ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মহান ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের জীবন, জ্ঞান ও চরিত্রের দীপ্তি কালের প্রবাহে কখনো ম্লান হয় না। তাফসির, হাদিস, জুহদ ও তাকওয়ার জগতে যাঁরা উজ্জ্বল নক্ষত্র, তাঁদের মধ্যে হজরত হাসান বসরি (রহ.) এক অনন্য নাম। তিনি তাবেয়িদের মধ্যেও ছিলেন শ্রেষ্ঠদের একজন। জ্ঞান, অন্তর্দৃষ্টি ও আখলাকের এমন অপূর্ব সমন্বয় তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল, যা তাঁকে যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে অমর করে রেখেছে।

তাঁর নাম ও পরিচয়:

হজরত হাসান বসরি (রহ.)-এঁর পূর্ণ নাম হাসান ইবনু আবুল হাসান ইয়াসার; কুনিয়াত আবু সাঈদ। তিনি আনসারি সাহাবি হজরত জায়েদ ইবনু সাবিত (রা.)-এঁর মুক্তদাস (মাওলা) ছিলেন—এ মতও পাওয়া যায়। আবার বলা হয়, তিনি আবুল ইয়াসার কা‘ব ইবনু আমর আস-সুলামী (রা.)-এর মাওলা ছিলেন। এই মতটি আবদুস সালাম আবু মুতাহহার, গাদিরাহ ইবনু কুরহাদ আল-আউফি-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

এরপর তিনি বলেন, হাসান বসরি (রহ.)-এঁর মা ছিলেন উম্মুল মু’মিনীন হজরত উম্মে সালামা আল-মাখযূমিয়্যা (রা.)-এর দাসী। আবার এটাও বলা হয়, তিনি জামিল ইবনু কুতবা-এর মাওলা ছিলেন।

তাঁর পিতা ইয়াসার ছিলেন মায়সান এলাকার যুদ্ধবন্দিদের অন্তর্ভুক্ত। পরে তিনি মদিনায় বসবাস করেন এবং মুক্তি লাভ করেন। এরপর তিনি হজরত উমর (রা.)-এর খিলাফতকালে মদিনাতেই বিবাহ করেন। সেই বিবাহ থেকে হাসান (রহ.)-এর জন্ম হয় উমর (রা.)-এঁর খিলাফতের শেষ দুই বছরের কোনো এক সময়। তাঁর মায়ের নাম ছিল খায়রাহ।

পরবর্তীতে হাসান বসরি (রহ.) ওয়াদিল কুরা এলাকায় লালিত-পালিত হন। তিনি হজরত উসমান (রা.)-এঁর সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করেছেন এবং তাঁর খুতবা শুনেছেন। তিনি ‘ইয়াওমুদ-দার’ (উসমান রা.-এর অবরোধ ও শাহাদাতের দিন)-এও উপস্থিত ছিলেন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল চৌদ্দ বছর।১

শৈশব:

শৈশবেই তিনি জ্ঞান ও তাকওয়ার গর্ভভূমি মদিনায় বেড়ে ওঠেন। আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে উম্মে সালামা (রা.) হয়ে ওঠেন তাঁর অভিভাবিকা; তাঁর ছায়ায় এবং সাহাবায়ে কিরামের সান্নিধ্যে তিনি ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকেন। এ সুবর্ণ সুযোগে তিনি প্রায় ১৩০ জন সাহাবির সাহচর্য লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে হজরত আলী (রা.), হজরত উসমান (রা.), হজরত আবু হুরায়রা (রা.) এবং হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতো বরেণ্য সাহাবিগণও ছিলেন।

মুহাম্মদ ইবনু সাল্লাম বলেন, আমাদের কাছে আবু আমর আশ-শা‘আবী তাঁর সনদসহ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, উম্মে সালামা (রা.) হাসানের মাকে যখন কোনো কাজে পাঠাতেন, তখন শিশু হাসান কাঁদত। উম্মে সালামা তাঁকে দুধ দিয়ে শান্ত করতেন। এরপর ছোটো অবস্থাতেই তাঁকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এঁর সাহাবিদের কাছে নিয়ে যেতেন। তাঁর মা উম্মে সালামার কাছেই বেশিরভাগ সময় কাটাতেন; ফলে সাহাবিগণ হাসানের জন্য দোয়া করতেন।

একবার তাঁকে হজরত উমর (রা.)-এঁর কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি তাঁর জন্য দোয়া করেন এবং বলেন, “হে আল্লাহ, আপনি তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং তাকে মানুষের কাছে প্রিয় করে দিন।”২

ইলম অর্জন:

হজরত হাসান বসরি (রহ.) বহু সাহাবি ও তাবেয়িদের সোহবতে ইলম অর্জন করেছেন। তিনি ইমরান ইবনু হুসাইন, মুগীরা ইবনু শু‘বা, আবদুর রহমান ইবনু সামুরা, সামুরা ইবনু জুনদুব, আবু বকরাহ আস-সাকাফী, নু‘মান ইবনু বশীর, জাবির, জুনদুব আল-বাজালী, ইবনু আব্বাস, আমরু ইবনু তাগলিব, মা‘কিল ইবনু ইয়াসার, আসওয়াদ ইবনু সারী, আনাস (রাদিআল্লাহু আনহুম)—সহ আরও বহু সাহাবির নিকট থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন।

তিনি হিত্তান ইবনু আবদুল্লাহ আর-রাকাশী (রহ.)-এঁর কাছে কুরআন পাঠ শিখেছেন এবং বহু তাবেয়ির কাছ থেকেও বর্ণনা গ্রহণ করেছেন।৩

শাগরিদ:

হজরত হাসান বসরি (রহ.) থেকে যাঁরা ইলম অর্জন ও হাদিস বর্ণনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন— ইয়ূব, শাইবান আন-নাহবী, ইউনুস ইবনু উবাইদ, ইবনু আউন, হুমাইদ আত-তাওয়ীল, সাবিত আল-বুনানী, মালিক ইবনু দিনার, হিশাম ইবনু হাসসান, জারীর ইবনু হাজিম, রাবী‘ ইবনু সুবাইহ, ইয়াজীদ ইবনু ইবরাহীম আত-তুস্তারী, মুবারক ইবনু ফাদালা, আবান ইবনু ইয়াজীদ আল-আত্তার, কুররাহ ইবনু খালিদ, হাজম আল-কুতাঈ, সালাম ইবনু মিসকীন, শুমাইত ইবনু আজলান, সালিহ আবু ‘আমির আল-খাজ্জাজ, আব্বাদ ইবনু রাশিদ, আবু হারীজ আবদুল্লাহ ইবনু হুসাইন (সিজিস্তানের কাজি), মু‘আভিয়া ইবনু আবদুল করিম আদ-দাল্ল, ওয়াসিল আবু হুররা আর-রাকাশী, হিশাম ইবনু জিয়াদ, শুবাইব ইবনু শাইবা, আশ‘আস ইবনু বারাজ, আশ‘আস ইবনু জাবির আল-হুদ্দানী, আশ‘আস ইবনু আবদুল মালিক আল-হুমরানী, আশ‘আস ইবনু সাওয়ার, আবু আল-আশহাব। এছাড়াও আরও অনেকে।৪

তাঁর শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি:

তিনি ছিলেন সুঠামদেহী, সুন্দর অবয়ব ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। একই সঙ্গে তিনি প্রখ্যাত বীরদের মধ্যেও অন্যতম।

মুহাম্মদ ইবনু সাদ বলেন, হাসান (রহ.) ছিলেন সর্বগুণে গুণান্বিত, বিজ্ঞ আলেম, সুউচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, ফকিহ, নির্ভরযোগ্য (সিকাহ), অকাট্য দলিল (হুজ্জাত), বিশ্বস্ত, ইবাদতগুজার, নিবেদিতপ্রাণ সাধক, অগাধ ইলমের অধিকারী, সুবক্তা ও অত্যন্ত সুদর্শন পুরুষ।

আল-আসমাঈ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “আমি হাসান আল-বসরির হাতের কবজির চেয়ে প্রশস্ত কবজি আর কারও দেখিনি; তাঁর কবজি এক বিঘত প্রশস্ত ছিল।”

আবু বুরদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান আল-বসরির চেয়ে অন্য কাউকে মুহাম্মদ ﷺ-এঁর সাহাবিদের সাথে এতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ (চালচলন ও স্বভাবে) দেখিনি।”

মুজালিদ আশ-শা’বী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “হাসানের চেয়ে প্রভাবশালী বা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আর কাউকে আমি দেখিনি।”

আমাতুল হাকাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হাসান যখন হাত্তান আর-রাকাশীর কাছে আসতেন, তখন আমি তাঁর চেয়ে সুন্দর চেহারার কোনো যুবক দেখিনি।”৫

তাঁর স্বভাব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য:

খালিদ বিন সাফওয়ান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হীরা (ইরাকের একটি প্রাচীন শহর) নামক স্থানে আমার সাথে মাসলামা বিন আব্দুল মালিক-এর সাক্ষাৎ হলে তিনি আমাকে বললেন, “হে খালিদ, আমাকে বসরার অধিবাসী হাসান সম্পর্কে কিছু বলো।”

আমি বললাম, “আল্লাহ আমিরের কল্যাণ করুন। আমি পূর্ণ জ্ঞান ও নিশ্চিত তথ্যের ভিত্তিতেই তাঁর সম্পর্কে বলছি। কারণ আমি তাঁর প্রতিবেশী এবং তাঁর মজলিসে তাঁর পাশেই বসি। তাঁর সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি কেউ জানে না। তিনি এমন ব্যক্তি, যার গোপন জীবন ও প্রকাশ্য জীবন অভিন্ন; কথা ও কাজে কোনো অমিল নেই। তিনি কোনো কাজের সিদ্ধান্ত নিলে তা সম্পন্ন করেই ওঠেন; আর কোনো কিছুর ওপর দাঁড়ালে তা পালন করেই বসেন। তিনি যখন কোনো কাজের আদেশ দেন, তখন নিজেই হন সেই কাজের সবচেয়ে বড় আমলকারী; আর যখন কোনো কাজ থেকে নিষেধ করেন, তখন নিজেই হন বর্জনকারীদের মধ্যে সবার প্রথম। আমি তাঁকে মানুষের থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী (নির্লোভ) দেখেছি; অথচ দেখেছি—মানুষ সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী (জ্ঞানের প্রয়োজনে)।”

তখন মাসলামা (রহ.) বললেন, “যথেষ্ট হয়েছে, হে খালিদ। এমন একজন মানুষ যে জাতির মধ্যে বিদ্যমান থাকে, সে জাতি কীভাবে পথভ্রষ্ট হতে পারে?”৬

পোশাক-পরিচ্ছদ:

মুসলিম ইবনু ইব্রাহিম বর্ণনা করেন, সাল্লাম ইবন মিসকীন বলেছেন, “আমি হাসানকে স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল রঙের একটি ক্বাবা (এক ধরনের দীর্ঘ বহিঃপোশাক) পরিহিত অবস্থায় দেখেছি।”

ইবনু উলাইয়্যাহ ইউনুস থেকে বর্ণনা করেন, “হাসান শীতকালে ‘হিবারাহ’ (কারুকার্যখচিত ইয়ামেনি চাদর) ক্বাবা, কুর্দিশ তৈলাসান (মাথার চাদর) এবং কালো পাগড়ি পরতেন। আর গ্রীষ্মকালে পরতেন শণ বা লিনেন কাপড়ের লুঙ্গি, কামিজ এবং হিবারাহ চাদর।”

হাওশাব হাসান (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “মুমিন ব্যক্তি উত্তম পোশাকের মাধ্যমে নিজের দ্বীনকে রক্ষা করে (অথবা মর্যাদা রক্ষা করে)।”৭

মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব:

আবু হিলাল বলেন, আমি কাতাদার কাছে ছিলাম; এমন সময় হাসান আল-বসরির মৃত্যুসংবাদ এলো। আমি বললাম, “তিনি তো ইলমের সাগরে নিমজ্জিত ছিলেন।” কাতাদা বললেন, “বরং তিনি ইলমের ভেতরেই বেড়ে উঠেছেন, একে ধারণ করেছেন এবং নিজের সত্তায় মিশিয়ে নিয়েছেন। আল্লাহর কসম, কেবল ‘হারুরি’ (খারেজি) ছাড়া অন্য কেউ তাঁকে ঘৃণা করে না।”

মুহাম্মদ ইবনু সাল্লাম আল-জুমাহি হাম্মাম থেকে এবং তিনি কাতাদা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “বলা হয়ে থাকে পৃথিবী কখনোই সাতজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির দল থেকে শূন্য থাকে না; যাদের ওসিলায় মানুষ বৃষ্টি পায় এবং যাদের ওসিলায় বিপদ-আপদ দূর করা হয়। আমি আশা করি, হাসান সেই সাতজনের একজন ছিলেন।”

কাতাদা আরও বলেন, “পৌরুষ ও শিষ্টাচারের দিক থেকে হাসানের চেয়ে পরিপূর্ণ আর কেউ ছিল না।”

হুমাইদ ও ইউনুস বলেন, “আমরা হাসানের চেয়ে অধিকতর পূর্ণাঙ্গ পৌরুষ ও চরিত্রের অধিকারী আর কাউকে দেখিনি।”

আলী ইবন জায়েদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি ইবনুল মুসাইয়িব, উরওয়াহ, কাসিমসহ আরও অনেক বড় তাবেয়ির কথা শুনেছি; কিন্তু হাসানের মতো আর কাউকে দেখিনি। তিনি যদি সাহাবিদের সমসাময়িক হতেন এবং তাঁদের সমান বয়সের হতেন, তবে তাঁরা (জ্ঞানের দৌড়ে) তাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পারতেন না।”৮

ইবাদত:

সারিয়্যাহ ইবন ইয়াহইয়া বলেন, হাসান (রহ.) আইয়ামে বিয (প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ), আশহুরে হুরুম (চারটি পবিত্র মাস), এবং প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখতেন।৯

তাকওয়া:

হজরত ইউনূস (রহ.) থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি (রহ.) বলতেন, “আমরা হাসাহাসি করি; অথচ হতে পারে আল্লাহ আমাদের কোনো আমলের ওপর দৃষ্টিপাত করে বলেছেন— আমি তোমাদের থেকে কিছুই কবুল করব না।”

হাকিম বিন জাফর (রহ.) বলেন, মাসমা আমাকে বলেছেন, “তুমি যদি হাসানকে দেখতে, তবে মনে করতে দুনিয়ার সব সৃষ্টিজীবের দুঃখ-বেদনা যেন তাঁর ওপর ঢেলে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দীর্ঘ অশ্রুপাত এবং কান্নার শব্দের আধিক্য দেখে এমনটাই মনে হতো।”

মুহাম্মদ বিন সাদ (রহ.) বলেন, ইয়াজিদ বিন হাওশাব বলেছেন, “আমি হাসান বসরি এবং ওমর বিন আব্দুল আজিজের চেয়ে বেশি ভীতসন্ত্রস্ত আর কাউকে দেখিনি। তাঁদের অবস্থা দেখে মনে হতো— জাহান্নাম যেন কেবল তাঁদের দুজনের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে।”

হাফস বিন ওমর (রহ.) থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি একবার কাঁদলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, “আপনি কেন কাঁদছেন?” তিনি বললেন, “আমি ভয় করি, কাল (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ আমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন; এবং তিনি এর কোনো পরোয়া করবেন না।”

হুমাইদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি একবার মসজিদে থাকা অবস্থায় দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন এবং এমনভাবে কাঁদলেন যে, তাঁর দুই কাঁধ কাঁপতে লাগল। এরপর তিনি বললেন, “যদি অন্তরে প্রাণ থাকত, যদি অন্তরে সততা থাকত, তবে সেই রাতটির কথা ভেবে তোমরা কান্নায় ভেঙে পড়তে—যার ভোর হবে কিয়ামত দিয়ে। নিশ্চয়ই কিয়ামতের সকালের সেই রাতে মানুষ এমন কিছু শুনবে, যা আগে কখনো শুনেনি; সেদিন মানুষের গোপন লজ্জাসমূহ প্রকাশ হয়ে পড়বে এবং চোখের পানি ঝরবে।”১০

রিয়াজত:

ইব্রাহিম ইবনু ঈসা আল-ইয়াশকুরী বলেন, “আমি হাসানের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী দুঃখবোধসম্পন্ন আর কাউকে দেখিনি। আমি যখনই তাঁকে দেখতাম, মনে হতো তিনি এইমাত্র কোনো বড়ো বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন।”১১

জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:

হিশাম ইবনু হাসান বলেন, আমি হাসানকে আল্লাহর কসম খেয়ে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি দিরহামকে (টাকা-পয়সাকে) সম্মান করবে (অতিরিক্ত মর্যাদা দেবে), আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করবেন।”

হাযম ইবনু আবি হাযম বলেন, আমি হাসানকে বলতে শুনেছি, “দিনার ও দিরহাম কতই না নিকৃষ্ট সঙ্গী! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার উপকারে আসে না, যতক্ষণ না তারা তোমাকে ছেড়ে চলে যায় (অর্থাৎ খরচ করা না পর্যন্ত কাজে আসে না)।”

সাল্লাম ইবনু মিসকিন হাসান (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “দুনিয়াকে তুচ্ছ জ্ঞান করো (এর মোহ ত্যাগ করো)। আল্লাহর কসম, তুমি একে যতটা তুচ্ছ মনে করবে, এটি তোমার কাছে ততটাই সুখকর ও তৃপ্তিদায়ক হবে।”

ইবন শাওজাব মাতার থেকে বর্ণনা করেন, “আমরা হাসানকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে তাঁর ঘরে প্রবেশ করলাম। দেখলাম, তাঁর ঘরে (আসবাবপত্র বলতে) কিছুই নেই, কোনো বিছানা নেই, গালিচা নেই, বালিশ নেই; এমনকি কোনো চাটাইও নেই। শুধু দড়ি দিয়ে বোনা একটি সাধারণ খাট ছিল, যার ওপর তিনি শুয়ে ছিলেন।”১২

ইব্রাহিম ইবনু ঈসা আল-ইয়াশকুরী (রহ.) বলেন, আমি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি যখন দুনিয়ার অনুসারীদের কথা উল্লেখ করতেন, তখন বলতেন, “আল্লাহর কসম, না দুনিয়া তার জন্য অবশিষ্ট থাকে, না সে নিজে দুনিয়ার জন্য অবশিষ্ট থাকে। সে দুনিয়ার দায়, অকল্যাণ ও হিসাব থেকে নিরাপদ থাকতে পারে না। অবশেষে তাকে দুনিয়া থেকে বের করে দেওয়া হয়। কেবল কয়েক টুকরো কাফনের কাপড়ে জড়ানো অবস্থায়।”১৩

তাঁর আখেরাত ভাবনা:

আহমদ বিন জাফর বিন হামদান (রহ.) ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-এঁর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, হুমাইদ (রহ.) বলেছেন, “রজব মাসের একদিন হাসান বসরি (রহ.) মসজিদে ছিলেন। তিনি পানি দিয়ে কুলি করছিলেন; এমন সময় তিনি এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অতঃপর তিনি এতটাই কাঁদলেন যে, তাঁর দুই কাঁধ থরথর করে কাঁপতে লাগল। এরপর তিনি বললেন, ‘যদি অন্তরগুলোতে প্রাণ থাকত, যদি অন্তরগুলোতে সততা ও শুভবুদ্ধি থাকত, তবে আমি সেই রাতটির কথা বলে তোমাদের কাঁদিয়ে দিতাম, যার ভোর হবে কিয়ামতের দিন দিয়ে।”

তিনি আরও বলেন, “আগামীকাল কেবল সেই বিষয়েই প্রত্যেক মানুষ ব্যস্ত থাকবে, যা তাকে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত করেছিল। মানুষ যে বিষয়ে বেশি চিন্তা করে, সেটাই তার আলোচনার কেন্দ্র হয়ে যায়। যার কোনো আখিরাত নেই, তার কোনো দুনিয়াও নেই। আর যে ব্যক্তি তার আখিরাতের ওপর দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়, তার না দুনিয়া থাকে, না আখিরাত।”১৪

বিনয় ও গাম্ভীর্য:

ইউসুফ বিন আসবাত (রহ.) বলেন, “হাসান বসরি টানা ত্রিশ বছর হাসেননি এবং চল্লিশ বছর কোনো কৌতুক করেননি।” তিনি আরও বলেন, হাসান বসরি বলতেন, “আমি এমন এক প্রজন্মের (সাহাবায়ে কেরাম) দেখা পেয়েছি, যাঁদের তুলনায় আমি নিজেকে একজন চোর ছাড়া আর কিছুই মনে করি না।”১৫

তাসাউফ চর্চার মজলিস:

আবু সাঈদ ইবনুল আরাবি তাঁর তাবাকাতুন নুসসাক গ্রন্থে বলেন, আমরা যে সমস্ত ইবাদতগুজার ও সাধক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছি, তাঁদের অধিকাংশই হাসান আল-বসরির কাছে যেতেন, তাঁর কথা শুনতেন এবং বিশেষ করে আধ্যাত্মিক ও চারিত্রিক পরিশুদ্ধির ক্ষেত্রে তাঁর প্রজ্ঞা ও ফিকহকে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করতেন। আমর ইবনে উবাইদ এবং আব্দুল ওয়াহিদ ইবন জায়েদ তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন।

হজরত হাসানের নিজ ঘরে একটি বিশেষ মজলিস ছিল, যেখানে তিনি জুহদ (দুনিয়াবিমুখতা), ইবাদত (নুসুক) এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞান (উলুমে বাতিন) ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কথা বলতেন না। সেখানে কেউ অন্য কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বিরক্ত হতেন এবং বলতেন, “আমরা এখানে আমাদের ভাইদের সাথে নিভৃতে আল্লাহর স্মরণে ও জ্ঞানচর্চায় বসেছি; এটি অন্য প্রসঙ্গের স্থান নয়।”

অন্যদিকে, মসজিদে তাঁর যে সাধারণ মজলিস বা হালাকা বসতো, সেখানে হাদিস, ফিকহ, কুরআন-সংক্রান্ত জ্ঞান, ভাষা ও ব্যাকরণসহ নানান বিষয়ের আলোচনা হতো। কখনো কখনো তাসাউফ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি তার উত্তর দিতেন। তাঁর ছাত্রদের কেউ কেবল হাদিস শোনার জন্য, কেউ কুরআন ও ব্যাখ্যা শেখার জন্য, কেউ বালাগাত শেখার জন্য, আবার কেউ ইখলাস ও বিশেষ আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য তাঁর সান্নিধ্যে থাকতেন।

তাঁদের মধ্যে আমর ইবনে উবাইদ, আবু জাহির, আব্দুল ওয়াহিদ ইবন জায়েদ, সালিহ আল-মুররি, শুমাইত এবং আবু উবাইদাহ আন-নাজি প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের প্রত্যেকেই ইবাদত-বন্দেগির উচ্চ স্তরের জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন।১৬

খলিফা উমর ইবনুল আবদুল আজিজের প্রতি হাসান বসরি (রহ.)-এঁর চিঠি:

“জেনে রাখুন, চিন্তা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করে এবং তা পালনে উদ্বুদ্ধ করে। আর মন্দ কাজের জন্য অনুশোচনা মানুষকে মন্দ ত্যাগের দিকে টেনে আনে। যা ধ্বংস হয়ে যাবে, তা পরিমাণে যতই বেশি হোক, যা চিরস্থায়ী, তার সমান হতে পারে না; যদিও তা অর্জন করা কঠিন। সাময়িক কষ্ট, যার পরিণতি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, তা সেই সাময়িক আরামের চেয়ে উত্তম, যার পরিণতিতে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি দুর্গতি।

অতএব, এই প্রতারক ও ধূর্ত আবাসস্থল— দুনিয়া থেকে সাবধান থাকুন। সে তার ছলাকলায় নিজেকে সাজিয়ে তোলে, মিথ্যা আশায় বাসিন্দাদের মোহিত করে এবং নিজের মোহ দিয়ে তাদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। সে নিজেকে নববধূর মতো সাজিয়ে উপস্থাপন করে; যার দিকে চোখ অপলক তাকিয়ে থাকে, নফস যার প্রেমে পড়ে যায় এবং হৃদয় পাগলপ্রায় হয়ে ওঠে। অথচ দুনিয়া তার সকল বসবাসকারীর জন্যই খুনি।

যারা বেঁচে আছে, তারা পূর্বে গত হওয়া লোকদের থেকে শিক্ষা নেয় না; আর পরের জন আগের জনের পরিণতি দেখে সতর্ক হয় না। কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি অভিজ্ঞতার সুফল গ্রহণ করে না; আর আল্লাহ যখন দুনিয়ার অসারতা সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন, তখনও কোনো আল্লাহভীরু ব্যক্তি তা স্মরণ করে না। এই দুনিয়ার প্রতি হৃদয়ের ভালোবাসা এবং নফসের আসক্তি যেন কাটতেই চায় না। যে ব্যক্তি কোনো কিছুর প্রেমে পড়ে, সে তা ছাড়া আর কিছু বুঝতে পারে না। সব মিলিয়ে দুনিয়া অন্বেষণকারী দুই ধরনের—

১. দুনিয়া অর্জন করে অহংকারী হয়ে যায় এবং পরকাল ভুলে যায়। হঠাৎ তার মৃত্যু উপস্থিত হয়, যখন সে চরম সুখে ছিল। তখন অনুশোচনা ও বেদনার কোনো সীমা থাকে না। মৃত্যুযন্ত্রণা ও আফসোস তাকে একসঙ্গে ঘিরে ধরে।

২. দুনিয়া পাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করে। সে কষ্ট ও দুঃখ নিয়েই চলে যায়; যা চেয়েছিল তা পেল না, আবার নফসকেও পরিশ্রম থেকে মুক্ত করতে পারল না।

উভয় দলই পরকালের পাথেয় ছাড়া বিদায় নেয়; আরামদায়ক কোনো বিছানা (নেক আমল) ছাড়াই কবরে উপস্থিত হয়।

সুতরাং, দুনিয়া থেকে পুরোপুরি সতর্ক থাকুন। এটি স্পর্শে নরম সাপের মতো, কিন্তু এর বিষ প্রাণঘাতী। এর চাকচিক্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন; কারণ এখান থেকে সামান্যই আপনার সাথে যাবে। এর দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলুন; কারণ আপনি এর বিচ্ছেদ সম্পর্কে নিশ্চিত। দুনিয়াতে যখন আপনি খুব বেশি আনন্দিত থাকেন, তখনই এর থেকে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকুন। কারণ, দুনিয়াদার যখনই এখানে স্বস্তি পায়, দুনিয়া তাকে কোনো অপছন্দনীয় বিষয় দিয়ে আঘাত করে। এর সুখ ধোঁকা; এর উপকার ক্ষতিতে রূপান্তর হয়। এর স্বচ্ছতা আবিলতায় ভরে যায়; আর জীবনের পরিণতি হয় দুর্বলতা ও জীর্ণতা।

অতএব দুনিয়ার দিকে তাকান— একজন বিরাগী ও বিদায়ীর দৃষ্টিতে; প্রেমিকের দৃষ্টিতে নয়। দুনিয়া স্থায়ী বাসিন্দাকে উচ্ছেদ করে এবং নিশ্চিন্ত ব্যক্তিকে বিপদে ফেলে। এর যা গত হয়েছে, তা আর ফিরে আসবে না; আর যা সামনে আসছে, তা অনিশ্চিত। এর আশা মিথ্যা এবং জীবন অত্যন্ত কষ্টদায়ক। আপনি এখানে ঝুঁকির মধ্যে আছেন। হয় কোনো নেয়ামত যা হারিয়ে যাবে, অথবা কোনো বিপদ যা নাজিল হবে, কিংবা কোনো বেদনাদায়ক মুসিবত, অথবা অবধারিত মৃত্যু।

আল্লাহর কাছে দুনিয়ার কোনো ওজন নেই। তার মর্যাদা কণামাত্রও নয়। আল্লাহ একে সৃষ্টি করার পর থেকে দয়ার দৃষ্টিতে তাকাননি। আমাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এঁর কাছে দুনিয়ার ধনভাণ্ডারের চাবিকাঠি পেশ করা হয়েছিল, যা গ্রহণ করলে আল্লাহর কাছে তাঁর মর্যাদা মশার ডানার সমানও কমত না; তবুও তিনি তা গ্রহণ করেননি। কারণ, তিনি জানতেন আল্লাহ একে অপছন্দ করেন; তাই তিনিও একে অপছন্দ করেছেন। আল্লাহ যাকে তুচ্ছ করেছেন, তিনিও তাকে তুচ্ছ করেছেন।

আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী ও বন্ধুদের পরীক্ষা করার জন্য দুনিয়াকে তাঁদের থেকে দূরে রেখেছেন। মুসা (আলাইহিস সালাম) ক্ষুধার তাড়নায় পেটে পাথর বেঁধেছিলেন। বলা হয়, আল্লাহ মুসা (আলাইহিস সালাম)-কে ওহি পাঠিয়েছিলেন: ‘হে মুসা, যখন দেখবে দরিদ্রতা তোমার দিকে আসছে, তখন বলো— স্বাগতম হে নেককারদের ভূষণ! আর যখন দেখবে প্রাচুর্য আসছে, তখন বলো— এটি এমন এক গুনাহ, যার শাস্তি দ্রুত দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

ইসা (আলাইহিস সালাম) বলতেন, ‘ক্ষুধাই আমার তরকারি, ভয় আমার ভূষণ, পশম আমার পোশাক, আমার দুই পা আমার বাহন, চাঁদ আমার বাতি, সূর্য আমার শীতের কম্বল এবং জমিনে যা উৎপন্ন হয় তা-ই আমার ফল ও ফুল। আমি যখন ঘুমাতে যাই আমার কাছে কিছুই থাকে না—অথচ আমার চেয়ে ধনী আর কেউ নেই।’

সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-এঁর রাজত্ব থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজে যবের রুটি খেতেন এবং পরিবারের লোকদের মোটা চালের খাবার দিতেন। রাত হলে তিনি পশমের কাপড় পরে আল্লাহর দরবারে কেঁদে ভোর করতেন।

দুনিয়া মূলত তিন দিনের সমষ্টি। গতকাল; যা চলে গেছে। তার ফিরে আসার আশা নেই। এটি একজন বিজ্ঞ শিক্ষক, আপনাকে শিক্ষা দিয়ে গেছে। আজ; আপনার বিদায়ী বন্ধু। এর প্রতিটি মুহূর্ত গনিমত মনে করুন। আগামীকাল; আপনি জানেন না— সেই পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবেন কি না।

আপনি যদি আগামীকালের আশা হৃদয় থেকে বের করে দিতে পারেন, তবে আজকের আমল সুন্দর হবে। দুনিয়া হলো দুই সময়ের মাঝখানের একটি মুহূর্ত—অতীত ও ভবিষ্যৎ। অতীত ও ভবিষ্যতের আরাম-অসুবিধা আপনি এখন অনুভব করছেন না। আপনি যে বর্তমান মুহূর্তে আছেন, সেটিই আপনার আসল দুনিয়া। এই ক্ষুদ্র মুহূর্তটি যেন আপনাকে জান্নাত থেকে বিমুখ করে জাহান্নামের দিকে টেনে না নেয়।

আপনার আয়ুর যতটুকু অবশিষ্ট আছে, তার কোনো মূল্য নেই। পুরো দুনিয়া জমা করলেও তা জীবনের একটি অবশিষ্ট দিনের সমান হবে না। কবরে শায়িত ব্যক্তি যদি সুযোগ পেত, তবে দুনিয়ার সব রাজত্বের বদলে সে কেবল একটি ‘সুবহানাল্লাহ’ বলার সুযোগ বা একটি নেক আমলের মুহূর্ত বেছে নিত।

অতএব, আজই নিজের জন্য প্রস্তুতি নিন। প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্য দিন এবং মৃত্যুযন্ত্রণার সময়কার আফসোস থেকে সতর্ক থাকুন। আল্লাহ আমাদের এই নসিহত দ্বারা উপকৃত হওয়ার তাওফিক দিন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।১৭

খলিফার নির্দেশের সামনে হাসান বসরি (রহ.)-এর অটল অবস্থান:

আলকামা ইবনে মারছাদ থেকে বর্ণিত, যখন ওমর বিন হুবাইরা ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত হলেন, তখন তিনি (বিখ্যাত দুই আলেম) ইমাম হাসান বসরি ও ইমাম শা’বী-কে ডেকে পাঠালেন। তাঁদের জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হলো এবং তাঁরা প্রায় এক মাস সেখানে অবস্থান করলেন।

একদিন গভর্নরের এক খাদেম এসে জানাল— আমির (গভর্নর) তাঁদের সাথে দেখা করতে আসছেন। ওমর বিন হুবাইরা একটি লাঠিতে ভর দিয়ে প্রবেশ করলেন। তিনি তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বসলেন এবং বললেন, ‘আমিরুল মুমিনীন ইয়াজিদ বিন আব্দুল মালিক আমাকে এমন কিছু ফরমান পাঠিয়েছেন, যা কার্যকর করতে গিয়ে আমি ধ্বংস (পরকাল নষ্ট হওয়ার ভয়) দেখতে পাচ্ছি। আমি যদি তাঁর আনুগত্য করি, তবে আল্লাহর অবাধ্যতা হবে; আর যদি তাঁর অবাধ্য হই, তবে আল্লাহর আনুগত্য হবে। আপনাদের দৃষ্টিতে কি তাঁর আনুগত্য করার মাঝে আমার মুক্তির কোনো পথ আছে?”

হাসান বসরি (রহ.) বললেন, “হে আবু আমর (ইমাম শা’বীর উপনাম)! আপনি আমিরের প্রশ্নের উত্তর দিন।”

ইমাম শা’বী উত্তর দিলেন এবং কিছুটা নমনীয়/কৌশলী পথ দেখানোর চেষ্টা করলেন; যাতে শাসক অসন্তুষ্ট না হন।

গভর্নর এরপর হাসান বসরিকে বললেন, “হে আবু সাঈদ, আপনি কী বলেন?”

হাসান বসরি (রহ.) বললেন, “হে ওমর বিন হুবাইরা, খুব শীঘ্রই আল্লাহর পক্ষ থেকে এক কঠোর ও কর্কশ ফেরেশতা (মৃত্যুদূত) তোমার কাছে আসবেন, যিনি আল্লাহর কোনো আদেশ অমান্য করেন না। তিনি তোমাকে তোমার এই প্রশস্ত প্রাসাদ থেকে বের করে কবরের সংকীর্ণতায় নিয়ে যাবেন।

হে ওমর বিন হুবাইরা, তুমি যদি আল্লাহকে ভয় করো, তবে আল্লাহ তোমাকে ইয়াজিদ বিন আব্দুল মালিকের হাত থেকে রক্ষা করবেন। কিন্তু ইয়াজিদ বিন আব্দুল মালিক তোমাকে আল্লাহর হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না। ইয়াজিদের আনুগত্য করতে গিয়ে যদি তুমি জঘন্য কোনো কাজে লিপ্ত হও, তবে সাবধান, আল্লাহ যেন তোমার প্রতি ঘৃণার দৃষ্টিতে না তাকান এবং তোমার জন্য ক্ষমার দরজা বন্ধ না করে দেন।

হে ওমর বিন হুবাইরা, আমি এই উম্মতের অগ্রজদের (সাহাবিদের) দেখেছি। আল্লাহর কসম, দুনিয়া যখন তাদের দিকে আসছিল, তারা তার থেকে ততটাই দূরে পালাতেন, যতটা তোমরা দুনিয়ার পেছনে ছুটছ; অথচ দুনিয়া তোমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

হে ইবনে হুবাইরা, আমি তোমাকে সেই দাঁড়ানোর জায়গা (কিয়ামতের ময়দান) সম্পর্কে সতর্ক করছি, যার ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ সতর্ক করেছেন— ‘এটি তার জন্য, যে আমার সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং আমার শাস্তিকে ভয় করে।’ (সুরা ইবরাহিম: ১৪)

তুমি যদি আল্লাহর আনুগত্যে থাকো, তবে ইয়াজিদের পক্ষ থেকে আসা বিপদ থেকে আল্লাহই তোমার জন্য যথেষ্ট হবেন। আর যদি তুমি ইয়াজিদের সাথে থেকে আল্লাহর অবাধ্যতা করো, তবে আল্লাহ তোমাকে ইয়াজিদের হাতেই সঁপে দেবেন।”

এই কথা শুনে ওমর বিন হুবাইরা কেঁদে ফেললেন এবং অশ্রুসজল চোখে উঠে চলে গেলেন। পরদিন তিনি তাঁদের বিদায় দিলেন এবং পুরস্কার পাঠালেন। হাসান বসরিকে তিনি বেশি দিলেন, আর শা’বীর পুরস্কারে কিছুটা কমতি করলেন।

এরপর ইমাম শা’বী মসজিদে গিয়ে মানুষকে লক্ষ্য করে বললেন, “হে লোকসকল, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সৃষ্টির ওপর স্রষ্টাকে (আল্লাহকে) প্রাধান্য দিতে পারে, সে যেন তাই করে। সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, হাসান বসরি যা জানতেন আমিও তা জানতাম; কিন্তু আমি ইবনে হুবাইরার সন্তুষ্টি চেয়েছিলাম, ফলে আল্লাহ আমাকে তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন (মর্যাদা কমিয়ে দিলেন)।”১৮

বিবাহের ঘটনা:

হুমাইদ আত-তাওয়িল (রহ.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি হাসান বসরি (রহ.)-এঁর কাছে বিবাহের প্রস্তাব পাঠাল। আমি (হুমাইদ) ছিলাম তাঁদের মধ্যস্থতাকারী। হাসান বসরি যেন তাকে পছন্দই করেছিলেন। একদিন লোকটির প্রশংসা করতে গিয়ে আমি বললাম, “হে আবু সাঈদ, আরও একটি কথা— তার কাছে পঞ্চাশ হাজার দিরহাম সম্পদ আছে।”

হাসান বসরি (রহ.) বললেন, “তার পঞ্চাশ হাজার দিরহাম আছে? এত টাকা কখনও হালাল পথে জমা হতে পারে না!”

আমি বললাম, “হে আবু সাঈদ, আমি তো জানি, সে একজন পরহেজগার মুসলিম।”

তিনি বললেন, “যদি সে হালাল পথেই তা জমা করে থাকে, তবে নিশ্চয়ই সে আল্লাহর নির্ধারিত হক (দান-সদকা) আদায়ে কৃপণতা করেছে। না, আল্লাহর কসম, আমাদের আর তার মাঝে কখনও আত্মীয়তার সম্পর্ক (বিয়ে) হবে না।”১৯

শাসকের দেওয়া অন্যায্য সুযোগ বর্জন:

ইবনে শাওযাব (রহ.) থেকে বর্ণিত, যখন অত্যাচারী শাসক হাজ্জাজ মারা গেল এবং সুলাইমান বিন আব্দুল মালিক ক্ষমতায় বসলেন, তখন তিনি অনাবাদি জমিগুলো জনগণের মাঝে ভাগ করে দিতে লাগলেন। মানুষও হুড়মুড় করে নিতে শুরু করল।

তখন হাসান বসরির ছেলে তাঁকে বললেন, “মানুষ যেভাবে জমি নিচ্ছে, আমরাও যদি সেভাবে নিতাম!”

হাসান বসরি (রহ.) বললেন, “চুপ করো, এই দুই ব্রিজের মাঝখানের সবটুকু জায়গাও যদি আমাকে এক ঝুড়ি মাটির বিনিময়ে দেওয়া হয় তবুও আমি খুশি হবো না (যদি তা নেওয়া তাকওয়ার পরিপন্থী হয়)।”২০

অন্তরের যত্ন:

আবু উবাইদা আন-নাজি থেকে বর্ণিত, তিনি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছেন,“তোমরা নসিহতের মাধ্যমে এই অন্তরগুলোকে সজিব করো, কারণ এতে দ্রুত মরিচা ধরে যায়। আর নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখো, কারণ, নফস প্রবৃত্তির পেছনে ছুটতে চায় এবং মন্দের দিকে তার ঝোঁক প্রবল। তোমরা যদি নফসকে শাসন না করো, তবে সে তোমাদের আমলের কিছুই অবশিষ্ট রাখবে না। সুতরাং ধৈর্য ধরো এবং দৃঢ় হও। এ তো কেবল কয়েকটি রাতের ব্যাপার।

তোমরা তো একটি কাফেলার মতো, যারা সাময়িক যাত্রাবিরতি করছে। শীঘ্রই তোমাদের ডাকা হবে; আর তোমরা কোনো দিকে না তাকিয়েই চলে যেতে হবে। সুতরাং তোমাদের কাছে থাকা সর্বোত্তম পাথেয় নিয়ে ফিরে যাও।

নিশ্চয়ই এই ‘হক’ (সত্য) মানুষকে পরিশ্রান্ত করে এবং নফস ও লালসার মাঝে প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। কেবল তারাই হকের ওপর ধৈর্য ধরতে পারে, যারা এর মর্যাদা বোঝে এবং শুভ পরিণামের আশা রাখে।”২১

আলেমদের অবমাননার কারণ:

ফুদাইল বিন জাফর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাসান বসরি (রহ.) যখন (গভর্নর) ইবনে হুবাইরার কাছ থেকে বের হলেন, তখন দরজার বাইরে তিনি একদল ‘কারি’ বা আলেমকে (সুযোগের অপেক্ষায়) বসে থাকতে দেখলেন। তাঁদের দেখে তিনি বললেন,“তোমরা এখানে কেন বসে আছো? তোমরা কি এই খবিশদের (অসৎ শাসকদের) কাছে যেতে চাও? আল্লাহর কসম, এদের মজলিস নেককারদের মজলিস নয়। এখান থেকে সরে যাও। আল্লাহ তোমাদের আত্মা ও শরীরের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিক (অর্থাৎ মৃত্যু দিক)!”

এরপর তিনি বললেন,“তোমরা জুতা পলিশ করেছ, কাপড় গুটিয়ে নিয়েছ, চুল ছেঁটে পরিপাটি হয়েছ শাসকদের মুগ্ধ করার জন্য! তোমরা কারিদের ও আলেমদের মান-সম্মান ডুবিয়েছ। আল্লাহ তোমাদের অপদস্থ করুন। আল্লাহর কসম, যদি তোমরা তাদের কাছে থাকা ধন-সম্পদ থেকে নির্লোভ হতে, তবে তারা তোমাদের কাছে থাকা জ্ঞান থেকে উপকৃত হতে আগ্রহী হতো। কিন্তু তোমরা তাদের সম্পদের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েছ। ফলে তারাও তোমাদের জ্ঞানের প্রতি অনাগ্রহী হয়ে গেছে। আল্লাহ তাদের দূর করে দিন, যারা সত্য থেকে দূরে সরে গেছে।”২২

মুমিন ও মুনাফিকের পরিচয়:

আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, তালহা ইবন সবিহ থেকে, তালহা ইবন সবিহ হাসান (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,“মুমিন সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহ যা বলেছেন তা ঠিক তেমনই বিশ্বাস করে। মুমিন আমলের দিক থেকে মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ; আবার আল্লাহভীতির দিক থেকেও সে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভীত। মুমিন যদি পাহাড়সম সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয়ও করে, তবুও পরকাল স্বচক্ষে না দেখা পর্যন্ত সে নিজেকে নিরাপদ মনে করে না। সে যত বেশি নেক আমল করে, তার অন্তরে আল্লাহভীতি ততই বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে মুনাফিক বলে, ‘মানুষের ভিড় তো অনেক; আমাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে, আমার কোনো সমস্যা নেই।’ সে মন্দ কাজ চালিয়েই যায়, অথচ আল্লাহর কাছে (ক্ষমার) বৃথা আশা পোষণ করে।”২৩

মুমিনের গুণাবলি:

ইয়াহইয়া ইবনু আল-মুখতার (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাসান বসরি রহ. বলেছেন, “নিশ্চয়ই একজন মুমিন নিজের ওপর সদা-সচেতন প্রহরীর মতো থাকে। আল্লাহ তায়ালার জন্যই সে নিজেকে হিসাবের মুখোমুখি করে। কিয়ামতের দিনে যাদের হিসাব সহজ হবে, তারা হলো সেইসব লোক, যারা দুনিয়াতেই নিজেদের হিসাব করে নিয়েছে। আর কিয়ামতের দিনে যাদের হিসাব কঠিন হবে, তারা হলো সেইসব লোক, যারা কোনো আত্মসমালোচনা ও হিসাব ছাড়াই জীবনযাপন করেছে।

যখন মুমিনের সামনে হঠাৎ কোনো বিষয় উপস্থিত হয়, যা তার ভালো লাগে, তখন সে নিজেকে বলে,‘আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে কামনা করি, আর তুমি আমার প্রয়োজনেরও বিষয়; কিন্তু আল্লাহর কসম, তোমার কাছে পৌঁছার কোনো পথ আমার জন্য খোলা নেই। দূরে সরে যাও, দূরে সরে যাও। আমার ও তোমার মাঝে পর্দা টেনে দেওয়া হয়েছে।’আর যদি তার কোনো ভুল বা বাড়াবাড়ি হয়ে যায়, তবে সে নিজের দিকে ফিরে এসে বলে, ‘আমি কেন এমনটি করতে গেলাম? আমার এতে কী দরকার ছিল? আল্লাহর কসম, ইনশাআল্লাহ, আমি আর কখনো এমন করব না।’

মুমিনরা এমন এক সম্প্রদায়, যাদেরকে কুরআন দৃঢ়ভাবে বেঁধে রেখেছে এবং ধ্বংসের পথে পতিত হওয়া থেকে বিরত রেখেছে। মুমিন এই দুনিয়ায় এক বন্দির মতো; সে সদা নিজের গলার শিকল মুক্ত করার চেষ্টা করে। আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়া পর্যন্ত সে কোনো বিষয়ের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয় না। সে জানে— তার কান, চোখ, জিহ্বা এবং সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পর্কে আল্লাহর কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।”২৪

আল্লাহর খাঁটি বান্দাদের বৈশিষ্ট্য:

হাসান বসরি (রহ.) বলেন,“নিশ্চয়ই আল্লাহর এমন কিছু বান্দা আছেন, যারা (ইমানের নুরে) জান্নাতবাসীদের জান্নাতে চিরস্থায়ী অবস্থান করতে দেখেন এবং জাহান্নামবাসীদের জাহান্নামে চিরস্থায়ীভাবে শাস্তি পেতে দেখেন।

তাঁদের অন্তর আখিরাতের চিন্তায় ব্যথিত। তাঁদের অনিষ্ট থেকে মানুষ নিরাপদ। পার্থিব প্রয়োজন অতি সামান্য এবং নফস অত্যন্ত পবিত্র। দুনিয়ার এই স্বল্প কয়েকটা দিন তাঁরা ধৈর্য ধরে কাটিয়েছেন, যার বিনিময়ে লাভ করবেন দীর্ঘস্থায়ী সুখ ও আরাম।

রাতে তাঁরা কাতারবদ্ধ হয়ে নামাজে দাঁড়ান। গাল বেয়ে অশ্রু ঝরে। তাঁরা রবের দরবারে ডেকে বলেন, ‘হে আমাদের রব, হে আমাদের রব!’ আর দিনে তাঁরা বিচরণ করেন ধৈর্যশীল, প্রজ্ঞাবান, নেককার ও মুত্তাকি হয়ে। ইবাদতের পরিশ্রমে তাঁরা যেন ছিলা-ছাড়া তীরের মতো চিকন। দর্শক দেখে মনে করে তাঁরা অসুস্থ; অথচ তাঁরা অসুস্থ নন। কেউ ভাবে তাঁদের মস্তিষ্কে বিকৃতি ঘটেছে; অথচ আখিরাতের প্রবল স্মরণই তাঁদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে।”২৫

দুনিয়াতে আমলের গুরুত্ব:

আব্দুল মুমিন বিন ওবায়দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি (রহ.) বলেন,“হে আদম সন্তান, তুমি তোমার আমলের দিকে তাকিয়ে আছ। এর ভালো-মন্দ সবই ওজন করা হবে। অতএব কোনো ভালো কাজকে ছোটো মনে করে ছেড়ে দিও না; কারণ আমলনামায় যখন তা দেখবে, তা তোমাকে আনন্দ দেবে। আবার কোনো মন্দ কাজকে ছোটো মনে করো না; কারণ যখন তা দেখবে, তা তোমাকে ব্যথিত করবে।

আল্লাহ সেই ব্যক্তির ওপর রহম করুন, যে পবিত্র উপায়ে উপার্জন করে, পরিমিত ব্যয় করে এবং নিজের দারিদ্র্য ও অভাবের দিনের (পরকালের) জন্য অতিরিক্ত অংশ অগ্রিম পাঠিয়ে দেয়।

আফসোস! দুনিয়া তার জৌলুস নিয়ে চলে গেছে আর তোমাদের কর্মগুলো তোমাদের গলায় হারের মতো ঝুলে আছে। তোমরা মানুষকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছ, আর কিয়ামত তোমাদের তাড়া করছে। সর্বোত্তম ব্যক্তিরা দ্রুত বিদায় নিচ্ছেন, তবুও তোমরা কিসের অপেক্ষা করছ? মৃত্যুকে স্বচক্ষে দেখার? জেনে রাখো,তা অতি সন্নিকটে।

তোমাদের কিতাবের পর আর কোনো কিতাব নেই, তোমাদের নবীর পর আর কোনো নবী নেই। হে আদম সন্তান, যদি তুমি তোমার আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়াকে বিক্রি করে দাও, তবে তুমি উভয়টিতেই লাভবান হবে। সাবধান, দুনিয়ার বিনিময়ে আখিরাত বিক্রি করো না। তাহলে উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”২৬

জাহান্নাম ও শয়তান থেকে রক্ষা পাওয়ার চারটি গুণ:

আওয়াম বিন হাওশাব বলেন, আমি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি,“যার মধ্যে চারটি গুণ থাকবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে জাহান্নামের আগুনের জন্য হারাম করে দেবেন এবং শয়তান থেকে রক্ষা করবেন। এগুলো হলো—

১. আকাঙ্ক্ষা বা লোভের সময় যে ব্যক্তি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

২. ভয়ের সময় যে ব্যক্তি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

৩. প্রবৃত্তি ও লালসার সময় যে ব্যক্তি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

৪. রাগের সময় যে ব্যক্তি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।।”২৭

সাথিদের প্রতি হাসান বসরি (রহ.)-এর নসিহত:

হাসান বসরি (রহ.) তাঁর সঙ্গীদের উপদেশ দিতেন—“নিশ্চয়ই দুনিয়া আমলের ক্ষেত্র। যে ব্যক্তি এর অপূর্ণতা ও অসারতা বুঝে দুনিয়াবিমুখ হয়ে এর সঙ্গ দেবে, সে সফল হবে এবং দুনিয়ার সঙ্গ তার উপকারে আসবে। আর যে ব্যক্তি লালসা ও ভালোবাসা নিয়ে এর সঙ্গ দেবে, সে দুর্ভাগা হবে এবং আল্লাহর কাছে তার প্রাপ্য অংশ হারাবে। পরিণামে দুনিয়া তাকে আল্লাহর এমন আজাবের দিকে ঠেলে দেবে, যা সহ্য করার ক্ষমতা তার থাকবে না। দুনিয়ার গুরুত্ব সামান্য, ভোগবিলাস অল্প এবং বিনাশ অবধারিত।”

তিনি আরও বলতেন,“আল্লাহ তায়ালাই এই জগতের উত্তরাধিকারী। দুনিয়ার বাসিন্দাদের এখান থেকে সরিয়ে এমন এক আবাসে নেওয়া হবে, যা পুরোনো হয় না, আর দীর্ঘ অবস্থানও কোনো পরিবর্তন আনে না। হে আদম সন্তান, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো উপায় নেই, তাই সেই গন্তব্য সম্পর্কে সতর্ক হও। দুনিয়ার দুশ্চিন্তা গুটিয়ে নাও; নতুবা দুনিয়ার মায়া তোমাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করবে যে, তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে, সেই উদ্দেশ্যই ভুলে যাবে। তখন অন্তর সত্য থেকে বিচ্যুত হবে এবং দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে ধ্বংসের দিকে গড়াতে থাকবে।”

তিনি বলতেন,“হে আদম সন্তান, ধোঁকায় পড়ো না। যে বিপদ এখনো সামনে আসেনি, তা থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করো না। সামনে ভয়াবহ বিষয় অপেক্ষা করছে, সেই পথ তোমাকে অতিক্রম করতেই হবে। হয় আল্লাহ তোমাকে এর অনিষ্ট থেকে বাঁচাবেন, নইলে ধ্বংস অবধারিত। অতএব প্রস্তুতি নাও। এই তুচ্ছ ও নশ্বর ভোগবিলাস যেন তোমাকে গাফেল না করে। সময় নষ্ট করো না, আয়ু দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। মৃত্যুর আগে দ্রুত নেক আমল করো; কাল করব, পরশু করব বলে দেরি করো না; কারণ তুমি জানো না কখন আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে।”

তিনি আরও বলতেন,“মানুষ এখন দুনিয়ার চাকচিক্যে ব্যস্ত। প্রত্যেকে নিজের অবস্থায় মুগ্ধ এবং আরও বাড়াতে মরিয়া। অথচ আল্লাহর আনুগত্য ছাড়া সবই বিফল। কিয়ামতের বিচার হবে দুই রকম— রহমত ও পুরস্কার, যা পরম নেয়ামত; অথবা ক্রোধ ও শাস্তি, যা চরম অনুতাপ। যার কাছে সত্য পৌঁছে গেছে, তার উচিত আল্লাহর কাছে যা তুচ্ছ, তাকে তুচ্ছ গণ্য করা; আর আল্লাহর কাছে যা মহান, তাকে মহান গণ্য করা।”

হে আদম সন্তান, তুমি আজ এমন এক ঘরে আছ, যা শীঘ্রই তোমাকে উগরে দেবে (বের করে দেবে)। দুনিয়া থেকে তোমার জন্য ততটুকুই থাকবে, যতটুকু তুমি আখিরাতের জন্য করেছ। যা রেখে যাবে, তার মোহে থেকো না। দীর্ঘ সফরের পাথেয় সংগ্রহ করো। দুনিয়াকে ত্যাগ করো। তবেই চিরস্থায়ী নেয়ামত পাবে। শরীর দিয়ে দুনিয়াতে থাকো, কিন্তু অন্তরকে এখান থেকে আলাদা রাখো। দুনিয়া-মত্তদের দেখে আরও দুনিয়াবিমুখ হও; কারণ নেককাররা এমনই ছিলেন।”

পরিশেষে তিনি বলেন,“আফসোস হে আদম সন্তান, আখিরাতের কল্যাণ যদি অর্জিত হয়, তবে দুনিয়ার কষ্ট তোমার কী ক্ষতি করবে? প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের ধ্বংস করেছে। আমরা এমন লোকদের সঙ্গ পেয়েছি, যারা বলতেন, ‘দুনিয়াতে আমাদের প্রয়োজন নেই; এর জন্য আমরা সৃষ্টি হইনি।’ তাঁরা সর্বদা রাতের জাগরণে আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যমে জান্নাত খুঁজতেন। তাঁরা ছিলেন রোজাদার, বিনয়ী ও সদা ভীত। ঘরে ফিরলে খাবার দেওয়া হলে খেতেন, না হলে নীরব থাকতেন,‘এটা কী জিনিস’, ‘ওটা কেন নেই’— এমন প্রশ্ন করতেন না।”

তারপর তিনি বলেন,“মরে গেলেই কারো সব শেষ হয়ে যায় না যে, সে বিশ্রাম পাবে; প্রকৃত মৃত তো সে-ই, যে জীবিতদের মাঝে থেকেও অন্তরের দিক থেকে মৃত।”২৮

মুসলিমদের প্রতি তাঁর নসিহত:

আবু উবাইদা (রহ.) বলেন, হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন,“আল্লাহ সেই মানুষটির প্রতি রহম করুন, যে সত্যকে চিনেছে, তারপর ধৈর্য ধরেছে; যে দেখেছে, তারপর অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেছে। কিন্তু কিছু লোক সত্য চিনেছিল; তারপর অস্থিরতা ও হতাশা তাদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিয়েছে। ফলে তারা না পৌঁছাতে পেরেছে তাদের লক্ষ্যে, না ফিরে আসতে পেরেছে তারা যা ছেড়ে এসেছিল সেখানে।”

তিনি আরও বলেন,“ওই বিভ্রান্তিকর প্রবৃত্তিগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যা আল্লাহ থেকে বহু দূরে নিয়ে যায়; যার সারকথা পথভ্রষ্টতা এবং যার পরিণতি জাহান্নাম। এতে কঠিন পরীক্ষা আছে। যে এতে পতিত হয়, তা তাকে বিভ্রান্ত করে; আর যে এতে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়ে, তা তাকে ধ্বংস করে।

হে আদম সন্তান, তুমি তোমার দ্বীনকে আঁকড়ে ধরো। দ্বীনই তোমার মাংস ও রক্তের মতো। দ্বীন নিরাপদ থাকলে মাংস ও রক্তও নিরাপদ থাকবে। আর বিপরীত হলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই—তা এমন এক আগুন, যা নিভবে না; এমন এক ক্ষত, যা সারবে না; এমন এক শাস্তি, যা শেষ হবে না এবং এমন এক আত্মা, যা মরবে না।”

“নিশ্চয় তোমাকে তোমার প্রতিপালকের সামনে দাঁড় করানো হবে এবং তোমাকে তোমার আমলের বিনিময়ে বন্ধক রাখা হবে। সুতরাং, এখন যা তোমার হাতে আছে, তা থেকেই সঞ্চয় করে নাও— সেই দিনের জন্য, যা সামনে অপেক্ষা করছে। মৃত্যুর সময় সংবাদ এসে পৌঁছবে; তখন জিজ্ঞেস করা হবে, কিন্তু তুমি উত্তর খুঁজে পাবে না। বান্দা ততদিন কল্যাণের উপর থাকে, যতদিন তার নফসই তার উপদেশদাতা থাকে এবং আত্মসমালোচনাই তার প্রধান চিন্তা হয়।”

আবু উবাইদাহ থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন,“হে আদম সন্তান, তুমি তো কেবল গোগ্রাসে গিলে যাচ্ছ, পাত্রে সম্পদ জমা করছ, থলের মুখ শক্ত করে বাঁধছ; আরামদায়ক বাহনে চড়ছ, নরম পোশাক পরছ। এরপর একদিন বলা হবে—‘সে মারা গেছে।’ আল্লাহর কসম, এরপর সে আখিরাতের দিকে যাত্রা করবে।

মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়াতে অল্প কয়েকদিন আমল করে। আল্লাহর কসম, দুনিয়ার নিয়ামত ও স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ না করার কারণে সে আখিরাতে অনুতপ্ত হবে না। বরং দুনিয়া যখন তার সামনে সজ্জিত হয়ে আসত, সে আখিরাতের আশায় একে তুচ্ছ মনে করত। সে এখান থেকে কেবল পাথেয় সংগ্রহ করেছে; দুনিয়াকে স্থায়ী ঘর বানায়নি। দুনিয়ার নিয়ামতের প্রতি লালায়িত হয়নি; প্রাচুর্যে উল্লসিত হয়নি। বিপদ এলেও সে তা বড়ো করে দেখত না; আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা করত। সে দুনিয়ার প্রাপ্তিকে বড় মনে করেনি, যতক্ষণ না আল্লাহর প্রতি আগ্রহ ও ভয় নিয়ে বিদায় নিয়েছে। সুসংবাদ তার জন্য, আল্লাহ তার কিয়ামতের ভয় দূর করবেন, ভুল ঢেকে দেবেন এবং হিসাব সহজ করবেন।”

তিনি আরও বলেন,“মুসলিমদের মধ্যে যারা বুদ্ধিমান ছিলেন, তারা বলতেন, ‘জীবন তো কেবল সকাল-সন্ধ্যা, আর রাতের শেষভাগের কিছু ইবাদত ও দ্বীনের ওপর অবিচল থাকা।’ হে আদম সন্তান, কল্যাণ পেতে তোমার বেশি দেরি হবে না। আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে জান্নাত দান করবেন, তখনই সে সফল। মনে রেখো, আল্লাহকে তাঁর জান্নাতের ব্যাপারে ধোঁকা দেওয়া যায় না; আর অলীক কামনা (আশা-তামান্না) দিয়ে জান্নাতও পাওয়া যায় না। অথচ এখন কৃপণতা বেড়েছে, অলীক বাসনা ছড়িয়েছে, আর আকাঙ্ক্ষাকারী ব্যক্তি ধোঁকার ঘোরেই ডুবে আছে।”২৯

বাণীসমগ্র:

১. হজরত হাসান বসরি (রহ.) বলেন,“হে আদম সন্তান, আল্লাহর কসম, তুমি যদি কুরআন পাঠ করো এবং তার ওপর যথার্থ বিশ্বাস স্থাপন করো, তবে দুনিয়ায় তোমার দুঃখবোধ দীর্ঘ হবে, তোমার ভয় প্রবল হবে এবং তোমার কান্না বেড়ে যাবে।”

২. হাসান (রহ.) প্রায়ই বলতেন,“আমরা হাসি; অথচ জানি না, হয়তো আল্লাহ আমাদের কোনো আমলের ওপর দৃষ্টি দিয়ে বলে দিয়েছেন, ‘আমি তোমাদের কোনো আমলই কবুল করব না।”

৩. হায় আদম সন্তান, আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার মতো শক্তি কি তোমার আছে?

৪. আমি এমন মহৎ লোকদের (সাহাবিদের) দেখেছি, যাঁদের কাছে এই দুনিয়া পায়ের নিচের মাটির চেয়েও তুচ্ছ ছিল। আবার এমন লোকও দেখেছি, যাদের কাছে রাতের খাবারের জন্য সামান্য খাদ্য ছাড়া আর কিছুই থাকত না; তবুও তারা বলত— ‘আমি সবটুকু পেটে পুরব না।’ এরপর ক্ষুধার্ত থাকা সত্ত্বেও তার একাংশ সদকা করে দিত, যদিও গ্রহীতার চেয়ে দাতার ক্ষুধা হয়তো বেশি ছিল।

৫. সালিহ আল-মুররি হাসান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন,“হে আদম সন্তান, তুমি তো কেবল কয়েকটি দিনের সমষ্টি; একটি দিন চলে গেলে তোমার অস্তিত্বের একাংশও বিলীন হয়ে যায়।”

৬. মুবারক ইবন ফাদালাহ বলেন, আমি হাসানকে বলতে শুনেছি,“মৃত্যু দুনিয়ার আসল রূপ উন্মোচিত করে একে লাঞ্ছিত করেছে; কোনো বুদ্ধিমান মানুষের জন্য দুনিয়াতে আনন্দিত হওয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট রাখেনি।”

৭. সাবিত তাঁর থেকে বর্ণনা করেন, হাসান (রহ.) বলতেন,“মুমিনের অট্টহাসি তার অন্তরের গাফলতির পরিচয়।”৩০

৮. আবু উবাইদা আন-নাজি থেকে বর্ণিত, তিনি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছেন,“হে আদম সন্তান, তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত ঈমানের স্বাদ পাবে না, যতক্ষণ না মানুষের সেই দোষ ধরা ছেড়ে দেবে, যে দোষ তোমার মধ্যেও আছে। প্রকৃত ঈমান হলো আগে নিজের দোষ সংশোধন করা। তুমি যখনই নিজের একটি দোষ সংশোধন করবে, তখনই নিজের ভেতরে আরেকটি দোষ পাবে, যা সংশোধন করা বাকি। এভাবে তুমি নিজের ভুল সংশোধনেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আর আল্লাহর কাছে সেই বান্দাই সবচেয়ে প্রিয়, যে নিজের সংশোধনে মগ্ন থাকে।”৩১

৯. ইমরান বিন খালিদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি (রহ.) বলেন,“একজন মুমিন সকালেও দুঃখিত অবস্থায় থাকে এবং সন্ধ্যাতেও দুঃখিত থাকে। এর বাইরে তার উপায় নেই। কারণ, সে সর্বদা দুটি ভয়ের মধ্যে থাকে। ক. অতীত গুনাহের ভয়। আল্লাহ সে বিষয়ে কী ফয়সালা করবেন, সে জানে না। খ. অবশিষ্ট সময়ের ভয়। এই সময়ের মধ্যে সে কী ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িয়ে পড়বে, সে জানে না।”

১০. হে আদম সন্তান, তুমি তো কিছু দিনের সমষ্টি; একটি দিন চলে গেলে তোমার অস্তিত্বের একাংশও বিলীন হয়ে যায়।

১১. সবচেয়ে পাপিষ্ঠ সে ব্যক্তি, যে কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়, দম্ভভরে কাপড় টেনে চলে এবং বলে ‘আমার কোনো সমস্যা নেই।’ অচিরেই সে জানবে— আল্লাহ কখনও দুনিয়াতেই দ্রুত শাস্তি দেন, আবার কখনও তা বিচারের দিনের জন্য জমা রাখেন।

১২. হিশাম থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন,“আল্লাহ তার ওপর রহম করুন, যে জীর্ণ পোশাক পরে, রুটির শুকনো টুকরো খায়, মাটির সাথে মিশে থাকে (অত্যন্ত বিনয়ী হয়), গুনাহের জন্য কাঁদে এবং ইবাদতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে।”

১৩. হাওশাব ইবনে মুসলিম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি,“আল্লাহর কসম, তাদের (পাপিষ্ঠদের) পায়ের নিচে যদি দামি ঘোড়া শব্দ করে চলে এবং মানুষ সম্মান করে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে; তবুও পাপের গ্লানি ও লাঞ্ছনা তাদের অন্তরে লেগেই থাকে। আল্লাহ তায়ালা স্থির করে দিয়েছেন। বান্দা যখন তাঁর অবাধ্য হয়, আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করবেনই।”

১৪. মুবারক বিন ফাদালাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি,“মৃত্যু দুনিয়ার সমস্ত সম্মান ও চাকচিক্যকে কলঙ্কিত করে দিয়েছে; ফলে বুদ্ধিমানের জন্য আনন্দিত হওয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট নেই।”

১৫. হাসান বসরি (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন,“হে আদম সন্তান, তোমার অবস্থা সেই ভেড়ার মতো, যে ভেড়াকে জবেহ করার জন্য ছুরি ধার দেওয়া হচ্ছে, রান্নার জন্য চুলা জ্বালানো হচ্ছে; অথচ ভেড়া জাবর কাটছে!”(অর্থাৎ মৃত্যু নিকটে, অথচ মানুষ গাফেল।)

১৬. হে আদম সন্তান, তুমি তো দুটি সওয়ারি। রাত ও দিনের ওপর সওয়ার। তারা তোমাকে নিয়ে থামে না; অবশেষে তারা তোমাকে আখিরাতে পৌঁছে দেবে। এরপর হয় জান্নাত, নয় জাহান্নাম। তোমার চেয়ে বড়ো ঝুঁকিতে আর কে আছে?”

১৭. আবু মুসা বর্ণনা করেন, আমি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি,“জানো, ইসলাম কী? ইসলাম হলো তোমার গোপন ও প্রকাশ্য অবস্থা এক হবে, তোমার অন্তর আল্লাহর কাছে সমর্পিত হবে, আর তোমার হাত ও জবান থেকে প্রতিটি মুসলিম ও চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নিরাপদ থাকবে।”

১৮. আল্লাহর কসম, যে বান্দার রিজিক প্রতিদিন (তাকদির অনুযায়ী) বণ্টন করে দেওয়া হয়, অথচ সে যদি না ভাবে— এটাই তার জন্য সর্বোত্তম ছিল (অর্থাৎ সে অসন্তুষ্ট থাকে), তবে সে হয় অক্ষম, নয়তো চরম নির্বোধ।”৩২

মৃত্যুশয্যায় শেষ তিনটি উপদেশ:

ইমাম হাসান বসরি (রহ.)-এঁর যখন মৃত্যু ঘনিয়ে এলো, তখন তাঁর কয়েকজন সঙ্গী তাঁর কাছে প্রবেশ করে বললেন,“হে আবু সাঈদ, আমাদের জন্য কিছু পাথেয় (উপদেশ) দিন, যা দিয়ে আমরা উপকৃত হতে পারি।” তিনি বললেন,“আমি তোমাদের তিনটি কথা বলছি। এরপর তোমরা আমার কাছ থেকে উঠে যাবে এবং আমাকে আমার গন্তব্যের (আখেরাতের) জন্য একা ছেড়ে দেবে।

১. তোমরা মানুষকে যে মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করো, নিজেরা তা বর্জন করার ক্ষেত্রে সবার অগ্রগামী হও।

২. তোমরা মানুষকে যে ভালো কাজের আদেশ দাও, নিজেরা তা পালনে সবার চেয়ে বেশি আমলকারী হও।

৩. জেনে রেখো, তোমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ দুই অবস্থা থেকে মুক্ত না। হয় তা তোমাদের পক্ষে (সওয়াব) যাবে, না হয় তোমাদের বিপক্ষে (গুনাহ) যাবে। সুতরাং লক্ষ্য করো, সকালে কোথায় যাচ্ছ এবং সন্ধ্যায় কোথায় ফিরে আসছ; অর্থাৎ সারা দিনের প্রতিটি কাজ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকো।”৩৩

 

ওফাত:

খালিদ ইবনে খিদাশ বর্ণনা করেন; সালিহ আল-মুররি ইউনুস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, হাসান আল-বসরির মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে তিনি বারবার “ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” পাঠ করতে থাকেন। তখন তাঁর ছেলে কাছে দাঁড়িয়ে বলল,“হে বাবা, আপনি তো আমাদের চিন্তায় ফেলে দিলেন। আপনি কি বিশেষ কিছু দেখছেন?”

তিনি উত্তর দিলেন,“এটি আমার প্রাণ; যা বের হয়ে যাচ্ছে। এর আগে এমন বিপদে আমি কখনো পড়িনি।”

তিনি পহেলা রজবে ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানাজায় মানুষের বিশাল সমাগম হয়েছিল। বসরার জামে মসজিদে জুমার নামাজের পরপরই তাঁর জানাজা সম্পন্ন হয়। মানুষের উপচে পড়া ভিড় এবং জানাজায় শরিক হওয়ার তীব্র আকুলতার কারণে সেদিন বসরার ওই প্রধান মসজিদে আসরের জামাতও কায়েম করা সম্ভব হয়নি; সবাই জানাজার জন্য ময়দানে চলে গিয়েছিল।

হিশাম ইবনে হাসান বলেন, আমরা বৃহস্পতিবার বিকেলে মুহাম্মদ (ইবনু সিরীন)-এর কাছে ছিলাম। আসরের পর এক ব্যক্তি এসে সংবাদ দিল— “হাসান ইন্তেকাল করেছেন।”

মুহাম্মদ (ইবনু সিরীন) তাঁর জন্য রহমতের দোয়া করলেন। শোকের তীব্রতায় তাঁর গায়ের রং পরিবর্তিত হয়ে গেল এবং তিনি কথা বলা বন্ধ করে দিলেন। সূর্যাস্ত পর্যন্ত তিনি আর একটি কথাও বলেননি। তাঁর এই গভীর শোক দেখে মজলিসে উপস্থিত অন্যরাও কথা বলতে সংকোচ বোধ করল।

ইবনে উলাইয়্যাহ বলেন, হাসান বসরি (রহ.) ১১০ হিজরি সালের রজব মাসে ইন্তেকাল করেন। আবদুল্লাহ ইবনে হাসান বলেন, তাঁর পিতা (হাসান আল-বসরি) প্রায় ৮৮ বছর বয়স পেয়েছিলেন।৩৪