একদিন বিখ্যাত আলেম সুফিয়ান আস-সাওরি (রহ.) রাবেয়া বসরি (রহ.)-এর কাছে বসে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আহ, দুঃখ!”
রাবেয়া (রহ.) তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধমক দিলেন, “মিথ্যা বলো না, সুফিয়ান! বরং বলো, আহ, অল্পই আমাদের দুঃখ! যদি সত্যিই দুঃখ থাকত, তবে শ্বাস নেওয়াও তোমার পক্ষে সম্ভব হতো না।”
সুফিয়ান (রহ.) হতবাক হয়ে গেলেন। কী গভীর কথা! আল্লাহর প্রেমে যে ডুবে গেছে, তার কাছে দুঃখ বলে কিছু থাকে না।
আরেকদিনের ঘটনা। সুফিয়ান সাওরি (রহ.) রাবেয়াকে দেখলেন— শরীরে জীর্ণ কাপড়, মুখে দুর্বলতার ছাপ। তাঁর মন কেঁদে উঠল। উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, “হে উম্মু আমর, তোমার এই দশা কেন? চাইলে তো পাশের ধনবান প্রতিবেশীর কাছে সাহায্য চাইতে পারো।”
রাবেয়া (রহ.) হাসলেন— এমন হাসি, যেন কোনো রাজকন্যা দরিদ্রতার অভিযোগ শুনছেন। তিনি বললেন, “সুফিয়ান, তুমি আমার কোন খারাপ অবস্থা দেখছ? আমি কি ইসলাম থেকে বঞ্চিত হয়েছি?”
এরপর এমন কথা বললেন, যা সুফিয়ানের হৃদয় কাঁপিয়ে দিল—
“ইসলাম তো এমন সম্মান, যার কোনো অপমান নেই। এমন সম্পদ, যার সাথে দারিদ্র্য নেই। আর এমন সঙ্গ, যার নিঃসঙ্গতা নেই। আমি তো লজ্জা পাই পৃথিবীর মালিকের কাছ থেকে দুনিয়ার কিছু চাইতে— তাহলে আমি কীভাবে তার কাছ থেকে চাইব, যার কাছে দুনিয়াই নেই?”
সুফিয়ান (রহ.) যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। মুখ ফুটে বললেন, “এরকম কথা আমি জীবনে কখনো শুনিনি।”
রাবেয়া (রহ.) থামলেন না। তিনি সুফিয়ানকে আরও শোনালেন, “তুমি তো কেবলই কিছু দিনের সমষ্টি। প্রতিদিন চলে যাওয়ার সাথে সাথে তোমার কিছু অংশও চলে যাচ্ছে। শিগগিরই সবটাই শেষ হবে। তুমি জেনে শুনে বসে আছো, কাজ করছো না!”
জাফর ইবনে সুলায়মান এক অবিস্মরণীয় ঘটনা বর্ণনা করেন। একবার সুফিয়ান আল-সাওরি তাঁর হাত ধরে বললেন, “চলো আমাদের সেই শিক্ষিকার কাছে নিয়ে চলো। যাকে ছেড়ে এলে আমার মন শান্তি পায় না।”
যখন তারা রাবেয়ার সামনে পৌঁছলেন, সুফিয়ান হাত তুলে দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে নিরাপত্তা চাই।”
হঠাৎ রাবেয়া (রহ.) কেঁদে ফেললেন। সুফিয়ান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কাঁদছেন কেন?”
“তুমি আমাকে কাঁদিয়েছ” উত্তর এলো।
“কীভাবে?” সুফিয়ান হতবুদ্ধি।
রাবেয়া (রহ.) তখন এমন কথা বললেন, যা সুফিয়ানের অন্তর বিদীর্ণ করে দিল—
“তুমি কি জানো না, দুনিয়া থেকে নিরাপত্তা মানে হলো তা ত্যাগ করা? তাহলে কীভাবে তুমি দুনিয়ায় জড়িয়ে থেকে নিরাপত্তা চাও?”
জাফর ইবনে সুলায়মান আরও বলেন, রাবেয়া বারবার সুফিয়ানকে সতর্ক করতেন, “তুমি তো কিছু নির্দিষ্ট দিনের সমষ্টি। যখন একটি দিন চলে যায়, তোমার জীবনের একটি অংশ চলে যায়। আর শীঘ্রই যখন অংশগুলো শেষ হবে, তখন পুরো জীবনটাই শেষ। তুমি এটা জানো— তাহলে কাজ করো, বসে থেকো না!”
এভাবেই একজন নারী, যিনি দুনিয়ার চোখে ছিলেন দরিদ্র ও দুর্বল, তিনিই হয়ে উঠলেন যুগশ্রেষ্ঠ আলেম সুফিয়ান সাওরি (রহ.)-এর শিক্ষক। কারণ, তাঁর কাছে ছিল এমন সম্পদ, যা কোনো রাজভাণ্ডারে নেই— আল্লাহর সান্নিধ্য। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, যার কাছে ইসলাম আছে, সে কখনো গরিব নয়। যার হৃদয়ে আল্লাহ আছেন, সে কখনো একা নয়। যে দুনিয়ার মালিকের প্রেমে মগ্ন, তার কাছে সৃষ্টির দরজায় হাত পাতার কী প্রয়োজন?