বহু বছর পর, যখন ইউসুফ ইবনুল হুসাইন মিশরের বিখ্যাত সুফি সাধক জুননুন আল-মিসরির সান্নিধ্য লাভ করলেন, তখন একদিন তিনি কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “হে শায়খ, আপনার জীবনের শুরুটা কেমন ছিল? কীভাবে আপনি এই পথে এলেন?”
জুননুন আল-মিসরি একটু হাসলেন। তারপর বললেন, “আমার গল্পটা বেশ অদ্ভুত। আমি যুবক বয়সে খেলাধুলা আর আমোদ-প্রমোদে মত্ত ছিলাম। কিন্তু একসময় তওবা করলাম এবং সেসব ছেড়ে দিলাম। তারপর মনে হলো পবিত্র কাবা শরিফে হজ করতে যাই।”
“আমার সাথে সামান্য কিছু সম্পদ ছিল। কিছু মিশরীয় ব্যবসায়ীর সাথে একটি নৌকায় উঠলাম। সমুদ্রপথে আমরা যাত্রা শুরু করলাম।”
ইউসুফ মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন।
“আমাদের সাথে একজন সুদর্শন যুবকও ছিল। তার চেহারা এমন ঝলমল করছিল যে, মনে হতো কোনো নুরানি মানুষ। কিন্তু সে খুব কম কথা বলত, বেশিরভাগ সময় নীরবে বসে থাকত।”
যখন আমরা মাঝনদীতে পৌঁছলাম, তখন হঠাৎ নৌকার মালিক চিৎকার করে উঠলেন। তার একটি টাকার থলি হারিয়ে গেছে। তিনি রাগে ফেটে পড়লেন এবং নৌকা থামিয়ে সবার দেহ তল্লাশি করার নির্দেশ দিলেন। সবাই খুব বিব্রত হলো, হয়রানি শুরু হলো।
যখন তারা সেই যুবকের কাছে পৌঁছল এবং তাকে তল্লাশি করতে গেল, তখন সে হঠাৎ এক লাফে নৌকা থেকে সমুদ্রের ঢেউয়ের উপর গিয়ে বসল।
“কী!” ইউসুফ অবাক হয়ে বললেন।
“হ্যাঁ, ঢেউগুলো তার জন্য যেন সিংহাসনের মতো উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। আমরা নৌকা থেকে স্পষ্ট তাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। সে পানির উপর বসে আছে, যেন কোনো শক্ত মেঝেতে বসে আছে।
তারপর সে বলল, ‘হে আমার মাওলা, এরা আমাকে সন্দেহ করছে। আর আমি আমার প্রাণের প্রিয়তমের কসম করে বলছি যে, তুমি এই স্থানের প্রতিটি জলজ প্রাণীকে আদেশ করো, যেন তারা তাদের মুখে রত্ন নিয়ে মাথা বের করে।”
জুননুন বললেন, “তার কথা শেষ না হতেই আমরা দেখলাম, নৌকার চারপাশে সমুদ্রের মাছ আর অন্যান্য জলজ প্রাণীরা মাথা বের করল। আর প্রত্যেকটির মুখে একটি করে দ্যুতিময় চকচকে রত্ন। আমরা সবাই হতবাক হয়ে গেলাম।
এরপর সেই যুবক ঢেউ থেকে সমুদ্রে লাফিয়ে পড়ল এবং পানির উপর হাঁটতে শুরু করল। তার পায়ের ছাপ পানিতে পড়ছিল, যেন শক্ত মাটিতে হাঁটছে। আর সে পড়ছিল— ‘ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতায়িন— আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি এবং শুধু তোমারই সাহায্য চাই।’ এভাবে সে আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল।”
ইউসুফ নিশ্চুপ। জুননুন বললেন, “এই ঘটনাই আমাকে দেশভ্রমণে উৎসাহিত করেছিল। আমি বুঝলাম, আল্লাহর এমন বান্দা আছেন যাদের সাথে আল্লাহর বিশেষ সম্পর্ক। তখন আমার মনে পড়ল নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি কথা— ‘এই উম্মতের মধ্যে সর্বদা ত্রিশ জন এমন থাকবে, যাদের অন্তর ইবরাহিম খলিলের অন্তরের মতো। যখনই তাদের মধ্যে কেউ মারা যায়, আল্লাহ তার জায়গায় অন্য একজনকে স্থলাভিষিক্ত করেন।”
জুননুন থামলেন। তারপর বললেন, “সেদিনই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি এই পথের মানুষদের খোঁজ করব। আল্লাহর প্রকৃত প্রেমিকদের সন্ধান করব।”