ইসলামের প্রথম শতকের জ্ঞানের অম্লান ধারা ও আধ্যাত্মিক সাধনার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন হজরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)। তিনি তাবেয়িদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবন ছিল অনন্য জ্ঞান, সততা, তাকওয়া ও দুনিয়াবিমুখতার এক মহাকাব্য। সাহাবিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার আলোকে তিনি ইসলামের বিভিন্ন শাখায় যেমন অবদান রেখেছেন, তেমনি আধ্যাত্মিকতার এক গভীর পথিকৃৎ হিসেবে নিজের অবস্থান স্থাপন করেছেন।
নাম ও পরিচয়:
তাঁর বংশধারা হলো সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ইবনে হাযন ইবনে আবি ওহাব ইবনে আমর ইবনে আইয ইবনে ইমরান ইবনে মাখযূম ইবনে ইয়াকাযাহ। তিনি একজন মহিমান্বিত ইমাম ও প্রসিদ্ধ আলেম। কুনিয়ত আবু মুহাম্মদ। কুরাইশ বংশোদ্ভূত এবং মাখজুম গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। তিনি ছিলেন মদিনাবাসীদের প্রধান আলেম এবং তাঁর সময়ে তিনি তাবেয়িদের সর্দার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন।
প্রসিদ্ধ মত অনুসারে হজরত ওমর (রাদিআল্লাহু আনহু)-এঁর খিলাফতের দুই বছর অতিবাহিত হওয়ার পর তাঁর জন্ম হয়। অর্থাৎ, ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দ। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় বলা হয়েছে ওমর (রাদিআল্লাহু আনহু)-এঁর খিলাফতের চার বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর মদিনা মুনাওয়ারাতেই তাঁর জন্ম হয়। ১
সাহাবিদের সোহবতে ইলম অর্জন ও হাদিস বর্ণনা:
ওয়াকিদী বর্ণনা করেন, আমাকে হিশাম ইবনে সাদ অবহিত করেছেন; তিনি বলেন, আমি যুহরীকে বলতে শুনেছি। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল— সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব কার কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন? তিনি উত্তরে বলেন, “তিনি জায়েদ ইবনে সাবিত (রাদিআল্লাহু আনহু)-এঁর কাছ থেকে ইলম গ্রহণ করেছেন।”সাথে তিনি সাদ, ইবনে আব্বাস ও ইবনে ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এঁর সাহচর্যে থেকেছেন। তিনি নবী ﷺ-এঁর স্ত্রীগণের কাছে থেকেও জ্ঞান অর্জন করেছেন। বিশেষ করে আয়েশা ও উম্মে সালামা (রাদিআল্লাহু আনহুমা)-এঁর নিকট থেকে। এমনকি তিনি উসমান, আলী, সুহাইব ও মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এঁর কাছ থেকেও হাদিস শুনেছেন।
তাঁর অধিকাংশ মুসনাদ (সংযুক্ত সনদযুক্ত) বর্ণনা এসেছে আবু হুরাইরা (রাদিআল্লাহু আনহু)-এঁর সূত্রে। আর এ কথাও বলা হয়েছে যে, “হজরত ওমর ও উসমান (রাদিআল্লাহু আনহুম) যেসব ফয়সালা প্রদান করেছেন, সে বিষয়ে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের চেয়ে অধিক জ্ঞানী আর কেউ নেই।”২
এছাড়াও ইবনে হাজার আসকালানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘তাহযিব আত-তাহযিব’ কিতাবে লিখেছেন— তিনি হজরত ওমর (রাদিআল্লাহু আনহু)-কে দেখেছেন এবং হজরত উসমান, হজরত আলী, যায়েদ ইবনে সাবিত, আবু মূসা আশআরী, সাদ, আয়িশা, আবু হুরাইরা, ইবনে আব্বাস, মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা এবং উম্মে সালামা (রাদিআল্লাহু আনহুম)দের কাছ থেকে হাদিস শুনেছেন; এছাড়া আরও অনেক সাহাবির কাছ থেকে তিনি ইলম গ্রহণ করেছেন। হজরত আলী, সাদ, উসমান, আবু মূসা, আয়িশা, উম্মে শরীক, ইবনে ওমর, আবু হুরাইরা, ইবনে আব্বাস, হাকিম ইবনে হিযাম, আবদুল্লাহ ইবনে আমর, তাঁর পিতা মুসাইয়্যিব এবং আবু সাঈদ (রাদিআল্লাহু আনহুম)—এঁদের থেকে বর্ণিত হাদিস সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম উভয় গ্রন্থেই স্থান পেয়েছে। ৩
ছাত্রবৃন্দ:
তাঁর কাছ থেকে অসংখ্য মানুষ ইলম অর্জন ও হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— ইদরিস ইবনে সুবাইহ, উসামা ইবনে যায়েদ আল-লাইসী, ইসমাইল ইবনে উমাইয়া, বশীর, আবদুর রহমান ইবনে হারমালা, আবদুর রহমান ইবনে হুমাইদ ইবনে আবদুর রহমান, আবদুল করীম আল-জাজরী, আবদুল মাজিদ ইবনে সুহাইল, উবাইদুল্লাহ ইবনে সুলাইমান আল-আবদী, উসমান ইবনে হাকিম, আতাউল খুরাসানী, উকবা ইবনে হুরাইস, আলী ইবনে জুদ‘আন, আলী ইবনে নুফাইল আল-হাররানী, উমারা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে তু’মা, আমর ইবনে শু‘আইব, আমর ইবনে দিনার, আমর ইবনে মুররা, আমর ইবনে মুসলিম আল-লাইসী, গাইলান ইবনে জারীর, কাসিম ইবনে আসিম, তাঁর পুত্র মুহাম্মদ ইবনে সাঈদ, কাতাদা, মুহাম্মদ ইবনে সাফওয়ান, মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আবি লাবিবা, আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে আলী, মুহাম্মদ ইবনে আমর ইবনে আতা, যুহরী, ইবনুল মুনকাদির, মা‘বাদ ইবনে হুরমুয, মামার ইবনে আবি হাবিবা, মূসা ইবনে ওয়ারদান, মাইসারা আল-আশজাঈ, মাইমূন ইবনে মিহরান, আবু সুহাইল নাফি‘ ইবনে মালিক, আবু মা‘শার নাজীহ আস-সিনদী (যার বর্ণনা তিরমিযীতে রয়েছে), হাশিম ইবনে হাশিম আল-ওয়াক্কাসী, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-আনসারী, ইয়াযিদ ইবনে কুসাইত, ইয়াযীদ ইবনে নু‘আইম ইবনে হাযযাল, ইয়াকুব ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আল-আশাজ্জ, ইউনুস ইবনে সাইফ, আবু জাফর আল-খাতমী এবং আবু কুররা আল-আসাদী প্রমুখ।[৪]
জ্ঞানের প্রখরতা:
তিনি ছিলেন তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীদের অন্যতম। হজরত কাতাদা, মাকহুল, যুহরী প্রমুখ এক বাক্যে স্বীকার করেছেন যে, “আমি (তাঁরা) সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের চেয়ে অধিক জ্ঞানী কাউকে দেখিনি।”
আলী ইবনুল মাদিনী (রহ.) বলেন, ‘তাবেয়িদের মধ্যে আমি ইবনুল মুসায়্যিবের চেয়ে অধিক বিস্তৃত জ্ঞানের অধিকারী কাউকে জানি না। আমার কাছে তিনি তাবেয়িদের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন।’৫
ইবাদত ও রিয়াজত:
তিনি ছিলেন একজন মুখলিস ইবাদতগুজার। সর্বদা নামাজ, রোজা ও ইবাদতে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। আত্তাফ ইবনে খালিদ বর্ণনা করেন, তিনি আবু হারমালা থেকে, তিনি ইবনুল মুসায়্যিব থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, “চল্লিশ বছর ধরে আমার কোনো নামাজই জামাতে আদায় করা থেকে বাদ পড়েনি।”
সুফিয়ান আস-সাওরী বর্ণনা করেন, তিনি উসমান ইবনে হাকিম থেকে শুনেছেন, তিনি বলেছেন, আমি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে বলতে শুনেছি, “ত্রিশ বছর ধরে এমন কোনো সময় আসেনি, যখন মুয়াজ্জিন আজান দিয়েছে অথচ আমি মসজিদে উপস্থিত ছিলাম না।”
হাম্মাদ ইবনে জায়েদ বর্ণনা করেন, আমাদেরকে ইয়াযীদ ইবনে হাজিম জানিয়েছেন যে, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব নিয়মিতভাবে একটানা নফল রোজা রাখতেন।
আবদুর রহমান ইবনে হারমালা বলেন, আমি ইবনুল মুসায়্যিবকে বলতে শুনেছি, “আমি চল্লিশ বার হজ আদায় করেছি।”৬।
তিনি আরও বর্ণনা করেন, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব একবার চোখের ব্যথায় আক্রান্ত হলেন। তাঁকে বলা হলো, ‘হে আবু মুহাম্মদ, আপনি যদি (মদিনার অদূরে) ‘আকিক’ উপত্যকায় যেতেন, তবে সেখানকার সবুজ প্রকৃতির দিকে তাকানো এবং বুনো নির্মল বাতাস আপনার চোখের জন্য উপকারী হতো।’ সাঈদ (রহ.) উত্তর দিলেন, ‘তাহলে এশা ও ফজরের জামাতে উপস্থিত হওয়ার ব্যাপারে আমি কী করব?’ (অর্থাৎ চোখের চিকিৎসার চেয়েও তাঁর কাছে মসজিদে জামাতে শরিক হওয়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল)।
কাতাদাহ (রহ.) থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব একদিন বললেন, ‘গত বিশ বছর ধরে আমি (নামাজের কাতারে) আমার সামনের কোনো মানুষের ঘাড় দেখিনি।’ (অর্থাৎ তিনি বিশ বছর ধরে সবসময় প্রথম কাতারে নামাজ পড়েছেন, ফলে তাঁর সামনে কেউ থাকত না)।
আবদুর রহমান ইবনে ইদ্রিস তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, ‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর এশার অজু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছেন (অর্থাৎ সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন)। তিনি বলতেন, ‘পঞ্চাশ বছর ধরে আমার কখনও প্রথম তাকবির (তাকবিরে উলা) ছুটেনি এবং পঞ্চাশ বছর ধরে আমি নামাজে কারও ঘাড় দেখিনি।’
ইয়াজিদ ইবনে আবি হাযেম থেকে বর্ণিত, ‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ‘সারদ’ রোজা রাখতেন (অর্থাৎ বছরের প্রায় প্রতিদিন রোজা রাখতেন, কেবল দুই ঈদ ও আইয়ামে তাশরিকের দিনগুলো ছাড়া)।’৭
জাফর ইবনে বুরকান, মায়মুন ইবনে মিহরান থেকে বর্ণনা করেন, আমি জানতে পেরেছি যে, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব টানা চল্লিশ বছর মসজিদে এমনভাবে কাটিয়েছেন যে, তিনি মসজিদে প্রবেশের সময় কখনো মুসল্লিদের নামাজ শেষ করে বের হয়ে আসতে দেখেননি (অর্থাৎ জামাত শুরু হওয়ার অনেক আগেই তিনি মসজিদে উপস্থিত থাকতেন)।৮
জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:
সুফিয়ান ইবনে উইয়াইনাহ থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই এই দুনিয়া অতি নীচ; আর এটি প্রত্যেক নীচ ব্যক্তির দিকেই বেশি ঝুঁকে থাকে। তবে দুনিয়ার চেয়েও বেশি নীচ হলো সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়াকে অন্যায়ভাবে গ্রহণ করে, অসৎ উপায়ে অনুসন্ধান করে এবং ভুল পথে ব্যয় করে।’৯
মদিনার ‘সাত ফুকাহা’র অন্যতম ও ফিকহের স্থপতি:
হজরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) ছিলেন মদিনার বিখ্যাত ‘সাত ফুকাহায়ে কিরাম’ (الفقهاء السبعة)-এর অন্যতম। তাঁর ফিকহি জ্ঞান, গভীর প্রজ্ঞা এবং শরয়ি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিচক্ষণতা ছিল অনন্য। তাঁর ফাতোয়া ও ইজতিহাদ এতটাই নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য ছিল যে, পরবর্তীকালের মহান ইমামগণও, যেমন ইমাম মালেক (রহ.), তাঁর জ্ঞানের গভীরতার প্রশংসা করতেন এবং তাঁকে ফিকহি ধারার অন্যতম স্থপতি হিসেবে গণ্য করতেন। তাঁর ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামি আইনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
হজরত মিস‘আর বর্ণনা করেন, তিনি সাঈদ ইবনে ইবরাহিম থেকে শুনেছেন যে, তিনি ইবনুল মুসায়্যিবকে বলতে শুনেছেন, “রসুলুল্লাহ ﷺ, আবু বকর কিংবা ওমর (রাদিআল্লাহু আনহুম)—তাঁরা যে ফায়সালা করেছেন, সে বিষয়ে আমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী আর কেউ নেই।”
উসামা ইবনে জায়েদ বর্ণনা করেন, তিনি নাফি থেকে বর্ণনা করেন যে, ইবনে ওমর (রাদিআল্লাহু আনহু) একবার সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের কথা উল্লেখ করে বলেন, “আল্লাহর কসম, তিনি নিঃসন্দেহে শীর্ষস্থানীয় মুফতিদের একজন।”
কুদামা ইবনে মুসা বলেন, সাহাবায়ে কেরাম জীবিত থাকাকালেই সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ফতোয়া দিতেন।
মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে হিব্বান বলেন, তাঁর যুগে ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.)। তাঁকে বলা হতো ‘ফকিহুল ফুকাহা’ তথা ‘ফকিহদের ফকিহ’।
ওয়াকিদি বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমাদেরকে সাওর ইবনে ইয়াযিদ জানিয়েছেন; তিনি মাকহুল থেকে বর্ণনা করেন যে, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ছিলেন আলেমদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আলেম।
আলী ইবনে হুসাইন (রহ.) বলেন, পূর্ববর্তী যুগের বর্ণিত আছারসমূহ (নবী-রসুলদের ঘটনা) সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী ছিলেন ইবনুল মুসায়্যিব এবং নিজস্ব ইজতিহাদ ও মতামতের ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন সর্বাধিক গভীর জ্ঞানের অধিকারী।
জাফর ইবনে বুরকান বলেন, আমাকে মাইমুন ইবনে মিহরান সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন, আমি যখন মদিনায় এলাম, তখন সেখানকার সর্বাধিক ফকিহ ব্যক্তির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। লোকেরা আমাকে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের দিকেই নির্দেশ করল। মাইমুন বলেন, আমি এ কথা দৃঢ়তার সাথেই বলছি, যদিও আমার সাক্ষাৎ হয়েছে আবু হুরাইরা ও ইবনে আব্বাস (রাদিআল্লাহু আনহুম)-এঁর সঙ্গেও।
ওমর ইবনে আল-ওয়ালিদ আশ-শান্নী বর্ণনা করেন, তিনি শিহাব ইবনে আব্বাদ আল-আসারী থেকে বর্ণনা করেন, আমি হজ আদায় করে মদিনায় এসেছিলাম। আমরা সেখানকার সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে লোকেরা বলল, ‘তিনি হলেন সাঈদ।’১০
খলিফারাও বিচারকার্যে তাঁর দ্বারস্থ হতেন:
মাআন ইবনে ঈসা, ইমাম মালিক (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ যখন মদিনার গভর্নর ছিলেন, তখন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে জিজ্ঞেস না করে কোনো ফয়সালা বা বিচারকার্য পরিচালনা করতেন না। একবার তিনি (মাসআলা জিজ্ঞাসা করার জন্য) এক ব্যক্তিকে তাঁর কাছে পাঠালেন। সেই ব্যক্তি ভুল করে তাঁকে ডেকে নিয়ে এলেন। সাঈদ (রহ.) দরবারে উপস্থিত হলে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, ‘দূত ভুল করেছে; আমি তো তাকে পাঠিয়েছিলাম আপনার মজলিসে গিয়ে মাসআলাটি জিজ্ঞাসা করে আসার জন্য (আপনাকে কষ্ট দিয়ে ডেকে আনার জন্য নয়)।’ ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বলতেন, ‘মদিনার এমন কোনো আলেম ছিলেন না যিনি নিজের ইলম নিয়ে আমার কাছে আসতেন না, তবে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের ইলম আমার কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো (অর্থাৎ তিনি কারও কাছে যেতেন না, বরং তাঁর কাছেই যেতে হতো)।’
সাল্লাম ইবনে মিসকীন ইমরান ইবনে আবদুল্লাহ আল-খুজায়ী থেকে বর্ণনা করেন, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব আমাকে আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। আমি আমার বংশ-পরিচয় দিলে তিনি বললেন, ‘তোমার পিতা মুয়াবিয়া (রা.)-এর খিলাফতকালে আমার মজলিসে বসতেন এবং আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেন।’ ইমরান বলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমার মনে হয় তাঁর (সাঈদের) কানে কোনো কিছু একবার প্রবেশ করলে তাঁর অন্তর তা চিরতরে গেঁথে নিত। আর আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে সাঈদ নিজের জীবনকে একটি মাছির চেয়েও তুচ্ছ মনে করতেন।’১১
জালিম শাসকের প্রতি বদদোয়া:
আফফান, হাম্মাদ ইবনে সালামাহ থেকে বর্ণনা করেন যে, আলী বিন জায়েদ সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে বললেন, ‘আপনার গোত্রের লোকেরা বলাবলি করে যে, আপনি নাকি এই কারণে হজ করতে যান না, আপনি মানত করেছেন কাবার দিকে তাকালেই ইবনে মারওয়ান (তৎকালীন জালিম শাসক)-এর বিরুদ্ধে বদদোয়া করবেন?’ সাঈদ (রহ.) উত্তরে বললেন, ‘না, আমি এমনটি করিনি। তবে আমি এমন কোনো নামাজ পড়ি না যেখানে তাদের (অত্যাচারী শাসকদের) বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি না। আর আমি বিশ বারেরও বেশি হজ ও ওমরাহ করেছি; অথচ আমার ওপর মাত্র একটি হজ ও একটি ওমরাহ ফরজ ছিল। আমি তোমার গোত্রের অনেককে দেখি যারা ঋণ করে হজ ও ওমরাহ করে, এরপর মারা যায়; কিন্তু তাদের ঋণ পরিশোধ হয় না। নফল হজ বা ওমরার চেয়ে একটি জুমার নামাজ আদায় করা আমার কাছে বেশি প্রিয়।’১২
রাজকীয় ভাতা বর্জন ও আত্মসম্মান:
সাল্লাম ইবনে মিসকীন ইমরান ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, সরকারি বায়তুল মালে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের প্রাপ্য ভাতার পরিমাণ জমে একত্রিশ হাজার (দিরহাম বা দিনার) ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাঁকে বারবার সেই অর্থ গ্রহণ করার জন্য ডাকা হতো, কিন্তু তিনি তা নিতে অস্বীকার করতেন। তিনি বলতেন, ‘আমার এই অর্থের কোনো প্রয়োজন নেই, যতক্ষণ না আল্লাহ আমার এবং বনী মারওয়ান (তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী)-এর মাঝে ফয়সালা করেন।’১৩
হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে শাসানো:
হাম্মাদ ইবনে সালামাহ আলী বিন জায়েদ থেকে বর্ণনা করেন, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘ব্যাপার কী, (অত্যাচারী শাসক) হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কেন আপনার কাছে লোক পাঠায় না, আপনাকে কোনো বিরক্ত করে না কিংবা কষ্ট দেয় না?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি ঠিক জানি না। তবে একবার সে (হাজ্জাজ) তার পিতার সাথে মসজিদে প্রবেশ করে এমনভাবে নামাজ পড়ছিল যে, রুকু এবং সেজদাগুলো ঠিকমতো পূর্ণ করছিল না। তখন আমি এক মুষ্টি কঙ্কর নিয়ে তাকে ছুড়ে মারলাম (সতর্ক করার জন্য)।’ ধারণা করা হয়, এই ঘটনার পর হাজ্জাজ বলেছিল, ‘এরপর থেকে আমি সবসময় ভালোভাবে নামাজ আদায় করি।’১৪
খলিফার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান:
ইবনে সা’দ এর ‘তাবাকাত’ গ্রন্থে মাইমুন ইবনে মিহরান থেকে বর্ণিত, একবার খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান মদিনায় এলেন। দুপুরে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় তিনি জেগে উঠলেন এবং তাঁর দ্বাররক্ষীকে বললেন, ‘দেখো তো, মসজিদে আমাদের সাথে গল্প করার মতো (মুহদ্দিস বা গল্পকার) কেউ আছে কি না?’ দ্বাররক্ষী বের হয়ে দেখল সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব নিজের জ্ঞানগর্ভ মজলিসে বসে আছেন। সে এমন এক জায়গায় দাঁড়াল যেখান থেকে সাঈদ (রহ.) তাকে দেখতে পাচ্ছিলেন। এরপর সে হাতের ইশারায় তাঁকে ডাকল। ডেকে বাদশার কাছে চলে যেতে লাগল। কিন্তু সাঈদ জায়গা থেকে নড়লেন না। কিছুদূর গিয়ে দ্বাররক্ষী দেখল যে, সাঈদ আসছেন না। সে ভাবল, ‘মনে হয় বৃদ্ধ লোকটি খেয়াল করেননি।’ সে আরও কাছে গিয়ে চোখে ইশারা করল এবং বলল, ‘আপনি কি দেখছেন না যে, আমি আপনাকে ইশারা করছি?’ সাঈদ (রহ.) শান্তভাবে বললেন, ‘তোমার প্রয়োজন কী?’ দ্বাররক্ষী বলল, ‘আমিরুল মুমিনীনের ডাকে সাড়া দিন।’ সাঈদ (রহ.) পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘তিনি কি আমার কাছেই তোমাকে পাঠিয়েছেন?’ সে বলল, ‘না, তবে তিনি বলেছেন আমাদের সাথে কথা বলতে পারে এমন কাউকে দেখতে। আমি আপনার চেয়ে যোগ্য কাউকে দেখলাম না।’ সাঈদ (রহ.) দৃঢ়ভাবে বললেন, ‘যাও, তাঁকে গিয়ে জানাও যে, আমি তাঁর গল্পকারদের অন্তর্ভুক্ত নই।’ দ্বাররক্ষী বেরিয়ে গেল এবং বিড়বিড় করে বলতে লাগল, ‘এই বুড়োকে তো পাগল মনে হচ্ছে!’ সে গিয়ে খলিফাকে সব জানালে আবদুল মালিক বিন মারওয়ান বললেন, ‘উনি হলেন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, ওনাকে তাঁর অবস্থায় ছেড়ে দাও (বিরক্ত করো না)।’১৫
খলিফা আবদুল মালিক ও ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের সাথে সাঈদের (রহ.) আচরণ:
খলিফা আবদুল মালিকের ডাক প্রত্যাখ্যান: ইমরান ইবনে আবদুল্লাহ আল-খুজায়ী বর্ণনা করেন, খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান হজের উদ্দেশ্যে বের হয়ে মদিনায় এলেন। মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে তিনি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের কাছে একজন দূত পাঠালেন। খলিফা নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তাঁকে শুধু দাওয়াত দেওয়া হয়, কিন্তু জোর করে যেন আনার চেষ্টা করা না হয়। দূত গিয়ে বলল, ‘আমিরুল মুমিনীনের ডাকে সাড়া দিন, তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে আপনার সাথে কথা বলতে চাইছেন।’ সাঈদ (রহ.) উত্তর দিলেন, ‘আমিরুল মুমিনীনের আমার কাছে কোনো প্রয়োজন নেই, আর আমারও তাঁর কাছে কোনো প্রয়োজন নেই। আর আমার কাছে তাঁর যে চাওয়া (অর্থাৎ তাঁর কাছে গিয়ে দেখা করা), তা পূরণ হওয়ার নয়।’ দূত ফিরে গিয়ে খলিফাকে জানালে খলিফা বললেন, ‘আবার যাও এবং তাঁকে বলো, আমি শুধু কথা বলতে চাই; তবে তাঁকে জোর করবে না।’ দূত আবারও গিয়ে তাঁকে ডাকল। সাঈদ (রহ.) আগের মতোই উত্তর দিলেন। তখন দূত রেগে গিয়ে বলল, ‘খলিফা যদি আগে থেকে আপনার ব্যাপারে (নরম হওয়ার) নির্দেশ না দিতেন, তবে আমি তাঁর কাছে আপনার বিচ্ছিন্ন মাথা নিয়ে যেতাম! আমিরুল মুমিনীন আপনাকে ডাকছেন আর আপনি এমন উত্তর দিচ্ছেন!’ সাঈদ (রহ.) অবিচলভাবে বললেন, ‘তিনি যদি আমার সাথে ভালো কিছু করতে চান তবে সেটা তোমার জন্যই তোলা থাক। আর যদি তিনি অন্য কিছু (শাস্তি) দিতে চান, তবে তিনি তাঁর ফয়সালা কার্যকর না করা পর্যন্ত আমি আমার বসার ভঙ্গি থেকে নড়ব না।’ খলিফা সব শুনে বললেন, ‘আল্লাহ আবু মুহাম্মদকে (সাঈদ) রহম করুন; তিনি আপসহীনতা ছাড়া আর কিছুই জানেন না।’
খলিফা ওয়ালিদের সাথে ঘটনা: খলিফা আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে ওয়ালিদ যখন খলিফা হলেন, তিনি মদিনায় এসে মসজিদে প্রবেশ করলেন। তিনি দেখলেন এক বৃদ্ধকে ঘিরে মানুষের ভিড়। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘উনি কে?’ লোকেরা বলল, ‘উনি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব।’ ওয়ালিদ বসার পর সাঈদের কাছে দূত পাঠালেন। দূত গিয়ে বলল, ‘আমিরুল মুমিনীনের ডাকে সাড়া দিন।’ সাঈদ (রহ.) কৌশলে উত্তর দিলেন, ‘হয়তো তুমি নাম ভুল করেছ, অথবা তিনি তোমাকে অন্য কারও কাছে পাঠিয়েছেন।’ দূত ফিরে গিয়ে খলিফাকে সব বললে ওয়ালিদ অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন এবং তাঁর ক্ষতি করার ইচ্ছা করলেন। তখন উপস্থিত সুধীজন খলিফাকে বুঝিয়ে বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, তিনি মদিনার শ্রেষ্ঠ ফকিহ, কুরাইশদের মুরব্বি এবং আপনার পিতার বন্ধু। আপনার পূর্বের কোনো শাসকই তাঁকে নিজের দরবারে নিতে সক্ষম হননি।’ লোকেরা অনবরত তাঁকে বোঝাতে থাকলে এক পর্যায়ে খলিফা তাঁর ক্ষোভ দমন করলেন এবং তাঁকে ছেড়ে দিলেন।
সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের অন্যতম সঙ্গী ইমরান ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমি তাঁর স্বভাবে কখনো নমনীয়তা (শাসকদের প্রতি আনুগত্যে) দেখিনি।’
ইমাম আয-যাহাবী বলেন, ‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের অন্তরে বনী উমাইয়াদের প্রতি এবং তাদের মন্দ শাসনব্যবস্থার কারণে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও ঘৃণা ছিল। এই কারণেই তিনি কখনোই তাদের দেওয়া উপহার বা সরকারি ভাতা গ্রহণ করতেন না।’ সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের নীতিতে অটল ছিলেন।১৬
হাররার যুদ্ধের সময়ে রসুলুল্লাহ ﷺ এঁর রওজা মুবারকে তাঁর অবস্থান ও সেখান থেকে আজানের ধ্বনি শ্রবণ:
ইবনে সা’দ তাঁর গ্রন্থে আব্দুল হামিদ ইবনে সুলাইমান ও আবু হাযিমের সূত্রে বর্ণনা করেন, আমি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে বলতে শুনেছি, ‘হাররার যুদ্ধের সেই কঠিন রাতগুলোতে মসজিদে নববীতে আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না। সিরিয়ার সৈন্যরা (ইয়াজিদের বাহিনী) দলে দলে মসজিদে প্রবেশ করত আর আমাকে দেখে বলত, ‘দেখো, এই পাগলটাকে দেখো!’ তখন নামাজের ওয়াক্ত হলেই আমি নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এঁর রওজা মোবারক থেকে আজানের শব্দ শুনতে পেতাম। এরপর আমি সামনে গিয়ে ইকামত দিতাম ও নামাজ পড়তাম। অথচ সেই সময় মসজিদে আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না।’
ওয়াকিদী তাঁর সূত্রে সাঈদের পুত্র মুহাম্মদ বিন সাঈদ থেকে বর্ণনা করেন, ‘হাররার যুদ্ধের দিনগুলোতে সাঈদ (রহ.) মসজিদেই অবস্থান করতেন, বের হতেন না। তিনি তাদের সাথে জুমআ আদায় করতেন এবং রাতে বের হতেন। সাঈদ (রহ.) বলেন, ‘যখনই নামাজের ওয়াক্ত হতো, আমি রওজা মোবারকের দিক থেকে আজানের শব্দ শুনতে পেতাম। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত এভাবেই চলছিল।’১৭
(হাররার যুদ্ধ (হিজরী ৬৩): এটি ছিল উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদের বাহিনী এবং মদিনাবাসীদের মধ্যে সংঘটিত একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এই সময় মদিনা এবং মসজিদে নববীর পবিত্রতা চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছিল। অধিকাংশ মানুষ প্রাণভয়ে পালিয়ে গেলেও সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) মদিনা এবং মসজিদে নববীর মায়া ত্যাগ করেননি।)
জালিম শাসকের দরবারে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.)-এঁর অনমনীয়তা:
ইমরান ইবনে আবদুল্লাহ আল-খুজায়ি বলেন, আবদুল মালিকের পর তাঁর দুই ছেলে ওয়ালিদ ও সুলাইমানের জন্য (একই সাথে) সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে বায়াত নিতে ডাকা হলো। তিনি বললেন, যতদিন আমি বেঁচে থাকব, ততদিন আমি দুই ব্যক্তির হাতে (একসাথে) বায়াত নেব না।’ তাঁকে পরামর্শ দেওয়া হলো, ‘আপনি (দরবারে) এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করুন এবং অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান (যাতে লোকে মনে করে আপনি বায়াত নিয়েছেন)।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আমার এই কাজ দেখে যেন কেউ বিভ্রান্ত হয়ে আমাকে অনুসরণ না করে (আমি লোক দেখানো কাজ করব না)।’ এরপর তাঁকে একশত বেত্রাঘাত করা হলো এবং পশমের তৈরি মোটা কম্বল সদৃশ পোশাক (মুসুহ) পরানো হলো।১৮
এক দরিদ্র ছাত্রের সাথে কন্যার বিবাহ:
কাসীর ইবনে মুত্তালিব ইবনে আবি ওয়াদায়া থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের মজলিসে বসতাম। বেশ কয়েকদিন অনুপস্থিত থাকার পর যখন আমি তাঁর কাছে আসলাম, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কোথায় ছিলে?’ আমি বললাম, ‘আমার স্ত্রী মারা গিয়েছেন, তাই তাঁর কাজে ব্যস্ত ছিলাম।’ তিনি বললেন, ‘আমাদের আগে জানাওনি কেন? জানালে আমরা জানাযায় শরিক হতাম।’ অতঃপর আমি যখন উঠে দাঁড়াতে চাইলাম, তিনি বললেন, ‘তুমি কি নতুন কোনো বিবাহের কথা ভেবেছ?’ আমি বললাম, ‘আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন, আমাকে কে মেয়ে বিয়ে দেবে? আমার কাছে তো দুই বা তিন দিরহাম ছাড়া আর কিছুই নেই।’ তিনি বললেন, ‘আমি তোমাকে মেয়ে বিয়ে দেব।’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘আপনি সত্যিই তা করবেন?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ অতঃপর তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরুদ পাঠ করলেন এবং মাত্র দুই বা তিন দিরহাম মহরের বিনিময়ে তাঁর কন্যার সাথে আমার বিবাহ সম্পন্ন করলেন।
আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে বাড়ি ফিরলাম এবং চিন্তা করতে লাগলাম, সংসারের নিত্যপণ্য কেনার জন্য কার কাছ থেকে ধার নেওয়া যায়। আমি তখন রোজা অবস্থায় ছিলাম। মাগরিবের নামাজ পড়ে বাড়িতে এসে ইফতারের জন্য রুটি আর তেল সামনে নিয়েছি, ঠিক তখনই দরজায় করাঘাত হলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে?’ উত্তর এলো, ‘সাঈদ’। আমি সাঈদ নামের পরিচিত সবার কথা ভাবলাম, কিন্তু সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের কথা কল্পনাও করিনি। কারণ, গত চল্লিশ বছর ধরে তাঁকে তাঁর ঘর আর মসজিদ ছাড়া কোথাও দেখা যায়নি। আমি গিয়ে দরজা খুলে দেখি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব দাঁড়িয়ে! আমি ভাবলাম তিনি হয়তো মত পরিবর্তন করেছেন। আমি বললাম, ‘হে আবু মুহাম্মদ, আপনি কাউকে পাঠিয়ে দিলেই তো আমি আপনার কাছে হাজির হতাম।’ তিনি বললেন, ‘না, আজ তোমার কাছে আসাটাই উত্তম।’ আমি বললাম, ‘আমার জন্য আপনার কী আদেশ?’ তিনি বললেন, ‘তুমি একজন একা মানুষ ছিলে, আজ বিয়ে করেছ। আমার এটা ভালো লাগছে না যে তুমি আজ রাতটি একা কাটাও। এই যে তোমার স্ত্রী!’ দেখলাম তাঁর পেছনে পূর্ণ উচ্চতার একজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি তাঁর হাত ধরে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা টেনে চলে গেলেন। লজ্জায় মেয়েটি সেখানেই বসে গেল।
আমি ঘরের দরজা ভালো করে বন্ধ করলাম। তারপর তেলের বাতিটি রুটি ও তেলের পাত্র থেকে সরিয়ে ছায়ায় রাখলাম যেন সে আমার দরিদ্রতার দস্তরখান দেখতে না পায়। এরপর ছাদে উঠে প্রতিবেশীদের ডাকলাম। তারা এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে?’ আমি বললাম, ‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব আজ আমার সাথে তাঁর কন্যার বিবাহ দিয়েছেন এবং হঠাৎ করে তাঁকে আমার ঘরে দিয়ে গেছেন।’ তারা অবাক হয়ে বলল, ‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব তাঁর মেয়েকে তোমার সাথে বিয়ে দিয়েছেন?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, তিনি ঘরেই আছেন।’ তারা ভেতরে গেল।
খবর পেয়ে আমার মা-ও আসলেন। মা আমাকে বললেন, ‘আমি একে সাজিয়ে গুছিয়ে দেওয়ার আগে যদি তুমি একে স্পর্শ করো, তবে তোমার সাথে দেখা করা আমার জন্য হারাম।’ তিনদিন পর আমি তাঁর কাছে গেলাম। দেখলাম তিনি তৎকালীন সেরা সুন্দরী, আল্লাহর কিতাবের হাফেজ, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ এবং স্বামীর হক সম্পর্কে সবচেয়ে সচেতন নারী।’
আবদুল্লাহ ইবনে সুলাইমান থেকে বর্ণিত, খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান তাঁর পুত্রের (যুবরাজ ওয়ালীদের) জন্য সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের কন্যার বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সাঈদ তা প্রত্যাখ্যান করেন। এ কারণে আব্দুল মালিক ক্ষুব্ধ হয়ে এক কনকনে শীতের দিনে তাকে একশ চাবুক মারেন, মাথায় ঠান্ডা পানি ঢালেন এবং পশমের মোটা জুব্বা পরিয়ে রাখেন। (অর্থাৎ তিনি রাজপ্রাসাদের বিলাসিতার চেয়ে একজন দরিদ্র দ্বীনদার ছাত্রকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন)।১৯
স্বপ্ন ব্যাখ্যায় তাঁর পারদর্শিতা:
আল-ওয়াকিদি বলেন, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ছিলেন সমসাময়িক মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো স্বপ্ন-ব্যাখ্যাকারী। তিনি এই জ্ঞান অর্জন করেছিলেন আসমা বিনতে আবি বকর (রা.)-এঁর কাছ থেকে, আর আসমা (রা.) তা শিখেছিলেন তাঁর পিতা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এঁর কাছ থেকে। এরপর ওয়াকিদি বেশ কিছু স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেন, যার মধ্যে কয়েকটি হলো—
১. ওমর ইবনে হাবিব ইবনে কুলাইয় বলেন, আমি একদিন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের কাছে বসে ছিলাম। তখন আমার দিনকাল খুব কষ্টে কাটছিল এবং ঋণের বোঝায় আমি জর্জরিত ছিলাম। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম যেন আমি খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানকে ধরে মাটিতে আছাড় দিলাম এবং তাঁকে উপুড় করে শুইয়ে তাঁর পিঠে চারটি খুঁটি গেড়ে দিলাম।’ সাঈদ (রহ.) বললেন, ‘তুমি নিজে এই স্বপ্ন দেখোনি।’ সে বলল, ‘জি হ্যাঁ, আমিই দেখেছি।’ সাঈদ (রহ.) বললেন, ‘তুমি সত্যি কথা না বলা পর্যন্ত আমি এর ব্যাখ্যা দেব না।’ তখন লোকটি স্বীকার করল, ‘আসলে ইবনে যুবায়ের এই স্বপ্নটি দেখেছেন এবং তিনি আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন।’ সাঈদ (রহ.) তখন বললেন, ‘যদি তাঁর এই স্বপ্ন সত্য হয়, তবে আবদুল মালিক তাঁকে (ইবনে যুবায়েরকে) হত্যা করবেন এবং আবদুল মালিকের বংশ থেকে এমন চারজন জন্ম নেবেন যাঁরা প্রত্যেকেই খলিফা হবেন।’ বর্ণনাকারী ওমর ইবনে হাবিব বলেন, (সাঈদের এই ব্যাখ্যা শুনে) আমি সিরিয়ায় আবদুল মালিকের কাছে গেলাম এবং তাঁকে এই স্বপ্নের কথা জানালাম। তিনি এতে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং সাঈদের অবস্থা ও তাঁর সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। আমি তাঁকে সব জানালাম। এরপর খলিফা আমার সমস্ত ঋণ পরিশোধের নির্দেশ দিলেন এবং তাঁর কাছ থেকে আমি অনেক ধন-সম্পদ ও কল্যাণ লাভ করলাম।
২. দাঁত পড়ে যাওয়ার স্বপ্ন: শারীক ইবনে আবি নামির বলেন, আমি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে বললাম, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম যেন আমার দাঁতগুলো আমার হাতে পড়ে গেল, আর আমি সেগুলো দাফন করলাম।’ তিনি বললেন, ‘যদি তোমার স্বপ্ন সত্য হয়, তবে তোমার সমবয়সী বা তোমার পরিবারের অনেককে তুমি নিজের হাতে দাফন করবে।’ (অর্থাৎ নিজের দাঁত পড়ে যাওয়া পরিজন বিয়োগের সংকেত)।
৩. নিজ হাতে প্রস্রাব করার স্বপ্ন: মুসলিম আল-হান্নাত বলেন, এক ব্যক্তি ইবনুল মুসায়্যিবকে বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি নিজের হাতের ওপর প্রস্রাব করছি।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহকে ভয় করো; তোমার স্ত্রী সম্ভবত তোমার মাহরাম (রক্তের সম্পর্কের বা নিষিদ্ধ কেউ)।’ পরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, ওই ব্যক্তি আর তার স্ত্রীর মধ্যে দুগ্ধ-সম্পর্ক (রেযায়ী ভাই-বোন) রয়েছে।
৪. জয়তুন গাছের মূলে প্রস্রাব: আরেকজন এসে বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম যেন আমি একটি জয়তুন গাছের গোড়ায় প্রস্রাব করছি।’ তিনি বললেন, ‘তোমার স্ত্রী তোমার নিকটাত্মীয় (যাঁকে বিয়ে করা জায়েজ নেই)।’ পরে যাচাই করে দেখা গেল তা-ই সত্য।
৫. মিনারের ওপর কবুতর: এক ব্যক্তি তাঁকে বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম একটি কবুতর মিনারের ওপর বসেছে।’ তিনি বললেন, ‘হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ আবদুল্লাহ ইবনে জাফরের কন্যাকে বিয়ে করবে।’ (পরবর্তীতে তা-ই ঘটেছিল)।
৬. শিকল ও রোদ-ছায়ার স্বপ্ন: সাঈদ (রহ.) বলতেন, ‘স্বপ্নে শিকল বা বেড়ি দেখা দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার লক্ষণ।’ এক ব্যক্তি বলল, ‘হে আবু মুহাম্মদ, আমি স্বপ্নে দেখলাম যে আমি ছায়ায় বসেছিলাম, এরপর সেখান থেকে উঠে রোদে গিয়ে বসলাম।’ তিনি বললেন, যদি তোমার স্বপ্ন সত্য হয়, তবে তুমি ইসলাম ত্যাগ করে কুফরিতে লিপ্ত হবে।’ লোকটি তখন বলল, ‘আমি এও দেখেছি যে, আমাকে জোর করে বের করে রোদে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং আমি সেখানে বসেছি।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে তোমাকে কুফরির ওপর বাধ্য করা হবে।’ পরবর্তীতে দেখা গেল, লোকটি বন্দি হয়েছিল এবং তাকে কুফরি করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এরপর সে পুনরায় ইসলামে ফিরে আসে এবং মদিনায় নিজের এই স্বপ্নের কথা বর্ণনা করত।
৭. আগুনের মধ্য দিয়ে হাঁটার স্বপ্ন: উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে সায়েব থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি ইবনুল মুসায়্যিবকে বলল যে, সে স্বপ্নে দেখেছে যেন সে আগুনের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সাঈদ (রহ.) বললেন, ‘তুমি সমুদ্রে ভ্রমণ না করা পর্যন্ত এবং নিহত হওয়ার মাধ্যমে মৃত্যু বরণ না করা পর্যন্ত মরবে না।’ পরবর্তীতে সেই ব্যক্তি সমুদ্র যাত্রা করেছিল এবং সেখানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এসেছিল। পরিশেষে সে ‘কুদাইদ’-এর যুদ্ধের দিন নিহত হয়।
৮. হজরত হাসান (রাদ্বিআল্লাহু আনহু)-এঁর কপালে সুরা ইখলাস: ইমরান ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (নবী দৌহিত্র) হাসান ইবনে আলী (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) স্বপ্নে দেখলেন, যেন তাঁর দুই চোখের মাঝখানে (কপালে) লেখা রয়েছে ‘কুল হুয়াল্লাহু আহাদ’ (সুরা ইখলাস)। এই স্বপ্নে তিনি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তাঁরা যখন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের কাছে এই স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলেন, তিনি বললেন, ‘যদি তাঁর এই স্বপ্ন সত্য হয়, তবে তাঁর হায়াত আর খুব সামান্যই বাকি আছে।’ এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই হাসান (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) শাহাদাত বরণ করেন।
স্বপ্ন কার্যকর হওয়ার সময়কাল:
সালেহ ইবনে খাওওয়াত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, স্বপ্নের শেষ সময়কাল (বা এর ব্যাখ্যা বাস্তবায়িত হওয়ার সর্বোচ্চ মেয়াদ) হলো চল্লিশ বছর।’ (অর্থাৎ কোনো স্বপ্নের ফল প্রকাশ পেতে চল্লিশ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে)।২০
সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.)-এর পোশাক-পরিচ্ছদ:
ইবনে সাদ ‘তাবাকাত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, উবাইদ ইবনে নিসতাস বলেন, ‘আমি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে কালো রঙের পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় দেখেছি; পাগড়ির শিমলা বা বাড়তি অংশটি তিনি তাঁর পিঠের দিকে ঝুলিয়ে রাখতেন। এছাড়া আমি তাঁকে লুঙ্গি, চাদর এবং মোজা পরিহিত অবস্থায়ও দেখেছি।’
মুহাম্মদ ইবনে হিলাল বর্ণনা করেন, তিনি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় দেখেছেন। তাঁর পাগড়ির নিচে একটি সুন্দর টুপি থাকত এবং পাগড়িটি ছিল সাদা রঙের, যাতে লাল রঙের নকশা ছিল। পাগড়ির বাড়তি অংশটি তিনি পেছনের দিকে এক বিঘত পরিমাণ ঝুলিয়ে রাখতেন।২১
প্রকৃত ইবাদতের সংজ্ঞা:
বকর বিন খুনাইস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে একদল লোককে (অবিরাম) নামাজ পড়তে ও ইবাদত করতে দেখে বললাম, ‘হে আবু মুহাম্মদ, আপনি কি এই লোকদের সাথে ইবাদতে শরিক হবেন না?’ তিনি আমাকে বললেন, ‘হে ভাতিজা, এটিই (আসল) ইবাদত নয়।’ আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তবে প্রকৃত ইবাদত কী, হে আবু মুহাম্মদ?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘প্রকৃত ইবাদত হলো আল্লাহর কুদরত ও নির্দেশ সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করা (তাফাক্কুর), আল্লাহর হারামকৃত বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকা (ওয়ারা) এবং আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অর্পিত ফরজ কাজগুলো যথাযথভাবে আদায় করা।’২২
বাণী ও নসিহত:
১. ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ, হজরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.)-কে বলতে শুনেছেন, ‘ওই ব্যক্তির মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, যে বৈধ পথে সম্পদ উপার্জনের ইচ্ছা রাখে না; যার মাধ্যমে সে মানুষের পাওনা (হক) আদায় করবে এবং মানুষের কাছে হাত পাতা থেকে নিজের চেহারাকে রক্ষা করবে (অর্থাৎ স্বাবলম্বী হবে)।’২৩
২. সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) বলতেন, ‘বান্দা আল্লাহর আনুগত্যের মতো অন্য কোনো কিছু দিয়ে নিজেকে এতটা সম্মানিত করতে পারে না। আবার আল্লাহর অবাধ্যতার মতো অন্য কোনো কিছু দিয়ে নিজেকে এতটা লাঞ্ছিতও করতে পারে না। আর একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য হিসেবে এটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার শত্রুকে আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত দেখতে পায়।’
৩. আলী ইবনে যায়েদ থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) বলতেন, ‘আমি আশি বছর বয়সে উপনীত হয়েছি, কিন্তু আমার কাছে নারীদের (ফিতনার) চেয়ে ভয়ের আর কিছু নেই।’ বর্ণনাকারী আরও উল্লেখ করেন যে, তখন তাঁর দৃষ্টিশক্তি প্রায় চলে গিয়েছিল। এমনকি চুরাশি বছর বয়সে, যখন তিনি এক চোখে দেখতে পেতেন না এবং অন্য চোখেও খুব ঝাপসা দেখতেন, তখনও তিনি বলতেন, ‘শয়তান কোনো বিষয়ে নিরাশ হলে সে নারীদের মাধ্যমেই প্ররোচনা দিতে আসে; তাই নারীদের ফিতনাই আমার কাছে সবচেয়ে আশঙ্কার।’
৪. উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে বলতে শুনেছেন, ‘আল্লাহর কুদরতি হাত তাঁর বান্দাদের ওপর। যে ব্যক্তি অহংকারবশত নিজেকে বড়ো মনে করে, আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করেন। আর যে আল্লাহর জন্য নিজেকে ছোটো (বিনয়ী) করে, আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেন। মানুষ আল্লাহর ছায়ার নিচেই তাদের আমলসমূহ করে থাকে; যখন আল্লাহ কোনো বান্দাকে অপমানিত করতে চান, তখন তাকে তাঁর নিরাপত্তা ও ছায়া থেকে বের করে দেন, ফলে মানুষের সামনে তার দোষ-ত্রুটি ও গোপন লজ্জা প্রকাশ হয়ে পড়ে।’
৫. ইব্রাহিম ইবনে আদহাম (রহ.) সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ‘তোমরা জালিমদের সহযোগীদের দিকে (শ্রদ্ধার সাথে) চোখ ভরে তাকাবে না; বরং অন্তর থেকে তাদের ঘৃণা ও অস্বীকারের সাথেই তাকাবে। অন্যথায় তোমাদের নেক আমলগুলো বরবাদ হয়ে যেতে পারে।’
৬. সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর মাধ্যমে অমুখাপেক্ষী বা অভাবমুক্ত হয়, মানুষ তার প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে।’ (অর্থাৎ যে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করে, আল্লাহ মানুষের হৃদয়ে তার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করে দেন)।২৪
সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.)-এর মৃত্যুকালীন অবস্থা:
আবদুর রহমান ইবনে হারমালা বলেন, ‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। আমি তাঁর কাছে গেলাম। তিনি শুয়ে শুয়ে ইশারার মাধ্যমে জোহরের নামাজ আদায় করছিলেন। আমি তাঁকে নামাজে ‘সুরা আশ-শামস’ তিলাওয়াত করতে শুনলাম।’
জানাজা ও দাফন নিয়ে তাঁর অসিয়ত: ইবনে হারমালা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একবার আমি ইবনুল মুসায়্যিবের সাথে একটি জানাজায় ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি বলল, ‘মৃতের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো।’ সাঈদ (রহ.) বললেন, ‘এই কবিতা পাঠকারী কী বলছে? আমি তো আমার পরিবারকে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছি যেন আমার (জানাজার) সাথে এমন কোনো কবিতা পাঠকারী বা উচ্চস্বরে ঘোষণাকারী না থাকে। তারা যেন এও না বলে যে, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব মারা গেছেন। বরং যিনি আমাকে আমার রবের কাছে নিয়ে যাবেন, তিনিই আমার জন্য যথেষ্ট। তারা যেন আমার সাথে কোনো আগরবাতি বা ধূপদানি নিয়ে না হাঁটে; কারণ আমি যদি নেককার হই, তবে আল্লাহর কাছে যা আছে তা তাদের সুগন্ধির চেয়েও অনেক বেশি উত্তম।’
পরিবারের প্রতি তিনটি অসিয়ত: ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) বলেছেন, ‘আমি আমার পরিবারকে তিনটি বিষয়ে অসিয়ত করেছি— ১. আমার জানাজার পেছনে যেন কোনো বিলাপকারী বা উচ্চস্বরে ঘোষণাকারী না থাকে। ২. জানাজার সাথে যেন আগুন (সুগন্ধির ধোঁয়া) বহন করা না হয়। ৩. আমাকে যেন দ্রুত দাফন করা হয়। কারণ, যদি আল্লাহর কাছে আমার জন্য কল্যাণ জমা থাকে, তবে তোমাদের কাছে থাকার চেয়ে সেই কল্যাণের কাছে পৌঁছানোই আমার জন্য উত্তম।’
কিবলামুখী করা নিয়ে তাঁর মন্তব্য: আবদুর রহমান ইবনুল হারিস আল-মাখজুমি বলেন, ‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের অসুস্থতা যখন খুব বেড়ে গেল, তখন নাফে ইবনে জুবায়ের তাঁকে দেখতে এলেন। ওই সময় সাঈদ (রহ.) বেহুঁশ হয়ে পড়লে নাফে বললেন, ‘তাঁর মুখ কিবলার দিকে ঘুরিয়ে দাও।’ লোকেরা তা-ই করল। কিছুক্ষণ পর তাঁর চেতনা ফিরে এলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে তোমাদের আমার বিছানা কিবলার দিকে ঘুরাতে বলেছে? নাফে নাকি? নাফে বললেন, ‘হ্যাঁ।’ সাঈদ (রহ.) তখন বললেন, ‘আল্লাহর কসম, যদি আমি মনে-প্রাণে কিবলা ও দ্বীন ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত না থাকি, তবে তোমাদের এই বিছানা ঘুরিয়ে দেওয়া আমার কোনোই উপকারে আসবে না।’ (অর্থাৎ বাহ্যিক আচারের চেয়ে অন্তরের বিশ্বাস ও ইমানের ওপর মৃত্যু হওয়াই আসল সাফল্য)।২৫
ওফাত:
আবদুল হাকিম ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, ৯৪ হিজরিতে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব যেদিন ইন্তেকাল করেন, আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমি দেখেছি তাঁর কবরের ওপর পানি ছিটানো হয়েছে। ওই বছরকে ‘ফুকাহাদের বছর’ (সানাতুল ফুকাহা) বলা হতো। কারণে, একই বছরে অনেক বড়ো বড়ো ফকিহ ও আলেম মৃত্যুবরণ করেছিলেন।’
হায়সাম ইবনে আদি বলেন, ৯৪ হিজরিতে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবসহ অনেক ফকিহ মারা যান।’ সাঈদ ইবনে উফায়ের, ইবনে নুমায়ের এবং ওয়াকিদিও তাঁর মৃত্যুর তারিখ ৯৪ হিজরি বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনে সাদও কেবল এই তারিখটিই উল্লেখ করেছেন।২৬