ঈদের সকাল। চারদিকে আনন্দের ঢল। আবু আলি রুজবারির বাড়িতে উৎসবের আমেজ। ঘরে রান্নার সুবাস, বাইরে নতুন জামার ভিড়। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় এসে দাঁড়াল এক ফকির।
জীর্ণ পোশাক, ধুলোমাখা পা, চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। আবু আলি তাকে দেখলেন। ঈদের দিনে এই মলিন মানুষটিকে দেখে মনে একটু বিরক্তিই জন্মাল।
ফকির বলল, “আপনার কাছে কি এমন কোনো পরিষ্কার জায়গা আছে, যেখানে কোনো পরদেশি গরিব মানুষ মরতে পারে?”
আবু আলি একটু অবহেলার সুরেই বললেন, “ভেতরে যাও, যেখানে ইচ্ছা সেখানে মরো।”
ফকির মাথা নত করে ভেতরে প্রবেশ করল।
সে প্রথমে অজু করল। তারপর দুই রাকাত নামাজ পড়ল, এত ধীরে, এত গভীরে, যেন প্রতিটি সিজদায় সে কোনো অনন্ত দরজার সামনে হাঁটু গেড়ে বসছে। নামাজ শেষে সে শুয়ে পড়ল। তারপর নিঃশব্দে তার শ্বাস থেমে গেল।
আবু আলি এসে দেখলেন— ফকির সত্যিই মারা গেছে। অপরিচিত, অনাথ, নামহীন এক মানুষ। তিনি মনে মনে লজ্জা পেলেন। যেভাবে কথা বলেছিলেন, সেটা কি ঠিক হয়েছিল?
তিনি নিজেই তার গোসল দিলেন, কাফন পরালেন, দাফনের ব্যবস্থা করলেন। কবরে শোয়ানোর আগে মুখের আবরণ সরালেন, এই আশায় যে আল্লাহ এই অনাথ মানুষটির উপর রহম করবেন। আর ঠিক তখনই— ফকির চোখ খুলল।
আবু আলি পাথরের মতো স্থির হয়ে গেলেন।
ফকির বলল, স্পষ্ট, শান্ত, গভীর কণ্ঠে— “হে আবু আলি, যে রব নিজে আমাকে মর্যাদা দেন, তার সামনে আমাকে তুমি কি অপমান করতে চাও?”
আবু আলির কণ্ঠ কেঁপে উঠল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “হে আমার সায়্যিদ, মৃত্যুর পরেও কি জীবন থাকে?”
ফকির মৃদু হাসল। “হ্যাঁ, আমি জীবিত। আর আল্লাহর সব প্রেমিকই জীবিত। হে রুজবারি, আগামীকাল আমি আল্লাহর দরবারে আমার মর্যাদা দিয়ে তোমার জন্য সুপারিশ করব।”
তারপর সে চোখ বন্ধ করল।
আবু আলি অনেকক্ষণ নিঃশব্দে সেখানে বসে রইলেন।
বাইরে ঈদের আনন্দ চলছিল। কিন্তু তার ভেতরে তখন অন্য এক আলো জ্বলছিল।
তিনি বুঝলেন— পরদেশি ফকিরের জীর্ণ পোশাকের নিচে সেদিন কে এসেছিল। আর তিনি কত সহজে তাকে ফিরিয়ে দিতে পারতেন।
সেই কবরের পাশে বসে তিনি কাঁদলেন। অনুতাপের কান্না নয়, কৃতজ্ঞতার কান্না। কারণ আল্লাহ তাকে সেই সুযোগটুকু দিয়েছিলেন। ঈদের দিনে, জীর্ণ পোশাকে এক মৃত্যুকামী ফকিরের বেশে।
যে ভালোবাসা মৃত্যুকে পার হয়ে যায়, সেই ভালোবাসাকে মৃত্যু স্পর্শ করতে পারে না।