আমিরুল মুমিনীন খলিফা হারুনুর রশিদ যখন পবিত্র হজ পালনে গেলেন, তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য আর প্রতিপত্তি সত্ত্বেও মনের গহীনে এক গভীর অস্থিরতা অনুভব করলেন। হৃদয়ের কোনো এক অদৃশ্য খচখচানি তাঁকে শান্ত হতে দিচ্ছিল না। অস্থির হয়ে তিনি তাঁর বিশ্বস্ত সহচর ফদ্বল ইবনে রাবীকে ডেকে বললেন, ‘আমার অন্তরে কী যেন একটা খচখচ করছে। আমার এমন একজন জ্ঞানী মানুষ চাই, যার কাছে আমি আমার মনের কথা খুলে বলতে পারি।’
ফদ্বল বিনয়ের সাথে বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, এখানে সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ আছেন।’ খলিফা সম্মতি দিয়ে বললেন, ‘চলো, আমরা তাঁর কাছেই যাই।’ তাঁরা যখন সুফিয়ানের বাড়িতে পৌঁছালেন, ফদ্বল দরজায় কড়া নাড়লেন। ভেতর থেকে প্রশ্ন এলো, ‘কে?’ ফদ্বল শ্রদ্ধাভরে উত্তর দিলেন, ‘আমিরুল মুমিনীনকে সাড়া দিন।’ খলিফাকে দেখে হজরত সুফিয়ান অত্যন্ত দ্রুত বেরিয়ে এলেন এবং বিনীত হয়ে বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, আপনি যদি শুধু ইশারা করতেন, আমি নিজেই আপনার খেদমতে হাজির হতাম।’ খলিফা হারুনুর রশিদ তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে বললেন, ‘আমি যে উদ্দেশ্যে এসেছি, সে বিষয়ে বলুন।’ হজরত সুফিয়ান কিছুক্ষণ খলিফার সাথে দ্বীন ও জীবন নিয়ে আলোচনা করলেন। বিদায়ের সময় খলিফা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কি কোনো ঋণ আছে?’ তিনি স্বীকার করলেন যে তাঁর ঋণ আছে। খলিফা তখন ফদ্বলকে নির্দেশ দিলেন তাঁর ঋণ পরিশোধ করে দিতে।
সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পর খলিফার অস্থিরতা কমল না। তিনি অতৃপ্ত মনে বললেন, ‘তোমার এই সঙ্গী আমার মনের গহীনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারলেন না।’ ফদ্বল তখন অন্য একজনের নাম প্রস্তাব করে বললেন, ‘এখানে আব্দুর রাজ্জাক আছেন।’ খলিফা বললেন, ‘চলো, তাঁর কাছে যাই।’ সেখানে গিয়েও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো। আব্দুর রাজ্জাক বেরিয়ে এসে খলিফার সাথে আলাপ করলেন। খলিফা তাঁকেও ঋণের কথা জিজ্ঞেস করলেন এবং তাঁর ঋণ পরিশোধের আদেশ দিলেন। কিন্তু বের হওয়ার সময় খলিফার মুখাবয়বে সেই একই অসন্তোষ। তিনি বললেন, ‘তোমার এই সঙ্গীও আমাকে কিছুই দিতে পারলেন না। আমার জন্য এমন একজন মানুষ খোঁজো, যিনি আমার সংশয় দূর করবেন।’
ফদ্বল তখন চিন্তিত হয়ে বললেন, ‘তবে চলুন ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এঁর কাছে যাই।’ এই নামটি শোনামাত্র খলিফার চোখে যেন এক ঝলক আশার আলো খেলে গেল। তিনি বললেন, ‘চলো, তাঁর কাছেই যাব।’
তাঁরা যখন ফুজাইলের কুটিরের দরজায় পৌঁছালেন, দেখলেন ভেতরে তিনি একা দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করছেন। তিনি গভীর আবেগ নিয়ে একটি আয়াত বারবার পাঠ করছিলেন আর তাঁর গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। খলিফা বললেন, ‘দরজা ধাক্কা দাও।’ ফদ্বল কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে নির্লিপ্ত কণ্ঠে প্রশ্ন এলো, ‘কে এই রাতের আঁধারে?’ ফদ্বল উত্তর দিলেন, ‘আমিরুল মুমিনীনকে সাড়া দিন।’
কিন্তু ফুজাইল (রহ.)-এর কণ্ঠে কোনো চাঞ্চল্য বা ভয় ছিল না। তিনি উল্টো প্রশ্ন করলেন, ‘আমিরুল মুমিনীনের সাথে আমার কীসের লেনদেন?’ ফদ্বল অবাক হয়ে বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ, আপনি কি তাঁর আনুগত্য করতে বাধ্য নন?’ এই কথায় ফুজাইল নিচে নেমে এসে দরজা খুলে দিলেন। কিন্তু তাঁদের বসার কোনো সুযোগ না দিয়ে তিনি দ্রুত উপরে তাঁর ছোট কামরায় চলে গেলেন এবং প্রদীপটি নিভিয়ে দিয়ে এক কোণে গুটিয়ে বসলেন।
অন্ধকার ঘরে খলিফা ও ফদ্বল প্রবেশ করে তাঁকে খুঁজতে লাগলেন। ফদ্বলের আগে খলিফা হারুনুর রশিদের হাত গিয়ে পড়ল ফুজাইলের গায়ে। সেই স্পর্শ অনুভব করে খলিফার মুখ থেকে এক আশ্চর্য আর্তি বেরিয়ে এলো— ‘আহা, কী কোমল এই হাত! যদি এটি আগামীকাল আল্লাহর আজাব থেকে মুক্তি পায়, তবেই রক্ষা!’ ফদ্বল তখন মনে মনে নিশ্চিত হলেন যে, আজ রাতে এই পবিত্র হৃদয়ের মানুষটি খলিফাকে এমন কিছু শোনাবেন যা আগে কেউ শোনাননি।
খলিফা অত্যন্ত বিনয়ী হয়ে বললেন, ‘আমরা যে কারণে এসেছি, সে বিষয়ে কিছু উপদেশ দিন, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন।’ ফুজাইল ইবনে ইয়াজ তখন দৃঢ় কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন, ‘উমার ইবনে আব্দুল আজিজ যখন খিলাফতের গুরুভার কাঁধে তুলে নিলেন, তখন তিনি সালিম ইবনে আব্দুল্লাহ, মুহাম্মাদ ইবনে কাব ও রাজা ইবনে হাইওয়াহকে ডেকে বললেন, ‘আমি এক মহাবিপদে জড়িয়ে পড়েছি, তোমরা আমাকে পথ দেখাও।’ তিনি খিলাফতকে মনে করতেন বিপদ, আর আপনি ও আপনার পরিষদ এটিকে মনে করেন আল্লাহর নেয়ামত।’
এরপর তিনি উমার ইবনে আব্দুল আজিজের পরামর্শদাতাদের সেই কালজয়ী বাণীগুলো খলিফাকে শোনালেন। তিনি বললেন: সালিম বলেছিলেন, ‘যদি আপনি মুক্তি চান, তবে দুনিয়ায় রোজা রাখুন; আর আপনার ইফতার হবে কেবল মৃত্যুর দিন।’ ইবনে কা’ব বলেছিলেন, ‘যদি আপনি আল্লাহর আজাব থেকে নিষ্কৃতি চান, তবে মুসলমানদের প্রবীণকে পিতা, মধ্যবয়সীকে ভাই এবং কনিষ্ঠদের সন্তান জ্ঞান করুন। আপনার পিতাকে সম্মান করুন, ভাইকে মর্যাদা দিন এবং সন্তানের প্রতি স্নেহশীল হোন।’ রাজা’ বলেছিলেন, ‘মুক্তি চাইলে নিজের জন্য যা পছন্দ করেন, মুসলিমদের জন্যও তাই পছন্দ করুন, আর নিজের জন্য যা অপছন্দ করেন, তাদের জন্যেও তা অপছন্দ করুন। এরপর যখন ইচ্ছা, আপনি মৃত্যুবরণ করুন।’
এই কথাগুলো বলে ফুজাইল খলিফার চোখের দিকে চেয়ে বললেন, ‘আমি আপনাকে এই কথাগুলোই বলছি। আর আমি সেই দিনের জন্য আপনার উপর ভীষণভাবে ভীত, যেদিন মানুষের পা টলে যাবে! আপনার সাথে কি এমন কেউ আছেন, যিনি আপনাকে এমন খাঁটি পরামর্শ দেন?’
এই সত্যের আঘাতে খলিফা হারুনুর রশিদ হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন এবং এক পর্যায়ে বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন। ফদ্বল বিচলিত হয়ে বললেন, ‘আমিরুল মুমিনীনের প্রতি একটু সদয় হোন।’ ফুজাইল তখন রাগতস্বরে ফদ্বলকে বললেন, ‘ওহে উম্মুর রবীর পুত্র, তুমি আর তোমার সঙ্গীরাই তো তাঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছো, আর আমি তাঁর প্রতি সদয় হব?’
খলিফার জ্ঞান ফিরলে তিনি আবার কাতরকণ্ঠে বললেন, ‘আরও বলুন, আল্লাহ আপনাকে শান্তি দিন।’ ফুজাইল তখন উমার ইবনে আব্দুল আজিজের শাসনের এক ঘটনা শোনালেন, যেখানে এক গভর্নরকে চিঠি লিখে উমর সতর্ক করেছিলেন জাহান্নামের অনন্তকাল জেগে থাকার কথা বলে। সেই চিঠি পড়ে গভর্নর ভয়ে শাসনভার ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলেন। এই কথা শুনে খলিফা আবারও কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
ফুজাইল আরও বললেন, নবী করিম (সা.)-এর চাচা আব্বাস (রা.) যখন নেতৃত্ব চেয়েছিলেন, নবীজি তাকে বলেছিলেন যে নেতৃত্ব কিয়ামতের দিন কেবলই আক্ষেপ ও অনুতাপের কারণ হবে। এরপর তিনি সরাসরি খলিফাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘ওহে সুশ্রী চেহারার মানুষ, কিয়ামতের দিন আল্লাহ আপনাকে এই সৃষ্টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন। যদি আপনি এই চেহারাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারেন, তবে তাই করুন। সাবধান, প্রজার প্রতি মনে কোনো মন্দ ইচ্ছা রাখবেন না। কারণ যে প্রজার প্রতি অসৎ থেকে সকালে ঘুম থেকে উঠবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।’
খলিফা কাঁদতে কাঁদতে ফুজাইলকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কি কোনো ঋণ আছে?’ ফুজাইল উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, আমার রবের কাছে আমার ঋণ আছে, যার হিসাব তিনি এখনও নেননি। আমার দুর্ভাগ্য যদি তিনি সূক্ষ্ম হিসাব নেন!’ খলিফা স্পষ্ট করে বললেন, ‘আমি সাধারণ মানুষের ঋণের কথা বলছি।’ ফুজাইল বললেন, ‘আমার রব আমাকে এই কাজের নির্দেশ দেননি। তিনি আমাকে ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর ওয়াদায় বিশ্বাস করতে বলেছেন।’
খলিফা তাঁর সামনে এক হাজার দিনার পেশ করে বললেন, ‘এই নিন, আপনার পরিবারের জন্য খরচ করুন।’ ফুজাইল বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ, আমি আপনাকে মুক্তির পথ দেখাচ্ছি, আর আপনি আমাকে এর প্রতিদান দিচ্ছেন?’ তিনি আর কোনো কথা বললেন না।
বেরিয়ে আসার সময় খলিফা মুগ্ধ হয়ে ফদ্বলকে বললেন, ‘ভবিষ্যতে যদি আমাকে কারো কাছে নিতে হয়, তবে এমন মানুষের কাছেই নিও। ইনিই প্রকৃত নেতা।’ পরে ফুজাইলের পরিবার অর্থের অভাবের কথা বললে তিনি তাঁদের এক বৃদ্ধ উটের মালিকের উপমা দিয়ে বোঝালেন যে, শেষ বয়সে এসে তিনি নিজের দ্বীনকে বিক্রি করতে পারেন না।
খলিফা আবারও ফুজাইলের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ফুজাইল (রহ.) আর তাঁদের সাথে দেখা করেননি। তিনি ঘরের ছাদে গিয়ে বসে রইলেন। শেষে এক দাসী এসে তাঁদের চলে যেতে বললে নিরুপায় খলিফা হারুনুর রশিদ ফিরে এলেন।