ইসলামি আধ্যাত্মিকতা বা তাসাউফ শাস্ত্রের ইতিহাসে মুজাদ্দেদিয়া তরিকা একটি বৈপ্লবিক ও সংস্কারবাদী ধারার নাম। মূলত এটি নকশবন্দিয়া তরিকার একটি বিশেষ শাখা, যা দশম হিজরির প্রখ্যাত সংস্কারক ও আধ্যাত্মিক সাধক শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.)-এর মাধ্যমে পূর্ণতা ও ব্যাপকতা লাভ করে। তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত ইসলামি বিশ্বাসে যখন বিজাতীয় দর্শন ও শরিয়ত-বিরোধী প্রথার অনুপ্রবেশ ঘটছিল, তখন তিনি কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আধ্যাত্মিকতাকে পুনর্গঠন করেন। এই মহতী সংস্কার কাজের জন্য তাকে ‘মুজাদ্দেদে আলফে সানি’ বা দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক বলা হয় এবং তার প্রবর্তিত এই আধ্যাত্মিক ধারাটিই ইতিহাসে ‘মুজাদ্দেদিয়া তরিকা’ হিসেবে সুপরিচিত।

এই তরিকার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘শরিয়ত’ ও ‘তরিকত’-এর অবিচ্ছেদ্য সমন্বয়। মুজাদ্দেদিয়া দর্শনে তাসাউফ কোনো আলাদা জীবনব্যবস্থা নয়; বরং এটি শরিয়তের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণের একটি মাধ্যম মাত্র। এই তরিকায় জিকিরে খফি বা মৌন জিকির এবং ‘লাতায়েফ’ বা মানবদেহের অভ্যন্তরীণ সূক্ষ্ম শক্তিকেন্দ্রগুলোর পরিশোধনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলামের বিশুদ্ধ আকিদা পুনপ্রতিষ্ঠায় মুজাদ্দেদিয়া তরিকা আজও অনন্য ও প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে আসছে।

তরিকা নকশবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়ার আধ্যাত্মিক সবক:

শায়খুল মাশায়েখ হজরত খাজা আহমদ সাঈদ (ক.) ‘আরবা আনবার’ গ্রন্থে কাইয়্যুমে রব্বানি হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (নূরুল্লাহু মারকাদাহু)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেন— মানুষ মূলত দশটি ‘লতিফা’ বা সূক্ষ্ম উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। এর মধ্যে পাঁচটি লতিফার সম্পর্ক ‘আলমে আমর’ (নির্দেশ জগত) এবং বাকি পাঁচটির সম্পর্ক ‘আলমে খালক’ (সৃষ্টি জগত) এর সাথে।

আলমে আমরের পাঁচটি লতিফা হলো—
১. ক্বলব (অন্তর)
২. রুহ (আত্মা)
৩. সির (রহস্য)
৪. খফি (গুপ্ত)
৫. আখফা (অতি গুপ্ত)

আলমে খালকের পাঁচটি লতিফা হলো—
১. লতিফায়ে নফস (প্রবৃত্তি)
এবং চারটি মৌলিক উপাদান:
২. আগুন
৩. পানি
৪. মাটি
৫. বাতাস।

লতিফার মূল উৎস ও অবস্থান:

আলমে আমরের লতিফাগুলোর মূল উৎস হলো ‘আরশে আজিম’ এবং এগুলোর আদি সম্পর্ক হলো স্থান-কাল অতীত বা ‘লামাকানিয়্যাত’ জগতের সাথে। মহান আল্লাহ তাঁর অসীম কুদরতে এই নিরাকার রত্নসম লতিফাগুলোকে মানবদেহের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে আমানত হিসেবে গচ্ছিত রেখেছেন।

আধ্যাত্মিক যাত্রার স্বরূপ:

পার্থিব জগতের মোহ এবং নফসের কুপ্রবৃত্তির কারণে এই লতিফাগুলো তাদের মূল উৎস বা কেন্দ্রকে ভুলে যায়। কিন্তু একজন কামেল ও পূর্ণাঙ্গ পীরের (আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকের) বিশেষ মনোযোগ বা ‘তাওয়াজ্জুহ’র বরকতে এই লতিফাগুলো পুনরায় তাদের শেকড় বা উৎসের সন্ধান পায় এবং সেদিকে ধাবিত হয়।

এই পর্যায়ে বান্দার মধ্যে মহান আল্লাহর প্রতি ঐশ্বরিক টান (ইশক) এবং নৈকট্য প্রকাশ পায়। এভাবে লতিফাগুলো ধাপে ধাপে তাদের মূল উৎসে এবং মূলের মূলে পৌঁছাতে থাকে। পরিশেষে তারা সেই পবিত্র সত্তা অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সান্নিধ্য লাভ করে, যিনি যাবতীয় গুণাবলি ও অবস্থার ঊর্ধ্বে এবং পবিত্র। এই স্তরেই একজন আধ্যাত্মিক পথিক (সালেক) কামেল ‘ফানা’ (অস্তিত্ব বিলীন করা) এবং আকমাল ‘বাকা’ (আল্লাহর সন্তুষ্টিতে স্থায়ী হওয়া) লাভ করেন।[1]

লতিফা সংশোধনের তিনটি মাধ্যম:

আধ্যাত্মিক পথের একজন পথিক (সালেক) এই তিনটি বিষয়ের প্রতি যত বেশি যত্নশীল হবেন, তাঁর আধ্যাত্মিক উন্নতি তত দ্রুত হবে। বিপরীতে, এই বিষয়গুলোতে অবহেলা করলে বাতেনি পথ অতিক্রম করতে বিলম্ব ঘটবে।
প্রথম পদ্ধতি: জিকির, মহান আল্লাহর স্মরণে অন্তরকে মশগুল রাখা।
দ্বিতীয় পদ্ধতি: মুরাকাবা, চোখ বন্ধ করে আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন হওয়া এবং লতিফাগুলোর ওপর ঐশ্বরিক নুর বা ফয়েজ কল্পনা করা।
তৃতীয় পদ্ধতি: রাবেতায়ে শায়েখ, নিজের পীর বা আধ্যাত্মিক গুরুর প্রতি মহব্বত ও একাগ্রতা রাখা, যাতে তাঁর মাধ্যমে আল্লাহর ফয়েজ অন্তরে সঞ্চারিত হয়।[2]

তরিকা-এ মুজাদ্দেদিয়ার উচ্চতর আধ্যাত্মিক পরিক্রমা:

ইসলামি আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসে হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)-এর প্রবর্তিত পদ্ধতি অনন্য উচ্চতা দান করেছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁকে এক বিশেষ ও নবতর আধ্যাত্মিক ধারা (তরিকা-এ-জাদিদ) দান করেছিলেন, যা পূর্ববর্তী অনেক পদ্ধতির তুলনায় অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী।

হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এর পূর্বে অধিকাংশ আধ্যাত্মিক পথিকের বিচরণ ও সাধনা মূলত ‘বেলায়েতে সুগরা’ বা ক্বলবকেন্দ্রিক ক্ষুদ্রতর বেলায়েতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। খুব সামান্য সংখ্যক সাধকই উচ্চতর স্তরে আরোহণ করতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর বিশেষ অনুগ্রহে হজরত মুজাদ্দেদে আলফে সানী (রহ.)-এর সামনে আধ্যাত্মিকতার এমন সব উচ্চতর তোরণ উন্মোচিত করেন, যা ইতঃপূর্বে অপ্রকাশিত ছিল। তিনি কেবল নিজে তা অর্জন করেননি; বরং কিয়ামত পর্যন্ত আগত সালেকদের জন্য সেই পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন।

উচ্চতর মাকাম ও হাকিকতসমূহ:

মুজাদ্দেদিয়া তরিকার সাধনায় যে উচ্চতর স্তরগুলো অতিক্রম করা হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
১. বেলায়েতে কুবরা ও উলয়া: যা নবীগণের বেলায়েতের সাথে সম্পৃক্ত উচ্চতর নুরানি জগৎ।
২. কামালাতে নবুওয়াত ও রিসালাত: নবুওয়ত ও রিসালাতের নিগূঢ় পূর্ণতা অর্জন।
৩. হাকিকতে ইব্রাহিমি, মুসাবি ও মুহাম্মদি আহমদি: নবীগণের আধ্যাত্মিক সত্তার মূল রহস্যের সাথে পরিচিতি।
৪. হাকিকতে কাবা ও কুরআন: পবিত্র কাবা শরিফ এবং মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য অনুধাবন।

মুজাদ্দেদিয়া তরিকার উত্তরাধিকার:

হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) এই সূক্ষ্ম মাকামগুলোর পূর্ণ জ্ঞান তাঁর সুযোগ্য দুই পুত্র— হজরত খাজা মুহাম্মদ সাঈদ (রহ.) ও হজরত খাজা মুহাম্মদ মাসুম (রহ.)-এর সিনায় আমানত হিসেবে অর্পণ করেন। তাঁদের মাধ্যমেই এই ‘মুহাম্মদি’ নিসবত আজ অবধি জারি রয়েছে। একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.) নিজেই ঘোষণা করে গেছেন যে, হজরত ইমাম মাহদি আলাইহিস সালাম এই তরিকার আধ্যাত্মিক নিসবত লাভ করবেন এবং তাঁর মাঝে এই ধারার পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ঘটবে।

মুজাদ্দেদিয়া তরিকার রুহানি সংযোগ ও ইলমে লাদুন্নি:

এই তরিকার গভীরতা বোঝা যায় হজরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এর আত্মিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। তিনি বর্ণনা করেছেন যে, আসাদুল্লাহিল গালিব হজরত আলী রাদ্বিআল্লাহু আনহু স্বয়ং তাঁকে ‘ইলমে দাওয়াত’ (বিশেষ দোয়া ও আধ্যাত্মিক প্রভাবের জ্ঞান) শিক্ষা দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি হজরত খিজির (আলাইহিস সালাম)-এর রুহানিয়্যত থেকে সরাসরি ‘ইলমে লাদুন্নি’ বা ঐশ্বরিক জ্ঞান লাভ করেছেন।[3]

ভারতবর্ষে নকশবন্দিয়া সিলসিলা এবং ডক্টর আর্থার ব্যুহলার-এর গবেষণা:

ভারতবর্ষে নকশবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়া শাখার বিস্তারের ওপর ডক্টর আর্থার এফ. ব্যুহলার-এর গবেষণা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। এই সম্পর্কে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘Revealed Grace: Jurist Sufism of Ahmad Sirhindi (1564–1624)’।

এই গ্রন্থে তিনি শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.)-এর মাকতুবাত বা পত্রাবলির অনুবাদ করার পাশাপাশি সেই পত্রগুলোর প্রেক্ষাপট, ভূ-প্রকৃতি এবং যাদের উদ্দেশ্যে পত্রগুলো লেখা হয়েছিল, তাঁদের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমানা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে যেখানে শায়খ আহমদ সিরহিন্দি তাঁর সুফি চিন্তাধারার সাথে সমসাময়িক রাজনীতিকে সমন্বিত করেছিলেন, তা ব্যুহলার নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

ডক্টর ব্যুহলার প্রখ্যাত সুফি গবেষক অ্যান মেরি শিমেল-এর সাথে যৌথভাবে উত্তর-উপনিবেশবাদী (Post-colonial) সুফি ঐতিহ্য এবং বিশেষত ভারতের নকশবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়া ধারার ওপর একটি বিখ্যাত বই লিখেছেন, যার নাম— ‘Sufi Heirs of the Prophet: The Indian Naqshbandiyya and the Rise of the Mediating Sufi’।

নকশবন্দিয়া থেকে মুজাদ্দেদিয়া নামে রূপান্তর:

ভারতবর্ষে নকশবন্দি সুফিদের আগমন মূলত ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দ তথা দশম হিজরি শতকে তৈমুরি (মুঘল) বিজয়ের সাথে সাথে ঘটেছিল। এই একই শতাব্দীতে শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.) নকশবন্দি ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। তিনি নকশবন্দি তরিকার সংজ্ঞা নতুনভাবে নির্ধারণ করেন এবং এর আধ্যাত্মিক সাধনায় (সুলুক) তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় দিক থেকে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেন। তাঁকে দেওয়া ‘মুজাদ্দেদে আলফে সানি’ (দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক) উপাধিটি তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের ওপর তাঁর গভীর প্রভাবের গুরুত্বকেই ফুটিয়ে তোলে। পরবর্তীকালে তাঁর অনুসারীরা এই ধারাটিকে ‘নকশবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়া’ শাখা হিসেবে নামকরণ করেন।

মুজাদ্দেদিয়া ধারার অনন্য বৈশিষ্ট্য ও রাজনৈতিক ভূমিকা:

ভারতবর্ষে নকশবন্দি সুফিদের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে তাদের সুসংবদ্ধ ধর্মীয় নেতৃত্বের ধারণার সাথে। ভারতবর্ষের অন্যান্য সুফি সিলসিলার তুলনায় নকশবন্দিগণ রাজনৈতিক বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা সবচেয়ে বেশি করেছিলেন। তাঁরা তৎকালীন শাসকদের একজন ‘শরিয়তপন্থী সুফি পথপ্রদর্শক’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস পান, যাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম সমাজে ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তি মজবুত করা যায়।

নকশবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়া ধারার সুফিরা অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক এবং ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক— উভয় দিক থেকে সুফিবাদ ও রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের এই আত্মত্যাগের ফলেই সপ্তদশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে ধর্মীয় সংহতি বা ‘রিলিজিয়াস ক্রিস্টালাইজেশন’ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। এই প্রক্রিয়াটি ভারতীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেক নতুন ধারার জন্ম দেয়। এমনকি পাকিস্তানের অভ্যুদয়েও এই আদর্শিক সংহতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সুফি ও ফকিহ’র সমন্বয়:

উপনিবেশবাদ-পূর্ব সময়ে নকশবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়া নেতৃত্ব সুফি এবং ফকিহ (ইসলামি আইনজ্ঞ)—উভয় গুণাবলিকে একই ব্যক্তিত্বের মধ্যে সমন্বিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই প্রক্রিয়াটি সময়ের সাথে আরও বেগবান হয় (সম্ভবত আওরঙ্গজেব আলমগীরের আমলে সুফি ও কাজী বা বিচারকের গুণাবলি একই ব্যক্তির মধ্যে বিকশিত হওয়ার বিষয়টি পূর্ণতা পায়)। এর ফলে নকশবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়া সিলসিলার মধ্যে আধ্যাত্মিক কর্তৃত্বের পাশাপাশি ‘ধর্মীয় নেতৃত্ব’ লাভের প্রবণতাও অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

নকশবন্দিয়া সিলসিলার বিস্তারের তিনটি প্রধান পর্যায়:

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নকশবন্দিয়া সিলসিলার বিস্তারকে আমরা তিনটি প্রধান ও স্বতন্ত্র পর্যায়ে বিভক্ত করতে পারি। প্রতিটি পর্যায় একজন মহান ব্যক্তিত্বের সাথে যুক্ত, যিনি এই সিলসিলায় সংস্কার বা تجدید (তাজদীদ)-এর দায়িত্ব পালন করেছেন:
১. প্রথম পর্যায় — তরিকা-এ-খাজগান: এর সূচনা হয় হজরত খাজা আব্দুল খালেক গুজদুওয়ানি (মৃ. ১১৭৯ খ্রি./৫৭৫ হি.)-এর মাধ্যমে।
২. দ্বিতীয় পর্যায় — নকশবন্দিয়া: এই পর্যায়ের শুরু হয় হজরত খাজা বাহাউদ্দীন নকশবন্দ (রহ.)-এর মাধ্যমে।
৩. তৃতীয় পর্যায় — মুজাদ্দেদিয়া: এই পর্যায়টি শায়খ আহমদ সিরহিন্দি মুজাদ্দেদে আলফে সানি (রহ.)-এর মাধ্যমে পূর্ণতা পায়।

ভারতবর্ষে নকশবন্দিয়া সিলসিলার বিস্তারে আহরার পরিবার ও মুঘল শাসকগণ:

ভারতবর্ষে নকশবন্দিয়া সিলসিলা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন হজরত খাজা নাসিরুদ্দিন উবায়দুল্লাহ আহরার রহ. (মৃ. ১৪৯০ খ্রি.)-এর বংশধর এবং তাঁর খলিফাগণ। তাঁদের মাধ্যমেই এই তরিকা কেবল ভারতে নয়; বরং ইরান, তুরস্ক ও আরব বিশ্বেও বিস্তৃতি লাভ করে।

খাজা উবায়দুল্লাহ আহরার কেবল একজন আধ্যাত্মিক সাধকই ছিলেন না; বরং তিনি খোরাসানের অন্যতম বৃহৎ ভূস্বামী এবং পূর্ব তৈমুরি (মুঘলদের পূর্বপুরুষ) সাম্রাজ্যের একজন অলিখিত বা প্রভাবশালী শাসক হিসেবে গণ্য হতেন। তিনি তৈমুরি শাসকদের সাথে তাঁর সুসম্পর্ককে নকশবন্দিয়া তরিকার প্রচার ও প্রসারে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করেছিলেন। একইসাথে তিনি তুর্কি-মঙ্গোল প্রচলিত আইনের পরিবর্তে এলাকায় ইসলামি শরিয়াহ প্রতিষ্ঠার জোর প্রচেষ্টা চালান।

তৈমুরি শাসনের প্রথম পর্ব শেষ হয়ে যখন শাইবানি বংশীয় রাজত্ব শুরু হয়, তখন আহরার পরিবার কিছুটা সংকটের মুখে পড়ে। শাইবানি শাসক মুহাম্মদ শাইবানি আহরার পরিবারের জমিদারি বাজেয়াপ্ত করেন এবং তাঁর বংশের কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেন। তবে এই দুর্দিন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি; দ্রুতই শাইবানি ও পরবর্তী উজবেক শাসকদের সাথে এই নকশবন্দি পরিবারের সম্পর্ক পুনরায় স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের সাথে আহরার পরিবারের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। বাবর কাবুল দখলের পূর্বেই খাজা আহরারের বংশধর ও খলিফাগণ সেখানে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন। প্রচলিত আছে যে, বাবরের দিল্লি বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী স্বয়ং খাজা উবায়দুল্লাহ আহরার করেছিলেন।

সম্রাট হুমায়ুনের সময়েও এই আধ্যাত্মিক প্রভাব বিদ্যমান ছিল। খাজা আখন্দ মাহমুদ (যিনি খাজা নূরা নামে পরিচিত) বাবরের পুত্র কামরান মির্জার কান্দাহার বিজয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আবার হুমায়ুন যখন খাজা নূরার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেন, তখন তিনি শের শাহ সুরির কাছে হুমায়ুনের পরাজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন বলে জানা যায়। তবে হুমায়ুন নিজে খাজা বাহলুলের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন, যিনি বিখ্যাত সুফি খাজা গাউস গোয়ালিয়রির বড় ভাই ছিলেন।

উপরে বর্ণিত উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, তৎকালের সুফি সাধকগণ কীভাবে নিজ সময়ের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক মেরুকরণে প্রভাব বিস্তার করতেন। এটি নকশবন্দিয়া সিলসিলা এবং তৈমুরি (মুঘল) বাহিনীর সামরিক সাফল্যের মধ্যকার গভীর সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটায়। তৈমুরি যুগে এই বিশ্বাস প্রবল ছিল যে, একজন সুফি শায়খ কেবল আধ্যাত্মিক জগতেই নয়, বরং জাগতিক বিষয়েও হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা রাখেন।

রাজদরবারে নকশবন্দিয়া প্রভাব ও উচ্চপদ:

মুঘল শাসক এবং নকশবন্দিয়া মাশায়েখদের সম্পর্কের বহুমুখী দিক ছিল।

আধ্যাত্মিক শিক্ষক: খাজা মঈনুদ্দিন আব্দুল হক (মৃ. ১৫৫৪ খ্রি.) ছিলেন সম্রাট হুমায়ুনের পুত্র মির্জা কামরানের আধ্যাত্মিক শিক্ষক।

অভিভাবক ও মুরিদ: আকবরের অভিভাবক বৈরাম খাঁ ছিলেন ইরানি নকশবন্দি সুফি মাওলানা জিয়াউদ্দিন কামানকারের মুরিদ।

প্রশাসনিক পদ: খাজা আহরারের নাতি খাজা আব্দুল কাফি এবং খাজা কাসিম হুমায়ুনের শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

ধর্মীয় ব্যবস্থাপনা: সুলতান খাজা নকশবন্দি সম্রাট আকবরের আমলে ওয়াকফ ও জায়গির বণ্টনের দায়িত্বে ছিলেন। অন্যদিকে, মোহাম্মদ ইয়াহইয়া ১৫৯০ খ্রিষ্টাব্দে আকবর কর্তৃক ‘আমিরুল হজ’ নিযুক্ত হন।

ভারতবর্ষে নকশবন্দিয়া তরিকার পুনর্জাগরণ:

নকশবন্দিয়া সিলসিলার ইতিহাসে মধ্য এশীয় প্রভাব থেকে ভারতীয় স্বতন্ত্র ধারায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হলেন হজরত খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.) (মৃ. ১৬০৩ খ্রি.)। তিনি মুজাদ্দেদে আলফে সানি শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.)-এর পীর বা আধ্যাত্মিক গুরু হওয়ার কারণে তাঁর গুরুত্ব অপরিসীম।
সে সময় অনেক নকশবন্দি সুফি হজের উদ্দেশ্যে বা জীবিকার সন্ধানে ভারতবর্ষে আসতেন। যেমন—
খাজা জামালুদ্দিন খওয়ারেজমি। তিনি ‘বাদশাহ পর্দা পোশ’ নামে পরিচিত ছিলেন। হজের সফর শেষে সুরাট বন্দরে অবস্থান নেন এবং সেখানেই ধর্ম প্রচার করেন।
খাজা আব্দুল্লাহ কাবুলি: তিনি জীবিকার সন্ধানে কাবুল থেকে ভারতে আসেন এবং সম্রাট আকবর তাঁকে تربت (তুর্বত) জেলায় ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন।

খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক পরিক্রমা:

খাজা বাকি বিল্লাহ শৈশব থেকেই এই তরিকার সাথে পরিচিত ছিলেন, কারণ তাঁর দাদা খাজা উবায়দুল্লাহ আহরারের নাতি খাজা মুহাম্মদ জাকারিয়ার মুরিদ ছিলেন। আধ্যাত্মিক পূর্ণতা লাভের আশায় তিনি কাবুল থেকে কাশ্মীর হয়ে সমরকন্দ পর্যন্ত সফর করেন। অবশেষে সমরকন্দে খাজা আমকাঙ্গি (রহ.)-এর সান্নিধ্যে তিনি বেলায়েতের উচ্চ মাকাম লাভ করেন।

পীরের ইন্তেকালের পর তিনি লাহোর হয়ে দিল্লিতে আসেন এবং ফিরোজ শাহ কোটলার সামনে একটি ‘খানকাহ’ প্রতিষ্ঠা করেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই খানকাহ নির্মাণের সমস্ত ব্যয়ভার বহন করেছিলেন সম্রাট আকবরের প্রভাবশালী মন্ত্রী শেখ ফরিদ বুখারি। খাজা বাকি বিল্লাহ মাত্র ৪০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করলেও এই সংক্ষিপ্ত সময়ে তিনি এক আধ্যাত্মিক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন।

তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর খলিফাগণ এই তরিকাকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেন। যার মধ্যে রয়েছে—

১. খাজা তাজউদ্দীন সম্ভলি। তিনি হিজাজে (আরব দেশ) চলে যান এবং তাঁর মাধ্যমে মিসর ও ইয়েমেনে নকশবন্দিয়া তরিকা বিস্তৃতি লাভ করে।

২. খাজা হুসামুদ্দীন: তিনি দিল্লিতে খাজা বাকি বিল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি সম্রাট আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজলের বোনকে বিয়ে করেছিলেন এবং একজন উচ্চপদস্থ মনসবদার ছিলেন। পরবর্তীতে সব ত্যাগ করে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন হন।

মুঘল দরবারে তরিকার অবস্থান:

খাজা বাকি বিল্লাহ যখন দিল্লিতে আধ্যাত্মিক কার্যক্রম শুরু করেন, তখন সম্রাট আকবর চিশতিয়া তরিকার প্রতি অত্যন্ত অনুরাগী ছিলেন। তিনি খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) এবং হজরত সেলিম চিশতি (রহ.)-এর প্রতি বিশেষ ভক্তি রাখতেন। এই প্রতিকূল ও মিশ্র পরিবেশের মধ্যেই খাজা বাকি বিল্লাহ (রহ.) নকশবন্দিয়া তরিকার সংস্কারবাদী বীজ বপন করেন, যা পরবর্তীতে শায়খ আহমদ সিরহিন্দির মাধ্যমে মহীরুহে পরিণত হয়।

মুজাদ্দেদিয়া তরিকার বিশেষত্ব:

গবেষক আর্থার ব্যুহলারের মতে, শায়খ আহমদ সিরহিন্দি নকশবন্দিয়া তরিকাকে একদম নতুনভাবে বিন্যস্ত করেন। তিনি এই তরিকায় নতুন নতুন আধ্যাত্মিক সাধনা ও অনুশীলনী (যেমন— লতিফাসমূহের সংস্কার ও বিশেষ মুরাকাবা) প্রবর্তন করেন। তাঁর এই সংস্কার ও তাজদীদের কারণে তাঁর পরবর্তী ধারাটি বিশ্বব্যাপী ‘মুজাদ্দেদিয়া’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

মুজাদ্দেদিয়া তরিকা ও মুঘল রাজবংশ:

ওলন্দাজ গবেষক ইয়োহানান ফ্রিডম্যান তাঁর পিএইচডি গবেষণায় প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.) মূলত একজন রাজনৈতিক সংস্কারক হিসেবে নয়; বরং একজন আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। তাঁর আধ্যাত্মিক দাবিসমূহ এবং ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁকে সাময়িকভাবে কারারুদ্ধ করেছিলেন। তবে প্রভাবশালী আফগান আমিরদের মধ্যস্থতায় তিনি মুক্তি পান।

১৬১৯ খ্রিষ্টাব্দে শায়খ আহমদ সিরহিন্দির ‘মাকতুবাত’-এর দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হলে সম্রাট শাহজাহান তাঁকে পুনরায় কারারুদ্ধ করেন। অভিযোগ ছিল, তিনি একটি পত্রে নিজের আধ্যাত্মিক মাকাম বা স্তরকে ‘মাকামে সিদ্দিকিয়াত’-এর উপরে বলে উল্লেখ করেছেন। শাহজাহান পাঞ্জাব ও সিরহিন্দ অঞ্চলে এই তরিকার ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় যখন তিনি সৈয়দ আদম বানুরি (রহ.)-কে হিজাজে যেতে বাধা দেন। কারণ, লাহোরে তাঁর হাজার হাজার সশস্ত্র আফগান অনুসারী ছিল। তবে সময়ের সাথে সাথে মুঘল রাজদরবারের সাথে শায়খ এবং তাঁর সন্তানদের সম্পর্কের উন্নতি ঘটে।

কাইয়ুমে সানি হজরত খাজা মুহাম্মদ মাসুম (রহ.):

শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.) তাঁর মেজো ছেলে খাজা মুহাম্মদ মাসুম (রহ.)-কে তাঁর উত্তরসূরি বা জানশীন নিযুক্ত করেন, যিনি ‘কাইয়ুমে সানি’ (দ্বিতীয় কাইয়ুম) হিসেবে পরিচিত। তিনি তাঁর পিতার ঐতিহ্য রক্ষা করে রাজপরিবারের সদস্যদের কাছে হেদায়েতি পত্র পাঠাতেন এবং তাঁদের শরিয়ত পালনে উদ্বুদ্ধ করতেন।

সম্রাট আওরঙ্গজেব ও মুজাদ্দেদিয়া নিসবত:

ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে শাহজাহানের মৃত্যুর পর সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর সিরহিন্দ সফর করেন এবং খাজা মুহাম্মদ মাসুম (রহ.)-এর কাছে বায়াত গ্রহণ করেন। আওরঙ্গজেব যে নকশবন্দি ছিলেন, তার প্রমাণ খাজা মাসুমের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলোতে পাওয়া যায়। তাঁর পুত্র হুজ্জাতুল্লাহ নকশবন্দি উল্লেখ করেছেন যে, আওরঙ্গজেব দীর্ঘকাল নকশবন্দি তরিকার বিশেষ অজিফা ও আমলসমূহ (ঔরাদ-ও-আশগাল) পালন করতেন।

উত্তরাধিকার যুদ্ধে নকশবন্দি ভূমিকা:

শাহজাহানের পুত্রদের মধ্যে যখন ক্ষমতার লড়াই চরম আকার ধারণ করে, তখন আওরঙ্গজেব সিরহিন্দ কেন্দ্রের সাথে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত মজবুত করে তুলেছিলেন। তিনি খাজা মুহাম্মদ মাসুম (রহ.)-এর কাছে আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক সাহায্য প্রার্থনা করেন। খাজা মাসুম এবং তাঁর খলিফাগণ কেবল আফগান আমিরদেরই আওরঙ্গজেবের পক্ষে সংগৃহীত করেননি, বরং মুঘল সেনাবাহিনীর অনেক প্রভাবশালী সেনাপতিকেও আওরঙ্গজেবের সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।

মুঘল সম্রাট শাহজাহানের পুত্রদের মধ্যে যখন ক্ষমতার লড়াই চরম পর্যায়ে, তখন কেবল তরবারি নয়; বরং ‘রুহানি শক্তি’ বা আধ্যাত্মিক সমর্থনের লড়াইও সমানতালে চলছিল। আওরঙ্গজেব আলমগীরের পক্ষে নকশবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়া তরিকার সমর্থন ছিল এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক শক্তি।

আওরঙ্গজেবের সমর্থনে নকশবন্দি পরিবার:

নকশবন্দি ইতিহাস থেকে জানা যায়, খাজা মুহাম্মদ মাসুম (রহ.) তাঁর ভাতিজা শেখ সানাউদ্দিন এবং পুত্র মোহাম্মদ আশরাফকে আওরঙ্গজেবের কাছে পাঠান। এটি ছিল রাজনৈতিকভাবে আওরঙ্গজেবের প্রতি মুজাদ্দেদিয়া তরিকার প্রকাশ্য সমর্থনের একটি শক্তিশালী বার্তা। একই সময়ে খাজা মাসুম এবং তাঁর বড় ছেলে সিবগাতুল্লাহ মক্কায় চলে যান। সেখানে তাঁরা উলামা ও সুফিদের সাথে সাক্ষাৎ করে আওরঙ্গজেবের বিজয়ের জন্য দোয়ার অনুরোধ করেন।

বড়পীর হজরত আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর রুহানি ফয়সালা:

খাজা মাসুম তাঁর পুত্র সিবগাতুল্লাহকে বাগদাদে হজরত আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতে পাঠান। এর উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত গভীর। আওরঙ্গজেবের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দারা শিকোহ ছিলেন কাদিরিয়া তরিকার অনুসারী এবং হজরত মিয়া মীর (রহ.)-এর মুরিদ। নকশবন্দিগণ চেয়েছিলেন আধ্যাত্মিকভাবে এটি নিশ্চিত করতে যে, দারা শিকোহ যেন বড়পীরের রুহানি সাহায্য না পান।

দারা শিকোহ-এর আধ্যাত্মিক বিচ্ছিন্নতা ও প্রচার:

নকশবন্দি মুজাদ্দেদিয়া তরিকার অনুসারীরা তৎকালীন জনমনে এই ধারণা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন যে, দারা শিকোহ দ্বীন থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণে কাদিরিয়া সিলসিলার সাথে তাঁর আর কোনো সম্পর্ক নেই। এমনকি প্রচার করা হয়েছিল যে, দারা শিকোহ নিজের নামের সাথে ‘কাদরি’ উপাধি ব্যবহার করাও ছেড়ে দিয়েছেন।

ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষ এবং সৈন্যদের বিশ্বাস ছিল যে, ‘গাউসে পাক’ হজরত আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.) বিপদে মানুষের সাহায্য করেন। তাই যুদ্ধের ময়দানে আওরঙ্গজেবের সৈন্যদের মনস্তাত্ত্বিক জয়ের জন্য এটি প্রমাণ করা জরুরি ছিল যে, বড়পীরের সাহায্য আওরঙ্গজেবের সাথে আছে, দারা শিকোহ-এর সাথে নয়।

মুজাদ্দেদিয়া তরিকার শ্রেষ্ঠত্ব ও লৈখিক ঐতিহ্যের প্রভাব:

ভারতবর্ষে নকশবন্দিয়া সিলসিলার অন্যান্য উপ-শাখাগুলো থাকা সত্ত্বেও কেন কেবল ‘মুজাদ্দেদিয়া’ শাখাটিই টিকে রইল এবং প্রভাবশালী হয়ে উঠল, তার পেছনে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.)-এর শক্তিশালী যুক্তি ও এই তরিকার বিশাল লৈখিক ভাণ্ডার কাজ করেছে।

শাহ ওয়ালিউল্লাহর মতে, নকশবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়া শাখাটি ছিল অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, উজ্জ্বল এবং সুন্নাহর অনুসারী। এটি একদিকে শরিয়তের সীমানা কঠোরভাবে রক্ষা করত, অন্যদিকে মানুষের আচার-আচরণকে ‘সালাফ’ বা পূর্বসূরিদের আদলে গড়ে তুলত।

এর বিপরীতে ভারতবর্ষে আরও কিছু নকশবন্দি শাখা ছিল। যেমন শেখ আবুল আলা এবং খাজা বাকি বিল্লাহর সন্তানদের ধারা। যারা বাদ্যযন্ত্রসহ সামা (কাওয়ালি) ও আধ্যাত্মিক নৃত্যের আয়োজন করত। তারা একে আধ্যাত্মিক উন্নতির মাধ্যম মনে করত। কিন্তু শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.)-এর ইন্তেকালের ১০০ বছরের মধ্যেই মুজাদ্দেদিয়া শাখাটি এই অন্য শাখাগুলোকে গ্রাস করে নেয়। লাহোরে খাজা খুন্দ মাহমুদ এবং আওরঙ্গবাদে বাবা শাহ মুহাম্মদ মুসাফিরের মতো বুজুর্গদের শক্তিশালী শাখাগুলোও একসময় মুজাদ্দেদিয়া ধারার সাথে মিশে যায় বা বিলুপ্ত হয়ে যায়।

মুজাদ্দেদিয়া সাহিত্যের প্রভাব: ‘মাকতুবাত-এ-ইমাম রব্বানি’

মুজাদ্দেদিয়া তরিকার অমরত্বের পেছনে এর সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ঐতিহ্যের বড় ভূমিকা রয়েছে। শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর জীবন ও দর্শনের ওপর একাধিক কালজয়ী গ্রন্থ রচিত হয়। যথা—

জুবদাতুল মাকামাত: মুহাম্মদ হাশেম কাশ্মীরি রচিত।

হাজরাতিল কুদস: খাজা বদরুদ্দিন সিরহিন্দি রচিত।

রওজাতুল কাইয়ুমিয়া: আবুল ফয়েজ আল-হাসান রচিত।

তবে সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো শায়খ আহমদ সিরহিন্দির ৫৩৬টি মাকতুবাত বা পত্রাবলি। ভারতবর্ষে সুফি সাহিত্যের প্রভাবের দিক থেকে একে কেবল খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়ার ‘ফাওয়ায়িদুল ফুয়াদ’ এর সাথে তুলনা করা যায়। যদিও এই পত্রগুলো অত্যন্ত জটিল এবং আধ্যাত্মিক পরিভাষায় পূর্ণ, তবুও এর তাত্ত্বিক গভীরতা এই তরিকাকে অনন্য উচ্চতা দান করেছে।

মাকতুবাতের মূল বিষয়বস্তু:

গবেষক আর্থার ব্যুহলারের মতে, ‘মাকতুবাত’ কোনো সাধারণ বই নয়। এতে শায়খ মূলত নকশবন্দি মুজাদ্দেদিয়া তরিকার বিশেষ জিকির, আধ্যাত্মিক স্তর (মাকামাত) এবং অন্তরের অবস্থার (ওয়ারিদাত) ওপর দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। যেখানে শরিয়ত নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সেখানে হানাফি ফিকহের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তিনি তাঁর প্রবর্তিত আধ্যাত্মিক চর্চার ভিত্তিগুলো আদি নকশবন্দি এবং ইসলামের মূল ঐতিহ্য থেকে খুঁজে বের করে প্রমাণ করেছেন। অন্য শাখাগুলোর (যেমন: খাজা বাকি বিল্লাহ বা আবুল আলা) এরকম কোনো বিশাল লিখিত ভাণ্ডার না থাকায় তারা সময়ের সাথে হারিয়ে গেছে।

ব্রিটিশ রাজত্ব ও ১৮৫৭ পরবর্তী পরিস্থিতি:

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পর ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপট পুরোপুরি বদলে যায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম হওয়ার পর শাসকদের ওপর নকশবন্দি সুফিদের যে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল, তা বিলুপ্ত হয়ে যায়।

১৮০৩ সাল: ব্রিটিশরা মারাঠাদের দিল্লি থেকে হটিয়ে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে তাদের আশ্রয়ে নিয়ে আসে।

১৮৪৯ সাল: পাঞ্জাব ব্রিটিশদের দখলে চলে যায়।

১৮৫৭ সালের পর: মুঘল শাসনের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে যায় এবং সম্রাটকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়। এই বিপ্লবের পর ব্রিটিশদের আক্রোশের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয় মুসলমানরা এবং তাদেরকে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হয়।

১৮৫৭ সালের যুদ্ধ মুঘল আমলের উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ১৮৯৯ সাল পর্যন্ত দিল্লির শাহি মসজিদে তালা ঝোলানো ছিল এবং ব্রিটিশ শাসকরা জুতা পায়ে সেই পবিত্র মসজিদে প্রবেশ করাকে নিজেদের অধিকার মনে করত। দিল্লির এই অস্থিরতা নকশবন্দিয়া তরিকার কার্যক্রমকে স্থবির করে দেয়।

তৎকালে দিল্লির সবচেয়ে বড় নকশবন্দি কেন্দ্র ছিল খাজা আহমদ সাঈদ (রহ.)-এর খানকাহ (যেখানে মির্জা মাজহার জানে জানা এবং শাহ গুলাম আলী দেহলভীর মাজার অবস্থিত)। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশদের চরম প্রতিশোধমূলক আচরণের মুখে শাহ আহমদ সাঈদ (রহ.) অনুধাবন করেন যে দিল্লিতে থাকা আর নিরাপদ নয়। তাই তিনি সপরিবারে গোপনে হিজাজ (মক্কা-মদিনা) চলে যান এবং এর দুই বছর পর ১৮৬০ সালে সেখানেই ইন্তেকাল করেন। দীর্ঘ ৩০ বছর পর তাঁর পৌত্র শাহ আবু আল-খায়ের নকশবন্দি (রহ.) (মৃ. ১৯২৪ খ্রি.) দিল্লিতে ফিরে এসে পুনরায় সেই খানকাহ ও আধ্যাত্মিক কার্যক্রম সচল করেন।

পাঞ্জাব; নকশবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়ার নতুন দুর্গ:

আর্থার ব্যুহলারের মতে, ১৮৫৭ সালের পর থেকে পরবর্তী ৯০ বছর নকশবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়া তরিকার মূল কেন্দ্রবিন্দু দিল্লি থেকে সরে গিয়ে পাঞ্জাবে স্থিতি লাভ করে। পাঞ্জাবের মুসলিম সমাজে এই তরিকার প্রভাব অন্য যে-কোনো অঞ্চলের চেয়ে বেশি ছিল।

পাঞ্চাবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল (যেমন: ডেরা গাজী খাঁ, মুজাফফরগড়, মুলতান ও মন্টগোমারি) মূলত সৈয়দ জালালুদ্দিন সুরখ-পোশ বুখারী (রহ.)-এর বংশধরদের প্রভাবাধীন ছিল। সেখানকার সাজ্জাদানশীনরা মাজারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করতেন।

পাঞ্জাবের গ্রামীণ সমাজে বড় বড় মাজার (যেমন: লাহোরে দাতা গঞ্জ বখশ, পাকপত্তনে বাবা ফরিদুদ্দিন গঞ্জ-এ-শকর এবং মুলতানে রুকনুদ্দিন আলমের মাজার) ছিল আধ্যাত্মিকতার মূল প্রতীক।

নকশবন্দি সুফিরা সাধারণত সেই সব গ্রামীণ এলাকায় নতুন করে দরগাহ বা খানকাহ নির্মাণ করেননি, যেখানে আগে থেকেই স্থানীয় অন্য সুফিদের শক্তিশালী প্রভাব ছিল। ব্রিটিশ শাসকরা মুঘলদের মতো ঢালাওভাবে সব দরগাহকে জায়গির বা সুযোগ-সুবিধা দান করেনি; বরং তারা কেবল তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের নিরিখে সুফিদের প্রতি মনোযোগ দিত।

শহরাঞ্চল ছেড়ে গ্রামীণ জনপদে খানকাহর বিস্তার:

ব্রিটিশ সরকারের সাথে সরাসরি সংঘাত এড়াতে ১৮৫৭ সালের পর অনেক নকশবন্দি সুফি বড় বড় শহর ছেড়ে গ্রামীণ ও উপজাতীয় অঞ্চলে তাঁদের খানকাহ্ স্থানান্তর করেন।

হজরত দোস্ত মোহাম্মদ কান্দাহারী (রহ.): ১৮৫০ সালে কান্দাহারের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তিনি তাঁর পীর আহমদ সাঈদের নির্দেশে এমন এক স্থানে খানকাহ্ তৈরির পরিকল্পনা করেন, যেখানে পাঞ্জাবি ও পশতু— উভয় ভাষার মানুষ রয়েছে। তিনি ডেরা ইসমাইল খাঁ থেকে ৪১ মাইল দূরে ‘মুসা জাই’ গ্রামে খানকাহ্ প্রতিষ্ঠা করেন। দ্রুতই এটি আফগানিস্তান, পেশোয়ার ও পাঞ্জাবের তালিবে ইলমদের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

হজরত মোহাম্মদ উসমান (রহ.): তিনি ১৮৯৩ সালে পাঞ্জাবের মিয়াওয়ালি জেলার ‘কুন্ডিয়ান’ গ্রামে নতুন খানকাহ্ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পাঞ্জাবি ও পশতুনদের মধ্যে নকশবন্দিয়া সিলসিলা ছড়িয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখে।

হজরত সিরাজুদ্দীন (রহ.): তিনি শীতকাল মুসা জাই-তে এবং গ্রীষ্মকাল কুন্ডিয়ানে অতিবাহিত করতেন। তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই সিলসিলা সিন্ধু প্রদেশের হায়দ্রাবাদ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

মিয়াঁ শের মুহাম্মদ শরাকপুরী (রহ.): (মৃ. ১৯২৮ খ্রি.) তিনি শরাকপুর শরীফে খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পাঞ্জাবের আর্যাঁ (Arain) সম্প্রদায়ের মধ্যে এই তরিকার ব্যাপক বিস্তার ঘটান।

হজরত উমর বীরবলভী (রহ.): সারগোদা জেলায় তাঁর মাধ্যমে এই সিলসিলা শক্তিশালী হয়।

সৈয়দ ইসমাইল কিরমানওয়ালা (রহ.): (মৃ. ১৯৬৬ খ্রি.) লাহোরে তাঁর খানকাহ এই তরিকার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

সৈয়দ হাসান কল্যানওয়ালী (রহ.): গুজরাওয়ালার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে তিনি নকশবন্দিয়া তরিকাকে জনপ্রিয় করে তোলেন।

এই সকল বুজুর্গের আধ্যাত্মিক ধারা বা সিলসিলা মূলত ১৮৫৭ পূর্ববর্তী দিল্লির সেই মহান মুজাদ্দেদিয়া শায়খদের সাথে গিয়ে মিলেছে।[4]

তরিকায়ে মুজাদ্দেদিয়া হলো দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামের আকিদাগত বিশুদ্ধতা ও ‘শরিয়তভিত্তিক তাসাউফ’-এর এক পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। মোগল আমলের শেষভাগে যখন ‘ওয়াহদাতুল উজুদ’ এর ভুল ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, তখন এই সিলসিলা ‘ওয়াহদাতুশ শুহুদ’ (দর্শনের একত্ববাদ) এবং কঠোর সুন্নাহর অনুসরণের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনে। আধ্যাত্মিক সাধনায় এই তরিকা উচ্চৈঃস্বরে জিকির বা বাদ্যযন্ত্রের পরিবর্তে ‘জিকরে খাফি’ (নিভৃত স্মরণ), ‘মুরাকাবা’ (ধ্যান) এবং শরীরের ছয়টি সূক্ষ্ম কেন্দ্র বা ‘লতিফা’ জাগ্রত করার ওপর জোর দেয়।

এতে কিতাব পড়ার চেয়ে কামেল পীরের ‘সোহবত’ (সান্নিধ্য) ও ‘রাবেতা’ (আধ্যাত্মিক সংযোগ)-কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা একজন সালেককে কেবল নির্জন সাধক নয়; বরং আদর্শ সমাজ সংস্কারক হিসেবে গড়ে তোলে। এক কথায়, মুজাদ্দেদিয়া তরিকা হলো আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের সাথে সামাজিক ও রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের এক ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়।