ফদ্বল ইবনে রাবী বলেন, আমিরুল মুমিনীন খলিফা হারুনুর রশিদ যখন হজ পালনে গেলেন, তখন তাঁর মনে এক গভীর অস্থিরতা ভর করল। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, ‘আমার অন্তরে কী যেন একটা খচখচ করছে। আমার এমন একজন জ্ঞানী মানুষ চাই, যার কাছে আমি আমার মনের কথা খুলে বলতে পারি।’ আমি বললাম, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, এখানে সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ আছেন।’
তিনি বললেন, ‘চলো, আমরা তাঁর কাছেই যাই।’ আমরা তাঁর বাড়িতে পৌঁছলাম। আমি দরজায় কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে জিজ্ঞেস হলো, ‘কে?’ আমি শ্রদ্ধার সাথে উত্তর দিলাম, ‘আমিরুল মুমিনীনকে সাড়া দিন।’ হজরত সুফিয়ান দ্রুত বেরিয়ে এলেন এবং বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, আপনি যদি শুধু ইশারা করতেন, আমি নিজেই আপনার খেদমতে হাজির হতাম।’
খলিফা হারুনুর রশিদ বললেন, ‘আমি যে উদ্দেশ্যে এসেছি, সে বিষয়ে বলুন।’ হজরত সুফিয়ান কিছুক্ষণ আলোচনা করলেন। বিদায়ের সময় খলিফা হারুনুর রশিদ জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কি কোনো ঋণ আছে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ খলিফা হারুনুর রশিদ তখন আমাকে নির্দেশ দিলেন, ‘তাঁর ঋণ পরিশোধ করে দাও।’ আমরা বেরিয়ে এলাম। কিন্তু খলিফার মন ভরল না, তিনি বললেন, ‘তোমার এই সঙ্গী আমার মনের গহীনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারলেন না।’
আমি বললাম, ‘এখানে আব্দুর রাজ্জাক আছেন।’ হারুন বললেন, ‘চলো, তাঁর কাছে যাই।’ আমরা সেখানে গেলাম। কড়া নাড়তেই তিনি বেরিয়ে এলেন এবং কিছুক্ষণ খলিফা হারুনুর রশিদের সাথে আলাপ করলেন। খলিফা হারুনুর রশিদ তাঁকেও একই প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার কি কোনো ঋণ আছে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ খলিফা হারুনুর রশিদ আমাকে বললেন, ‘হে আবুল আব্বাস, তাঁর ঋণও মিটিয়ে দাও।’
আমরা যখন বেরিয়ে এলাম, খলিফা হারুনুর রশিদ আবারও অসন্তোষ নিয়ে বললেন, ‘তোমার সঙ্গীও আমাকে কিছুই দিতে পারলেন না। আমার জন্য এমন একজন মানুষ খোঁজো, যিনি আমার সংশয় দূর করবেন।’ আমি বললাম, ‘তবে চলুন ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এঁর কাছে যাই।’ খলিফা হারুনুর রশিদ যেন এই নামটির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন, বললেন, ‘চলো, তাঁর কাছেই যাব।’
আমরা তাঁর দরজায় পৌঁছে দেখলাম, তিনি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করছেন, আর একটি আয়াত বারবার ধরে অশ্রুসিক্ত নয়নে আওড়াচ্ছেন। খলিফা হারুনুর রশিদ বললেন, ‘দরজা ধাক্কা দাও।’ আমি কড়া নাড়তেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে এই রাতের আঁধারে?’ আমি বললাম, ‘আমিরুল মুমিনীনকে সাড়া দিন।’
তাঁর কণ্ঠে কোনো চাঞ্চল্য ছিল না, তিনি বললেন, “আমিরুল মুমিনীন-এর সাথে আমার কীসের লেনদেন?’ আমি হতবাক হয়ে বললাম, ‘সুবহানাল্লাহ, আপনি কি তাঁর আনুগত্য করতে বাধ্য নন?’ এই কথায় তিনি নিচে নেমে দরজা খুললেন। কিন্তু আমাদের বসার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত উপরে তাঁর চিলেকোঠার কামরায় চলে গেলেন। তিনি প্রদীপটি নিভিয়ে দিয়ে এক কোণে গুটিয়ে বসলেন।
আমরা অন্ধকারে সেই ঘরে প্রবেশ করলাম এবং তাঁকে খুঁজতে লাগলাম। আমার আগে খলিফা হারুনুর রশিদের হাত তাঁর উপর পড়ল। সেই নরম স্পর্শে খলিফা হারুনের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো এক আশ্চর্য কথা— ‘আহা, কী কোমল এই হাত, যদি এটি আগামীকাল আল্লাহর আজাব থেকে মুক্তি পায়, তবেই রক্ষা!’ আমি তখন নিশ্চিত হলাম, আজ রাতে পবিত্র হৃদয়ের মানুষটি এই পরাক্রমশালী খলিফাকে এমন কিছু শোনাবেন, যা তাঁর জীবন বদলে দেবে।
খলিফা হারুনুর রশিদ বিনয়ী হয়ে বললেন, ‘আমরা যে কারণে এসেছি, সে বিষয়ে কিছু উপদেশ দিন, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন।’ ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি তখন দৃঢ় কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন, ‘উমার ইবনে আব্দুল আজিজ যখন খিলাফতের গুরুভার কাঁধে তুলে নিলেন, তখন তিনি সালিম ইবনে আব্দুল্লাহ, মুহাম্মাদ ইবনে কাব ও রাজা ইবনে হাইওয়াহকে ডেকে বললেন, ‘আমি এক মহাবিপদে জড়িয়ে পড়েছি, তোমরা আমাকে পথ দেখাও।’ তিনি খিলাফতকে মনে করতেন বিপদ, আর আপনি ও আপনার পরিষদ এটিকে মনে করেন আল্লাহর নেয়ামত।’
এরপর তিনি উমার ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.)-এঁর পরামর্শদাতাদের বাণী তুলে ধরলেন। যেমন— সালিম বলেছিলেন, ‘যদি আপনি মুক্তি চান, তবে দুনিয়ায় রোজা রাখুন; আর আপনার ইফতার হবে কেবল মৃত্যুর দিন।’ ইবনে কা’ব বলেছিলেন, ‘যদি আপনি আল্লাহর আজাব থেকে নিষ্কৃতি চান, তবে মুসলমানদের প্রবীণকে পিতা, মধ্যবয়সীকে ভাই এবং কনিষ্ঠদের সন্তান জ্ঞান করুন। আপনার পিতাকে সম্মান করুন, ভাইকে মর্যাদা দিন এবং সন্তানের প্রতি স্নেহশীল হোন।’ রাজা’ বলেছিলেন, ‘মুক্তি চাইলে নিজের জন্য যা পছন্দ করেন, মুসলিমদের জন্যও তাই পছন্দ করুন, আর নিজের জন্য যা অপছন্দ করেন, তাদের জন্যেও তা অপছন্দ করুন। এরপর যখন ইচ্ছা, আপনি মৃত্যুবরণ করুন।’
এই কথাগুলো বলে ফুজাইল হারুনকে বললেন, ‘আমি আপনাকে এই কথাগুলোই বলছি। আর আমি সেই দিনের জন্য আপনার উপর ভীষণভাবে ভীত, যেদিন মানুষের পা টলে যাবে! আপনার সাথে কি এমন কেউ আছেন, যিনি আপনাকে এমন খাঁটি পরামর্শ দেন?’ এ কথা শোনামাত্র হারুনুর রশিদ এমনভাবে কেঁদে উঠলেন যে, তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন। আমি তাঁকে বললাম, ‘আমিরুল মুমিনীনের প্রতি একটু সদয় হোন।’ ফুজাইল রহমাতুল্লাহি আলাইহি রাগতস্বরে বললেন, ‘ওহে উম্মুর রবীর পুত্র, তুমি আর তোমার সঙ্গীরাই তো তাঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছো, আর আমি তাঁর প্রতি সদয় হব?’
খলিফা হারুনের জ্ঞান ফিরলে তিনি কাতরকণ্ঠে বললেন, ‘আরও বলুন, আল্লাহ আপনাকে শান্তি দিন।’ ফুজাইল তখন উমার ইবনে আব্দুল আজিজ (রহ.)-এঁর শাসনামলের আরেক ঘটনা শোনালেন। এক গভর্নরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে উমর তাকে চিঠি লিখলেন, ‘হে আমার ভাই, আমি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি জাহান্নামের অধিবাসীদের অনন্তকালের জন্য জাহান্নামে দীর্ঘকাল জেগে থাকার কথা! সাবধান, এমন যেন না হয় যে, আপনার এই আমল (শাসন) আপনাকে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, আর আপনার সাথে তাঁর সকল সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়।’ গভর্নর চিঠিটি পড়েই সব ফেলে ছুটে এলেন এবং বললেন, ‘আপনার চিঠি আমার হৃদয় উপড়ে ফেলেছে! আল্লাহর সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত আমি আর কোনোদিন শাসনের দায়িত্ব নেব না।’
এই ঘটনা শুনে খলিফা হারুনুর রশিদ এবারও হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। ফুজাইল ইবনে ইয়াজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি আরও বললেন, ‘হে আমিরুল মুমিনীন, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এঁর চাচা আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু যখন নেতৃত্ব চাইলেন, নবীজি তাঁকে বলেছিলেন, ‘নিশ্চয় নেতৃত্ব কিয়ামতের দিন আক্ষেপ ও অনুতাপ হয়ে দেখা দেবে। যদি তুমি আমির না হতে পারো, তবে সেটাই ভালো করবে।’
খলিফা হারুন আবারও কেঁদে উঠলেন এবং বললেন, ‘দয়া করে আরও কিছু বলুন।’ ফুজাইল এবার তাঁর চেহারার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওহে সুশ্রী চেহারার মানুষ, কিয়ামতের দিন আল্লাহ এই সমস্ত সৃষ্টি সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করবেন। যদি আপনি এই চেহারাকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে পারেন, তবে সেটাই করুন। আর সাবধান, সকাল-সন্ধ্যা আপনার হৃদয়ে যেন আপনার কোনো প্রজার প্রতি কোনো প্রকার প্রতারণা বা মন্দ ইচ্ছা না থাকে। কারণ নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রজার প্রতি প্রতারক (অসৎ শাসক) অবস্থায় সকালে উঠবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।’
খলিফা হারুন কাঁদলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার কি কোনো ঋণ আছে?’ ফুজাইল রহমাতুল্লাহি আলাইহি উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, আমার রবের কাছে আমার ঋণ আছে, যার হিসাব তিনি এখনও নেননি। আমার দুর্ভাগ্য যদি তিনি আমাকে প্রশ্ন করেন! আমার দুর্ভাগ্য যদি তিনি সূক্ষ্ম হিসাব নেন! আর আমার দুর্ভাগ্য যদি আমি সেদিন কোনো যুক্তি খুঁজে না পাই!’
খলিফা হারুন বললেন, ‘আমি তো সাধারণ মানুষের ঋণের কথা জিজ্ঞেস করছি।’ তিনি বললেন, ‘আমার রব আমাকে এই কাজের নির্দেশ দেননি। তিনি আমাকে তাঁর ওয়াদা বিশ্বাস করতে এবং তাঁর আদেশ মান্য করতে বলেছেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি মানব ও জিন জাতিকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ খলিফা হারুনুর রশিদ তখন তাঁর সামনে এক হাজার দিনার পেশ করে বললেন, ‘এই নিন, আপনার পরিবারের জন্য খরচ করুন এবং এর মাধ্যমে আপনার রবের ইবাদতে শক্তি সঞ্চয় করুন।’ ফুজাইল রহমাতুল্লাহি আলাইহি বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ, আমি আপনাকে মুক্তির পথ দেখাচ্ছি, আর আপনি আমাকে এর প্রতিদান দিচ্ছেন? আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করুন এবং সফল করুন।’ এরপর তিনি আর কোনো কথা বললেন না।
আমরা বেরিয়ে এলাম। হারুন আমাকে মুগ্ধ হয়ে বললেন, ‘হে আবুল আব্বাস, ভবিষ্যতে যদি আমাকে কোনো দরবেশের কাছে নিয়ে যেতে হয়, তবে এমন মানুষের কাছেই নিয়ে যেও। ইনিই হচ্ছেন মুসলমানদের সত্যিকারের নেতা।’ পরে ফুজাইল রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এঁর স্ত্রীদের একজন এসে বললেন, ‘আপনি তো দেখছেন আমরা কত কষ্টে আছি। যদি আপনি এই অর্থটা গ্রহণ করতেন, তবে কী ক্ষতি হতো?’ তিনি তখন একটি চমৎকার উপমা দিলেন, ‘আমার ও তোমাদের উপমা এমন একদল লোকের মতো, যাদের একটি উট ছিল, আর তারা তার রোজগার থেকে খেত। কিন্তু যখন উটটি বুড়ো হয়ে গেল, তারা সেটিকে জবাই করে তার মাংস খেল।’ অর্থাৎ, এখন আমি আমার জীবনের শেষভাগেও যদি উপার্জনের জন্য দ্বীন বিক্রি করি, তবে আমার উপমা ঐ স্বার্থপর লোকগুলোর মতো হবে।
হারুন এই কথা জানতে পারলেন এবং বললেন, ‘চলো, আরেকবার যাওয়া যাক। হয়তো এবার তিনি অর্থটা গ্রহণ করবেন। কিন্তু ফুজাইল রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাদের আসার খবর জানতে পেরে ঘরের দরজা পেরিয়ে ছাদে এসে বসলেন। খলিফা হারুনুর রশিদ এসে তাঁর পাশে বসলেন এবং আবারও কথা বলার চেষ্টা করতে লাগলেন, কিন্তু ফুজাইল নীরব রইলেন। আমরা যখন এভাবে অপেক্ষায়, তখন একটি কৃষ্ণকায় দাসী বেরিয়ে এসে কঠোরভাবে বলল, ‘হে লোকেরা, আপনি আজ রাত ধরে শাইখকে কষ্ট দিচ্ছেন, চলে যান!’ সুতরাং আমরা নিরুপায় হয়ে ফিরে এলাম।
ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা: ৮/৪২৮-৪৩১, মুয়াসসাতুল রিসালা, বৈরুত, লেবানন, ১৯৮২