদের চিন্তা কী?” ১৮

ইন্তেকাল:

তাঁর মৃত্যুর সন নিয়ে মতভিন্নতা আছে। ইবনে সাঈদ বলেন, তিনি প্লেগ শুরু হওয়ার কিছু আগে মারা যান। যে প্লেগ হয়েছিল ১৩১ হিজরিতে। অন্যরা বলেন, তিনি ১২৭ হিজরিতে মারা যান। আবার কেউ বলেন, ১২৩ হিজরিতে। ইমাম ইবনে আবিদ দুনিয়া বর্ণনা করেন, আব্দুল ওয়াহিদ ইবনে জায়েদকে জিজ্ঞেস করা হলো— মালেক ইবনে দিনারের মৃত্যুর কারণ কী? তিনি বললেন, “তিনি একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন। স্বপ্নে মুসলিম ইবনে ইয়াসারকে দেখলেন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ আমার সাথে কী করেছেন জানো? তিনি আমাদের সৎকর্ম গ্রহণ করেছেন এবং গুনাহ ক্ষমা করেছেন।’মালেক এটা শুনে জোরে হাহাকার করে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। কয়েকদিন অসুস্থ থাকার পর তাঁর হৃদয় ফেটে গিয়ে তিনি ইন্তিকাল করেন।”১৯