বাগদাদের দজলা নদী তখন তার আপন গতিতে বয়ে চলেছে। নদীর তীরে এক শান্ত পরিবেশে বসেছিলেন সে সময়ের বিখ্যাত বুজুর্গ ও আধ্যাত্মিক সাধক মারুফ আল-করখি (রহ.)। তাঁর চারপাশে পরম শ্রদ্ধায় বসে ছিলেন তাঁর একদল সঙ্গী ও ভক্ত। চারদিকের নিস্তব্ধতায় সবাই যখন আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন, ঠিক তখনই সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে এক বিকট আওয়াজ কানে এল।
সবাই তাকিয়ে দেখলেন, একটি নৌকা নদীর বুক চিরে এগিয়ে আসছে। সেই নৌকায় ছিল একদল উচ্ছৃঙ্খল যুবক। তারা উচ্চস্বরে বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছিল, নাচছিল এবং প্রকাশ্যেই মদ্যপান করে মাতলামি করছিল। নদীর পবিত্র ও শান্ত পরিবেশকে তারা এক নিমিষেই কলুষিত করে তুলল। আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত এই যুবকদের দেখে মারুফ আল-করখির সঙ্গীরা ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন। তাদের মনে হলো, এমন পবিত্র এক স্থানে বসে এমন পাপকাজ মেনে নেওয়া যায় না।
সঙ্গীরা ক্ষোভ সামলাতে না পেরে মারুফ আল-করখিকে বললেন, ‘হে আল্লাহর প্রিয় বান্দা! আপনি কি দেখছেন না এই লোকগুলো কীভাবে আল্লাহর নাফরমানি করছে? এই পবিত্র পানির ওপর বসে তারা আল্লাহকে অসম্মান করছে। আপনি কেন চুপ করে আছেন? আপনি দয়া করে হাত তুলুন এবং এই পাপিষ্ঠদের ধ্বংসের জন্য আল্লাহর কাছে বদদোয়া করুন, যাতে দুনিয়া থেকে এই ফিতনা দূর হয়।’
সঙ্গীদের প্রবল অনুরোধে মারুফ আল-করখি আকাশের দিকে তাঁর দুটি হাত তুললেন। সঙ্গীরা নিশ্চিত ছিলেন যে, এবার হয়তো কোনো গজব বা কঠিন শাস্তির দোয়া আসবে। চারপাশ তখন একদম চুপচাপ। কিন্তু মারুফ আল-করখি তাঁর প্রশান্ত কণ্ঠে যে দোয়াটি করলেন, তা শুনে সবার চোখ কপালে উঠল। তিনি খুব দরদ মাখা কণ্ঠে প্রার্থনা করলেন:
‘হে আমার প্রতিপালক, হে আমার মাবুদ! আমি আপনার কাছে আকুল আবেদন করছি—আপনি এই যুবকদের জান্নাতে ঠিক তেমনই হাসিখুশি ও আনন্দিত রাখুন, যেমন আনন্দে তারা আজ এই দুনিয়াতে মেতে আছে!’
এই প্রার্থনা শুনে তাঁর সঙ্গীরা তো একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন। তারা নিজেদের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। বিস্ময় আর বিরক্তি নিয়ে তারা বললেন, ‘হে শায়খ! আমরা তো আপনাকে তাদের শাস্তির জন্য বদদোয়া করতে বলেছিলাম। আপনি তো উল্টো তাদের জান্নাত আর সুখের জন্য দোয়া করছেন! এটি কেমন কথা?’
মারুফ আল-করখি (রহ.) তখন এক অনন্য সুন্দর ও গভীর হাসি হাসলেন। তিনি খুব শান্ত ও মায়াবী স্বরে তাঁর সঙ্গীদের মনের ভুল ভেঙে দিয়ে বললেন, ‘একটু ভেবে দেখো হে আমার ভাইয়েরা! আল্লাহ যদি পরকালে তাদের আনন্দ দিতে চান, তবে তো আগে দুনিয়াতেই তাদের তওবা কবুল করে নিতে হবে। আর আল্লাহ যদি তাদের তওবা কবুল করেন এবং তাদের হেদায়েত দিয়ে অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনেন, তবে এতে কি তোমাদের কোনো ক্ষতি আছে? একজন মানুষ তওবা করে আল্লাহর বন্ধু হয়ে গেলে তো দুনিয়া ও আখেরাত দুটোরই কল্যাণ হবে।’
তাঁর এই অসীম ধৈর্য ও দূরদর্শী চিন্তা শুনে সঙ্গীরা মাথা নিচু করলেন। তারা বুঝতে পারলেন, আল্লাহর ওলিরা কাউকে ধ্বংস করতে নয়, বরং মানুষকে ঘৃণা ও অভিশাপের হাত থেকে বাঁচিয়ে আল্লাহর দয়া আর করুণার ছায়াতলে ফিরিয়ে আনতেই বেশি পছন্দ করেন