<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>তাবেয়ি Archives - Sufigraphy</title>
	<atom:link href="https://sufigraphy.com/darbar/%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%BF/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://sufigraphy.com/darbar/তাবেয়ি/</link>
	<description></description>
	<lastBuildDate>Sat, 10 Jan 2026 12:52:27 +0000</lastBuildDate>
	<language>en-US</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=6.9.4</generator>

<image>
	<url>https://sufigraphy.com/wp-content/uploads/2026/01/Sufigraphy-logo-150x150.png</url>
	<title>তাবেয়ি Archives - Sufigraphy</title>
	<link>https://sufigraphy.com/darbar/তাবেয়ি/</link>
	<width>32</width>
	<height>32</height>
</image> 
	<item>
		<title>হজরত হাসান বসরি (রহ.)</title>
		<link>https://sufigraphy.com/bio/hasan-al-basri/</link>
		
		<dc:creator><![CDATA[Sufieditor]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 10 Jan 2026 12:52:27 +0000</pubDate>
				<guid isPermaLink="false">https://sufigraphy.com/?post_type=bio&#038;p=1868</guid>

					<description><![CDATA[<p>হজরত হাসান বসরি (রহ.) ছিলেন একজন মহান তাবেয়ি। তিনি ১৩০ জন সাহাবির সান্নিধ্যে ইলম অর্জন করেন। তাফসির, হাদিস ও তাসাউফে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। গভীর আল্লাহভীতি, দুনিয়াবিমুখতা ও আত্মশুদ্ধি ছিল তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য। শাসকদের সামনেও তিনি সত্য বলতে দ্বিধা করতেন না। তিনি মানুষকে আখিরাতমুখী হওয়ার ও নিজের হিসাব নিজে নেওয়ার শিক্ষা দিতেন। ১১০ হিজরিতে তাঁর ইন্তেকাল হয়। </p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/bio/hasan-al-basri/">হজরত হাসান বসরি (রহ.)</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div id="model-response-message-contentr_96c1a8a76e486347" class="markdown markdown-main-panel enable-updated-hr-color" dir="ltr" aria-live="off" aria-busy="false">
<p>ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মহান ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের জীবন, জ্ঞান ও চরিত্রের দীপ্তি কালের প্রবাহে কখনো ম্লান হয় না। তাফসির, হাদিস, জুহদ ও তাকওয়ার জগতে যাঁরা উজ্জ্বল নক্ষত্র, তাঁদের মধ্যে হজরত হাসান বসরি (রহ.) এক অনন্য নাম। তিনি তাবেয়িদের মধ্যেও শ্রেষ্ঠদের একজন ছিলেন। জ্ঞান, অন্তর্দৃষ্টি ও আখলাকের এমন অপূর্ব সমন্বয় তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল, যা তাঁকে যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে অমর করে রেখেছে।</p>
<h2 data-path-to-node="4">প্রাথমিক পরিচিতি:</h2>
<p data-path-to-node="4">তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ছিল ইসলামের স্বর্ণযুগের কেন্দ্রবিন্দুতে। হজরত হাসান বসরি (রহ.)-এর পূর্ণ নাম হাসান ইবনু আবুল হাসান ইয়াসার; কুনিয়াত আবু সাঈদ। তিনি আনসারি সাহাবি হজরত জায়েদ ইবনু সাবিত (রা.)-এর মুক্তদাস (মাওলা) ছিলেন—এ মতও পাওয়া যায়। আবার বলা হয়, তিনি আবুল ইয়াসার কা‘ব ইবনু আমর আস-সুলামী (রা.)-এর মাওলা ছিলেন। এই মতটি আবদুস সালাম আবু মুতাহহার, গাদিরাহ ইবনু কুরহাদ আল-আউফি-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।</p>
<p data-path-to-node="5">হাসান বসরি (রহ.)-এর মা ছিলেন উম্মুল মু’মিনীন হজরত উম্মে সালামা আল-মাখযূমিয়্যা (রা.)-এর দাসী। আবার এটাও বলা হয়, তিনি জামিল ইবনু কুতবা-এর মাওলা ছিলেন। তাঁর পিতা ইয়াসার ছিলেন মায়সান এলাকার যুদ্ধবন্দিদের অন্তর্ভুক্ত। পরে তিনি মদিনায় বসবাস করেন এবং মুক্তি লাভ করেন। এরপর তিনি হজরত উমর (রা.)-এর খিলাফতকালে মদিনাতেই বিবাহ করেন। সেই বিবাহ থেকে হাসান (রহ.)-এর জন্ম হয় উমর (রা.)-এর খিলাফতের শেষ দুই বছরের কোনো এক সময়। তাঁর মায়ের নাম ছিল খায়রাহ। পরবর্তীতে হাসান বসরি (রহ.) ওয়াদিল কুরা এলাকায় লালিত-পালিত হন। তিনি হজরত উসমান (রা.)-এর সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করেছেন এবং তাঁর খুতবা শুনেছেন। তিনি ‘ইয়াওমুদ-দার’ (উসমান রা.-এর অবরোধ ও শাহাদাতের দিন)-এও উপস্থিত ছিলেন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল চৌদ্দ বছর। <a href="/#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a></p>
<h2 data-path-to-node="6">শৈশব:</h2>
<p data-path-to-node="6">শৈশবেই তিনি জ্ঞান ও তাকওয়ার গর্ভভূমি মদিনায় বেড়ে ওঠেন। আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে উম্মে সালামা (রা.) হয়ে ওঠেন তাঁর অভিভাবিকা; তাঁর ছায়ায় এবং সাহাবায়ে কিরামের সান্নিধ্যে তিনি ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকেন। এ সুবর্ণ সুযোগে তিনি প্রায় ১৩০ জন সাহাবির সাহচর্য লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে হজরত আলী (রা.), হজরত উসমান (রা.), হজরত আবু হুরায়রা (রা.) এবং হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতো বরেণ্য সাহাবিগণও ছিলেন।</p>
<p data-path-to-node="7">মুহাম্মদ ইবনু সাল্লাম বলেন, আমাদের কাছে আবু আমর আশ-শা‘আবী তাঁর সনদসহ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, উম্মে সালামা (রা.) হাসানের মাকে যখন কোনো কাজে পাঠাতেন, তখন শিশু হাসান কাঁদত। উম্মে সালামা তাঁকে দুধ দিয়ে শান্ত করতেন। এরপর ছোটো অবস্থাতেই তাঁকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবিদের কাছে নিয়ে যেতেন। তাঁর মা উম্মে সালামার কাছেই বেশিরভাগ সময় কাটাতেন; ফলে সাহাবিগণ হাসানের জন্য দোয়া করতেন। একবার তাঁকে হজরত উমর (রা.)-এর কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি তাঁর জন্য দোয়া করেন এবং বলেন, “হে আল্লাহ, আপনি তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং তাকে মানুষের কাছে প্রিয় করে দিন।” <a href="/#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a></p>
<h2 data-path-to-node="8">ইলম অর্জন:</h2>
<p data-path-to-node="8">জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাতে তিনি সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ উৎসগুলোর দ্বারস্থ হয়েছিলেন। হজরত হাসান বসরি (রহ.) বহু সাহাবি ও তাবেয়িদের সোহবতে ইলম অর্জন করেছেন। তিনি ইমরান ইবনু হুসাইন, মুগীরা ইবনু শু‘বা, আবদুর রহমান ইবনু সামুরা, সামুরা ইবনু জুনদুব, আবু বকরাহ আস-সাকাফী, নু‘মান ইবনু বশীর, জাবির, জুনদুব আল-বাজালী, ইবনু আব্বাস, আমরু ইবনু তাগলিব, মা‘কিল ইবনু ইয়াসার, আসওয়াদ ইবনু সারী, আনাস (রাদিআল্লাহু আনহুম)—সহ আরও বহু সাহাবির নিকট থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি হিত্তান ইবনু আবদুল্লাহ আর-রাকাশী (রহ.)-এর কাছে কুরআন পাঠ শিখেছেন এবং বহু তাবেয়ির কাছ থেকেও বর্ণনা গ্রহণ করেছেন। <a href="/#_ftn3" name="_ftnref3">[3]</a></p>
<h2 data-path-to-node="9">শাগরিদ (ছাত্রবৃন্দ):</h2>
<p data-path-to-node="9">তাঁর জ্ঞানের আলোকবর্তিকা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল এক বিশাল ছাত্রসমাজ। হজরত হাসান বসরি (রহ.) থেকে যাঁরা ইলম অর্জন ও হাদিস বর্ণনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন— আইয়ুব, শাইবান আন-নাহবী, ইউনুস ইবনু উবাইদ, ইবনু আউন, হুমাইদ আত-তাওয়ীল, সাবিত আল-বুনানী, মালিক ইবনু দিনার, হিশাম ইবনু হাসসান, জারীর ইবনু হাজিম, রাবী‘ ইবনু সুবাইহ, ইয়াজীদ ইবনু ইবরাহীম আত-তুস্তারী, মুবারক ইবনু ফাদালা, আবান ইবনু ইয়াজীদ আল-আত্তার, কুররাহ ইবনু খালিদ, হাজম আল-কুতাঈ, সালাম ইবনু মিসকীন, শুমাইত ইবনু আজলান, সালিহ আবু ‘আমির আল-খাজ্জাজ, আব্বাদ ইবনু রাশিদ, আবু হারীজ আবদুল্লাহ ইবনু হুসাইন (সিজিস্তানের কাজি), মু‘আভিয়া ইবনু আবদুল করিম আদ-দাল্ল, ওয়াসিল আবু হুররা আর-রাকাশী, হিশাম ইবনু জিয়াদ, শুবাইব ইবনু শাইবা, আশ‘আস ইবনু বারাজ, আশ‘আস ইবনু জাবির আল-হুদ্দানী, আশ‘আস ইবনু আবদুল মালিক আল-হুমরানী, আশ‘আস ইবনু সাওয়ার, আবু আল-আশহাব। এছাড়াও আরও অনেকে। <a href="/#_ftn4" name="_ftnref4">[4]</a></p>
<h2 data-path-to-node="10">তাঁর শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি:</h2>
<p data-path-to-node="10">তিনি কেবল আত্মিক নয়, শারীরিক সৌন্দর্যেও ছিলেন অনন্য। তিনি ছিলেন সুঠামদেহী, সুন্দর অবয়ব ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। একই সঙ্গে তিনি প্রখ্যাত বীরদের মধ্যেও অন্যতম। মুহাম্মদ ইবনু সাদ বলেন, হাসান (রহ.) ছিলেন সর্বগুণে গুণান্বিত, বিজ্ঞ আলেম, সুউচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, ফকিহ, নির্ভরযোগ্য (সিকাহ), অকাট্য দলিল (হুজ্জাত), বিশ্বস্ত, ইবাদতগুজার, নিবেদিতপ্রাণ সাধক, অগাধ ইলমের অধিকারী, সুবক্তা ও অত্যন্ত সুদর্শন পুরুষ।</p>
<p data-path-to-node="11">আল-আসমাঈ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “আমি হাসান আল-বসরির হাতের কবজির চেয়ে প্রশস্ত কবজি আর কারও দেখিনি; তাঁর কবজি এক বিঘত প্রশস্ত ছিল।” আবু বুরদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান আল-বসরির চেয়ে অন্য কাউকে মুহাম্মদ ﷺ-এর সাহাবিদের সাথে এতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ (চালচলন ও স্বভাবে) দেখিনি।” মুজালিদ আশ-শা’বী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “হাসানের চেয়ে প্রভাবশালী বা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আর কাউকে আমি দেখিনি।” আমাতুল হাকাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হাসান যখন হাত্তান আর-রাকাশীর কাছে আসতেন, তখন আমি তাঁর চেয়ে সুন্দর চেহারার কোনো যুবক দেখিনি।” <a href="/#_ftn5" name="_ftnref5">[5]</a></p>
<h2 data-path-to-node="12">তাঁর স্বভাব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য:</h2>
<p data-path-to-node="12">তাঁর জীবন ছিল কথা ও কাজের এক নিখুঁত সংমিশ্রণ। খালিদ বিন সাফওয়ান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হীরা (ইরাকের একটি প্রাচীন শহর) নামক স্থানে আমার সাথে মাসলামা বিন আব্দুল মালিক-এর সাক্ষাৎ হলে তিনি আমাকে বললেন, “হে খালিদ, আমাকে বসরার অধিবাসী হাসান সম্পর্কে কিছু বলো।”</p>
<p data-path-to-node="13">আমি বললাম, “আল্লাহ আমিরের কল্যাণ করুন। আমি পূর্ণ জ্ঞান ও নিশ্চিত তথ্যের ভিত্তিতেই তাঁর সম্পর্কে বলছি। কারণ আমি তাঁর প্রতিবেশী এবং তাঁর মজলিসে তাঁর পাশেই বসি। তাঁর সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি কেউ জানে না। তিনি এমন ব্যক্তি, যার গোপন জীবন ও প্রকাশ্য জীবন অভিন্ন; কথা ও কাজে কোনো অমিল নেই। তিনি কোনো কাজের সিদ্ধান্ত নিলে তা সম্পন্ন করেই ওঠেন; আর কোনো কিছুর ওপর দাঁড়ালে তা পালন করেই বসেন। তিনি যখন কোনো কাজের আদেশ দেন, তখন নিজেই হন সেই কাজের সবচেয়ে বড় আমলকারী; আর যখন কোনো কাজ থেকে নিষেধ করেন, তখন নিজেই হন বর্জনকারীদের মধ্যে সবার প্রথম। আমি তাঁকে মানুষের থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী (নির্লোভ) দেখেছি; অথচ দেখেছি—মানুষ সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী (জ্ঞানের প্রয়োজনে)।” তখন মাসলামা (রহ.) বললেন, “যথেষ্ট হয়েছে, হে খালিদ। এমন একজন মানুষ যে জাতির মধ্যে বিদ্যমান থাকে, সে জাতি কীভাবে পথভ্রষ্ট হতে পারে?” <a href="/#_ftn6" name="_ftnref6">[6]</a></p>
<h2 data-path-to-node="14">পোশাক-পরিচ্ছদ:</h2>
<p data-path-to-node="14">পরিচ্ছন্নতা ও গাম্ভীর্য ছিল তাঁর পোশাকের ভূষণ। মুসলিম ইবনু ইব্রাহিম বর্ণনা করেন, সাল্লাম ইবনু মিসকীন বলেছেন, “আমি হাসানকে স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল রঙের একটি ক্বাবা (এক ধরনের দীর্ঘ বহিঃপোশাক) পরিহিত অবস্থায় দেখেছি।” ইবনু উলাইয়্যাহ ইউনুস থেকে বর্ণনা করেন, “হাসান শীতকালে ‘হিবারাহ’ (কারুকার্যখচিত ইয়ামেনি চাদর) ক্বাবা, কুর্দিশ তৈলাসান (মাথার চাদর) এবং কালো পাগড়ি পরতেন। আর গ্রীষ্মকালে পরতেন শণ বা লিনেন কাপড়ের লুঙ্গি, কামিজ এবং হিবারাহ চাদর।” হাওশাব হাসান (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “মুমিন ব্যক্তি উত্তম পোশাকের মাধ্যমে নিজের দ্বীনকে রক্ষা করে (অথবা মর্যাদা রক্ষা করে)।” <a href="/#_ftn7" name="_ftnref7">[7]</a></p>
<h2 data-path-to-node="15">মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব:</h2>
<p data-path-to-node="15">তৎকালীন শ্রেষ্ঠ মনীষীদের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন এক পরম সম্পদ। আবু হিলাল বলেন, আমি কাতাদার কাছে ছিলাম; এমন সময় হাসান আল-বসরির মৃত্যুসংবাদ এলো। আমি বললাম, “তিনি তো ইলমের সাগরে নিমজ্জিত ছিলেন।” কাতাদা বললেন, “বরং তিনি ইলমের ভেতরেই বেড়ে উঠেছেন, একে ধারণ করেছেন এবং নিজের সত্তায় মিশিয়ে নিয়েছেন। আল্লাহর কসম, কেবল ‘হারুরি’ (খারেজি) ছাড়া অন্য কেউ তাঁকে ঘৃণা করে না।” মুহাম্মদ ইবনু সাল্লাম আল-জুমাহি হাম্মাম থেকে এবং তিনি কাতাদা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “বলা হয়ে থাকে পৃথিবী কখনোই সাতজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির দল থেকে শূন্য থাকে না; যাদের ওসিলায় মানুষ বৃষ্টি পায় এবং যাদের ওসিলায় বিপদ-আপদ দূর করা হয়। আমি আশা করি, হাসান সেই সাতজনের একজন ছিলেন।”</p>
<p data-path-to-node="16">কাতাদা আরও বলেন, “পৌরুষ ও শিষ্টাচারের দিক থেকে হাসানের চেয়ে পরিপূর্ণ আর কেউ ছিল না।” হুমাইদ ও ইউনুস বলেন, “আমরা হাসানের চেয়ে অধিকতর পূর্ণাঙ্গ পৌরুষ ও চরিত্রের অধিকারী আর কাউকে দেখিনি।” আলী ইবন জায়েদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি ইবনুল মুসাইয়িব, উরওয়াহ, কাসিমসহ আরও অনেক বড় তাবেয়ির কথা শুনেছি; কিন্তু হাসানের মতো আর কাউকে দেখিনি। তিনি যদি সাহাবিদের সমসাময়িক হতেন এবং তাঁদের সমান বয়সের হতেন, তবে তাঁরা (জ্ঞানের দৌড়ে) তাঁকে ছাড়িয়ে যেতে পারতেন না।” <a href="/#_ftn8" name="_ftnref8">[8]</a></p>
<h2 data-path-to-node="17">ইবাদত-রিয়াজত:</h2>
<p data-path-to-node="17">ইবাদতের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ পথিক। সারিয়্যাহ ইবন ইয়াহইয়া বলেন, হাসান (রহ.) আইয়ামে বিয (প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ), আশহুরে হুরুম (চারটি পবিত্র মাস), এবং প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখতেন। <a href="/#_ftn9" name="_ftnref9">[9]</a></p>
<p data-path-to-node="20">তাঁর নিরবচ্ছিন্ন সাধনা তাঁকে এক ভিন্ন স্তরে নিয়ে গিয়েছিল। ইব্রাহিম ইবনু ঈসা আল-ইয়াশকুরী বলেন, “আমি হাসানের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী দুঃখবোধসম্পন্ন আর কাউকে দেখিনি। আমি যখনই তাঁকে দেখতাম, মনে হতো তিনি এইমাত্র কোনো বড়ো বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন।” <a href="/#_ftn10" name="_ftnref10">[10]</a></p>
<h2 data-path-to-node="18">তাকওয়া:</h2>
<p data-path-to-node="18">আল্লাহভীতি তাঁর হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে ছিল যে, তা তাঁর চোখে অশ্রু হয়ে ঝরত। হজরত ইউনূস (রহ.) থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি (রহ.) বলতেন, “আমরা হাসাহাসি করি; অথচ হতে পারে আল্লাহ আমাদের কোনো আমলের ওপর দৃষ্টিপাত করে বলেছেন— আমি তোমাদের থেকে কিছুই কবুল করব না।” হাকিম বিন জাফর (রহ.) বলেন, মাসমা আমাকে বলেছেন, “তুমি যদি হাসানকে দেখতে, তবে মনে করতে দুনিয়ার সব সৃষ্টিজীবের দুঃখ-বেদনা যেন তাঁর ওপর ঢেলে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দীর্ঘ অশ্রুপাত এবং কান্নার শব্দের আধিক্য দেখে এমনটাই মনে হতো।” মুহাম্মদ বিন সাদ (রহ.) বলেন, ইয়াজিদ বিন হাওশাব বলেছেন, “আমি হাসান বসরি এবং ওমর বিন আব্দুল আজিজের চেয়ে বেশি ভীতসন্ত্রস্ত আর কাউকে দেখিনি। তাঁদের অবস্থা দেখে মনে হতো— জাহান্নাম যেন কেবল তাঁদের দুজনের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে।”</p>
<p data-path-to-node="19">হাফস বিন ওমর (রহ.) থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি একবার কাঁদলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, “আপনি কেন কাঁদছেন?” তিনি বললেন, “আমি ভয় করি, কাল (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ আমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন; এবং তিনি এর কোনো পরোয়া করবেন না।” হুমাইদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি একবার মসজিদে থাকা অবস্থায় দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন এবং এমনভাবে কাঁদলেন যে, তাঁর দুই কাঁধ কাঁপতে লাগল। এরপর তিনি বললেন, “যদি অন্তরে প্রাণ থাকত, যদি অন্তরে সততা থাকত, তবে সেই রাতটির কথা ভেবে তোমরা কান্নায় ভেঙে পড়তে—যার ভোর হবে কিয়ামত দিয়ে। নিশ্চয়ই কিয়ামতের সকালের সেই রাতে মানুষ এমন কিছু শুনবে, যা আগে কখনো শুনেনি; সেদিন মানুষের গোপন লজ্জাসমূহ প্রকাশ হয়ে পড়বে এবং চোখের পানি ঝরবে।” <a href="/#_ftn11" name="_ftnref11">[11]</a></p>
<h2 data-path-to-node="21">জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:</h2>
<p data-path-to-node="21">দুনিয়ার মোহ তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। হিশাম ইবনু হাসান বলেন, আমি হাসানকে আল্লাহর কসম খেয়ে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি দিরহামকে (টাকা-পয়সাকে) সম্মান করবে (অতিরিক্ত মর্যাদা দেবে), আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করবেন।” হাযম ইবনু আবি হাযম বলেন, আমি হাসানকে বলতে শুনেছি, “দিনার ও দিরহাম কতই না নিকৃষ্ট সঙ্গী! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার উপকারে আসে না, যতক্ষণ না তারা তোমাকে ছেড়ে চলে যায় (অর্থাৎ খরচ করা না পর্যন্ত কাজে আসে না)।” সাল্লাম ইবনু মিসকিন হাসান (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “দুনিয়াকে তুচ্ছ জ্ঞান করো (এর মোহ ত্যাগ করো)। আল্লাহর কসম, তুমি একে যতটা তুচ্ছ মনে করবে, এটি তোমার কাছে ততটাই সুখকর ও তৃপ্তিদায়ক হবে।”</p>
<p data-path-to-node="22">ইবন শাওজাব মাতার থেকে বর্ণনা করেন, “আমরা হাসানকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে তাঁর ঘরে প্রবেশ করলাম। দেখলাম, তাঁর ঘরে (আসবাবপত্র বলতে) কিছুই নেই, কোনো বিছানা নেই, গালিচা নেই, বালিশ নেই; এমনকি কোনো চাটাইও নেই। শুধু দড়ি দিয়ে বোনা একটি সাধারণ খাট ছিল, যার ওপর তিনি শুয়ে ছিলেন।” <a href="/#_ftn12" name="_ftnref12">[12]</a> ইব্রাহিম ইবনু ঈসা আল-ইয়াশকুরী (রহ.) বলেন, আমি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি যখন দুনিয়ার অনুসারীদের কথা উল্লেখ করতেন, তখন বলতেন, “আল্লাহর কসম, না দুনিয়া তার জন্য অবশিষ্ট থাকে, না সে নিজে দুনিয়ার জন্য অবশিষ্ট থাকে। সে দুনিয়ার দায়, অকল্যাণ ও হিসাব থেকে নিরাপদ থাকতে পারে না। অবশেষে তাকে দুনিয়া থেকে বের করে দেওয়া হয়। কেবল কয়েক টুকরো কাফনের কাপড়ে জড়ানো অবস্থায়।” <a href="/#_ftn13" name="_ftnref13">[13]</a></p>
<h2 data-path-to-node="23">আখেরাত ভাবনা:</h2>
<p data-path-to-node="23">আখেরাতের চিন্তা ছিল তাঁর জীবনের মূল চালিকাশক্তি। আহমদ বিন জাফর বিন হামদান (রহ.) ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, হুমাইদ (রহ.) বলেছেন, “রজব মাসের একদিন হাসান বসরি (রহ.) মসজিদে ছিলেন। তিনি পানি দিয়ে কুলি করছিলেন; এমন সময় তিনি এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অতঃপর তিনি এতটাই কাঁদলেন যে, তাঁর দুই কাঁধ থরথর করে কাঁপতে লাগল। এরপর তিনি বললেন, ‘যদি অন্তরগুলোতে প্রাণ থাকত, যদি অন্তরগুলোতে সততা ও শুভবুদ্ধি থাকত, তবে আমি সেই রাতটির কথা বলে তোমাদের কাঁদিয়ে দিতাম, যার ভোর হবে কিয়ামতের দিন দিয়ে।” তিনি আরও বলেন, “আগামীকাল কেবল সেই বিষয়েই প্রত্যেক মানুষ ব্যস্ত থাকবে, যা তাকে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত করেছিল। মানুষ যে বিষয়ে বেশি চিন্তা করে, সেটাই তার আলোচনার কেন্দ্র হয়ে যায়। যার কোনো আখিরাত নেই, তার কোনো দুনিয়াও নেই। আর যে ব্যক্তি তার আখিরাতের ওপর দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়, তার না দুনিয়া থাকে, না আখিরাত।” <a href="/#_ftn14" name="_ftnref14">[14]</a></p>
<h2 data-path-to-node="24">বিনয় ও গাম্ভীর্য:</h2>
<p data-path-to-node="24">বিনয় ছিল তাঁর চরিত্রের ভূষণ। ইউসুফ বিন আসবাত (রহ.) বলেন, “হাসান বসরি টানা ত্রিশ বছর হাসেননি এবং চল্লিশ বছর কোনো কৌতুক করেননি।” তিনি আরও বলেন, হাসান বসরি বলতেন, “আমি এমন এক প্রজন্মের (সাহাবায়ে কেরাম) দেখা পেয়েছি, যাঁদের তুলনায় আমি নিজেকে একজন চোর ছাড়া আর কিছুই মনে করি না।” <a href="/#_ftn15" name="_ftnref15">[15]</a></p>
<h2 data-path-to-node="25">তাসাউফ চর্চার মজলিস:</h2>
<p data-path-to-node="25">আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য তিনি বিশেষ মজলিসের আয়োজন করতেন। আবু সাঈদ ইবনুল আরাবি তাঁর &#8216;তাবাকাতুন নুসসাক&#8217; গ্রন্থে বলেন, আমরা যে সমস্ত ইবাদতগুজার ও সাধক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছি, তাঁদের অধিকাংশই হাসান আল-বসরির কাছে যেতেন, তাঁর কথা শুনতেন এবং বিশেষ করে আধ্যাত্মিক ও চারিত্রিক পরিশুদ্ধির ক্ষেত্রে তাঁর প্রজ্ঞা ও ফিকহকে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করতেন। আমর ইবনে উবাইদ এবং আব্দুল ওয়াহিদ ইবন জায়েদ তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন।</p>
<p data-path-to-node="26">হজরত হাসানের নিজ ঘরে একটি বিশেষ মজলিস ছিল, যেখানে তিনি জুহদ (দুনিয়াবিমুখতা), ইবাদত (নুসুক) এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞান (উলুমে বাতিন) ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কথা বলতেন না। সেখানে কেউ অন্য কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বিরক্ত হতেন এবং বলতেন, “আমরা এখানে আমাদের ভাইদের সাথে নিভৃতে আল্লাহর স্মরণে ও জ্ঞানচর্চায় বসেছি; এটি অন্য প্রসঙ্গের স্থান নয়।” অন্যদিকে, মসজিদে তাঁর যে সাধারণ মজলিস বা হালাকা বসতো, সেখানে হাদিস, ফিকহ, কুরআন-সংক্রান্ত জ্ঞান, ভাষা ও ব্যাকরণসহ নানান বিষয়ের আলোচনা হতো। কখনো কখনো তাসাউফ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি তার উত্তর দিতেন। তাঁর ছাত্রদের কেউ কেবল হাদিস শোনার জন্য, কেউ কুরআন ও ব্যাখ্যা শেখার জন্য, কেউ বালাগাত শেখার জন্য, আবার কেউ ইখলাস ও বিশেষ আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য তাঁর সান্নিধ্যে থাকতেন। তাঁদের মধ্যে আমর ইবনে উবাইদ, আবু জাহির, আব্দুল ওয়াহিদ ইবন জায়েদ, সালিহ আল-মুররি, শুমাইত এবং আবু উবাইদাহ আন-নাজি প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের প্রত্যেকেই ইবাদত-বন্দেগির উচ্চ স্তরের জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। <a href="/#_ftn16" name="_ftnref16">[16]</a></p>
<h2 data-path-to-node="27">খলিফা উমর ইবনুল আবদুল আজিজের প্রতি তাঁর চিঠি:</h2>
<p data-path-to-node="27">শাসককেও তিনি পরম মমতায় উপদেশ দিতেন। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, “জেনে রাখুন, চিন্তা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করে এবং তা পালনে উদ্বুদ্ধ করে। আর মন্দ কাজের জন্য অনুশোচনা মানুষকে মন্দ ত্যাগের দিকে টেনে আনে। যা ধ্বংস হয়ে যাবে, তা পরিমাণে যতই বেশি হোক, যা চিরস্থায়ী, তার সমান হতে পারে না; যদিও তা অর্জন করা কঠিন। সাময়িক কষ্ট, যার পরিণতি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, তা সেই সাময়িক আরামের চেয়ে উত্তম, যার পরিণতিতে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি দুর্গতি।</p>
<p data-path-to-node="28">অতএব, এই প্রতারক ও ধূর্ত আবাসস্থল— দুনিয়া থেকে সাবধান থাকুন। সে তার ছলাকলায় নিজেকে সাজিয়ে তোলে, মিথ্যা আশায় বাসিন্দাদের মোহিত করে এবং নিজের মোহ দিয়ে তাদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। সে নিজেকে নববধূর মতো সাজিয়ে উপস্থাপন করে; যার দিকে চোখ অপলক তাকিয়ে থাকে, নফস যার প্রেমে পড়ে যায় এবং হৃদয় পাগলপ্রায় হয়ে ওঠে। অথচ দুনিয়া তার সকল বসবাসকারীর জন্যই খুনি। যারা বেঁচে আছে, তারা পূর্বে গত হওয়া লোকদের থেকে শিক্ষা নেয় না; আর পরের জন আগের জনের পরিণতি দেখে সতর্ক হয় না। কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি অভিজ্ঞতার সুফল গ্রহণ করে না; আর আল্লাহ যখন দুনিয়ার অসারতা সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন, তখনও কোনো আল্লাহভীরু ব্যক্তি তা স্মরণ করে না। এই দুনিয়ার প্রতি হৃদয়ের ভালোবাসা এবং নফসের আসক্তি যেন কাটতেই চায় না।</p>
<p data-path-to-node="29">সুতরাং, দুনিয়া থেকে পুরোপুরি সতর্ক থাকুন। এটি স্পর্শে নরম সাপের মতো, কিন্তু এর বিষ প্রাণঘাতী। এর চাকচিক্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন; কারণ এখান থেকে সামান্যই আপনার সাথে যাবে। এর দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলুন; কারণ আপনি এর বিচ্ছেদ সম্পর্কে নিশ্চিত। দুনিয়াতে যখন আপনি খুব বেশি আনন্দিত থাকেন, তখনই এর থেকে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকুন। কারণ, দুনিয়াদার যখনই এখানে স্বস্তি পায়, দুনিয়া তাকে কোনো অপছন্দনীয় বিষয় দিয়ে আঘাত করে। এর সুখ ধোঁকা; এর উপকার ক্ষতিতে রূপান্তর হয়। এর স্বচ্ছতা আবিলতায় ভরে যায়; আর জীবনের পরিণতি হয় দুর্বলতা ও জীর্ণতা।</p>
<p data-path-to-node="30">অতএব দুনিয়ার দিকে তাকান— একজন বিরাগী ও বিদায়ীর দৃষ্টিতে; প্রেমিকের দৃষ্টিতে নয়। দুনিয়া মূলত তিন দিনের সমষ্টি। গতকাল; যা চলে গেছে। আজ; আপনার বিদায়ী বন্ধু। আগামীকাল; আপনি জানেন না— সেই পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবেন কি না। আপনার আয়ুর যতটুকু অবশিষ্ট আছে, তার কোনো মূল্য নেই। পুরো দুনিয়া জমা করলেও তা জীবনের একটি অবশিষ্ট দিনের সমান হবে না। কবরে শায়িত ব্যক্তি যদি সুযোগ পেত, তবে দুনিয়ার সব রাজত্বের বদলে সে কেবল একটি ‘সুবহানাল্লাহ’ বলার সুযোগ বা একটি নেক আমলের মুহূর্ত বেছে নিত। অতএব, আজই নিজের জন্য প্রস্তুতি নিন। প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্য দিন এবং মৃত্যুযন্ত্রণার সময়কার আফসোস থেকে সতর্ক থাকুন। আল্লাহ আমাদের এই নসিহত দ্বারা উপকৃত হওয়ার তাওফিক দিন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।” <a href="/#_ftn17" name="_ftnref17">[17]</a></p>
<h2 data-path-to-node="31">খলিফার নির্দেশের সামনে তাঁর অটল অবস্থান:</h2>
<p data-path-to-node="31">তিনি রাজভয় তুচ্ছ জ্ঞান করে সত্য উচ্চারণে অটল থাকতেন। আলকামা ইবনে মারছাদ থেকে বর্ণিত, যখন ওমর বিন হুবাইরা ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত হলেন, তখন তিনি ইমাম হাসান বসরি ও ইমাম শা’বী-কে ডেকে পাঠালেন। গভর্নর তাঁদের কাছে তাঁর পরকাল ধ্বংসের আশঙ্কার কথা জানালেন এবং খলিফার অন্যায্য আদেশে তাঁর মুক্তির পথ জানতে চাইলেন। ইমাম শা’বী কিছুটা নমনীয় পথ দেখানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু হাসান বসরি (রহ.) বললেন, “হে ওমর বিন হুবাইরা, খুব শীঘ্রই আল্লাহর পক্ষ থেকে এক কঠোর ও কর্কশ ফেরেশতা (মৃত্যুদূত) তোমার কাছে আসবেন, যিনি আল্লাহর কোনো আদেশ অমান্য করেন না। তিনি তোমাকে তোমার এই প্রশস্ত প্রাসাদ থেকে বের করে কবরের সংকীর্ণতায় নিয়ে যাবেন।</p>
<p data-path-to-node="32">হে ওমর বিন হুবাইরা, তুমি যদি আল্লাহকে ভয় করো, তবে আল্লাহ তোমাকে ইয়াজিদ বিন আব্দুল মালিকের হাত থেকে রক্ষা করবেন। কিন্তু ইয়াজিদ বিন আব্দুল মালিক তোমাকে আল্লাহর হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না। তুমি যদি আল্লাহর আনুগত্যে থাকো, তবে ইয়াজিদের পক্ষ থেকে আসা বিপদ থেকে আল্লাহই তোমার জন্য যথেষ্ট হবেন। আর যদি তুমি ইয়াজিদের সাথে থেকে আল্লাহর অবাধ্যতা করো, তবে আল্লাহ তোমাকে ইয়াজিদের হাতেই সঁপে দেবেন।” এই কথা শুনে ওমর বিন হুবাইরা কেঁদে ফেললেন। পরদিন ইমাম শা’বী মসজিদে গিয়ে মানুষকে লক্ষ্য করে বললেন, “হে লোকসকল, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সৃষ্টির ওপর স্রষ্টাকে (আল্লাহকে) প্রাধান্য দিতে পারে, সে যেন তাই করে। হাসান বসরি যা জানতেন আমিও তা জানতাম; কিন্তু আমি ইবনে হুবাইরার সন্তুষ্টি চেয়েছিলাম, ফলে আল্লাহ আমাকে তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে দিলেন (মর্যাদা কমিয়ে দিলেন)।” <a href="/#_ftn18" name="_ftnref18">[18]</a></p>
<h2 data-path-to-node="33">বিবাহের ঘটনা:</h2>
<p data-path-to-node="33">তাকওয়ার মানদণ্ডে তিনি ছিলেন আপসহীন। হুমাইদ আত-তাওয়িল (রহ.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি হাসান বসরি (রহ.)-এর কাছে বিবাহের প্রস্তাব পাঠাল। লোকটির প্রশংসা করতে গিয়ে হুমাইদ জানালেন তার কাছে পঞ্চাশ হাজার দিরহাম সম্পদ আছে। হাসান বসরি (রহ.) বললেন, “তার পঞ্চাশ হাজার দিরহাম আছে? এত টাকা কখনও হালাল পথে জমা হতে পারে না! যদি সে হালাল পথেই তা জমা করে থাকে, তবে নিশ্চয়ই সে আল্লাহর নির্ধারিত হক (দান-সদকা) আদায়ে কৃপণতা করেছে। না, আল্লাহর কসম, আমাদের আর তার মাঝে কখনও আত্মীয়তার সম্পর্ক (বিয়ে) হবে না।” <a href="/#_ftn19" name="_ftnref19">[19]</a></p>
<h2 data-path-to-node="34">শাসকের দেওয়া অন্যায্য সুযোগ বর্জন:</h2>
<p data-path-to-node="34">অন্যায্য পথে আসা কোনো সুযোগই তিনি গ্রহণ করতেন না। ইবনে শাওযাব (রহ.) থেকে বর্ণিত, যখন খলিফা সুলাইমান বিন আব্দুল মালিক অনাবাদি জমিগুলো জনগণের মাঝে ভাগ করে দিতে লাগলেন, তখন হাসান বসরির ছেলে তাঁকে জমি নেওয়ার অনুরোধ করলেন। হাসান বসরি (রহ.) বললেন, “চুপ করো, এই দুই ব্রিজের মাঝখানের সবটুকু জায়গাও যদি আমাকে এক ঝুড়ি মাটির বিনিময়ে দেওয়া হয় তবুও আমি খুশি হবো না (যদি তা নেওয়া তাকওয়ার পরিপন্থী হয়)।” <a href="/#_ftn20" name="_ftnref20">[20]</a></p>
<h2 data-path-to-node="35">অন্তরের যত্ন:</h2>
<p data-path-to-node="35">তিনি সর্বদা অন্তরকে সজিব রাখার পরামর্শ দিতেন। আবু উবাইদা আন-নাজি থেকে বর্ণিত, তিনি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছেন, “তোমরা নসিহতের মাধ্যমে এই অন্তরগুলোকে সজিব করো, কারণ এতে দ্রুত মরিচা ধরে যায়। আর নফসকে নিয়ন্ত্রণে রাখো, কারণ, নফস প্রবৃত্তির পেছনে ছুটতে চায় এবং মন্দের দিকে তার ঝোঁক প্রবল। তোমরা তো একটি কাফেলার মতো, যারা সাময়িক যাত্রাবিরতি করছে। শীঘ্রই তোমাদের ডাকা হবে। সুতরাং তোমাদের কাছে থাকা সর্বোত্তম পাথেয় নিয়ে ফিরে যাও।” <a href="/#_ftn21" name="_ftnref21">[21]</a></p>
<h2 data-path-to-node="36">আলেমদের অবমাননার কারণ:</h2>
<p data-path-to-node="36">আলেমদের আত্মমর্যাদা রক্ষায় তিনি ছিলেন সোচ্চার। ফুদাইল বিন জাফর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হাসান বসরি (রহ.) যখন গভর্নরের কাছ থেকে বের হলেন, দরজার বাইরে কিছু আলেমকে সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকতে দেখলেন। তিনি তাঁদের ভর্ৎসনা করে বললেন, “তোমরা কারিদের ও আলেমদের মান-সম্মান ডুবিয়েছ। আল্লাহর কসম, যদি তোমরা তাদের কাছে থাকা ধন-সম্পদ থেকে নির্লোভ হতে, তবে তারা তোমাদের কাছে থাকা জ্ঞান থেকে উপকৃত হতে আগ্রহী হতো। কিন্তু তোমরা তাদের সম্পদের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েছ। ফলে তারাও তোমাদের জ্ঞানের প্রতি অনাগ্রহী হয়ে গেছে।” <a href="/#_ftn22" name="_ftnref22">[22]</a></p>
<h2 data-path-to-node="37">মুমিন ও মুনাফিকের পরিচয়:</h2>
<p data-path-to-node="37">চরিত্রের মাধ্যমেই তিনি মুমিন ও মুনাফিকের পার্থক্য ফুটিয়ে তুলতেন। তিনি বলেন, “মুমিন সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহ যা বলেছেন তা ঠিক তেমনই বিশ্বাস করে। মুমিন আমলের দিক থেকে মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ; আবার আল্লাহভীতির দিক থেকেও সে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভীত। অন্যদিকে মুনাফিক বলে, ‘আমাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে, আমার কোনো সমস্যা নেই।’ সে মন্দ কাজ চালিয়েই যায়, অথচ আল্লাহর কাছে (ক্ষমার) বৃথা আশা পোষণ করে।” <a href="/#_ftn23" name="_ftnref23">[23]</a></p>
<h2 data-path-to-node="38">মুমিনের গুণাবলি:</h2>
<p data-path-to-node="38">আত্মসমালোচনা ছিল তাঁর দর্শনের অন্যতম দিক। হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই একজন মুমিন নিজের ওপর সদা-সচেতন প্রহরীর মতো থাকে। কিয়ামতের দিনে যাদের হিসাব সহজ হবে, তারা হলো সেইসব লোক, যারা দুনিয়াতেই নিজেদের হিসাব করে নিয়েছে। মুমিন এই দুনিয়ায় এক বন্দির মতো; সে সদা নিজের গলার শিকল মুক্ত করার চেষ্টা করে। সে জানে— তার কান, চোখ, জিহ্বা এবং সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পর্কে আল্লাহর কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।” <a href="/#_ftn24" name="_ftnref24">[24]</a></p>
<h2 data-path-to-node="39">আল্লাহর খাঁটি বান্দাদের বৈশিষ্ট্য:</h2>
<p data-path-to-node="39">তিনি ইমানদারদের সেই উচ্চ স্তরের কথা বলতেন, যেখানে আখেরাতই মুখ্য। হাসান বসরি (রহ.) বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর এমন কিছু বান্দা আছেন, যারা (ইমানের নুরে) জান্নাতবাসীদের জান্নাতে চিরস্থায়ী অবস্থান করতে দেখেন এবং জাহান্নামবাসীদের জাহান্নামে চিরস্থায়ীভাবে শাস্তি পেতে দেখেন। তাঁদের অন্তর আখিরাতের চিন্তায় ব্যথিত। তাঁদের অনিষ্ট থেকে মানুষ নিরাপদ। রাতে তাঁরা কাতারবদ্ধ হয়ে নামাজে দাঁড়ান। দিনে তাঁরা বিচরণ করেন ধৈর্যশীল, প্রজ্ঞাবান, নেককার ও মুত্তাকি হয়ে।” <a href="/#_ftn25" name="_ftnref25">[25]</a></p>
<h2 data-path-to-node="40">দুনিয়াতে আমলের গুরুত্ব:</h2>
<p data-path-to-node="40">প্রতিটি আমলকে তিনি পরম গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তিনি বলেন, “হে আদম সন্তান, কোনো ভালো কাজকে ছোটো মনে করে ছেড়ে দিও না; কারণ আমলনামায় যখন তা দেখবে, তা তোমাকে আনন্দ দেবে। আফসোস! দুনিয়া তার জৌলুস নিয়ে চলে গেছে আর তোমাদের কর্মগুলো তোমাদের গলায় হারের মতো ঝুলে আছে। হে আদম সন্তান, যদি তুমি তোমার আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়াকে বিক্রি করে দাও, তবে তুমি উভয়টিতেই লাভবান হবে। সাবধান, দুনিয়ার বিনিময়ে আখিরাত বিক্রি করো না।” <a href="/#_ftn26" name="_ftnref26">[26]</a></p>
<h2 data-path-to-node="41">জাহান্নাম ও শয়তান থেকে রক্ষা পাওয়ার চারটি গুণ:</h2>
<p data-path-to-node="41">তিনি জীবনের মোক্ষ লাভের চারটি সূত্রের কথা বলতেন— ১. আকাঙ্ক্ষা বা লোভের সময়, ২. ভয়ের সময়, ৩. প্রবৃত্তি ও লালসার সময় এবং ৪. রাগের সময়—যে ব্যক্তি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুনের জন্য হারাম করে দেবেন। <a href="/#_ftn27" name="_ftnref27">[27]</a></p>
<h2 data-path-to-node="42">সাথিদের প্রতি তাঁর নসিহত:</h2>
<p data-path-to-node="42">তিনি তাঁর সঙ্গীদের দুনিয়ার অসারতা সম্পর্কে সতর্ক করতেন। তিনি বলতেন, “দুনিয়া আমলের ক্ষেত্র। হে আদম সন্তান, দুনিয়ার দুশ্চিন্তা গুটিয়ে নাও; নতুবা দুনিয়ার মায়া তোমাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করবে যে, তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে, সেই উদ্দেশ্যই ভুলে যাবে। মৃত্যুর আগে দ্রুত নেক আমল করো; কাল করব, পরশু করব বলে দেরি করো না; কারণ তুমি জানো না কখন আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে।” পরিশেষে তিনি বলেন, “প্রকৃত মৃত তো সে-ই, যে জীবিতদের মাঝে থেকেও অন্তরের দিক থেকে মৃত।” <a href="/#_ftn28" name="_ftnref28">[28]</a></p>
<h2 data-path-to-node="2">মুসলিমদের প্রতি তাঁর নসিহত</h2>
<p data-path-to-node="3">আবু উবাইদা (রহ.) বলেন, হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, “আল্লাহ সেই মানুষটির প্রতি রহম করুন, যে সত্যকে চিনেছে, তারপর ধৈর্য ধরেছে; যে দেখেছে, তারপর অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেছে। কিন্তু কিছু লোক সত্য চিনেছিল; তারপর অস্থিরতা ও হতাশা তাদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিয়েছে। ফলে তারা না পেরেছে লক্ষ্যে পৌঁছাতে, না পেরেছে আগের অবস্থায় ফিরে যেতে।”</p>
<p data-path-to-node="4">তিনি আরও বলেন, “ওই বিভ্রান্তিকর প্রবৃত্তিগুলো থেকে বেঁচে থাকো, যা আল্লাহ থেকে বহু দূরে নিয়ে যায়; যার সারকথা পথভ্রষ্টতা এবং যার পরিণতি জাহান্নাম। এতে কঠিন পরীক্ষা আছে। যে এতে পতিত হয়, তা তাকে বিভ্রান্ত করে; আর যে এতে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়ে, তা তাকে ধ্বংস করে। হে আদম সন্তান, তুমি তোমার দিনকে আঁকড়ে ধরো। দিনই তোমার মাংস ও রক্তের মতো। দিন নিরাপদ থাকলে মাংস ও রক্তও নিরাপদ থাকবে। আর বিপরীত হলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই—তা এমন এক আগুন, যা নিভবে না; এমন এক ক্ষত, যা সারবে না; এমন এক শাস্তি, যা শেষ হবে না এবং এমন এক আত্মা, যা মরবে না।”</p>
<p data-path-to-node="5">“নিশ্চয়ই তোমাকে তোমার প্রতিপালকের সামনে দাঁড় করানো হবে এবং তোমাকে তোমার আমলের বিনিময়ে বন্ধক রাখা হবে। সুতরাং, এখন যা তোমার হাতে আছে, তা থেকেই সঞ্চয় করে নাও— সেই দিনের জন্য, যা সামনে অপেক্ষা করছে। মৃত্যুর সময় সংবাদ এসে পৌঁছবে; তখন জিজ্ঞেস করা হবে, কিন্তু তুমি উত্তর খুঁজে পাবে না। বান্দা ততদিন কল্যাণের উপর থাকে, যতদিন তার নফসই তার উপদেশদাতা থাকে এবং আত্মসমালোচনাই তার প্রধান চিন্তা হয়।”</p>
<p data-path-to-node="6">আবু উবাইদাহ থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, “হে আদম সন্তান, তুমি তো কেবল গোগ্রাসে গিলে যাচ্ছ, পাত্রে সম্পদ জমা করছ, থলের মুখ শক্ত করে বাঁধছ; আরামদায়ক বাহনে চড়ছ, নরম পোশাক পরছ। এরপর একদিন বলা হবে—‘সে মারা গেছে।’ আল্লাহর কসম, এরপর সে আখিরাতের দিকে যাত্রা করবে। মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়াতে অল্প কয়েকদিন আমল করে। আল্লাহর কসম, দুনিয়ার নিয়ামত ও স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করার কারণে সে আখিরাতে অনুতপ্ত হবে না। বরং দুনিয়া যখন তার সামনে সজ্জিত হয়ে আসত, সে আখিরাতের আশায় একে তুচ্ছ মনে করত। সে এখান থেকে কেবল পাথেয় সংগ্রহ করেছে; দুনিয়াকে স্থায়ী ঘর বানায়নি। দুনিয়ার নিয়ামতের প্রতি লালায়িত হয়নি; প্রাচুর্যে উল্লসিত হয়নি। বিপদ এলেও সে তা বড় করে দেখত না; আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা করত। সে দুনিয়ার প্রাপ্তিকে বড় মনে করেনি, যতক্ষণ না আল্লাহর প্রতি আগ্রহ ও ভয় নিয়ে বিদায় নিয়েছে। সুসংবাদ তার জন্য, আল্লাহ তার কিয়ামতের ভয় দূর করবেন, ভুল ঢেকে দেবেন এবং হিসাব সহজ করবেন।”</p>
<p data-path-to-node="7">তিনি আরও বলেন, “মুসলিমদের মধ্যে যারা বুদ্ধিমান ছিলেন, তারা বলতেন, ‘জীবন তো কেবল সকাল-সন্ধ্যা, আর রাতের শেষভাগের কিছু ইবাদত ও দিনের ওপর অবিচল থাকা।’ হে আদম সন্তান, কল্যাণ পেতে তোমার বেশি দেরি হবে না। আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে জান্নাত দান করবেন, তখনই সে সফল। মনে রেখো, আল্লাহকে তাঁর জান্নাতের ব্যাপারে ধোঁকা দেওয়া যায় না; আর অলীক কামনা (আশা-তামান্না) দিয়ে জান্নাতও পাওয়া যায় না। অথচ এখন কৃপণতা বেড়েছে, অলীক বাসনা ছড়িয়েছে, আর আকাঙ্ক্ষাকারী ব্যক্তি ধোঁকার ঘোরেই ডুবে আছে।” <a href="/#_ftn29" name="_ftnref29">[29]</a></p>
<h2 data-path-to-node="9">বাণীসমগ্র</h2>
<p data-path-to-node="10">১. হজরত হাসান বসরি (রহ.) বলেন, “হে আদম সন্তান, আল্লাহর কসম, তুমি যদি কুরআন পাঠ করো এবং তার ওপর যথার্থ বিশ্বাস স্থাপন করো, তবে দুনিয়ায় তোমার দুঃখবোধ দীর্ঘ হবে, তোমার ভয় প্রবল হবে এবং তোমার কান্না বেড়ে যাবে।”</p>
<p data-path-to-node="10">২. হাসান (রহ.) প্রায়ই বলতেন, “আমরা হাসি; অথচ জানি না, হয়তো আল্লাহ আমাদের কোনো আমলের ওপর দৃষ্টি দিয়ে বলে দিয়েছেন, ‘আমি তোমাদের কোনো আমলই কবুল করব না’।”</p>
<p data-path-to-node="10">৩. “হায় আদম সন্তান, আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার মতো শক্তি কি তোমার আছে?”</p>
<p data-path-to-node="10">৪. “আমি এমন মহৎ লোকদের (সাহাবিদের) দেখেছি, যাঁদের কাছে এই দুনিয়া পায়ের নিচের মাটির চেয়েও তুচ্ছ ছিল। আবার এমন লোকও দেখেছি, যাদের কাছে রাতের খাবারের জন্য সামান্য খাদ্য ছাড়া আর কিছুই থাকত না; তবুও তারা বলত— ‘আমি সবটুকু পেটে পুরব না।’ এরপর ক্ষুধার্ত থাকা সত্ত্বেও তার একাংশ সদকা করে দিত, যদিও গ্রহীতার চেয়ে দাতার ক্ষুধা হয়তো বেশি ছিল।”</p>
<p data-path-to-node="10">৫. সালিহ আল-মুররি হাসান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “হে আদম সন্তান, তুমি তো কেবল কয়েকটি দিনের সমষ্টি; একটি দিন চলে গেলে তোমার অস্তিত্বের একাংশও বিলীন হয়ে যায়।”</p>
<p data-path-to-node="10">৬. মুবারক ইবন ফাদালাহ বলেন, আমি হাসানকে বলতে শুনেছি, “মৃত্যু দুনিয়ার আসল রূপ উন্মোচিত করে একে লাঞ্ছিত করেছে; কোনো বুদ্ধিমান মানুষের জন্য দুনিয়াতে আনন্দিত হওয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট রাখেনি।”</p>
<p data-path-to-node="10">৭. সাবিত তাঁর থেকে বর্ণনা করেন, হাসান (রহ.) বলতেন, “মুমিনের অট্টহাসি তার অন্তরের গাফলতির পরিচয়।” <a href="/#_ftn30" name="_ftnref30">[30]</a></p>
<p data-path-to-node="10">৮. আবু উবাইদা আন-নাজি থেকে বর্ণিত, তিনি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছেন, “হে আদম সন্তান, তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত ইমানের স্বাদ পাবে না, যতক্ষণ না মানুষের সেই দোষ ধরা ছেড়ে দেবে, যে দোষ তোমার মধ্যেও আছে। প্রকৃত ইমান হলো আগে নিজের দোষ সংশোধন করা। তুমি যখনই নিজের একটি দোষ সংশোধন করবে, তখনই নিজের ভেতরে আরেকটি দোষ পাবে, যা সংশোধন করা বাকি। এভাবে তুমি নিজের ভুল সংশোধনেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আর আল্লাহর কাছে সেই বান্দাই সবচেয়ে প্রিয়, যে নিজের সংশোধনে মগ্ন থাকে।” <a href="/#_ftn31" name="_ftnref31">[31]</a></p>
<p data-path-to-node="10">৯. ইমরান বিন খালিদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি (রহ.) বলেন, “একজন মুমিন সকালেও দুঃখিত অবস্থায় থাকে এবং সন্ধ্যাতেও দুঃখিত থাকে। এর বাইরে তার উপায় নেই। কারণ, সে সর্বদা দুটি ভয়ের মধ্যে থাকে। ক. অতীত গুনাহের ভয়—আল্লাহ সে বিষয়ে কী ফয়সালা করবেন, সে জানে না। খ. অবশিষ্ট সময়ের ভয়—এই সময়ের মধ্যে সে কী ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িয়ে পড়বে, সে জানে না।”</p>
<p data-path-to-node="10">১০. “হে আদম সন্তান, তুমি তো কিছু দিনের সমষ্টি; একটি দিন চলে গেলে তোমার অস্তিত্বের একাংশও বিলীন হয়ে যায়।”</p>
<p data-path-to-node="10">১১. “সবচেয়ে পাপিষ্ঠ সে ব্যক্তি, যে কবিরা গুনাহে লিপ্ত হয়, দম্ভভরে কাপড় টেনে চলে এবং বলে— ‘আমার কোনো সমস্যা নেই।’ অচিরেই সে জানবে— আল্লাহ কখনও দুনিয়াতেই দ্রুত শাস্তি দেন, আবার কখনও তা বিচারের দিনের জন্য জমা রাখেন।”</p>
<p data-path-to-node="10">১২. হিশাম থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি (রহ.) বলেছেন, “আল্লাহ তার ওপর রহম করুন, যে জীর্ণ পোশাক পরে, রুটির শুকনো টুকরো খায়, মাটির সাথে মিশে থাকে (অত্যন্ত বিনয়ী হয়), গুনাহের জন্য কাঁদে এবং ইবাদতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে।”</p>
<p data-path-to-node="10">১৩. হাওশাব ইবনে মুসলিম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “আল্লাহর কসম, তাদের (পাপিষ্ঠদের) পায়ের নিচে যদি দামি ঘোড়া শব্দ করে চলে এবং মানুষ সম্মান করে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে; তবুও পাপের গ্লানি ও লাঞ্ছনা তাদের অন্তরে লেগেই থাকে। আল্লাহ তায়ালা স্থির করে দিয়েছেন— বান্দা যখন তাঁর অবাধ্য হয়, আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করবেনই।”</p>
<p data-path-to-node="10">১৪. মুবারক বিন ফাদালাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “মৃত্যু দুনিয়ার সমস্ত সম্মান ও চাকচিক্যকে কলঙ্কিত করে দিয়েছে; ফলে বুদ্ধিমানের জন্য আনন্দিত হওয়ার মতো কিছু অবশিষ্ট নেই।”</p>
<p data-path-to-node="10">১৫. হাসান বসরি (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন, “হে আদম সন্তান, তোমার অবস্থা সেই ভেড়ার মতো, যে ভেড়াকে জবেহ করার জন্য ছুরি ধার দেওয়া হচ্ছে, রান্নার জন্য চুলা জ্বালানো হচ্ছে; অথচ ভেড়া জাবর কাটছে!” (অর্থাৎ মৃত্যু নিকটে, অথচ মানুষ গাফেল।)</p>
<p data-path-to-node="10">১৬. “হে আদম সন্তান, তুমি তো দুটি সওয়ারি। রাত ও দিনের ওপর সওয়ার। তারা তোমাকে নিয়ে থামে না; অবশেষে তারা তোমাকে আখিরাতে পৌঁছে দেবে। এরপর হয় জান্নাত, নয় জাহান্নাম। তোমার চেয়ে বড় ঝুঁকিতে আর কে আছে?”</p>
<p data-path-to-node="10">১৭. আবু মুসা বর্ণনা করেন, আমি হাসান বসরি (রহ.)-কে বলতে শুনেছি, “জানো, ইসলাম কী? ইসলাম হলো তোমার গোপন ও প্রকাশ্য অবস্থা এক হবে, তোমার অন্তর আল্লাহর কাছে সমর্পিত হবে, আর তোমার হাত ও জবান থেকে প্রতিটি মুসলিম ও চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নিরাপদ থাকবে।”</p>
<p data-path-to-node="10">১৮. “আল্লাহর কসম, যে বান্দার রিজিক প্রতিদিন (তাকদির অনুযায়ী) বণ্টন করে দেওয়া হয়, অথচ সে যদি না ভাবে— এটাই তার জন্য সর্বোত্তম ছিল (অর্থাৎ সে অসন্তুষ্ট থাকে), তবে সে হয় অক্ষম, নয়তো চরম নির্বোধ।” <a href="/#_ftn32" name="_ftnref32">[32]</a></p>
<h2 data-path-to-node="12">মৃত্যুশয্যায় শেষ তিনটি উপদেশ</h2>
<p data-path-to-node="13">ইমাম হাসান বসরি (রহ.)-এর যখন মৃত্যু ঘনিয়ে এলো, তখন তাঁর কয়েকজন সঙ্গী তাঁর কাছে প্রবেশ করে বললেন, “হে আবু সাঈদ, আমাদের জন্য কিছু পাথেয় (উপদেশ) দিন, যা দিয়ে আমরা উপকৃত হতে পারি।” তিনি বললেন, “আমি তোমাদের তিনটি কথা বলছি। এরপর তোমরা আমার কাছ থেকে উঠে যাবে এবং আমাকে আমার গন্তব্যের (আখেরাতের) জন্য একা ছেড়ে দেবে: ১. তোমরা মানুষকে যে মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করো, নিজেরা তা বর্জন করার ক্ষেত্রে সবার অগ্রগামী হও। ২. তোমরা মানুষকে যে ভালো কাজের আদেশ দাও, নিজেরা তা পালনে সবার চেয়ে বেশি আমলকারী হও। ৩. জেনে রেখো, তোমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ দুই অবস্থা থেকে মুক্ত না। হয় তা তোমাদের পক্ষে (সওয়াব) যাবে, না হয় তোমাদের বিপক্ষে (গুনাহ) যাবে। সুতরাং লক্ষ্য করো, সকালে কোথায় যাচ্ছ এবং সন্ধ্যায় কোথায় ফিরে আসছ; অর্থাৎ সারা দিনের প্রতিটি কাজ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকো।” <a href="/#_ftn33" name="_ftnref33">[33]</a></p>
<h2 data-path-to-node="15">ওফাত</h2>
<p data-path-to-node="16">খালিদ ইবনে খিদাশ বর্ণনা করেন; সালিহ আল-মুররি ইউনুস থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, হাসান আল-বসরির মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে তিনি বারবার “ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” পাঠ করতে থাকেন। তখন তাঁর ছেলে কাছে দাঁড়িয়ে বলল, “হে বাবা, আপনি তো আমাদের চিন্তায় ফেলে দিলেন। আপনি কি বিশেষ কিছু দেখছেন?” তিনি উত্তর দিলেন, “এটি আমার প্রাণ; যা বের হয়ে যাচ্ছে। এর আগে এমন বিপদে আমি কখনো পড়িনি।”</p>
<p data-path-to-node="17">তিনি পহেলা রজবে ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানাজায় মানুষের বিশাল সমাগম হয়েছিল। বসরার জামে মসজিদে জুমার নামাজের পরপরই তাঁর জানাজা সম্পন্ন হয়। মানুষের উপচে পড়া ভিড় এবং জানাজায় শরিক হওয়ার তীব্র আকুলতার কারণে সেদিন বসরার ওই প্রধান মসজিদে আসরের জামাতও কায়েম করা সম্ভব হয়নি; সবাই জানাজার জন্য ময়দানে চলে গিয়েছিল।</p>
<p data-path-to-node="18">হিশাম ইবনে হাসান বলেন, আমরা বৃহস্পতিবার বিকেলে মুহাম্মদ (ইবনু সিরীন)-এর কাছে ছিলাম। আসরের পর এক ব্যক্তি এসে সংবাদ দিল— “হাসান ইন্তেকাল করেছেন।” মুহাম্মদ (ইবনু সিরীন) তাঁর জন্য রহমতের দোয়া করলেন। শোকের তীব্রতায় তাঁর গায়ের রং পরিবর্তিত হয়ে গেল এবং তিনি কথা বলা বন্ধ করে দিলেন। সূর্যাস্ত পর্যন্ত তিনি আর একটি কথাও বলেননি। তাঁর এই গভীর শোক দেখে মজলিসে উপস্থিত অন্যরাও কথা বলতে সংকোচ বোধ করল।</p>
<p data-path-to-node="19">ইবনে উলাইয়্যাহ বলেন, হাসান বসরি (রহ.) ১১০ হিজরি সালের রজব মাসে ইন্তেকাল করেন। আবদুল্লাহ ইবনে হাসান বলেন, তাঁর পিতা (হাসান আল-বসরি) প্রায় ৮৮ বছর বয়স পেয়েছিলেন। <a href="/#_ftn34" name="_ftnref34">[34]</a></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><a href="/#_ftnref1" name="_ftn1"></a></p>
</div>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/bio/hasan-al-basri/">হজরত হাসান বসরি (রহ.)</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></content:encoded>
					
		
		
			</item>
		<item>
		<title>হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রহ.)</title>
		<link>https://sufigraphy.com/bio/uways-al-qarani/</link>
		
		<dc:creator><![CDATA[hsmsohrab]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 14 Sep 2025 10:48:50 +0000</pubDate>
				<guid isPermaLink="false">https://sufigraphy.com/bio/%e0%a6%b9%e0%a6%9c%e0%a6%b0%e0%a6%a4-%e0%a6%93%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%b8-%e0%a6%86%e0%a6%b2-%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%a8%e0%a7%80-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a6%bf/</guid>

					<description><![CDATA[<p>ওয়াইস ইবনে আমির আল-কারনি ছিলেন 'খায়রুত তাবেয়িন' উপাধিপ্রাপ্ত একজন মহান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। মায়ের সেবায় রত থাকার কারণে নবীজির সাক্ষাৎ পাননি, তবু নবীজি তাঁকে শ্রেষ্ঠ তাবেয়ি বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি ছিলেন দুনিয়াবিমুখ, দানশীল ও ইবাদতগুজার। হজরত ওমর ও আলী (রা.) তাঁর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন। সিফফিনের যুদ্ধে শহীদ হন বলে মত আছে। তাঁর জীবন ইমান ও আত্মত্যাগের অনন্য আদর্শ।</p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/bio/uways-al-qarani/">হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রহ.)</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div id="model-response-message-contentr_f76725019e889bdc" class="markdown markdown-main-panel enable-updated-hr-color" dir="ltr" aria-live="polite" aria-busy="false">
<h2>খায়রুত তাবেয়িন: হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রহ.)-এর মহাকাব্যিক জীবন</h2>
<p data-path-to-node="4">ইতিহাসের কালপরিক্রমায় কিছু জীবন মহাকাব্যের মতো স্নিগ্ধ আলো ছড়ায়, যা শুধু তথ্য নয়, অনুভব দিয়েও স্পর্শ করা যায়। ওয়াইস ইবনে আমির ইবনে জাজ আল-কারনি (রহ.) ছিলেন তেমনই এক মহাকাব্যিক চরিত্র, যাঁর জীবন ছিল নবীপ্রেম, মাতৃভক্তি আর দুনিয়াবিমুখতার এক জীবন্ত উদাহরণ। তিনি সশরীরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংস্পর্শ পাননি; কিন্তু তাঁর আধ্যাত্মিক উচ্চতা ও আত্মনিবেদন এমনই ছিল যে, তাঁকে ‘খায়রুত তাবেয়িন’ (তাবেয়িনদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। তাঁর জীবন যেন নিভৃতে জ্বলা এক প্রদীপ, যার আলো দূর থেকে দিকনির্দেশনা দেয়। তাঁর জীবনগাঁথা শাশ্বত মানবতার এক অনন্য দলিল, যা আজও কোটি হৃদয়ে ইমান ও আধ্যাত্মিকতার দীপশিখা জ্বেলে চলেছে।</p>
<h2 data-path-to-node="5">তাঁর নাম ও পরিচয়:</h2>
<p data-path-to-node="5">আধ্যাত্মিকতার এই নক্ষত্রটি ইয়েমেনের মরুভূমিতে উদিত হয়েছিলেন। তিনি তাঁর যুগের তাবেয়িনদের সর্দার। তাঁর পুরো নাম আবু আমর ওয়াইস ইবনে আমির ইবনে জাজ ইবনে মালিক আল-কারনি আল-মুরাদি আল-ইয়ামানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি। &#8216;করন&#8217; ছিল ইয়েমেনের মুরাদ গোত্রের একটি সম্মানিত শাখা, যে পবিত্র বংশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।<a href="/#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a> হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রা.)-এর জন্মসন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য খুব একটা পাওয়া যায় না। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, তিনি ইসলামের প্রথম যুগের শুরুতে, সম্ভবত ৬ষ্ঠ শতাব্দীর শেষার্ধে (আনুমানিক ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) জন্মগ্রহণ করেন।</p>
<h2 data-path-to-node="6">তাঁর হাদিস চর্চা:</h2>
<p data-path-to-node="6">তিনি নিজেকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখতেই পছন্দ করতেন, তাই তাঁর থেকে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা সীমিত। হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রা.) এক সময় হজরত ওমর (রা.)-এর নিকট আগমন করেন এবং তাঁর ও হজরত আলী (রা.)-এর নিকট থেকেও সামান্য কিছু হাদিস বর্ণনা করেছেন। আর তাঁর থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন— হজরত উসাইর ইবনে আমর, আবদুর রহমান ইবনে আবি লাইলা, আবু আব্দুর রব আদ-দিমাশকী এবং আরও কিছু বরণীয় তাবেয়ি। এগুলো ছিল মূলত সংক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ও কাহিনি; তিনি কোনো সনদবদ্ধ দীর্ঘ হাদিস (মুসনাদ) বর্ণনা করেননি। তাই তাঁকে দুর্বল রাবি হিসেবে মূল্যায়ন করার কোনো সুযোগ নেই; বরং তিনি ছিলেন আল্লাহর নিকটবর্তী মুত্তাকি অলি এবং মুখলিস বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।<a href="/#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a></p>
<h2 data-path-to-node="7">হজরত ওমর (রা.)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ:</h2>
<p data-path-to-node="7">পর্দার আড়ালে থাকা এই মহাপুরুষকে খুঁজে বের করার জন্য স্বয়ং আমিরুল মুমিনীন ব্যাকুল ছিলেন। আফফান (রহ.) বলেন, আমাদের কাছে হাদিস বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ ইবনু সালামা; তিনি আল-জুরাইরি থেকে, তিনি আবু নদরাহ থেকে এবং তিনি উসাইর ইবনু জাবির থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যখন ইয়েমেনের লোকেরা মদিনায় আগমন করত, তখন হজরত ওমর (রা.) প্রতিটি কাফেলাকে জিজ্ঞেস করতেন, “তোমাদের মধ্যে কি করন গোত্রের কেউ আছে?”</p>
<p data-path-to-node="8">একদিন এমন হলো যে, হজরত ওমর (রা.)-এর উটের লাগাম অথবা হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রা.)-এর উটের লাগাম—দুটির একটি অপরজনের হাতে এসে পড়ল; অথবা তাঁদের কেউ একজন লাগাম অপরজনকে এগিয়ে দিলেন। তখনই হজরত ওমর (রা.) তাঁকে চিনে ফেললেন এবং জিজ্ঞেস করলেন—</p>
<p data-path-to-node="8">“আপনার নাম কী?”</p>
<p data-path-to-node="8">তিনি বললেন, “আমি ওয়াইস।”</p>
<p data-path-to-node="8">“আপনার কি মা বেঁচে আছেন?”</p>
<p data-path-to-node="8">তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আছেন।”</p>
<p data-path-to-node="8">“আপনার শরীরে কি সাদা দাগ ছিল?”</p>
<p data-path-to-node="8">তিনি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, ছিল। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি এবং আল্লাহ তা দূর করে দিয়েছেন। শুধু নাভির কাছে দিরহামের মতো একটি দাগ রেখেছেন, যাতে আমি তা দেখে আমার রবকে স্মরণ করতে পারি।”</p>
<p data-path-to-node="9">এ কথা শুনে ওমর (রা.) বললেন, “আমার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।” হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রা.) বিনীতভাবে বললেন, “আপনিই বরং আমার জন্য ক্ষমা চাইবেন, কারণ আপনি তো রসুলুল্লাহ ﷺ-এর সাহাবি!” তখন হজরত ওমর (রা.) বললেন, “নিশ্চয়ই আমি রসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি—‘তাবেয়িদের মধ্যে সর্বোত্তম একজন ব্যক্তি, যার নাম ওয়াইস। তাঁর মা রয়েছেন। তাঁর শরীরে সাদা দাগ ছিল; তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, আল্লাহ তা দূর করে দিলেন, শুধু নাভির কাছে এক দিরহামের মতো একটি দাগ রেখে দিলেন। তাঁর কাছে যে ক্ষমা প্রার্থনা চাইবে, তিনি তাঁর জন্য ইস্তিগফার করবেন’।”</p>
<p data-path-to-node="10">এরপর তিনি (ওয়াইস কারনি) মানুষের ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলেন এবং আমরা আর বুঝতে পারলাম না তিনি কোথায় গেলেন। উসাইর ইবনে জাবির বলেন, পরে তিনি কুফায় উপস্থিত হলেন। আমরা এক বৃত্তে বসে আল্লাহর স্মরণ করতাম আর তিনি এসে আমাদের সঙ্গে বসতেন। কিন্তু যখন তিনি কথা বলতেন, তখন আমাদের হৃদয়ে এমনভাবে প্রভাব ফেলত যে অন্য কারও কথা ততটা প্রভাব ফেলতে পারত না।<a href="/#_ftn3" name="_ftnref3">[3]</a></p>
<h2 data-path-to-node="11">রসুলুল্লাহ ﷺ-এর পক্ষ থেকে জুব্বা মুবারক হাদিয়া:</h2>
<p data-path-to-node="11">নবীজির প্রতি তাঁর যে অদৃশ্য ভালোবাসা ছিল, তার প্রতিদান তিনি পার্থিব জীবনেই পেয়েছিলেন। যখন নবী ﷺ-এর ওফাতের সময় ঘনিয়ে এলো, সাহাবায়ে কেরাম (রা.) অত্যন্ত ব্যথিত হৃদয়ে জানতে চাইলেন, “হে আল্লাহর রসুল, আপনার চীরকা (মোটা পশমের পোশাক) কাকে দেব?” উত্তরে নবী করিম ﷺ বললেন, “ওয়াইস আল-কারনিকে।” পরবর্তীতে ওমর (রা.) তাঁর সাথে সাক্ষাৎকালে নবী ﷺ-এর নির্দেশিত তাঁর পবিত্র জুব্বা হজরত ওয়াইস আল-কারনির হাতে তুলে দেন। তিনি এই চীরকা গ্রহণ করে আনন্দে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সেজদা করেন এবং আল্লাহর কাছে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।<a href="/#_ftn4" name="_ftnref4">[4]</a></p>
<h2 data-path-to-node="12">জীবন পরিক্রমা:</h2>
<p data-path-to-node="12">ওয়াইস আল-কারনি (রহ.)-এর জীবন ছিল ধৈর্য ও অমায়িক ব্যবহারের এক জীবন্ত ছবি। তিনি কুফার বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর শরীরে একসময় শ্বেত রোগ হয়েছিল। তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন যেন তা দূর করে দেন। আল্লাহ তায়ালা তা কবুল করলেন। তখন তিনি বললেন, “হে আল্লাহ, আমার শরীরের কিছু অংশ রেখে দিন, যার মাধ্যমে আমি আপনার প্রদত্ত নিয়ামত স্মরণ করতে পারি।” ফলে আল্লাহ তাঁর শরীরে সামান্য দাগ রেখে দিলেন।</p>
<p data-path-to-node="13">ওয়াইস (রহ.) কিছু সাথি নিয়ে মসজিদে অবস্থান করতেন। তাঁর একজন চাচাতো ভাই ছিল, যে শাসকের সাথে ঘনিষ্ঠ ছিল এবং ওয়াইস (রহ.)-এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করত। যদি সে ওয়াইসকে ধনী লোকদের সাথে দেখত, তবে বলত, “সে শুধু তাদের থেকে খেয়ে বেড়ায়।” আর যদি গরিবদের সাথে দেখত, তবে বলত, “সে তাদের ধোঁকা দিচ্ছে।” কিন্তু ওয়াইস (রহ.) তাঁর সম্পর্কে কেবল ভালো কথাই বলতেন। তবে যখন সে পাশ দিয়ে যেত, তখন তিনি আড়াল হতেন এই ভয়ে যে তাঁর কারণে সে যেন কোনো পাপে (গিবত) লিপ্ত না হয়।</p>
<p data-path-to-node="14">ওমর (রা.) যখন কুফার প্রতিনিধি দলের কাছে খোঁজ নিতেন, তখন জিজ্ঞাসা করতেন, ‘তোমরা কি ওয়াইস ইবনে আমির আল-কারনিকে চেনো?’ তারা বলত, ‘না।’ এরপর কুফার একটি দল এল, যার মধ্যে সেই বিদ্বেষী চাচাতো ভাইটিও ছিল। ওমর (রা.) জিজ্ঞাসা করলে চাচাতো ভাই বলল, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, সে আমার চাচাতো ভাই। সে একজন নিকৃষ্ট ও নষ্ট প্রকৃতির লোক, আপনার চেনার মতো অবস্থানে সে পৌঁছায়নি।’ ওমর (রা.) বললেন, ‘তোমার ধ্বংস হোক! যখন তুমি কুফায় পৌঁছাবে, তখন তাকে আমার পক্ষ থেকে সালাম বলবে এবং আমার নির্দেশ পৌঁছে দেবে যেন সে আমার কাছে আসে।’</p>
<p data-path-to-node="15">সে কুফায় পৌঁছে সফরের পোশাক না খুলেই মসজিদে গেল। সেখানে সে ওয়াইসকে দেখতে পেয়ে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন, হে আমার চাচাতো ভাই।” ওয়াইস (রহ.) বললেন, “আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন।” সে বলল, “আমিরুল মুমিনীন আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং তাঁর কাছে যেতে বলেছেন।” ওয়াইস (রহ.) বললেন, “আমিরুল মুমিনীনের কথা আমার জন্য শোনা ও মানা ওয়াজিব।”</p>
<p data-path-to-node="16">অতঃপর তিনি ওমর (রা.)-এর কাছে এলেন। ওমর (রা.) তাঁর রোগের দাগের কথা জিজ্ঞেস করলে ওয়াইস (রহ.) অবাক হয়ে বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, আপনি কীভাবে জানলেন? আল্লাহর কসম, কোনো মানুষই এ বিষয়ে জানে না।’ ওমর (রা.) বললেন, ‘আমাদের রসুলুল্লাহ ﷺ খবর দিয়েছেন যে তাবেয়িদের মধ্যে করন গোত্রের একজন লোক আসবে যাকে ওয়াইস বলা হবে। তাঁর শ্বেত রোগ হবে এবং তিনি দোয়া করলে আল্লাহ তা দূর করে দেবেন।’ এরপর যখন লোকেরা শুনল যে ওমর (রা.) নবী ﷺ-এর পক্ষ থেকে এ কথা বলছেন, তখন সবাই তাঁর কাছে দোয়ার আবেদন করতে লাগল। জনসমাগম বেড়ে গেলে তিনি নিঃশব্দে সেখান থেকে সরে পড়লেন এবং চলে গেলেন। এরপর তাঁকে আর দেখা যায়নি।<a href="/#_ftn5" name="_ftnref5">[5]</a></p>
<h2 data-path-to-node="17">রসুল ﷺ ও সাহাবায়ে কিরামগণের নিকট তাঁর মর্যাদা:</h2>
<p data-path-to-node="17">নবীজি ﷺ-এর নিকট তাঁর মর্যাদা ছিল আকাশচুম্বী। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, একবার রসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের এক মজলিসে বললেন, “আগামীকাল তোমাদের সাথে জান্নাতবাসীদের মধ্যেকার একজন লোক সালাত আদায় করবে।” আমি সেই ব্যক্তি হওয়ার লোভ অনুভব করলাম। পরদিন মসজিদে শুধু আমি এবং নবী ﷺ বাকি থাকা অবস্থায় এক কালো লোক এগিয়ে এলেন। তিনি একটি ছেঁড়া কাপড় ও তালিযুক্ত বস্ত্র পরিহিত ছিলেন। তিনি নবী ﷺ-এর হাতে হাত রেখে দোয়ার আবেদন করলে নবী ﷺ তাঁর জন্য শাহাদাতের দোয়া করলেন। আমরা তাঁর শরীর থেকে কস্তুরীর সুগন্ধি পাচ্ছিলাম।</p>
<p data-path-to-node="18">আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আল্লাহর রসুল, ইনিই কি সেই ব্যক্তি?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, সে অমুক গোত্রের একজন দাস।’ নবী ﷺ আরও বললেন, ‘হে আবু হুরায়রা, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যাদের ভালোবাসেন, তারা হলেন আল-আসফিয়া (বিশুদ্ধচিত্ত) ও আল-আখফিয়া (লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা), যাদের চেহারা ধূলিধূসরিত ও পেট খালি; তবে তা কেবল হালাল উপার্জনে। যারা কোনো মজলিসে অনুমতি পায় না বা যাদের বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় না। তারা অসুস্থ হলে কেউ দেখতে যায় না, মারা গেলে জানাজায় যায় না।’ সাহাবিরা তাঁর বৈশিষ্ট্য জানতে চাইলে নবী ﷺ বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বললেন, ‘তিনি কুরআন তেলাওয়াত করেন এবং নিজের জন্য কাঁদেন। পৃথিবীর মানুষের কাছে অজানা কিন্তু আসমানের অধিবাসীদের কাছে সুপরিচিত। কিয়ামতের দিন তাঁকে রাবীয়াহ এবং মুদার গোত্রের সমান সংখ্যক লোকের জন্য সুপারিশ করার অনুমতি দেওয়া হবে।’</p>
<p data-path-to-node="19">নবী ﷺ আরও নির্দেশ দিলেন, ‘হে ওমর এবং হে আলী, যখন তোমরা তাঁর সাক্ষাৎ পাবে, তখন তাঁকে অনুরোধ করবে যেন তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।’ আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ওমর ও আলী (রা.) দশ বছর তাঁর সন্ধান করলেন। অবশেষে ওমর (রা.)-এর ইন্তেকালের বছর আরাফাতের আরাক এলাকায় তাঁকে সালাত আদায়রত অবস্থায় পেলেন। নবী ﷺ-এর বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর কাঁধের সাদা দাগ দেখে তাঁরা তাঁকে নিশ্চিতভাবে চিনে নিলেন এবং চুমু দিলেন। তাঁরা দোয়ার আবেদন করলে ওয়াইস আল-কারনি বললেন, ‘আমি দোয়াতে কেবল নিজেকে নয়, বরং জগতের সকল মুমিন নর-নারীকে অন্তর্ভুক্ত করি।’ ওমর (রা.) তাঁর জন্য খরচাপাতি ও কাপড় দিতে চাইলে তিনি বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করে বললেন, ‘আমার পশমের চাদরই যথেষ্ট। আমাদের সামনে কঠিন পথ রয়েছে; হালকা দেহবিশিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া কেউ তা অতিক্রম করতে পারবে না।’<a href="/#_ftn6" name="_ftnref6">[6]</a></p>
<h2 data-path-to-node="20">জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:</h2>
<p data-path-to-node="20">দুনিয়ার প্রতি তাঁর নির্লিপ্ততা ছিল বিস্ময়কর। বর্ণিত আছে যে তাঁর কাছে মাত্র একটি চাদর ছিল, যা পরিধান করে বসলে শরীর মাটির সাথে লেগে যেত। তিনি দোয়া করতেন, “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে ওজর পেশ করছি—একটি ক্ষুধার্ত পেটের পক্ষ থেকে এবং এক অনাবৃত দেহের পক্ষ থেকে। আমার কাছে যা আছে, তা কেবল পিঠের কাপড় আর সামান্য আহার।”<a href="/#_ftn7" name="_ftnref7">[7]</a></p>
<p data-path-to-node="21">আলকামা বিন মারসাদ বলেন, আটজন ব্যক্তির ওপর দুনিয়াবিমুখতা পূর্ণতা পেয়েছিল, যাদের অন্যতম ওয়াইস আল-কারনি। তাঁর পরিবারের লোকরা তাঁকে পাগল মনে করত এবং ঘরের পাশে ছোট একটি ঘর বানিয়ে দিয়েছিল। তাঁর খাবার ছিল কুড়িয়ে পাওয়া খুরমার আঁটি। সন্ধ্যা হলে সেগুলো বিক্রি করে তিনি ইফতারের খাবার কিনতেন।<a href="/#_ftn8" name="_ftnref8">[8]</a> আশ-শা’বী থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সময় আপনার উপর কেমন প্রভাব ফেলছে?’ তিনি বললেন, ‘সময় সেই ব্যক্তির উপর কেমন প্রভাব ফেলবে, যে সকালে উঠলে ভাবে সন্ধ্যায় আর বাঁচবে না? মৃত্যু ও আল্লাহর অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান কোনো মুমিনের জন্য পার্থিব আনন্দ অবশিষ্ট রাখেনি।’<a href="/#_ftn9" name="_ftnref9">[9]</a></p>
<h2 data-path-to-node="22">ইবাদত ও দানশীলতা:</h2>
<p data-path-to-node="22">নিজে রিক্ত থাকলেও তাঁর হৃদয় ছিল দানে সমৃদ্ধ। তিনি মাঝেমধ্যে নিজের পরিধেয় বস্ত্র দান করে দিয়ে বিবস্ত্র অবস্থায় ঘরে বসে থাকতেন, এমনকি জুমার নামাজে যাওয়ার মতো কাপড়ও থাকত না। আসবাহ বিন যায়েদ বলেন, একমাত্র মায়ের সেবার কারণেই তিনি নবী ﷺ-এর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেননি। ওয়াইস (রহ.) বলতেন, ‘আজকের রাতটি সিজদার রাত’ এবং ভোর পর্যন্ত সিজদায় কাটিয়ে দিতেন। তিনি ঘরে অতিরিক্ত যা থাকত দান করে দিতেন এবং আল্লাহর কাছে দায়মুক্তি চাইতেন যেন কেউ ক্ষুধার্ত বা বস্ত্রহীন অবস্থায় মারা গেলে তাঁকে পাকড়াও করা না হয়।<a href="/#_ftn10" name="_ftnref10">[10]</a></p>
<h2 data-path-to-node="23">অভাব ও লোকলজ্জা:</h2>
<p data-path-to-node="23">দুনিয়ার মানুষের বিদ্রুপ তাঁকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ওসাইর বিন জাবির বলেন, কুফায় ওয়াইস (রহ.) যখন কথা বলতেন, তা হৃদয়ে গেঁথে যেত। একদিন তাঁকে মজলিসে না দেখে তাঁর কুটিরে গিয়ে জানা গেল যে তাঁর পরার মতো পর্যাপ্ত কাপড় নেই। ওসাইর তাঁকে একটি চাদর দিতে চাইলে তিনি লোকলজ্জার ভয়ে তা নিতে চাইলেন না। অনেক অনুরোধে নেওয়ার পর দুষ্ট লোকেরা বিদ্রুপ করে বলতে লাগল, ‘দেখো, কার কাছ থেকে সে এটি হাতিয়ে নিয়েছে?’ তিনি চাদরটি ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘দেখলেন তো কেন নিতে চাইনি?’ ওসাইর তখন সেই লোকদের কড়া ভাষায় শাসন করেন।<a href="/#_ftn11" name="_ftnref11">[11]</a></p>
<h2 data-path-to-node="24">হারম ইবনে হাইয়্যানের সাথে সাক্ষাৎ:</h2>
<p data-path-to-node="24">হারম ইবনে হাইয়্যান অনেক খুঁজে তাঁকে ফুরাত নদীর তীরে পেলেন। সালাম ও মুসাফাহার পর হারম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি আমার ও আমার পিতার নাম কীভাবে জানলেন?’ ওয়াইস (রহ.) বললেন, ‘মুমিনরা আল্লাহর রুহের মাধ্যমে একে অপরকে চিনতে পারে।’ হারম হাদিস শুনতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আমি বিচারক বা মুফতি হওয়ার দরজা খুলতে চাই না, আমি নিজস্ব ইবাদত নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চাই।’ এরপর তিনি সুরা দুখানের ৪০-৪২ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন এবং হারমকে বললেন, ‘তোমার পিতা মারা গেছেন, শীঘ্রই তুমিও মারা যাবে। নিজের মৃত্যুকে সর্বদা হৃদয়ে জাগ্রত রাখো।’ তিনি কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলেন এবং এরপর হারম তাঁকে আর কখনও পাননি।<a href="/#_ftn12" name="_ftnref12">[12]</a></p>
<h2 data-path-to-node="25">বাণী ও নসিহত:</h2>
<p data-path-to-node="25">হারম ইবনে হাইয়্যানকে তিনি তিনটি কালজয়ী উপদেশ দিয়েছিলেন:</p>
<p data-path-to-node="25">১. ঘুমানোর সময় মৃত্যুকে বালিশ বানিয়ে ঘুমান এবং তাকে সর্বদা চোখের সামনে রাখুন।</p>
<p data-path-to-node="25">২. ঘুম থেকে উঠে নিজের অন্তর ও নিয়ত সংশোধনের দোয়া করুন, কারণ এর চেয়ে কঠিন চিকিৎসা আর নেই।</p>
<p data-path-to-node="25">৩. পাপ কত ছোট তা দেখবেন না; বরং দেখুন কার নাফরমানি করছেন—তিনি কত মহান।<a href="/#_ftn13" name="_ftnref13">[13]</a></p>
<h2 data-path-to-node="26">ওফাত:</h2>
<p data-path-to-node="26">তাঁর ওফাত সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে সালামাহর বর্ণনা অনুযায়ী, ওমর (রা.)-এর যুগে আযারবাইজান অভিযান থেকে ফেরার পথে তিনি অসুস্থ হয়ে ইন্তেকাল করেন। অলৌকিকভাবে সেখানে আগে থেকেই খননকৃত কবর ও কাফন প্রস্তুত পাওয়া যায়। দাফনের পর সাহাবিরা কবরটি চিহ্নিত করতে ফিরে গিয়ে দেখেন সেখানে কোনো কবরের চিহ্ন নেই।<a href="/#_ftn14" name="_ftnref14">[14]</a> অন্যদিকে হিশাম আল-কালবীর মতে, তিনি আলী (রা.)-এর পক্ষে সিফফিনের যুদ্ধে লড়াই করতে করতে শহীদ হন।<a href="/#_ftn15" name="_ftnref15">[15]</a> ইমাম ইবনে জাওযী এই দ্বিতীয় মতটিকে অধিক বিশুদ্ধ বলেছেন।<a href="/#_ftn16" name="_ftnref16">[16]</a></p>
<p>&nbsp;</p>
<p><a href="/#_ftnref1" name="_ftn1"></a></p>
</div>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/bio/uways-al-qarani/">হজরত ওয়াইস আল-কারনি (রহ.)</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></content:encoded>
					
		
		
			</item>
		<item>
		<title>হজরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.)</title>
		<link>https://sufigraphy.com/bio/said-ibn-al-musayyib/</link>
		
		<dc:creator><![CDATA[hsmsohrab]]></dc:creator>
		<pubDate>Sun, 14 Sep 2025 10:48:50 +0000</pubDate>
				<guid isPermaLink="false">https://sufigraphy.com/bio/%e0%a6%b9%e0%a6%9c%e0%a6%b0%e0%a6%a4-%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%88%e0%a6%a6-%e0%a6%87%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a7%8d%e0%a6%af/</guid>

					<description><![CDATA[<p>হজরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) ছিলেন তাবেয়িদের শ্রেষ্ঠ ইমাম ও মদিনার সাত ফকিহর অন্যতম। সাহাবিদের কাছ থেকে ইলম অর্জন করে তিনি হাদিস, ফিকহ ও স্বপ্ন ব্যাখ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। চল্লিশ বছর জামাতে নামাজ আদায়, পঞ্চাশ বছর প্রথম কাতারে দাঁড়ানো এবং চল্লিশ বার হজ তাঁর ইবাদতের নিদর্শন। জালিম শাসকদের প্রতি অনমনীয়, খলিফার দাওয়াত ও রাজকীয় ভাতা প্রত্যাখ্যান করে দরিদ্র দ্বীনদার ছাত্রের সাথে কন্যার বিয়ে দেওয়ার মতো নজির স্থাপন করেন। ৯৪ হিজরিতে তাঁর ওফাত হয়।</p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/bio/said-ibn-al-musayyib/">হজরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.)</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>ইসলামের প্রথম শতকের জ্ঞানের অম্লান ধারা ও আধ্যাত্মিক সাধনার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন হজরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহমাতুল্লাহি আলাইহি)। তিনি তাবেয়িদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর জীবন ছিল অনন্য জ্ঞান, সততা, তাকওয়া ও দুনিয়াবিমুখতার এক মহাকাব্য। সাহাবিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার আলোকে তিনি ইসলামের বিভিন্ন শাখায় যেমন অবদান রেখেছেন, তেমনি আধ্যাত্মিকতার এক গভীর পথিকৃৎ হিসেবে নিজের অবস্থান স্থাপন করেছেন।</p>
<h2>নাম ও পরিচয়:</h2>
<p>তাঁর বংশধারা হলো সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ইবনে হাযন ইবনে আবি ওহাব ইবনে আমর ইবনে আইয ইবনে ইমরান ইবনে মাখযূম ইবনে ইয়াকাযাহ। তিনি একজন মহিমান্বিত ইমাম ও প্রসিদ্ধ আলেম। কুনিয়ত আবু মুহাম্মদ। কুরাইশ বংশোদ্ভূত এবং মাখজুম গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। তিনি ছিলেন মদিনাবাসীদের প্রধান আলেম এবং তাঁর সময়ে তিনি তাবেয়িদের সর্দার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন।</p>
<p>প্রসিদ্ধ মত অনুসারে হজরত ওমর (রাদিআল্লাহু আনহু)-এঁর খিলাফতের দুই বছর অতিবাহিত হওয়ার পর তাঁর জন্ম হয়। অর্থাৎ, ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দ। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় বলা হয়েছে ওমর (রাদিআল্লাহু আনহু)-এঁর খিলাফতের চার বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর মদিনা মুনাওয়ারাতেই তাঁর জন্ম হয়। <a href="/#_ftn1" name="_ftnref1">[1]</a></p>
<h2>সাহাবিদের সোহবতে ইলম অর্জন ও হাদিস বর্ণনা:</h2>
<p>ওয়াকিদী বর্ণনা করেন, আমাকে হিশাম ইবনে সাদ অবহিত করেছেন; তিনি বলেন, আমি যুহরীকে বলতে শুনেছি। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল— সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব কার কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন? তিনি উত্তরে বলেন, “তিনি জায়েদ ইবনে সাবিত (রাদিআল্লাহু আনহু)-এঁর কাছ থেকে ইলম গ্রহণ করেছেন।”সাথে তিনি সাদ, ইবনে আব্বাস ও ইবনে ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এঁর সাহচর্যে থেকেছেন। তিনি নবী ﷺ-এঁর স্ত্রীগণের কাছে থেকেও জ্ঞান অর্জন করেছেন। বিশেষ করে আয়েশা ও উম্মে সালামা (রাদিআল্লাহু আনহুমা)-এঁর নিকট থেকে। এমনকি তিনি উসমান, আলী, সুহাইব ও মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)-এঁর কাছ থেকেও হাদিস শুনেছেন।</p>
<p>তাঁর অধিকাংশ মুসনাদ (সংযুক্ত সনদযুক্ত) বর্ণনা এসেছে আবু হুরাইরা (রাদিআল্লাহু আনহু)-এঁর সূত্রে। আর এ কথাও বলা হয়েছে যে, “হজরত ওমর ও উসমান (রাদিআল্লাহু আনহুম) যেসব ফয়সালা প্রদান করেছেন, সে বিষয়ে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের চেয়ে অধিক জ্ঞানী আর কেউ নেই।”<a href="/#_ftn2" name="_ftnref2">[2]</a></p>
<p>এছাড়াও ইবনে হাজার আসকালানি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ‘তাহযিব আত-তাহযিব’ কিতাবে লিখেছেন— তিনি হজরত ওমর (রাদিআল্লাহু আনহু)-কে দেখেছেন এবং হজরত উসমান, হজরত আলী, যায়েদ ইবনে সাবিত, আবু মূসা আশআরী, সাদ, আয়িশা, আবু হুরাইরা, ইবনে আব্বাস, মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা এবং উম্মে সালামা (রাদিআল্লাহু আনহুম)দের কাছ থেকে হাদিস শুনেছেন; এছাড়া আরও অনেক সাহাবির কাছ থেকে তিনি ইলম গ্রহণ করেছেন। হজরত আলী, সাদ, উসমান, আবু মূসা, আয়িশা, উম্মে শরীক, ইবনে ওমর, আবু হুরাইরা, ইবনে আব্বাস, হাকিম ইবনে হিযাম, আবদুল্লাহ ইবনে আমর, তাঁর পিতা মুসাইয়্যিব এবং আবু সাঈদ (রাদিআল্লাহু আনহুম)—এঁদের থেকে বর্ণিত হাদিস সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম উভয় গ্রন্থেই স্থান পেয়েছে। <a href="/#_ftn3" name="_ftnref3">[3]</a></p>
<h2>ছাত্রবৃন্দ:</h2>
<p>তাঁর কাছ থেকে অসংখ্য মানুষ ইলম অর্জন ও হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— ইদরিস ইবনে সুবাইহ, উসামা ইবনে যায়েদ আল-লাইসী, ইসমাইল ইবনে উমাইয়া, বশীর, আবদুর রহমান ইবনে হারমালা, আবদুর রহমান ইবনে হুমাইদ ইবনে আবদুর রহমান, আবদুল করীম আল-জাজরী, আবদুল মাজিদ ইবনে সুহাইল, উবাইদুল্লাহ ইবনে সুলাইমান আল-আবদী, উসমান ইবনে হাকিম, আতাউল খুরাসানী, উকবা ইবনে হুরাইস, আলী ইবনে জুদ‘আন, আলী ইবনে নুফাইল আল-হাররানী, উমারা ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে তু’মা, আমর ইবনে শু‘আইব, আমর ইবনে দিনার, আমর ইবনে মুররা, আমর ইবনে মুসলিম আল-লাইসী, গাইলান ইবনে জারীর, কাসিম ইবনে আসিম, তাঁর পুত্র মুহাম্মদ ইবনে সাঈদ, কাতাদা, মুহাম্মদ ইবনে সাফওয়ান, মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে আবি লাবিবা, আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে আলী, মুহাম্মদ ইবনে আমর ইবনে আতা, যুহরী, ইবনুল মুনকাদির, মা‘বাদ ইবনে হুরমুয, মামার ইবনে আবি হাবিবা, মূসা ইবনে ওয়ারদান, মাইসারা আল-আশজাঈ, মাইমূন ইবনে মিহরান, আবু সুহাইল নাফি‘ ইবনে মালিক, আবু মা‘শার নাজীহ আস-সিনদী (যার বর্ণনা তিরমিযীতে রয়েছে), হাশিম ইবনে হাশিম আল-ওয়াক্কাসী, ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-আনসারী, ইয়াযিদ ইবনে কুসাইত, ইয়াযীদ ইবনে নু‘আইম ইবনে হাযযাল, ইয়াকুব ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আল-আশাজ্জ, ইউনুস ইবনে সাইফ, আবু জাফর আল-খাতমী এবং আবু কুররা আল-আসাদী প্রমুখ।<a href="/#_ftn4" name="_ftnref4">[4]</a></p>
<h2>জ্ঞানের প্রখরতা:</h2>
<p>তিনি ছিলেন তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীদের অন্যতম। হজরত কাতাদা, মাকহুল, যুহরী প্রমুখ এক বাক্যে স্বীকার করেছেন যে, “আমি (তাঁরা) সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের চেয়ে অধিক জ্ঞানী কাউকে দেখিনি।”</p>
<p>আলী ইবনুল মাদিনী (রহ.) বলেন, ‘তাবেয়িদের মধ্যে আমি ইবনুল মুসায়্যিবের চেয়ে অধিক বিস্তৃত জ্ঞানের অধিকারী কাউকে জানি না। আমার কাছে তিনি তাবেয়িদের মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন।’<a href="/#_ftn5" name="_ftnref5">[5]</a></p>
<h2>ইবাদত ও রিয়াজত:</h2>
<p>তিনি ছিলেন একজন মুখলিস ইবাদতগুজার। সর্বদা নামাজ, রোজা ও ইবাদতে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। আত্তাফ ইবনে খালিদ বর্ণনা করেন, তিনি আবু হারমালা থেকে, তিনি ইবনুল মুসায়্যিব থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, “চল্লিশ বছর ধরে আমার কোনো নামাজই জামাতে আদায় করা থেকে বাদ পড়েনি।”</p>
<p>সুফিয়ান আস-সাওরী বর্ণনা করেন, তিনি উসমান ইবনে হাকিম থেকে শুনেছেন, তিনি বলেছেন, আমি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে বলতে শুনেছি, “ত্রিশ বছর ধরে এমন কোনো সময় আসেনি, যখন মুয়াজ্জিন আজান দিয়েছে অথচ আমি মসজিদে উপস্থিত ছিলাম না।”</p>
<p>হাম্মাদ ইবনে জায়েদ বর্ণনা করেন, আমাদেরকে ইয়াযীদ ইবনে হাজিম জানিয়েছেন যে, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব নিয়মিতভাবে একটানা নফল রোজা রাখতেন।</p>
<p>আবদুর রহমান ইবনে হারমালা বলেন, আমি ইবনুল মুসায়্যিবকে বলতে শুনেছি, “আমি চল্লিশ বার হজ আদায় করেছি।”<a href="/#_ftn6" name="_ftnref6">[6]</a></p>
<p>তিনি আরও বর্ণনা করেন, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব একবার চোখের ব্যথায় আক্রান্ত হলেন। তাঁকে বলা হলো, ‘হে আবু মুহাম্মদ, আপনি যদি (মদিনার অদূরে) ‘আকিক’ উপত্যকায় যেতেন, তবে সেখানকার সবুজ প্রকৃতির দিকে তাকানো এবং বুনো নির্মল বাতাস আপনার চোখের জন্য উপকারী হতো।’ সাঈদ (রহ.) উত্তর দিলেন, ‘তাহলে এশা ও ফজরের জামাতে উপস্থিত হওয়ার ব্যাপারে আমি কী করব?’ (অর্থাৎ চোখের চিকিৎসার চেয়েও তাঁর কাছে মসজিদে জামাতে শরিক হওয়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল)।</p>
<p>কাতাদাহ (রহ.) থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব একদিন বললেন, ‘গত বিশ বছর ধরে আমি (নামাজের কাতারে) আমার সামনের কোনো মানুষের ঘাড় দেখিনি।’ (অর্থাৎ তিনি বিশ বছর ধরে সবসময় প্রথম কাতারে নামাজ পড়েছেন, ফলে তাঁর সামনে কেউ থাকত না)।</p>
<p>আবদুর রহমান ইবনে ইদ্রিস তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, ‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর এশার অজু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছেন (অর্থাৎ সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন)। তিনি বলতেন, ‘পঞ্চাশ বছর ধরে আমার কখনও প্রথম তাকবির (তাকবিরে উলা) ছুটেনি এবং পঞ্চাশ বছর ধরে আমি নামাজে কারও ঘাড় দেখিনি।’</p>
<p>ইয়াজিদ ইবনে আবি হাযেম থেকে বর্ণিত, ‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ‘সারদ’ রোজা রাখতেন (অর্থাৎ বছরের প্রায় প্রতিদিন রোজা রাখতেন, কেবল দুই ঈদ ও আইয়ামে তাশরিকের দিনগুলো ছাড়া)।’<a href="/#_ftn7" name="_ftnref7">[7]</a></p>
<p>জাফর ইবনে বুরকান, মায়মুন ইবনে মিহরান থেকে বর্ণনা করেন, আমি জানতে পেরেছি যে, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব টানা চল্লিশ বছর মসজিদে এমনভাবে কাটিয়েছেন যে, তিনি মসজিদে প্রবেশের সময় কখনো মুসল্লিদের নামাজ শেষ করে বের হয়ে আসতে দেখেননি (অর্থাৎ জামাত শুরু হওয়ার অনেক আগেই তিনি মসজিদে উপস্থিত থাকতেন)।<a href="/#_ftn8" name="_ftnref8">[8]</a></p>
<h2>জুহদ তথা দুনিয়াবিমুখতা:</h2>
<p>সুফিয়ান ইবনে উইয়াইনাহ থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই এই দুনিয়া অতি নীচ; আর এটি প্রত্যেক নীচ ব্যক্তির দিকেই বেশি ঝুঁকে থাকে। তবে দুনিয়ার চেয়েও বেশি নীচ হলো সেই ব্যক্তি, যে দুনিয়াকে অন্যায়ভাবে গ্রহণ করে, অসৎ উপায়ে অনুসন্ধান করে এবং ভুল পথে ব্যয় করে।’<a href="/#_ftn9" name="_ftnref9">[9]</a></p>
<h2>মদিনার ‘সাত ফুকাহা’র অন্যতম ও ফিকহের স্থপতি:</h2>
<p>হজরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) ছিলেন মদিনার বিখ্যাত ‘সাত ফুকাহায়ে কিরাম’ (الفقهاء السبعة)-এর অন্যতম। তাঁর ফিকহি জ্ঞান, গভীর প্রজ্ঞা এবং শরয়ি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিচক্ষণতা ছিল অনন্য। তাঁর ফাতোয়া ও ইজতিহাদ এতটাই নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য ছিল যে, পরবর্তীকালের মহান ইমামগণও, যেমন ইমাম মালেক (রহ.), তাঁর জ্ঞানের গভীরতার প্রশংসা করতেন এবং তাঁকে ফিকহি ধারার অন্যতম স্থপতি হিসেবে গণ্য করতেন। তাঁর ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামি আইনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।</p>
<p>হজরত মিস‘আর বর্ণনা করেন, তিনি সাঈদ ইবনে ইবরাহিম থেকে শুনেছেন যে, তিনি ইবনুল মুসায়্যিবকে বলতে শুনেছেন, “রসুলুল্লাহ ﷺ, আবু বকর কিংবা ওমর (রাদিআল্লাহু আনহুম)—তাঁরা যে ফায়সালা করেছেন, সে বিষয়ে আমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী আর কেউ নেই।”</p>
<p>উসামা ইবনে জায়েদ বর্ণনা করেন, তিনি নাফি থেকে বর্ণনা করেন যে, ইবনে ওমর (রাদিআল্লাহু আনহু) একবার সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের কথা উল্লেখ করে বলেন, “আল্লাহর কসম, তিনি নিঃসন্দেহে শীর্ষস্থানীয় মুফতিদের একজন।”</p>
<p>কুদামা ইবনে মুসা বলেন, সাহাবায়ে কেরাম জীবিত থাকাকালেই সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ফতোয়া দিতেন।</p>
<p>মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে হিব্বান বলেন, তাঁর যুগে ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.)। তাঁকে বলা হতো ‘ফকিহুল ফুকাহা’ তথা ‘ফকিহদের ফকিহ’।</p>
<p>ওয়াকিদি বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমাদেরকে সাওর ইবনে ইয়াযিদ জানিয়েছেন; তিনি মাকহুল থেকে বর্ণনা করেন যে, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ছিলেন আলেমদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আলেম।</p>
<p>আলী ইবনে হুসাইন (রহ.) বলেন, পূর্ববর্তী যুগের বর্ণিত আছারসমূহ (নবী-রসুলদের ঘটনা) সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী ছিলেন ইবনুল মুসায়্যিব এবং নিজস্ব ইজতিহাদ ও মতামতের ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন সর্বাধিক গভীর জ্ঞানের অধিকারী।</p>
<p>জাফর ইবনে বুরকান বলেন, আমাকে মাইমুন ইবনে মিহরান সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন, আমি যখন মদিনায় এলাম, তখন সেখানকার সর্বাধিক ফকিহ ব্যক্তির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। লোকেরা আমাকে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের দিকেই নির্দেশ করল। মাইমুন বলেন, আমি এ কথা দৃঢ়তার সাথেই বলছি, যদিও আমার সাক্ষাৎ হয়েছে আবু হুরাইরা ও ইবনে আব্বাস (রাদিআল্লাহু আনহুম)-এঁর সঙ্গেও।</p>
<p>ওমর ইবনে আল-ওয়ালিদ আশ-শান্নী বর্ণনা করেন, তিনি শিহাব ইবনে আব্বাদ আল-আসারী থেকে বর্ণনা করেন, আমি হজ আদায় করে মদিনায় এসেছিলাম। আমরা সেখানকার সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে লোকেরা বলল, ‘তিনি হলেন সাঈদ।’<a href="/#_ftn10" name="_ftnref10">[10]</a></p>
<h2>খলিফারাও বিচারকার্যে তাঁর দ্বারস্থ হতেন:</h2>
<p>মাআন ইবনে ঈসা, ইমাম মালিক (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ যখন মদিনার গভর্নর ছিলেন, তখন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে জিজ্ঞেস না করে কোনো ফয়সালা বা বিচারকার্য পরিচালনা করতেন না। একবার তিনি (মাসআলা জিজ্ঞাসা করার জন্য) এক ব্যক্তিকে তাঁর কাছে পাঠালেন। সেই ব্যক্তি ভুল করে তাঁকে ডেকে নিয়ে এলেন। সাঈদ (রহ.) দরবারে উপস্থিত হলে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, ‘দূত ভুল করেছে; আমি তো তাকে পাঠিয়েছিলাম আপনার মজলিসে গিয়ে মাসআলাটি জিজ্ঞাসা করে আসার জন্য (আপনাকে কষ্ট দিয়ে ডেকে আনার জন্য নয়)।’ ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বলতেন, ‘মদিনার এমন কোনো আলেম ছিলেন না যিনি নিজের ইলম নিয়ে আমার কাছে আসতেন না, তবে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের ইলম আমার কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো (অর্থাৎ তিনি কারও কাছে যেতেন না, বরং তাঁর কাছেই যেতে হতো)।’</p>
<p>সাল্লাম ইবনে মিসকীন ইমরান ইবনে আবদুল্লাহ আল-খুজায়ী থেকে বর্ণনা করেন, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব আমাকে আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। আমি আমার বংশ-পরিচয় দিলে তিনি বললেন, ‘তোমার পিতা মুয়াবিয়া (রা.)-এর খিলাফতকালে আমার মজলিসে বসতেন এবং আমাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেন।’ ইমরান বলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমার মনে হয় তাঁর (সাঈদের) কানে কোনো কিছু একবার প্রবেশ করলে তাঁর অন্তর তা চিরতরে গেঁথে নিত। আর আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে সাঈদ নিজের জীবনকে একটি মাছির চেয়েও তুচ্ছ মনে করতেন।’<a href="/#_ftn11" name="_ftnref11">[11]</a></p>
<h2>জালিম শাসকের প্রতি বদদোয়া:</h2>
<p>আফফান, হাম্মাদ ইবনে সালামাহ থেকে বর্ণনা করেন যে, আলী বিন জায়েদ সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে বললেন, ‘আপনার গোত্রের লোকেরা বলাবলি করে যে, আপনি নাকি এই কারণে হজ করতে যান না, আপনি মানত করেছেন কাবার দিকে তাকালেই ইবনে মারওয়ান (তৎকালীন জালিম শাসক)-এর বিরুদ্ধে বদদোয়া করবেন?’ সাঈদ (রহ.) উত্তরে বললেন, ‘না, আমি এমনটি করিনি। তবে আমি এমন কোনো নামাজ পড়ি না যেখানে তাদের (অত্যাচারী শাসকদের) বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি না। আর আমি বিশ বারেরও বেশি হজ ও ওমরাহ করেছি; অথচ আমার ওপর মাত্র একটি হজ ও একটি ওমরাহ ফরজ ছিল। আমি তোমার গোত্রের অনেককে দেখি যারা ঋণ করে হজ ও ওমরাহ করে, এরপর মারা যায়; কিন্তু তাদের ঋণ পরিশোধ হয় না। নফল হজ বা ওমরার চেয়ে একটি জুমার নামাজ আদায় করা আমার কাছে বেশি প্রিয়।’<a href="/#_ftn12" name="_ftnref12">[12]</a></p>
<h2>রাজকীয় ভাতা বর্জন ও আত্মসম্মান:</h2>
<p>সাল্লাম ইবনে মিসকীন ইমরান ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, সরকারি বায়তুল মালে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের প্রাপ্য ভাতার পরিমাণ জমে একত্রিশ হাজার (দিরহাম বা দিনার) ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তাঁকে বারবার সেই অর্থ গ্রহণ করার জন্য ডাকা হতো, কিন্তু তিনি তা নিতে অস্বীকার করতেন। তিনি বলতেন, ‘আমার এই অর্থের কোনো প্রয়োজন নেই, যতক্ষণ না আল্লাহ আমার এবং বনী মারওয়ান (তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী)-এর মাঝে ফয়সালা করেন।’<a href="/#_ftn13" name="_ftnref13">[13]</a></p>
<h2>হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে শাসানো:</h2>
<p>হাম্মাদ ইবনে সালামাহ আলী বিন জায়েদ থেকে বর্ণনা করেন, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘ব্যাপার কী, (অত্যাচারী শাসক) হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কেন আপনার কাছে লোক পাঠায় না, আপনাকে কোনো বিরক্ত করে না কিংবা কষ্ট দেয় না?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি ঠিক জানি না। তবে একবার সে (হাজ্জাজ) তার পিতার সাথে মসজিদে প্রবেশ করে এমনভাবে নামাজ পড়ছিল যে, রুকু এবং সেজদাগুলো ঠিকমতো পূর্ণ করছিল না। তখন আমি এক মুষ্টি কঙ্কর নিয়ে তাকে ছুড়ে মারলাম (সতর্ক করার জন্য)।’ ধারণা করা হয়, এই ঘটনার পর হাজ্জাজ বলেছিল, ‘এরপর থেকে আমি সবসময় ভালোভাবে নামাজ আদায় করি।’<a href="/#_ftn14" name="_ftnref14">[14]</a></p>
<h2>খলিফার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান:</h2>
<p>ইবনে সা’দ এর ‘তাবাকাত’ গ্রন্থে মাইমুন ইবনে মিহরান থেকে বর্ণিত, একবার খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান মদিনায় এলেন। দুপুরে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় তিনি জেগে উঠলেন এবং তাঁর দ্বাররক্ষীকে বললেন, ‘দেখো তো, মসজিদে আমাদের সাথে গল্প করার মতো (মুহদ্দিস বা গল্পকার) কেউ আছে কি না?’ দ্বাররক্ষী বের হয়ে দেখল সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব নিজের জ্ঞানগর্ভ মজলিসে বসে আছেন। সে এমন এক জায়গায় দাঁড়াল যেখান থেকে সাঈদ (রহ.) তাকে দেখতে পাচ্ছিলেন। এরপর সে হাতের ইশারায় তাঁকে ডাকল। ডেকে বাদশার কাছে চলে যেতে লাগল। কিন্তু সাঈদ জায়গা থেকে নড়লেন না। কিছুদূর গিয়ে দ্বাররক্ষী দেখল যে, সাঈদ আসছেন না। সে ভাবল, ‘মনে হয় বৃদ্ধ লোকটি খেয়াল করেননি।’ সে আরও কাছে গিয়ে চোখে ইশারা করল এবং বলল, ‘আপনি কি দেখছেন না যে, আমি আপনাকে ইশারা করছি?’ সাঈদ (রহ.) শান্তভাবে বললেন, ‘তোমার প্রয়োজন কী?’ দ্বাররক্ষী বলল, ‘আমিরুল মুমিনীনের ডাকে সাড়া দিন।’ সাঈদ (রহ.) পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘তিনি কি আমার কাছেই তোমাকে পাঠিয়েছেন?’ সে বলল, ‘না, তবে তিনি বলেছেন আমাদের সাথে কথা বলতে পারে এমন কাউকে দেখতে। আমি আপনার চেয়ে যোগ্য কাউকে দেখলাম না।’ সাঈদ (রহ.) দৃঢ়ভাবে বললেন, ‘যাও, তাঁকে গিয়ে জানাও যে, আমি তাঁর গল্পকারদের অন্তর্ভুক্ত নই।’ দ্বাররক্ষী বেরিয়ে গেল এবং  বিড়বিড় করে বলতে লাগল, ‘এই বুড়োকে তো পাগল মনে হচ্ছে!’ সে গিয়ে খলিফাকে সব জানালে আবদুল মালিক বিন মারওয়ান বললেন, ‘উনি হলেন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, ওনাকে তাঁর অবস্থায় ছেড়ে দাও (বিরক্ত করো না)।’<a href="/#_ftn15" name="_ftnref15">[15]</a></p>
<h2>খলিফা আবদুল মালিক ও ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের সাথে সাঈদের (রহ.) আচরণ:</h2>
<p><strong>খলিফা </strong><strong>আবদুল </strong><strong>মালিকের </strong><strong>ডাক </strong><strong>প্রত্যাখ্যান:</strong> ইমরান ইবনে আবদুল্লাহ আল-খুজায়ী বর্ণনা করেন, খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান হজের উদ্দেশ্যে বের হয়ে মদিনায় এলেন। মসজিদের দরজায় দাঁড়িয়ে তিনি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের কাছে একজন দূত পাঠালেন। খলিফা নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তাঁকে শুধু দাওয়াত দেওয়া হয়, কিন্তু জোর করে যেন আনার চেষ্টা করা না হয়। দূত গিয়ে বলল, ‘আমিরুল মুমিনীনের ডাকে সাড়া দিন, তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে আপনার সাথে কথা বলতে চাইছেন।’ সাঈদ (রহ.) উত্তর দিলেন, ‘আমিরুল মুমিনীনের আমার কাছে কোনো প্রয়োজন নেই, আর আমারও তাঁর কাছে কোনো প্রয়োজন নেই। আর আমার কাছে তাঁর যে চাওয়া (অর্থাৎ তাঁর কাছে গিয়ে দেখা করা), তা পূরণ হওয়ার নয়।’ দূত ফিরে গিয়ে খলিফাকে জানালে খলিফা বললেন, ‘আবার যাও এবং তাঁকে বলো, আমি শুধু কথা বলতে চাই; তবে তাঁকে জোর করবে না।’ দূত আবারও গিয়ে তাঁকে ডাকল। সাঈদ (রহ.) আগের মতোই উত্তর দিলেন। তখন দূত রেগে গিয়ে বলল, ‘খলিফা যদি আগে থেকে আপনার ব্যাপারে (নরম হওয়ার) নির্দেশ না দিতেন, তবে আমি তাঁর কাছে আপনার বিচ্ছিন্ন মাথা নিয়ে যেতাম! আমিরুল মুমিনীন আপনাকে ডাকছেন আর আপনি এমন উত্তর দিচ্ছেন!’ সাঈদ (রহ.) অবিচলভাবে বললেন, ‘তিনি যদি আমার সাথে ভালো কিছু করতে চান তবে সেটা তোমার জন্যই তোলা থাক। আর যদি তিনি অন্য কিছু (শাস্তি) দিতে চান, তবে তিনি তাঁর ফয়সালা কার্যকর না করা পর্যন্ত আমি আমার বসার ভঙ্গি থেকে নড়ব না।’ খলিফা সব শুনে বললেন, ‘আল্লাহ আবু মুহাম্মদকে (সাঈদ) রহম করুন; তিনি আপসহীনতা ছাড়া আর কিছুই জানেন না।’</p>
<p><strong>খলিফা </strong><strong>ওয়ালিদের </strong><strong>সাথে </strong><strong>ঘটনা:</strong> খলিফা আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে ওয়ালিদ যখন খলিফা হলেন, তিনি মদিনায় এসে মসজিদে প্রবেশ করলেন। তিনি দেখলেন এক বৃদ্ধকে ঘিরে মানুষের ভিড়। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘উনি কে?’ লোকেরা বলল, ‘উনি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব।’ ওয়ালিদ বসার পর সাঈদের কাছে দূত পাঠালেন। দূত গিয়ে বলল, ‘আমিরুল মুমিনীনের ডাকে সাড়া দিন।’ সাঈদ (রহ.) কৌশলে উত্তর দিলেন, ‘হয়তো তুমি নাম ভুল করেছ, অথবা তিনি তোমাকে অন্য কারও কাছে পাঠিয়েছেন।’ দূত ফিরে গিয়ে খলিফাকে সব বললে ওয়ালিদ অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন এবং তাঁর ক্ষতি করার ইচ্ছা করলেন। তখন উপস্থিত সুধীজন খলিফাকে বুঝিয়ে বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, তিনি মদিনার শ্রেষ্ঠ ফকিহ, কুরাইশদের মুরব্বি এবং আপনার পিতার বন্ধু। আপনার পূর্বের কোনো শাসকই তাঁকে নিজের দরবারে নিতে সক্ষম হননি।’ লোকেরা অনবরত তাঁকে বোঝাতে থাকলে এক পর্যায়ে খলিফা তাঁর ক্ষোভ দমন করলেন এবং তাঁকে ছেড়ে দিলেন।</p>
<p>সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের অন্যতম সঙ্গী ইমরান ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমি তাঁর স্বভাবে কখনো নমনীয়তা (শাসকদের প্রতি আনুগত্যে) দেখিনি।’</p>
<p>ইমাম আয-যাহাবী বলেন, ‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের অন্তরে বনী উমাইয়াদের প্রতি এবং তাদের মন্দ শাসনব্যবস্থার কারণে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও ঘৃণা ছিল। এই কারণেই তিনি কখনোই তাদের দেওয়া উপহার বা সরকারি ভাতা গ্রহণ করতেন না।’ সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের নীতিতে অটল ছিলেন।<a href="/#_ftn16" name="_ftnref16">[16]</a></p>
<h2>হাররার যুদ্ধের সময়ে রসুলুল্লাহ ﷺ এঁর রওজা মুবারকে তাঁর অবস্থান ও সেখান থেকে আজানের ধ্বনি শ্রবণ:</h2>
<p>ইবনে সা’দ তাঁর গ্রন্থে আব্দুল হামিদ ইবনে সুলাইমান ও আবু হাযিমের সূত্রে বর্ণনা করেন, আমি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে বলতে শুনেছি, ‘হাররার যুদ্ধের সেই কঠিন রাতগুলোতে মসজিদে নববীতে আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না। সিরিয়ার সৈন্যরা (ইয়াজিদের বাহিনী) দলে দলে মসজিদে প্রবেশ করত আর আমাকে দেখে বলত, ‘দেখো, এই পাগলটাকে দেখো!’ তখন নামাজের ওয়াক্ত হলেই আমি নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এঁর রওজা মোবারক থেকে আজানের শব্দ শুনতে পেতাম। এরপর আমি সামনে গিয়ে ইকামত দিতাম ও নামাজ পড়তাম। অথচ সেই সময় মসজিদে আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না।’</p>
<p>ওয়াকিদী তাঁর সূত্রে সাঈদের পুত্র মুহাম্মদ বিন সাঈদ থেকে বর্ণনা করেন, ‘হাররার যুদ্ধের দিনগুলোতে সাঈদ (রহ.) মসজিদেই অবস্থান করতেন, বের হতেন না। তিনি তাদের সাথে জুমআ আদায় করতেন এবং রাতে বের হতেন। সাঈদ (রহ.) বলেন, ‘যখনই নামাজের ওয়াক্ত হতো, আমি রওজা মোবারকের দিক থেকে আজানের শব্দ শুনতে পেতাম। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত এভাবেই চলছিল।’<a href="/#_ftn17" name="_ftnref17">[17]</a></p>
<p>(হাররার যুদ্ধ (হিজরী ৬৩): এটি ছিল উমাইয়া খলিফা ইয়াজিদের বাহিনী এবং মদিনাবাসীদের মধ্যে সংঘটিত একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এই সময় মদিনা এবং মসজিদে নববীর পবিত্রতা চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছিল। অধিকাংশ মানুষ প্রাণভয়ে পালিয়ে গেলেও সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) মদিনা এবং মসজিদে নববীর মায়া ত্যাগ করেননি।)</p>
<h2>জালিম শাসকের দরবারে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.)-এঁর অনমনীয়তা:</h2>
<p>ইমরান ইবনে আবদুল্লাহ আল-খুজায়ি বলেন, আবদুল মালিকের পর তাঁর দুই ছেলে ওয়ালিদ ও সুলাইমানের জন্য (একই সাথে) সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে বায়াত নিতে ডাকা হলো। তিনি বললেন, যতদিন আমি বেঁচে থাকব, ততদিন আমি দুই ব্যক্তির হাতে (একসাথে) বায়াত নেব না।’ তাঁকে পরামর্শ দেওয়া হলো, ‘আপনি (দরবারে) এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করুন এবং অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান (যাতে লোকে মনে করে আপনি বায়াত নিয়েছেন)।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আমার এই কাজ দেখে যেন কেউ বিভ্রান্ত হয়ে আমাকে অনুসরণ না করে (আমি লোক দেখানো কাজ করব না)।’ এরপর তাঁকে একশত বেত্রাঘাত করা হলো এবং পশমের তৈরি মোটা কম্বল সদৃশ পোশাক (মুসুহ) পরানো হলো।<a href="/#_ftn18" name="_ftnref18">[18]</a></p>
<h2>এক দরিদ্র ছাত্রের সাথে কন্যার বিবাহ:</h2>
<p>কাসীর ইবনে মুত্তালিব ইবনে আবি ওয়াদায়া থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের মজলিসে বসতাম। বেশ কয়েকদিন অনুপস্থিত থাকার পর যখন আমি তাঁর কাছে আসলাম, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কোথায় ছিলে?’ আমি বললাম, ‘আমার স্ত্রী মারা গিয়েছেন, তাই তাঁর কাজে ব্যস্ত ছিলাম।’ তিনি বললেন, ‘আমাদের আগে জানাওনি কেন? জানালে আমরা জানাযায় শরিক হতাম।’ অতঃপর আমি যখন উঠে দাঁড়াতে চাইলাম, তিনি বললেন, ‘তুমি কি নতুন কোনো বিবাহের কথা ভেবেছ?’ আমি বললাম, ‘আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন, আমাকে কে মেয়ে বিয়ে দেবে? আমার কাছে তো দুই বা তিন দিরহাম ছাড়া আর কিছুই নেই।’ তিনি বললেন, ‘আমি তোমাকে মেয়ে বিয়ে দেব।’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘আপনি সত্যিই তা করবেন?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ অতঃপর তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরুদ পাঠ করলেন এবং মাত্র দুই বা তিন দিরহাম মহরের বিনিময়ে তাঁর কন্যার সাথে আমার বিবাহ সম্পন্ন করলেন।</p>
<p>আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে বাড়ি ফিরলাম এবং চিন্তা করতে লাগলাম, সংসারের নিত্যপণ্য কেনার জন্য কার কাছ থেকে ধার নেওয়া যায়। আমি তখন রোজা অবস্থায় ছিলাম। মাগরিবের নামাজ পড়ে বাড়িতে এসে ইফতারের জন্য রুটি আর তেল সামনে নিয়েছি, ঠিক তখনই দরজায় করাঘাত হলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে?’ উত্তর এলো, ‘সাঈদ’। আমি সাঈদ নামের পরিচিত সবার কথা ভাবলাম, কিন্তু সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের কথা কল্পনাও করিনি। কারণ, গত চল্লিশ বছর ধরে তাঁকে তাঁর ঘর আর মসজিদ ছাড়া কোথাও দেখা যায়নি। আমি গিয়ে দরজা খুলে দেখি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব দাঁড়িয়ে! আমি ভাবলাম তিনি হয়তো মত পরিবর্তন করেছেন। আমি বললাম, ‘হে আবু মুহাম্মদ, আপনি কাউকে পাঠিয়ে দিলেই তো আমি আপনার কাছে হাজির হতাম।’ তিনি বললেন, ‘না, আজ তোমার কাছে আসাটাই উত্তম।’ আমি বললাম, ‘আমার জন্য আপনার কী আদেশ?’ তিনি বললেন, ‘তুমি একজন একা মানুষ ছিলে, আজ বিয়ে করেছ। আমার এটা ভালো লাগছে না যে তুমি আজ রাতটি একা কাটাও। এই যে তোমার স্ত্রী!’ দেখলাম তাঁর পেছনে পূর্ণ উচ্চতার একজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি তাঁর হাত ধরে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা টেনে চলে গেলেন। লজ্জায় মেয়েটি সেখানেই বসে গেল।</p>
<p>আমি ঘরের দরজা ভালো করে বন্ধ করলাম। তারপর তেলের বাতিটি রুটি ও তেলের পাত্র থেকে সরিয়ে ছায়ায় রাখলাম যেন সে আমার দরিদ্রতার দস্তরখান দেখতে না পায়। এরপর ছাদে উঠে প্রতিবেশীদের ডাকলাম। তারা এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে?’ আমি বললাম, ‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব আজ আমার সাথে তাঁর কন্যার বিবাহ দিয়েছেন এবং হঠাৎ করে তাঁকে আমার ঘরে দিয়ে গেছেন।’ তারা অবাক হয়ে বলল, ‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব তাঁর মেয়েকে তোমার সাথে বিয়ে দিয়েছেন?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, তিনি ঘরেই আছেন।’ তারা ভেতরে গেল।</p>
<p>খবর পেয়ে আমার মা-ও আসলেন। মা আমাকে বললেন, ‘আমি একে সাজিয়ে গুছিয়ে দেওয়ার আগে যদি তুমি একে স্পর্শ করো, তবে তোমার সাথে দেখা করা আমার জন্য হারাম।’ তিনদিন পর আমি তাঁর কাছে গেলাম। দেখলাম তিনি তৎকালীন সেরা সুন্দরী, আল্লাহর কিতাবের হাফেজ, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ এবং স্বামীর হক সম্পর্কে সবচেয়ে সচেতন নারী।’</p>
<p>আবদুল্লাহ ইবনে সুলাইমান থেকে বর্ণিত, খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান তাঁর পুত্রের (যুবরাজ ওয়ালীদের) জন্য সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের কন্যার বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সাঈদ তা প্রত্যাখ্যান করেন। এ কারণে আব্দুল মালিক ক্ষুব্ধ হয়ে এক কনকনে শীতের দিনে তাকে একশ চাবুক মারেন, মাথায় ঠান্ডা পানি ঢালেন এবং পশমের মোটা জুব্বা পরিয়ে রাখেন। (অর্থাৎ তিনি রাজপ্রাসাদের বিলাসিতার চেয়ে একজন দরিদ্র দ্বীনদার ছাত্রকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন)।<a href="/#_ftn19" name="_ftnref19">[19]</a></p>
<h2>স্বপ্ন ব্যাখ্যায় তাঁর পারদর্শিতা:</h2>
<p>আল-ওয়াকিদি বলেন, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব ছিলেন সমসাময়িক মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো স্বপ্ন-ব্যাখ্যাকারী। তিনি এই জ্ঞান অর্জন করেছিলেন আসমা বিনতে আবি বকর (রা.)-এঁর কাছ থেকে, আর আসমা (রা.) তা শিখেছিলেন তাঁর পিতা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এঁর কাছ থেকে। এরপর ওয়াকিদি বেশ কিছু স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেন, যার মধ্যে কয়েকটি হলো—</p>
<p>১. ওমর ইবনে হাবিব ইবনে কুলাইয় বলেন, আমি একদিন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের কাছে বসে ছিলাম। তখন আমার দিনকাল খুব কষ্টে কাটছিল এবং ঋণের বোঝায় আমি জর্জরিত ছিলাম। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম যেন আমি খলিফা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানকে ধরে মাটিতে আছাড় দিলাম এবং তাঁকে উপুড় করে শুইয়ে তাঁর পিঠে চারটি খুঁটি গেড়ে দিলাম।’ সাঈদ (রহ.) বললেন, ‘তুমি নিজে এই স্বপ্ন দেখোনি।’ সে বলল, ‘জি হ্যাঁ, আমিই দেখেছি।’ সাঈদ (রহ.) বললেন, ‘তুমি সত্যি কথা না বলা পর্যন্ত আমি এর ব্যাখ্যা দেব না।’ তখন লোকটি স্বীকার করল, ‘আসলে ইবনে যুবায়ের এই স্বপ্নটি দেখেছেন এবং তিনি আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন।’ সাঈদ (রহ.) তখন বললেন, ‘যদি তাঁর এই স্বপ্ন সত্য হয়, তবে আবদুল মালিক তাঁকে (ইবনে যুবায়েরকে) হত্যা করবেন এবং আবদুল মালিকের বংশ থেকে এমন চারজন জন্ম নেবেন যাঁরা প্রত্যেকেই খলিফা হবেন।’ বর্ণনাকারী ওমর ইবনে হাবিব বলেন, (সাঈদের এই ব্যাখ্যা শুনে) আমি সিরিয়ায় আবদুল মালিকের কাছে গেলাম এবং তাঁকে এই স্বপ্নের কথা জানালাম। তিনি এতে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং সাঈদের অবস্থা ও তাঁর সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। আমি তাঁকে সব জানালাম। এরপর খলিফা আমার সমস্ত ঋণ পরিশোধের নির্দেশ দিলেন এবং তাঁর কাছ থেকে আমি অনেক ধন-সম্পদ ও কল্যাণ লাভ করলাম।</p>
<p>২. দাঁত পড়ে যাওয়ার স্বপ্ন: শারীক ইবনে আবি নামির বলেন, আমি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে বললাম, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম যেন আমার দাঁতগুলো আমার হাতে পড়ে গেল, আর আমি সেগুলো দাফন করলাম।’ তিনি বললেন, ‘যদি তোমার স্বপ্ন সত্য হয়, তবে তোমার সমবয়সী বা তোমার পরিবারের অনেককে তুমি নিজের হাতে দাফন করবে।’ (অর্থাৎ নিজের দাঁত পড়ে যাওয়া পরিজন বিয়োগের সংকেত)।</p>
<p>৩. নিজ হাতে প্রস্রাব করার স্বপ্ন: মুসলিম আল-হান্নাত বলেন, এক ব্যক্তি ইবনুল মুসায়্যিবকে বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি নিজের হাতের ওপর প্রস্রাব করছি।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহকে ভয় করো; তোমার স্ত্রী সম্ভবত তোমার মাহরাম (রক্তের সম্পর্কের বা নিষিদ্ধ কেউ)।’ পরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, ওই ব্যক্তি আর তার স্ত্রীর মধ্যে দুগ্ধ-সম্পর্ক (রেযায়ী ভাই-বোন) রয়েছে।</p>
<p>৪. জয়তুন গাছের মূলে প্রস্রাব: আরেকজন এসে বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম যেন আমি একটি জয়তুন গাছের গোড়ায় প্রস্রাব করছি।’ তিনি বললেন, ‘তোমার স্ত্রী তোমার নিকটাত্মীয় (যাঁকে বিয়ে করা জায়েজ নেই)।’ পরে যাচাই করে দেখা গেল তা-ই সত্য।</p>
<p>৫. মিনারের ওপর কবুতর: এক ব্যক্তি তাঁকে বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম একটি কবুতর মিনারের ওপর বসেছে।’ তিনি বললেন, ‘হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ আবদুল্লাহ ইবনে জাফরের কন্যাকে বিয়ে করবে।’ (পরবর্তীতে তা-ই ঘটেছিল)।</p>
<p>৬. শিকল ও রোদ-ছায়ার স্বপ্ন: সাঈদ (রহ.) বলতেন, ‘স্বপ্নে শিকল বা বেড়ি দেখা দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার লক্ষণ।’ এক ব্যক্তি বলল, ‘হে আবু মুহাম্মদ, আমি স্বপ্নে দেখলাম যে আমি ছায়ায় বসেছিলাম, এরপর সেখান থেকে উঠে রোদে গিয়ে বসলাম।’ তিনি বললেন, যদি তোমার স্বপ্ন সত্য হয়, তবে তুমি ইসলাম ত্যাগ করে কুফরিতে লিপ্ত হবে।’ লোকটি তখন বলল, ‘আমি এও দেখেছি যে, আমাকে জোর করে বের করে রোদে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং আমি সেখানে বসেছি।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে তোমাকে কুফরির ওপর বাধ্য করা হবে।’ পরবর্তীতে দেখা গেল, লোকটি বন্দি হয়েছিল এবং তাকে কুফরি করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এরপর সে পুনরায় ইসলামে ফিরে আসে এবং মদিনায় নিজের এই স্বপ্নের কথা বর্ণনা করত।</p>
<p>৭. আগুনের মধ্য দিয়ে হাঁটার স্বপ্ন: উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে সায়েব থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি ইবনুল মুসায়্যিবকে বলল যে, সে স্বপ্নে দেখেছে যেন সে আগুনের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সাঈদ (রহ.) বললেন, ‘তুমি সমুদ্রে ভ্রমণ না করা পর্যন্ত এবং নিহত হওয়ার মাধ্যমে মৃত্যু বরণ না করা পর্যন্ত মরবে না।’ পরবর্তীতে সেই ব্যক্তি সমুদ্র যাত্রা করেছিল এবং সেখানে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এসেছিল। পরিশেষে সে ‘কুদাইদ’-এর যুদ্ধের দিন নিহত হয়।</p>
<p>৮. হজরত হাসান (রাদ্বিআল্লাহু আনহু)-এঁর কপালে সুরা ইখলাস: ইমরান ইবনে আবদুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (নবী দৌহিত্র) হাসান ইবনে আলী (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) স্বপ্নে দেখলেন, যেন তাঁর দুই চোখের মাঝখানে (কপালে) লেখা রয়েছে ‘কুল হুয়াল্লাহু আহাদ’ (সুরা ইখলাস)। এই স্বপ্নে তিনি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তাঁরা যখন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের কাছে এই স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলেন, তিনি বললেন, ‘যদি তাঁর এই স্বপ্ন সত্য হয়, তবে তাঁর হায়াত আর খুব সামান্যই বাকি আছে।’ এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই হাসান (রাদ্বিআল্লাহু আনহু) শাহাদাত বরণ করেন।</p>
<p><strong>স্বপ্ন </strong><strong>কার্যকর </strong><strong>হওয়ার </strong><strong>সময়কাল:</strong></p>
<p>সালেহ ইবনে খাওওয়াত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, স্বপ্নের শেষ সময়কাল (বা এর ব্যাখ্যা বাস্তবায়িত হওয়ার সর্বোচ্চ মেয়াদ) হলো চল্লিশ বছর।’ (অর্থাৎ কোনো স্বপ্নের ফল প্রকাশ পেতে চল্লিশ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে)।<a href="/#_ftn20" name="_ftnref20">[20]</a></p>
<h2>সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.)-এর পোশাক-পরিচ্ছদ:</h2>
<p>ইবনে সাদ ‘তাবাকাত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, উবাইদ ইবনে নিসতাস বলেন, ‘আমি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে কালো রঙের পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় দেখেছি; পাগড়ির শিমলা বা বাড়তি অংশটি তিনি তাঁর পিঠের দিকে ঝুলিয়ে রাখতেন। এছাড়া আমি তাঁকে লুঙ্গি, চাদর এবং মোজা পরিহিত অবস্থায়ও দেখেছি।’</p>
<p>মুহাম্মদ ইবনে হিলাল বর্ণনা করেন, তিনি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় দেখেছেন। তাঁর পাগড়ির নিচে একটি সুন্দর টুপি থাকত এবং পাগড়িটি ছিল সাদা রঙের, যাতে লাল রঙের নকশা ছিল। পাগড়ির বাড়তি অংশটি তিনি পেছনের দিকে এক বিঘত পরিমাণ ঝুলিয়ে রাখতেন।<a href="/#_ftn21" name="_ftnref21">[21]</a></p>
<h2>প্রকৃত ইবাদতের সংজ্ঞা:</h2>
<p>বকর বিন খুনাইস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে একদল লোককে (অবিরাম) নামাজ পড়তে ও ইবাদত করতে দেখে বললাম, ‘হে আবু মুহাম্মদ, আপনি কি এই লোকদের সাথে ইবাদতে শরিক হবেন না?’ তিনি আমাকে বললেন, ‘হে ভাতিজা, এটিই (আসল) ইবাদত নয়।’ আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তবে প্রকৃত ইবাদত কী, হে আবু মুহাম্মদ?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘প্রকৃত ইবাদত হলো আল্লাহর কুদরত ও নির্দেশ সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করা (তাফাক্কুর), আল্লাহর হারামকৃত বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকা (ওয়ারা) এবং আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অর্পিত ফরজ কাজগুলো যথাযথভাবে আদায় করা।’<a href="/#_ftn22" name="_ftnref22">[22]</a></p>
<h2>বাণী ও নসিহত:</h2>
<p>১. ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ, হজরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.)-কে বলতে শুনেছেন, ‘ওই ব্যক্তির মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, যে বৈধ পথে সম্পদ উপার্জনের ইচ্ছা রাখে না; যার মাধ্যমে সে মানুষের পাওনা (হক) আদায় করবে এবং মানুষের কাছে হাত পাতা থেকে নিজের চেহারাকে রক্ষা করবে (অর্থাৎ স্বাবলম্বী হবে)।’<a href="/#_ftn23" name="_ftnref23">[23]</a></p>
<p>২. সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) বলতেন, ‘বান্দা আল্লাহর আনুগত্যের মতো অন্য কোনো কিছু দিয়ে নিজেকে এতটা সম্মানিত করতে পারে না। আবার আল্লাহর অবাধ্যতার মতো অন্য কোনো কিছু দিয়ে নিজেকে এতটা লাঞ্ছিতও করতে পারে না। আর একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য হিসেবে এটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার শত্রুকে আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত দেখতে পায়।’</p>
<p>৩. আলী ইবনে যায়েদ থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) বলতেন, ‘আমি আশি বছর বয়সে উপনীত হয়েছি, কিন্তু আমার কাছে নারীদের (ফিতনার) চেয়ে ভয়ের আর কিছু নেই।’ বর্ণনাকারী আরও উল্লেখ করেন যে, তখন তাঁর দৃষ্টিশক্তি প্রায় চলে গিয়েছিল। এমনকি চুরাশি বছর বয়সে, যখন তিনি এক চোখে দেখতে পেতেন না এবং অন্য চোখেও খুব ঝাপসা দেখতেন, তখনও তিনি বলতেন, ‘শয়তান কোনো বিষয়ে নিরাশ হলে সে নারীদের মাধ্যমেই প্ররোচনা দিতে আসে; তাই নারীদের ফিতনাই আমার কাছে সবচেয়ে আশঙ্কার।’</p>
<p>৪. উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবকে বলতে শুনেছেন, ‘আল্লাহর কুদরতি হাত তাঁর বান্দাদের ওপর। যে ব্যক্তি অহংকারবশত নিজেকে বড়ো মনে করে, আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করেন। আর যে আল্লাহর জন্য নিজেকে ছোটো (বিনয়ী) করে, আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেন। মানুষ আল্লাহর ছায়ার নিচেই তাদের আমলসমূহ করে থাকে; যখন আল্লাহ কোনো বান্দাকে অপমানিত করতে চান, তখন তাকে তাঁর নিরাপত্তা ও ছায়া থেকে বের করে দেন, ফলে মানুষের সামনে তার দোষ-ত্রুটি ও গোপন লজ্জা প্রকাশ হয়ে পড়ে।’</p>
<p>৫. ইব্রাহিম ইবনে আদহাম (রহ.) সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ‘তোমরা জালিমদের সহযোগীদের দিকে (শ্রদ্ধার সাথে) চোখ ভরে তাকাবে না; বরং অন্তর থেকে তাদের ঘৃণা ও অস্বীকারের সাথেই তাকাবে। অন্যথায় তোমাদের নেক আমলগুলো বরবাদ হয়ে যেতে পারে।’</p>
<p>৬. সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর মাধ্যমে অমুখাপেক্ষী বা অভাবমুক্ত হয়, মানুষ তার প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে।’ (অর্থাৎ যে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করে, আল্লাহ মানুষের হৃদয়ে তার প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করে দেন)।<a href="/#_ftn24" name="_ftnref24">[24]</a></p>
<h2>সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.)-এর মৃত্যুকালীন অবস্থা:</h2>
<p>আবদুর রহমান ইবনে হারমালা বলেন, ‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। আমি তাঁর কাছে গেলাম। তিনি শুয়ে শুয়ে ইশারার মাধ্যমে জোহরের নামাজ আদায় করছিলেন। আমি তাঁকে নামাজে ‘সুরা আশ-শামস’ তিলাওয়াত করতে শুনলাম।’</p>
<p>জানাজা ও দাফন নিয়ে তাঁর অসিয়ত: ইবনে হারমালা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একবার আমি ইবনুল মুসায়্যিবের সাথে একটি জানাজায় ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি বলল, ‘মৃতের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো।’ সাঈদ (রহ.) বললেন, ‘এই কবিতা পাঠকারী কী বলছে? আমি তো আমার পরিবারকে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছি যেন আমার (জানাজার) সাথে এমন কোনো কবিতা পাঠকারী বা উচ্চস্বরে ঘোষণাকারী না থাকে। তারা যেন এও না বলে যে, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব মারা গেছেন। বরং যিনি আমাকে আমার রবের কাছে নিয়ে যাবেন, তিনিই আমার জন্য যথেষ্ট। তারা যেন আমার সাথে কোনো আগরবাতি বা ধূপদানি নিয়ে না হাঁটে; কারণ আমি যদি নেককার হই, তবে আল্লাহর কাছে যা আছে তা তাদের সুগন্ধির চেয়েও অনেক বেশি উত্তম।’</p>
<p>পরিবারের প্রতি তিনটি অসিয়ত: ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.) বলেছেন, ‘আমি আমার পরিবারকে তিনটি বিষয়ে অসিয়ত করেছি— ১. আমার জানাজার পেছনে যেন কোনো বিলাপকারী বা উচ্চস্বরে ঘোষণাকারী না থাকে। ২. জানাজার সাথে যেন আগুন (সুগন্ধির ধোঁয়া) বহন করা না হয়। ৩. আমাকে যেন দ্রুত দাফন করা হয়। কারণ, যদি আল্লাহর কাছে আমার জন্য কল্যাণ জমা থাকে, তবে তোমাদের কাছে থাকার চেয়ে সেই কল্যাণের কাছে পৌঁছানোই আমার জন্য উত্তম।’</p>
<p>কিবলামুখী করা নিয়ে তাঁর মন্তব্য: আবদুর রহমান ইবনুল হারিস আল-মাখজুমি বলেন, ‘সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের অসুস্থতা যখন খুব বেড়ে গেল, তখন নাফে ইবনে জুবায়ের তাঁকে দেখতে এলেন। ওই সময় সাঈদ (রহ.) বেহুঁশ হয়ে পড়লে নাফে বললেন, ‘তাঁর মুখ কিবলার দিকে ঘুরিয়ে দাও।’ লোকেরা তা-ই করল। কিছুক্ষণ পর তাঁর চেতনা ফিরে এলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে তোমাদের আমার বিছানা কিবলার দিকে ঘুরাতে বলেছে? নাফে নাকি? নাফে বললেন, ‘হ্যাঁ।’ সাঈদ (রহ.) তখন বললেন, ‘আল্লাহর কসম, যদি আমি মনে-প্রাণে কিবলা ও দ্বীন ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত না থাকি, তবে তোমাদের এই বিছানা ঘুরিয়ে দেওয়া আমার কোনোই উপকারে আসবে না।’ (অর্থাৎ বাহ্যিক আচারের চেয়ে অন্তরের বিশ্বাস ও ইমানের ওপর মৃত্যু হওয়াই আসল সাফল্য)।<a href="/#_ftn25" name="_ftnref25">[25]</a></p>
<h2>ওফাত:</h2>
<p>আবদুল হাকিম ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, ৯৪ হিজরিতে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব যেদিন ইন্তেকাল করেন, আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমি দেখেছি তাঁর কবরের ওপর পানি ছিটানো হয়েছে। ওই বছরকে ‘ফুকাহাদের বছর’ (সানাতুল ফুকাহা) বলা হতো। কারণে, একই বছরে অনেক বড়ো বড়ো ফকিহ ও আলেম মৃত্যুবরণ করেছিলেন।’</p>
<p>হায়সাম ইবনে আদি বলেন, ৯৪ হিজরিতে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবসহ অনেক ফকিহ মারা যান।’ সাঈদ ইবনে উফায়ের, ইবনে নুমায়ের এবং ওয়াকিদিও তাঁর মৃত্যুর তারিখ ৯৪ হিজরি বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনে সাদও কেবল এই তারিখটিই উল্লেখ করেছেন।<a href="/#_ftn26" name="_ftnref26">[26]</a></p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p>&nbsp;</p>
<p><a href="/#_ftnref1" name="_ftn1"></a></p>
<p>The post <a href="https://sufigraphy.com/bio/said-ibn-al-musayyib/">হজরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব (রহ.)</a> appeared first on <a href="https://sufigraphy.com">Sufigraphy</a>.</p>
]]></content:encoded>
					
		
		
			</item>
	</channel>
</rss>
